সিকি RSS feed

অচল সিকির খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • নাদির
    "ইনসাইড আস দেয়ার ইজ সামথিং দ্যাট হ্যাজ নো নেম,দ্যাট সামথিং ইজ হোয়াট উই আর।"― হোসে সারামাগো, ব্লাইন্ডনেস***হেলেন-...
  • জিয়াগঞ্জের ঘটনাঃ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষতা
    আসামে এনার্সি কেসে লাথ খেয়েছে। একমাত্র দালাল ছাড়া গরিষ্ঠ বাঙালী এনার্সি চাই না। এসব বুঝে, জিয়াগঞ্জ নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছিল। যাই হোক করে ঘটনাটি থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতেই হবে। মেরুকরনের রাজনীতিই এদের ভোট কৌশল। ঐক্যবদ্ধ বাঙালী জাতিকে হিন্দু মুসলমানে ভাগ করা ...
  • অরফ্যানগঞ্জ
    পায়ের নিচে মাটি তোলপাড় হচ্ছিল প্রফুল্লর— ভূমিকম্পর মত। পৃথিবীর অভ্যন্তরে যেন কেউ আছাড়ি পিছাড়ি খাচ্ছে— সেই প্রচণ্ড কাঁপুনিতে ফাটল ধরছে পথঘাট, দোকানবাজার, বহুতলে। পাতাল থেকে গোঙানির আওয়াজ আসছিল। ঝোড়ো বাতাস বইছিল রেলব্রিজের দিক থেকে। প্রফুল্ল দোকান থেকে ...
  • থিম পুজো
    অনেকদিন পরে পুরনো পাড়ায় গেছিলাম। মাঝে মাঝে যাই। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়, আড্ডা হয়। বন্ধুদের মা-বাবা-পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। ভাল লাগে। বেশ রিজুভিনেটিং। এবার অনেকদিন পরে গেলাম। এবার গিয়ে শুনলাম তপেস নাকি ব্যবসা করে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। একটু পরে তপেসও এল ...
  • কাঁসাইয়ের সুতি খেলা
    সেকালে কাঁসাই নদীতে 'সুতি' নামের একটা খেলা প্রচলিত ছিল। মাছ ধরার অভিনব এক পদ্ধতি, বহু কাল ধরে যা চলে আসছে। আমাদের পাড়ার একাধিক লোক সুতি খেলাতে অংশ নিত। এই মৎস্যশিকার সার্বজনীন, হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ে জনপ্রিয়। মনে আছে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় একদিন ...
  • শুভ বিজয়া
    আমার যে ঠাকুর-দেবতায় খুব একটা বিশ্বাস আছে, এমন নয়। শাশ্বত অবিনশ্বর আত্মাতেও নয়। এদিকে, আমার এই জীবন, এই বেঁচে থাকা, সবকিছু নিছকই জৈবরাসায়নিক ক্রিয়া, এমনটা সবসময় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না - জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-পরিণ...
  • আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার চাই...
    দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা বুয়েটে পড়ার সুযোগ পায়। দেশের সবচেয়ে ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহে বুয়েট। সেই প্রতিষ্ঠানের একজন ছাত্রকে শিবির সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলল কিছু বরাহ নন্দন! কাওকে পিটিয়ে মেরে ফেলা কি খুব সহজ কাজ? কতটুকু জোরে মারতে হয়? একজন মানুষ পারে ...
  • ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৭
    চন্দ্রপুলিধনঞ্জয় বাজার থেকে এনেছে গোটা দশেক নারকেল। কিলোটাক খোয়া ক্ষীর। চিনি। ছোট এলাচ আনতে ভুলে গেছে। যত বয়েস বাড়ছে ধনঞ্জয়ের ভুল হচ্ছে ততো। এই নিয়ে সকালে ইন্দুবালার সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে। ছোট খাটো ঝগড়াও। পুজো এলেই ইন্দুবালার মন ভালো থাকে না। কেমন যেন ...
  • গুমনামিজোচ্চরফেরেব্বাজ
    #গুমনামিজোচ্চরফেরেব্...
  • হাসিমারার হাটে
    অনেকদিন আগে একবার দিন সাতেকের জন্যে ভূটান বেড়াতে যাব ঠিক করেছিলাম। কলেজ থেকে বেরিয়ে তদ্দিনে বছরখানেক চাকরি করা হয়ে গেছে। পুজোর সপ্তমীর দিন আমি, অভিজিৎ আর শুভায়ু দার্জিলিং মেল ধরলাম। শিলিগুড়ি অব্দি ট্রেন, সেখান থেকে বাসে ফুন্টসলিং। ফুন্টসলিঙে এক রাত্তির ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

শ্রীশ্রী আর্ট অফ লিভিং

সিকি

অনুষ্ঠানের পরের দিনই লেখা শুরু করেছিলাম, তার পরে আর শেষ করি নি। আজ শ্রীশ্রী রবিশংকর পদ্ম সম্মানে ভূষিত হয়েছেন, তাঁর সম্মানে আজ লেখাটা শেষ করেই ফেললাম। জয় গুরুদেব :)

অরূপ, বয়সে একটু বড় হলেও, স্কুলে আমার সহপাঠী ছিল। ব্যান্ডেল সেন্ট জনস। ভালো গান করত, হারমোনিয়াম বাজাত, ফলে স্কুলের প্রেয়ারে ও সামনের রো-তে দাঁড়াত। আমিও দাঁড়াতাম, কারণ আমি তবলাটা বাজাতাম। আমাদের মিশনারি স্কুলে প্রতিদিন হারমোনিয়াম তবলা সহযোগে দুটি করে গান হত। জনগণমন আর হে প্রভু, হে দয়াময়। দ্বিতীয় গানটা বুকের কাছে হাত জোড় করে গাইতে হত, আর যিশু সমেত যে কোনও প্রভুকে জোড়হাতে নমস্কার জানানো আমার বিদ্রোহী সত্ত্বার সাথে খাপ খেত না - তাই ঐ জোড়হাতে প্রার্থনাসঙ্গীত গাইবার থেকে বাঁচাত আমার তবলাবাদন। ধীরে ধীরে হারমোনিয়ামেও আমি গানদুটো তুলে ফেলেছিলাম, ফলে অরূপ না এলে সেদিন হারমোনিয়ামটা আমিই বাজাতাম।

প্রথাগত পড়াশুনো অরূপের খুব ভালোভাবে হয় নি, কিন্তু দারুণ উদাত্ত গানের গলা আর গানের সম্বন্ধে বেশ ক্লিয়ার কনসেপ্ট থাকায়, কোনওরকমে উচ্চমাধ্যমিক পাশ দিয়ে অরূপ ভর্তি হল রবীন্দ্রভারতীতে। রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে স্পেশালাইজ করল। এখন পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন জায়গা থেকে ডাক পায় গান গাইবার, ওর নিজের গানের দলও আছে, এর বাইরে প্রচুর প্রচুর লোককে ও গান শেখায়। মানে, রবীন্দ্রসঙ্গীত।
আমার মা-ও অরূপের একজন ছাত্রী। সত্তরের কাছাকাছি বয়েসেও ছেলের বয়েসী অরূপের কাছে নিষ্ঠা সহকারে আজও রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখে।

তো, এই অরূপ এসেছিল শ্রীশ্রী রবিশংকরের বিশ্ব সংস্কৃতি উৎসবে অংশ নিতে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে নাকি দু হাজার শিল্পীকে ট্রেনে চাপিয়ে নিয়ে আনা হয়েছে, রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবার জন্য। অরূপ তাদের একজন। দু হাজার শিল্পীকে সিঙ্ক্রোনাইজ করা তো চাট্টিখানি কথা নয়, তাই যোগাযোগ, রিহার্সাল ইত্যাদি শুরু হয়েছে অনেকদিন আগে থেকে। আর অরূপ যখন শুনল যে আমার বাবামাও এই সময়ে দিল্লি আসছে, তখন কি আর অনুষ্ঠান অ্যাটেন্ড না করে থাকা যায়? মা-কেও পাঁচখানা কার্ড ধরিয়ে দিল।

শনিবার নিউ দিল্লি স্টেশনের ষোল নম্বর লাটফরমে যখন বাবা-মাকে রিসিভ করতে পৌঁছলাম, অর্ধেক লাটফরম তখন আর্ট অফ লিভিং-এর ভলান্টিয়ারে ভর্তি, প্রত্যেকের হাতে প্ল্যাকার্ড - তাতে হিন্দিতে লেখা - রবীন্দ্রসঙ্গীত। সাথে এওএলের লোগো। শিল্পীরা খেপে খেপে আসছেন, পূর্বায়, শিয়ালদা রাজধানী, হাওড়া রাজধানীতে - তাঁদের নিয়ে যাওয়া হবে রাজধানীর বিভিন্ন হোটেলে, রবিবার সন্ধ্যেয় রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনুষ্ঠান। অরূপ আগেই চলে এসেছে পূর্বা এক্সপ্রেসে - মা-কে ফোন করেছিল একটু আগে।

ইতিমধ্যে শ্রীশ্রী কদিন ধরেই দিল্লির কাগজগুলোর খবরের শিরোনামে, ইন ফ্যাক্ট, গত দুদিন ধরে খুব হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে - বিজয়মাল্য নাকি শ্রীশ্রী, ফ্রন্ট পেজের প্রথম কলামগুলো কে দখল করবেন। প্রথমে মামলা, এনজিটি - মানে, ন্যাশনাল গ্রীন ট্রাইব্যুনালের হুঙ্কার, ওদিকে সুপ্রিম কোর্টের চেঁচামিচি - এইসব করে টরে দশ তারিখ দিনের শেষে শ্রীশ্রীর জন্য জরিমানা ধার্য হয়েছে পাঁচ কোটি টাকা, তাও শ্রীশ্রী বলেছেন দেবো না, দরকার হলে জেলে যাবো, তাতে শ্রীশ্রী-র ভক্তরা আরও চেগে উঠেছেন, মিডিয়ার সামনে শ্রীশ্রী ভেঙ্কাইয়া নাইডু বলেছেন, যাঁরা যাঁরা এেই অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করছেন তাঁরা আসলে হিন্দুত্ববিরোধী, হাল্কা করে অ্যান্টিন্যাশনালও বুঝিয়ে দিয়েছেন ঘুরিয়ে - কারণ বিরোধিতার মাধ্যমে বিরোধীরা আসলে দুনিয়ার কাছে ভারতের "ছবি" খারাপ করছেন কিনা।

সত্যি কথা। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এই হিন্দুত্ববিরোধিতা বড় বেশি বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে গেছে। আমাদের দেশের কৃষ্টি, দর্শন, অনুভব যে কোনও মূল্যে হেয় করতে রেডি এই বিরোধীরা।
যমুনার এই অববাহিকা, খুব কম এলাকা নয়। বরফগলা জলে সৃষ্ট নদী হলেও আজকের যমুনায় খুব বেশি জল থাকে না, তার মূল কারণ দূষণ। দূষণ মূলত মথুরা থেকে দিল্লিতে। নদীর ধার বরাবর বিভিন্ন কলকারখানা, তার থেকে গ্যালন গ্যালন দূষিত কেমিক্যাল দশকের পর দশক ধরে মিশেছে যমুনার জলে। ফলে যমুনার জল এখন ভয়ানক বিষাক্ত, টক্সিক। কুচকুচে কালো জল, তার ওপরে ফেনা ভেসে থাকে। জলজ কোনও প্রাণীই এতে বাস করে না। দিল্লির মসনদে সরকার এসেছে, সরকার গেছে, যমুনাকে স্বচ্ছ বানাবার জন্য, দূষণমুক্ত করার জন্য, প্যানেল বসেছে, ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি তৈরি হয়েছে, যমুনা বাঁচাও আন্দোলন তৈরি হয়েছে, বক্তৃতা হয়েছে, মিছিল হয়েছে - আর এসবের মধ্যে দিয়ে লাখ লাখ, কোটি কোটি টাকা বয়ে গেছে যমুনার জল দিয়ে, যমুনা ধীরে ধীরে আরও আরও দূষিত হয়ে চলেছে।

এখন নতুন সরকারের নতুন স্লোগান, স্বচ্ছ ভারত। তাই টাকা খরচ করার নতুন স্কিম হয়েছে, পরিকল্পনা হয়েছে, কিন্তু যমুনার দূষণ, আগের মতই এতটুকুও কমে নি, বরং বেড়েছে। যমুনার দুদিকের অববাহিকা খুব কম চওড়া নয়, এখানে মূলত অস্থায়ী ভাবে বাস করে ছোটখাটো চাষীর দল, দিল্লি শহরের বুকে, এইটুকু অঞ্চলেই যা শাকসব্জীর চাষ হয়। তুমুল দূষিত জল আর দুপাড়ের মাটি এখানে ফলায় ডাঁশা ডাঁশা মূলো, কপি, বীট, আলু, সরষে, ইত্যাদি। তবে রাজধানীর বুকে এই বিপুলা জমি কি খালি বেশিদিন পড়ে থাকা সম্ভব? তাই একটু একটু করে জমি চলে যায় কনস্ট্রাকশনের কবলে, কখনও ধর্মের নামে, কখনও রাষ্ট্রের নামে। দু হাজার পাঁচ নাগাদ, শীলা দীক্ষিতের শাসনকালে এই যমুনার অববাহিকা, বা ফ্লাডপ্লেনে তৈরি হয় অক্ষরধাম মন্দির। অপরূপ সুন্দর সে মন্দির - কিন্তু পরিবেশের সমস্ত আপত্তি অগ্রাহ্য করে তৈরি। তখন ন্যাশনাল গ্রীন ট্রাইব্যুনাল হয় তো এত শক্তিশালী ছিল না, সামান্য কিছু প্রতিবাদীর কণ্ঠস্বর সেদিন ভক্তজনের জয়ধ্বনির নিচে চাপা পড়ে গেছিল, কেউ গা করে নি।

এর পরে দু হাজার দশ, মন্দিরের গা ঘেঁষে আরও কয়েকশো একর জায়গা নিয়ে তৈরি হল কমনওয়েলথ গেমস ভিলেজ। যমুনার ফ্লাডপ্লেন আরও অনেকটা কমে গেল, কিন্তু তাতে কী? গেমস ভিলেজ নিয়ে কোটি কোটি টাকার ট্রানজাকশন হল, কিছু খেলেন কালমাডি, কিছু খেলেন দীক্ষিত ম্যাডাম, কিছু এদিক ওদিক খাওয়ানো হল। পিঠোপিঠি তৈরি হল ডিটিসির মিলেনিয়াম বাস ডিপো, হাই কোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট এবং এনজিটির সম্মিলিত তর্জনগর্জন উপেক্ষা করেই সে তৈরি হল এবং টিকেও গেল। নয়ডা মোড় থেকে নিজামুদ্দিন ক্রশিং পর্যন্ত লম্বা এন এইচ চব্বিশের একটা দিকের ফ্লাডপ্লেন ধ্বংসের কাজ সুচারু ভাবে সম্পন্ন হল গত একটা দশকে।

এই দশকে লোভী চোখেরা তাকিয়েছে ন্যাশনাল হাইওয়ের অন্যদিকটায়, যার একদিকে ময়ূর বিহার, অন্যদিকে সরাই কালে খাঁ পর্যন্ত বিস্তৃত যমুনার ফ্লাডপ্লেন। এই অংশেই তৈরি হয়েছে সুবিশাল টেম্পোরারি নগরী, শ্রী শ্রী রবিশংকরবাবুর প্রতিষ্ঠান আর্ট অফ লিভিং-এর পঁয়ত্রিশ বছরের ভরসাফূর্তি উপলক্ষ্যে তিনদিনব্যাপী ওয়ার্ল্ড কালচারাল ফেস্টিভালের। দেশবিদেশ থেকে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নেমন্তন্ন করা হয়েছে, অনেকে এসেছেন, অনেকেই আসেন নি। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিও আসবেন বলে মহাবিতর্কের মাঝে পড়ে শেষমেশ আসা ক্যানসেল করেছেন। কিন্তু ক্যানসেল করতে পারেন নি নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় অন্যান্য মন্ত্রীরা, এবং সর্বোপরি, অরবিন্দ কেজরিওয়াল। শ্রীশ্রী রবিশংকরের সঙ্গে যে তাঁদের আত্মিক যোগাযোগ!

এসব সবাই জানে, খবরের কাগজে, নিউজ চ্যানেলে এই নিয়ে অনেক চর্চা হয়ে গেছে। এন এইচ চব্বিশ দিয়ে যতবার গেছি এসেছি এই কদিনে, দেখার চেষ্টা করেছি কী রকম আয়োজন হয়েছে যমুনার চরে, কত বড় অ্যারেঞ্জমেন্ট। নাঃ, কিছুই দেখা যায় নি, রাস্তার মিডিয়ানে সারি সারি গেট নম্বরের ঠিকানা লাগানো অ্যারো মার্ক আর ইতিউতি শ্রীশ্রীর শ্রীমুখ সমেত ঢাউস বিজ্ঞাপনের ব্যানার ছাড়া আসল কীর্তিকাহিনি কিছুই চোখে পড়ে নি তেমন।

রবিবারটা কেটেছে বেশ ব্যস্ততার মধ্যে। ছিয়াত্তর বছর বয়স্ক বাবা আর উনসত্তর বছর বয়স্কা মা-কে নিয়ে সকালের প্রথম গন্তব্য ছিল রাষ্ট্রপতি ভবন। ভবন ভিজিটের অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে রাখাই ছিল, তাই ঘুরতে কোনও অসুবিধে হয় নি। ভবনটি বিশাল, হাঁটাহাঁটি করতে করতে বেশ পরিশ্রান্তই হয়ে গেছিল তারা। এর পরে কাছেই কনট প্লেসে দুপুরের লাঞ্চ সেরে বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ আমরা গিয়ে পৌঁছলাম বিশ্ব সংস্কৃতি উৎসবের দরজায়।

নয়ডা লিঙ্ক রোডের দিকে চারটি গেট, দশ, এগারো, বারো এবং তেরো। হাতের কাছেই পেলাম বারো নম্বর গেট, অতএব সেখানেই ঢুকিয়ে দিলাম গাড়ি। ঢোকার মুখেই বুঝতে পারছিলাম প্রকৃতির ধ্বংস কীভাবে করা হয়েছে। মাটি, ঘেঁষ আর ডেব্রিস ফেলে উঁচু করে তৈরি করা হয়েছে গাড়ি যাবার রাস্তা, দুদিকে চাষের জমি দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এই রাস্তা তৈরি হয়েছে চাষের জমিতে ঘেঁষ ফেলে। সেই রাস্তা গত দুদিনের বৃষ্টির জল খেয়ে কাদায় মাখামাখি। উঁচুনিচু কাঁচা রাস্তার ওপর দিয়ে দুলকি চালে বেশ খানিকটা যাবার পরে পার্কিং পেলাম। গেটের মুখ থেকে ভেতরে - সর্বত্র থিকথিক করছে দিল্লি পুলিশের অফিসার, কনস্টেবল এবং প্যারামিলিটারি বাহিনি।

গাড়ি রেখে এবার হাঁটা। আবছা কোথাও একটা শুনেছিলাম, পারকিং থেকে নাকি এক কিলোমিটার দূরে অনুষ্ঠানের জায়গা। সেইরকম মাইন্ডসেট নিয়ে এগোটে থাকলাম। কিন্তু পথ ফুরোয় না। যমুনার পলি ফেলে তৈরি করা রাস্তা, দুপাশে ক্ষেতে ফুলকিপি, সরষে, গম, তার মাঝে তারস্বরে বক্স বাজিয়ে ডিজেলের ধোঁয়ার সাথে বিক্রি হচ্ছে আখের রস, ক্যান্ডিফ্লস, পপকর্নের প্যাকেট, জায়গায় জায়গায়।
যত দূর চোখ যাচ্ছে, দেখতে পাচ্ছি মানুষের মিছিল চলেছে, অনুষ্ঠানের প্যান্ডেলের কোনও দর্শন নেই। তা হলে কি এক কিলোমিটারেরও বেশি?

প্রায় এক কিলোমিটার যাবার পরে চোখে পড়ল পুলিশের ব্যারিকেড। মেটাল ডিটেক্টর, গেট, চ্যাঁ-চুঁ আওয়াজ, এবং সেটা পেরিয়ে আবার, আরও হাঁটা। বাবা-মা দুজনেই ক্রমশ আরও পিছিয়ে পড়ছে, এতটা হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু কিছু করার নেই, এতক্ষণে প্রায় দেড় কিলোমিটার চলে এসেছি, এখন ফিরতে হলেও অতটাই হাঁটতে হবে, গাড়ি নিয়ে আসার কোনও উপায় নেই। এত আশা নিয়ে এসেছে মা, অরূপের অনুষ্ঠান দেখবে বলে - ফিরতে বলাটাও উচিত হবে না। দেখছি, খুব কষ্ট করেই হাঁটছে দুজনে।

খানিক বাদে আবার একটি ব্যারিকেড, মেটাল ডিটেক্টর এবং চ্যাঁ-চুঁ। তার পরে দেখি সামনেই যমুনা এবং তার বহুচর্চিত "পন্টুন ব্রিজ"। আমাদের ঘাটালের সেই ভাসা-পুলের মত। পর পর অনেকগুলো বয়ার ওপরে কাঠের আর লোহার পাটাতন ফেলে যমুনা পার হবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমাদের আগে পিছে তখন পালে পালে লোক। অলরেডি বোধ হয় দু কিলোমিটার হেঁটে ফেলেছি, এখন সামনে দেখা যাচ্ছে দূরের স্টেজ। খবরের কাগজে ছবি দেখেছিলাম, তাই চিনতে পারলাম। মাঝখানে সোনালি রঙের গম্বুজ টাইপের কিছু উঠে গেছে সারি সারি। সামনে যেদিকে তাকাই খালি সাদা তাঁবু, জলাজমি আর পুলিশ।

আর গন্ধের কথা বলি নি বুঝি? কুচকুচে কালো যমুনার জল, দুর্গন্ধে ম-ম করছে চারিদিক। পুলের আগেপিছের জমিও নিকষ কালো রঙের। সেই কাকচক্ষু জলে একটি রাবারের ডিঙি চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এনডিআরএফের লোকজন, কীসের আশায়, কে জানে! যাই হোক, পুলের শেষে আবার একটি করে মেটাল ডিটেক্টর গেট, এবং তার পরে আরও খানিক হন্টন। পায়ের নিচে মাটি কেমন দেবে দেবে যাচ্ছে, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে নিচে আসলে জল রয়েছে। কী রকম মনে হচ্ছে, বেশ শক্ত স্পঞ্জের ওপর দিয়ে হাঁটছি। আমার তো তেমন কোনও সমস্যা নেই, সমস্যা হচ্ছে বাবা-মা-র। এমনিতেই দু কিলোমিটার হেঁটে তারা কাবু, তার ওপর এই নরম জমিতে তাদের চলতেও কষ্ট হচ্ছে। পায়ে ঠিকমত গ্রিপ পাচ্ছে না।

তাঁবুর সামনে আবার মেটাল ডিটেক্টর গেট, চ্যাঁ-চুঁ, পুলিশ কর্তৃক পকেট-পাছা ইত্যাদি থাবড়ানো এবং তার পরে মূল অনুষ্ঠানের এলাকায় প্রবেশ। মাটির ওপরে এখন জল উঠে এসেছে, জায়গায় জায়গায় পাঁক, কাদা, দুর্গন্ধ তো রয়েইছে, সেই কাদা পাঁকের ওপর দিয়ে বিছিয়ে দিয়েছে লাল আর সবুজ রঙের কার্পেট পাইকিরি হারে। সেগুলো জল পড়ে আরও ফুলে উঠেছে, আর হাজার লোকের পায়ের চাপে সে একেবারে কার্পেটের তরকারি হয়ে গেছে।

অনুষ্ঠানমঞ্চ দূ-রে দেখা যাচ্ছে, ঐ উঁচু একটা জায়গা। সেখান থেকে ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে এসেছে, তাতে লেজারের আলো খেলছে টেলছে। আর জায়গায় জায়গায় বড় বড় এলইডি ডিসপ্লে বোর্ড বসানো। অনুষ্ঠানের মূল দৃশ্য সেখানেই দেখা যাবে। সামনে বিভিন্ন ভাবে লাখে লাখে চেয়ার বসানো, তার মধ্যেই জায়গা দেখে পাঁচখানা খালি চেয়ার খুঁজে নিয়ে বসে পড়লাম আমরা তাড়াতাড়ি। স্টেজে আসল কলাকুশলীদের দেখতে পাবার কোনও উপায়ই নেই, মূল স্টেজ এখনও আমাদের থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে, দেখতে হবে এলইডি স্ক্রিনের মাধ্যমেই। ... সেইটা দেখার জন্য যে কেন এতদূরে আসা, কে জানে, ঘরে টিভিতে বসে দেখলেই তো হত।

মানে, বোঝা গেল এইটুকু যে, আমরা ময়ূর বিহারের কাছে গাড়ি রেখে হেঁটে এসে গেছি সরাই কালে খানের দিকে। প্রায় তিন কিলোমিটার দূরত্বে। বিকেল সাড়ে চারটে বাজে, শেষবেলার রোদ্দুর চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। পাঁচটায় অনুষ্ঠান আরম্ভ হল।

প্রথমে আর্ট অফ লিভিং ফাউন্ডেশনের থিম সং। সঙ্ঘছদ্ধম। না, যে সুরে আমরা শুনেছি, সেই সুরে নয়, ইহা পাশ্চাত্য ফিউশন, প্রথম দিকের দুটো লাইন এক রেখে তার পরে ইংরেজিতে বাকি গানটা। গান শেষ হওয়া মাত্র সুন্দরী ঘোষিকা বললেন, আপনারা সবাই বলুন, জয় গুরুদেব। অমনি আমাদের চারপাশে এক মহা কলরোল উঠল, যমুনার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত কল্লোলিত হয়ে উঠে বলল, জ-য়-গু-রু-দে-এ-ব। সে ক্ষীই গর্জন! এর পর সমবেত মন্ত্রোচ্চারণ। ইংরেজ ভারতীয় জাপানি আফ্রিকান পাকিস্তানি চীনা সব্বাই একসঙ্গে ওওওওওওওওম্‌ম্‌ম্‌ম্‌ কিঁকুঁচিঁচুঁপিঁপিঁপুঁপুঁ করে এক মহাচ্যান্টিং শুরু করলেন স্টেজে দাঁড়িয়ে, আমরা বসে বসে বিগ স্ক্রিনে তাই দেখলাম, এবং মাইকে সেই মন্ত্রোচ্চারণ শুনে শিহরিত হলাম। মাঝে মাঝে স্ক্রিনে শ্রীশ্রী-কে দেখাচ্ছে, তাঁর চ্যান্টিং শুনে প্রায় ভাবসমাধিস্থ অবস্থা। পাশে চেয়ার আলো করে বসে আছেন - নান আদার দ্যান শ্রীশ্রী ভেঙ্কাইয়া নাইডু, তাঁর পাশে শ্রীশ্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ (মন্ত্রী), অন্য পাশে শ্রীশ্রী অরুণ জেটলি।

চ্যান্টিং শেষ হতে "দো শব্দ্‌" বলবার জন্য মাইক ধরলেন বেঙ্কাইয়াবাবু। শ্রীশ্রীর খুব খুব প্রশংসা করলেন, তিনি যে এক মঞ্চে সারা পৃথিবীকে নিয়ে আসতে পেরেছেন "বিরোধী"দের এত বিরোধিতা সত্ত্বেও, তার জন্য তিনি শ্রীশ্রী রবিশংকরবাবুর খুব কীর্তন করলেন, এবং বললেন, জয় গুরুদেব। তিনি আরও বললেন, লোকে ভুল তথ্য প্রচার করছে, বলছে, যমুনা দূষিত হচ্ছে, যমুনার ফ্লাডপ্লেন নষ্ট হচ্ছে। কোথাও কিছু নেই, যমুনার পানি এখন অনেক বেশি স্বচ্ছ, নির্মল, কোথাও কোনও প্রদূষণ নেই (বলতে বলতেই আবার দুর্গন্ধ এসে ঝাপটা মারল আমাদের নাকে), কিছু মিডিয়া খালি এই বিশাল কর্মযজ্ঞের নিন্দা করার কাজে লেগে রয়েছে। আমরা এই অনুষ্ঠানের সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করি। জয় গুরুদেব।
এর পর অরুণ জেটলি। একই কথা। তিনি আরও বিগলিত হয়ে বললেন, আমি শ্রীশ্রী-কে অনুরোধ করব, এই আর্ট অফ লিভিং অনুষ্ঠান প্রতি বছর দিল্লিতেই করা হোক, এখানেই করা হোক। জয় গুরুদেব।

এর পর কিছু অনুষ্ঠান হল। অনুষ্ঠান তো সবই মনে হল গিনেস বুকে নাম তোলবার উদ্দেশ্যে তৈরি - যেমন এইবারে আপনাদের সামনে খোল বাজাবেন একসাথে একশো ছেচল্লিশজন শিল্পী। এইবারে আপনাদের নাচ দেখাবেন দুশ তিপ্পান্ন জন আর্টিস্ট। এইবারে আফ্রিকান হুলা-হুলা ডান্স হবে, তাতে অংশ নিয়েছেন সাড়ে ছশো উপজাতি - এই রকমের সব ঘোষণা। আসল নাচ, আসল গানবাজনা কিছুই দেখা যাচ্ছে না, সবই দেখছি স্ক্রিনে। দু তিনটে আইটেম হবার পরে আবার বক্তৃতা শুরু। এইবারে সুরেশ প্রভু। তার পরে সুমিত্রা মহাজন। সুরেশ প্রভু বললেন, যেমতি আমাদের দিওয়ালি হচ্ছে "লাইট অফ ফেস্টিভাল", তেমনি এই আর্ট অফ লিভিং ভারতীয় সংস্কৃতির ফেস্টিভালের লিস্টে একটা পাকাপাকি জায়গা করে নেবে এবার থেকে। স্পীকার মহোদয়া অত্যন্ত "আভারী" হয়ে রইলেন শ্রীশ্রী-র চরণে, তাই বেশি কথা বললেন না, কেবল বললেন, আপনারা অনুষ্ঠান দেখুন, উপভোগ করুন, আর যমুনাকে নির্মল স্বচ্ছ রাখুন, যাতে কেউ কোনও অভিযোগ না করতে পারে। হুঁ, যেন আমাদের দোষেই যমুনায় দূষণ হচ্ছে, ওঁয়াদের কোনও দোষ নেই।

সূয্যি গেল পাটে। সন্ধ্যে হল। এইবারে প্রদীপ জ্বালানো হবে। আমি সবিস্ময়ে হাঁ করে দেখলাম, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে প্রদীপ ধরালেন শ্রীশ্রী অরুণ জেটলি এবং শ্রীশ্রী অরবিন্দো কেজরিওয়াল। ... কোর্টে কেস করেছে একে অপরের নামে, তবু এই লেভেলের বনহোমি বোধ হয় একমাত্র দিল্লিতেই হয়। ঘোষিকা স্বয়ং উদ্বেলিত, সেই আবেগ তিনি ছড়িয়ে দিলেন উপস্থিত কয়েক লাখ ভক্ত-দর্শকের মধ্যে। আপনারা সবাই নিজের নিজের মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট অন করে হাত উঁচু করে দোলান। প্রদীপের আলো শুধু যেন স্টেজেই সীমাবদ্ধ না থাকে, সে আলো ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে, সবখানে।

আলোড়িত হল আমার আশেপাশের অগণিত ভক্তকূল। তার পরে দেখা গেল সেই অভূতপূর্ব দিশ্যো - লাখে লাখে মোবাইল শূন্যে দুলছে, গোধূলির ছায়া ঘনাইছে যমুনার চরে, সেখানে বিন্দু বিন্দু জোনাকির মত আলো ছড়াচ্ছে লাখ লাখ মোবাইল থেকে নিঃসৃত ফ্ল্যাশলাইটের আলো। কোথা থেকে কে জানে ক্যামেরা সেই ছবি তুলে দেখাচ্ছে চারপাশের জায়ান্ট এলইডি স্ক্রিনে।

অতঃপর আবার অনুষ্ঠান শুরু। জ্যায় গুড়ুডেভ - বলে একজন ইংরেজ শুরু করলেন তাঁর বক্তৃতা। তিনি সেখানকার হাউস অফ কমনসের সদস্য, রাণীমার শুভেচ্ছাবার্তা নিয়ে এসেছেন। পড়ে শোনালেন। আবার খানিক অনুষ্ঠান, দেড়শো শিল্পী আর পাঁচশো বাদকের স্ট্যাটিসটিক্স সমেত। আবার বক্তৃতা, কে আসে নি রে ভাই - পুরো বিজেপির মন্ত্রীসভাটা উঠে এসেছে, নেহাত নরেন মুদী সেদিন বিহার গেছিলেন, নইলে তিনিও হয় তো আসতেন। সবারই এক বক্তব্য, কিছু নিন্দুক মিডিয়া আর ইন্টেলেকচুয়াল মিথ্যে নিন্দে করছে শ্রীশ্রী-র এই মেগা ইভেন্টের। ওরা কারুর ভালো দেখতে পারে না। মাঝে একবার বেঙ্কাইয়াবাবু মাইক কেড়ে নিয়ে আপ্লুত স্বরে বললেন, শ্রীশ্রীর আর্ট অফ লিভিং-এর প্রোগ্রামের এই যে অনুশাসন, এই যে শৃঙ্খলা, এত বিরুদ্ধমতের মধ্যেও এই সুচারু সম্পাদনা - এ একমাত্র তুলনীয় আরএসএসের শৃঙ্খলা-অনুশাসন-ঐক্যের সাথে। আমরাও এই শৃঙ্খলা-অনুশাসন নিয়েই বড় হয়েছি, আমি চাই সারা ভারত এই আদর্শে বড় হোক।

উফফ, সে কী হর্ষধ্বনি রে ভাই, কানে তালা লেগে যাবে মনে হচ্ছিল। একেবারে রোরিং জনতা।
আটটার সময়ে অনেক কষ্টে মা-কে বোঝালাম - এবার ওঠা উচিত। কারণ আবার তিন কিলোমিটার হেঁটে ফিরতে হবে, আর তোমার পায়ে ব্যথা। উঠলাম সবাই। মঞ্চে তখনও পালা করে অনুষ্ঠান আর বক্তৃতা চলছে। অরূপের অনুষ্ঠানের কোনও নামগন্ধও নেই, কখন হবে, আদৌ হবে কিনা, তা-ও বোঝা যাচ্ছে না।

ফিরতে গিয়ে বুঝলাম, আমরা একাই উঠে আসার কথা ভাবি নি, ভেবেছে আমাদের সাথে আরও দশ পনেরো হাজার লোক। যে পন্টুন ব্রিজ দিয়ে এসেছিলাম, সেখানে প্যারামিলিটারি পাহারা দিচ্ছে, সেটি ওয়ান ওয়ে, আসা যায়, যাওয়া যায় না। যাবার জন্য পরের পরের ব্রিজ। একটু এগোতে গিয়ে আটকে গেলাম ভিড়ে, তুমুল ভিড়, এবং চাপাচাপি ভিড়। স্ট্যাম্পিড হয়ে যাবার আশংকা। কারণ? সামনে অনেকখানি মাটি জুড়ে জল, চওড়া পথটা হঠাৎ করে সরু হয়ে গেছে। বটলনেক। পাঁচজন একসাথে হাঁটা যাচ্ছে না এমন ভিড়, এর ওপরে বাবার আর মায়ের শারীরিক অবস্থাও অনুকূল নয়। মেয়েও ছোট - সে এই ভিড় কখনও দ্যাখে নি আগে। শক্ত করে একে অপরের হাত ধরে রইলাম।

আশ্চর্য ব্যাপার, এই সাঙ্ঘাতিক ক্যাওসের মধ্যেও কিন্তু লোকজনের মধ্যে বিরক্তি নেই। সবাই অপরূপ প্রশান্তিতে ভরপুর। গুরুদেব কা নাম লে কর চলতে রহো - পার হো জাওগে, জয় যম্‌না মাতা কী জয় - এই জাতীয় মন্তব্য উড়ে আসছে চারদিক থেকে। সবাই যে দিল্লির লোক তা-ও নয় - কেউ এসেছে হায়দ্রাবাদ থেকে, কেউ চেন্নাই থেকে তো কেউ নাসিক থেকে, কেউ কাশ্মীর থেকে। এবং সকলে এসেছে ভক্তির টানে। ভক্তি। অপরিসীম ভক্তি।

ঝাড়া এক ঘন্টার চেষ্টায় আমরা পুল পার হলাম, তার পরে আবার হাঁটা। রাস্তাও চিনতে পারছি না, কেবল লোকজনকে ফলো করছি। মা সমানে পিছিয়ে পড়ছে, হাঁটতে আর পারছে না, প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পারছি, কিন্তু এই চরে বসানোর মতও জায়গা নেই। অনেকখানি হেঁটে একটা চেয়ার দেখলাম, পাশে একজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞেস না করেই মা-কে সেখানে বসালাম খানিক। একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার হাঁটা শুরু।

হাঁটতে হাঁটতে, কতক্ষণ হেঁটেছি জানি না, এক সময়ে এসে পড়লাম একেবারে বড় রাস্তায়, দশ নম্বর গেটের মুখে। আমার গাড়ি রাখা ছিল বারো নম্বর গেটের ভেতরে। রাস্তার পেভমেন্টে বাবা-মা-বউ-মেয়েকে দাঁড় করিয়ে আমি দৌড়লাম এবারে। এখান থেকে বারো নম্বর গেট আরও এক কিলোমিটার। আর গেটের ভেতরে আরও এক কিলোমিটার দূরে পার্কিং। দু কিলোমিটার আরও প্রায় ছুটে প্রায় হেঁটে গাড়ি উদ্ধার করলাম, তার পরে নয়ডা মোড়ে গিয়ে ইউ টার্ন নিয়ে আবার দশ নম্বর গেটের দিকে ফিরে এসে সবাইকে উদ্ধার করে গাড়িতে বসিয়ে বাড়ি পৌঁছলাম পৌনে এগারোটার সময়ে - প্রসঙ্গত, আমার বাড়ি থেকে এই অনুষ্ঠানের জায়গার দূরত্ব ছিল সাত কিলোমিটার।

বাড়ি ফিরে জানলাম, শ্রীশ্রী কেজরিওয়াল বলেছেন, কোথায় লোকজনের অসুবিধে হয়েছে এখানে আসতে? এই তো আমি এলাম, বাকি মন্ত্রীরা এলেন, আমাদের তো আসতে কোনও অসুবিধে হয় নি!

898 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 12 -- 31
Avatar: Robu

Re: শ্রীশ্রী আর্ট অফ লিভিং

মুদিদের হ্যাটা করবেন কেন? আপনি তো ভাবছেন আপনি মোদিকে হ্যাটা করছেন। সমস্যাটা সেখানেই। ভেবে দেখুন।
বলাই বাহুল্য, এখানে "আপনি" প্লেসহোল্ডার।
Avatar: রৌহিন

Re: শ্রীশ্রী আর্ট অফ লিভিং

অসুবিধা কিসের? দিব্যি পদ্মবিভীষণ বাগিয়ে বসে আছেন।
Avatar: কী ঝাম

Re: শ্রীশ্রী আর্ট অফ লিভিং

হ্যাটা তো করি নি! মোদী তো আসলে বাংলার মুদীই। মানে শব্দের উৎপত্তি হিসেব করলে, মোদী বানিয়া সম্প্রদায়ের পদবি। বানিয়া বাংলায় হয় বেনে, মোদী বাংলায় হয় মুদী। নরেন্দ্র মোদীর নাম নিয়ে খিল্লি করা হয়েছে, মুদীদের তো সম্প্রদায়গতভাবে কোনও হ্যাটা করা হয় নি!

ময়রা মুদী
চক্ষু মুদি
পাটায় বসে
ঢুলছে কষে

- এখানে কি কোনও রকমের হ্যাটা প্রকাশ পাচ্ছে?
Avatar: Robu

Re: শ্রীশ্রী আর্ট অফ লিভিং

হ্যাটার্থে না বল্লে বা মজা করার জন্য না বল্লে আই টেক ব্যাক মাই ওয়ার্ড।
Avatar: sosen

Re: শ্রীশ্রী আর্ট অফ লিভিং

আধুনিক কুম্ভ বা সাগরমেলা। সিকি রাগে ক্যান?
Avatar: Tim

Re: শ্রীশ্রী আর্ট অফ লিভিং

লেখাটা ভালো হয়েছে।

সিকি সপরিবারে না গেলেই পারতিস। বয়স্ক মানুষদের বা বাচ্চাদের জন্য খুবই রিস্কি।
Avatar: kihobejene

Re: শ্রীশ্রী আর্ট অফ লিভিং

siki ma baba ke ki bhebe niye gelen bujte parchi na; ei scale er anusthane etai howar katha; cynical hoye jacchi - tobe ei shob bhire ma baba bacchacha bou der na niye jawai bhalo - gele chot belar bondhu kimba guru-r bondhuder niye jaben - bhalo bawal kore phire ashben :-)
Avatar: Tim

Re: শ্রীশ্রী আর্ট অফ লিভিং

না না বাওয়াল করতে গেলে উত্তাল ক্যাল খেয়ে ফিরবে। মহান ভারত এখন জাগ্রত, সাবধানে চলাফেরা করা উচিত।
Avatar: kihobejene

Re: শ্রীশ্রী আর্ট অফ লিভিং

na na bawal mane negative orthe boli ni; nijeder moddhe positive bawal :-) tobe Tim -er advice r jonno dhyonobad .. lok jon kaal dite sodajagroto aajkaal
Avatar: সিকি

Re: শ্রীশ্রী আর্ট অফ লিভিং

আমার নিজের যাবার তো কোনও দরকারই ছিল না! মা-ই তো কার্ড নিয়ে এল, অরূপের প্রোগ্রাম দেখবে বলে বাবা-মা-ই প্ল্যান বানিয়েছিল। আমি তো শুধু নিয়ে গেছিলাম।

তা সে অরূপের প্রোগ্রাম দেখতেও পায় নি। ওদের অনুষ্ঠান হয়েছে রাত নটার পর, যখন আমরা কাদা ভেঙে হেঁটে ফিরছিলাম। এচ্চেয়ে ঘরে বসে টিভিতে দেখলেই হত।
Avatar: pi

Re: শ্রীশ্রী আর্ট অফ লিভিং

ওখানে প্রোগ্রাম করা শিল্পীরা, বিশেষ করে বাচ্চারা কী সাঙ্ঘাতিক অবস্থায় ছিল, ইনহিউম্যানই বলা চলে, একেবারে জলে ভেজা ড্রেসে, জলে ভেজা কার্পেটে ঘণ্তার পর ঘণ্টা বসে থাকা, খাওয়াদাওয়ার অসুবিধে , আরো নানা কিছু পড়েছিলাম একটা রিপোর্টে। অনেক শিশুশিল্পী নাকি বেশ অসুস্থ হয়ে পড়ে।
এমনিতেও এই ধরণের গ্রুপ রিআর্সালে খুব চাপ পড়ে। কোলকাতারই এক নামি ইংরাজী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা শুনছিলাম। তাদের আনুয়াল ফাংশন হয় চার বছর পর পর, কিন্তু সে বিরাট স্কেলে, ইন্ডোর ভাড়া টাড়া করে, ছয় থেকে আট মাস রিহার্সাল হয়ে , সেও নাকি দিনে প্রায় ছয় সাত ঘণ্টা মাঠে দাঁড়িয়ে, রোদের মধ্যে ( উঁচু ক্লাসেরা ছাড় পায়)। আরো নানাবিধ চাপে। প্রচুর বাচ্চা নাকি খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ে। এক্সট্রিম কেসও শুনেছি। তবে প্রোগ্রাম হয় জবরদস্ত, দেখার মত। পার্ফেক্ট। এইধরণের প্রোগ্রাম বা এশিয়াড , অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মত। অবশ্য বলতে গিয়ে মনে পড়লো, আমাদের স্কুলের আনুয়াল ফাংশনেই বা কী কম হত ? কিছু কোরাস গানের জন্যেও পুরো গরমের ছুটি ধরে গরমের মধ্যে রোজ দুপুরে রিহার্সাল করতে যেতে হত, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে। দিদিমণি ছিলেন পার্ফেক্শনিস্ট। অত জনের মধ্যে কারুর সুর একটু এদিক থেকে ওদিক হওয়া চলতো না।
Avatar: সিকি

Re: শ্রীশ্রী আর্ট অফ লিভিং

অরূপদেরও ট্রিটমেন্ট সেই রকমই হয়েছিল। পরে ফোন করে শুনলাম।
Avatar: PM

Re: শ্রীশ্রী আর্ট অফ লিভিং

সিকি আর জনতা কি বেন্কাইয়ার বক্তিমে শুনতে গেছিলো? গেলো, এলো বেন্কাইয়া/জেটলির প্রবচন শুনলো----কিন্তুক "আর্ট অফ লিভিং" এর গল্পো কৈ? ঃ(

শ্রী শ্রী নিজে কি নেত্য করলেন ? নাকি যাওয়া আসার ব্যায়ামটাই "আর্ট অফ লিভিং" ??
Avatar: সিকি

Re: শ্রীশ্রী আর্ট অফ লিভিং

আমি তো আগে শ্রীশ্রী-কে ছবি ছাড়া কখনও চলতে ফিরতে দেখি নি। এই প্রথম দেখলাম এবং বুঝলাম "ওহ মাই গড" সিনেমায় মিঠুন চক্রবর্তীর রোলটা আসলে এই শ্রীশ্রী-কে দেখেই বানানো। হাত ঘোরানোর স্টাইল, কথা বলার ভঙ্গিমা মিঠুন পুরোপুরি এনাকে দেখেই নকল করেছেন।

অনুষ্ঠানটা ছিল ওয়ার্ল্ড কালচারাল ফেস্টিভাল। বিশ্ব সংস্কৃতি উৎসব। তিনদিনের অনুষ্ঠানের শেষদিনে আমরা গেছিলাম তাই এত রাজাগজার দর্শন পেয়েছিলাম, যদিও এলইডি স্ক্রিনের মাধ্যমে। অনুষ্ঠান তো ছিল, ঐ কতশো লোকের খোল বাদন (বাবা বলল জি বাংলার কোন রিয়েলিটি শো তে নাকি উনি খোল বাজিয়ে গেছেন, বাকি সব ওনারই ছাত্রছাত্রী), কতশো লোকের ব্যালে (বিদেশের কোনও দল), চাইনিজ নৃত্য (চীন থেকে সত্যি সত্যি লোক এসেছিল), আফ্রিকান হুলাহুলা নৃত্য (আফ্রিকার কোন দেশের লোকনাচ), সমবেত ইয়াওমিয়াওচিয়াও গান - সে-ও কত শত গায়ক আর কত হাজার বাদক সমেত, কোন দেশের কে জানে, ফিউশন গান, ফিউশন নাচ - এই সবও দেখলাম তো। এর ফাঁকে ফাঁকে বাণী আর ভাষণ চলছিল। কিংবা বাণী আর ভাষণের ফাঁকে ফাঁকে সংস্কৃতি উৎসব চলছিল। বিজেপি এই স্টেজটাকে খুব সুন্দরভাবে নিজেদের প্রোপাগান্ডা করার জন্য ব্যবহার করেছে। বাকি দুদিন কী করেছে জানি না, আমি খালি তৃতীয় দিনটাই দেখেছি।
Avatar: S

Re: শ্রীশ্রী আর্ট অফ লিভিং

ঐরকম কিলো কিলো মিটার হেঁটে বক্তিতা শুনতে গেছে লোকে? লোকেদের তো যবরদস্ত সমর্থনও আছে বলছেন। দেশপ্রেম বলে কতা।
Avatar: সিকি

Re: শ্রীশ্রী আর্ট অফ লিভিং

আরে ধুর, বক্তৃতা শুনতে গেছে নাকি লোকে? ওটা তো ফাউ! গেছে তো ভক্তির টানে, এখানে কিলো কিলো লোক এই আর্ট অফ লিভিং ফাউন্ডেশনের সদস্য। আমাদের সোসাইটিতেই মাঝে মাঝে ওদের ওয়ার্কশপের পোস্টার পড়ে। প্রচুর লোক সন্ধ্যের পরে ঘরে বসে কালেক্টিভলি চ্যান্টিং করে। মানে বন্ধু-সহেলি-প্রতিবেশি সব একসাথে বসে চ্যান্টিং করে। লিফটে আলোচনা শুনতে পাই, আজ আমি গীতার এত নম্বর অধ্যায়টা শোনাবো সবাইকে, মিস্টার মাথুর, আপনি কিন্তু পরশু তত নম্বর সর্গটা তৈরি করে রাখবেন, আপনার থেকে শুনব।
Avatar: b

Re: শ্রীশ্রী আর্ট অফ লিভিং

Avatar: শান্তনু

Re: শ্রীশ্রী আর্ট অফ লিভিং

ওই জেয় গুড়ুডেভ টা বড় সড় প্রাপ্তি ।
Avatar: ranjan roy

Re: শ্রীশ্রী আর্ট অফ লিভিং

নিঃ সন্দেহে।
Avatar: abcd

Re: শ্রীশ্রী আর্ট অফ লিভিং

দারুণ লেখা, সিকি দা।

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 12 -- 31


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন