Kallol Lahiri RSS feed

Kallol Lahiriএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • কাশ্মীরের ইতিহাস : পালাবদলের ৭৫ বছর
    কাশ্মীরের ইতিহাস : পালাবদলের ৭৫ বছর - সৌভিক ঘোষালভারতভুক্তির আগে কাশ্মীর১ব্রিটিশরা যখন ভারত ছেড়ে চলে যাবে এই ব্যাপারটা নিশ্চিত হয়ে গেল, তখন দুটো প্রধান সমস্যা এসে দাঁড়ালো আমাদের স্বাধীনতার সামনে। একটি অবশ্যই দেশ ভাগ সংক্রান্ত। বহু আলাপ-আলোচনা, ...
  • গাম্বিয়া - মিয়ানমারঃ শুরু হল যুগান্তকারী মামলার শুনানি
    নেদারল্যান্ডের হেগ শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস—আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে করা গাম্বিয়ার মামলার শুনানি শুরু হয়েছে আজকে। শান্তি প্রাসাদে শান্তি আসবে কিনা তার আইনই লড়াই শুরু আজকে থেকে। নেদারল্যান্ডের হেগ শহরের পিস ...
  • রাতপরী (গল্প)
    ‘কপাল মানুষের সঙ্গে সঙ্গে যায়। পালানোর কি আর উপায় আছে!’- এই সপ্তাহে শরীর ‘খারাপ’ থাকার কথা। কিন্তু, কিছু টাকার খুবই দরকার। সকালে পেট-না-হওয়ার ওষুধ গিলে, সন্ধেয় লিপস্টিক পাউডার ডলে প্রস্তুত থাকলে কী হবে, খদ্দের এলে তো! রাত প্রায় একটা। এই গলির কার্যত কোনো ...
  • রাতপরী (গল্প)
    ‘কপাল মানুষের সঙ্গে সঙ্গে যায়। পালানোর কি আর উপায় আছে!’- এই সপ্তাহে শরীর ‘খারাপ’ থাকার কথা। কিন্তু, কিছু টাকার খুবই দরকার। সকালে পেট-না-হওয়ার ওষুধ গিলে, সন্ধেয় লিপস্টিক পাউডার ডলে প্রস্তুত থাকলে কী হবে, খদ্দের এলে তো! রাত প্রায় একটা। এই গলির কার্যত কোনো ...
  • বিনম্র শ্রদ্ধা অজয় রায়
    একুশে পদকপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অজয় রায় (৮৪) আর নেই। সোমবার ( ৯ ডিসেম্বর) দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। অধ্যাপক অজয় দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা অসুখে ভুগছিলেন।২০১৫ ...
  • আমাদের চমৎকার বড়দা প্রসঙ্গে
    ইয়ে, স-অ-অ-অ-ব দেখছে। বড়দা সব দেখছে। বড়দা স্রেফ দেখেনি ওইখানে এক দিন রাম জন্মালেন, তার পর কারা বিদেশ থেকে এসে যেন ভেঙেটেঙে মসজিদ স্থাপন করল, কেন না বড়দা তখন ঘুমোচ্ছিলেন। ঘুম ভাঙল যখন, চোখ কচলেটচলে দেখলেন মস্ত ব্যাপার এ, বড়দা বললেন, ভেঙে ফেলো মসজিদ, জমি ...
  • ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ?
    যেকোন নারকীয় ধর্ষণের ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়ে সামনে আসার পর নাগরিক হিসাবে আমাদের একটা ঈমানি দায়িত্ব থাকে। দায়িত্বটা হল অভিযুক্ত ধর্ষকের কঠোরতম শাস্তির দাবি করা। কঠোরতম শাস্তি বলতে কারোর কাছে মৃত্যুদন্ড। কেউ একটু এগিয়ে ধর্ষকের পুরুষাঙ্গ কেটে নেওয়ার ...
  • তোমার পূজার ছলে
    বাঙালি মধ্যবিত্তের মার্জিত ও পরিশীলিত হাবভাব দেখতে বেশ লাগে। অপসংস্কৃতি নিয়ে বাঙালি চিরকাল ওয়াকিবহাল ছিল। আজও আছে। বেশ লাগে। কিন্তু, বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনার প্রবল ক্ষোভ ও অপমানে আপনার কি খুব পরিশীলিত, গঙ্গাজলে ধোওয়া আদ্যন্ত সাত্ত্বিক শব্দ মনে পড়ে? না ...
  • The Irishman
    দা আইরিশম্যান। সিনেমা প্রেমীদের জন্য মার্টিন স্করসিসের নতুন বিস্ময়। ট্যাক্সি ড্রাইভার, গুডফেলাস, ক্যাসিনো, গ্যাংস অব নিউইয়র্ক, দা অ্যাভিয়েটর, দ্য ডিপার্টেড, শাটার আইল্যান্ড, দ্য উল্ফ অব ওয়াল স্ট্রিট, সাইলেন্টের পরের জায়গা দা আইরিশম্যান। বর্তমান সময়ের ...
  • তোকে আমরা কী দিইনি?
    পূর্ণেন্দু পত্রী মশাই মার্জনা করবেন -********তোকে আমরা কী দিইনি নরেন?আগুন জ্বালিয়ে হোলি খেলবি বলে আমরা তোকে দিয়েছি এক ট্রেন ভর্তি করসেবক। দেদার মুসলমান মারবি বলে তুলে দিয়েছি পুরো গুজরাট। তোর রাজধর্ম পালন করতে ইচ্ছে করে বলে পাঠিয়ে দিয়েছি স্বয়ং আদবানীজীকে, ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

গোরা নকশাল

Kallol Lahiri

চার

“গাছেরা ঘুমিয়ে পড়লে কি ফুলেরাও ঘুমিয়ে পড়ে?”

খেলার মাঠে হরেক রকমের আচার নিয়ে আসে চুনু হজমিওয়ালা। তার নানারকম কাচের বয়ামের মধ্যে থাকে টক জলে চোবানো লাল কুল। মাটির ডেলার মতো লাল হজমি। তেঁতুলের আচার। বিলাতী আমড়া। কারেন্ট নুন। এগুলো প্রত্যেকটাই আমার কাছে খুব লোভনীয়। প্রত্যেকটি আমার বায়নার জিনিষ। এদের কোনো না কোনটা আমার রোজ বিকেলের সঙ্গী না হলেই মনটা খারাপ হয়ে যায়। ঠিক আজ যেমন হয়েছে। ঠাম্মার কাছে পয়সা চাইতে যাওয়ার সময়ের একটু গন্ডগোল হওয়াতেই বিপত্তিটা ঘটেছে। ঠিক এমনটা হতো না, যদি না ঘুমটা আমার ঠিক চারটের সময়েই ভাঙতো। “আজ তিরিশ মিনিট লেট”। ঘুম থেকে উঠতেই দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দাদা বলে দিয়েছিল। দাদা সময়ের কাঁটা ধরে চলে। সময়ে পড়তে বসে। সময়ে খায়। সময়ে স্কুলে যায়। সময়ে ঘুমোয়। এবং সময়ে ঘুম থেকে ওঠে। ওকে সময়ের মধ্যে বসিয়ে দিয়ছে বাবা। চিনিয়ে দিয়েছে সময়ের কাজ সময়ে শেষ করার রাস্তা। দাদা খুশি মনে সময়ের নক্সীকাঁথা গায়ে দিয়ে বাবার নির্দেশ পালন করে। কারণ দাদা জানে তাকে অনেক তাড়াতাড়ি বড় হতে হবে। অনেক তাড়াতাড়ি সংসারের হাল ধরতে হবে। অনেক তাড়াতাড়ি ঝেড়ে ফেলতে হবে উদ্বাস্তু তকমা!

ঠাম্মার ঘরের দিকে যেতে গিয়েই এক্কেবারে মায়ের সামনে পড়ে যাই। “রোজ রোজ পয়সা দিয়ে ওর বারোটা আর নাই বা বাজালেন!” মা ঝাঁঝিয়ে ওঠে ঠাকুমাকে। শীতের পড়ন্ত বিকেলের অন্ধকার ঘরের কোন থেকে... ছানি না কাটা চোখের কোঠর থেকে ভেসে আসে তীব্র মমতা। “থাক না বৌমা...মোটে তো দশ আনা!” মা হার স্বীকার করে না। “ওই দশ আনাই দশ দিনে একটা টাকা! আমার এক ব্যাগ কয়লার সাশ্রয়!...হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখছো কী? হয় বেরোও...না হলে হ্যারিকেন জেলে দিচ্ছি পড়তে বোসো।” অন্ধকারের কোণ থেকে ভাঙা গলায় একটি বারের জন্য যেন ঠাম্মা শেষ খড়কুটো ধরতে চায়... “আজ ওর দাদু বেঁচে থাকলে...কলাপোতার বাজারে...ভোলা ময়রার দোকানের চিট সন্দেশ এনে দিতো...”। ঝাঁঝিয়ে ওঠে মার গলা আরো। “রাখেন আপনার ওপারের কথা...শুনে শুনে কান পচে গেলো! যা যাবার তো গেছে। আমার ছেলে গুলো উচ্ছন্নে না গেলেই হলো!” কে যেন হাত ধরে আমাকে টানে।

সবে সন্ধ্যে নামবে নামবে করছে। দেখি দাদা গলায় জড়িয়েছে একটা মোটা মাফলার। গায়ে দিয়েছে ফুল সোয়েটার। একটুতেই ওর ঠান্ডা লাগে। নাকের নীচে ঠোঁটের ওপরে কালো রেখার জমাট গম্ভীরভাব থেকে দাদা বলে “চল মাঠে যাবি চল।” ঘরের গুমোট ভাবটা নিমেষে হাওয়া হয়ে যায়। পল্টুর লাট্টুর মতো আমি পাক খেতে খেতে দাদার আগে ছুটি। “হ্যাঁরে দাদা তুই কোনোদিন চিট সন্দেশ খেয়েছিস?” দাদা গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়ায়। না। খায়নি ও। “ঠাম্মা বলেছে...কলাপোতার ভোলা ময়রার দোকানে চিট সন্দেশ পাওয়া যায়।” আর কথা এগোয় না আমার। একটা লম্বা মিছিল আমাদের সামনে দিয়ে চলে যায়। “মালিকের কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও। ইনক্লাব...জিন্দাবাদ...ধর্মঘট চলছে চলবে...মালিক তুমি দালাল হতে পারো না...পারো না...ভাতের বদলে রক্ত চাইতে পারো না...পারো না...”। গমগম করতে থাকে রাস্তাটা। মানুষজন সব থমকে যায়। যে লোকগুলো সারা রাতের শ্রমের স্নিগ্ধ ক্লান্তিটুকু নিয়ে হাঁদার দোকানে চা খেত সেই মানুষগুলোই কেমন যেন পালটে গেছে। মায়ের মতন খিটখিটে হয়ে গেছে। বুড়ো দারোয়ানটা আমাকে দেখলে এখন আর হাসে না। তার গ্রামের গল্প করে না। পাশ দিয়ে বয়ে চলা ছোট্ট কমলা নদীর গান শোনায় না। সারাক্ষণ ওরা জড়ো হয়ে বসে থাকে। নিজেদের মধ্যে কি শলা-পরামর্শ করে। বুড়ো বিহারীর খুনীকে না পাওয়া পর্যন্ত ওদের যেন শান্তি নেই। কারখানার গেট না খোলা পর্যন্ত ওদের উনুনে ভাত রান্না হবে না। সবাই ছাতু খেয়ে থাকবে। আমি একদিন ছাতু খেয়ে দেখেছি। ভালো লাগেনি তেমন। গোল গোল দলা পাকিয়ে ওরা একটু একটু ছাতু খায়। মন ভালো ভালো থাকলে গুণগুণ করে গান গায়। এখন ওসবের পাট উঠে গেছে। সারাক্ষণ কারখানার সামনে একটা ভাঙা তক্তপোষে ওরা বসে থাকে। আর আশায় থাকে কবে মালিক এসে ওদের সাথে কথা বলবে। কবে ওরা ওদের ন্যায্য টাকা পাবে। কবে ওদের লিডারের খুনী ধরা পড়বে। কিন্তু তেমন কিছুই হয় না। দিন এগোতে থাকে।

চটকলের ধর্মঘট আজ কুড়ি দিনে পড়লো। এগুলো আমার জানার কথা নয়। ছোটদের সব কিছু জানতে দিতে নেই বলে বাড়ির বড়দের যে ফতোয়া জারী হয় তাতে তারা বুঝতে পারে না পরোক্ষভাবে এতে ছোটদের লাভ হয় বেশী। তারা লুকিয়ে হোক...ঘুমিয়ে থাকার ভান করেই হোক...কিম্বা অন্য কোনো উপায়ে শুনে নেয় সব কিছু। বুঝুক আর নাই বুঝুক নিষিদ্ধ যাবতীয় জিনিসের প্রতি তাদের তীব্র টান। যে টানের জন্য টুকনু অনেক ছোট থেকে জেনে যায় অনেক কিছু। তাকে তো জানতেই হবে। ছোট থেকেই সে ঠিক করে ফেলেছে একদিন এই সব নিষিদ্ধ জিনিস নিয়েই সে লিখবে “নিষিদ্ধ এক ইস্তেহার...”। যেখানে থাকবে শুধু তার লুকিয়ে লুকিয়ে গল্প শোনার কথা। আর না বলা দুষ্টুমির অঙ্ক গুলো। যদিও অঙ্কে সে প্রচন্ড কাঁচা। উলটো একে চন্দ্র লিখতে তাকে হিমসিম খেতে হয়। নামতা মুখোস্থ হতে চায় না। সেই সুযোগটার সদ ব্যবহার করতে চায় দাদা। “ভাই মিছিলে কটা লোক গোন তো। এই সামনে সারির টা গুনলেই হবে।” অতি চালাকের গলায় দড়ি দিয়ে আমিও গুনতে থাকি। তিরিশের পর খেই হারিয়ে যায়। দাদা আমার দিকে তাকিয়ে হাসে। আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার ফাস্ট হওয়া দাদা বলে ওঠে “পঁয়ষট্টি জন”।

বড় মিছিলটা সরে যেতেই মিছিলের প্রান্তে যে মানুষটাকে দেখতে পেলাম তাকে সেখানে তখনি দেখতে পাবো বলে আশা করিনি। আমার ছোট ছোট পা...আর ছোট্ট একটা মন ছুট্টে গেলো লোকটার কাছে। সেও হাত বাড়িয়ে ধরলো আমাকে! “জানো গোরা নকশাল...ঠাম্মা বলেছে কলাপোতার ভোলা ময়রার দোকানে চিট সন্দেশ ছিল...”। লোকটার কালো দাড়ির মধ্যে একটা হাসির তরঙ্গ ওঠে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছেলে। দাদার থেকে একটু বড়। একে তো আগে কোনোদিন দেখিনি! চশমার ভেতর থেকে বড় বড় গোল গোল চোখ করে বলে “ আপনাকে নাম ধরে ডাকছে কমরেড!” ওরা দুজনেই হেসে ওঠে! আমার রাগ হয় গোরা নকশালের ওপর। চলে যেতে গেলে আমার হাত ধরে টানে ছেলেটা। “এই বুঝি আপনার টুকনু...? চে’র ছবিকে যে বলেছিল আপনার ভাই?” গোরা নকশাল হাসে। আমার রাগ আরো বেড়ে যায়। ইশ...আমার কথা গুলো আবার এই একদম কোনোদিন না দেখা একটা ছেলেকে বলে দিয়েছে? আমি আর দাঁড়াতে চাই না। ছেলেটাও আমাকে ছাড়ে না। “এই যে কমরেড টুকনু...তুমি কী জানো আজ থেকে আমি তোমাদের বাড়িতে থাকবো?” ধাক্কাটা খেতাম না। কিন্তু সত্যি যখন দেখলাম ছেলেটা আমাদের সাথে বসেই রুটি আর পেঁয়াজকলি ভাজা খাচ্ছে। খেজুরের গুড় হ্যাংলার মতো চেটে চেটে খাচ্ছে তখন রাগটা বেমক্কা গিয়ে পড়লো গোরা নকশালের ওপর। আমার পেঁয়াজকলি। আমার খেজুড়ের গুড়ে আমি কাউকে ভাগ বসাতে দেবো না। সে তুমি যতোই সাম্যবাদের কথা বলো না কেনো। কেউ আমার দিকে তাকায় না। বলে না... “আহা টুকনুর পাতে একটুও পেঁয়াজকলি নেই...ওকে একটু দাও...”। সবাই ছেলেটার সাথে কথা বলে। “শুনেছি এবার উচ্চমাধ্যমিকে স্টার নিয়ে পাশ করেছো?” মা বেশি করে পেঁয়াজ কলি তুলে দেয় ছেলেটার থালায়। আমার কান্না পায়। কিন্তু কে তাকায় আমার দিকে। বাবা বলে “পাশ কী বলছো? সোনার টুকরো ছেলে সুশান্ত! প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়েছে। সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে পড়তে চায় ভবিষ্যতে।” ছেলেটা লজ্জা পায়। মাথা নীচু করে থাকে। কিন্তু খাওয়াতে লজ্জা নেই। একবার তো না বল। একবার তো পেঁয়াজকলির থালাটা আমার দিকে আসুক। ছিঃ ছিঃ...এই নাকি হীরের টুকরো ছেলে। যা দিয়ে যাচ্ছে খেয়ে যাচ্ছে। ওরে না তো একবার বল। সব শেষ হয়ে গেল। “গোরার কে হও তুমি?” ঠাকুমার প্রশ্নের জবাবে এই প্রথম মাথা তুলে তাকায় সুশান্ত। “বন্ধু বলতে পারেন...! আমাদের কমরেড গোরা...।”

“অতবড় লোকটা তোমার বন্ধু কী গো?” ঠাকুমা তল পায় না। ছেলেটা বলার আগেই বাবা বলে ওঠে “ওর বাবাকেও জেলে থাকতে হয়েছিল গোরার সাথে অনেকদিন মা...আর জেলেই ওর বাবা মারা যান।” হঠাৎই নিঃস্তব্ধতা নেমে আসে। ঠাম্মা অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে। “আহা রে...”। রাগের চোটেই হোক। দুঃখেই হোক। জেনেই হোক বা না নেজেই আমার হাত থেকে গ্লাস পড়ে যায়। ভিজে যায় পাশে বসা হাঁদার রুটি। জল গড়িয়ে আসন ভিজিয়ে দেয় ছেলেটার। মা মারতে উঠলে ছেলেটাই ঠেকায়। “ছোটদের মারবেন না। ওদের মারতে নেই।” মা থমকে যায়। এতো এক্কেবারে গোরা নকশালের মতো কথা বলে। আজ অবশ্য দেখেছি জুটমিলের সামনে বড় জমায়েতে কিসব বোঝাচ্ছিল ছেলেটা শ্রমিকদের। ওরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল ছিপছিপে চশমা পড়া বছর ঊনিশের ছেলেটার কথা।

লেপের তলায় শুয়ে মন খারাপ করা রাগ নিয়ে জানতে চাই... “দাদা...ছেলেটা কতদিন থাকবে রে?” দাদা আমার দিকে পাশ ফিরে শোয়। গায়ের ওপর লেপটা ঠিক করে দেয়। আমার চোখের ওপর পড়ে থাকা লম্বা চুলটা সরিয়ে দিয়ে বলে “চলে যাবে কালকে।” “গোরা নকশালের কাছে এসেছে আমাদের বাড়ি খাচ্ছে কেন?...থাকছে কেনো?” দাদা আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয় না। বিড়বিড় করে বলে “প্রেসিডেন্সি কলেজ কোথায় জানিস ভাই?” আমি মাথা নাড়াই “না”। “অনেক বড় কলেজ। অনেক বড় বারান্দা। সেই ব্রিটিশ আমলের। যারা খুব খুব ভালো পড়াশোনায়...তারা ওখানে পড়তে যায়।”
“তোকে কে বলেছে?”
“গোরা নকশাল। ...আরও বলেছে...আমি যদি সত্যি সত্যি খুব ভালো রেজাল্ট করতে পারি মাধ্যমিকে...উচ্চ মাধ্যমিকে...তাহলে আমি নাকি প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তে পারবো।”
দাদা পাশ ফিরে শোয়। আমি জানি এখন ও কলকাতার বড় কলেজের স্বপ্ন দেখবে। প্রেসিডেন্সি কলেজের লম্বা বারান্দার ওপর দিয়ে হাঁটছে। ক্লাস করছে। কাল ভোরে উঠে আবার অঙ্ক কষতে বসবে। নকশালকে দানা খাওয়াবে। স্নান করাবে। দাদা নকশালকে ভালোবাসে। কিন্তু দাদা জানে না আসলে নকশাল হল পায়রাদের টাইটেল। “যারা উড়তে পারে তারাই নকশাল”। হাঁদা আমাকে বলেছিল। সেইবার নকশাল প্রথম এসেছিল আমাদের বাসায়। হাঁদা হাতে করে দানা খাওয়াতো আর বলতো... “সময়ের সাক্ষী থাকবি তুই নকশাল...যেখানে পারবি উড়ে বেড়াবি...আমি তোর ডানার পালক কেটে দেবো না কোনোদিন”। হাঁদা কোনোদিন পালক কাটেনি নকশালের। নকশাল এখানে ওখানে উড়ে বেড়ায়। ক্ষিদে পেলে নেমে আসে উঠোনে। ঘুরে ঘুরে দানা খায়। বাড়ির সবাই ভালোবাসে নকশালকে। শুধু আমি ছাড়া। তক্কে তক্কে থাকি...কোনদিন এসে হুলোটা ওর ঘাড় মটকাবে। ঠিক হবে।

বাইরে এই এতো রাতে কারা যেন কথা বলছে। বাবা না? এখনো ঘুমোতে যায়নি বাবা? উত্তরের হাওয়ার মতোই আমার কানে কথা গুলো ভেসে আসতে থাকে।
“গোরা এগুলো কি ঠিক হচ্ছে? সুশান্ত ওই টুকুনি ছেলে... ফুলের মতো ওরা... বোঝেটাই বা কী? এখন ওদের পড়ার সময়...নিজের মতো সুশান্তর জীবনটাও তুই কি চাস জেলের পেছনে কাটুক? কিম্বা গুম হয়ে যাক? ...”
গোরা নকশাল উত্তর দেয় না। তার চোখ তখন রবিদার বাড়ির পাশে ফোটা সন্ধ্যামণি গাছটার দিকে। গাঢ় সবুজ রঙের পাতার পাশে থোকা থোকা লাল ফুটিয়ে রেখেছে গাছটা। হঠাৎ গোরা নকশাল বলে ওঠে...
“গাছেরা ঘুমিয়ে পড়লে কি ফুলেরাও ঘুমিয়ে পড়ে রবিদা?”

বাবা কোনো জবাব দিয়েছিল কিনা টুকনু জানে না। কারণ টুকনু তখন ঘুমের মধ্যে চলে গিয়েছে ঠাকুমার খুলনার কলাপোতার গ্রামে। ভোলা ময়রার দোকানটা খুঁজছে টুকনু। ওখানে নাকি ভালো চিট সন্দেশ পাওয়া যায়।


339 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: Kallol Lahiri

Re: গোরা নকশাল

Swopner mato lekha ekta,...ek nihshwase pore fellam...e lekha uponyas hoye uthte paare na ki? Jodi othe, opekkshaay thaakbo.
Avatar: Sakyajit Bhattacharya

Re: গোরা নকশাল

এই সিরিজটাকে ওপরে তুললাম এই আশায় আরো মানুষ পড়বেন। আমার নিজের অসামান্য লেগেছিল এটা। মায়াময় গদ্য। সকলে পড়লে খুব ভাল লাগবে
Avatar: ঈশান

Re: গোরা নকশাল

সবকটা পর্বের একই নাম দিলে তো গুলিয়ে যেতে পারে। এটা 'গোরা নকশাল (দুই)' করে দিলে হয়না? আমার প্রস্তাবে লেখক রাজি থাকলে করে দেব।
Avatar: pi

Re: গোরা নকশাল

আপনি আগে যেমনি আগের পর্বগুলোর তলায় অ্যাপেন্ড করে দি্চ্ছিলেন, সেরকমও করতে পারেন।
Avatar: রৌহিন

Re: গোরা নকশাল

এই লেখাটা সত্যি বড় মায়াবী। পড়তে পড়তে কেমন মন খারাপ লাগে
Avatar: aranya

Re: গোরা নকশাল

অপূর্ব
Avatar: Kallol Lahiri

Re: গোরা নকশাল

ধন্যবাদ সবাইকে। আসলে খুব একটা কমেন্ট করতে পারি না। ফেসবুক থেকে গুরুর একাউন্ট খোলা। সেই প্রথম থেকে লক্ষ্য করছি ফেসবুকের কেউ বন্ধু লেখায় তার সিদ্ধান্ত দিলে সেটা আমার একাউন্ট থেকে দেখাচ্ছে। নিজের আই ডি থেকে নিজেকে প্রশংসা বড় লজ্জায় পড়েছিলাম প্রথমে। ঈপ্সিতা ভুলটা ভাঙান। এটা নাকি অদৃশ্য 'বাগ' এর কান্ড। আপনারা যে আমার লেখা ধৈর্য্য নিয়ে পড়ছেন আমি আপ্লুত। এবং শাক্যজিৎ আমাকে আরো অনেক কিছু লেখার জন্য তাগাদা দিয়ে যাচ্ছে। তারই উৎসাহে গুরুতে আসা। ভালো থাকবেন সবাই।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন