সিকি RSS feed

অচল সিকির খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • জিয়াগঞ্জের ঘটনাঃ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষতা
    আসামে এনার্সি কেসে লাথ খেয়েছে। একমাত্র দালাল ছাড়া গরিষ্ঠ বাঙালী এনার্সি চাই না। এসব বুঝে, জিয়াগঞ্জ নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছিল। যাই হোক করে ঘটনাটি থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতেই হবে। মেরুকরনের রাজনীতিই এদের ভোট কৌশল। ঐক্যবদ্ধ বাঙালী জাতিকে হিন্দু মুসলমানে ভাগ করা ...
  • অরফ্যানগঞ্জ
    পায়ের নিচে মাটি তোলপাড় হচ্ছিল প্রফুল্লর— ভূমিকম্পর মত। পৃথিবীর অভ্যন্তরে যেন কেউ আছাড়ি পিছাড়ি খাচ্ছে— সেই প্রচণ্ড কাঁপুনিতে ফাটল ধরছে পথঘাট, দোকানবাজার, বহুতলে। পাতাল থেকে গোঙানির আওয়াজ আসছিল। ঝোড়ো বাতাস বইছিল রেলব্রিজের দিক থেকে। প্রফুল্ল দোকান থেকে ...
  • থিম পুজো
    অনেকদিন পরে পুরনো পাড়ায় গেছিলাম। মাঝে মাঝে যাই। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়, আড্ডা হয়। বন্ধুদের মা-বাবা-পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। ভাল লাগে। বেশ রিজুভিনেটিং। এবার অনেকদিন পরে গেলাম। এবার গিয়ে শুনলাম তপেস নাকি ব্যবসা করে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। একটু পরে তপেসও এল ...
  • কাঁসাইয়ের সুতি খেলা
    সেকালে কাঁসাই নদীতে 'সুতি' নামের একটা খেলা প্রচলিত ছিল। মাছ ধরার অভিনব এক পদ্ধতি, বহু কাল ধরে যা চলে আসছে। আমাদের পাড়ার একাধিক লোক সুতি খেলাতে অংশ নিত। এই মৎস্যশিকার সার্বজনীন, হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ে জনপ্রিয়। মনে আছে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় একদিন ...
  • শুভ বিজয়া
    আমার যে ঠাকুর-দেবতায় খুব একটা বিশ্বাস আছে, এমন নয়। শাশ্বত অবিনশ্বর আত্মাতেও নয়। এদিকে, আমার এই জীবন, এই বেঁচে থাকা, সবকিছু নিছকই জৈবরাসায়নিক ক্রিয়া, এমনটা সবসময় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না - জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-পরিণ...
  • আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার চাই...
    দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা বুয়েটে পড়ার সুযোগ পায়। দেশের সবচেয়ে ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহে বুয়েট। সেই প্রতিষ্ঠানের একজন ছাত্রকে শিবির সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলল কিছু বরাহ নন্দন! কাওকে পিটিয়ে মেরে ফেলা কি খুব সহজ কাজ? কতটুকু জোরে মারতে হয়? একজন মানুষ পারে ...
  • ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৭
    চন্দ্রপুলিধনঞ্জয় বাজার থেকে এনেছে গোটা দশেক নারকেল। কিলোটাক খোয়া ক্ষীর। চিনি। ছোট এলাচ আনতে ভুলে গেছে। যত বয়েস বাড়ছে ধনঞ্জয়ের ভুল হচ্ছে ততো। এই নিয়ে সকালে ইন্দুবালার সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে। ছোট খাটো ঝগড়াও। পুজো এলেই ইন্দুবালার মন ভালো থাকে না। কেমন যেন ...
  • গুমনামিজোচ্চরফেরেব্বাজ
    #গুমনামিজোচ্চরফেরেব্...
  • হাসিমারার হাটে
    অনেকদিন আগে একবার দিন সাতেকের জন্যে ভূটান বেড়াতে যাব ঠিক করেছিলাম। কলেজ থেকে বেরিয়ে তদ্দিনে বছরখানেক চাকরি করা হয়ে গেছে। পুজোর সপ্তমীর দিন আমি, অভিজিৎ আর শুভায়ু দার্জিলিং মেল ধরলাম। শিলিগুড়ি অব্দি ট্রেন, সেখান থেকে বাসে ফুন্টসলিং। ফুন্টসলিঙে এক রাত্তির ...
  • দ্বিষো জহি
    বোধন হয়ে গেছে গতকাল। আজ ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ, সন্ধ্যাবেলায় আমন্ত্রণ ও অধিবাস। তবে আমবাঙালির মতো, আমারও এসব স্পেশিয়ালাইজড শিডিউল নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই তেমন - ছেলেবেলা থেকে আমি বুঝি দুগ্গা এসে গেছে, খুব আনন্দ হবে - এটুকুই।তা এখানে সেই আকাশ আজ। গভীর নীল - ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

স্লোগান দিতে গিয়ে - দিল্লির গল্প

সিকি

হ্যাঁ, মিছিল হাঁটার গপ্পো। আমি তো চিরদিনই রাজনীতি থেকে দূরে থাকা পাবলিক, মিছিলে কখনও হাঁটি নি, স্লোগানও দিই নি, তাই কে ভাই কে দুশমন - জানাটাও হয়ে ওঠে নি সময়মতো। যদিও সমসাময়িক রাজনীতির খবরাখবর ঠিকই রাখি-টাখি, এবং নিজের মত করে তার একটা ইন্টারপ্রিটেশনও করে থাকি।

তো, সেই ইন্টারপ্রিটেশন আমাকে জোর করে ঠেলে দিল কালকের মিছিলে, জেএনইউ সলিডারিটি মার্চ।

কবিতা কৃষ্ণণ জানিয়েছিলেন দুপুর দুটোয় জমায়েত, আর আড়াইটেয় মিছিল শুরু হবে। আমি সেইমত সাড়ে বারোটার সময় বেরিয়ে পড়লাম বাড়ি থেকে। যে হেতু মিছিল চলবে মান্ডি হাউস থেকে জন্তর মন্তর অবধি, তাই গাড়ি বা বাইক নিয়ে যাওয়ার উপায় নেই, মেট্রোতেই যেতে হবে। মান্ডি হাউস মেট্রো পৌঁছতে সময় লাগে পনেরো থেকে কুড়ি মিনিট। সোয়া একটার সময় পৌঁছেও গেলাম। কিন্তু কোথায় যাবো? মান্ডি হাউস মানে তো ইয়াআ বিশাল একটা গোল চক্কর, তার ছ'দিকে ছখানা রাস্তা গেছে। তা, বাউ-এর ফোন পেয়ে জায়গাটা স্পট করতে দেরি হল না, গোল চক্কর থেকে ঠিক যে পয়েন্টে বারাখাম্বা রোড শুরু হয়েছে - কনট প্লেসের দিকে যাবার রাস্তা, সেইখানেই একটা টেম্পোর ওপর দাঁড়িয়ে একজন বয়স্কা মহিলা ভাষণ দিচ্ছেন, সামনে কিছু লোক, প্রায় সবার হাতেই প্ল্যাকার্ড ফেস্টুন ব্যানার, আমি তো বাম রাজনীতির খুব বেশি খুচরো দল সম্বন্ধে অবহিত নই, নামগুলো তাই মনে নেই - আমার জ্ঞান পশ্চিমবঙ্গের বাম জগতে চলা নামগুলোর মধ্যেই সীমিত, তা তার মধ্যে একটা চেনা নাম পেলাম কিছু পোস্টারে - সিটু।

প্রথমে খ্যাক করে হাসি পেয়ে গেল, কারণ "সিটু" নামটার সঙ্গে আমাদের অনেক অম্লমধুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তবে এখন হাসির সময় নয়। পরিস্থিতি সিরিয়াস। ভাষণ চলছে, মাঝে মাঝে স্লোগানও চলছে, কানহাইয়া কো আজাদ করো, সিডিশন চার্জেস ওয়াপস লো, কানহাইয়া হাম তুমহারে সাথ হ্যায়।

লোকের থেকে পুলিশ বেশি, সব্বাই মোটা মোটা ভেস্ট পরা, হাতে বন্দুক, কারুর হাতে লাঠি, মাথায় অনেকেরই হেলমেট। কিছু ডিপি - মানে দিল্লি পুলিশ, বাকি সিআরপি। আমি টেম্পোর সামনের দিকে চলে এলাম বাউয়ের সাথে। ভিড়ের ওপর দিয়ে ঘাড় উঁচিয়ে দেখলাম, পেছনে আরও, আরও পুলিশ, আর দুটো জলকামানের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।

কত লোক হয়েছে? চলিশ জন, পঞ্চাশ জন? বারাখাম্বা রোডের এই দিকে গাড়ির যাতায়াত বন্ধ করে দিয়েছে, অন্য দিক দিয়ে গাড়ি চলছে। পঞ্চাশজনই কি? না না, বোধ হয় শতখানেক হবে - খানিক বাদে বুঝলাম, আমি অনেকের আগে এসে পৌঁছেছি, লোক আসছে, এবং আসছে হুড়মুড় করে। একশো দুশো পাঁচশো, নিমেষের মধ্যে মান্ডি হাউস গোলচক্কর প্রায় অবরুদ্ধ। বারাখাম্বা রোডের অবস্থা শোচনীয়। পতাকার ভ্যারিয়েশন বেড়েছে, ডিআইএসএফ, ডিওয়াইএফআই, আইসা, - লোক বেড়েছে। টেম্পোর ওপর থেকে ভাষণ তখনও চলছে, বোমাবর্ষণ হচ্ছে মোদী, রাজনাথ, স্মৃতি ইরানীকে উদ্দেশ্য করে, বাস্‌সিও ছাড় পাচ্ছেন না। আজ জেএনইউতে বারোটা থেকে গঙ্গা ধাবার সামনে সলিডারিটি প্রোগ্রাম ছিল, সে সব সেরে ছাত্রশিক্ষকরা এসে পৌঁছবেন মান্ডি হাউসে, তার পরে মিছিল এগোবে।

ততক্ষণে লোক এত বেড়ে গেছে, পুলিশ আর প্রায় চোখে দেখা যাচ্ছে না। বারাখাম্বা রোডের অবস্থা করুণ। পুলিশ আছে, এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। ... যাঁরা দিল্লি চেনেন না, তাঁদের জন্য এলাকার একটা ম্যাপ দিয়ে দিই, বুঝতে সুবিধে হবে।


http://s20.postimg.org/p80f19tzx/Map.jpg

ডানদিকে মান্ডি হাউসের গোলচক্করে জমায়েতের শুরু। আর মেরুন লাইন ধরে মিছিলের পথ।

খানিক বাদে দেখি লোকে লোকারণ্য। শুনলাম জেএনইউ থেকে ইতিমধ্যেই চার পাঁচ বাস ভর্তি ছাত্র শিক্ষক এসে গেছেন, চারপাশে বিভিন্ন বয়েসের লোকজনে ভর্তি, আঠেরো থেকে আটষট্টি, আর কে নেই? প্রাক্তনী, নন-প্রাক্তনী, নন-জেএনইউ তারাও আসছে দলে দলে। আমি তাদেরই একজন। এখন আর একটা ভাষণের জায়গা নেই, একটা স্লোগানের উৎস নেই। জায়গায় জায়গায় আলাদা আলাদা করে স্লোগান চলছে। বিভিন্ন রকমের প্ল্যাকার্ড। স্লোগান এখানে চলে হাততালির সাথে, আর নয় তো কেউ একজন একটা ছোট ড্রাম নিয়ে আসে, সেই ড্রামের তালে তালে স্লোগান হয়। সলিডারিটি কী জিনিস হয়, কাল দেখলাম। থিকথিক করছে ভিড়, বাসগুলোকে ডাইভার্ট করিয়ে দেওয়া হচ্ছে অন্য রাস্তায়, ছোট গাড়ি শুধু কনট প্লেসের দিক থেকে আসতে পারছে, কনট প্লেসে যাবার রাস্তা বন্ধ। আর চারদিক লাল পতাকায় ভর্তি। আমি আর বাউ বলাবলি করছিলাম, দিল্লিতে লাল পতাকার মিছিল খুব বেশি হলে আমরা দেখেছি নয়ডার এনইপিজেড-এ, একটা লাল পতাকা, নটা কি দশটা লোক, রাস্তার এক কোণ দিয়ে চলেছে ভঙ্গ্‌ করো মাঙ্গ্‌ করো বলতে বলতে। এই লেভেলের বাম সমাবেশ, দিল্লির একেবারে কেন্দ্রে, আর গোটা ভিড়টা একসাথে গজরাচ্ছে, গর্জাচ্ছে, আছড়ে পড়ছে - তাকে ঘিরে আছে একগুচ্ছ লাল পতাকা, বাম ব্যানার - এ জিনিস বোধ হয় দিল্লি কখনও দ্যাখে নি। বাউ বলছিল নব্বইয়ের দশকে তার জেল যাবার গল্প, তখন ছিল অটলবিহারী বাজপেয়ীর ক্যাবিনেট। সেবারেও ক্যাম্পাসের মধ্যে ঢোকানো হয়েছিল পুলিশ, তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ছাত্রদের। কিন্তু এইবারে নরেন্দ্র মোদী সরকার যা করেছে, তার তুলনা নেই। শুধু তো জেএনইউ নয়, প্রতিবাদ প্রতিরোধ রাগ এক হয়ে গেছে হায়দ্রাবাদ টেকনিকাল ইউনিভার্সিটির ঘটনায়, পুণে এফটিআিআই-এর ঘটনায়, আইআইটি ম্যাড্রাসের ঘটনায়। একের পর এক চাড্ডিবাজির প্রকোপে সারা ভারত এখন দিশেহারা।

মিছিল তখনও এগোয় নি। ফোন জ্যাম, নেটওয়ার্ক কাজ করছে না। তারই মধ্যে কে খবর আনল, জেএনইউ-তে এখনও চার হাজার জন অপেক্ষা করছে, বাসে তারা জায়গা পায় নি। আরও বাস বুক করে তাদের নিয়ে আসা হবে, তারা আসবে, তবে মিছিল শুরু হবে। ... ভিড়ের মধ্যে ইতিউতি দেখছি কিছু বিচ্ছিন প্ল্যাকার্ড, এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটি ইন সলিডারিটি, জামিয়া মিলিয়া ইন সলিডারিটি, অন্ধ্র ইউনিভার্সিটি - আর সেই ভিড়ের ঠিক মাঝখানে আমি। চারদিকে যতদূর চোখ যায়, শুধু লোক, লোক, লোক।

অনেকের সাথে বাউ আলাপ করিয়ে দিল, আমি তাঁদের নাম মনে রাখতে পারি নি। কেউ জেএনইউ-তে পড়ান, কেউ অন্য কোথাও প্রফেসর, কেউ সাংবাদিক, কেউ বা অন্য কোনও কাজে যুক্ত। সবাই সময় নিয়ে এসেছেন আজকের মিছিলে যুক্ত হতে।

হঠাৎ একজন বয়স্ক লোক কোথা থেকে একটা বিশাল জাতীয় পতাকা নিয়ে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়লেন, "ভারত মাতা কী ..." বলে। কিন্তু কেউ স্বভাবসিদ্ধ "জয়" বলল না। বৃদ্ধ তাতে না দমে "কোই বাত নেহি" বলে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে গেলেন।

একটু পরে হঠাৎ দেখি এনএসইউআই একগাদা লালনীল পতাকা নিয়ে হাজির। তারাও কানহাইয়ার মুক্তির দাবি জানাচ্ছে। তার মধ্যে হঠাৎ দশবারোজন লোক চলে এল কোথা থেকে, সবার বুকে পিঠে ফ্লেক্স আটকানো, তাতে হিন্দিতে কিছু লেখা - আর নিচে গেরুয়া পদ্মফুলের ছবি। লেখাটা পড়বার আগেই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় বাউ আর আমি পরস্পরকে বললাম, সরে এসো। ঝামেলা বাধানোর চেষ্টা করতে পারে এরা।

সরে আসতে গিয়ে চোখ আটকে গেল, সবার সামনে যে লোকটা এই রকমের ফ্লেক্স আটকে, তার সাথে হাসি মুখে হাত মেলাচ্ছেন যোগেন্দ্র যাদব। মিডিয়ার ক্যামেরাগুলো চলে আসছে এইদিকে।

তার পরে পড়লাম ফ্লেক্সের হিন্দি। কানহাইয়া বধ করেগা কংস্‌ কো। "কংস্‌ কো" লেখাটা ঠিক পদ্মফুলের ওপরে ছাপানো। এইবারে বুঝলাম কেসটা কি। পলিটিকাল খিল্লি। এরা সম্ভবত যোগেন্দ্র যাদবের গ্রুপের লোক।

রবিশ কুমারও এসেছেন। ইতিউতি লোকের প্রতিক্রিয়া নিচ্ছেন, পেছন পেছন ঘুরছে টিভি ক্যামেরা।

জেএনইউ থেকে আরও বাস এসে গেছে, প্রায় সবাই এখন হাজির মান্ডি হাউস বারাখাম্বা রোডের চত্বরে। মিছিলের মধ্যে জনাদুই ছাত্র সবাইকে বিলি করে চলেছে গোলাপফুল। মুহূর্তের মধ্যে মিছিলের মধ্যে ছেয়ে গেল লাল টকটকে গোলাপফুল। বলা হল, যারা আমাদের বিরোধিতা করবে, আমরা তাদের ফুল দেব।

পরে শুনলাম, ঘটনা কভার করতে আসা জি নিউজের সাংবাদিককে হাতে গোলাপফুল তুলে দিয়েছেন জেএনইউএসইউ ভাইস প্রেসিডেন্ট শেহলা রশিদ। বলেছেন, ঘৃণা নয়, ভালোবাসা প্রচার করো। কাঁচুমাচু মুখে জি নিউজের সাংবাদিক সেটা গ্রহণও করেছেন।

মিছিল এইবারে এগোতে শুরু করল। বাউয়ের সাথে আমি সামনের দিকে চলে গেলাম, প্রকাণ্ড বড় ব্যানার নিয়ে স্লোগান দিচ্ছে শেহলা রশিদ, পাশে কবিতা কৃষ্ণণ। দুজনকেই প্রথম সামনাসামনি দেখলাম। শেহলার বক্তৃতা দুদিন আগেই ইউটিউবে দেখেছি। মুগ্ধ হয়েছি। অসামান্য ওরেটর মেয়েটি।


টলস্টয় মার্গে পড়লাম। এই রাস্তা চলে গেছে জন্তর মন্তর অবধি। এক কিলোমিটার দূরে। মিছিল তখন ভাইব্র্যান্ট। একটু দূরে দূরে আলাদা স্লোগান, ড্রাম। হাততালি। টলস্টয় মার্গেরও জন্তর মন্তর-মুখী রাস্তা মিছিলের জন্য বন্ধ, কেবল উল্টোদিকের ট্রাফিক আসছে। আমি প্রাণভরে দেখছিলাম উল্টোদিকের পথচলতি মানুষগুলোর মুখ, দোকান থেকে লোকজন বেরিয়ে এসে - কেমন থতমত ভঙ্গী। রাস্তাজোড়া মিছিল সচরাচর দ্যাখে না দিল্লি, ধর্মীয় প্রসেশন ছাড়া। সেইখানে এই রকম একটা মিছিল, হাতে গোলাপফুল, মুখে মোদী, অমিত শাহ, রাজনাথ, ইরানি, বাস্‌সির নামে ছিছিক্কার, আর কানহাইয়াকে মুক্ত করার দাবি, রোহিতের হত্যাকারীদের শাস্তির দাবি, আর শয়ে শয়ে লাল পতাকা, বাম দলগুলোর এককাট্টামিছিল - দিল্লি জাস্ট হতভম্ব। এই লেভেলের গর্জন - জাস্ট আনপ্রিসিডেন্টেড।

জন্তর মন্তরের সামনে যখন এসে পড়লাম, ঘড়িতে তখন প্রায় পাঁচটা। থিকথিক করছে পুলিশ। পারমিশন মিলল না সেখানে বসার। সামান্য কথাবার্তা হল কবিতা, শেহলার সঙ্গে পুলিশের। মিছিল আবার এগিয়ে চলল, এবারের গন্তব্য সংসদ মার্গ।

প্যাটেল চকের একটু আগে, পার্লামেন্ট স্ট্রীট পুলিশ স্টেশনের ঠিক সামনেটায় এসে থামল মিছিল। আর আগে যাবার হুকুম নেই। সামনে ব্যারিকেড, পুলিশের কর্ডন, জলকামান। প্যাটেল চকের এই দিকের অংশটাতে সংসদ মার্গ পুরোপুরি মিছিলের দখলে।

শেহলা শুরু করলেন বক্তৃতা। আগেও মুগ্ধ হয়েছিলাম, কাল আবারও মুগ্ধ হলাম। বড় ভালো বলেন মেয়েটি। অনাবিল অনাড়ষ্ট স্পিচ। ঠিক যে যে কথাগুলো আমরা এতদিন ধরে বলে আসছি, সেই কথাগুলো সুন্দরভাবে বলে গেলেন শেহলা। তার পরে বলতে এলেন সুচেতনা দে, জেএনইউ প্রাক্তনী, প্রাক্তন স্টুডেন্ট ইউনিয়ন প্রেসিডেন্ট। দারুণ বললেন ইনিও। এর পরে বললেন শিক্ষকদের সংগঠনের এক মুখ - নাম আর মনে নেই, একের পর এক লোক উঠছেন, বলছেন, আর সমবেত জনতা গর্জন করছে, শেম, শেম, শেম। কখনও হাততালিতে অভিনন্দন জানাচ্ছে বক্তাকে।

সারাদিনে ফোন লাগেনি কারুর, এইবারে ফোন করে পেয়ে গেলাম পরাগকে, দেখা হল জিগীষার সঙ্গে। খানিক আড্ডা হল।

বাউ চলে গেছে একটু আগেই। আমাকেও ফিরতে হবে, তাই সাতটার একটু আগে হাঁটা লাগালাম ফিরতি। সংসদ মার্গ জুড়ে তখনও ছেলেমেয়েদের ভিড়। দলীয় পতাকার পাশে তখন উড়ছে জাতীয় পতাকাও। সেদিকে তাকিয়ে মনে হল, আমি কেন এলাম এখানে? আমি তো জেএনইউয়ের কেউ নই। এই সব রাজনৈতিক দলের পতাকার থেকে আমি সচেতনে দূরত্ব রেখে চলেছি। আজ কেন তবে এই পতাকার কাছে এলাম? কেন এসবের মাঝে এতগুলো জাতীয় পতাকা উড়তে দেখে আমার ভালো লাগছে?

দেশটাকে ভালোবাসি বলেই বোধ হয়। যতগুলো দলীয় পতাকা কাল দেখলাম, তারাও সচরাচর একে অপরের কাছে আসে না। আইডিওলজিতে বিশাল তফাত। কানহাইয়া কাল সবাইকে মিশিয়ে এক করে দিয়েছে। নরেন্দ্র মোদী সব্বাইকে মিশিয়ে এক করে দিয়েছেন। রাজস্থান, অন্ধ্র, মহারাষ্ট্র, দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ মিলেমিশে এক হয়ে গেল সংসদ ভবন থেকে ঠিক আটশো মিটার দূরে।

এই হচ্ছে দেশ। এই হচ্ছে আমাদের স্পিরিট। শালা, কতজনকে দেশদ্রোহী বলবি তোরা? একবার সামনে এসে বল্‌।
মিছিলের ছবি - https://photos.google.com/share/AF1QipNcL5TSuzz4xwmlcsVtkIj6OH_NHB__Ji
WCCZG5sJ8QJ5f8_29Psbwx7yAd_oCyEQ?key=eHNyYXlFNHoxQzZ6OVFraFNnSGhWZnNKa
GFBWVhR


ভিডিও কিছু আপলোড হয়েছে। আরও আপলোড হচ্ছে।


https://www.youtube.com/watch?v=ZHPTcmZGcDk


https://www.youtube.com/watch?v=cImN2P5tjxw


https://www.youtube.com/watch?v=I0TTo5QFmjc


https://www.youtube.com/watch?v=YVR8_5DXvDc
ভিডিও সমস্ত আপলোড হয়ে গেছে। এই চ্যানেলে আছে।

https://www.youtube.com/playlist?list=PLjXupvQaEt6BQNrY3YfsjQvejQ8PM4O
UR


911 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 11 -- 30
Avatar: Subrata Sarkar

Re: স্লোগান দিতে গিয়ে - দিল্লির গল্প

দারুণ লেখা । অনেক দূর থেকেও একাত্মতা অনুভব করায় ।

Avatar: কল্লোল

Re: স্লোগান দিতে গিয়ে - দিল্লির গল্প

প্রথমবার মিছিলে হাঁটার জন্য অভিনন্দন আর সাব্বাশী। গর্ব হচ্ছে তোর জন্য।
Avatar: Born Free

Re: স্লোগান দিতে গিয়ে - দিল্লির গল্প

এও এক প্রাইড মার্চ ,
ভালো লাগলো
Avatar: T

Re: স্লোগান দিতে গিয়ে - দিল্লির গল্প

খুব ভালো লাগল। কিন্তু খারাপ সময় ঘনিয়ে আসছে। চাড্ডি গণ এত সহজে ছেড়ে দেবে না।
Avatar: lcm

Re: স্লোগান দিতে গিয়ে - দিল্লির গল্প

খাসা। জীবন্ত।
Avatar: Arin Basu

Re: স্লোগান দিতে গিয়ে - দিল্লির গল্প

দারুণ সুন্দর বর্ণনা। মনে হল সিকি, আপনার সঙ্গে মিছিলে পথ হেঁটে এলাম।
Avatar: এটা থাক এখানে

Re: স্লোগান দিতে গিয়ে - দিল্লির গল্প

Avatar: Div0

Re: স্লোগান দিতে গিয়ে - দিল্লির গল্প

থ্যাঙ্ক্যু সিকি। তোর লেখার মধ্যে দিয়ে আরও একজোড়া পা হাঁটল। মাই কান্ট্রীমেন।
Avatar: abvp

Re: স্লোগান দিতে গিয়ে - দিল্লির গল্প

আরে দাঁড়ান। আগে আমাদের মিছিলটা নামুক। তারপর পোল খুলবো।
Avatar: Div0

Re: স্লোগান দিতে গিয়ে - দিল্লির গল্প

Yeah, right!
Avatar: শিবাংশু

Re: স্লোগান দিতে গিয়ে - দিল্লির গল্প

বাহ....। সিকি এতোদিন পতাকা থেকে দূরে থেকেছে। এই জামাতটা ওকেও পতাকা চেনালো। হয়তো আরো অনেককেই.... এটাই আসল সাফল্য।
Avatar: sch

Re: স্লোগান দিতে গিয়ে - দিল্লির গল্প

সালুট সিকিকে -ব্যক্তিগত ব্যস্ততার মধ্যে থেকেও সময় বের করে এই হাঁটাটার জন্য । অনেক শ্রদ্ধা বেড়ে গেল
Avatar: pi

Re: স্লোগান দিতে গিয়ে - দিল্লির গল্প

আরো হাঁটো এমনি মিছিলে। হয়তো এমনিভাবেই আরো অনেকে হাঁটবেন, যাঁরা আগে দূরে ছিলেন। এটা পড়েও হয়তো অনেকে পা মেলাতে চাইবেন..
Avatar: সিকি

Re: স্লোগান দিতে গিয়ে - দিল্লির গল্প

একটি ছবি পেলাম। যখন গোলাপফুল দেওয়া হচ্ছে।


http://s20.postimg.org/52bmad0d9/12671656_10156618029040523_6402856101
395966404_o.jpg


রবিশের থুতনির নিচে বাউ। পেছনে অমার দাঁত দেখা যাচ্ছে :)
Avatar: Robu

Re: স্লোগান দিতে গিয়ে - দিল্লির গল্প

হ্যাটস অফ সিকি।
Avatar: পাল্টা

Re: স্লোগান দিতে গিয়ে - দিল্লির গল্প

http://www.ndtv.com/india-news/thousands-march-for-unity-in-delhi-agai
nst-anti-national-activities-at-jnu-1279715?pfrom=home-lateststories

এটাও থাক - ওদিকের ভয়েস টাও আসুক :-) পুলিশ বলছে আজকের মিছিলে জনসংখ্যা টা অনেক বেশি ।

আর নাক কান মূলে কান্হাইয়ার মুচলেকা দেখেন নি ?
In court, Mr Kumar said: "On the 9th February 2016, there was an unfortunate incident which occurred at my prestigious university and I condemn it. After watching videos obtained from different sources, I have found out that in JNU, some JNU people and some others were raising anti-national slogans. I do not support those anti-national slogans and I would like to appeal to you that in matters like these, the country, our society and universities should not disturb the peace."
"I believe in the unity and integrity of India and I do not support any unconstitutional or anti-national activities,"
আরো দেখুন যে প্রতি টা রাজনৈতিক দল গা বাঁচাচ্ছে - নিয়ম করে বলছে " কাশ্মীর ইস এন ইন্টেগ্রাল পার্ট অফ ইন্ডিয়া " ,"উই ডোন্ট সাপোর্ট আন্টি ন্যাশনাল স্টেটমেন্ট " । ওদের তো নির্বাচনী লড়াই তে টিকে থাকতে হবে। কাশ্মীরে আর কত সিট্ ,এখানেই ভারতীয় গণতন্ত্রের জিত । বাবাসাহেব অনেক বিবেচনা করেই "কলোনিয়াল" সিডেসন রুল টা রেখেছিল সেই প্রথম সংবিধানের প্রবর্তন থেকেই ।আপনারা কি বললেন কিস্যু যায় আসে না ।চু চু আঙ্গুল চুসুন ।
মোদী সরকারের বিরুদ্ধে একশ বার বলুন অনেক ইস্যু আছে , কিন্তু যেই সেটা হবে ভারতের বিরুদ্ধে আমরা কিন্তু সাথ দেব ভারত সরকার কেই - মানে মোদী সরকার কেও ।আমরা সেজন্যে "চাড্ডি" হলে আপনারা "মাওবাদী" :-) "ভারত কে বরবাদী তক জং চলেগী" আর "ভারত কে হাজার টুকরে হোঙ্গে" বলা হবে আর আমরা চুপচাপ দেখব না। আমাদের সংখ্যা টা অনেক বেশি।
আজ যে কাশ্মীরে জঙ্গি হামলা হয়েছে সেটা তো এই seditious স্পিচ এর পরেই হলো - ব্যাকগ্রাউন্ড -এ হুরিয়াত এর সৈয়দ গিলানি-র প্রথম দিন থেকে JNU নিয়ে হুমকি ।
(http://www.thehindu.com/news/national/geelani-warns-against-action-on-jnu-students/article8224336.একে )
দুয়ে দুয়ে চার -inciting ভায়োলেন্স ক্যাটাগরি । আপনাদের খড়কুটো সম সুপ্রিম কোর্ট রুলিং এও বক্তব্য তো ছিল যদি কোনো স্পিচ ভায়োলেন্স সৃষ্টি করে সেটাই seditious তাই না ? :-)

আরো থাক - আজকে কাশ্মীরে শহীদ হওয়া ক্যাপ্টেনের কথা - কি আশ্চর্য সে বিভীষণ ও যে JNU স্টুডেন্ট ।
http://www.ndtv.com/india-news/a-jat-from-jnu-martyred-officer-pawan-k
umar-left-a-poignant-facebook-post-1279745?pfrom=home-lateststories



Avatar: robu

Re: স্লোগান দিতে গিয়ে - দিল্লির গল্প

জে-এন-ইউ এর প্রাক্তনীদের হাতে দেশরক্ষার দায়িত্ব দিয়েছে?
নো ওয়ান্ডার, এতো জঙ্গী রোজ বর্ডার পেরিয়ে যাওয়া আসা করে!!
Avatar: robu

Re: স্লোগান দিতে গিয়ে - দিল্লির গল্প

জাঠেদের হামলাও ওই inciting speech এর পরের ঘটনা। পুরো জে এন ইউ-র ছাত্র দের জেলে ভরা উচিত। পারলে প্রতিষ্ঠাতাকেও।
Avatar: b

Re: স্লোগান দিতে গিয়ে - দিল্লির গল্প

"বাবাসাহেব অনেক বিবেচনা করেই "কলোনিয়াল" সিডেসন রুল টা রেখেছিল সেই প্রথম সংবিধানের প্রবর্তন থেকেই ।আপনারা কি বললেন কিস্যু যায় আসে না ।চু চু আঙ্গুল চুসুন "

কলোনিয়াল সিডিশন রুলটা তো সংবিধান-এ নেই। ইন্ডিয়ান পেনাল কোড -এ আছে। সেটা অম্বেদ্কর লেখেন নি।

(উল্টো "ভয়েস" কে চিনি মনে হচ্চে!)
Avatar: S

Re: স্লোগান দিতে গিয়ে - দিল্লির গল্প

একজ্যাক্টলি। এই পার্থক্যটা যারা জানে/বোঝে না। ধুর।

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 11 -- 30


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন