ক্যাপ্টেন হ্যাডক RSS feed

খুকুর কুুকুর ঠাকুরপুকুর মেঘলা দুপুর টাপুর টুপুর বৃষ্টি পড়ে!

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া
    -'একটা ছিল লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া।আর ছিল একটা নীল ঝুঁটি মামাতুয়া।'-'এরা কারা?' মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড়ো করে অদ্ভুত লোকটাকে জিজ্ঞেস করে।-'আসলে কাকাতুয়া আর মামাতুয়া এক জনই। ওর আসল নাম তুয়া। কাকা-ও তুয়া বলে ডাকে, মামা-ও ডাকে তুয়া।'শুনেই মেয়েটা ফিক করে হেসে ...
  • স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি
    স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি। আমি স্টার্ট-আপ কোম্পানিতে কাজ করছি ১৯৯৮ সাল থেকে। সিলিকন ভ্যালিতে। সময়ের একটা আন্দাজ দিতে বলি - গুগুল তখনও শুধু সিলিকন ভ্যালির আনাচে-কানাচে, ফেসবুকের নামগন্ধ নেই, ইয়াহুর বয়েস বছর চারেক, অ্যামাজনেরও বেশি দিন হয়নি। ...
  • মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার
    [আজ বের্টোল্ট ব্রেশট-এর মৃত্যুদিন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে যিনি সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন ব্রেশটিয় আঙ্গিক, সেই মৃণাল সেনকে নিয়ে একটি সামান্য লেখা।]ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কীভাবে যেন পরিচালক ত্রয়ী সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল এক বিন্দুতে এসে মিলিত হন। ১৯৫৫-তে মুক্তি ...
  • দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল পড়ে
    পড়লাম সিজনস অব বিট্রেয়াল গুরুচন্ডা৯'র বই দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল। বইটার সঙ্গে যেন তীব্র সমানুভবে জড়িয়ে গেলাম। প্রাককথনে প্রথম বাক্যেই লেখক বলেছেন বাঙাল বাড়ির দ্বিতীয় প্রজন্মের মেয়ে হিসেবে পার্টিশন শব্দটির সঙ্গে পরিচিতি জন্মাবধি। দেশভাগ কেতাবি ...
  • দুটি পাড়া, একটি বাড়ি
    পাশাপাশি দুই পাড়া - ভ-পাড়া আর প-পাড়া। জন্মলগ্ন থেকেই তাদের মধ্যে তুমুল টক্কর। দুই পাড়ার সীমানায় একখানি সাতমহলা বাহারী বাড়ি। তাতে ক-পরিবারের বাস। এরা সম্ভ্রান্ত, উচ্চশিক্ষিত। দুই পাড়ার সাথেই এদের মুখ মিষ্টি, কিন্তু নিজেদের এরা কোনো পাড়ারই অংশ মনে করে না। ...
  • পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি
    দিলীপ ঘোষযখন স্কুলের গণ্ডি ছাড়াচ্ছি, সন্তোষ রাণা তখন বেশ শিহরণ জাগানাে নাম। গত ষাটের দশকের শেষার্ধ। সংবাদপত্র, সাময়িক পত্রিকা, রেডিও জুড়ে নকশালবাড়ির আন্দোলনের নানা নাম ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের মধ্যে। বুঝি না বুঝি, পকেটে রেড বুক নিয়ে ঘােরাঘুরি ফ্যাশন হয়ে ...
  • দক্ষিণের কড়চা
    (টিপ্পনি : দক্ষিণের কথ্যভাষার অনেক শব্দ রয়েছে। না বুঝতে পারলে বলে দেব।)দক্ষিণের কড়চা▶️এখানে মেঘ ও ভূমি সঙ্গমরত ক্রীড়াময়। এখন ভূমি অনাবৃত মহিষের মতো সহস্রবাসনা, জলধারাস্নানে। সামাদভেড়ির এই ভাগে চিরহরিৎ বৃক্ষরাজি নুনের দিকে চুপিসারে এগিয়ে এসেছে যেন ...
  • জোড়াসাঁকো জংশন ও জেনএক্স রকেটপ্যাড-১৪
    তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায়...আসলে যে কোনও শিল্প উপভোগ করতে পারার একটা বিজ্ঞান আছে। কারণ যাবতীয় পারফর্মিং আর্টের প্রাসাদ পদার্থবিদ্যার সশক্ত স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। পদার্থবিদ্যার শর্তগুলি পূরণ হলেই তবে মনন ও অনুভূতির পর্যায় শুরু হয়। যেমন কণ্ঠ বা যন্ত্র ...
  • উপনিবেশের পাঁচালি
    সাহেবের কাঁধে আছে পৃথিবীর দায়ভিন্নগ্রহ থেকে তাই আসেন ধরায়ঐশী শক্তি, অবতার, আয়ুধাদি সহসকলে দখলে নেয় দুরাচারী গ্রহমর্ত্যলোকে মানুষ যে স্বভাবে পীড়িতমূঢ়মতি, ধীরগতি, জীবিত না মৃতঠাহরই হবে না, তার কীসে উপশমসাহেবের দুইগালে দয়ার পশমঘোষণা দিলেন ওই অবোধের ...
  • ৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড
    পুরোনো কথার আবাদ বড্ড জড়িয়ে রাখে। যেন রাহুর প্রেমে - অবিরাম শুধু আমি ছাড়া আর কিছু না রহিবে মনে। মনে তো কতো কিছুই আছে। সময় এবং আরো কত অনিবার্যকে কাটাতে সেইসব মনে থাকা লেখার শুরু খামখেয়ালে, তাও পাঁচ বছর হতে চললো। মাঝে ছেড়ে দেওয়ার পর কিছু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

পুরানো সেই দিনের কথা (৩)

ক্যাপ্টেন হ্যাডক

পর্ব ১ আর পর্ব ২ পাওয়া যাবে এখানে: http://www.guruchandali.com/blog/2015/10/08/1444245356550.html
..................................................................

পুরানো সেই দিনের কথা (৩) - " হাঁটি-হাঁটি পা-পা "

::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::

যা চলে যায়, তা আর ফেরে না - এই প্রকৃতির নিয়ম। ডাইনোসরদের দিন গিয়েছে। যে থেরোপডরা একসময় পৃথিবীর রাজা ছিল, তারা আজ পাখি হয়ে রয়ে গেছে, দ্বিতীয় সারির জীব হয়ে। অতীতের সাক্ষ্য দেয় শুধু পাথর-হয়ে-যাওয়া হাড়। সময়ের নিয়ম, সবাই আসে, সবাই যায়। যারা গেছে তারা ফেরে না।

কিন্তু মানুষ তো চিরকালই নিষিদ্ধ স্বপ্ন দেখে এসেছে, নিয়ম দেখিয়ে কবেই বা তাকে রোখা গেছে! প্রমিথিউস-ইকারাসের রক্ত বইছে যাদের শরীরে, তারা তো অসম্ভবকে চ্যালেঞ্জ জানাবেই। বেশীদিন আগেকার কথা নয় - কয়েকজন বিজ্ঞানী একটা প্রজেক্ট হাতে নিলেন। তাদের লক্ষ্য, চার হাজার বছর আগে চিরবিদায় নেওয়া Mammuthus primigenius-কে আবার এই পৃথিবীর বুকে ফিরিয়ে আনবেন।


ঊলি ম্যামথের যে হাড় আর দাঁত আমরা পেয়েছি, তা ফসিল নয়। ফসিল হলে তা আর হাড় থাকে না, পাথর হয়ে যায়, হাড়ের আকৃতিটুকু শুধু থাকে। কিন্তু ঊলি ম্যামথ আমাদের হলোসীন যুগের প্রাণী, তার হাড় এখনো হাড়ই আছে। সেই হাড় থেকে বিজ্ঞানীরা খুব, খুব সামান্য মাত্রায় টিকে থাকা জৈব পদার্থ উদ্ধার করতে পেরেছেন। জৈব পদার্থ মানে এখনো কোনোক্রমে রয়ে যাওয়া রক্ত বা মাংস, মোটামুটি অক্ষত কোনো কোষ, বা অন্তত কোষের নিউক্লিয়াসটুকু। নিউক্লিয়াসটুকু থাকলেই তার মধ্যে পাওয়া যাবে DNA, আর ডি এন এ পাওয়া মানেই আসল ব্লু - প্রিন্ট হাতে পাওয়া। ঊলি ম্যামথের ম্যামথ হওয়ার সমস্ত রেসিপিটা ওই ডি এন এ-র মধ্যে জীনে-জীনে রেকর্ড হয়ে আছে। তাই যেমন করে হোক - ডি এন এ উদ্ধার করা চাই। করাটা অসম্ভব নয়, কেননা বরফের মধ্যে যেসব ম্যামথের মৃতদেহ পাওয়া গেছে, সেগুলো খুব একটা বিকৃত হয়নি।

ডি এন এ পাওয়া যাচ্ছিল, তবে টুকরো টুকরো; শুধু তাই দিয়ে আস্ত একটা প্রাণী বানানো সম্ভব নয়। আস্ত প্রাণী বানাতে গেলে তার জীনের পুরো সেটটা চাই, একটা আস্ত genome চাই। পুরোনো ম্যামথের টিস্যু থেকে তা পাওয়া দুঃসাধ্য দেখে হার্ভার্ডের গবেষক জর্জ চার্চ অন্য রাস্তা ধরলেন। ম্যামথের যে নিকটতম আত্মীয় এখনও বেঁচে আছে, সে হল এশিয়ান এলিফ্যান্ট - আমাদের ভারতীয় হাতি। হাতির তাজা কোষ থেকে চার্চ তার জীনোম বার করলেন, করে তার মধ্যে বিশেষ বিশেষ জায়গা কেটে বাদ দিয়ে সেখানে ম্যামথের জীনের টুকরো জোড়া লাগাতে লাগলেন। হাতি যেহেতু ম্যামথেরই মতো, তাই তাদের জীনের বেশীরভাগটাই একইরকম। শুধু কয়েকটা জায়গা আলাদা - ম্যামথের লম্বা লোম, শীত-সওয়া রক্ত, গা গরম রাখতে বাড়তি চর্বির স্তর - এগুলোয় হাতির সাথে তার তফাৎ। চার্চ বেছে বেছে সেই পার্থক্যের জায়গাগুলোয় হাতির জীন সরিয়ে ম্যামথের জীন বসালেন। - এক্সপেরিমেন্টটা উতরেও গেল, এই edit করা পূর্ণাঙ্গ জীনোম পরীক্ষা করে দেখা গেল, তা থেকে ম্যামথের মতো লোম, রক্ত, চর্বির স্তর পাওয়া যাবে।

কিন্তু জোড়াতালির দরকার হল না। দু'হাজার পনেরোর এপ্রিলে, সুইডিশ মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রির বিজ্ঞানী ডঃ লাভ ড্যালেন বিবিসির এক রিপোর্টে জানালেন - তাঁদের টীম ম্যামথের সম্পূর্ণ জীনোম তৈরী করতে পেরেছে। পুরো ডি এন এ সিকোয়েন্স উদ্ধার করা গেছে। 'কারেন্ট বায়োলজি' জার্নালে তাদের সেই স্টাডি প্রকাশিত হল। ম্যামথকে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে ড্যালেনরা গবেষণা করছিলেন না, কিন্তু পুরো জীনোম পত্রিকায় বেরোনোর পর সান ফ্রানসিসকোর অন্য একদল বিজ্ঞানী জানালেন, তাঁরা ম্যামথকে ফিরিয়ে আনতেই চাইছেন। হয়তো পুরোপুরি আসল ম্যামথ নয়, - এশীয় হাতি আর ম্যামথের হাইব্রিড। এই হাইব্রিড বানিয়ে তুন্দ্রা অঞ্চলের অরণ্যে ছাড়া হবে। তাঁরা ম্যামথের ডি এন এ নিয়ে, চিড়িয়াখানার পোষা হাতির গর্ভে তা স্থাপন করে, - সেই মা হাতিকে নতুন ম্যামথের ধাত্রী হিসেবে ব্যবহার করার কথা ভাবছেন।

স্বাভাবিকভাবেই বির্তক উঠেছে। অনেকেই এইধরনের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কারণ দেখিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন স্বয়ং বেথ শাপিরো, যিনি 'How to Clone a Mammoth' বইটির লেখিকা। বেথ বলছেন, হাতিরা এমনিতেই বন্দীদশায় ভালো থাকে না, কৃত্রিম প্রক্রিয়ায় প্রজনন তাদের পক্ষে আরও কঠিন হয়। একটা হাতিকে এভাবে জোর করে গর্ভে ম্যামথ নেওয়ানোটা নিষ্ঠুরতা ছাড়া কিছুই না। তাছাড়া, হাতিরা যূথবদ্ধ প্রাণী, সবসময় তারা দল বেঁধে থাকে। ম্যামথরাও তাই ছিল। একটা ম্যামথকে একলা জন্ম নিতে বাধ্য করা মানে তাকে বাঁচিয়ে তুলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। করতে হলে পুরো একটা দলকে তৈরী করা দরকার, নইলে একটাকেও নয়। দল তৈরী করলেও, তাদেরকে কে বড় করবে, একবয়সী একদল ম্যামথ - যাদের কোনো ম্যামথ অভিভাবক নেই - তাদেরকে কে নেতৃত্ব দেবে, এগুলোও বড় প্রশ্ন। হঠকারীর মত না ভেবেচিন্তে কোনো প্রাণীকে এভাবে ফিরিয়ে আনা সমর্থন করা যায় না। - 'প্রগতিশীল' বিজ্ঞানীরা অবশ্য এসব বিতর্কে কান দিচ্ছেন না। তাঁরা জানিয়ে দিয়েছেন, ২০১৮ নাগাদ ম্যামথ ক্লোনিং-এর কাজ শুরু করে দেওয়া হবে।

কিন্তু ম্যামথই de-extinction-এর একমাত্র ক্যান্ডিডেট নয়। ২০০৮ সালের কথা, মনটানার জীবাশ্মবিদ জ্যাক হর্নার ফসিলের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি করতে করতে একটা টী-রেক্সের কঙ্কাল খুঁজে পেলেন।

ফসিল জিনিসটা ঠিক হাড় নয়। দু'তিন রকম ভাবে ফসিল হতে পারে। এক হয় trace fossil। দু'হাজার চোদ্দো সালে জয়সলমীরে তিরিশ সেন্টিমিটার লম্বা টেরোসরের পায়ের ছাপ পাওয়া যায়। নরম মাটিতে পড়া পায়ের ছাপ কোটি কোটি বছরে জমে পাথর হয়ে অবিকৃত থেকে গেছে। টেরোসর উড়ুক্কু সরীসৃপ, ঠিক ডাইনোসরদের মধ্যে না পড়লেও তাদেরই সমসাময়িক। এখানে টেরোসরের শরীরের কোনো অংশ পাওয়া যায়নি, পাওয়া গেছে তার পায়ের ছাপ। এই ধরনের ফসিল, যা প্রাণীর শরীরের অংশ নয়, কিন্তু তার ক্রিয়াকলাপের চিহ্ন ধরে রেখেছে, তাকে বলে ট্রেস ফসিল। আর যদি শরীরের অংশ বা গোটা শরীরটাই পাওয়া যায়, তাহলে তাকে বলে body fossil। বডি ফসিল আবার নানাভাবে হতে পারে। বরফে জমে গিয়ে হতে পারে; অ্যাম্বারের মধ্যে সংরক্ষিত হয়ে থাকতে পারে; মাটিতে চাপা পড়ে শরীরের ছাঁচ রেখে গিয়ে থাকতে পারে, বা হাড়গোড় জমে পাথর হয়ে গিয়ে থাকতে পারে। আমরা সাধারণত এই শেষ ধরনটাকেই 'ফসিল' বলে জানি। এক্ষেত্রে, হাড় মাটিচাপা থাকাকালীন তার ভিতরে এমনভাবে খনিজ যৌগ জমে যে তাতে হাড়ের আকৃতি হুবহু বজায় থাকে। ভিতরের জৈব গঠন লোপ পেয়ে যায়, খাপে খাপ মিলিয়ে অজৈব খনিজ তার জায়গা নেয়। এর থেকে শুধু শরীরের কাঠামোটাই জানা যায়, তার বেশী কিছু নয়। জ্যান্ত প্রাণীটার কোনোকিছু প্রকৃতপক্ষে জীবিত বা মৃত কোনো অবস্থাতেই অবশিষ্ট থাকে না। শুধু হাড়ের গড়ন থেকে বিজ্ঞানীরা তার মালিক সম্পর্কে ধারণা করতে পারেন, - যেমন দাঁত দেখে বলা যায় সে ঘাসপাতা খেত না মাংস, পায়ের গঠন দেখে বলা যায় সে দু'পায়ে চলত না চারপায়ে।

জ্যাক হর্নার যে কঙ্কালটা পেলেন, সেটা এরকম এক ফসিল। বিরাট ভারী টী-রেক্সের কঙ্কাল, হেলিকপ্টারে তুলে গবেষণাগারে আনার সময় তার একটা থাইবোন দু'টুকরো হয়ে ভেঙে গেল। তার থেকে একটা টুকরো জ্যাক দিলেন তার ছাত্রী মেরী শোয়াইটজারকে।

শোয়াইটজার ল্যাবে বসে হাড়ের টুকরোটা খুঁটিয়ে দেখছিলেন। হঠাৎ একটা অদ্ভুত জিনিস তাঁর নজরে পড়ল। হাড়টার গায়ে এমন একটা প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে, যা একমাত্র অন্তঃসত্ত্বা পাখিদের হাড়ে দেখা যায়। শোয়াইটজারের রিসার্চ অ্যাসিসট্যান্ট ছিলেন জেনিফার উইটমেয়ার, - জেনিফারকে ডেকে তিনি বললেন, হাড়টার বাইরের খনিজ আস্তরণটাকে ধুয়ে পরিষ্কার করতে, যাতে ভালো করে ভেতরটা দেখা যায়।

ছ'ঘন্টা পরে শোয়াইটজারের দরজায় টোকা পড়ল। প্রায় হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকেছে জেনিফার। 'য়ু আর নট গোয়িং টু বিলিভ দিস।'

পরিষ্কার করতে করতে ফরসেপ দিয়ে জেনিফার হাড়ের ভিতরের একটা টুকরোয় টান দিয়েছিলেন। ফরসেপের টানে টুকরোটা ইলাস্টিকের মতো লম্বা হয়ে এল!

ফসিলাইজ্‌ড হাড়ে নরম টিস্যু???

শোয়াইটজাররা তখুনি বুঝে গিয়েছিলেন, তারা অসম্ভবকে আবিষ্কার করেছেন। আটষট্টি মিলিয়ন বছর আগেকার ডাইনোসরের ফসিলে তাঁরা নরম টিস্যু খুঁজে পেয়েছেন। যার অর্থ - ডাইনোসরের ডি এন এ। ব্যাপারটা এখানেই থামল না। ওই টিস্যুর আশপাশ ভালো করে দেখতে গিয়ে তাঁরা আরও একটা জিনিস পেলেন - রক্তনালী। মাইক্রোস্কোপের তলায় ফেলে দেখা গেল, যেন রক্তকণিকার মতো কী একটা দেখাও যাচ্ছে। ল্যাবের স্টোরে আরও অনেক ডাইনোসরের হাড় রাখা ছিল, এবারে সেগুলো বের করে খোঁজ আরম্ভ হল। অনেক চেষ্টার পর একধরনের কোষ মোটামুটি উদ্ধার করা গেল - যে ধরনের কোষ দিয়ে হাড় তৈরী হয় - osteocyte। তা থেকে অল্প ডি এন এ পাওয়া যেতে পারে।

কিন্তু এত কমে কাজ হবে না। যদি এইভাবে ডাইনোসরের পুরো জীনোম বানাতে হয়, অনন্তকাল সময় লাগবে। কাজেই জ্যাক হর্নার পুরো গেমপ্ল্যানটাই উল্টে দিলেন। ডাইনোসরের টিস্যু পাওয়া যত বড় যুগান্তকারী আবিষ্কারই হোক না কেন, dinosaur-engineering তা থেকে সম্ভব নয়। যদি ডাইনোসর বানাতে হয়, তাহলে তার পথ একটাই; আধুনিক প্রাণীর জীনের গতি উল্টোমুখে ফিরিয়ে দিয়ে retro-engineering-এর মাধ্যমে তাকে ডাইনোসর করে তুলতে হবে। আর ডাইনোসর হয়ে ওঠার জন্য আদর্শ সাবজেক্ট কে হতে পারে - আজকের থেরোপড পাখি ছাড়া? জ্যাক ঠিক করলেন, এমু পাখির জীনোমের ওপর পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু করবেন। ‘Emus have all the features we need in order to make a Velociraptor-sized dinosaur. If I were to make a dinosaur, that is where I’d start.'


এদিকে ক্যানাডার জীবাশ্মবিদ হান্স লারসন তাঁর ল্যাবে আর এক কাণ্ড ঘটিয়ে বসলেন।

দু'দিন বয়সী একটা মুরগীর ভ্রূণ মাইক্রোস্কোপের তলায় স্টাডি করতে করতে একটা অপ্রত্যাশিত জিনিস তাঁর চোখে পড়ল। মুরগীর লেজে চার থেকে আটটা অস্থিখণ্ড থাকার কথা। কিন্তু হান্স দেখলেন, ভ্রূণটার শিরদাঁড়ায় লেজের অস্থিখণ্ড রয়েছে ষোলোটা। লেজে ষোলোটা ভার্টিব্রা পাখিদের শরীরে থাকে না, থাকে সরীসৃপদের শরীরে। হান্সের মনে একটা সন্দেহ দেখা দিল, তিনি বাড়ন্ত ভ্রূণের ওপর নিয়মিত নজর রাখলেন। দেখা গেল, বয়স বাড়ার সাথে সাথে ভার্টিব্রার সংখ্যা কমে আসছে। শেষে যখন ডিম ফুটে মুরগীছানা বেরোল, তখন তার লেজে মাত্র পাঁচটা ভার্টিব্রা, আর পাঁচটা সাধারণ মুরগীছানার মতোই!

মানেটা কী দাঁড়াল? - মানে দাঁড়াল এই যে আজ দেড়শো মিলিয়ন বছর পাখির জীনের গভীরে ডাইনোসরের নকশা লুকোনো আছে। পূর্ণবয়স্ক পাখির মধ্যে তা অনুপস্থিত হলেও, ভ্রূণ অবস্থায় তা লক্ষ্য করা যায়। হান্স এবার কাজে হাত লাগালেন। মুরগীর ডিমের মধ্যে সামান্য জেনেটিক রদবদল ঘটিয়ে তিনি লেজের ভার্টিব্রার সংখ্যা পাঁচ থেকে বাড়িয়ে আট করলেন সফলভাবে। পাখির গায়ে ডাইনোসরের লেজ দেখা গেল।

তা, ল্যাজা যদি হতে পারে, তাহলে মুড়ো হবে না কেন?

ইংরেজীতে একটা বাগ্‌ধারা আছে, 'as rare as hen's teeth'। মানে যেমন ডুমুরের ফুল, এত বিরল যে দেখাই যায় না। সত্যিই, মুরগীর কি আর দাঁত হয়? পাখির শরীরের নিয়মই তো তাই - দাঁতের বদলে শক্ত ঠোঁট। 'কিন্তু -', উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাট হ্যারিস আর জন ফ্যালন বলতে চাইলেন, '- কিন্তু হবে না কেন?'

ম্যাট আর জন মুরগীদের মিউটেশন নিয়ে গবেষণা করছিলেন। অনেক সময়ে শারীরিক বিকৃতি বা অসুবিধার জন্য মিউট্যান্ট প্রাণীরা ভ্রূণ অবস্থাতেই মারা যায়। এরকম একটা চোদ্দো দিন বয়সী মুরগীর ঠোঁটের মধ্যে ম্যাট একটা অস্বাভাবিক গঠন পেলেন। ভালো করে পরীক্ষা করে দেখা গেল, জিনিসটা সত্যিই দাঁত, অ্যালিগেটরের ভ্রূণে যেরকম দাঁত দেখা যায়, প্রায় হুবহু সেই জিনিস। ম্যাট আর জন এবার নিজেরা চেষ্টা করলেন, মুরগীর মধ্যে ঘুমন্ত দাঁত-তৈরীর জীনকে জাগানো যায় কিনা। স্বাভাবিক (মিউট্যান্ট নয়) একটা ভ্রূণের মধ্যে ওই জীন তাক করে একটা ভাইরাস প্রয়োগ করলেন। সেটা সুপ্ত জীনকে খোঁচা মেরে সচল করে তুলবে। - দু'সপ্তাহ পর দেখা গেল, মুরগীটার ঠোঁটে দাঁত উঠেছে। কিন্তু এ দাঁত কুমীরের মতো দাঁত নয়। মুরগীর ঠোঁটে দেখা দিয়েছে বাঁকানো fang, যে জিনিস ম্যাটরা ডাইনোসরের কঙ্কালে দেখেছেন।


এবার পালা পালকের। Silkie নামে একজাতের চীনা মুরগি হয়। এদের বৈশিষ্ট্য হল, এদের সারা শরীর - এমনকী পা-ও - গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা পালকে ঢাকা থাকে। নরম ঝাঁকড়া পালকের জন্য তার চেহারাটা লাগে অনেকটা লোমশ ভুটিয়া কুকুরের মতো। ম্যাট আর জন ভাবলেন, জীনের গতিপথ ঘুরিয়ে এই মুরগীর পালককে আঁশে রূপান্তরিত করা যায় কিনা দেখবেন। আঁশ বলতে dry scales, যা সরীসৃপদের গায়ে থাকে, পাখিদের পায়েও থাকে। - আগের মতোই, এবারেও একই ফল হল। ডিমের মধ্যে বৃদ্ধির সময় প্রথমে পাখির ভ্রূণে আঁশের লক্ষণ দেখা দেয়, পরে তা থেকে পালক রূপ পায়। ম্যাটরা দেখলেন, সঠিক জীনকে সঠিক সময়ে চালু করে দিতে পারলে ভ্রূণের শরীরে আঁশ থেকে পালক হওয়ার প্রক্রিয়া আটকে দেওয়া সম্ভব। তাতে যে প্রাণীটা পাওয়া যাবে, তার পালক থাকবে না, থাকবে আঁশ।

ওদিকে ক্যানাডায় লারসন আবিষ্কার করে ফেলেছেন, পাখিদের ডানার হাড়ে ডাইনোসরের সামনের থাবার মতো গঠন এখনো টিকে আছে। রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং করে পাখির ডানাকে ডাইনোসরের পায়ে বদলে ফেলা থিওরিটিক্যালি সম্ভব।


বছর আটেক এগিয়ে আসা যাক। দু'হাজার পনেরো সাল। জুন মাসের শেষদিকে, 'Evolution' পত্রিকার ওয়েবসাইটে একটা অনলাইন প্রবন্ধ বেরোল। ন'জন বায়োলজিস্টের একটা টীম পাখির ঠোঁটের বিবর্তন নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছিলেন। প্রাচীন পাখিদের ঠোঁট হত না, অনেকটা ভেলোসির‍্যাপটরদের মতো মুখের আদল হত। সেই snout-এর মতো আদল থেকে কীভাবে beak এল, সেই ইতিহাস জানার চেষ্টা চলছিল। ঠোঁট এমন একটা প্রত্যঙ্গ যা পাখিদের জন্য চূড়ান্ত গুরুত্বপূর্ণ, - এই বৈশিষ্ট্য ছাড়া এতরকম পরিবেশে ওরা এতটা সাফল্য পেত না। অথচ ঠোঁট জিনিসটা নিয়ে সেই অর্থে তেমন গবেষণা হয়নি।

কথা হল, - ঠোঁট থাকার গুরুত্ব কোথায়, কীভাবে তা পাখিদের জীবনকে প্রভাবিত করে, কেন সেটা এত বড় একটা অভিযোজন হয়ে দেখা দিল - এসবের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমে ঠোঁট কীভাবে তৈরী হল তা জানা দরকার। এই বিজ্ঞানীরা পাখির সাথে টিকটিকি, কুমীর, কচ্ছপ - এরকম অন্যান্য প্রাণীর জীন তুলনা করে দেখলেন, ঠোঁটওয়ালাদের মধ্যে এমন কিছু জীন পাওয়া যাচ্ছে যা ঠোঁটছাড়াদের নেই। সেই জীনগুলোই পাখিদের মুখে ঠোঁটের জন্ম দিচ্ছে। এবারে মুরগীর ভ্রূণের মধ্যে কৃত্রিমভাবে এই বিশেষ জীনগুলোর প্রভাব ঠেকিয়ে রাখা হল। তাতে দেখা গেল, ঠোঁট সহ পুরো করোটির গঠনে একটা উল্লেখযোগ্য বদল আসছে। পাখির মাথা আর পাখির মাথা থাকছে না, প্রায় যেন পাখি আর কুমীরের মাথার মাঝামাঝি এক 'মিসিং লিঙ্ক' হয়ে উঠছে। গবেষকরা আর এই সরীসৃপ-পাখিদের জন্মাতে দিলেন না, ভ্রূণের বৃদ্ধি স্থগিত থাকল। জন্মালে হয়তো এক বিচিত্র ধড়ে-মুড়ো সন্ধি হয়ে দাঁড়াত, একটা প্রাণ অনর্থক কষ্ট পেত। - কিন্তু বট্‌মলাইনটা যা পাওয়া গেল, তা খুব পরিষ্কার।


'ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।'


অনেকদিন আগে একটা বইয়ে একটা কথা পড়েছিলাম। ধরা যাক একজন মানুষকে মঙ্গলগ্রহে একা ছেড়ে দেওয়া হল। কোনো সঙ্গী নেই, কথা বলার কেউ নেই, চতুর্দিকে প্রাণের কোনো চিহ্ন নেই। এরকম অবস্থায় যদি সেই লোকটা হঠাৎ একটা মাছিও দেখতে পায়, তাহলেও সে মহা আনন্দে চীৎকার করে উঠবে। কেন? কারণ মাছিটা তার মতোই পৃথিবীর জীব। এই ভিনগ্রহে ওটাই তার নিকটতম আত্মীয়, তার 'দেশের লোক'। পরিচিত গণ্ডীর মধ্যে বসে বসে আমরা এই অনুভূতির স্বাদ পাই না, কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টালে আমাদের জৈবিক ধর্ম স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রবিনসন ক্রুসো সাদা চামড়ার বর্ণবিদ্বেষী ইংরেজ ছিল, তবুও সেই পাণ্ডববর্জিত দ্বীপে আদিবাসী ফ্রাইডেকেই সে তার সবচেয়ে বড় বন্ধু করে তুলেছিল। মিল-বেমিলের হিসেবটা আসলে সম্পূর্ণ আপেক্ষিক।

এই যে বিশাল বৈচিত্রপূর্ণ প্রাণীজগৎ, তার মধ্যে এতরকম বিভিন্নতা, - তবুও এর মধ্যে অনেকটাই আসলে একরকম। আমাদের জেনেটিক গঠন মিলিয়ে দেখলে এটা পরিষ্কার বোঝা যায়। পাখির মধ্যেকার জীন থেকে সরীসৃপকে জাগিয়ে তোলা, হাতির জীন থেকে ম্যামথের জীনের অসম্পূর্ণতা দূর করা - এসব সম্ভব হয় এই মিল থাকার জন্যেই। তুলনা করলে দেখা যাবে, মানুষ আর মৌমাছির জীনের মধ্যে 44%-ই এক। মানুষ আর মুরগীর মধ্যে এই মিলটা বেড়ে হয় ৬৫%, মানুষ আর কুকুরের মধ্যে ৮৪%, আর শিম্পাঞ্জীর সাথে মেলালে দেখা যায় ওদের জীন আমাদের সাথে ৯০% মেলে। যেটুকু তফাৎ, সেটা আসে ওই সামান্য না মেলা অংশটুকুর কল্যাণে।

'জুরাসিক পার্ক' উপন্যাসে জন হ্যামন্ড ডাইনোসর বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। কোটি কোটি টাকা ঢেলে ডাইনোসর ডি এন এ-র জন্য খোঁজ লাগিয়েছিলেন। শেষে সেই ডি এন এ পাওয়া গিয়েছিল অ্যাম্বার থেকে। অ্যাম্বার একধরনের ফসিল, প্রাগৈতিহাসিক গাছের গা থেকে গড়ানো রস জমে তাই থেকে ফসিল হয়ে অ্যাম্বার হয়। হ্যামন্ড এমন ধরনের অ্যাম্বার জোগাড় করেছিলেন, যার মধ্যে গাছের রসে আটকা-পড়া প্রাগৈতিহাসিক মশাদের মৃতদেহ সংরক্ষিত হয়ে আছে। সেই পচন-না-ধরা মশার পেট থেকে বার করা হয়েছিল ডাইনোসরের রক্ত, আর সেই রক্ত ছেনে উদ্ধার করা হয়েছিল তার ডি এন এ। কিন্তু যতই হোক, ৬৫ মিলিয়ন বছর নেহাত কম সময় নয়। পুরো ডি এন এ হ্যামন্ড পেলেন না, কয়েক জায়গায় ফাঁক থেকে গেল। সেই ফাঁক ভরাট করার জন্যে হ্যামন্ডের ভাড়াটে বিজ্ঞানীরা অন্য প্রাণীদের জীনোম থেকে মালমশলা নিলেন। পাখি, কুমীর আর ব্যাঙের ডি এন এ দিয়ে ফাঁক ভরাট করা হল, তাই থেকে বানানো হল ডাইনোসর। ভাগ্যিস পাখি-কুমীর-ব্যাঙদের সাথে ডাইনোসরদের মিল ছিল, তা নাহলে তো এ কাজ করাই যেত না। খুব ভালো কথা।

কিন্তু খোদার ওপর খোদকারি চলে না। জুরাসিক পার্কের গতি কী হয়েছিল তা সবাই জানি। যেটা সবাই জানে না, সেটা সিনেমায় ভালোভাবে বলা নেই। উপন্যাসটায় আছে। বানানো ডাইনোসররা যাতে সম্পূর্ণভাবে মালিকদের ওপর নির্ভরশীল হয় - তাদের আওতায় থাকে, তার জন্যে জুরাসিক পার্কের কর্মকর্তারা কিছু safety measures নিয়েছিলেন। পার্কের যত ডাইনোসর সবাই ছিল মেয়ে। এতে সুবিধা হল, ওরা নিজেরা বংশবৃদ্ধি করতে পারবে না, বন্য পরিবেশে স্বাধীন জীবন খুঁজে নিতে পারবে না। একমাত্র হ্যামন্ডের এয়ারকন্ডিশনড ল্যাবেই নতুন ডাইনোসর বাচ্চা জন্ম নেবে। এরকমটাই ভাবা হয়েছিল। গোলমাল রয়ে গিয়েছিল অন্য জায়গায়।


আফ্রিকায় একধরনের ব্যাঙ পাওয়া যায়, তার নাম common reed frog। এই ব্যাঙদের একটা চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য আছে। এরা প্রয়োজনমত লিঙ্গ পরিবর্তন করতে পারে। কোনোরকম ছুরিকাঁচি বা কৃত্রিম হরমোনাল ট্রিটমেন্ট ছাড়াই। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, যদি একদল কমন রীড ফ্রগের মধ্যে থেকে সব পুরুষ ব্যাঙ সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে কিছুক্ষণ বাদে বড় বড় কয়েকটা মেয়ে ব্যাঙ লিঙ্গ পাল্টে ছেলে হয়ে যায়। প্রকৃতিতেও যদি কখনো কোনো কারণে তাদের মধ্যে single sex environment দেখা দেয়, তাহলে তারা এইভাবেই তার সমাধান করে।

জুরাসিক পার্কে ডাইনোসরদের জন্যে যে ব্যাঙের ডি এন এ ব্যবহার করা হয়েছিল, তা ছিল এই কমন রীড ফ্রগ। ডাইনোসরদের স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধি রোখা গেল না। অ্যালান গ্র্যান্ট জঙ্গলের মধ্যে ভেলোসির‍্যাপটরের ডিমের খোলা পেলেন। হ্যামন্ডের সাধের স্বপ্ন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।

বিজ্ঞানীরা যে ব্যাঙের লিঙ্গ পরিবর্তনের ব্যাপারটা হিসেবে ধরতে ভুলেছিলেন, সেটা তাঁদের পক্ষে নিতান্তই কাঁচা কাজ হয়েছিল। প্রাণীদের মধ্যে এটা একেবারে বিরল নয়। 'Finding Nemo'-খ্যাত ক্লাউনফিশদের মধ্যে এ জিনিস হামেশাই হচ্ছে। একদল ক্লাউনফিশের মধ্যে সবচেয়ে বড় জন হয় মেয়ে। আকারে তার পরেই যে, সে ছেলে। বাকিদের কারো জননাঙ্গ থাকে না, তারা 'আন্ডার-এজ' হয়ে দলে থাকে। স্ত্রী-পুরুষ জুটি বেঁধে ডিম পাড়ে। যদি স্ত্রী কোনো কারণে মারা যায়, তখন পুরুষ ক্লাউনফিশ নিজেকে বদলে ফেলে, 'বাবা' থেকে 'মা' হয়ে যায় ('ফাইন্ডিং নিমো'-তে মা-মরা নিমোর বাবা মার্লিনের মাতৃস্নেহ স্মরণীয়), আর ওই মাইনর ক্লাউনফিশদের মধ্যে যে সবচেয়ে বড়, সে পুরুষ মাছের জায়গা নেয়। ক্লাউনফিশ ছাড়াও আরো অনেক মাছ, কয়েকজাতের তারামাছ, কিছু শামুক - এদের মধ্যেও লিঙ্গবদল দেখা যায়। কমন রীড ফ্রগ ছাড়াও অন্য কোনো কোনো উভচরদের মধ্যেও এটা আছে, যেমন আফ্রিকান বুলফ্রগ।

উভচররা এক বিচিত্র শ্রেণীর জীব। এরা না জলের, না ডাঙার - দুইয়ে মিলে এদের জীবন কাটে। সমস্ত মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে একমাত্র এদেরই গায়ে কোনোরকম আত্মরক্ষার বর্ম থাকে না। বাকি সবার চামড়ায় কিছু না কিছু আবরণ আছে - মাছের আঁশ আছে, সরীসৃপেরও আঁশ আছে, পাখির পালক আছে, স্তন্যপায়ীর লোম আছে, - একমাত্র উভচরদের ত্বক অনাবৃত। ভেজা স্যাঁতসেঁতে গায়ের চামড়া, পিচ্ছিল মিউকাসে ঢাকা। এরকম ব্যবস্থার পেছনে কারণ আছে। বিবর্তনের ইতিহাসে উভচররা হল প্রথম মেরুদণ্ডী প্রাণী যারা জল থেকে ডাঙায় উঠে এসেছিল, মাছ থেকে চতুষ্পদ হয়েছিল। ডাঙায় উঠে এসে তাদের প্রথম সমস্যা ছিল dessication - ডাঙার অনার্দ্র পরিবেশে শরীর শুকিয়ে মৃত্যু। সিলুরিয়ানে যখন গাছেরা প্রথম ডাঙায় এসেছিল, তখন তাদেরও এই সমস্যা হয়েছিল। গাছেরা তার সমাধান করেছিল মোমের মতো কিউটিকল দিয়ে। মাছের শরীরেও আঁশ ছিল, কিন্তু তা দিয়ে ডেসিকেশন ভালো আটকায় না। এর সমাধান করতে উভচররা ত্বকে পিচ্ছিল মিউকাসের ব্যবস্থা করল। মিউকাসের আস্তরণ থাকার ফলে শরীরের জল শুকিয়ে ওঠার হার অনেকটা কমে। মেছো আঁশকে বিদায় দিয়ে শরীর নিরাবরণ হওয়ায় আরো একটা বড় সুবিধা হল। ডাঙার প্রাণীদের শ্বাস নেওয়ার যন্ত্র হল ফুসফুস। উভচরদের ফুসফুস সরীসৃপ-পাখি-স্তন্যপায়ীদের মতো অতটা উন্নত নয়, তার অক্সিজেন টানার ক্ষমতা কম। এই চাহিদা পূরণ করল উভচরদের নগ্ন ত্বক। খোলা চামড়ার মাধ্যমে বাতাসের আদানপ্রদান চালিয়ে তারা অক্সিজেনের খামতি মেটাল।

চামড়া ছাড়াও শরীরে আরো পরিবর্তন এলো। সমুদ্রের যারা থাকে, তাদের শরীর অনেক বড় হলেও তা বয়ে বেড়ানো তেমন কঠিন হয় না, কারণ জল নিজেই সেই ভার অনেকটা বহন করে। কিন্তু ডাঙায় এই সুবিধা নেই। বাতাসের প্লবতা এত কম যে তা হাড়মাংসের শরীরকে ভাসিয়ে রাখতে পারে না। এদিকে উভচরদের দেহে ফুসফুস দেখা দিয়েছে, তা যাতে বাকি শরীরের ভরে চুপসে না যায় সেই ব্যবস্থা করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা ডাঙায় হেঁটে চলে বেড়াতে হবে, তার জন্যে পা চাই। একটা ঢালাও কাঠামোগত বদল দরকার। ধাপে ধাপে সেই বদল এল। শুরুটা হয়েছিল মাছ থেকেই।


সিলুরিয়ান পর্যায়ের শেষ, ডেভোনিয়ান আসন্ন। প্রথম চোয়ালওয়ালা মাছের দল - শক্ত হাড়ের বর্মে মাথা ঢাকা শিকারী প্ল্যাকোডার্মরা তখন সমুদ্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এইরকম সময়ে নতুন একধরনের মাছ দেখা দিল। অন্যদের চেয়ে এদের পাখনার ধরন আলাদা। এমনিতে মাছের পাখনা তাদের মূল শরীরের সাথে লাগানো থাকে; পাখনায় কোনো মাংস থাকে না, হাড়ও থাকে না। কিন্তু এই নতুন মাছদের একরকম 'হাত-পাখনা' দেখা দিল। যেন শরীর থেকে ছোটো ছোটো হাত-পা বের হতে হতে শেষে পাখনা হয়ে গেছে। এই পাখনায় মাংসল অংশ থাকল, হাতের মতো হাড়ও থাকল। এদের আমরা বলি lobe-finned fish। এদের থেকে আবার দুটো শাখা বেরোল। একদিকে গেল শিলাকান্থ মাছের দল। এই শিলাকান্থ বাংলা সাহিত্যে বিখ্যাত মাছ, সেই কথায় পরে আসছি। দু'নম্বর যে শাখা 'হাত-পাখনা' মাছদের থেকে বেরোল, তারা সমুদ্রে আর রইল না, ডাঙার নদী নালা জলা-জায়গায় ঠাঁই নিল। এদের মধ্যে থেকে উঠে এল মিঠা জলের লাংফিশ সম্প্রদায়, আর চতুষ্পদ প্রাণীদের প্রথম পূর্বপুরুষ।


২০০৪ সালে কানাডায় একদল গবেষক এক অদ্ভুত জানোয়ারের ফসিল পেলেন। মাছের মতো প্রাণী, পাখনা আছে, ফুলকা আছে, গায়ে আঁশও পাওয়া গেল। কিন্তু তবুও একে ঠিক মাছ বলা গেল না। জানোয়ারটার মাথা মাছের মতো দু'পাশ থেকে চাপা নয়, বরং কুমীরের মতো ওপরে-নীচে চ্যাপ্টা, তার উপরে দুই চোখ বসানো। বুকের পাশে পাঁজরের হাড় মিলল, ডাঙায় শরীরের ভার নেবার মতো উপযুক্ত পাঁজরের হাড় - যা জলচর মাছের থাকে না, থাকার দরকার হয় না। মাছের শরীরে ঘাড় বলেও কিছু থাকে না, মাথা সরাসরি বুকের সাথে লাগানো। এই জানোয়ারের শরীরে ঘাড় পাওয়া গেল, কাঁধের সাথে তা জোড়া লাগানো নয়। তার মানে এ স্বাধীনভাবে এদিকে-ওদিকে মাথা ঘোরাতে পারত। মাছ তা পারে না। মাত্র কয়েকটা হাড়ের পার্থক্যে এই জীব বিবর্তনের পরের সোপানে পা রেখেছে। সত্যিই 'পা'। কারণ এই নতুন মাছের পাখনার ভিতর হাড় পাওয়া গেল। পায়ের হাড়। এমনকী হাতও বলা চলে। গবেষকরা স্পষ্ট দেখলেন, - কাঁধ, কনুই, কব্জি সমেত আস্ত হাত তৈরী হয়েছে এর পাখনার মধ্যে। তাহলে না-মাছ না-চতুষ্পদ এই নয়া জীবকে কী বলে ডাকা যায়? জীবাশ্মবিদ নীইল শুবিন একটা মাঝামাঝি রফা করে বললেন: মাছ-পদী!


এই 'মাছপদী' জীবের নাম রাখা হয় Tiktaalik, - সে আমাদের স্থলচরদের সবারই 'অতি বৃদ্ধ প্রপিতামহ', বস্তুত তার চেয়েও অনেক বেশী। ঘাড়-ওয়ালা শরীরের এই নকশা পরবর্তী সমস্ত প্রাণীদের মধ্যে রক্ষিত হয়েছে, - ব্যাঙ, সাপ, ডাইনোসর, ময়ূর, হরিণ, মানুষ - সবাই এই একসুতোয় বাঁধা। ৩৭৫ মিলিয়ন বছর আগেকার প্রথম স্থলচর টিকটালিক, - ছোটো ছোটো পাখনা-পায়ে ভর দিয়ে সে জল থেকে ডাঙায় উঠে আসত, খানিকটা যেন সীলমাছের মতো হামাগুড়ি দিয়ে, সামনের পাখনার জোর লাগিয়ে মাটির ওপর শরীর টেনে টেনে চলতে পারত। এর থেকেই উভচরদের উৎপত্তি। ডাঙার জীবনের জন্য প্রাথমিক অভিযোজন হিসেবে ঘাড় এর মধ্যেই দেখা গিয়েছিল, এর পরে Acanthostega আর Ichthyostega-দের মধ্যে দেখা গেল শরীরের ভর বইবার জন্যে মজবুত বুকের খাঁচা, শক্তপোক্ত শিরদাঁড়া, আর হেঁটে বেড়ানোর মতো সক্ষম হাত-পা। এরা এতদিনে মোটামুটি 'উভচর'-পদবাচ্য হয়েছে। এটা ডেভোনিয়ান পর্যায়।

ডেভোনিয়ান পৃথিবীতে স্থলভাগ তখন গাছে গাছে ঢাকা, বাতাসে ভরপুর অক্সিজেন, পোকামাকড়ের দল জলাজঙ্গল ছেয়ে ফেলেছে, ডাঙায় তখনো মেরুদণ্ডীদের দেখা নেই। কীটপতঙ্গ মানেই প্রচুর পুষ্টিকর খাবার, আর জল ছেড়ে এলে অন্য কোনো শিকারী জানোয়ারের ভয়ও নেই - তাই অ্যাকান্থোস্টেগারা মাঝে মাঝেই ভূরিভোজনের লোভে ডাঙায় উঠে আসত। অপোনেন্ট-বিহীন মাঠে টেনিদা এক এক করে বত্রিশ গোল দিয়েছিল, অবস্থা হল ঠিক তাই। কাজেই যতদিনে ডেভোনিয়ান পেরিয়ে কার্বনিফেরাস পড়ল, ততদিনে দেখা গেল উভচরের দল ডাঙায় ভালোভাবে আসন পাকা করে নিয়েছে।


কার্বনিফেরাস পর্যায় থেকে পার্মিয়ান পর্যায় - এই সময়টাকে বলা হয় Age of Amphibians। জল-ডাঙা মিলিয়ে যাদের জীবন, তাদের জন্যে আদর্শ প্রতিবেশ কার্বিফেরাস অরণ্যে তৈরী হয়েছিল। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া, উষ্ণ তাপমান আর অক্সিজেনের আধিক্যের ফলে পোকামাকড়ের বাড়বাড়ন্ত, অন্য কোনোরকম শিকারী প্রাণীর অনুপস্থিতি - উভচরদের আর কী চাই? অনুকূল পরিবেশ পেয়ে তাদের মধ্যেও এবার নানারকম শাখাপ্রশাখা দেখা দিল। একদল আকারে ছোটোখাটো, পিচ্ছিল ত্বক, জলের আশেপাশেই তাদের বেশীরভাগ সময় কাটে। এদের মধ্যে Diplocaulus বলে একজন ছিল, তার মাথার আকৃতি ঠিক বুমেরাং-এর মতো! খুব সম্ভব জলের তলায় দিক ঠিক করতে এতে তার সুবিধা হত। আর এক দল উভচর আকারে বড়সড় - লম্বা শরীর, বেঁটেখাটো মজবুত পা, বড় মাথা, অনেকের গায়ে একরকম আঁশও থাকত। শরীরের তলার দিকে বুক আর পেট ঢাকা থাকত আড়াআড়ি-টানা চওড়া প্লেটের মতো আঁশে - যেমন সাপদের থাকে। কিন্তু এই বর্ণনা শুনে তো উভচরের কথা মনে হয় না, এ চেহারা গিরগিটি-কুমীরদের মার্কামারা reptilian চেহারা। ডাইনোসররা কি তাহলে এই শ্রেণীর উভচরদের বংশধর? উত্তর পেলাম - না, তা নয়।


সরীসৃপরা প্রথম যখন উভচরদের থেকে নিজেদের আলাদা করে নিতে শুরু করল, সেটা কার্বনিফেরাসের শেষ দিক। সবচেয়ে বড় যে উন্নতি তারা করল, তা হল ডাঙায় পাড়বার মতো খোলা-ওয়ালা ডিম। উভচরদের নিয়ম হল, জীবন যেখানেই কাটাক না কেন - ডিম তাদের পাড়তে হবে জলেই। তা না হলে পাড়ার সাথে সাথে ডিম শুকিয়ে যাবে; নরম খোলাওয়ালা ডিম ডাঙার শুকনো পরিবেশে বাঁচে না। উভচরের জীবন যে জলের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে বাঁধা, এটাই তার সবচেয়ে বড় কারণ। প্রথম সরীসৃপরা এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠল। সরীসৃপদের ডিমের খোলা জলনিরোধক হয়, তা নিরাপদে ডাঙায় পাড়া যায়। পাখির ডিমও তাই। তফাতের মধ্যে পাখির ডিমের আবরণ শক্ত হয়, আর সরীসৃপের ডিমের আবরণ রবারের মতো নমনীয়। ব্যতিক্রম আছে, সে আমাদের অনেকেরই নিজের চোখে দেখা। ছোটবেলায় উঁচু বইয়ের তাকে মাঝেমাঝে দু-তিনটে টিকটিকির ডিম খুঁজে পেতাম। মটরদানার মতো ছোট্ট ধবধবে সাদা ডিম, ভারী সুন্দর দেখতে। কোনো কোনো ডিম আস্ত পেতাম, অনেকগুলো পেতাম ভাঙা। বাচ্চা টিকটিকি ডিম ফুটে বেরিয়ে শিকার খুঁজতে চলে গেছে। পড়ার টেবিলে কখনো কখনো সেই ইঞ্চিখানেক লম্বা খুদে টিকটিকিদের দেখা পাওয়া যেত, সিলিং থেকে খসে পড়ে আবার তাড়াতাড়ি দৌড়ে পালাত।


সবে জাতে-ওঠা সরীসৃপরা তো সেই যুগে তেমন কেউকেটা ছিল না। বড় বড় অ্যাম্ফিবিয়ানদেরই রাজত্ব তখন, যদিও কার্বনিফেরাস রেইনফরেস্ট কোলাপ্সে তারা একটা বড় ধাক্কা খেল। কিন্তু তাও, পার্মিয়ানেও শিকারী উভচর আর সরীসৃপদের দাপট পাশাপাশি চলেছিল। Prionosuchus বলে একরকম প্রাণী হত, জাতে সে উভচর হলেও চেহারায় অবিকল কুমীরের মতো ছিল। মাপে তিরিশ ফুট লম্বা হত, ওজন হত প্রায় দুই টন। এ হেন উপস্থিতির পাশে ওদিকে ছিল পেলিকোসর জাতের সরীসৃপরা। Dimetrodon নামে একরকম পেলিকোসর হত, তাদের পিঠের ওপর বড় পালের মতো পাখনা ছিল। এরাও কম বড় হত না, প্রায় পনেরো ফুট লম্বা আর আড়াইশো কেজি ওজন হত।

পার্মিয়ানের মাঝামাঝি এসে বিশেষ একদল সরীসৃপ উভচরদেরকে বেশ খানিকটা ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল, সুযোগ পেলে হয়তো এদের হাত ধরেই পৃথিবীতে সরীসৃপদের রাজত্ব কায়েম হত। এদের পোশাকি নাম Therapsid, জাতে পেলিকোসরেরই উত্তরপুরুষ। থেরাপসিডদের শরীরে এখন একটা লক্ষণ দেখা গেল, যা পেলিকোসরদের ছিল না। পেলিকোসরদের পা ছিল কুমীরের মতো - শরীরের পাশ দিয়ে বেরিয়ে কনুইয়ের কাছে ভেঙে মাটির দিকে নেমেছে। থেরাপসিডদের পা বেরোল সরাসরি শরীরের তলা থেকে, সোজা নেমে মাটি ছুঁল। এই ছোটো পার্থক্যটার দাম অনেক, থেরাপসিডদের এই পায়ের গঠন পরবর্তী আড়াইশো মিলিয়ন বছর পরেও সফলভাবে পৃথিবীতে টিকে থাকবে; কারণ, ছড়িয়ে থাকা চার পা নিয়ে কুমীরের মতো প্রাণীরা ডাঙায় হাঁটতে পারলেও দৌড়তে পারে না। কিন্তু থেরাপসিডের এই নতুন ধরনের পা নিয়ে দৌড়োনো যায়।



ট্রায়াসিকের শেষে এসে থেরাপসিডদের থেকেই জন্ম নিয়েছিল প্রথম স্তন্যপায়ী।



পার্মিয়ানের অন্তিমপর্ব সমাসন্ন, কিন্তু মেসোজয়িকের সিংহদুয়ার পেরোবার আগে অন্তত একটা প্রাথমিক পরিচয়পর্ব সেরে নেওয়া প্রয়োজন। প্রথম 'উন্নত উভচর' থেকে শুরু করে আজকের টিকটিকি পর্যন্ত যত সরীসৃপ, তাদের সবাইকে কয়েকটা ভাগে ভাগ করা যায়। এই ভাগটা করা হয় তাদের মাথার খুলির ভিত্তিতে।




(চলবে)
..................................................................

পুরানো সেই দিনের কথা (৪) - "চক্রবৎ পরিবর্তন্তে"

::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::

আমাদের পৃথিবীতে সব মিলিয়ে যতরকম গাছপালা আর পশুপাখি আছে, গুণে দেখা গেছে তার সংখ্যাটা প্রায় ৮.৭ মিলিয়ন। এত বড় এবং এত বিচিত্র এই প্রাণীজগৎ, যে গুছিয়ে তা নিয়ে ভাবা যায় না, সব প্রাণীকেই নতুন লাগে। তাই, জীববিজ্ঞানে এই সমস্ত প্রজাতিকে একভাবে ঢেলে সাজানো হয়েছে, একটা ছকে বেঁধে আলাদা আলাদা ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যাতে এতরকম জীবজন্তুর ভিড়ে আমাদের খেই হারিয়ে না যায়। ছকে বাঁধার পর পুরো ছবিটার মধ্যে একটা ছন্দ ধরা পড়ে। - ভুল বলা হল। আসলে বিজ্ঞানীরা ওই ছন্দ ধরে ধরেই তাঁদের এই ছকটা সাজান। মানুষ সহ সমস্ত জ্যান্ত জিনিস এই ছন্দে গাঁথা।

ছন্দ বলতে কীরকম?


দেখা যায়, প্রাণীদের সবার সাথে সবার একটা সম্পর্কের যোগ আছে। একটা আত্মীয়তা আছে। কখনো তা বহু দূরের, কখনো বা একেবারেই নিকট আত্মীয়তা। পুরো প্রাণীজগতকে ধাপে ধাপে বড় থেকে ছোটো ভাগে ভাগ করা যায়। এটা বিজ্ঞানের একটা মূল তত্ত্ব। সবাই সবার সাথে জড়িত, কেউ দূরে, কেউ কাছে, - কার সাথে কার কতটা মিল আর কতটা ফারাক, সেই ভিত্তিতেই জীববৈচিত্র্যের ছক আঁকেন বিজ্ঞানীরা।


ধরা যাক আমরা চিড়িয়াখানা বেড়াতে গেলাম। চিড়িয়াখানায় নানারকম পশু, নানারকম পাখি। কাঁচের ঘরে সাপ, বাঁধানো পুকুরে কুমীর, অ্যাকোয়ারিয়ামে মাছ। গাছের ডালে ঝুলে আছে ঝাঁকে ঝাঁকে বাদুড়। আর চারদিকে অজস্র সবুজ - ঘাস, ঝোপ, গাছ, গাছড়া। এই যে এতরকম কিছু, এদেরকে প্রথমেই আমরা 'দু'রকম' জিনিস বলে চিনতে পারি। একরকম হল গাছ; আরেকরকম হল পশুপাখি। খুবই সহজ, সাধারণ শ্রেণীবিভাগ - অন্তত এই স্তরে। এরপর লক্ষ্য করলে দেখব, চিড়িয়াখানার যত পশুপাখি তাদের সবার ক্ষেত্রে একটা বৈশিষ্ট্য common, - তাদের সবার একটা করে মাথা আছে। মাছ, সাপ, কুমীর, বাঘ, হাতি, পাখি, মানুষ - সবার মাথা আছে। তাহলে এদের সবাইকে একটা দল হিসেবে ধরা যায় - মাথাওয়ালা প্রাণী।

এবার এই সমস্ত মাথাওয়ালাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে, - কিছু কিছু প্রাণীদের হাত-পা আছে, আর বাকিদের তা নেই। যেমন স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে - মাছদের কারও হাত বা পা বলে কিছু নেই। মাছ বাদে বাকিদের তা আছে। - হ্যাঁ সাপেরও - সাপের পা ছিল; পরে লোপ পেয়েছে, অনেকটা আমাদের লেজের মতো। - কিন্তু মাছেরা কোনোকালেই পা-ওয়ালা ছিল না। তাই মাথাওয়ালাদের মধ্যে আবার ভাগ করলে, মাছ থাকবে একদিকে, আর বাকিরা থাকবে আরেকদিকে। এদেরকে বলা যাক মাথা এবং পা-ওয়ালার দল।


এবার দেখা যাবে পা-ওয়ালাদের মধ্যেও নানারকমের জীব রয়েছে। কারও কারও গায়ে পালক, তারা ডিম পাড়ে। কারও কারও গায়ে লোম, তারা বাচ্চা পাড়ে, সেই বাচ্চারা আবার মায়ের বুকে দুধ খায়। কেউ কেউ আবার ডিম পাড়ে, কিন্তু তাদের গায়ে পালক নেই। ডিম-পাড়িয়েদের মধ্যে আবার দেখা যাচ্ছে কেউ কেউ জলে ডিম পাড়ে, কেউ শুকনোয়। - এইভাবে এদেরকে ছোটো ছোটো ভাগে ভাগ করে ফেলা যায়। পালক + ডিম হলে তারা হবে পাখি; লোম + বাচ্চা + দুধ যদি হয় তবে সে স্তন্যপায়ী; ডিম কিন্তু পালক নেই - এমন হলে তারা সরীসৃপ; কিন্তু পাখি বা সরীসৃপ তো ডিম পাড়ে শুকনোয়, - ওদিকে যারা জলে ডিম পাড়ে আর ছানারা জলেই শৈশব কাটায়, - তারা হল উভচর, আমাদের সোনাব্যাঙ-কোলাব্যাঙের জ্ঞাতিগুষ্টি।

আর যদি স্তন্যপায়ীদের মধ্যে ঢুকে একটা ভাগ খুঁজে বার করি, - যাদের মাথা আছে, হাত-পা আছে, গায়ে লোম হয়, মায়ের দুধ খায়, আর দুই পায়ে সোজা হয়ে হাঁটে, তাহলে দেখব যে এদের নামই মানুষ।


এতটা অবধি যা দেখা গেল, তা তেমন কঠিন না। স্কুলে থাকতে একটা খেলা শিখেছিলাম - একধরনের guessing game, - খেলাটার নাম Twenty Questions। একজন মনে মনে কোনো একজন বিখ্যাত লোকের নাম ভাববে। এবার তার বন্ধুরা বের করার চেষ্টা করবে নামটা কী। তারা বন্ধুকে এমন ধরনের প্রশ্ন করবে যার উত্তর হ্যাঁ বা না-তে দেওয়া যায়। যেমন, 'লোকটা কি জীবিত?' - উত্তর এলো - না। এর পর প্রশ্ন হল, 'ভারতীয়?' - হ্যাঁ। 'বাঙালী?' - হ্যাঁ। 'সে কি কোনো বিজ্ঞানী?' - না। 'সাহিত্যিক?' - হ্যাঁ। 'তার কী লম্বা সাদা দাড়ি আছে?' - হ্যাঁ। - এতক্ষণে সবাই বুঝে ফেলেছে বন্ধুটির মনের গভীরে কোন্ বিখ্যাত ব্যক্তির নাম ডুবসাঁতার কাটছে। নিয়ম হল কুড়িটা প্রশ্নের মধ্যে বুঝে ফেলতে হবে কার কথা ভাবা হয়েছে। অনেকসময় গণ্ডগোল হত। 'সাহিত্যিক?' - হ্যাঁ। অতঃপর যত সাহিত্যিক আছে সবার নাম নিঃশেষ করে ফেলেও বোঝা গেল না লোকটা কে। তখন কেউ একজন হতাশ হয়ে জিজ্ঞেস করল - 'বিজ্ঞানী?' - জবাব এল - 'হ্যাঁ!!!' - শেষে উত্তর বেরোলো - জগদীশচন্দ্র বসু!

এই খেলাটা শুধু বিখ্যাত মানুষ নিয়ে নয়, পশুপাখি নিয়েও খেলা যেত। মনে মনে ভাবা জন্তুটা ডাঙায় থাকে কিনা, তার পালক আছে কিনা, সে মাংসাশী কিনা, হিংস্র কিনা, একা শিকার করে কিনা, গায়ে ডোরাকাটা দাগ আছে কিনা - এই সব প্রশ্ন ধরে ধরে সহজেই বোঝা যায় কোন্ পশুর কথা ভাবা হচ্ছে। এটাও প্রাণীজগতের ছন্দোবদ্ধ সজ্জার একটা উদাহরণ। সমস্ত প্রজাতি একসাথে একটা ছকে বাঁধা না থাকলে এই খেলা অসম্ভব হত।

তবে ভুলও কি হত না? চেহারার মিল-বেমিল ধরে পশুপাখিদের পরিচয় বের করে আনা যায় ঠিকই, কিন্তু কখনো কখনো এমন দেখা যায়, যে উপর-উপর কোনো একটা বৈশিষ্ট্য খুব প্রকট হলেও আসলে তার চরিত্র আলাদা। যেমন বাদুড়। বাদুড়ের ডানা আছে, কিন্তু 'ডানাওয়ালা' বলেই তাকে পাখি বলে ধরে নিলে ভুল হবে। আমরা জানি বাদুড় স্তন্যপায়ী - একমাত্র আকাশচারী স্তন্যপায়ী। সেরকম, কেউ যদি ক্লু-তে 'স্তন্যপায়ী' পেয়েই চারপেয়ে পশুদের কথা ভাবতে শুরু করে, তাহলে তিমির কথা আর তার মাথায় আসবে না। তিমির পা নেই, পাখনা আছে - সে সামুদ্রিক!



সাপের ক্ষেত্রেও এই জন্যেই আমাদের ধন্দ লেগেছিল। সাপের পা নেই - ঠিকই। যে ধরনের জীবনে সে অভ্যস্ত, তাতে পা লাগে না। বাইরে থেকে দেখলে তাই সাপ পা-ছাড়া। তবে ভালো করে খুঁজে দেখলে কিন্তু অন্যরকম কথা উঠে আসে।

অ্যানাকন্ডা, অজগর, এবং এদের জাতভাইয়েরা - সাপেদের মধ্যে অতিকায় বলে বিখ্যাত। অজগর - আমাদের আশৈশব পরিচিত সাপ, পৃথিবীর দীর্ঘতম সাপ। আমাদের দেশে Reticulated Python বলে একধরনের অজগর আছে, ভারত সহ সারা দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় এর দেখা পাওয়া যায়। একে লম্বায় ৬.৯৫ মিটার অবধি হতে দেখা গেছে। দৈর্ঘ্যের বিচারে একে আর কোনো সাপ টপকাতে পারে না। দক্ষিণ আমেরিকার অ্যামাজন অরণ্যের সাপ অ্যানাকন্ডা, এরা পৃথিবীর বৃহত্তম সাপ - আকারে এবং ওজনে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় জাতের যারা, সেই Green Anaconda-র শরীরের ব্যাস হয় প্রায় 30 cm - মানে পাক্কা এক ফুট। ওজন হয় ২২৭ কেজি। আর লম্বায় যদিও এমনিতে হয় মিটার ছয়েক, - কিন্তু আজ অবধি সবচেয়ে বড় যে গ্রীন অ্যানাকন্ডা পাওয়া গেছে, সে দৈর্ঘ্যে অজগরকেও অনায়াসে টেক্কা দেয় - ৮.৮ মিটার।

একটা অজগরকে চিত করে শুইয়ে যদি ভালোভাবে লক্ষ্য করা যায়, তাহলে দেখা যাবে, তার লেজের কাছে, তলার দিকে - দুটো ছোটো ছোটো কাঁটার মতো রয়েছে, অনেকটা যেন ছোটো শিঙের মতো। লেজের কাছে পেটের দু'পাশ থেকে সে দুটো বেরিয়েছে, বেরিয়ে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। এই ছোটো ছোটো জিনিসগুলো আসলে অজগরের পেছনের পা। পা আর নেই, চিহ্নটুকু টিকে আছে। অ্যানাকন্ডারও এরকম দেখা যায়, পেটের তলায় ছোটো ছোটো কাঁটার মতো দুই পা জেগে থাকে। এই পা আর চলাফেরার কাজে লাগে না, স্মৃতিচিহ্ন হয়েই থেকে গেছে একরকম। বড় জাতের সাপদের অনেকের মধ্যেই এই 'পা' দেখা যায়।


সুতরাং সাপ সত্যিসত্যিই 'পা-ছাড়া' প্রাণী নয়। অজগরপ্রতিমরা তার সাক্ষী। একসময় সাপের পা ছিল, তা সে হারিয়েছে - তাই বরং তাকে 'পা-হারা' বলা যেতে পারে। কিন্তু মাছ কোনোকালেই পা-ওয়ালা নয়, ডাঙার পয়দল জীবনযাত্রা তার কাছে অলীক।

তলিয়ে দেখলে এইধরনের ভুল হবার সম্ভাবনা অনেকটাই কেটে যায়। বুকে-হাঁটা সাপ কানকোর বদলে ফুসফুসের সাহায্যে শরীরে অক্সিজেন ভরে নেয়, ডানাওয়ালা বাদুড় তার লোমশ শরীরের পরিচয়ে সহজেই ধরা পড়ে, সামুদ্রিক তিমি নিঃশ্বাসের সাথে জলের ফোয়ারা ছুটিয়ে তার সঠিক পরিচয়ের জানান দেয়। পোকামাকড়-মাছ-উভচর-সরীসৃপ-পাখি-স্তন্যপায়ী, - এই চেনা ছকে আমরা মোটামুটি সবাইকেই এনে ফেলতে পারি।




তাই, এতদূর অবধি ব্যাপারটা তেমন কঠিন নয়। কঠিন হয় তখনই, যখন খেয়াল করি যে আমাদের সুপরিচিত প্রাণীদের বাইরেও বহু বহু রকম জীবজন্তু এই পৃথিবীতে বেঁচে আছে। তাদের সবাইকে অত সহজে পরিচিত ভাগগুলোর মধ্যে ফেলে দেওয়া যায় না। আর সেই সাথে এটাও আমাদের মনে পড়ে যায়, যে আমাদের চোখের সামনেকার এই বর্তমান কালের অনেক আগে থেকে, - বিগত চল্লিশ কোটি বছর ধরে এই গ্রহে প্রাণের উপস্থিতি রয়েছে। হাজার হাজার এমন প্রাণীরা পৃথিবীতে ছিল, যারা আমাদের সমসাময়িক কোনো ভাগের আওতাতেই পড়ে না। - আর এই অধুনা অনুপস্থিত প্রাণীদের সম্পর্কে আমরা প্রায় কিছুই জানি না। মাঝে মাঝে শুধু সামান্য চিহ্ন খুঁজে পাই, একটুখানি পায়ের দাগ, এক চিলতে গায়ের আঁশ, এক টুকরো ছোটো ফসিল। খুব ভাগ্য থাকলে হয়তো একটা পূর্ণাঙ্গ কঙ্কাল। এক একটা আবিষ্কারে নতুন নতুন তথ্য জানা যায়, ছকের একেকটা অংশ ঢেলে সাজানোর কথা ভাবতে হয়। বিজ্ঞানের এই মহলে সবসময়েই মতানৈক্য, সবসময়েই বাগ্‌বিতণ্ডা চলেছে - কেউ বলেন অমুকভাবে সাজাও, কেউ বলেন তমুকভাবে। কেউই কারোর কথা পুরোপুরি কাটতে পারেন না, কারণ পুরো ছবিটা কেমন হবে সে সম্পর্কে সবাইই - 'আমি যে তিমিরে, তুমি সে তিমিরে'। এ যেন এক বিরাট জিগ্-স পাজল সল্‌ভ করতে বসেছেন বিজ্ঞানীরা, কেবল মুশকিল হল পাজলের টুকরোগুলোর অর্ধেকই হারিয়ে গেছে।

তবুও, হাজার হোক বিজ্ঞান এক self-correcting, self-nourishing, ever-expanding বিদ্যা। অসম্পূর্ণতাই তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তাই আমাদের হাতে অন্তত একটা অসম্পূর্ণ ছবি গবেষকরা তুলে দিয়েছেন। নতুন কোনো টুকরোর হদিস পেলেই পরিমার্জন, পরিবর্ধন চলছে। অনেক জায়গা আবছা, ছোটো ছোটো সূত্র ধরে একটা অস্পষ্ট রূপরেখা আমাদের সামনে ফুটে উঠছে। তাই ভেজা-ডিম জলজ উভচরদের থেকে শুকনো-ডিম স্থলজ চারপেয়েদের বংশপঞ্জী এবং বৈশিষ্ট্য যদি খুঁজে দেখতে যাই, তাহলে ঝকঝকে পরিষ্কার ধারণার চেয়ে ছোপ-ছোপ ধারণা পাবার সম্ভাবনাই বেশী। আর সেই শতছিন্ন রোডম্যাপ ধরেই আমাদের এই গাইডেড ট্যুর।




খুলির কথা বলছিলাম।



খুলি বলতে আমরা বোঝাই কঙ্কালের মাথার অংশটা, যার মধ্যে মগজ আর চোখ, কান, নাক, জিভ – এই চারটে জ্ঞানেন্দ্রিয় সুরক্ষিত থাকে। খুলির ওপরদিকে দু'খানা বড় গর্ত, সেই কোটরে বসানো থাকে দুই চোখ। ভালো বাংলায় একে বলে অক্ষিকোটর। এই অক্ষিকোটরের পেছনে খুলির গায়ে একটা অংশ থাকে, তার নাম temporal fenestra। দেখতে ছোট ফুটোর মতো, দু’চোখের পিছনে একটা করে। এই ফুটোর সূত্র ধরে - কচ্ছপ, কুমীর, ডাইনোসর, পাখি, স্তন্যপায়ী - সবার মাথার খুলি যদি তুলনা করে দেখি, - তাহলে তাদেরকে কয়েকটা নির্দিষ্ট ধরনে ভাগ করা যায়।

কচ্ছপের মাথার খুলি যদি নিই, দেখব তার চোখের কোটরের পেছনে কোনোধরনের কোনো ফুটো নেই। একটানা হাড়ের পাত সাজানো রয়েছে, চোখ ছাড়া আর কোনো গর্ত দেখা যাচ্ছে না। এইধরনের খুলি যাদের, তাদেরকে বলে Anapsid।

কিছু খুলিতে অন্যরকম ব্যাপার। অক্ষিকোটরের পেছনে একটা করে ফুটো দেখা যাচ্ছে। দু'পাশ মিলে দুটো। এই জাতের প্রাণীদের বলা হল Synapsid।

তৃতীয় আরেকরকম খুলি দেখা যাবে, যাদের চোখের পেছনে একটা নয়, দু'টো করে ফুটো রয়েছে। একটার নীচে আরেকটা। এরকম দুই ফুটো যাদের, তাদের নাম দেওয়া হয়েছে Diapsid।


অ্যানাপসিড, সাইনাপসিড, ডায়াপসিড = নেই-ফুটো, এক-ফুটো, দুই-ফুটো। এতদূর হল। কিন্তু এই তিন ধরনের উদাহরণ কারা কারা? জীবজন্তুদের মধ্যে কে এখানে কোন্ ভাগে পড়ছে?

অ্যানাপসিডদের মধ্যে রয়েছে সবরকম কচ্ছপ আর কাছিম। পিঠে-বুকে শক্ত খোলাওয়ালা সরীসৃপ এরা, এদের সবাই এই দলে পড়ে।

সাইনাপসিডদের মধ্যে যারা পড়ে, তারা আজকে একটা রূপেই বেঁচে আছে। স্তন্যপায়ী। আমাদের দূর পূর্বপুরুষরাও এই দলে পড়ত, আজ থেকে প্রায় এক কোটি বছর আগে সেই অ-স্তন্যপায়ী সাইনাপসিডদের শেষ শাখা পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়।

ডায়াপসিডদের মধ্যে পড়ে কুমীর, ডাইনোসর, পাখি, সাপ, গিরগিটি - এরা সবাই।


কিন্তু প্রাণ তো নতুন নতুন রূপ নেয় বিবর্তনের প্রভাবে, প্রকৃতির তাই নিয়ম। তাহলে এই তিন ধরনের প্রাণীরা বিবর্তনের ধারায় কে কার থেকে উঠে এলো? - শ্রেণীবিভাজন করতে গেলে এই প্রশ্নের জবাব আমাদের দিতেই হবে।

ডাঙার জীবনে উভচরদের প্রধান সীমাবদ্ধতা ছিল তাদের জলে ডিম পাড়ার অভ্যেস। উভচরদের জীবনে শৈশবটুকু কাটে জলে, এই অবস্থায় তাদের বলে লার্ভা। আমাদের জলায় ডোবায় পুকুরে ব্যাঙের লার্ভা সহজেই দেখতে পাই, বদ্ধ ড্রেনের জলে বা বাগানের খোলা চৌবাচ্চাতেও ছোটো ছোটো গোলমাথা ল্যাজওয়ালা ব্যাঙাচির ঝাঁক দেখা যায়। এইসময় এদের পা থাকে না, এরা লেজ দিয়ে সাঁতার কাটে, মাছের মতো ফুলকো দিয়ে শ্বাস নেয়। বড় হলে ব্যাঙাচির লেজ ছোটো হয়ে মিলিয়ে যায়, সামনে পিছনে পা গজায়, লার্ভা থেকে সে পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। সব উভচরের ক্ষেত্রেই এরকম হয়, প্রাগৈতিহাসিক আমলেও তাই হত। জন্ম জলে, শৈশব জলে, - সাবালক হলে ডাঙায় উঠে আসা। এবং অবধারিতভাবেই - নিজেরা ডিম পাড়ার সময়ে আবার জলে ফিরে যাওয়া।

এরকমটা হবার কারণ হল, প্রাণের বৃদ্ধির জন্য আর্দ্রতা আবশ্যিক। তা না থাকলে ডিমের ভিতর ভ্রূণ বাড়তে পারবে না। উভচরদের ডিমে শক্ত খোলা বলে কিছু নেই, ডাঙায় সে ডিম তুললে তা দেখতে দেখতে শুকিয়ে যাবে, ভ্রূণ মারা পড়বে। এইধরনের ডিম স্থলে পাড়ার প্রশ্নই ওঠে না। তাই উভচররা জলে ডিম পাড়ে। সেখানে তা প্রয়োজনীয় পরিবেশ পায়, শুকিয়ে যাওয়ার কোনো ভয় থাকে না। বাচ্চারাও জলেই জন্মায়, ধীরে ধীরে ডাঙার উপযুক্ত হয়ে ওঠে।


উভচরদের এই দুর্বলতা যারা প্রথম কাটিয়ে উঠল, তাদের নাম amniote। জলের প্রয়োজন আর রইল না, এরা এমন ডিম তৈরী করল, যা ডাঙায় শুকিয়ে যাবে না, - শক্ত খোলার আড়ালে যা ভিতরকার ভ্রূণকে অক্ষত রাখতে পারবে। এই প্রথম অ্যামনিওটদের আমরা সরীসৃপ বলেই ধরি, প্রকৃতপক্ষে যদিও 'আসল' সরীসৃপদের সাথে এদের অনেক তফাৎ। কিন্তু শর্টহ্যাণ্ডের খাতিরে আমরা এটুকু আপোষ করে নিই। প্রাথমিক অ্যামনিওটদের দেখতেও অনেকটা টিকটিকির মতোই হত, তাছাড়া নিয়মমতো সরীসৃপ, পাখি, স্তন্যপায়ী - এরাও সবাই অ্যামনিওটের মধ্যেই পড়ে। "অ্যামনিওটদের থেকে এরা সবাই এসেছে", আর "অ্যামনিওটদের মধ্যে এরা সবাই পড়ে" - এই দুটোই ঠিক, - দুটোই একই তত্ত্বের কথা বলে। অ্যামনিওট একটা প্রাথমিক দশা - তার থেকে ধীরে ধীরে নানারকম স্পেশালাইজেশন হয়েছিল।



আকাশের মেঘ আর কাটছে না, সারারাত বৃষ্টি হয়েছে, সকালেও বিরাম নেই। মাঠে জল জমেছে, ঘাস ডুবে গেছে। ঝোপঝাড় সব আধডোবা। ক্ষেতজমি সব জলের তলায়, ঘোলারঙা সমুদ্র। পাখিরা বোধহয় গত কয়েকদিন গায়ের পালক শুকাতে পায়নি। তবে বর্ষাকালে সবদিকেই প্রাচুর্য, এদিকে যেমন নতুন গাছ, ঘাস আর শ্যাওলার ভিড়, তেমন পোকামাকড় ব্যাঙ সাপেদেরও উৎসব। প্রাণের উদ্বোধন। A grand banquet. সবাই উপস্থিত, কেউ খাবার খেতে, কেউ খাবার হিসেবে, বেশীরভাগই দুইই। নিজের শরীরের জোগান করতে করতে পরের মেনু সাজানো। এর নাম ফুড ওয়েব, কার্বন সাইক্‌ল, কনজারভেশন অফ মাস অ্যাণ্ড এনার্জি। নিজের জন্যে কে কী রাখবে? প্রকৃতি যেন এক লাইব্রেরিয়ান, তার থেকে জিনিস নেওয়া সব ধারে। মেয়াদ ফুরোলে বই ফেরত দিতে হবে, - সেই বই আবার অন্যে নিয়ে যাবে।



ভিজতে ভিজতে উড়ে এসে বসল পালক-ভেজা উস্কোখুস্কো বক। বক মাঠে কেন? - জল জমেছে যে। ভরা বর্ষায় কীই বা মাঠ আর কীই বা পুকুর। জল পেয়ে দলে দলে পোকা উঠছে। ঘাসফড়িং, উচ্চিংড়ে, ঝিঁঝি। মানুষের বাড়িতে অভিযান চালাচ্ছে মশা, বাদলাপোকা। ভেজা সবুজ পাতা বেয়ে শামুকের শম্বুকগতি। এই সবের উৎপত্তি ওইখানে – জল মাটি ঘাস ঝোপের মেটার্নিটি ওয়ার্ড। ইউরোপের রূপকথায় আছে, ছোটো ছোটো বাচ্চারা সবাই তৈয়ার হয় মেঘের মুল্লুকে, সারস পাখিরা সেই বাচ্চাদের বাবা-মায়ের কাছে দিয়ে যায়। এই বক কিন্তু এখানে বাচ্চা পৌঁছে দিতে আসেনি। আপাতত পেট ভরানোই তার উদ্দেশ্য।



কোথা থেকে উড়ে এল মাছরাঙা, ঝপাৎ করে জলে ঝাপটা মেরে কী যেন তুলে নিয়ে গেল! কী ধরলি রে ভাই, ব্যাঙ না গঙ্গাফড়িং? ব্যাঙকে যখন সাপ বা পাখিতে ধরে খায়, তখন ব্যাঙ তাদের কথা শোনাতে পারে না? – বড় যে আমায় ধরে খাচ্ছিস। আমরা না থাকলে তোরা আসতিস কোথা থেকে, জানিস পাখির আগে পৃথিবীতে এসেছিল উভচর! – বা সেই যমের দোসর কেরানিপাখি। যদি আফ্রিকার গোখরো তাকে উল্টে বলে, ব্যাটা ছোটো হয়ে দাদাগিরি করছিস। আগে সরীসৃপ, পরে পাখি, তা জানিস। স্তন্যপায়ীরা তো পাত্তাই পাবে না, ছোটোর ছোটো তস্য ছোটো। আমরা যখন ট্রায়াসিক দাপিয়ে বেড়াচ্ছি তখন তোরা কোথায় ছিলিস!



ব্যাঙ বা গোখরো কোনোদিন কাউকে এরকম বলেছে বলে খবর নেই। যদি বলত তাহলে তার জবাবও পেত। একালের প্রাণী আর সেকালের প্রাণীরা চরিত্রে এক নয়। কেউ কেউ কোটি কোটি বছর ধরে একইরকম থেকে গেছে ঠিকই, কিন্তু বেশীরভাগই এসেছে নানারকম রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে। আজকের প্রাণীদের মধ্যে এক এক দলকে আমরা এক এক নাম দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছি – কিন্তু এরা এই চেহারায় এসেছে ধাপে ধাপে। পাখির আগে সরীসৃপ, স্তন্যপায়ীর আগে সরীসৃপ – এমনটা নয়। কার্বনিফেরাসের সেই যে জীব, যে গোখরো, কেরানিপাখি, নেউল – সবারই পূর্বপুরুষ, সে নিজে এদের তিনজনের কারো দলেই পড়ত না। আজকের দিনে যারা সরীসৃপ, তাদের সাথে তার অনেক পার্থক্য আছে। যেমন পার্থক্য আছে আজকের পাখি বা স্তন্যপায়ীর সাথে। সে আমাদের সবার common ancestor, কিন্তু তাই বলে সে আমাদের মধ্যেকার কেউ নয়। তার থেকে যেমন একদিকে ভবিষ্যতের সরীসৃপরা উদ্ভুত হয়েছে, তেমন অন্যদিকে পেলিকোসর-থেরাপসিড লাইন বেয়ে এসেছে স্তন্যপায়ী। কোনো শাখা আবার বেরিয়ে গেছে কাছিমদের নিয়ে। কোনো দিকে ডাইনোসরদের থেকে উঠে এসেছে পাখিরা। তার নিজের মধ্যে সবার সম্ভাবনাই নিহিত ছিল। সময়ের গতিতে তার প্রকাশ হয়েছে, প্রসার হয়েছে, শাখাপ্রশাখায় ভাগ হয়েছে। মাধ্যমিকের সিলেবাসে যেমন সব বিষয়ই অল্প অল্প থাকে। ব্যাচের সবাইকেই পড়তে হয় বাংলা ইংরেজী অঙ্ক বিজ্ঞান ভূগোল ইতিহাস। পরে তাদের মধ্যে থেকেই কেউ ডাক্তার, কেউ গণিতবিদ, কেউ সাহিত্যিক, কেউ ঐতিহাসিক। আবার দেখা যায় কয়েকজন ইংরেজী নিয়ে অনার্স করল, তারপর কেউ গেল ফিল্মমেকিং শিখতে, কেউ গেল জার্নালিজম পড়তে, কেউ সব ছেড়ে ম্যানেজমেন্ট ধরল। কেউ ইংরেজী নিয়েই এগোল। - এবার জার্নালিজমের ছাত্রকে ইতিহাসের ছাত্র বলতে পারে না, যে তুই আনকোরা নতুন, আমি তোর আগে থেকে নিজের সাবজেক্ট নিয়ে পড়ছি। - কারণ স্পেশালাইজেশন এসেছে অনেক পরে। একটা সময় অবধি সবারই একই পড়া ছিল, ভিতটায় সবারই এক গাঁথুনি। সাংবাদিকের চেতনাতেও ইতিহাসশিক্ষা রয়েছে, - তবে তা সেই মাধ্যমিকের ইতিহাস, - ঐতিহাসিকের স্পেশালাইজড ইতিহাস নয়।

ডারউইনের তত্ত্বের অপব্যাখ্যা করে একটা লোক-ঠকানো প্রশ্ন প্রায়ই করা হয় - "বাঁদর থেকে যদি মানুষ হয়ে থাকে তাহলে বাঁদররা এখনও টিকে আছে কেন!" বিবর্তনবাদী এ হেন প্রশ্ন শুনে 'ফেসপাম' দেন। "ওরে ছোঁড়া, বানর থেকে মানুষ এসেছে এমন নয় - বানর আর মানুষ দুইই এক সাধারণ পূর্বপুরুষের থেকে উঠে এসেছে - এই কথা বলতে চাওয়া হচ্ছে! তোর আফ্রিকার সিলভারব্যাক গরিলা একরাতে ভোল বদলে মানুষ হয়ে বেরিয়ে আসেনি।" বায়োলজির evolution তো আর হগওয়ার্টসের transfiguration নয়। একই প্রাণশক্তি নতুনতর প্রসাধনে নতুন প্রজাতি হয়ে দেখা দেয় - ডারউইনের ভাষায় 'the origin of species'। আর সেই প্রসাধন আর অঙ্গসজ্জার ড্রেসিংরুম হল ডি এন এ-র ডাব্‌ল হেলিক্স। একেক কম্বিনেশনে একেক নকশার ইঙ্গিত। অ্যালফাবেটের ২৬টা বর্ণ ব্যবহার করেই 'Hamlet' থেকে 'War and Peace' - সব লেখা হয়েছে; আর ডি এন এ স্ট্র্যান্ডে ৪ + ১ + ১ =৬টা অক্ষর সাজিয়ে সাজিয়ে তৈরী হয়েছে লেডিবার্ড থেকে রেডউড - ছোটো বড়ো সব প্রাণীর ব্লু প্রিন্ট। যার ওপর নির্ভর করে নতুন প্রাণীদেহ গেঁথে তোলা হবে। একেকরকম বাড়ির একেকরকম ব্লুপ্রিন্ট - কিন্তু তৈরী করার সময় শুরুটা সবারই মোটামুটি একরকম। ভিত হবার পর দেওয়াল-ছাদ হয়ে বাড়ি শেষ হবার দিকে এগোতে এগোতে বোঝা যায় - বাংলো উঠল না অ্যাপার্টমেন্ট, তার স্টাইলটা সাবেকী না অত্যাধুনিক এক্সপেরিমেন্টাল।

হান্স লারসন যে মুরগীর ভ্রূণে সরীসৃপের লক্ষণ দেখেছিলেন, ম্যাট হ্যারিস আর জন ফ্যালন যে মুরগীছানার ঠোঁটে ডাইনোসরের মতো দাঁত জাগাতে পেরেছিলেন, - তা সম্ভব হয়েছিল এই জন্যেই। সব সম্ভাবনার বীজ সবার মধ্যে লুকিয়ে আছে। সময়ের সাথে সাথে কিছু লক্ষণ চাপা পড়ে যায়, অন্য কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য বাকিদের ছাপিয়ে প্রকট হয়ে ওঠে। সেই প্রকট বৈশিষ্ট্যের ওপরেই নির্ভর করে – নবজাতক কোন্ জাতের প্রাণী।

উভচরদের মধ্যে যারা জলে ডিম পাড়ার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠল, তাদের নতুন নাম হল অ্যামনিওট। এবারে অ্যামনিওটদের ভেতর থেকে একদল আবার নতুন ধরনের উন্নতি করল। সাইনাপসিডদের কথাই বলছি। তাদের করোটিতে চোখের পিছনদিকে বিশেষ রকম ফুটো দেখা দিল, যার পোশাকী নাম temporal fenestra। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বদল এল তাদের দুই পাটি দাঁতে। এদের মধ্যে প্রথম দাঁতের প্রকারভেদ দেখা গেল। কুমীর বা হাঙরের মুখ দেখলে দেখা যায়, ওদের অনেক দাঁত, কিন্তু সব দাঁতই একরকম। কিন্তু আমরা জানি আমাদের দাঁত চাররকম, তাদের কাজও আলাদা আলাদা – সামনের দাঁত দিয়ে খাবার কাটা যায় আর ছেঁড়া যায়, পিছনের দাঁত দিয়ে সেই খাবার চিবোনো যায়। বাঘ, সিংহ, হাতি, ঘোড়া - সবার মুখেই তাই। - এই যে দাঁতের বিভিন্নতা, এটা প্রথম এলো সাইনাপসিডদের মধ্যে।



সাইনাপসিডদের মধ্যে ছিল পার্মিয়ান যুগের পেলিকোসররা, যাদের পিঠে বড় পালের মতো পাখনা ছিল। এই পাখনা দিয়ে তারা বোধহয় শরীরের তাপমান নিয়ন্ত্রণ করত। পাখনার আকার বেশ বড় হত – শরীরের উপরিতলের ক্ষেত্রফল বেশ কিছুটা বাড়ত তার দরুণ। রোদের দিকে সেই পাখনা ফিরিয়ে বসলে তাড়াতাড়ি গরম হওয়া যেত; আবার ছায়ায় চলে গেলে তাপ কমেও যেত তাড়াতাড়ি। সুবিধে ঠিকই; কিন্তু বিবর্তনের তো কোনো শেষ নেই। পেলিকোসরদেরও সীমাবদ্ধতা ছিল। তাদের ভারী চেহারা, গিরগিটির মতো পায়ের গঠন – শরীরের দু’পাশ থেকে সামনে-পেছনে দু’টো করে পা বেরিয়েছে, তারপর নব্বই ডিগ্রীতে ভেঙে নীচের দিকে এসে মাটি ছুঁয়েছে। এই নব্বই ডিগ্রীটাই প্রথম ‘কনুই’। বা ‘হাঁটু’। – কিন্তু এই ধরনের পায়ে তো দৌড়োনো চলে না, যদিও তাড়াতাড়ি হাঁটা যায় ঠিকই। ডাঙার উপরে কুমীরের ‘দৌড়’ - মাঝেমাঝে ওয়াইল্ডলাইফ ডকুমেন্টারীতে দেখা যায়, সেই জিনিস দেখলে বোঝা যায় অসুবিধাটা কোথায়; সবসময় মাটিতে পায়ের ঠেকনা রেখে এগোতে হচ্ছে, শরীরকে উৎক্ষিপ্ত করা যাচ্ছে না। ছুটতে গেলে যেভাবে দুই পদক্ষেপের মাঝে খণ্ডমুহূর্তের জন্যে শূন্যে ভেসে থাকতে হয়, কুমীরের পক্ষে তা সম্ভব নয়। পেলিকোসরদের পক্ষেও ছিল না। তাই পেলিকোসরদের একটা শাখা তাদের পায়ের গঠন বদলে ফেলল। পাশের দিক থেকে সরে এসে তাদের পা বেরোল সরাসরি শরীরের তলার দিক থেকে। এরাই থেরাপসিড, পেলিকোসরদের তুলনায় আধুনিকতর সাইনাপসিড প্রাণী।

পার্মিয়ানের শেষ অবধি এদের সুখের সময় চলেছিল, তারপরে ডাইনোসরদের যুগ এলো। ডাইনোসরের রাজত্বে এরা বামন হয়ে থেকে গেল, অট্টালিকাপ্রমাণ ডায়াপসিডদের ছায়ায় কোনোরকমে টিকে রইল। থেরাপসিডদের মাত্র দুটো শাখা এই দুঃসময়ে চালিয়ে নিতে পেরেছিল, - এক দল cycodont, আর এক দল dicycodont। ডাইসাইকোডন্টরা কিছুদিন থেকে তারপর বিদায় নিল। সাইকোডন্টরাও তার পরে খুব বেশীদিন থাকল না, ক্রীটাশিয়াসের শুরুর দিকেই সবাই প্রায় শেষ হয়ে এল; শুধুমাত্র একটা শাখা দাঁত কামড়ে রয়ে গেল রঙ্গমঞ্চে। তারা হারিয়ে গেল না, লোপ পেল না, বিলুপ্তি তাদের ভবিতব্য নয়; ক্রীটাশিয়াসের শেষে যখন ডাইনোসররা চলে যাবে, তখনও তারা পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে। এরাই স্তন্যপায়ী। ডাইনোসরদের পরে পৃথিবীতে সবচেয়ে উঁচু জায়গা নেবে তারাই।


এদিকে সবুজের দুনিয়ায় এক নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটে গেছে। ডাঙায় ওঠার পর গাছেরা কাণ্ড আর পাতা আগেই অর্জন করেছিল, এবারে তাদের মধ্যে দেখা দিল সেই অপ্রতিম সৃষ্টি - বীজ।


ডেভোনিয়ানের মাঝামাঝি সময়কার একরকম গাছের ফসিল পাওয়া যায়, তার নাম Runcaria। এটি বীজধারী গাছের এক প্রাচীন পূর্বপুরুষ। বীজের দেখা ভালোভাবে পাওয়া গেল এর কয়েক মিলিয়ন বছর পরে, কার্বনিফেরাস পর্যায়ের দ্বিতীয়ার্ধে।

বীজের আবির্ভাব গাছপালার ইতিহাসে এক অসাধারণ ঘটনা। ঠিক কেন, কীভাবে এ জিনিস তৈরী হয়েছিল, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা আছে। বিরল এক জীনগত আপতনের ফলে সম্ভবত প্রথম বীজের সৃষ্টি হয়। ঠিক এইরকম জীনগত দৈবযোগ উদ্ভিদের ইতিহাসে আরো একবার এসেছিল এর পরে, - সেও আর এক আশ্চর্যের জন্মকাহিনী। কিন্তু আগে বীজ। যেসব গাছ বীজ পেল, তাদের জন্যে জীবন অনেক সহজ হয়ে গেল এক ধাক্কায়। প্রথমত, বীজ মানেই আবরক। শিশু উদ্ভিদ তার জীবনের প্রথম দশায় একেবারেই নিঃসম্বল অসহায়, ছোট্ট ভ্রূণ মাত্র। তার জন্যে বর্ম হয়ে দাঁড়াল বীজ। বাইরের রোদ হাওয়ায় আর ভ্রূণ নষ্ট হবার ভয় থাকল না। জলাভূমির ওপর নির্ভরতা কমল। আর বীজে আশ্রিত ভ্রূণ সহজেই গাছ থেকে পড়ে দূরে ছড়িয়ে যেতে পারে, শক্ত খোলা তাকে নিরাপত্তা দেয়। সবচেয়ে বড় কথা, বীজ মানে এক দুর্ভেদ্য ক্যাপসুল, যার মধ্যে গাছের ভ্রূণ দীর্ঘদিন সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। একে ইংরেজীতে বলে dormant state, - এই সুপ্তির সময় জীবনচক্রের গতি স্থগিত থাকে। শিশু গাছের বাড় থেমে যায়। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে আবার খোলসের ভিতর প্রাণের ঘুম ভাঙে, বীজ ফাটিয়ে তা থেকে সবুজ অঙ্কুর মাথা তোলে।


এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম - এই পাড়ির মাঝপথে এই যে বিরাম, এর গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের জীবনচর্যার সাথে গাছের জীবনের পার্থক্য অনেক, এই বিরতি তার এক অনন্য নজির। নবজাত গাছ পৃথিবীতে জন্ম নিয়েই তার জীবন শুরু করে না। মায়ের শরীর থেকে পাওয়া সামান্য রসদ সম্বল করে, বীজের ভিতর সে গুটিয়ে ঘুমিয়ে থাকে - জীব থেকে জড়বৎ হয়ে যায়। এই অবস্থায় তার জল লাগে না, বাতাস লাগে না, উত্তাপ লাগে না। যতক্ষণ তার বর্ম অটুট থাকবে, যতদিন তার জীবনীশক্তি বজায় থাকবে, ততদিন সে বিনা সহায়ে প্রাণের সম্ভাবনা বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে থাকবে। যেদিন উপযুক্ত সময় আসবে, যেদিন বীজ তার প্রয়োজনীয় জল, বাতাস, উষ্ণতা খুঁজে পাবে, সেদিন এই গাছের ঘুম ভাঙবে। তার আগে নয়। তার আগে অবধি সে স্থির, অচঞ্চল, পাথর।


মরু অঞ্চলে একধরনের গাছ হয়, তাদের ডাকনাম tumbleweed। টাম্বলউইড কোনো প্রজাতিগত নাম নয়, বেশ কয়েক রকম গাছ এর মধ্যে পড়ে। সিনেমায় দেখা আমেরিকার "ওয়াইল্ড ওয়েস্ট" অঞ্চলে, যেখানে ধূ ধূ শুকনো পাথুরে উপত্যকায় নদীর জল বইতে বইতে শুকিয়ে যায়, ক্যাকটাস-প্রসূ বালির রাজ্যে শুধু র‍্যাট্‌লস্নেক আর শিংওয়ালা মরুভূমির গিরগিটিরা ঘুরে বেড়ায়, আর কোমরে-কার্তুজ হলস্টারে-পিস্তল নিয়ে বেপরোয়া কাউবয়রা ধূলো উড়িয়ে সূর্যাস্তের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দেয়, - সেই দেশে এই গাছ দেখা যায়। শুধু আমেরিকা নয়, আফ্রিকা আর এশিয়ার মরুভূমিতেও এরা থাকে। ছোটো ঝোপড়ার মতো দেখতে, জল পেলে গাছে ঝাঁক ধরে ফুল আসে। তারপর একসময় সে ফুল শুকায়। গাছ শুকায়। সূর্যের কিরণে সারা শরীরের সব রসকষ শুষে যায়। শুকিয়ে গিয়ে গাছের সারা শরীরটা কুঁকড়ে গোল হয়ে আসে। মাটি থেকে শিকড় আলগা হয়ে যায়। শুধু একটি মাত্র জিনিস তার মৃত শরীরে প্রাণের অস্তিত্ব ধরে রাখে। তার শুকোনো ফুলের বিদায়ের দান। বীজ। এই বীজের ভার নিয়ে এবার টাম্বলউইড চলতে শুরু করে।


বাতাসের ধাক্কায় গাছের শুকনো শরীরটা শিকড়ের জায়গা থেকে ছিট্‌কে পড়ে। ছিটকে পড়ে গড়াতে আরম্ভ করে। বাতাসের তোড়ে গড়াতে গড়াতে এগিয়ে যায়। মরুভূমিতে ধূলোর ঝড় ওঠে - সেই ঝড়ের জোরে মরা গাছ মাইলের পর মাইল বালি পেরিয়ে চলে। আর চলার সাথে সাথে সে ছড়িয়ে চলে তার বীজ। অথবা বিকল্প ব্যবস্থা। চলতে চলতে একসময় টাম্বলউইড এসে থামে কোনো ভেজা জায়গায়। যেখানে জল আছে। জীবনের মূল শর্তের জোগান আছে। এবার এই জল শুষে নিয়ে টাম্বলউইডের শুকনো শরীর ফেঁপে উঠে ফেটে যায়। বীজ ছড়িয়ে পড়ে তার ভেতর থেকে। মাটিতে পড়ে তারা নতুন গাছের জন্ম দেয়।

এক প্রজন্মের অবসান এখানে পরবর্তী প্রজন্মের বাঁচার প্রধান উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। টাম্বলউইডের শুকিয়ে যাওয়া নেহাত নির্লিপ্ত মৃত্যুবরণ নয়, তার ওই শরীরই হয়ে উঠবে তার সন্তানদের প্রথম বাহন। তা না হলে তারা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে পাবে না। আর এই ঝড়ঝাপটার সময়টুকু তাদের নিরাপদে রক্ষা করবে - বীজ।

আমেরিকা আর কানাডার জঙ্গলে জ্যাক পাইন নামে একধরনের গাছ জন্মায়। নামেই বোঝা যায় - এরা জাতে পাইন। এদের ফল হয় না, হয় cone - বাংলায় 'মোচক'। পাইনের গায়ে আঠা জাতীয় একধরনের রস হয় - তাকে রজন বলে। জ্যাক পাইনের কোন-এর গায়ে এই রজনের আঠা শক্ত হয়ে জমে থাকে, বীজ ছড়ানোর পথ একেবারে বন্ধ। বছরের পর বছর জ্যাক পাইন এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকে - রজনের আবরণের ভিতর বীজ, তার মধ্যে ঘুমন্ত ভ্রূণ। অপেক্ষায় থাকে। জলের নয় - অপেক্ষায় থাকে আগুনের।

বনে যখন দাবানল আসে, তখন জ্যাক পাইনের প্রতীক্ষার শেষ হয়। সে নিজে হয়তো আগুনে পুড়ে মরে। কিন্তু দাবানলের তাপে তার সন্তানরা ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে। ধূ ধূ আগুনে শক্ত রজনের আবরণ গলে যায়, বীজরা খোলা বাতাসে মুক্তি পায়। পূর্বজের দেহাবশেষের ওপর নতুন করে তাদের জীবনযাত্রা শুরু হয়।

এই পুরো প্রতীক্ষার সময়টুকু মা গাছের পক্ষেও যেমন ধৈর্য্যের, সন্তান গাছের পক্ষেও তেমনই। মা গাছ তার ডালপালা, পাতা, শিকড় নিয়ে প্রাণের রসদ জুটিয়ে বেঁচে থাকে, বেড়েও চলে। কিন্তু ভ্রূণ গাছের সেরকম কোনো উপায় নেই; তাকে পুরো সময়টা জড়িমায় কাটাতে হয়। আর এটা তার পক্ষে করা সম্ভব হয় - বীজ আছে বলেই।


নারকেলগাছের ফল কীভাবে ভাসতে ভাসতে সমুদ্র পেরিয়ে দেশে-দেশান্তরে পাড়ি দেয়, তা তো সবার জানা।

বীজের সবচেয়ে বড় ভূমিকা এটাই। গাছকে একটা সুযোগ করে দেওয়া - তার সন্তান যাতে উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত পরিবেশে জীবন আরম্ভ করতে পারে। একবার বড় গাছ ছোট গাছকে জন্ম দেয়, - আর তার পরে ছোট গাছ বীজের থেকে নিজে জন্ম নেয়। এক জীবনে দুই জন্ম। বৈজ্ঞানিক পরিভাষার কথা জানি না - তবে আমাদের বাংলা ভাষায় এর জন্যে একটা সংস্কৃত-থেকে-পাওয়া শব্দ আছে: "দ্বিজ"।



গাছের মধ্যে এই দ্বিজত্বের বিকাশ হয়েছিল আজ থেকে প্রায় তিনশো মিলিয়ন বছর আগে। কার্বনিফেরাস অরণ্যের কথা বলতে গিয়ে আমরা ফার্ন আর শ্যাওলার পাশাপাশি যে সাইকাডের কথা বলেছিলাম, তারা এই জাতের গাছ ছিল। আর তার পরে এলো পাইনরা। এদের শিকড় আছে, কাণ্ড আছে, পাতা আছে, ডালপালা আছে, - আর আছে নতুন অভিযোজন বীজ। এতদিন নতুন গাছের জন্ম দিতে গেলে কোথায় ভেজা জায়গা পাওয়া যাবে সেই ভরসায় থাকতে হত। এবারে সেই চিন্তা নেই - বীজ ছড়িয়ে গেলেই হল, সুবিধামত অঙ্কুর বেরোবে না হয় পরে। আর বীজের মধ্যে তো শুধু ভ্রূণ নয় - সাথে খানিকটা পরিপোষক জিনিসও জমা থাকে - যেটাকে ভালো ভাষায় বলে endosperm। কাজেই প্রতিকূল জায়গা হলেও চারাগাছের প্রাথমিক খাবারের চাহিদাটা সেই থেকেই মিটে যায়। সব মিলিয়ে বীজধারী গাছদের বহুমুখীতা অনেক বেড়ে গেল, - পাহাড়পর্বতের গায়ে, যেসব জায়গা এতদিন শুকনো বলে খালি পড়ে ছিল - সেখানে পাইন-সাইকাডের বন গজিয়ে উঠতে লাগল। কার্বনিফেরাস রেইনফরেস্ট কোলাপ্সের ধাক্কা পেরিয়ে, পার্মিয়ানের সুদীর্ঘ ৪৭ মিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবীতে আসন কায়েম করে নিল দলে দলে কনিফার, সাইকাড, গিঙ্কগো। লেপিডোডেনড্রন-সিজিলারিয়ার মতো লাইকোপডরা মিলিয়ে গেল ধীরে ধীরে। এল এক বিশাল পরিবর্তনের পালা।




ওদিকে পোকাদের মধ্যে আরশোলার দাপট কার্বনিফেরাস পর্যায়েও ছিল, পার্মিয়ানেও তা অব্যাহত থাকল। পার্মিয়ানের গোড়ায় কীটপতঙ্গের মধ্যে নব্বই ভাগই ছিল আরশোলা জাতের। ফড়িংদের মধ্যে Meganeuropsis permianaর ডানার মাপ ছিল ৭১ সেন্টিমিটার, আর মাথা থেকে লেজের ডগা অবধি লম্বায় ছিল প্রায় ৪৩ সেন্টিমিটার। এই পর্যায়ে নতুনদের মধ্যে এলো বীট্‌ল জাতের পোকারা (ভালো নাম Coleoptera), আর সিকাডা-অ্যাফিড-ছারপোকা জাতীয় পোকারা, যাদের ইংরিজীতে true bugs বলে (ভালো নাম Hemiptera)। - এই কোলিওপটেরা বা বীট্‌লরা প্রজাতির দিক থেকে সবার মধ্যে অ্যাবসোলিউট মেজরিটি। বর্তমান পৃথিবীতে প্রাণীদের মধ্যে আন্দাজ পনেরো লক্ষ প্রজাতি আছে, তার মধ্যে ২৫ শতাংশই হল বীট্‌ল। এদের প্রজাতির সংখ্যা প্রায় চার লাখ। - এই বীট্‌লরা প্রথম দেখা দিয়েছিল পার্মিয়ান পর্যায়েই।


আবার অন্য দিকে ছিল জলচর সরীসৃপের দল। উভচররা হাত-পা গজিয়ে ডাঙায় উঠে এসে অ্যামনিওট হল বটে, কিন্তু কেউ কেউ তা সত্ত্বেও জলের জীবনে ফিরে গেল। 'ফিরে গেল', না 'রয়ে গেল', - সে নিয়ে খানিকটা কুয়াশা আছে। এমন হতে পারে যে স্থলচর সরীসৃপরা কেউ কেউ অ্যাবাউট টার্ন করে জলে ফিরে গিয়েছিল; আবার এমনটাও হতে পারে যে এই ব্যতিক্রমীরা পুরোপুরি স্থলচর কখনোই হয় নি, - semi-terrestrial হয়েছিল মাত্র। ছোটোখাটো চেহারার এই সরীসৃপদের নাম দেওয়া হয়েছে Mesosaur, - 'মাঝারি টিকটিকি'। আন্দাজ ২৯৯ থেকে ২৭০ মিলিয়ন বছর আগেকার জীব এরা। সবচেয়ে পরিচিত মেসোসরের নাম Mesosaurus (লক্ষ্য করার বিষয়: Mesosaur আর Mesosaurus সমার্থক নয়। আগেরটা একটা গ্রুপের নাম। পরেরটা তার মধ্যেকার একটা নির্দিষ্ট জীনাস। 'সর' আর 'সরাস'-এর এই তফাৎটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে।) মেসোসরাস মিটারখানেক বড় হত, উপকূলবর্তী অঞ্চলের সমুদ্রে থাকত। এর লেজের চেহারা অনেকটা ঈলমাছের লেজের কথা মনে পড়িয়ে দেয়; ওই লেজ নেড়ে এরা সাঁতার কাটত। আমরা যে পৃথিবীর বিবর্তন নিয়ে কথা বলছি, এই কাহিনীতে মেসোসরাসের একটা নাটকীয় ভূমিকা আছে, - আপাতত সে কথা তোলা রইল।

মেসোসরদের মনে করা হয় প্রাথমিক পর্যায়ের প্যারারেপটাইল। Parareptile, - মানে 'সরীসৃপের পাশেই'। প্রায়-রেপটাইল বলা যেতে পারে। অ্যামনিওটরা যে বিশাল দুই ভাগে ভাগ হয়েছিল, তার মধ্যে একদিকে ছিল সাইনাপসিড, আর অন্য দিকে যারা ছিল তাদের নাম Sauropsid - 'গিরগিটিমুখো'। সরপসিডদের মধ্যে আবার দুই ভাগ - একদিকে আমাদের 'আসল' সরীসৃপরা - ডাইনোসর থেকে শুরু করে পাখি সাপ টিকটিকি কুমীর সবাই, - আর অন্যদিকে এই প্রায়-সরীসৃপের দল। আসলে 'অ্যানাপসিড' বলে যে ভাগের কথা আমরা শুনি, তা আধুনিক নিয়মে চলে না, ধীরে ধীরে সেটা বাতিল হতে বসেছে। সেই জায়গায় যে সঠিকতর শ্রেণীবিভাগ করা হচ্ছে আজকাল, - তাতে এই Parareptilia ভাগটা রাখা হয়েছে। অ্যানাপসিডদের মধ্যে আমরা কচ্ছপ আর কাছিমদের ফেলেছি বটে, কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানীরা বলেন, - ওরা আসলে ডায়াপসিড, চেহারা অনেকটা বদলে গিয়েছে বলে চেনা যায় না। যদিও এখনো এই বিষয়ে সবাই সম্পূর্ণ নিশ্চিত নন, তবুও, 'অ্যানাপসিড' ছেড়ে এবার থেকে আমরা 'প্যারারেপটাইল'ই বলব।


প্যারারেপটাইলদের মধ্যে প্যারিয়াসর বলে একধরনের সরীসৃপ হত, পার্মিয়ানের মাঠে বনে এদের দেখতে পাওয়া যেত। বেঁটেখাটো, গাঁট্টাগোট্টা চেহারা, ছোটো লেজ, ছড়ানো থাবা। আহার নিরামিষ। প্যারিয়াসরদের গায়ে বর্মের মতো মজবুত চামড়া থাকত। কুমীরের গায়ে বা কচ্ছপের খোলায় যে শক্ত, বর্মের মতো আচ্ছাদন থাকে, তাকে বলে scute। পাখিদের পায়েও এই জিনিসই থাকে - ঠিক চামড়া নয়, যেন শুকনো আবরণীর মতো অনেকটা, আঁশেরই আরেক সংস্করণ। প্যারিয়াসরদের গায়েও এমনি স্কুট হত। কোনো কোনো জীবাশ্মবিদ এমনও মনে করেন যে এদের থেকেই কচ্ছপদের উৎপত্তি।

একজাতের প্যারিয়াসর হত, তাদের নাম ছিল Scutosaurus। বোঝাই যায়, শরীরের বর্মের জন্যেই এই নাম। আকারে এরা বেশ বড় হত, প্রায় দশ ফুটের কাছাকাছি লম্বা, মোটাসোটা ভারী গড়ন। প্রচুর পরিমাণে গাছপাতা খেয়ে এদের পেট ভরাতে হত। সাধারণত মাঠে ঘাটে, নদীর ধারে এদের চরতে দেখা যেত। পার্মিয়ানের ভূখণ্ড তখন সুপারকন্টিনেন্ট প্যানজিয়ার রূপ নিয়েছে, জলবায়ু তখন শুকনো, ঘন অরণ্য কম। ভারী চেহারার স্কুটোসরাসরা ছোটো ছোটো দলে খোলা উপত্যকায় ঘুরে বেড়াত, আর তাদের ওপর হামলা চালাত হিংস্র ছোরাদেঁতো থেরাপসিড শিকারী - ইনোসট্রানসিভিয়া।

নামটা শুনতে কঠিন। এই জাতের থেরাপসিডদের একসাথে বলা হয় 'গর্গন-মুখী' - Gorgonopsids,- গ্রীক পুরাণে যে ভয়ঙ্কর গর্গন রাক্ষসীদের কথা আছে, তাদের নামে। এই গর্গন শব্দটা কিন্তু আমাদের ঘরের শব্দ - সংস্কৃত 'গর্জন' আর গ্রীক 'গর্গন' - এদের মূল একই। মোট মিলিয়ে গর্গনপসিডরা যে রীতিমতো হিংস্র জানোয়ার ছিল, তা বেশ বোঝা যায়। আর এই গর্গনপসিডদের মধ্যে বৃহত্তম প্রজাতি ছিল Inostrancevia। রাশান ভূবিজ্ঞানী আলেক্সাণ্ডার ইনোসট্রান্টসেভের নামে নাম। এ নিজে প্রায় সাড়ে এগারো ফুট লম্বা হত, ছোরার মতো দাঁতওয়ালা মাথাটাই হত ফুট দুয়েক। ওজন ছিল প্রায় হাজার পাউন্ড। আর ওই যে দাঁত - ওপরের পাটির ছোরামার্কা দু'খানা canine লম্বায় একেকটা হত পনেরো সেন্টিমিটার। স্কুটোসরাসের বর্ম ভেদ করার জন্য জুতসই অস্ত্র চাই তো। খাদ্য খাদক, শিকার ও শিকারী - সবে মিলে জমে গেল পার্মিয়ান ইকোসিস্টেম।



এই পর্যন্ত এসে, কেমন যেন অনিবার্যভাবেই, একটা গানের কথা মনে পড়ে।

"আজও যদি তুমি
কোনো গাঁয়ে দেখো
ভাঙা কুটিরের সারি...
জেনো সেইখানে - সে গাঁয়ের বধূর আশা-স্বপনের সমাধি।"

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের "গাঁয়ের বধূ"। অবসানের গান। মরণের ছোঁয়া লেগে ভরন্ত জীবন ছাই হয়ে শেষ হয়ে যাবার গান।


নতুন বীজের গাছ, নতুন গড়নের থেরাপসিড, নতুন জাতের কীটপতঙ্গ, - কিশোর পৃথিবীকে ঘিরে চতুর্দিকে প্রাণের তরঙ্গ। সব মিলিয়ে ভালোই ছিল সবকিছু। তার পর এলো দহনবেলা। আজ থেকে আড়াইশো মিলিয়ন বছর আগে, জীবজন্তুগাছপালায় ভরা জমজমাট পার্মিয়ানে ঘটল সেই পৃথিবী-শ্মশান-করা মহাপ্রলয়: the Great Permian Extinction।

*************************************************************************************************

800 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 9 -- 28
Avatar: dd

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (৩)

দুর্দান্ত হচ্ছে। এরকম সাবলীল ভাষায় সায়েন্স নিয়ে লেখা বাংলায় আগে পড়ি নি।
Avatar: b

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (৩)

আমি পড়িচি। ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণের লেখা। ছোটদের বিশ্বকোষে। ক্যাপ্টেনকে ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভার্সান টু বলে মনে হচ্চে।
Avatar: Tim

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (৩)

অপূর্ব হচ্চে লেখাটা। ক্যাপ্টেন হ্যাডক একসময় আমার নিক ছেলো ফ্যাঁসবইতে, সে অনেককাল আগের কথা। আরো এগোক লেখাটা, পড়ছি।
Avatar: ক্যাপ্টেন হ্যাডক

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (৩)

শারদ্বত, কেন ভয় দেখানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছেন?

কান্তি, লেখা যতটুকু হয়েছে (বা যতটুকু হবে), ঢঙ বদলাবে না। সে কেউ পড়ুক আর না পড়ুক।
Avatar: PM

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (৩)

অসামান্য লেখা। ঝরঝরে ভাষা। কতকিছু জানার আছে কিন্তু জানি না ভেবে নিজেকে হাঁদা গঙ্গারাম মনে হয়।

এরকম লেখা নামানোর জন্য অভিনন্দন
Avatar: b

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (৩)

ক্যাপটেন, কোথায় গেলেন?
Avatar: sinfaut

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (৩)

এতদিন এটা পড়িনি। অসাধারণ লেখা, দুর্দান্ত।
Avatar: Blank

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (৩)

তারপর কি হলো ?
Avatar: sosen

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (৩)

দিব্য হইতাসে
Avatar: sosen

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (৩)

ডাইনোসরেদের ছবিছাবা দিলে আরো বেশ হয়
Avatar: পুপে

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (৩)

এই লেখাটা ভারি ভালো। প্রচন্ড আগ্রহ তৈরী হচ্চে বিষয়টা নিয়ে। গুগল করেও জেনে নিচ্চি যা যা প্রশ্ন আসছে মনে। পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।
Avatar: ranjan roy

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (৩)

"সে কেউ পড়ুক আর না পড়ুক।"
---- পড়বে না মানে? এ লেখা না পড়ে থাকা যায়?

যে পড়েনি এই লেখা,
সে আসলে রাম বোকা।

--- যেমন আমি, আজই পড়লাম। অ্যাদ্দিন কেন দেখিনি!

Avatar: শারদ্বত

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (৩)

যাক, ৪ নম্বরটা এখানে পোস্টেড... কমেন্ট করে একটু ওপরে ভাসিয়ে দিলাম।

Avatar: হ্যাঁ হ্যাঁ

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (৩)

পরের পর্ব কবে আসছে?
Avatar: avi

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (৩)

আরে, এও একটা খুব ভালো টই, মাঝপথে দাঁড়িয়ে আছে। ঃ(
Avatar: b

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (৩)

ক্যাপ্টেন স্যার
Avatar: avi

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (৩)

হেঁইয়ো। ক্যাপ্টেন কই গেলেন?
Avatar: Du

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (৩)

দারুন লাগছে পড়তে। আবার শুরু করুন।
Avatar: Du

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (৩)

দারুন লাগছে পড়তে। আবার শুরু করুন।
Avatar: amit

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (৩)

অসাধারণ লেখা। বাংলাতে এতো ভালো বিজ্ঞান নিয়ে লেখা সত্যি পড়ি নি আগে, শুধু এটা নয়, এই বিষয়ে আপনার বাকিলেখা গুলো ও অসাধারণ। আপনার সব লেখাগুলো এক সাথে সংকলন করলে একটা খুব ভালো বই হবে। আগাম শুভেচ্ছ আর বায়না রইলো।

এটা পড়তে পড়তে জুরাসিক পার্ক সিনেমাটা একদম চোখের সামনে ভাসছিলো, যেভাবে রিসার্চ এগোচ্ছে, হয়তো আর কুড়ি বছর পরে সত্যি ওরকম ল্যাবরেটরি তৈরি হবে।

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 9 -- 28


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন