ক্যাপ্টেন হ্যাডক RSS feed

খুকুর কুুকুর ঠাকুরপুকুর মেঘলা দুপুর টাপুর টুপুর বৃষ্টি পড়ে!

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • কাশ্মীরের ইতিহাস : পালাবদলের ৭৫ বছর
    কাশ্মীরের ইতিহাস : পালাবদলের ৭৫ বছর - সৌভিক ঘোষালভারতভুক্তির আগে কাশ্মীর১ব্রিটিশরা যখন ভারত ছেড়ে চলে যাবে এই ব্যাপারটা নিশ্চিত হয়ে গেল, তখন দুটো প্রধান সমস্যা এসে দাঁড়ালো আমাদের স্বাধীনতার সামনে। একটি অবশ্যই দেশ ভাগ সংক্রান্ত। বহু আলাপ-আলোচনা, ...
  • গাম্বিয়া - মিয়ানমারঃ শুরু হল যুগান্তকারী মামলার শুনানি
    নেদারল্যান্ডের হেগ শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস—আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে করা গাম্বিয়ার মামলার শুনানি শুরু হয়েছে আজকে। শান্তি প্রাসাদে শান্তি আসবে কিনা তার আইনই লড়াই শুরু আজকে থেকে। নেদারল্যান্ডের হেগ শহরের পিস ...
  • রাতপরী (গল্প)
    ‘কপাল মানুষের সঙ্গে সঙ্গে যায়। পালানোর কি আর উপায় আছে!’- এই সপ্তাহে শরীর ‘খারাপ’ থাকার কথা। কিন্তু, কিছু টাকার খুবই দরকার। সকালে পেট-না-হওয়ার ওষুধ গিলে, সন্ধেয় লিপস্টিক পাউডার ডলে প্রস্তুত থাকলে কী হবে, খদ্দের এলে তো! রাত প্রায় একটা। এই গলির কার্যত কোনো ...
  • রাতপরী (গল্প)
    ‘কপাল মানুষের সঙ্গে সঙ্গে যায়। পালানোর কি আর উপায় আছে!’- এই সপ্তাহে শরীর ‘খারাপ’ থাকার কথা। কিন্তু, কিছু টাকার খুবই দরকার। সকালে পেট-না-হওয়ার ওষুধ গিলে, সন্ধেয় লিপস্টিক পাউডার ডলে প্রস্তুত থাকলে কী হবে, খদ্দের এলে তো! রাত প্রায় একটা। এই গলির কার্যত কোনো ...
  • বিনম্র শ্রদ্ধা অজয় রায়
    একুশে পদকপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অজয় রায় (৮৪) আর নেই। সোমবার ( ৯ ডিসেম্বর) দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। অধ্যাপক অজয় দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা অসুখে ভুগছিলেন।২০১৫ ...
  • আমাদের চমৎকার বড়দা প্রসঙ্গে
    ইয়ে, স-অ-অ-অ-ব দেখছে। বড়দা সব দেখছে। বড়দা স্রেফ দেখেনি ওইখানে এক দিন রাম জন্মালেন, তার পর কারা বিদেশ থেকে এসে যেন ভেঙেটেঙে মসজিদ স্থাপন করল, কেন না বড়দা তখন ঘুমোচ্ছিলেন। ঘুম ভাঙল যখন, চোখ কচলেটচলে দেখলেন মস্ত ব্যাপার এ, বড়দা বললেন, ভেঙে ফেলো মসজিদ, জমি ...
  • ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ?
    যেকোন নারকীয় ধর্ষণের ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়ে সামনে আসার পর নাগরিক হিসাবে আমাদের একটা ঈমানি দায়িত্ব থাকে। দায়িত্বটা হল অভিযুক্ত ধর্ষকের কঠোরতম শাস্তির দাবি করা। কঠোরতম শাস্তি বলতে কারোর কাছে মৃত্যুদন্ড। কেউ একটু এগিয়ে ধর্ষকের পুরুষাঙ্গ কেটে নেওয়ার ...
  • তোমার পূজার ছলে
    বাঙালি মধ্যবিত্তের মার্জিত ও পরিশীলিত হাবভাব দেখতে বেশ লাগে। অপসংস্কৃতি নিয়ে বাঙালি চিরকাল ওয়াকিবহাল ছিল। আজও আছে। বেশ লাগে। কিন্তু, বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনার প্রবল ক্ষোভ ও অপমানে আপনার কি খুব পরিশীলিত, গঙ্গাজলে ধোওয়া আদ্যন্ত সাত্ত্বিক শব্দ মনে পড়ে? না ...
  • The Irishman
    দা আইরিশম্যান। সিনেমা প্রেমীদের জন্য মার্টিন স্করসিসের নতুন বিস্ময়। ট্যাক্সি ড্রাইভার, গুডফেলাস, ক্যাসিনো, গ্যাংস অব নিউইয়র্ক, দা অ্যাভিয়েটর, দ্য ডিপার্টেড, শাটার আইল্যান্ড, দ্য উল্ফ অব ওয়াল স্ট্রিট, সাইলেন্টের পরের জায়গা দা আইরিশম্যান। বর্তমান সময়ের ...
  • তোকে আমরা কী দিইনি?
    পূর্ণেন্দু পত্রী মশাই মার্জনা করবেন -********তোকে আমরা কী দিইনি নরেন?আগুন জ্বালিয়ে হোলি খেলবি বলে আমরা তোকে দিয়েছি এক ট্রেন ভর্তি করসেবক। দেদার মুসলমান মারবি বলে তুলে দিয়েছি পুরো গুজরাট। তোর রাজধর্ম পালন করতে ইচ্ছে করে বলে পাঠিয়ে দিয়েছি স্বয়ং আদবানীজীকে, ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

পুরানো সেই দিনের কথা (১)

Manash Sarkar

"ওয়েলকাম টু জুরাসিক পার্ক"

:::::::::::::::::::::::::::::::::::::


অডিটোরিয়ামের বাঁ পাশে হরিণদের এনক্লোজারের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ময়ূরের খাঁচাটার সামনে।
এ ময়ূরগুলো ঠিক পোষ মানা নয়। বিদ্যাপীঠের পোল্ট্রিতে মুরগীকে দিয়ে তা দিইয়ে অনেকক'টা ময়ূরের ডিম ফোটানো হয়েছে, সেগুলো আজন্ম মানুষের সাহচর্যে বেড়ে ওঠা। ছোটবেলায় ধাই-মা মুরগীর পিছনে পিছনে ঘুরত, বড় হতে হতে নিজের জাত চিনে আলাদা হয়েছে। ওদেরকে খাঁচার বাইরে মাঝেমধ্যেই ছাড়া হয়, ডেয়ারীর খড়গাদা পেরিয়ে ইলেভেন-টুয়েলভের হস্টেলের কাছ অবধিও চলে আসে প্রায়ই। ওরা ক্যাম্পাস ছেড়ে যাবে না, কোনোদিন বন্য ছিল না, হবেও না। কিন্তু এই ময়ূরগুলো, - ময়ূর ময়ূরী দুইই - এরা যারা এই হরিণদের পাশের খাঁচায় থাকে, এরা বাইরে জন্মেছে। খাঁচার বাইরে বেরোলে এদেরকে ফেরানো যাবে না। সেজন্য এরা ভেতরেই থাকে, পরিসর কম, কিন্তু অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

ময়ূরের খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে পাখিগুলোকে দেখছিলাম। দুটো ময়ূর, তিনটে ময়ূরী। খাঁচার ভিতরের ঘাসছাড়া রুক্ষ মাটি, পা ফেলে ফেলে পায়চারি করছে। ময়ূরীদের তুলনায় ময়ূরের মেজাজটা বোধহয় একটু চড়া, সন্ধিৎসু চাউনিতে দেখছে মাঝে মাঝে আমার দিকে মুখ তুলে, এগিয়ে আসবে কিনা ভাবছে। গলা নামিয়ে মাটির দিকে ছোবল চালাচ্ছে, খুঁটে খাচ্ছে। আর কখনো সখনো একটা করে ডাক।

'ক্যাঁওয়া!'

চেনা ডাক। ডাকের আগে থেকে যেটা চেনা সেটা হল ডাকের বানানটা। 'সোনার কেল্লা' বইয়ে ঠিক এই বানান ছিল, সার্কিট হাউসের কাছে ময়ূর ডেকেছিল। সাধারণ বাঙালীদের কাছে ময়ূর খুব একটা কাছের পাখি নয়, কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালীয়ানায় ময়ূরের অবস্থান বেশী নেই। পুজোর সময় কার্তিকের বাহন, আর বইয়ের তাকে 'কুহু ও কেকা'। কিন্তু পুরুলিয়ার বাংলা অন্য বাংলা। মানভূমের বুনো মাঠে লম্বা পা ফেলে চরে বেড়ানো ময়ূর, এখানকার সাপ বিছে আর চোরকাঁটার সাথে বেমালুম মানিয়ে যায়।

আমি খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে এসব কথা ভাবছিলাম না। আমার চোখ আটকে যাচ্ছিল ময়ূরটার পায়ের দিকে। চার আঙুলে পা, তিনটে সামনের দিকে, একটা পিছনে। জোরালো, শক্তপোক্ত, মাঠচরা পাখির মার্কামারা পা। পাখির গায়ে পালক থাকে, কিন্তু এই পায়ে পালক নেই, পালক শুরু হয়েছে আরও উঁচুতে, বেশ খানিকটা ন্যাড়া পায়ের পর থেকে। আর এই ন্যাড়া পায়ে পালকের জায়গায় আছে আঁশ। স্কেলস। মাছের গায়ের ভেজা আঁশ না। শুকনো আঁশ, বর্মের মতো টুকরো টুকরো চামড়ার পাত দিয়ে তৈরী আঁশ। ড্রাই স্কেলস। যে ড্রাই স্কেলস স্কুলের বায়োলজির সিলেবাসে ছিল, আ রেগুলার ফিচার অফ আ পার্টিকুলার অর্ডার... ময়ূরটা হেঁটে হেঁটে খাঁচার ভিতরের জায়গাটায় বেড়াচ্ছিল। পাখির শরীরের একটা গতি থাকে, বিশেষ একটা ছন্দ থাকে। ময়ূরটার চলা, ওই ভঙ্গী, চোখধাঁধানো ময়ূরকণ্ঠী পালকে ঢাকা গলা বেঁকে নামছে মাটির দিকে, নামাটা ঠিক ফ্লুইড নয়, যেন আটকে আটকে, ব্রেক ডান্সের মতো থমকে থমকে নামছে, একটা জার্কিং মুভমেন্ট। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানোটা... চোখ ফেরানো, চাউনি... লম্বা পায়ের ওপর বসানো ব্যালেন্স করা শরীর, সামনে লম্বাটে হয়ে বেরোনো বুক-গলা-মাথা, পিছনে লম্বা লেজ যেন তাকে কাউন্টারব্যালেন্স করছে, চলার ওই বিশেষ ঠমকটা আমার প্রচণ্ড চেনা।


ভিতরে দুটো খাটো গোলপোস্টের মতো কাঠের খোঁটার ওপর একটা লম্বা বাঁশ আড়াআড়ি বসানো, দাঁড়ের মতো করে। ময়ূরগুলোর পিঠের ওপর থেকে বুকের দুপাশে শান্তভাবে ভাঁজ হয়ে থাকা ডানা, খাঁচার ভিতরে এই ডানার উড়ালের কোনো কাজ নেই, মাটি থেকে লাফিয়ে ওই আড়াআড়ি-টানা বসার বাঁশটায় ওঠা ছাড়া। যে ময়ূরটাকে আমি দেখছিলাম, কীজন্য যেন সেটা একটু রেগে এদিকটায় তেড়ে এল। আমার চোখ সটান ওর দিকে, ইয়েলো স্পট পাগুলোর ওপর ফিক্সড। এই ধেয়ে আসা আমি জানি। এখানে না, এ জিনিস আমি দেখেছি বাড়িতে, টিভির পর্দায়। সিনেমায়। সেই সিনেমায় আমি যা দেখেছিলাম, এই চলাফেরা হুবহু তার সাথে মিলে যায়।

এ চলন শিকারীর চলন। খামারে মুরগীরা যখন কক-কক করতে করতে ধান খুঁটে খায়, কেঁচো কি কেন্নো ধরে খায়, তখন তাদের শরীরে এই একই ভাষা দেখা যায়। ময়ূর, মোরগ, - জাতভাই পাখি এরা, গ্যালিফর্মেস বর্গের সদস্য। এদের ইংরেজী নামেও তার ইঙ্গিত আছে। এরা মানুষের কাছে ঠিক শিকারী পাখি না হলেও, শিকার-শিকারীর সংজ্ঞা যে কতটা আপেক্ষিক তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। মোরগ আমাদের কাছে ভয়ঙ্কর নয়, কিন্তু মোরগের দু-তিনগুণ বড় চেহারার ময়ূর তেড়ে এলে মানুষ পিছপা হবে। আর যদি তার চেয়েও উঁচু, তার চেয়েও বড় হয়?

'... উটপাখিও লম্বা হয়, তবে সেটা প্রধানত তার গলার জন্য। এ পাখির পিঠই তুলসীবাবুর মাথা ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ একমাসে পাখি উচ্চতায় বেড়েছে প্রায় দেড় ফুট। গায়ের রঙও বদলেছে। বেগুনীর উপর কালোর ছোপ ধরেছে। আর জ্বলন্ত হলুদ চোখের ওই দৃষ্টি পাখির খাঁচাবন্দী অবস্থায় প্রদ্যোতবাবুর সহ্য করতে অসুবিধা হয়নি, কিন্তু এখন সে-চোখের দিকে চাওয়া যায় না....'

টেরর বার্ড। 'ভয়াল পাখি'। আমাদের কেউ নামটা ভুলবে না চট্ করে। পুরোনো রিডার্স ডাইজেস্ট পত্রিকা ঘেঁটে প্রদ্যোতবাবু এর পরিচয় বের করেছিলেন। শিকাগো ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে রাখা প্রতিমূর্তি ছিল এই প্রাগৈতিহাসিক পাখির, নাম ছিল অ্যাণ্ডালগ্যালর্নিস। সত্যজিৎ বাংলা করেছিলেন - বৃহচ্চঞ্চু।

আর কোস্টা রিকার পশ্চিম প্রান্তে, ববি কার্টারের কাছে হেলিকপ্টারে করে যে কন্সট্রাকশন-ওয়ার্কার লোকটাকে চিকিৎসার জন্যে আনা হয়েছিল, যাকে বাঁচানো যায়নি, তার গায়ে ববি কয়েকটা অন্যরকম আঁচড়ের দাগ পেয়েছিল। কনস্ট্রাকশন মেশিনে পড়ে জখম হলে ওরকম আঁচড় পড়ে না। এই সমস্ত ঘটনা সবার জানা। কিন্তু একটা জায়গা লোকে মনে রাখতে ভুলে যায়। পরে, ওই চ্যাপ্টারের শেষে, ঘরের ছোটো ইংলিশ ডিকশনারিটা খুলে ববি তার মধ্যে একটা শব্দের মানে খুঁজে বের করেছিল।

raptor \ n [deriv. of L. raptor plunderer, fr. Raptus]: bird of prey.


ময়ূরটার পা-ফেলার দিকে তাকিয়ে, জুরাসিক পার্কের র‍্যাপটরদের কথা আমার স্পষ্টভাবে মনে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল, পঁচাত্তর মিলিয়ন বছর আগে ফেলে আসা ইতিহাস দাঁড়িয়ে চাক্ষুষ দেখছি। সামনে দেখছি পাখি, চোখ নামিয়ে পায়ের দিকে আনলেই অতীত-বর্তমানের সীমানা একাকার হয়ে যাচ্ছে। বিবর্তনের ধারা অনর্গল বয়ে গেছে, যেতে যেতে সামনে-পিছনে তার মিল-বেমিলের ছাপ পরিষ্কার রেখে গেছে। ইভলিউশনের প্রমাণ হিসেবে 'লিভিং ফসিল' কয়েকটা প্রাণীর নাম করা হয়, যারা আজকের যুগেও ফেলে আসা দিনের চিহ্ন বয়ে বেড়ায়। কিন্তু ইভলিউশনকে সরাসরি দুচোখে দেখতে গেলে লিভিং ফসিল বা মিসিং লিংক খুঁজে বের করার কোনো দরকার নেই। আমাদের চারদিকেই, পৃথিবী-কাঁপানো ডাইনোসরদের উত্তরপুরুষরা এখনও বেঁচে আছে।

আজ অবধি যে ডাইনোসরদের চিহ্ন পাওয়া গেছে, তাদের দুটো ভাগে ভাগ করা হয়। এই ভাগটা করা হয় এদের কোমরের হাড়ের গঠনের ভিত্তিতে। একদলের কোমর আমাদের আধুনিককালের সরীসৃপদের মতো, - এদের নাম টিকটিকি-কোমর ডাইনোসর, Saurischia (গ্রীকে 'সরাস' মানেই টিকটিকি); আর এক দলের কোমর আধুনিক পাখিদের মতো, - এদের নাম পাখি-কোমর ডাইনোসর, Ornithischia, 'অরনিথ-' মানেই যে 'পাখি' তা তো জানা কথা। ডাইনোসর আর পাখিদের মধ্যে যে সম্পর্ক আছে তার সূত্র এই নামগুলোর মধ্যে রয়েছে। এই পাখি-কোমর ডাইনোদের থেকেই কি উঠে এল আজকের পাখি?

ভাবতে লোভ হয়, কিন্তু খোঁজ করে দেখলাম, উত্তর পেলাম: না। প্রাণের ধারা এই পথে সোজা আসেনি, ঘুরপথে এসেছে, ভুল করে উল্টো ভেবে বসছিলাম আরেকটু হলে। পাখিদের পূর্বপুরুষ অরনিথিসকিয়া ডাইনোসররা ছিল না, ছিল টিকটিকি-কোমররা। বরং স্টেগোসরাস বা ট্রাইসেরাটপসের মতো বড়, চারপেয়ে, ভারী গড়নের নিরামিষাশী ডাইনোসররা পাখি-কোমরদের মধ্যে পড়ত। দুপেয়ে দৌড়বাজ ডাইনোসরও এর মধ্যে ছিল, - হাঁসের মতো চ্যাপ্টা মুখওয়ালা হ্যাড্রোসর, ওরফে 'ডাকবিল'। কিন্তু পাখি-কোমররা শেষ অবধি সবচেয়ে বেশীদূর এগোতে পারেনি। ডাইনোসরদের সবচেয়ে সফল, সবচেয়ে উজ্জ্বল পরিবার হয়ে উঠেছিল টিকটিকির মতো কোমরওয়ালা সরিসকিয়ানরাই।

আজকের ডানাওয়ালা পাখির সংজ্ঞা যদি দিতে হয়, তাহলে কী বলব? সেলিম আলি তাঁর বইয়ে বলেছেন, 'A bird is a feathered biped.' পালকওয়ালা দুপেয়ে প্রাণী - সেই হল পাখি। মানুষ দু'পায়ে হাঁটে, কিন্তু তার পালক হয় না, তার গায়ে পালকের জায়গায় লোম। পালক এমন একটা বৈশিষ্ট্য যা একমাত্র পাখিদের শরীরে থাকে, আর কারও থাকে না। কিন্তু কথাটা পুরোপুরি ঠিক হল না। পাখি ছাড়াও অন্য কারও কারও গায়ে পালক দেখা গেছে। তখনও পৃথিবীতে পাখিরা আসেনি। পাখিদের সুদূর পূর্বপুরুষ, বিবর্তনের নাটকে এই অঙ্কের যারা কুশীলব, তাদের প্রথম উদ্ভব - সে প্রায় আড়াইশো মিলিয়ন বছর আগেকার কথা। এত দীর্ঘ সময়ের মাপ আমাদের আন্দাজে আসে না। আমাদের কবি রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়েছিল একশো চুয়ান্ন বছর আগে, দেড়শো বছরেরও বেশী। 'সেই সময়'-এর নায়ক কালীপ্রসন্ন সিংহের জন্মসাল সঠিক জানা যায় না, তিনি রবীন্দ্রনাথের চেয়ে আন্দাজ বছর কুড়ির বড় ছিলেন। এঁরা সবাই ব্রিটিশ ভারতে জন্মেছেন। ব্রিটিশ আমলের গোড়াপত্তন হয়েছিল যাদের রাজত্বের ভগ্নাবশেষের ওপর, সেই মুঘল সাম্রাজ্য ভারতে শিকড় গেড়েছিল বাবরের হাত ধরে, ১৫২৬ সালে প্রথম পানিপথের যুদ্ধে, এ প্রায় পাঁচশো বছর আগেকার কথা। ওদিকে বাবর ভারতে আসার তিয়াত্তর বছর আগে, পাশ্চাত্য সভ্যতার বুকে সব ওলটপালট হয়ে নতুন যুগের সূচনা লেখা হয়ে যাচ্ছে, দেড় হাজার বছরের অটল রোমান সাম্রাজ্যের অবসান ঘটিয়ে কনস্টানটিনোপলের পতন হল ১৪৫৩ সালে। রোমানরা একসময় গণতান্ত্রিক ছিল, রাষ্ট্রের বিপদের দিনে নেতৃত্বের প্রয়োজনে জুলিয়াস সীজারকে তারা সম্রাট হিসেবে বরণ করেছিল। সেই গদি আর সীজার ছাড়েননি, রোমান ঈগলের ছায়া দুনিয়ার ওপর ছেয়ে ছিল দেড়হাজার বছর, বেথ্‌লহেমের আস্তাবলে যীশুর জন্ম নেওয়ারও কয়েক বছর আগে থেকে। আর রোমানদেরও আগে ইউরোপে প্রথম আলো জ্বেলেছিল গ্রীকরা। 'সাম্রাজ্য' নয়, বলা হয় গ্রীক 'সভ্যতা'। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির জন্মই যে গ্রীসে! খ্রীষ্টের জন্মের চারশো-পাঁচশো বছর আগে ক্লাসিকাল গ্রীক সভ্যতার শুরু, এথেন্সের নেতৃত্বে পারস্য আক্রমণ প্রতিহত করার সেই ইতিহাস সারা পৃথিবীতে আজও গল্পে গল্পে বেঁচে আছে। ৪৯০ খ্রীষ্টপূর্বের ব্যাট্‌ল অফ ম্যারাথন, - যার সম্মানে আজও চার বছর অন্তর অলিম্পিক গেম্‌সের অলঙ্কার হিসেবে ম্যারাথন ইভেন্ট থাকে। আর তার দশ বছর পরে হয়েছিল থার্মোপাইলির যুদ্ধ। থার্মো - তপ্ত; পাইলা, বহুবচনে পাইলি - দ্বার, দরজা। The Hot Gates. স্পার্টার অধিনায়ক কিং লিওনাইডাস মাত্র একমুঠো নির্ভীক যোদ্ধা নিয়ে এক-দেড় লাখ বিদেশী শত্রুর মহড়া নিয়েছিলেন, আড়াই হাজার বছর পরেও সেই কাহিনী পপ কালচারের অঙ্গ হয়ে আছে।

আর যে যুদ্ধ, যে লড়াই মারামারি, যে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মানুষের এত আগ্রহ, এত উৎসাহ, এত সৃষ্টিশীলতা - তার শুরু কবে? ইতিহাসে লোহার ব্যবহার শুরু হয় ১২০০ খ্রীষ্টপূর্বের আশেপাশে, তার আগে ব্রোঞ্জ যুগ আরম্ভ হয়েছিল প্রায় ৩০০০ খ্রীষ্টপূর্বে, তারও আগে পাথরের যুগ, নিওলিথিক পিরিয়ড। ওই সময়েই মানুষ প্রথম চাষ করতে শিখল, পশুদের পোষ মানাতে শিখল। যে 'ক্রো-ম্যানিঅঁ'দের আমাদের পূর্বজ বলে ধরা হয়, তারা ছিল চল্লিশ হাজার বছর আগেকার মানুষ। ইতিহাসের দৃষ্টি ততদূর অতীতে পৌঁছয় না, ক্রো ম্যানিঅঁ-রা আমাদের খাতায় প্রাক্-ইতিহাস।

Cretaceous পিরিয়ডের অন্তিমপর্বে ডাইনোসররা পৃথিবী থেকে মুছে গিয়েছিল, এই ক্রীটাশিয়াস আজ থেকে পঁয়ষট্টি মিলিয়ন বছর আগে শেষ হয়। পঁয়ষট্টি মিলিয়ন বছর- মানে, এটুকু সময়ের মধ্যে ৪২২০৭৭টা রবীন্দ্র-জন্মোত্তর যুগ, ১৩০০০০টা মুঘল আমল, সাড়ে বত্রিশ হাজার রোমান সভ্যতা, ছত্রিশ হাজার ব্রোঞ্জ যুগ, আর দেড় হাজার '...চল্লিশ হাজার বছর আগেকার...' ঢুকে যায়। কতদূর আন্দাজ দিতে পারলাম জানি না। '৪২২০৭৭' মানে ঠিক কতটা? এক কেজি চাল কিনলে একসপ্তাহের দুপুরের ভাত হয়ে যায়। এক কেজিতে ৫০,০০০ চাল থাকে।

কিন্তু আড়াইশো মিলিয়ন বছর আগে যে থেরোপডরা পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে নেমেছিল, তাদের উত্তরসূরীরা পূর্বজদের উত্তরাধিকার আজও ধরে রেখেছে। শেলীর Ozymandias বিবর্তনের এই গল্পে অবান্তর হয়ে গেছে। Theropod - মানে 'পশু-আঙুলে'। সবচেয়ে ক্ষিপ্র, সবচেয়ে বুদ্ধিমান ডাইনোসররা সবাই এই ভাগের মধ্যে পড়ে। আর গোটা থেরোপড ভাগটা ঢোকে সরিসকিয়া ভাগের মধ্যে। থেরোপড ছাড়া অন্যধরনেরও সরিসকিয়ান ছিল, তারা প্রত্যক্ষভাবে পাখিদের পূর্বপুরুষ নয়। থেরোপডের পাশাপাশি ভাগ ছিল Sauropod, আর তার পূর্বসূরী Prosauropod। 'প্রো-' বলতে 'পূর্বকার'।

যেন রূপকথা মনে পড়ে যেতে চায়। বিরাট শরীর নিয়ে আকাশছোঁয়া উঁচু সরোপডরা দেড়শো মিলিয়ন বছর আগেকার জুরাসিক মাঠে দল বেঁধে চরে বেড়াত। পঁচাত্তর ফুট লম্বা, আটত্রিশ টন ওজনের অ্যাপাটোসরাস। ব্রন্টোসরাস, সত্তর ফুট লম্বা শরীর, ওজন পনেরো টন। সরোপডরা সবাই শাকাহারী, নিরীহ নিরামিষাশী ডাইনোসর। এদের নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে অনেক বিতর্ক আছে। আবিষ্কারে আবিষ্কারে গবেষণা নতুন নতুন মোড় নিয়ে নেয়, ব্রন্টোসরের নাম করলাম, এই সেদিন অবধিও ব্রন্টোসরাস আর অ্যাপাটোসরাসকে অভিন্ন বলে ভাবা হত। এই দু'হাজার পনেরোয় এক গবেষণায় ঠিক হয়েছে ব্রন্টোসরাস স্বাধীন প্রজাতি, অ্যাপাটোসরাসের থেকে আলাদা জীনাস। আরও একটা বিখ্যাত নাম এই দুটোর সাথে উচ্চারিত হয়। পঞ্চাশ ফুট উঁচু, মাথা থেকে লেজের ডগা অবধি পঁচাশি ফুট লম্বা, পঞ্চান্ন টনের কাছাকাছি ওজন।


সেই সীনটা কোনোদিন ভুলতে পারব না।

পান্না-সবুজ মাঠের ঢাল বেয়ে দুটো জীপ এঁকেবেঁকে এসে কয়েকটা ইউক্যালিপটাস গাছের পাশে থামল। এলি স্যাটলার - প্যালিওবটানিস্ট - একটা গাছের পাতা নিয়ে ধন্দে পড়েছেন, কারণ পাতাটা যে গাছের তা ছ'শো-সাতশো লক্ষ বছর হল পৃথিবী থেকে লোপ পেয়েছে, এ পাতা এরকম তাজা সবুজ অবস্থায় তাঁর হাতে পড়া অসম্ভব। ডঃ গ্র্যান্টকে ডেকে সেকথা বলতে চাইছেন। কিন্তু গ্র্যান্টের কান এলির দিকে নেই। গ্র্যান্টের চোখ ঘুরে গেছে অন্য দিকে, সীট থেকে তাঁর শরীরটা আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল, চোখ থেকে কালো চশমাটা কাঁপা হাতে খুলে এল। অসহ্য বিস্ময় আর অবিশ্বাসে গ্র্যান্টের বাকশক্তি লোপ পেয়েছে, আচ্ছন্নের মতো একটা হাত বাড়িয়ে এলির মাথাটা পাতাটার থেকে ঘুরিয়ে সটান বাঁদিকে করে দিলেন।

পরপর দাঁড়ানো ইউক্যালিপটাসগুলোর পাশ বেয়ে ধীর পায়ে এসে দাঁড়িয়েছে একটা জীব। ডালপালা ছাড়িয়ে তার মুখ উঠে গেছে গাছের মাথার কাছে, লম্বা গলা বাড়িয়ে সে ইউক্যালিপটাসের মগডালে কচি কচি পাতায় কামড় বসিয়েছে।

কত লম্বা হবে ওর গলা?

জীপ থেকে নেমে এসেছেন জন হ্যামন্ড। ব্র্যাকিওসরের গলা? তিরিশ ফুট। আর চলাফেরার স্পীড বলতে, টি রেক্সটাকে ঘন্টায় বত্রিশ মাইলে ছুটতে দেখা গেছে। - টি রেক্স? ... ডঃ গ্র্যান্ট টলতে টলতে ঘাসের ওপর বসে পড়েন। এলি পাশে। দু'চোখে স্বপ্ন ভরা, ওয়াকিং স্টিকের মাথায় বসানো অ্যাম্বারটা চেপে ধরে শুভ্রকেশ বৃদ্ধ এগিয়ে আসেন, একটা অপরিসীম তৃপ্তির হাসি, তাঁর অনেক, অনেক দিনের স্বপ্নকে আজ তিনি দুনিয়ার সামনে খুলে দিচ্ছেন।


" ডক্টর গ্র্যান্ট.., মাই ডীয়ার ডক্টর স্যাটলার.., - ওয়েলকাম টু জুরাসিক পার্ক। "



.....

ব্র্যাকিওসরাস। ১৯০৩ সালে মার্কিন প্রত্নতত্ত্ববিদ এলমার রিগ্‌স গ্র্যাণ্ড ক্যানিয়ন উপত্যকায় এর হাড় প্রথম খুঁজে পান। কলোরাডো নদীর গ্র্যাণ্ড ক্যানিয়ন, 'Rocky Mountains high'-এর সেই কলোরাডো। হাড়গুলো নতুন এক সরোপডের বটে, কিন্তু সাধারণ সরোপডদের থেকে আলাদা একটা লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট্য দেখা গেল। সরোপডদের দেহে সামনের পায়ের চেয়ে পিছনের পা সচরাচর বেশী লম্বা হয় - আফ্রিকান হাতিদের গড়ন যেমন। এই ডাইনোসরের সামনের পায়ের দৈর্ঘ্য পিছনের তুলনায় অনেক বেশী। যেন পা-কে ছাপিয়ে 'হাত'ই বেশী স্পষ্ট হয়ে উঠতে চায় এর গঠনে। গ্রীকে brachion, মানে 'বাহু', আর জাতিগত উপাধি 'সরাস'; নতুন আবিষ্কারের নাম রাখা হল ব্র্যাকিওসরাস। জিরাফের চেহারার সাথে এই চেহারার মিল আছে, ঘাড় থেকে লেজের গোড়া মাটির সাথে সমান্তরাল নয়, সামনে থেকে পিছনে ঢালু হয়ে নেমেছে। আরেকটা তফাৎও খেয়াল করার মতো। অন্যান্য সরোপডদের শরীরের তুলনায় লেজ যতটা লম্বা, ব্র্যাকিওসরের লেজ সে তুলনায় খাটো। এমনটা হওয়ার কারণ লুকিয়ে আছে ওই ব্যতিক্রমী সামনের পায়ের মধ্যে।

ইউ.এস.এ-র পোর্টল্যান্ড শহরে St. John's Bridge নামে একটা সেতু আছে। ছবি ইন্টারনেটে সহজেই পাওয়া যায়। আমাদের হাওড়া ব্রিজ হল cantilever bridge, তার এমাথা-ওমাথা নদীর এপারে-ওপারে লাগানো, দু' প্রান্তের মাঝে এমন কোনো স্তম্ভ বা সাপোর্ট নেই যা গঙ্গার বুকে ব্রিজের ঠেকনা হয়ে নেমেছে। সেন্ট জনস্ ব্রিজ দেখতে অনেকটা হাওড়া ব্রিজের মতোই, কিন্তু ক্যান্টিলিভার ব্রিজ নয়, সাসপেনশন ব্রিজ; দুটো টাওয়ারের দুই জোড়া থাম নদীর মধ্যে পা গেঁথে তাকে ধরে রেখেছে। দুই টাওয়ারের মাঝ দিয়ে ব্রিজের মূল রাস্তা লম্বা হয়ে বেরিয়ে গেছে। এই যে নির্মাণকৌশল, চার থামের ওপর ভর দিয়ে মূল সেতুকে ব্যালেন্স করে টাঙিয়ে দেওয়া, এটাই সাধারণ সরোপডদের শারীরিক গঠনের মূল কথা। অ্যাপাটোসরাসের চেহারা হুবহু সেন্ট জনস্ ব্রিজের মতো, সামনে বাড়িয়ে থাকা লম্বা গলা, পিছনে তাকে কাউন্টারব্যালেন্স করার জন্য দীর্ঘায়িত লেজ, - থামের মতো বিশাল চার পায়ের ভরে শূন্যে ভাসিয়ে রাখা শিরদাঁড়া ও সারা দেহ। প্রকৃতির আইনে এই চেহারা অ্যাপাটোসরাস পেয়েছে, পিছনের অত বড় ভারী লেজ না থাকলে সে হাঁটতে পারত না, এমনকী দাঁড়াতেও পারত না, সামনের দিকে মুখ থুবড়ে পড়ে যেত। কিন্তু ব্র্যাকিওসরাসের শরীরের নকশা আলাদা। সামনের পা লম্বা, বুকের খাঁচা সুবিশাল ও গভীর, ভরকেন্দ্র অপেক্ষাকৃত সামনের দিকে, শরীরের ব্যালেন্স অনেকটাই ওই শক্তিশালী 'হাত'-এর ওপর দিয়ে যায়। পিছনে ওজন বাড়ানোর জন্যে লম্বা লেজের ভূমিকা অ্যাপাটোসরাসের তুলনায় গৌণ। তাই ব্র্যাকিওসরের লেজ খাটো। খাটো মানে প্রায় মিটার সাতেক।

সরোপডরা এরকম লম্বাচওড়া, প্রোসরোপডরা এতটা নয়, তবে কাছাকাছি। এদের দুই দলকে একসাথে বলা হয় 'Sauropodomorph', ('মর্ফ' মানে শরীর) বাংলা করলে হবে 'সরোপডসুলভ চেহারা'। সরোপডোমর্ফ আর থেরোপড, - টিকটিকি-কোমর সরিসকিয়ানদের এই দুটোই বড় ভাগ। সরোপডোমর্ফদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল লম্বা গলা আর ছোটো মাথা; অন্যদিকে ছিল থেরোপডরা।

পৃথিবীতে একটা মাত্র ডাইনোসর আছে যার সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত নাম সাধারণ মানুষের মুখে মুখে চলে, জীনাস নেম, স্পিসিস নেম - দুটোই একসাথে উচ্চারিত হয়। আজ অবধি আর কোনো ডাইনোসর বিজ্ঞানীমহলের বাইরে এতটা জনপ্রিয়তা পায়নি। তার নামের মধ্যেই তার একচ্ছত্রাধিপত্যের পরিচয়, সে ডাইনোসরের রাজা, 'অত্যাচার-সম্রাট' টাইর‍্যানোসরাস রেক্স। জীনাস Tyrannosaurus, অর্থাৎ অত্যাচারী টিকটিকি, স্পিসিস rex, অর্থাৎ king। স্থলচর মাংসাশী ডাইনোসরদের মধ্যে টী-রেক্স সর্ববৃহৎ নয়, জাইগ্যানোটোসরের মতো কেউ কেউ তার চেয়ে বড়। কিন্তু আকারটাই তো রাজকীয়তার শেষ কথা নয়। রেক্স ছাড়া টাইরানোসরাসের আরও অনেক প্রজাতি আছে, টাইরানোসরাস বাদেও অনেক বাঘা বাঘা জাত-শিকারী ডাইনোসর আছে। Carcharodontosaurus আছে,Velociraptor আছে। ভেলোসির‍্যাপটরকে আমরা একরকমভাবে চিনি, 'জুরাসিক পার্ক'-এর র‍্যাপটর এরাই। এরা সবাই থেরোপড। থেরোপডদের মধ্যে থেকেই সবচেয়ে বুদ্ধিমান ও আধুনিক ডাইনোসররা উঠে এসেছিল। এদের একটা শাখা এখনও পৃথিবীতে মজুত আছে। তাদের আমরা বলি 'পাখি'।

টী-রেক্সের চালচলন দেখে সিনেমায় ডঃ গ্র্যান্ট মন্তব্য করেছিলেন - ঠিক পাখির মতো। যদি উটপাখির পায়ের দিকে তাকাই, তাহলে একথার জলজ্যান্ত প্রমাণ পাওয়া যাবে। এখন আইনক্সে-আইনক্সে 'জুরাসিক ওয়ার্ল্ড' চলছে, হল থেকে বেরোনোর পর যদি কাউকে উটপাখির পায়ের থাবার ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়, বলোতো কীসের পা, সে একবাক্যে বলে ফেলতে পারে - 'T Rex!' কেবল একটা মস্ত ফারাকের জন্য হুবহু মিলবে না, টী-রেক্সের পায়ে তিনটে আঙুল, উটপাখির দুটো। উটপাখির আহারও অনেকটা নিরীহ, গাছ-বীজ-ফল-ফুল-দানার ওপর দিয়েই যায়, মাঝেমাঝে ফড়িং-পঙ্গপালও চলে। খাওয়ার সাথে সাথে পেটে চালান হয় কিছু নুড়ি পাথর, হজমে সাহায্য করার জন্য। এটা কয়েকজাতের প্রাণীর একটা মার্কামারা বৈশিষ্ট্য, কুমীর-অ্যালিগেটরদের মধ্যে এ জিনিস হামেশা দেখা যায়। এদের শরীরে খাদ্যনালীতে gizzard নামে একটা অংশ থাকে, তাতে গেলা খাবার মাড়াই-পেষাই হয়ে নরম সহজপাচ্য চেহারা নেয়। এই মাড়াইয়ের সময় কাজে লাগে ওই ছোট ছোট নুড়ি, গিজার্ডে থেকে ওগুলো খাবারের শক্ত টুকরোকে ভাঙতে সাহায্য করে। খাদ্যনালীতে গিজার্ড থাকা উটপাখি আর টী-রেক্সের মধ্যে আরেকটা বড় মিল; পাখি, কুমীর, ডাইনোসর, উড়ুক্কু Pterosaur - এদের সবাই গিজার্ডধারী জীব । অডিটোরিয়ামের পাশের খাঁচার এই ময়ূর, এও।

ময়ূরের চেয়েও নাটকীয়ভাবে যাদের মধ্যে র‍্যাপটর বেঁচে আছে, তাদের মধ্যে অন্যতম হল আফ্রিকার সাভানা প্রান্তরের secretarybird। মাথার পাশ দিয়ে কয়েকটা কালো পালক পিছনে ঝুঁটির মতো বেরিয়ে থাকে, দেখতে লাগে কানে-কলম-গোঁজা সাবেক কালের সেক্রেটারী বা অফিস কেরানির মতো, তাই এই নাম; বাংলায় 'কেরানিপাখি'। সেরেঙ্গেটির মাঠে যেখানে ডোরাকাটা জেব্রা আর দাড়িঝোলা বাইসন-মার্কা চেহারার উইল্ডবীস্টরা সারাদিন পালে পালে ঘুরে বেড়ায়, সেই মুলুকে এই পাখি দেখা যায়। সুন্দর চেহারা, চোখের চারপাশে উজ্জ্বল কমলা রঙ, মাথার পেছনে কালো ঝুঁটি, সাদা পালকে ঢাকা শরীর, লেজ সহ পিছনদিকটা - 'কোট'-এর 'টেইল' যেখানটা হবার কথা - সেটা কালো, লম্বা পায়ের ওপরদিক কালো পালকে ঢাকা। নীচের অংশ পালকছাড়া, শক্ত আঁশে ঢাকা, আঙুলে নখ। সামনের দিকে তিনটে আঙুল, পিছনে একটা।

কেরানিপাখি পুরোদস্তুর বার্ড অফ প্রে। ঈগল চিল শকুনদের জাতভাই। ডানা মেলে আকাশে উড়তে পারে, পায়ে হেঁটেও শিকার ধরতে পারে। হেঁটে শিকার করার দিকেই ঝোঁকটা বেশী। লম্বা লম্বা পা ফেলে মাঠের ইঁদুর, খরগোশ, বেজী, টিকটিকি, ব্যাঙ, সাপ তাড়িয়ে ধরে কেরানিপাখি পেট ভরায়। এদিক থেকে বাকি শিকারী পাখিদের মধ্যে সে ব্যতিক্রম। কেরানিপাখির সবচেয়ে বেশী নামডাক সাপের যম হিসেবে। গোখরোর সাথে কেরানিপাখির লড়াই দেখলে বোঝা যায়, আদতে ব্যাপারটা কোনো লড়াইই নয়। শক্তিশালী পা দুটো এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়। সাপের গায়ের ওপর বার বার লাথি চালিয়ে আর চাপড় মেরে কেরানিপাখি তার শিরদাঁড়া ভেঙে দেয়। আহত, অচেতনপ্রায় অবস্থায় সাপের আর কিছুই করার থাকে না। অন্যান্য শিকারও এইভাবেই ধরা চলে, সেক্ষেত্রে কাজ আরও সোজা, ইঁদুরের মতো ছোটোখাটো প্রাণীরা ঠোঁটের ধারালো ঠোকরে অনায়াসেই ঘায়েল হয়। র‍্যাপটর শ্রেণীর পাখিদের স্বভাব পায়ের নখ দিয়ে শিকার ছিঁড়ে খাওয়া, কেরানিপাখির মধ্যেও তা দেখা গেছে। ছোটো gazelle বা হরিণছানা কেরানিপাখির শিকার হয়েছে, এমনও শোনা যায়।

সেক্রেটারীবার্ড বড় পাখি, খাড়াই চার ফুট। এমন পাখিকে শিকারী বলে মেনে নিতে অসুবিধা হয় না। ষাট মিলিয়ন বছর আগেকার অতিকায় টেরর বার্ডরাও এভাবেই শিকার ধরত। কিন্তু আমাদের বাড়ির কার্নিশে লাফিয়ে বেড়ানো ছোট্ট চড়ুই, তাকে চট্ করে 'ঘাতক' হিসেবে কল্পনা করতে আটকায়। চড়াই তো ধান খুঁটে খায়, কাক আর কুঁকড়োবুড়োর লড়াইয়ের ফাঁকে চুপিচুপি পায়েস খেয়ে পালায়। হ্যাঁ, পোকামাকড়ও খায় বৈকী। তাহলে সেই আরশোলা বা উচ্চিংড়েদের কাছে তার পরিচয়টা কেমন ঠেকে?

আমরা সাধারণ মানুষ, সবকিছু আমাদের একপেশে দৃষ্টি দিয়ে দেখি। যাঁরা প্রকৃতি-ঘাঁটা মানুষ, তাঁদের বয়ান পড়লে অন্য এক ছবি আমাদের চোখে ধরা পড়ে। সেই ছবি বহুমাত্রিক, আলাদা আলাদা জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখলে একেকটা চরিত্রের পরিচয় পাল্টে পাল্টে যায়। কলেজে উঠে পড়েছিলাম Ted Hughes-এর কবিতা, 'Thrushes'।

থ্রাশ চড়ুইপাখিরই একটু দূরের আত্মীয়, প্যাসেরিফর্মেস বর্গের পাখি। মিষ্টি গলার জন্য সঙবার্ড হিসেবে বিখ্যাত। ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতায় গ্রাম ছেড়ে শহরে-আসা মেয়ে সুসান, উড স্ট্রীটের মোড়ে থ্রাশের গান শুনে পথ চলতে চলতে আনমনা হয়ে যেত। রবীন্দ্রনাথের লেখায় সেই আনমনের কথা অমর হয়ে আছে -

হায় রে রাজধানী পাষাণকায়া!
বিরাট মুঠিতলে চাপিছে দৃঢ়বলে
ব্যাকুল বালিকারে, নাহিকো মায়া!
কোথা সে খোলা মাঠ, উদার পথঘাট,
পাখির গান কই, বনের ছায়া!

রবীন্দ্রনাথের 'বধূ' রূপান্তরে লণ্ডনের পথে থমকে দাঁড়ানো সুসান; ভোরের আলোর সাথে সাথে উড স্ট্রীটের কোণে থ্রাশের গান ফোটে, তিন বছর ধরে সেই গান তাকে শহরের বন্দীদশার মধ্যে প্রাণ দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে। আমাদের কাব্যে থ্রাশের স্থান এইখানে।

সেখানে আশৈশব পশুপ্রেমী কবি টেড হিউজ কী লিখলেন?

"
Thrushes

Terrifying are the attent sleek thrushes on the lawn,
More coiled steel than living - a poised
Dark deadly eye, those delicate legs
Triggered to stirrings beyond sense - with a start, a bounce,
a stab
Overtake the instant and drag out some writhing thing.
No indolent procrastinations and no yawning states,
No sighs or head-scratchings. Nothing but bounce and stab
And a ravening second.

Is it their single-mind-sized skulls, or a trained
Body, or genius, or a nestful of brats
Gives their days this bullet and automatic
Purpose? Mozart's brain had it, and the shark's mouth
That hungers down the blood-smell even to a leak of its own
Side and devouring of itself: efficiency which
Strikes too streamlined for any doubt to pluck at it
Or obstruction deflect.

....... "


বাউন্স অ্যাণ্ড স্ট্যাব। দক্ষ বক্সার যেমন রিংয়ের মধ্যে নিপুণ ফুটওয়ার্কে প্রতিদ্বন্দ্বীকে কোণঠাসা করে, ঠিক তেমনি - তার চেয়েও বেশী ক্ষিপ্রতায়, অব্যর্থ লক্ষ্যে শিকারকে বিঁধে ফেলে ইস্পাত-নিষ্ঠুর ন্যাচারাল বর্ন কিলার। একচুল সময় নষ্ট নেই, এক ফোঁটা ইতস্তত নেই, - সজীব সচেতন মৃত্যুবাণ। মোৎজার্টস ব্রেন... শার্কস মাউথ ... - যেন সতর্ক সম্ভ্রমে শার্লক হোম্‌স প্রফেসর মরিয়ার্টির বর্ণনা দিচ্ছেন। এই বর্ণনা নিছক আকাশকুসুম কল্পনা নয়, টেড হিউজ ছোটো থেকে জীবজন্তু-ঘেঁষা লোক, জঙ্গলের আইন তাঁর ভালোমতো জানা ছিল। তৈরী চোখ ছিল, প্রচলিত ইমেজের আড়াল থেকে থ্রাশ পাখির অন্য পরিচয়টা তিনি কবিতায় বের করে এনেছিলেন। প্রকৃতির এই ব্যবস্থায় 'ক্রৌঞ্চ' আর 'নিষাদ' অভিন্ন - ব্যাধই পাখি, পাখিই ব্যাধ।

থেরোপডদের স্বর্ণযুগ ছিল জুরাসিক আর ক্রীটাশিয়াস, জুরাসিকেই প্রথম 'ফেদার্ড বাইপেড' পাখিরা এসেছিল। থেরোপড ডাইনোসরদের মধ্যেও কারও কারও গায়ে পালক ছিল, যেমন র‍্যাপটর।

'জুরাসিক পার্ক' সিনেমা হয়েছিল ১৯৯৩ সালে, তার পরে গবেষণা অনেকটা এগিয়ে গেছে। সিনেমায় র‍্যাপটরদের যেরকম চেহারা আছে, সেই মডেল এখন আর চলে না। সিনেমার চেহারায় র‍্যাপটরের গা ছিল গিরগিটি বা কোমোডো মনিটরদের মতো, খসখসে শুকনো আঁশ - ভালো বাংলায় 'শল্ক', মোটা চামড়া বর্মের মতো মজবুত, হিংস্র চেহারা। আধুনিক মতে কিন্তু র‍্যাপটরদের গায়ে পালক ছিল। এখনকার পাখিদের সাথে প্রায় কোনো তফাতই ছিল না, রীতিমতো তৈরী ডানা, লম্বা পালক-বসানো লেজ, ফাঁপা হাড়, কঙ্কালের গড়ন, - সিল্যুট ছায়া দেখলে যে কেউ পাখি বলে ভুল করবে। সাইজেও সিনেমার মতো অত বড় হত না। Velociraptor mongoliensis (মঙ্গোলিয়ায় ফসিল পাওয়া গিয়েছিল) আমাদের হাঁটুসমান উঁচু ছিল, হয়তো আরেকটু বেশী। গলা মাথা বুক পিঠ ল্যাজ পুরোপুরি পালকে ঢাকা, বিজ্ঞানীরা তো মনে করেন এদের পূর্বপুরুষরা উড়তেও পারত, পরে অভিযোজনের ফলে র‍্যাপটররা ওড়ার ক্ষমতা হারালেও পালক হারায়নি, যেমন পালক হারায়নি আমাদের এমু-টার্কি-উটপাখিরা। ২০০৭ সালে মঙ্গোলিয়ায় জীবাশ্মবিদরা র‍্যাপটরের হাতের হাড়ে স্পষ্ট quill knobs খুঁজে পান। হাত না বলে ডানা বলাই উচিত। 'কুইল নব' পাখিদের হাড়ে পাওয়া যায়, যেখানে যেখানে পালক মূল শরীরের সাথে যুক্ত হয়েছে, সেই সেই পয়েন্টে এটা থাকে। ভেলোসির‍্যাপটরের হাড়ে কুইল নব আবিষ্কার হয়ে বিজ্ঞানীদের অনেকদিনের একটা সন্দেহ ঠিক প্রমাণিত হল - র‍্যাপটর পালকওয়ালা ডাইনোসর। শুধু র‍্যাপটর কেন? টী-রেক্সও আদতে পালকওয়ালা ডাইনোসর।


টী-রেক্সের গায়ে পালক, শুনলে মনে হয় লিওনেল মেসি ব্যাট হাতে ওভালে নামছেন গোছের একটা ব্যাপার। সত্যি কিন্তু টাইরানোসরাসের গায়ে পালক হত। মাইকেল ক্রাইটন যখন স্পিলবার্গের অনুরোধ ঠেলতে না পেরে 'জুরাসিক পার্ক' উপন্যাসের সিকোয়েল 'দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড' লিখেছিলেন, তখন প্রথম সিনেমার পর আরও দু'বছর কেটে গেছে। দু'নম্বর বইয়ে ক্রাইটন বাচ্চা টী-রেক্সের যে বর্ণনা রেখেছেন তাতে পালকের কথা আছে। এখন শুধু বাচ্চা নয়, পূর্ণবয়স্ক টী-রেক্সের মডেলেও পালক রাখা হয়। র‍্যাপটরের মতো অবিকল পাখি নয়, তবুও কম কী?

কিন্তু কথা হল, পাখির মতো পালক আছে বটে, কিন্তু সত্যিসত্যি পাখি তো এরা নয়? Avialae বলে যে ভাগের মধ্যে যাবতীয় বর্তমান ও লোপ-পাওয়া পাখিরা পড়ে, তার আওতায় তো এরা আসে না। কাজেই মানতে হয় যে পাখি ছাড়াও কারো কারো পালক থাকে, ইদানীং না থাকলেও, আগে থাকত। পাখির সাথে ডাইনোসরদের যোগ আছে, কিন্তু কোন্ পথে তা এসেছে, তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে আরেকটা বড় জিনিস খেয়াল হল।

এই যে পাখি, এ হল স্তন্যপায়ীদের সহোদর class। Class বলতে, পুরো প্রাণীজগতকে ধাপে ধাপে বড় ভাগ থেকে ছোটো ভাগ - এইভাবে সাজানো হয়, বোঝার সুবিধার জন্য, যেমন - রাষ্ট্র, রাজ্য, জেলা, মহকুমা, থানা - এইভাবে ভূগোলে জায়গা চেনার মাপ বড় থেকে ছোট করে আনা হয়। একটা রাষ্ট্রের মধ্যে অনেকগুলো রাজ্য, প্রতিটা রাজ্যে কয়েকটা করে জেলা, একেকটা জেলায় খানকয়েক মহকুমা, - এইভাবে ধাপ নামতে থাকে। তেমনভাবে প্রাণীজগতেরও একটা সজ্জা আছে। বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের মধ্যে বেশ কয়েকরকম সজ্জা নিয়ে মতের এদিক-ওদিক আছে, মোটের ওপর ধরনটা পরপর বড় থেকে ছোট সাজালে এরকম দাঁড়ায় - Kingdom > Phylum > Class > Order > Family > Genus > Species। স্কুলে থাকতে পড়া মনে রাখার জন্য এই ক্রমটার শর্টহ্যাণ্ড ছিল - Kids prefer cheese over fried green spinach! লাইকেব্‌ল, সন্দেহ কী। এছাড়া খুচরো কিছু কিছু subphylum (ফাইলামের চেয়ে ছোটো কিন্তু ক্লাসের চেয়ে বড়), subfamily (ফ্যামিলির চেয়ে ছোটো কিন্তু জীনাসের চেয়ে বড়) - এসব আছে, সেসব ততটা মনে রাখতে হয় না, 'সাব-'এর পরে কী লেজুড় আছে তাই দেখেই চেনা যায়।

যত মেরুদণ্ডী প্রাণী আছে, সবাইকে ধরে একটা সাবফাইলাম তৈরী হয়েছে - Vertebrata। নামের মধ্যে 'ভার্টিব্রা' দেখেই চেনা যায়। এই ভার্টিব্রাটার মধ্যে মাছ-ব্যাঙ-সাপ-টিকটিকি-কাক-চিল-বাঘ-হাতি-মানুষ সবাই পড়ে। মোট সাতটা ক্লাস - তার তিনটেয় তিনরকমের মাছ, একটায় উভচর, একটায় সরীসৃপ, একটায় পাখি, একটায় স্তন্যপায়ী।

এই যে পাখি, এ তো আমাদের মতো উষ্ণ রক্তের জীব, এর রক্ত গরম। কিন্তু সরীসৃপরা, সাপ, টিকটিকি, এরা - এদের রক্ত না ঠাণ্ডা? তাহলে?

শীতল রক্তের সরীসৃপ ডাইনোসর থেকে গরম রক্তের পাখি হল কী করে? - এর উত্তরটা এককথায় দেবার মতো নয়। প্রাণীজগতের একটা মূল জায়গায় আমরা হাত দিয়েছি।

আমরা জানি, সূর্য না থাকলে পৃথিবীতে প্রাণের সৃষ্টি সম্ভব হত না। আলো আর তাপ, সূর্য থেকে বিকির্ণ তেজ মূলত এই দুই চেহারায় পৃথিবীতে আসে, ইংরেজীতে বলে radiant energy। পৃথিবীর বুকে যত প্রাণী, তাদের প্রত্যেকের দেহে যে অবিরাম জৈবরাসায়নিক বিক্রিয়া চলছে, তার মধ্যে এই এনার্জির স্রোত বয়ে যাচ্ছে। পুষ্টি, প্রজনন, যাবতীয় শারীরবৃত্তীয় কাজ - এর গোড়ায় যে প্রক্রিয়া চলে, বিজ্ঞানের ভাষায় তার নাম বিপাক, বা metabolism। মেটাবলিজম আছে বলেই শরীর শরীরের জায়গায় থেকে তার সব কাজ চালাতে পারে। এই মেটাবলিজমের দুই ভাগ, - গড়ার যত কাজ, তাকে বলে anabolism, আর ভাঙার যত কাজ, তাকে বলে catabolism। পরীক্ষার জন্যে আমাদের শর্টহ্যান্ড ছিল: 'আনা-' মানে 'নিয়ে আসা' বা 'গঠন', 'কাটা-' মানে কেটেকুটে ভেঙে ফেলা। আমরা যে খাবার খেলাম, সেই খাবার আমাদের পেটে গিয়ে হজম হল, বড় বড় খাদ্যকণা ভেঙে ছোটো ছোটো কণা হল, তার দরুণ আমরা এনার্জি পেলাম - এটা হল ক্যাটাবলিজম। আর এই ছোটো ছোটো কণা আমাদের শরীরময় ছড়িয়ে গিয়ে হাড়-মাস-রক্ত তৈরী করল, গায়ে গত্তি লাগল - এই হল অ্যানাবলিজম। এই করেই দিনরাত চলেছে। এবার ঘটনা হল, কোনো মেশিন চালাতে গেলে তাকে ওয়ার্ম-আপ করাতে হয়। একটু গরম হলে তারপর গড়গড়িয়ে কাজ চলে। আমাদের শরীরেরও কাজ করার জন্য একটা নূন্যতম উষ্ণতা লাগে। সেটুকু না পেলে আমরা ঠাণ্ডায় জমে মারা যাই।

তাহলে সব প্রাণীরই শরীর গরম রাখার একটা ব্যবস্থা করতে হয়। বিভিন্ন প্রাণী এই কাজটা বিভিন্নভাবে করে থাকে। জীবজন্তুদের গা গরম রাখার যতরকম কায়দাকানুন, তার সবগুলোকে একসাথে নিলে দেখা যায় যে তাদের দুটো প্রধান ভাগে ভাগ করা যাচ্ছে।

এক হল, শরীরের বাইরের পরিবেশের ওপর নির্ভর করা। বাইরে কতটা গরম পড়েছে, কতটা রোদ, কতটা ছায়া, জলের তাপমাত্রা কত - এই সবের ওপর নির্ভর করে, তার সাথে তাল মিলিয়ে নিজের রোজকার চলন ঠিক রাখে যারা, তারা এই দলে পড়ে। এদেরকে ক্রমাগত বাইরে থেকে পাওয়া তাপের ওপর নির্ভর করে চলতে হয়, শরীর যাতে অতিরিক্ত গরম বা অতিরিক্ত ঠাণ্ডা না হয়ে পড়ে সেই খেয়াল রাখতে হয়। বেশী গরম হয়ে গেলেও মৃত্যু, বেশী ঠাণ্ডা হলেও তাই। এই ধরনের প্রাণীদের বলে ectothermic প্রাণী, বা এক্টোথার্ম। এদের যে শারীরিক তাপমানের ওঠানামা হওয়া, একে বলে poikilothermy, সেই সুবাদে এদেরকে পইকিলোথার্মিক জীবও বলা যায়। শামুক, কীটপতঙ্গ, মাছ, উভচর, সরীসৃপ - এরা সবাই এক্টোথার্ম। কুমীর নদীর পাড়ে শুয়ে শুয়ে রোদ পোহায়, শীতের রোদেলা সকালে প্রজাপতি গাছের পাতায় বসে ডানা মেলে তাপ নেয়। এ সবই মেটাবলিজমের জন্য শরীরকে গরম রাখার আয়োজন। কুমীর যদি রোদ পোহাতে পোহাতে ঠিক সময়ে জলে ডুব না দেয়, তাহলে তার শরীর খুব বেশী গরম হয়ে যাবে, প্রাণসংশয় দেখা দেবে। জল-ডাঙা জল-ডাঙা করে করে তাকে ব্যালেন্স রাখতে হয়। সাপ, টিকটিকি - সবাই এরা এক্টোথার্মিক, সাদা বাংলায় যাকে বলি 'শীতল রক্তের প্রাণী'। আসলে শীতল রক্ত না, যেমন রোদ তেমন রক্ত।

দুই হল, দেহের মধ্যেকার শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই নিজের দরকারী তাপ তৈরী করে নেওয়া। বাইরে যতই ঠাণ্ডা বা গরম পড়ুক, শরীরের তাপমান অবিচল থাকবে, তার জোগান আসছে ক্যাটাবলিজমের কাটাছেঁড়ার মারফত। তথাকথিত 'উষ্ণ রক্তের' প্রাণীরা এই দলে পড়ে, নাম এন্ডোথার্ম। পাখি, স্তন্যপায়ী - এরা সবাই এন্ডোথার্ম। এরা যে বাইরের রোদজলের থেকে স্বতন্ত্রভাবে শরীরের তাপমাত্রা বজায় রাখে, এর নাম thermal homeostasis: 'থার্ম-' মানে সবাই জানে, 'হোমিও-' মানে 'সম', 'স্ট্যাসিস' মানে 'স্থিতি'। ভিতরের তাপমান সব অবস্থায় সমান থাকে, তাই এই নাম। এই কায়দায় শরীরকে ঠিকমতো গরম রাখে বলে এন্ডোথার্মদের আরেক নাম হোমিওথার্ম। যদি কোনো কারণে কোনো এন্ডোথার্মের তাপমান এদিক ওদিক হয়, তাহলে বুঝতে হবে তার শরীর সুস্থ নেই। 98.6 °Fছাড়ালেই মায়ের দুশ্চিন্তা, ছেলেটা আবার জ্বরেই পড়ল নাকি! এক্টোথার্মদের কিন্তু দিনের মধ্যে কয়েকবার করে তাপমান ওঠানামা হামেশাই হচ্ছে।

যেসব জানোয়ারকে খুব বেশী দৌড়ঝাঁপ করে শিকার করতে হয়, বা যাদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর চাপ খুব বেশী বলে এনার্জির চাহিদা বেশী হয়, বাইরের প্রকৃতির খেয়ালের ওপর নির্ভর করলে তাদের চলে না। নিজের ক্যালোরির ব্যবস্থা তাদের নিজেদেরকেই করতে হয়। কুমীর শিকার ধরার আগে ভালো করে রোদ পুইয়ে শরীরকে ঝরঝরে করে নেয়, তারপরে জলে ডুব দিয়ে ওত পাতে। অনেকক্ষণ কেটে গিয়েও যদি শিকার না পায়, তখন আবার তাকে আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এসে রোদে বসতে হয়, এতক্ষণে শরীর আবার ঠাণ্ডা হয়ে গেছে বলে। কুমীরকে যদি লাফঝাঁপ করে সারাদিন শিকার করতে হত, তাহলে এক্টোথার্ম হয়ে তার পোষাত না।

ডাইনোসররা এক্টোথার্ম ছিল না এন্ডোথার্ম, এই ডিবেট ডাইনো-বিজ্ঞানীদের মধ্যে বহুকাল চলে আসছে।

ব্র্যাকিওসরাসের যেরকম আকার ও চালচলন, তাতে তার পক্ষে এক্টোথার্ম হওয়া একেবারেই অসম্ভব। সে একজন high browser, গাছপালার উঁচু ডালের পাতা খেয়ে তার আহার সমাধা হয়। প্রাগৈতিহাসিক বনেপ্রান্তরে ধীরমন্থর ভঙ্গিতে হেঁটে বেড়িয়ে সে পেট ভরাত, দিনে একশোকুড়ি কেজি তার খাবার লাগত। জলাভূমিতে তার বসবাস ছিল না, আজকের দিনের জিরাফ বা হাতির মতোই সে শুকনো ডাঙার প্রাণী। একসময় ধারণা করা হত যে ব্র্যাকিওসর নির্ঘাত এক্টোথার্মিক, কারণ তার বিশাল দেহের অতিমাত্রায় গরম হয়ে ওঠার একটা সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছিল, এন্ডোথার্মিক হলে তার পক্ষে সেটা সামাল দেওয়া মুশকিল। পরে দেখা গেল যে তার শরীরের এমন কিছু বিশেষত্ব ছিল যাতে সে এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিল। কীভাবে, সেটা দেখতে গেলে আরেকটা জিনিস মনে করতে হবে।


একটা সলিড শেপের জিনিসকে যদি আকারে দ্বিগুণ, তিনগুণ, চারগুণ করে বাড়ানো হয়, তাহলে তার surface area আর volume, দুটোই বাড়তে থাকে। কিন্তু দুটো বাড়ার হার আলাদা। দুই সেন্টিমিটার লম্বা একটা লুডোর ছক্কা, তার একেকটা ধার 2 cm, একেক পাশের ক্ষেত্রফল 2 x 2 = 4 sq.cm, মোট ছয় পাশ মিলে 24 sq.cm। আর আয়তন 8 cubic cm। এবারে এই কিউবটাকে যদি খানিকটা বড় করে দিই, একেকটা ধার 4 cm লম্বা করে দিই, তাহলে কী হবে দেখা যাক। একেকটা ধার 4 cm, একেক পাশের ক্ষেত্রফল 4 x 4 = 16 sq.cm, মোট ছয় পাশ মিলে 96 sq.cm। আর আয়তন 64 cubic cm। কিউবটাকে বাড়িয়ে 8 cm লম্বা করলে এই হিসেবটা দাঁড়াবে ছ'পাশ মিলে 384 sq.cm, আয়তন 512 cubic cm।

একটা প্যাটার্ন এর থেকে উঠে আসছে। Surface area বাড়ার হারের চেয়ে, volume বাড়ার হার অনেক বেশী। যত বড় প্রাণী হবে, দেহের ভরের অনুপাতে তার ত্বকের ক্ষেত্রফল তত কমবে। আর আমরা জানি, তাপ বিকিরণের হার নির্ভর করে surface area-র ওপর। গরম চা পেয়ালা থেকে পিরিচে ঢেলে নিলে তাড়াতাড়ি ঠাণ্ডা হয়।

মানে কী দাঁড়াল? যত বিশালদেহী জীব, তার শরীর গরম থাকে তত সহজে। যত ছোটো প্রাণী, তার তাপ জুড়িয়ে যায় তত তাড়াতাড়ি। এইজন্যেই মেরু ভালুক বা সাইবেরিয়ার সাদা বাঘের শরীর তাদের জাতের মধ্যে সবচেয়ে বড়। ওতে ওদের গা গরম থাকতে সাহায্য হয়। অন্যদিকে রোগা ছিপছিপে হালকা জানোয়াররা গরম দেশে সহজে বেঁচে থাকে। যখন কোনো প্রাণী বড় দেহ হওয়া সত্ত্বেও গরম দেশের বাসিন্দা হয়, তখন তাকে শরীরে ত্বকের ক্ষেত্রফল বাড়ানোর জন্য নানারকম উপায় করতে হয়। যেমন হাতি। ভারতীয় হাতির চেয়ে আফ্রিকার হাতিদের অনেক বেশী গরমে দিন কাটাতে হয়। তাই, তাদের কান আমাদের দেশী হাতির কানের চেয়ে অনেকটাই বড়, আমাদের হাতির কান যদি কুলো হয়, ওদের কান তবে চাটাই। এই বড় পর্দার মতো কানের গায়ে জালের মতো ছড়িয়ে আছে শয়ে শয়ে রক্তজালিকা, শিরা-উপশিরা, তাদের মধ্যে দিয়ে অবিরাম রক্তের স্রোত শরীর ঘুরে এসে বয়ে যাচ্ছে। বয়ে যাচ্ছে, আর এতটা বেশী জায়গা পাওয়ার সুবিধায় অনেকখানি তাপ ছেড়ে দিচ্ছে বাতাসে। হাতির শরীর ঠাণ্ডা হচ্ছে।

এরকম নানাভাবে পশুপাখিরা নিজেদেরকে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। ব্র্যাকিওসরাসও তাই নিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ব্র্যাকিওসরের বুকের খাঁচার ভিতরে ফুসফুস ছাড়াও বাড়তি কিছু air sac ছিল, যেমন পাখিদের থাকে। এর ফলে ওদের একদিকে যেমন ওজন কমত, অন্যদিকে তেমন তাপ ছাড়ার সারফেস এরিয়ার অনেকটা সুবিধা হত। নাকের ফুটোর কাছেও এরকম 'ছড়ানোর' ব্যবস্থা ছিল। মোটের ওপর নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ব্র্যাকিওসরাসরা এক্টোথার্ম নয়, এন্ডোথার্মই।

র‍্যাপটর বা টী-রেক্সের মতো শিকারী ডাইনোসররাও এন্ডোথার্মিক ছিল, সহজেই আন্দাজ করা যায়। সারাদিন ডাকবিল তাড়িয়ে ফিরে শিকার ধরা ঠাণ্ডা রক্তের কারও কর্ম নয়। পাখিরা যে ডানা ঝাপটে আকাশে ওড়ে, তাতে প্রচুর প্রচুর শক্তি খরচ হয়, ওরাও অনিবার্যভাবে এন্ডোথার্ম। ধারণা করা হয়, থেরোপডরা সবাই মোটামুটি এন্ডোথার্মিকই ছিল। কাজেই পাখি আর ডাইনোতে এ ব্যাপারে কোনো বিভেদ নেই। ডাইনোসর বলতে সব ডাইনো নয় অবশ্য। স্টেগোসরাসদের মতো পুরোনো ডাইনোসররা ঠিক কী ছিল, সেই নিয়ে এখনও অনেক বিতর্ক আছে।

(চলবে)
পুরানো সেই দিনের কথা (২)

"বর্ষামঙ্গল"
.
.
.
.
.

এইমাত্র বলছিলাম, নানাভাবে পশুপাখিরা নিজেদেরকে নানারকম গরম-ঠাণ্ডার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। কিন্তু একটা ব্যাপার আমরা খেয়াল করিনি। একটা বিরাট কথা আমাদের নজর এড়িয়ে এতক্ষণ আমাদের ফাঁকি দিয়ে এসেছে। বিপাক বা মেটাবলিজম - এ তো প্রাণের শর্ত। প্রাণের অধিকারী কি এই পৃথিবীতে কেবল আমরাই, পশুপাখিরাই?

আমরা যতক্ষণ ডাইনোসরের সূত্র ধরে পাখির বংশপরিচয় খুঁজতে ব্যস্ত থেকেছি, বিশালদেহী ব্র্যাকিওসরের খাওয়ার মাপ আর টী-রেক্স বা কেরানিপাখির শিকার ধরা নিয়ে ছেলেমানুষী করেছি, - আমাদের চারপাশে অফুরান অথচ নীরব উপস্থিতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছেরা ততক্ষণ আমাদের অলক্ষ্যেই মুচকি মুচকি হেসেছে। প্রাণের দরবারে পশুপাখিদের পাশাপাশি গাছের গৌরব সমান, হয়তো গাছ মহত্তর। আমরা 'কত বড়'-তে সহজেই চমকিত হই। একাল-সেকাল মিলিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পশু যে, তার দৈর্ঘ্য তিরিশ মিটার, ওজন একশো আশি টন। আর আমেরিকার রেডউড গাছ লম্বায় হয় পঁচাশি মিটারের ওপর, ওজনের কথা আর নাই বা ভাবলাম। বাঁচে দু'হাজার বছরের কাছাকাছি।

তাহলে গাছেরা খুব বেশী গরম বা খুব বেশী ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া থেকে নিজেদের বাঁচায় কী করে? ওদের শরীরে রক্ত বলে কিছু নেই, কাজেই গরম-রক্ত ঠাণ্ডা-রক্তের হিসাব এখানে খাটবে না। গাছের দেহে প্রাণরস বলতে মূলতঃ দুটো - এক হল জল, আর এক হল খাদ্যরস। ওদের খেয়াল রাখতে হয় যাতে শরীর শুকিয়ে না যায় বা জমে না যায়। বেশী গরমে শরীরের কিছু কিছু উপাদানও নষ্ট হয়ে যেতে পারে, কোষের সরস অংশের কোনো কোনো ধর্ম নষ্ট হতে পারে। কাজেই উষ্ণতাকে সামলে রাখা খুবই প্রয়োজন।

উষ্ণতা কাকে বলে? কতটা তাপ জমে আছে, তার মাপই হল উষ্ণতা, সরলতর ভাষায় - তাপমাত্রা। তাহলে উষ্ণতা কমাতে হলে এই তাপ খরচ করার রাস্তা দেখতে হয়। গাছের হাতে এর একটা খুব সহজ উপায় আছে, - জল। গাছের সারা শরীর জুড়েই কিছু নির্দিষ্ট অংশে জল ধরা থাকে, সেই জলকে যদি বাষ্প হতে দেওয়া যায়, তাহলেই গাছের গরম জুড়ায়। ঠিক যে কারণে আমাদের ঘাম হয়। আমরা যদি না ঘামতাম, তাহলে আমাদের বাঁচা কঠিন হত। জল থেকে ভাপ হয়ে উবে যেতে যে তাপ দরকার, সেটা ঘাম নেয় আমাদের শরীর থেকেই; ফলে খানিকটা heat খরচ হয়, আমাদের গা ঠাণ্ডা হয়। গাছও অনেকটা একই কাজ করে, শরীরের খুব সূক্ষ্ম একধরনের ছিদ্র দিয়ে বিন্দু বিন্দু জল বাতাসে বাষ্প করে ছেড়ে দেয়, একে বলে transpiration। এতে জল খানিকটা খরচ হয় ঠিকই, কিন্তু সেটা তেমন সমস্যা হয় না, বেশিরভাগ গাছের কাছে জল জোগাড় করা কঠিন নয়। কিন্তু যেসব গাছ জল থেকে দূরে মরুভূমিতে জন্মায়, তাদের ঠাণ্ডা থাকার জন্য অন্য পথ নিতে হয়।


মরুভূমির গাছেরা সহজে জল পায় না। তাই ট্রান্সপিরেশনের রাস্তা তাদের কাছে বন্ধ, জল খরচ করে ফেললে শুকিয়ে মরতে হবে। এরা অত্যধিক তাপ থেকে বাঁচার জন্য নিজেদের শারীরিক গঠন বদলে নেয়। মাটির সাথে সংস্পর্শ যথাসম্ভব কমিয়ে আনে - যাতে তেতে ওঠা মাটির ছোঁয়ায় গরম না লাগে, হাওয়ায় হাওয়ায় শরীর ঠাণ্ডা থাকে। শরীরের যে অংশ মাটির ওপরে, তার গড়ন এমন হয় যাতে সূর্যের রোদ সরাসরি গায়ে না পড়ে। ফণিমনসার চেহারা মনে করলে এটা পরিষ্কার হয়ে যায়। চ্যাপ্টা সবুজ চাকতির মতো কাণ্ডের অংশগুলো খাড়াভাবে রয়েছে, মাটির সমান্তরালভাবে নেই। সমান্তরাল থাকলেই রোদটা সরাসরি গায়ে পড়ত, - যেমন আম-জাম-কাঁঠালের পাতায় পড়ে। কিন্তু ফণিমনসার চ্যাপ্টা চাকতি যেহেতু খাড়াভাবে সাজানো, তার ওপর রোদের প্রকোপ হয় অনেক কম।

মরুভূমির মধ্যে অবশ্য মেরু অঞ্চলও পড়ে, - সেগুলো ঠাণ্ডা মরুভূমি। জলের অভাব সেখানেও সমান। বরফ প্রচুর, কিন্তু nor any drop to drink। শরীরের মধ্যেকার জল সেই ঠাণ্ডায় জমে যেতে চায়। যদি জমে যায়, তাহলে গাছের মরণ নিশ্চিত। কাজেই এদের প্রথম কাজ হয় শরীরকে ঠাণ্ডা না হতে দেওয়া, যতটা পারা যায় গরম রাখা। বরফ দেশের এই গাছেরা তাই ফণিমনসার উল্টো পথ নেয়। ঊর্ধ্বমুখী না হয়ে তারা শরীরকে মাটির ওপর ছড়িয়ে দেয় - শীতের ঠাণ্ডা শুকনো বাতাস থেকে বাঁচার জন্য। মাটিতে বিছিয়ে যাওয়ায় রোদ পেতে‌ও সুবিধা হয়, সূর্যের তেজে পুরোমাত্রায় তারা গা সেঁকে নিতে পারে। কোনো কোনো গাছ সূর্যমুখীর মতো সারাদিন সূর্যের গতি অনুসরণ করে, ফুল-ধরা অংশে যতটা পারে রোদ নেয়। কারো কারো শরীরে এমন ব্যবস্থা থাকে যা গা-ঘেঁষে যাওয়া বায়ুপ্রবাহের গতি কমিয়ে দেয়, ঠাণ্ডা হওয়া কমায়। শুধু বাইরে নয়, ভিতরেও প্রস্তুতি থাকে।


যেসব দেশে খুব বরফ পড়ে, সেখানে প্রায়ই রাস্তার বরফ গলিয়ে পরিষ্কার করার জন্য তার ওপর নুন ছড়ানো হয়। সাধারণ জল যত সহজে জমে বরফ হয়, নোনা জল তত সহজে জমে না। শূন্য ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের চেয়েও আরও কিছুটা তাপমান কমলে তবে নোনা জল জমাট বাঁধে। তাই রাস্তায় জমা বরফে - যার তাপমান 0 °C - তাতে নুন ছড়ালে সেই বরফ গলে তরল হয়ে আসে, নোনা জলকে কঠিন রাখার জন্যে 0 °C যথেষ্ট নয় বলে। অতিরিক্ত শীত সহ্য করতে হয় যেসব গাছকে, তারা কোষের মধ্যে উপযুক্ত কিছু রাসায়নিক উপাদান জড়ো করে সেখানকার হিমাঙ্ক কমিয়ে আনে, যাতে জমে যাওয়ার মতো ঠাণ্ডা পড়লেও গাছের ভিতরকার জল না জমে।


গাছেদের অভিযোজনের ধরন আমাদের থেকে অনেকটা আলাদা। মূল নিয়মগুলো একই, কিন্তু বিবর্তনের যাত্রায় প্রাণী আর উদ্ভিদ এগিয়েছে ভিন্ন ভিন্ন পথে। লাইনটা লিখতে গিয়ে কলমে একটা হোঁচট খেলাম। একটা পুরোনো অমত আছে আমার, ওই 'প্রাণী' শব্দটা নিয়ে। প্রাণ যারই আছে, তারই তো ওই নামে সূচিত হবার অধিকার থাকা উচিত। তাহলে কেন ভাগ করা হয়েছে - 'প্রাণী' আর 'উদ্ভিদ'? বিকল্প নাম কি নেই Kingdom Animalia-র জন্য? - না থাকলে আপাতত বাংলায় 'অ্যানিম্যাল'-ই বলতে পারি। উপযুক্ত পরিভাষার অপেক্ষায় রইলাম, না পেলেও ক্ষতি নেই। প্রাণের মতো ভাষাও চির-বিবর্তনশীল, - যদি তাকে বেঁচে থাকতে হয়।


ডাইনোসর বলতে যাদের বুঝি, তাদের প্রথম দেখা গিয়েছিল আজ থেকে আন্দাজ ২৩৫ মিলিয়ন বছর আগে। পৃথিবীর ইতিহাসের ভাষায় সেই পর্যায়ের নাম Triassic period। ট্রায়াসিকের পরে এসেছিল Jurassic - আমাদের সর্বাধিক পরিচিত নাম; আর তার পরে Cretaceous। তিন পর্যায় একসাথে মিলে হয় Mesozoic era।

ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। আমাদের দিন-হপ্তা-মাস-বছরের হিসেব পৃথিবীর বয়স নিয়ে কথা বলতে গেলে কার্যকরী হয় না। এত দীর্ঘ বিস্তার এই প্রাক-ইতিহাসের, যে শতাব্দ-সহস্রাব্দের মাপও কম পড়ে। তাছাড়া সময়ের সাথে সাথে পৃথিবীর রূপবদলের গতি সবসময় সমান ছিল না। এসবের সাথে সঙ্গতি রেখে বিজ্ঞানীরা তাই একটা সময়ের মাপ ঠিক করেছেন, যাতে পৃথিবীর জীবনের প্রতিটা অধ্যায় নির্দিষ্ট ভাবে ছকে রাখা যাবে। এই টাইম স্কেলের নাম Biogeological Time Scale। প্রাণের বিকাশের বিভিন্ন ধাপকে এখানে চিহ্নিত করা আছে, তাই 'বায়ো-', আর পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক বিকাশের ইতিহাসও চিহ্নিত করা আছে বলে 'জিও-'। হাত ধরাধরি করে এই গ্রহ, আর এই গ্রহে জন্ম নেওয়া প্রাণ, - দুইই বড় হয়ে উঠেছে।

এই স্কেলে সবচেয়ে বড় যে সময়ের মাপ, তার নাম eon। ইয়নের ভাগ করলে তাদের বলা হয় era, এরা ভাগ করলে হয় period, পিরিয়ড ভাগ করলে হয় epoch, আর ইপককে ভাঙলে পাওয়া যায় এক একটা age। ডাইনোসরদের উত্থান যে সময়ে হয়, তা হল Phanerozoic eon-এর Mesozoic era-র Triassic period। এই eon, era, period, epoch, age - এদের বাংলা কোনো পারিভাষিক প্রতিশব্দ আছে কি না আমি জানিনা। আমি ভেবেছি - কাল, পর্ব, পর্যায়, অধ্যায়, যুগ, - ইন অর্ডার। পাখিরা জুরাসিকের শেষ দিকেই রূপ পেতে শুরু করেছিল, ক্রীটাশিয়াস পর্যায়ে এসে মোটামুটি আমাদের পরিচিত চেহারা নিতে আরম্ভ করে। এই ক্রীটাশিয়াসেই ডাইনোসরদের অবলুপ্তি।

‌আজ থেকে সাড়ে তেইশ কোটি বছর আগেকার যে পৃথিবীতে ডাইনোসররা জন্ম নিয়েছিল, তার বনভূমির চেহারা কেমন ছিল? আজকের মতো অবশ্যই নয়। প্রাগৈতিহাসিক অরণ্যের অবশেষ আমাদের সময়ে থেকে গেছে - আমরা জানি তার নাম কয়লা। কয়লার জন্ম যে বনের থেকে, তার বয়স ডাইনোসরদের থেকেও অনেক বেশী। সেটা Carboniferous period, ট্রায়াসিক পর্যায়েরও পাঁচ কোটি বছর আগেকার কথা। গাছেরা তখন ডাঙার অবিসংবাদিত রাজা, বড় বড় জীবজন্তুরা সবাই সেসময় ভবিষ্যতের গর্ভে সুপ্ত। দৈত্যাকার ফার্ন আর শ্যাওলা গাছেরা দলে দলে পৃথিবী ভরিয়ে ফেলেছে। - 'শ্যাওলা গাছ' কথাটা শুনতে বেমানান - আধুনিক মানুষের কানে সেরকম ঠেকাই স্বাভাবিক। আমাদের পরিচিত শ্যাওলারা নিতান্ত ছোটো, কয়েক মিলিমিটার, বড়জোর সেন্টিমিটার দিয়ে তাদের মাপ হয়। কিন্তু কার্বনিফেরাস পর্যায়ে আজকের বড় গাছেদের জন্মই হয়নি। তিরিশ মিটার উঁচু বিশালদেহী শ্যাওলাদের সে আমলে দেখা যেত। আর ছিল ফার্ন, সাইকাড, হর্সটেইল গাছেরা। এদের কারও ফল ছিল না, ফুল ছিল না, বীজ ছিল না। জীববিজ্ঞানে যেসব অংশকে পাতা বা কাণ্ড বলা হয় - তাও এদের হত না। শুধু সবুজ শরীর নিয়ে কিশোর পৃথিবীর বুকে তারা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল। আর তা সম্ভব হয়েছিল এক বিশেষ অভিযোজনের ফলে।


জলের গাছেরা যখন প্রথম ধীরে ধীরে ডাঙায় উঠে আসে, তখন তাদের শরীর ছিল একেবারেই সাদামাটা ধরনের। সালোকসংশ্লেষের জন্য সবুজ ক্লোরোফিল-ওয়ালা শরীর, আর জমি কামড়ে থাকার জন্য শিকড়ের মতো একধরনের জিনিস - নাম rhizoid। চেহারাও বিশেষ বড় হত না। জলের আশেপাশে, ভেজা-ভেজা জায়গায় তারা জন্মাত, কারণ জল ছাড়া জীবন অচল। পুষ্টি, প্রজনন - কোনোকিছুই জল ছাড়া চলবে না। এই গাছেরা ডাঙার পরিবেশে এতটাই নতুন যে আলাদা করে 'জলপান' করার কোনো বন্দোবস্ত তারা করে উঠতে পারেনি, সেযাবৎ জলের মধ্যেই তাদের জীবন কেটেছে যে! কিন্তু ডাঙার উঠে আসার পর পরিস্থিতি পাল্টে গেল, নতুন আগন্তুকরা জলা জায়গার ধারে ধারেই বাসা বাঁধল। কিন্তু তাই করে তো বেশীদিন চলে না। 'জল পান' করার উপায় বের না করলে ভালোভাবে ডাঙায় ছড়িয়ে পড়া যায় না, স্থলভাগের পুরোটাই প্রায় অধরা থেকে যায়। মাইল মাইল খালি জমি ফাঁকা পড়ে, - কেবল শিকড় বাড়ানোর অপেক্ষা।

এক কথা থেকে আরেক কথা উঠে আসে। তখনকার স্থলভাগের প্রকৃতিও ভীষণ, ভীষণ আলাদা ছিল। স্থল তো চিরকাল ছিল না। গরম আধা-তরল পৃথিবীর ওপরভাগ আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা হয়ে শক্ত ডাঙা তৈরী হয়েছিল, যেমন করে দুধে সর জমে। ভেতরটা যদিও প্রায় একইরকম গরম থেকে গেল। এই সবে-হওয়া ডাঙা ছিল আগাগোড়া পাথুরে, রুক্ষ, চঞ্চল রাসায়নিক পদার্থে ভরা। অবিরাম অগ্নুৎপাত, গ্যাসোদগার, তীব্র রাসায়নিক বিক্রিয়া চলছে, নতুন নতুন যৌগ তৈরী হচ্ছে - জ্যান্ত গ্রহ গড়ার কাঁচামাল। পৃথিবীর সেই শৈশবে বায়ুমণ্ডলে মুক্ত অক্সিজেনের পরিমাণ শূন্য, এককোষী প্রাণের সৃষ্টি হয়ে গেছে, তখনও বাতাসে সেভাবে অক্সিজেন জমে ওঠেনি। যেটুকু অক্সিজেন তৈরী হয় সেটুকু সালফার আর লোহার সাথে বিক্রিয়ায় শুষে যায়। মোটামুটি আড়াইশো কোটি বছর আগে ধীরে ধীরে বাতাসে অক্সিজেন জমতে আরম্ভ করে। কিন্তু ডাঙা তখনো পাথুরে, বহু কোটি বছর পাথুরেই থাকবে।

জল থেকে উঠে আসা গাছদের সামনে যে স্থলভাগ খোলা পড়ে ছিল, তা এই পাথুরে ডাঙা।

অভিযোজনের পালা এল শিগগিরই। শুকিয়ে যাওয়া আটকাতে গেলে, কর্তব্য দুটো। এক, - যাতে জল শরীরে আসে, সেই ব্যবস্থা করা; দুই, - যাতে জল শরীর ছেড়ে না যায়, তার ব্যবস্থা করা। পরের ব্যাপারটা জরুরী, কেননা ডাঙা মানেই খোলা হাওয়া, আর খোলা হাওয়া মানে বাষ্পীভবন। ভেজা যেকোনো জিনিস খোলা ফেলে রাখলে ধীরে ধীরে তা শুকিয়ে যেতে বাধ্য। ডাঙার গাছদের গায়ে তাই দেখা দিল পাতলা মোমের স্তরের মতো cuticle। কিউটিকল একধরনের মোমের আস্তরণ, জলনিরোধক। গায়ে এর প্রলেপ পড়ার ফলে গাছের শরীর থেকে জল বাষ্প হয়ে বেরিয়ে যাবার ভয় থাকল না। একটা অন্য সমস্যা হল বটে, কিন্তু তারও সমাধান মিলে গেল। গাছেরা শ্বাসপ্রশ্বাসের কাজ চালায় সারা শরীর দিয়ে। জল উবে যাওয়া আটকানোর জন্য যখন কিউটিকল তৈরী হল, তখন এই গ্যাস আদানপ্রদানের পথও বন্ধ হয়ে গেল। তখন উদ্ভিদদেহে তৈরী হল stomata, - শ্বাসরন্ধ্র। গাছ ইচ্ছেমতো স্টোমাটা খোলা-বন্ধ করতে পারে, কাজেই বেহিসেবী জল নষ্ট আর গ্যাসের সহজে যাওয়া-আসা - দুইয়েরই সমস্যা মিটল। এ হল জল ধরে রাখার জোগাড়। এর পাশাপাশি, গাছের শরীরে দেখা গেল প্রথম vascular tissue। ভ্যাসকুলার টিস্যু আর কিছুই না - গাছের জল খাবার 'স্ট্র'। সরু নলের মতো চেহারার টিস্যু সিস্টেম গড়ে উঠতে লাগল গাছের দেহের গভীরে, তাই দিয়ে নীচ থেকে জল শুষে নেওয়া চলে। অর্থাৎ, জলে শিকড় ডুবিয়ে রাখা নিয়ে কথা - সেটুকু যদি থাকে, বাকি শরীরটা অনায়াসে জল থেকে দূরে ছড়িয়ে উঠতে পারে, - আর্দ্রতার জোগান অব্যাহত থাকবে। এই হল গাছের 'গাছ' হয়ে ওঠার গোড়ার কথা। এই অভিযোজনের পর থেকে বিবর্তিত যত গাছ, মানে যাদের দেহে নলতন্ত্র আছে তারা সবাই - তাদেরকে একসাথে বলা হয় tracheophyte, অর্থাৎ 'নলওয়ালা গাছ' । নল তৈরী করার দুটো প্রভাব এবার গাছের জীবনে বড়ো হয়ে উঠল - তার জলের সমস্যা ঘুচল, আর সে আকারেও বড় হতে শুরু করল।

আধুনিক গাছের গঠনও যদি দেখি, দেখব তার structural দিকটা মূলতঃ দাঁড়িয়ে আছে তার ভ্যাসকুলার সিস্টেমের ওপর। এই নলের গোছা কীভাবে বাড়ছে, তার ওপরেই নির্ভর করে গাছটা দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে কেমন দাঁড়াল। গাছের জন্যে এটা অস্থিতন্ত্র আর সংবহনতন্ত্র - দুইই। প্রথম ভ্যাসকুলার গাছেরা যে আকৃতিতে পূর্বপুরুষদের অনেকগুণ ছাপিয়ে গেল, তার কারণ এটাই। জলের নল বড় হতে হতে গাছের শরীরটাও বাড়তে লাগল। এক পায়ে দাঁড়িয়ে সে উঁকি মারল আকাশে। শুধু ওপরে নয়, পাইপলাইন বাড়ল নীচের দিকেও। জলের খোঁজে শিকড় ছড়ালো কাছ থেকে দূরে, ডাঙার খাঁজ বেয়ে, পাথর ফাটিয়ে।

আর এর থেকেই এলো এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন।

রুক্ষ ডাঙার পাথর ভেঙে গাছ তার শিকড় ছড়িয়ে দিতে লাগল, আর সেই ভাঙনের থেকে জন্ম নিল মাটি। পাথর থেকে নুড়ি, নুড়ি থেকে ধুলোবালি, - তার সাথে মিশল গাছের শরীরের পরিত্যক্ত অবশেষ। লাভা থেকে ঠাণ্ডা হয়ে অবধি এতদিন পৃথিবী কঠোর কঠিন হয়ে পড়ে ছিল, মাটির সৃষ্টিতে যেন তার শরীরে প্রাণপ্রতিষ্ঠা হল। এ এক যুগান্তকারী পরিবর্তন, a one-time event। এমনটা ইতিহাসে একবারই ঘটেছিল, আর কোনোদিন এর পুনরাবৃত্তি হবে না, হতে পারে না। প্রাণের সৃষ্টি যেমন one-time event, একবার প্রাণ বিকশিত হয়ে যাবার পরে আর তার পুনরাবৃত্তির সুযোগ থাকেনি, - এও তেমন, একক। ডাঙায় উঠে আসা প্রথম গাছেরা এইভাবে মাটির জন্ম দিল। ইতিহাস সাক্ষী, - আজ অবধি মাটি সেই মাতৃঋণ শোধ করে আসছে। মাটিতে জন্ম নেওয়া কনিষ্ঠতম উত্তরপুরুষ হিসেবে আমরাও।


অলক্ষ্যে লেখা হয়ে চলে অনাগত জন্ম-ইতিহাস। এখনকার ক্যানভাসে যাদের বিচিত্র ছবি আঁকা, তার জন্য রঙ মেশানোর পালা কবে শুরু হয়েছিল, কে খবর রাখে? আজ পৃথিবীর সন্তান আত্মপরিচয়ের সন্ধানে যাত্রা করেছে, হাজার রূপের আড়াল থেকে নিজের স্বরূপকে সে চিনে নিতে চায়। চেতনার স্ফুরণ ঘটেছে, - তাই চেতনার উৎসের খোঁজে সে উন্মুখ। জড় থেকে জীব, প্রাণ থেকে মহত্তর প্রাণ, হাজার হাজার রঙে লক্ষ লক্ষ আলপনা আঁকা হয়ে আসছে আজ চারশো কোটি বছর। আধুনিককালের হলোসীন পর্যায়ে সেই প্রাণের ধারা মানুষের রূপ নিয়ে নিজেকে নিজেই ফিরে দেখতে চায় - এ এক আশ্চর্য বিরাট সেল্‌ফি। এই সীমাহীন উপন্যাসে আর কোনো পাত্র-পাত্রী নেই, কেউ যেন নিজে হাতে কলম ধরে নিজের অবিরাম জন্মকাহিনী নিজেকেই শুনিয়ে চলেছে।


" মাটি-পৃথিবীর টানে মানবজন্মের ঘরে কখন এসেছি,
না এলেই ভালো হত অনুভব করে;
এসে যে গভীরতর লাভ হল সে সব বুঝেছি
শিশির শরীর ছুঁয়ে সমুজ্জ্বল ভোরে;
দেখেছি যা হল হবে মানুষের যা হবার নয়–
শাশ্বত রাত্রির বুকে সকলি অনন্ত সূর্যোদয়। "


* * *

ডাঙার পরিবেশে গাছের নতুন অভিযোজন দারুণ রকম সাফল্য পেয়েছিল। প্রথমদিককার এই গাছদের মধ্যে ছিল ছোটো চেহারার Cooksonia, ১৯৩৭ সালে ইংল্যান্ডের ওয়েল্‌সে এর ফসিল পাওয়া যায়। ছিল আরো একটু জটিল গঠনের Baragwanathia, 'পাতা' দেখা গেল এর গায়ে, তার মধ্যে নলবিন্যাসও পাওয়া গেল। এদের সময়কালের নাম Silurian period। সিলুরিয়ান পর্যায়, মনে রাখার মতো নাম - ডাঙার সফলভাবে প্রাণের বিস্তার ঘটল এই পর্যায়েই। প্রথম সফল স্থলজ গাছ তো এলই, প্রথম ডাঙার প্রাণীও এল সিলুরিয়ানে। তার কথা আমরা জানলাম দু'হাজার চার সালে, মাইক নিউম্যান নামে এক বাস ড্রাইভারের দৌলতে।


মাইক নিউম্যান বাস ড্রাইভার হলেও শখের জীবাশ্মবিদ। ২০০৪ সালে স্কটল্যাণ্ডের স্টোনহ্যাভেনের কাছে বেলেপাথর ঘাঁটতে ঘাঁটতে সে একটা এক সেন্টিমিটার লম্বা ফসিলের টুকরো খুঁজে পায়। কেন্নোর মতো চেহারা, ৪২৮ মিলিয়ন বছর আগেকার প্রাণী। ভালো করে খুঁটিয়ে দেখে এই প্রাগৈতিহাসিক কেন্নো থেকে যা জানা গেল তা মোটামুটি এই: এক, এটা একধরনের millipede, 'সহস্রপদী' কেন্নো। দুই, নিউম্যানের আবিষ্কৃত কেন্নো সম্ভবত পৃথিবীর প্রথম স্থলচর জীব। তিন, শুধু স্থলচর জীবই নয়, এই কেন্নোর শরীরে যে শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল তার স্পষ্ট চিহ্ন ফসিলে আছে - কাজেই এ প্রথম অক্সিজেনপায়ী স্থলচর জীবও বটে। বাতাসে শ্বাস নেবার যন্ত্র পাওয়া গেল বলেই বরং আরও নিশ্চিত হওয়া গেল যে এ জলের বাসিন্দা নয়। নিউম্যানের সম্মানে এই কেন্নোর নাম রাখা হল Pneumodesmus newmani, 'শ্বাস-নেওয়া কেন্নো যাকে নিউম্যান খুঁজে পেয়েছিল'। দশ মিলিয়ন বছর পরে নিউমোডেসমাসের জাতভায়েরা তার মিলিয়ন-পদাঙ্ক অনুসরণ করে ডাঙায় উঠে আসে, সেটা Devonian period। আর প্রথম যে মেরুদণ্ডীরা 'মাছ' থেকে বদলে 'উভচর' হয়ে গুটিগুটি জল থেকে উঠে এসেছিলো, আমাদের সেই পূর্বপুরুষ নিউমোডেসমাসের চেয়ে পাক্কা পাঁচ কোটি বছরের ছোট।


'টোকা দিলে টাকা হয়' যে কেন্নো, সে-ই প্রথম বশ করেছিল শুকনো ডাঙার পৃথিবীকে। 'পৃথিবীটা কার বশ', এর পরে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না।

পরে যারা ডেভোনিয়ান যুগে মাটিতে উঠে এল, তারা ছিল centipede, মিলিপীড নয়; কেন্নো বলতে আমরা সচরাচর যা বুঝি তা মিলিপীডই, সেন্টিপীডের উদাহরণ হল আমাদের তেঁতুলবিছে। সেন্টিপীড শিকারী মাংসাশী; মিলিপীড নিরামিষাশী, শান্তশিষ্ট, হাতে তুলে নিলেও কিছু বলে না। সিলুরিয়ান কেন্নোরাও সেরকমই হবার কথা। কিন্তু একধরনের শিকারী মাকড়শার ফসিল পাওয়া যায়, যারা সিলুরিয়ানেই বেঁচে ছিল, সম্ভবত নিউমোডেসমাসের পাশাপাশি। এ থেকে একধরনের খাদ্য-খাদক সম্পর্ক বা food web-এর সম্ভাবনা আঁচ করা যায়। এই আদিম মাকড়শারা পরে আরও বিবর্তিত হয়েছিল, কার্বনিফেরাসের জঙ্গলে এদের দেখা পাওয়া যেত। দেখতে অনেকটা আধুনিক ট্যারান্টুলাদের মতো। জাল বা রেশম বোনার ক্ষমতা এদের ছিল না, হেঁটে বেড়িয়ে খাবার ধরতে হত। এদের হাঁটার চলন কেমন ছিল, তার একটা মডেল বিজ্ঞানীরা গতবছর কম্পিউটার গ্রাফিক্সে তৈরী করেছেন।

.
.
.
.
.

সিলুরিয়ান বহু 'প্রথম'-এর যুগ। সমুদ্রে আধুনিক মাছেরা দেখা দিল এই সময়। আধুনিক বলতে - চোয়ালওয়ালা, ইংরেজীতে gnathostomata, g-টা সাইলেন্ট। প্রথমদিকে সিলুরিয়ান পর্যায়ের সমুদ্রে চোয়ালবিহীন মাছেদের প্রাচুর্য ছিল, আজকের দিনের হ্যাগফিশ বা ল্যামপ্রে জাতীয় মাছের মতো। তার কিছু পরে, মাঝ-সিলুরিয়ান বরাবর, প্রথম চোয়াল দেখা গেল। বছর দুয়েক আগে চীনে একদল গবেষক এক মাছ-ফসিল খুঁজে পান, তার মাথায় এইরকম প্রাথমিক চোয়াল পাওয়া যায়। 'মুখ' বলতে আমরা যে জিনিসটা বুঝি, তার আদলটা এল এইভাবে। This was the face that launched a thousand faces. ল্যাটিনে নামটা Entelognathus primordialis, সরাসরি বাংলা করলে সাদা অর্থ দাঁড়ায় 'আদিম সম্পূর্ণ-চোয়ালওয়ালা মাছ'। ল্যাটিনে অবশ্য 'মাছ' কথাটার উল্লেখ নেই। যেসময়ের কথা, সেসময় মাছ ছাড়া আর মেরুদণ্ডী প্রাণী ছিলই বা কী?


শুধু চোয়ালেই থামল না, সিলুরিয়ানে ন্যাথোস্টোমাটারা আরও দুইভাগে ভাগ হয়ে গেল। একভাগ গেল কার্টিলেজের দিকে, আর এক ভাগ এল হাড়ের দিকে। শরীরে কঙ্কালের প্রধানতঃ এই দুই উপাদান: শক্ত হাড়, আর নমনীয় কার্টিলেজ। আমাদের শরীরে হাড়ের গুরুত্ব বেশী, কার্টিলেজ কম। কিন্তু এমন প্রাণী আছে যাদের কঙ্কাল কার্টিলেজ দিয়ে তৈরী, হাড় দিয়ে নয়। হাঙর আর শঙ্করমাছেরা এই দলে পড়ে। এই বিভাজনটা দেখা দিয়েছিল সিলুরিয়ানে। একদিকে রইল কার্টিলেজওয়ালা মাছেরা, আর একদিকে রইল হাড়ের কাঁটাওয়ালা মাছেরা, যাদের থেকে পরে ডাঙার উভচর-সরীসৃপ-পাখি-স্তন্যপায়ীরা উদ্ভুত হবে।

সিলুরিয়ান সমুদ্রের সত্যিকারের দাপুটে বাসিন্দা কিন্তু এইসব মাছেরা ছিল না। আসল শাসনদণ্ড ছিল অমেরুদণ্ডীদের হাতে।

একধরনের সামুদ্রিক কাঁকড়াবিছে সেসময় সমুদ্রের apex predator ছিল। এরা পৃথিবীর সর্বকালের সর্ববৃহৎ 'পোকা', - সবচেয়ে বড় যে ফসিল পাওয়া গেছে তার দৈর্ঘ্য আড়াই মিটার, - মানে একটা কুমীরের সমান লম্বা। সবাই এরকম রাক্ষুসে আকারের হত না, গড় সাইজ অনেকটাই কম ছিল। শিকার করার মতো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ভালোরকমই ছিল, সাঁতার যদিও কাটতে পারত, তবু সমুদ্রের মেঝেতে পায়ে হেঁটে বেড়ানোর অভ্যেসই বেশী ছিল। শিকারের মধ্যে পড়ত নরম কৃমি বা কেঁচো জাতীয় প্রাণী। পূর্ণবয়স্ক বিছেরা ডিম পাড়ার সময়ে গভীর সমুদ্র থেকে তীরবর্তী অঞ্চলের দিকে চলে আসত, সেখানেই সঙ্গম আর তার পরে ডিম পাড়ত। তখনকার জীবজগৎ প্রধানত সামুদ্রিক, ডাঙা প্রায় ফাঁকা, শিকারী পশুপাখির সম্ভাবনা নেই, তাই বাচ্চাদের জন্য সেরকম জায়গা মাঝসমুদ্রের চেয়ে অনেক বেশী নিরাপদ। বাচ্চারা বড় হয়ে আবার সাঁতরে সমুদ্রের গভীরে ফিরে যেত, বিয়ের বয়স হলে আবার বীচের দিকে আসত - 'হনিমুন' সারতে। প্রজননের সময় পুরোনো খোলস ছাড়া এদের স্বভাব ছিল, যে স্বভাব আধুনিক horseshoe crab-দের মধ্যে দেখা যায়। 'আধুনিক' কথাটা বলা ভুল হল। হর্সশু ক্র্যাব যে living fossil, লোপ-না-পেয়ে টিকে থাকা প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী! ওই কাঁকড়াবিছেদের পাশাপাশি তারাও সিলুরিয়ান সমুদ্রের অধিবাসী ছিল।


ডাঙায় গাছেরা উঠে আসার ফলে একটা ব্যাপার হল, বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়তে লাগল। পরিমাণটা যখন ১৩%-এর কাছাকাছি দাঁড়াল, তখন বায়ুমণ্ডলে 'দাহ্য' গুণটা ভালোরকম প্রকাশ পেল। আজ থেকে চারশো কুড়ি মিলিয়ন বছর আগে সিলুরিয়ানের শেষভাগে জ্বলল প্রথম দাবানল। কাঠকয়লার সেই হল প্রথম উৎপত্তি। কাঠ পুড়ে শুধু কার্বনের খোলসটা পড়ে রইল, বাকি অংশ বাষ্প হয়ে উবে গেল। শুকনো পিওর কার্বন কোনো জানোয়ার খায় না, সহজে সংরক্ষিত হয়। এইভাবে অনেক পুরোনো গাছেরা কাঠকয়লা হয়ে ফসিল হবার সুযোগ পেয়েছে।

সিলুরিয়ান পেরিয়ে ডেভোনিয়ান এলো, উভচর অ্যাম্ফিবিয়ানদের উত্থানের সাক্ষী ডেভোনিয়ান পিরিয়ড। তার পরে কার্বনিফেরাস।


কার্বনিফেরাস পর্যায়ে যে বিরাট বিরাট মস (শ্যাওলা), সাইকাড আর ফার্নের বন তৈরী হয়েছিল, তা সম্ভব হয়েছিল গাছের গায়ে নল-ব্যবস্থা থাকার জন্যই। পৃথিবীর অনেকটা জুড়ে এদের জঙ্গল ছড়িয়ে ছিল। এখনকার ম্যাপে সেসব জায়গার বেশীরভাগই অ-জঙ্গুলে জায়গা, কেউ দেখে বলবে না সেখানে একসময় ঘন বন ছিল। চিহ্ন পাওয়া যায় শুধু কয়লাখনির উপস্থিতি দেখে। একসময় বিশাল বনভূমির অস্তিত্ব না থাকলে তো কয়লাখনি তৈরী হতে পারে না। এই পর্যায়ের নাম সেইজন্যেই কার্বনিফেরাস, - carbo = কয়লা, fero = বহন করা, - মানে 'কয়লাবাহী' পর্যায়। এই সময়কার পৃথিবীর ম্যাপ অন্যরকম, Pangaea নামে যে অতিকায় মহাদেশ ছিঁড়ে আমাদের আজকের সাত মহাদেশের জন্ম, সেই প্যানজিয়ার তখন গড়ে ওঠার পালা চলছে। আমেরিকায় (তখনো আমেরিকা হয়নি) অ্যাপালেশিয়ান পর্বতমালা মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে, হিমালয়ের চিহ্ন নেই, সবেমাত্র টেথিস সাগরের চেহারাটা যেন খানিকটা আঁচ করা যাচ্ছে। আবহাওয়া উষ্ণ, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইডের ভাগ বেশী, গাছের খাবারের জোগান অফুরান, বড় বড় জলা-জঙ্গলে তখনকার ইউরোপ আমেরিকা ঢাকা।

সেইসব বন শুধু সবুজের বন। গাছেরা তখন সবে কাণ্ড আর পাতা বানিয়ে উঠতে পেরেছে, ফুল ফল তখনো আসেনি, এমনকী 'কাঠ'ও সবার ঠিকমতো তৈরী হয়নি। গায়ে শুধু একধরনের বাকল হত। আধুনিক গাছের মতো চেহারার সিজিলারিয়া, লেপিডোডেনড্রন আর কালামাইটস, বিশাল সমস্ত মস আর হর্সটেইল গাছ, কুড়ি তিরিশ মিটার উঁচু বড় বড় ফার্ন, সাইকাড, সবচেয়ে পুরোনো যে জাতের ট্র্যাকিওফাইট গাছ এখনও বেঁচে আছে - সেই লাইকোপড, - এদের নিয়ে তৈরী হয়েছিল কার্বনিফেরাসের জঙ্গল। ফার্নগাছ আমরা চিনি, বর্ষাপ্রধান বনের ঝোপেঝাড়ে, বড় গাছের গোড়ায় গোছায় গোছায় এদের দেখা যায়। সবুজ চেহারা, একেকটা বোঁটায় মাঝের একটা অক্ষের দুপাশে সারি দিয়ে ছোটো ছোটো পাতা সাজানো, - নিমপাতার সজ্জা যেমন হয়, অনেকটা সেরকম। ফ্লোরিস্টদের কাছে এর কদর খুব - ফুলের তোড়া সাজাতে তারা এগুলো ব্যবহার করে। এই সবুজ অংশগুলো আসলে ঠিক 'পাতা' নয়, ঝালরের মতো চেহারার এই প্রায়-পাতাদের বলে frond। সেকালের ফ্রন্ড-ওয়ালা ফার্নরা বড় বড় তালগাছের মতো লম্বা হত। জুরাসিক পার্ক বানানোর সময় জন হ্যামন্ড ডাইনোসরদের পাশাপাশি প্রাগৈতিহাসিক গাছপালারও ব্যবস্থা করেছিলেন, যাতে ডাইনোরা তাদের পরিচিত খাবার পায়।

গাছেরা ডাঙার জীবজগতের ভিত্তি। এখানেও সেই জিনিস দেখা গেল। অফুরন্ত সবুজের কল্যাণে বাতাসে অক্সিজেনের ঘনত্ব বেড়ে গেল, আর তার সুযোগ নিল নানারকম পোকামাকড়। সেন্টিপীডরা তো ডেভোনিয়ানেই ডাঙায় উঠে এসেছিল। প্রচুর অক্সিজেন পেয়ে তারা এবার আকারে বাড়তে শুরু করল। ছ'ফুট লম্বা কেন্নো Arthropleura - আজ অবধি ডাঙায় এত বড় পোকা আর হয়নি। তিন ফুট সাইজের বড় বড় কাঁকড়াবিছে, অতিকায় আরশোলা, - কার্বনিফেরাসে এরাই ছিল জঙ্গলের রাজা। তিনশো কুড়ি মিলিয়ন বছর আগেকার একরকমের ফড়িঙের ফসিল পাওয়া গেছে, ডানা ছড়ালে তার সাইজ দাঁড়াত আড়াই ফুট, - ছোটোখাটো একটা গাঙচিলের মতো। এই প্রাগৈতিহাসিক ফড়িঙের নাম Meganeura, এ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ডানাওয়ালা পতঙ্গ। - এই যে কীটপতঙ্গের এত বাড়বাড়ন্ত, তার পেছনে যেমন অক্সিজেনের একটা বড় ভূমিকা ছিল, তেমন এই সুবিধাও ছিল যে পোকা আর উভচর বাদে খুব বেশী জীববৈচিত্র সে আমলে ডাঙায় ছিল না। উভচররা উড়তে পারে না, আর স্যাঁতসেঁতে জায়গা ছাড়া থাকতেও পারে না। পোকাদের রাজত্ব অনায়াসে কায়েম হল।

পতঙ্গরা কীভাবে প্রথম উড়তে শিখল, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। ওদের হাত ধরেই তো প্রাণীদের প্রথম আকাশ জয়। একটা সম্ভাবনা হতে পারে - হয়তো নিজেদের তাপমান নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে পোকারা তাদের শরীরে পাতলা, ছড়ানো ধরনের কোনো প্রত্যঙ্গ তৈরী করেছিল। পোকারা যেহেতু এক্টোথার্মিক, তাই শরীর গরম রাখার জন্য তাদের রোদের ওপরেই নির্ভর করতে হয়। ছড়িয়ে থাকা অঙ্গ মানে তার ক্ষেত্রফল বেশী, বেশী করে রোদ নিয়ে তা তাড়াতাড়ি তাপের জোগান দিতে পারে। পরে হয়তো এই ছড়ানো অংশই পাখা হয়ে উঠেছিল। কার্বনিফেরাস বড় গাছের জঙ্গলের যুগ, এক গাছ থেকে আরেক গাছে লাফিয়ে যেতে গেলে পাখার মতো অংশ বাড়তি সুবিধা দিত - হতেই পারে। গাছের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রাণীদের বিবর্তন সমানতালে এগিয়ে চলল।


এদিকে ধীরে ধীরে টুকরো টুকরো মহাদেশ জোড়া লেগে প্যানজিয়া তৈরী হল, আর তার প্রভাব পড়ল সামুদ্রিক জীবজগতে।


টুকরো মহাদেশরা যতদিন আলাদা আলাদা ছিল, ততদিন প্রত্যেক ভূখণ্ডের চারপাশে সমুদ্র ঘিরে থাকার দরুণ অনেকটা পরিমাণে উপকূল অঞ্চল ছিল। এবার যখন এরা কাছাকাছি এসে জোড়া লাগতে আরম্ভ করল, তখন দেখা দিল বিপদ। জোড়া-লাগার বর্ডার বরাবর সমস্ত উপকূল সমুদ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, - জল থেকেই আলাদা হয়ে গেল। আগে যা ছিল একজোড়া সমুদ্রতীর, তা বদলে হল একটানা বিস্তৃত ডাঙা। এর ধাক্কায় অনেক সামুদ্রিক প্রজাতি লোপ পেল। কিন্তু তার চেয়েও বড় বিপর্যয় আসছিল অন্য দিক থেকে। হাজার হাজার বর্গমাইল বনভূমির ক্রমাগত সালোকসংশ্লেষের ফলে বাতাসে অক্সিজেন হু-হু করে বাড়ছিল।

আমাদের স্কুলে 'গ্রীনহাউস গ্যাস' বলে কিছু গ্যাসের কথা পড়ানো হয়। কার্বন ডাইঅক্সাইড, জলীয় বাষ্প, মিথেন, ওজোন - এরা এই দলে পড়ে। 'গ্রীনহাউস' কথাটার পেছনে কারণ আছে। শীতপ্রধান দেশে যারা বাগান করে, তাদের অনেকসময় ঠাণ্ডার হাত থেকে গাছ বাঁচানোর জন্য গ্রীনহাউস বলে একধরনের ঘর ব্যবহার করতে হয়। আগাগোড়া কাঁচ দিয়ে তৈরী ঘর, দেওয়াল-সীলিং সবই স্বচ্ছ কাঁচের। সূর্যের আলো এর ভেতরে ঢোকে, কিন্তু বেরোবার সময় সমান তেজ নিয়ে বেরোতে পারে না, খানিকটা এনার্জি ঘরের ভিতর রেখে যায়। এই তাপ আটকে রাখাকে বলে heat trapping। এর ফলে বাইরের চেয়ে গ্রীনহাউসের ভিতরের তাপমান খানিকটা বেশী হয়, শীতের সময় গাছকে নিরাপদে সূর্যের আলোয় রাখা যায়।


গ্রীনহাউস গ্যাস যারা, তাদেরও এরকম ধর্ম থাকে। সূর্যের কিরণ আমাদের বায়ুস্তরে ঢুকে পৃথিবী স্পর্শ করে আবার ফিরে যায়, কিন্তু বায়ুমণ্ডলে থাকা গ্রীনহাউস গ্যাসেরা এই ফিরতি এনার্জির সবটুকু পৃথিবীর গা থেকে মহাকাশে ছড়িয়ে যেতে দেয় না। খানিকটা শুষে নিয়ে আবার পৃথিবীকে ফিরিয়ে দেয়। পৃথিবী ঠাণ্ডা হওয়া থেকে বাঁচে। দেখা গেছে, বাতাসে গ্রীনহাউস গ্যাসের পরিমাণ সময়ের সাথে সাথে ব্যাপকভাবে ওঠানামা করে। কখনো বেড়ে যায়, কখনো খুব কমে যায়। অবশ্য এই বদলটা এত দীর্ঘ সময় ধরে হয় যে আমাদের সাধারণ চোখে তা কোনো প্যাটার্ন নেয় না। আড়াইশো বছর আগে ইউরোপে শিল্পবিপ্লব হল, আর তার পর থেকে আমাদের 'বায়ুদূষণ' বেড়ে গেল। এখন এসে ঠেকেছে গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এ। মানুষের কাছে এটা নিঃসন্দেহে একটা প্রলয়ঙ্কর ব্যাপার। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে এটা কোনো নতুন কথা নয়। বিজ্ঞানীরা বলেন, পৃথিবীর দু'রকম দশা আছে - একটা হল greenhouse earth বা hothouse earth, আর একটা হল icehouse earth; তাপঘর আর হিমঘর। যদি এমন অবস্থা থাকে, যে পৃথিবীর ওপর অতিকায় বরফের স্তর বা continental glacier লক্ষ্য করা যাচ্ছে - যেমন আমাদের অ্যান্টার্কটিকা কিংবা আর্কটিক - তাহলে তখন সেই দশাকে বলা হবে আইসহাউস আর্থ। আর যদি ওরকম মাপের বিশাল বরফের আস্তরণ বা গ্লেসিয়ার কোথাও না থাকে, তাহলে তাকে বলা হবে গ্রীনহাউস আর্থ। আজ অবধি পৃথিবী গ্রীনহাউস হয়েই বেশীরভাগ সময় কাটিয়েছে। ভাবতে কষ্ট হয়,- এখন যেটা চলছে সেটা পৃথিবীর সদ্যতম হিমযুগ,- আমরা আইসহাউজ দশার প্রাণী। দেখে মনে হয় না যদিও; কিন্তু উত্তরে দক্ষিণে দুই মেরুতে দুই বরফে ঢাকা মহাদেশ এর অকাট্য প্রমাণ। তাছাড়া, আমরা যে আইসহাউসে রয়েছি, তার একটা পরোক্ষ প্রমাণও আছে।

'Ice Age' সিনেমার কথা মনে আছে? ২০০২-এর সিনেমা, বেস্ট অ্যানিমেটেড ফিচারের জন্য অস্কারে গিয়েছিল। অস্কার পায়নি, কিন্তু অসম্ভব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল - ঊলি ম্যামথ ম্যানফ্রেড, ছোরাদেঁতো বাঘ ডিয়েগো, গ্রাউন্ড স্লথ সিড, আর দাঁতালো কাঠবেড়ালী 'স্ক্র্যাট'। সেই ছবিতে দেখেছিলাম, প্রাচীন মানুষ দল বেঁধে বল্লম হাতে ম্যামথ শিকার করতে বেরোত। বাস্তবে যে প্রমাণ মেলে তাতেও দেখা গেছে, আজ থেকে আন্দাজ ১.৮ মিলিয়ন বছর আগেকার মানুষের যে পূর্বপুরুষ, Homo erectus, তারা ম্যামথের মাংস খেত। শিকার করে, না আগে থেকে মরা ম্যামথের দেহের সদ্ব্যবহার করে - তা ঠিক পরিষ্কার নয়। আরো পরের দিকে Neanderthal মানুষরা মাংসের জন্য ম্যামথ শিকার করত, সেই মাংস কেটেকুটে রান্না করে খেত। ৫০,০০০ বছর আগেকার ম্যামথের হাড়ে অস্ত্রাঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া গেছে। ম্যামথের হাড় দিয়ে আদিম মানুষ ঘর বানাতেও শিখেছিল। আর শিখেছিল কিছু কিছু অস্ত্র বানাতে। এসব প্রয়োজনের জিনিস ছাড়াও, ম্যামথের হাড় আর দাঁত দিয়ে পুরোনো মানুষরা নানারকম শখের জিনিসও তৈরী করত।

ম্যামথের দাঁত দিয়ে তৈরী জিনিস - শুনে অবধারিতভাবেই হাতির দাঁতের কথা মনে পড়ে। ম্যামথ প্রাগৈতিহাসিক হাতি ছাড়া আর কী? - হয়তো একভাবে কথাটা ঠিক, কারণ ম্যামথ আর আধুনিক হাতির ফ্যামিলি এক - Elephantidae। কিন্তু একটা কথা ভুল করে প্রায়ই ভাবি, যে ম্যামথ হাতির পূর্বপুরুষ। আসলে তা নয়। ম্যামথের সাথে হাতির সম্পর্ক পিতা-পুত্রের নয়, বরং অগ্রজ-অনুজের। হাতি আর ম্যামথ সহোদর প্রজাতি। আন্দাজ পাঁচ মিলিয়ন বছর আগে, Primelephas নামে একধরনের শুঁড়ওয়ালা প্রাণী পৃথিবীতে বেঁচে ছিল। শুঁড় ছিল, বড় বড় কান ছিল, থামের মতো বিশাল পা ছিল, আর ছিল - দুটো নয় - চারটে লম্বা গজদাঁত। এই চেহারা আমাদের কাছে নতুন নয়, পীটার জ্যাকসনের দৌলতে একে আমরা রূপোলী পর্দায় অনেকদিন হল চিনেছি। মরডরের ব্ল্যাক গেটের কাছে গিরিখাতের আড়ালে বিশ্রাম নেওয়ার সময় স্যাম গ্যামগী একটা ছড়ায় গলামকে তার পরিচয় শুনিয়েছিল -

Oliphaunt
Grey as a mouse,
Big as a house,
Nose like a snake,
I make the earth shake,
As I tramp through the grass;
Trees crack as I pass.
With horns in my mouth
I walk in the South,
Flapping big ears.
Beyond count of years
I stump round and round,
Never lie on the ground,
Not even to die.
Oliphaunt am I,
Biggest of all,
Huge, old, and tall.
If ever you’d meet me
You wouldn’t forget me.
If you never do,
You won’t think I’m true;
But old Oliphaunt am I,
And I never lie.

হবিটদের ছড়ায় এর নাম ছিল অলিফন্ট, কিন্তু বিজ্ঞানীরা একে নাম দিয়েছেন প্রাইমএলিফাস, - 'প্রথম হাতি'। ৫ মিলিয়ন বছর আগে প্লিওসীন অধ্যায়ে প্রাইমএলিফাসদের থেকে দুটো শাখা বেরিয়ে আসে, তার একটা আবার দু'ভাগ হয়। একটা শাখা থেকে উঠে আসে Loxodonta - আফ্রিকান হাতি, আর আরেকটা শাখা দুভাগ হয়ে একদিকে উঠে আসে Mammuthus, আর একদিকে আমাদের Elephas - ভারতীয় হাতি। এই তিন শাখার মধ্যে ম্যামথরা কয়েক হাজার বছর আগে বিদায় নিয়েছে, বাকি দুই প্রজাতি এখনও অবধি জীবিত।

'Mammuthus' জীনাসের মধ্যে অনেক প্রজাতি ছিল, সবাইকেই আমরা চলতি কথায় ম্যামথ বলি। এদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ যারা, সেই ঊলি ম্যামথরা আদিম মানুষের সমসাময়িক ছিল। 'ঊলি' কেন? কেননা বড় বড় ঘন লোমে এদের শরীর ঢাকা ছিল, শীত থেকে বাঁচার জন্য। আমাদের সাধারণ গরু আর হিমালয়ের চমরী গাইয়ের মধ্যে ঠিক এই তফাত দেখা যায়। ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সব ম্যামথের tusk (গজদাঁত) থাকত, আর আকৃতিও হাতিদের থেকে বড়ই হত, মাটি থেকে কাঁধ প্রায় চার মিটার উঁচু, ওজন আট-নয় টন। এমনকী বারো টনের ম্যামথও পাওয়া গেছে। এই বিশাল চেহারার একটা বড় অংশ ছিল ফ্যাট। ঠাণ্ডার প্রাণী হিসেবে ম্যামথরা দেহে চর্বি জমিয়ে রাখত, অভাবের সময় সেই চর্বি ভাঙিয়ে শরীরের কাজ চলত।

উত্তর মেরুর সাদা ভালুকদের মধ্যে এখনও এই অভ্যেস দেখা যায়। ওদের সন্তানপালন এর সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে থাকে। ওদের ওখানে কার্যত বারো মাসই শীত, তার মধ্যেও বসন্ত পেরিয়ে যখন গরমকাল পড়ে, ধূ-ধূ বরফের দেশে কোনোমতে শিকার জোটানো সেইসময় সবচেয়ে সহজ হয়। এপ্রিল-মে নাগাদ সীলদের দল তাদের পছন্দমতো জায়গায় ডেরা বাঁধে, আর তাদের খোঁজে এসে হাজির হয় মেরু ভালুকরা। পছন্দসই সঙ্গী খুঁজে নিয়ে তারা জুটি বাঁধে। সপ্তাহখানেক বর-বউ একসাথে থাকে, তার পর থেকে মেয়ে ভালুক মাতৃত্বের জন্য তৈরী হওয়া শুরু করে। দেখতে দেখতে শীতকাল চলে আসবে, শিকার জোটানো অসম্ভব হবে, বাচ্চাদের খাবার না দিলে তো তারা বাঁচবে না। ঠাণ্ডাতেও মারা যাবে। শীতকালে বাচ্চাসহ মায়ের ঘরের বাইরে থাকার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তাই মে থেকে সেপ্টেম্বর - এই চার মাসে মা ভালুক যতটা পারে খাবার খেয়ে শরীরে চর্বি মজুত করে। ওজন বেড়ে যায় অনেকটা, প্রায় দুশো কেজি বাড়তি ভার জমে মায়ের শরীরে। তারপর যখন বছরের শেষ দিকে তাপমান কমতে শুরু করে, তখন মা বরফের ভিতর গর্ত খুঁড়ে গুহার মতো বানিয়ে নেয়। শীতকালটা তার এখানেই কাটবে। টানা আট মাস সে আর বাইরে বের হবে না।

শীতের ঠিক মাঝামাঝি, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারীর মধ্যে, বাচ্চা ভালুকরা জন্মায়। ওজন এক কেজিও নয়, হালকা লোমে গা ঢাকা, - একেবারেই ছোটো অসহায়। মা তাদের নিজের শরীরের তাপে গরম রাখে, অল্প অল্প করে ফ্যাট-সমৃদ্ধ দুধ খাওয়ায়, চার মাস ধরে একটু একটু করে তাদের বড় করে তোলে। মাঝ-এপ্রিলের দিকে যখন গর্তের মুখের বরফ ভেঙে মা বাচ্চাদের নিয়ে বাইরে আসে, তখন ওদের ওজন দশ-পনেরো কেজি, দিব্যি হেঁটে চলে বেড়ানোর বয়স হয়েছে। মা ভালুক এই আট মাস টানা উপোসী থেকেছে, একটিবারের জন্যেও হাত-পা ছড়ায়নি, গর্ত ছেড়ে বেরোয়নি। এতদিন পরে বাইরে এসে সে খুশিতে বরফে গড়াগড়ি দেয়, বাচ্চারা মায়ের সাথে খেলায় মাতে। কিন্তু তাদের ভালুক হওয়া এখনো বাকি। মা রোগা হয়ে গেছে, অভুক্ত পেটে খিদে, দুর্বল শরীর। খাবার জোটানো প্রথম কাজ। মায়ের সাথে পায়ে পায়ে তারা এবার শিকার শিখতে বেরোয়।

ম্যামথদের সন্তানপালনে চর্বির এরকম আলাদা কোনো ভূমিকা থাকত কিনা, জানিনা। কিন্তু একটা ব্যাপার পরিষ্কার। ঊলি ম্যামথ নিশ্চিতভাবেই হিমযুগের প্রাণী, যে হিমযুগ মাত্র কয়েক হাজার বছর আগেও স্পষ্ট ছিল। এখন সে বরফ অনেকটাই কমেছে ঠিকই, কিন্তু ওয়ার্ল্ড ম্যাপের ওপরে আর নীচে ওই দুটো সাদা ছোপই সাক্ষ্য দিচ্ছে, পৃথিবী এখনও আইসহাউস। এরকম আইসহাউস দশা চলাকালীন কন্টিনেন্টাল গ্লেসিয়ারদের আকার বাড়তে-কমতে পারে, কখনো বেড়ে এগিয়ে আসে, কখনো কমে পিছিয়ে যায়, কিন্তু একেবারে নিশ্চিহ্ন হয় না। তেমন হলেই আর তাকে আইসহাউস আর্থ বলা যাবে না। এখন আমাদের বরফগলার পালা চলছে, হিমবাহরা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে, অ্যান্টার্কটিকায় ice shelf খসে যাচ্ছে, সমুদ্রের জলতল ক্রমশ বাড়ছে। পৃথিবী সম্ভবত তার হিমঘর দশা কাটিয়ে উঠছে। 'গ্রীনহাউস এফেক্ট'-এর নাম তো আজ ঘরে ঘরে জানা।


মোটের ওপর নিয়মটা দেখা গেল - বায়ুমণ্ডলে গ্রীনহাউস গ্যাস যত বেশী হবে, পৃথিবী তত সহজে গরম থাকবে। যদি এর মাত্রা কমে যায়, তাহলে তাপ বিকীর্ণ হয়ে ছড়িয়ে যাওয়ার হার বেড়ে যাবে, পৃথিবীর তাপমান নেমে আসবে। কার্বনিফেরাসের বন-কে-বন গাছপালা ক্রমাগত CO₂ শুষে নিয়ে অক্সিজেনে বাতাস ভরিয়ে তোলার ফলে ঠিক তাই হল।

বাতাসে তখন ৩৫% O₂, - এত বেশী অক্সিজেন পৃথিবীর ইতিহাসে আর কখনো বায়ুমণ্ডলে জমেনি। পৃথিবী দ্রুত শীতল হতে লাগল, সেইসাথে সামগ্রিক আর্দ্রতাও কমে এল। প্যানজিয়ায় দেখা দিল হিমযুগ। অনেকখানি অঞ্চল বরফে ঢেকে গেল, ভেজা-ভেজা গরমের দিনকাল বদলে গিয়ে এল শুকনো, ঠাণ্ডা আবহাওয়া। বিশালকায় ফার্ন-মসের বাদলবনেরা এই পরিবর্তন সহ্য করতে পারল না। অধিকাংশ লোপ পেল, যারা বাঁচল তারা টুকরো টুকরো হয়ে এদিকে ওদিকে টিকে রইল। সেই একটানা নিরবিচ্ছিন্ন সবুজ আর রইল না। প্রাগৈতিহাসিক বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে থাকা কার্বন গাছের শরীরে আশ্রয় নিয়েছিল, তার সেই সজীব ঘনীভূত রূপ মাটির নীচে চাপা পড়ে সময়ের সাথে সাথে নতুন পরিচয় পেল - কয়লা।

কার্বনিফেরাসের এই উপসংহারের নাম Carboniferous rainforest collapse। কিন্তু এই কাহিনীতে সত্যিকারের উপসংহার বলে কিছু নেই। কয়লাবাহী রেইনফরেস্ট নিজে শেষ হল বটে, কিন্তু সেই সাথে সাথে প্রাণের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে দিয়ে গেল। যে প্রাণীরা এতদিনে প্রথম আসরে নামল, তাদের নাম সরীসৃপ।


(চলবে)

1610 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2] [3]   এই পাতায় আছে 34 -- 53
Avatar: শারদ্বত

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (১)

সেটা ঠিক, এবং এটা তো পপুলার বিলিফও। সেটা তো খুব ভুল নয়...

Avatar: ক্যাপ্টেন হ্যাডক

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (১)

@শারদ্বত পপুলার হোক না। এই প্রত্যুত্তর দিতে গিয়ে আমার মনে পড়ল যে লেখার সময় ওখানটায় আমি থমকেছিলাম, ‘আপনি’ দেব না ‘তুমি’ দেব তাই নিয়ে। ‘তুমি’ই দিই। কারণটাও মনে পড়ছে। এখানে বলতে বাধছে কারণ পোস্টের বিষয়বস্তু থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছি। এককথায় বলতে গেলে - মানাচ্ছিল না। টেনিদাকে যেমন ‘আপনি’ বললে মানায় না। মাইক লোকটা এমন, - সে ঠিক ‘মাইক মশাই’ নয়, সে হল ‘মাইক ভায়া’। একটা লোককে কতটা ‘প্রেস্টিজিয়াস’ ভাবা হয়, তার ছায়া যেমন তার সর্বনামে পড়ে, তেমন উল্টোটাও হয়, - কোন সর্বনাম ব্যবহৃত হচ্ছে তার ওপর একজন লোকের ইমেজ অামাদের মনে অাঁকা হয়। মাইককে ‘তুমি’ বলেছি সে বাস ড্রাইভার বলে নয়। মাইককে ‘তুমি’ বলেছি কারণ সে ওরকম একটা লোক - শখের চোটে উৎপটাং ঘোরাঘুরি করে বেড়ায়... একটা অ্যামেচার, বোহেমিয়ান, খ্যাপাটে ব্যাপার আছে। ধীরস্থির, রেস্পেক্টেবল ইমেজ হলে ‘আপনি’ লাগাতাম। ঠেলাগাড়ি-ড্রাইভার হলেও।

ঘনাদার বেলা ‘আপনি’, টেনিদার বেলা ‘তুমি’।
ক্যাপ্টেন অ্যামেরিকার বেলা ‘আপনি’, আয়রন ম্যানের বেলা ‘তুমি’।
ডেভিড অ্যাটেনবরোর বেলা ‘আপনি’, স্টিভ আরউইনের বেলা ‘তুমি’। ----- ইহাই আমার ভাষা।

পপুলেস চুলায় যাউক।
Avatar: শারদ্বত

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (১)

নাহ, ফাটাফাটি যুক্তি... হার মানলুম। :)
Avatar: রৌহিন

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (১)

দ্বিতীয় পর্বটা আরো ভালো - কি আর বলব। পরেরটার জন্য অপেক্ষায় থাকি।
Avatar: Atoz

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (১)

আহ, কী ভালো লেখা!!!! অপূর্ব!
Avatar: 0

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (১)

জীব-বিবর্তন নিয়ে এমন সহজ গল্পের মত ক'রে সুন্দর লেখা সেই অভিজিতের এই নিয়ে লেখাপত্রের পরে আর দেখিনি।
পরের পর্বের জন্য বসে রইলাম।

blankএর দাবীকে সমর্থন। এমন লেখার সাথে ছবি না থাকলে হয়?!
Avatar: ক্যাপ্টেন হ্যাডক

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (১)

ছবির দাবী ইচ্ছে করেই মেটাব না। শুধু খিদে মেটানো নয়, খিদে জাগানোটাও উদ্দেশ্য। বানান করে নাম দেওয়া আছে, পাশের ট্যাবে সার্চ মারুন। দাবী জানিয়ে কমেন্ট করার চেয়ে কম সময় লাগবে কৌতূহল মেটাতে। --- এটা আপাতদৃষ্টিতে আমার high-handedness মনে হলেও, পাঠকের স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত। আমি নিজেও ছাত্র, তাই একথা বলছি - এ লেখা প্যাসিভভাবে পড়ে লাভ নেই, পাঁচমিনিটে ভুলে যাবেন - উত্তেজনা জুড়িয়ে যাবে। লেখক, পাঠক - দু’তরফেই দুই কাজই চলুক। নিজে ইনভলভড হয়ে যোগ দিলে তবেই আসল রস পাবেন, এই গ্যারান্টি দিচ্ছি।
Avatar: কল্লোল

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (১)

উফ, মশয়। আমাদের ছোটবেলায় "মানুষ এলো কোথা হতে - ১ আর ২ এই দুইখন্ডে ছবির বই পাওয়া যেতো। আপনি সমতুল্য একটি কাজ করছেন। ভালো থাকুন, আরও লিখুন। ছবিছাবা দেখে নেবো।
কিন্তু একটাই অনুরোধ থামাবেন না।

সম্পাদকদের জন্য - এই লেখাটা সম্পূর্ণ হলে এর চটি চাই। বাচ্চাদের জন্য।
Avatar: মিকটেক্স

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (১)

লেখাটা ভালো হচ্ছে, আরো পর্বের আশায় রইলাম।

শুধু একটা জায়গায় একটু আঘাত পেলাম। অলিফন্ট ছড়া প্রসঙ্গে পিটার জ্যাকসনের নাম না করে জে আর আর টলকিয়েনের নাম নিতে পারতেন। মিডল আর্থের অমর স্রষ্টা টলকিয়েনের বইগুলোকেই জ্যাকসন তাঁর অতি অখাদ্য ও ভয়ানক জঘন্য সিনেমার রূপ দিয়েছেন। হবিট, রিংস ট্রিলজি, সিলমারিলিয়ন বা লস্ট টেলসের ধারেকাছেও জ্যাকসন যেতে পারেননি। বলা বাহুল্য ছড়াটা ট্লকিয়েনের লেখা। তাই ট্লকিয়েনকে মনে করলেই বোধায় ভালো হতো। যাই হোক, এ এক টলকিয়েন ভক্তের মৃদু প্রতিবাদ মাত্র, মূল লেখাটা চলুক।
Avatar: শারদ্বত

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (১)

লেখক টোলকিয়েনের ভয়ঙ্কর ভক্ত। পিটার জ্যাকসনের সিনেমায় Oliphaunt এর প্রথম কল্পিত ছবিটা আমরা দেখি, সেই প্রসঙ্গেই এরকম উল্লেখ, নয়তো ও টোলকিয়েনের সব উপন্যাস পড়েছে, এতটা কাঁচা কাজ ও করবে না... @মিকটেক্স
Avatar: a

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (১)

এইরকম লেখা পড়ার জন্যেই গুরুতে আসা। চলুক প্লিজ
Avatar: Blank

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (১)

তারপর?
Avatar: তাপস

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (১)

দারুন, দারুন।
Avatar: san

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (১)

প্রবল ইন্টারেস্টিং ! চলুক
Avatar: de

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (১)

এতো লম্বা লেখা - পড়তে একটু টাইম লাগে।

খুবই ভালো হচ্ছে!
Avatar: রৌহিন

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (১)

কল্লোলের শেষ কমেন্টের জন্য ক। অবশ্যই শেষ হলে এটার একটা চটি চাই। এবার মিকটেক্সকে ধন্যবাদ দেবার পালা - এটা একদম ঘটনা যে পিটার জ্যাকসন বহু ক্ষেত্রেই টোয়েলকিনের মূল সুরটাই ধরতে পারেন নি - এমন কি অলিফ্যান্টের সেই নাটকীয় ইন্ট্রোদাকশনও ছবিতে অনুপস্থিত - তবু অলিফ্যান্টকে ভিশুয়ালাইজ করার কৃতিত্বটুকু তার প্রাপ্য।
Avatar: Tim

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (১)

ভালো হচ্ছে খুব। চলুক
Avatar: রথীজিৎ

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (১)

অনেক অনেক দিন পর পরের পর্বের জন্য এরকম অকুল হচ্ছি। ঠিক যেমন কিশোর দশায় সাদাকালো বোকাবাক্স তে শুধুমাত্র দূরদর্শন ওয়ান আসত আর চন্দ্রকান্তা কি মহাভারত কি রামায়ণ এর পরের এপিসোডের জন্য হতাম।
চটির দাবীকে সর্বঅন্তঃকরণে সমর্থন জানাচ্ছি।
Avatar: pi

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (১)

ভাল লাগছে। কিছু প্রশ্নও পাচ্ছে। শেষ হোক, তারপর করি ?


Avatar: ক্যাপ্টেন হ্যাডক

Re: পুরানো সেই দিনের কথা (১)

করে ফেলুন। শেষ আর হবে না। আলোচনা যা করার করে ফেলুন, আমি তো সব জানি না, খুব কম জানি, তাই আপনার প্রশ্নে জবাব আমার থেকেই পাবেন এমন আশা করবেন না। হয়তো কোনো পাঠক জবাব দিলেন। তাই, দেরী করে কাজ নাই।

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2] [3]   এই পাতায় আছে 34 -- 53


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন