উদয়ন ঘোষচৌধুরি RSS feed

মোদ্দা ব্যাপার হল, বাঙালি সব জানে। সব মানে, সঅঅঅব। ব্রহ্মা যা জানে না, বাঙালি তা-ও জানে। মোদী থেকে মারাদোনা – লাইফে কে কি করতে পারল না, বাঙালি জাস্ট একটা বিড়ি খেতে খেতে বলে দেবে। উদয়ন বাঙালি, তাই সে-ও সব জানে। অন্তত সেরকমই মনে করে সে। সিনেমা নিয়ে, বইপত্র নিয়ে, বেড়ানোর গপ্পো নিয়ে, আর আরও হ্যানত্যান ইত্যাদি নিয়ে প্রচুর ভাঁটায়। সেইসব বুকনিবাতেলা এবার আপনার ক্লিকে। প্রকাশিত বই : উদোর পিণ্ডি, সৃষ্টিসুখ, ২০১৪; লিঙ্গ নেই মৃত্যু নেই, উবুদশ, ২০১২

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • বার্সিলোনা - পর্ব ১
    ঠিক করেছিলাম আট-নয়দিন স্পেন বেড়াতে গেলে, বার্সিলোনাতেই থাকব। বেড়ানোর সময়টুকুর মধ্যে খুব দৌড় ঝাঁপ, এক দিনে একটা শহর দেখে বা একটা গন্তব্যের দেখার জায়গা ফর্দ মিলিয়ে শেষ করে আবার মাল পত্তর নিয়ে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে ভোর রাতে রওনা হওয়া, আর এই করে ১০ দিনে ৮ ...
  • লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া
    -'একটা ছিল লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া।আর ছিল একটা নীল ঝুঁটি মামাতুয়া।'-'এরা কারা?' মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড়ো করে অদ্ভুত লোকটাকে জিজ্ঞেস করে।-'আসলে কাকাতুয়া আর মামাতুয়া এক জনই। ওর আসল নাম তুয়া। কাকা-ও তুয়া বলে ডাকে, মামা-ও ডাকে তুয়া।'শুনেই মেয়েটা ফিক করে হেসে ...
  • স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি
    স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি। আমি স্টার্ট-আপ কোম্পানিতে কাজ করছি ১৯৯৮ সাল থেকে। সিলিকন ভ্যালিতে। সময়ের একটা আন্দাজ দিতে বলি - গুগুল তখনও শুধু সিলিকন ভ্যালির আনাচে-কানাচে, ফেসবুকের নামগন্ধ নেই, ইয়াহুর বয়েস বছর চারেক, অ্যামাজনেরও বেশি দিন হয়নি। ...
  • মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার
    [আজ বের্টোল্ট ব্রেশট-এর মৃত্যুদিন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে যিনি সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন ব্রেশটিয় আঙ্গিক, সেই মৃণাল সেনকে নিয়ে একটি সামান্য লেখা।]ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কীভাবে যেন পরিচালক ত্রয়ী সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল এক বিন্দুতে এসে মিলিত হন। ১৯৫৫-তে মুক্তি ...
  • দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল পড়ে
    পড়লাম সিজনস অব বিট্রেয়াল গুরুচন্ডা৯'র বই দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল। বইটার সঙ্গে যেন তীব্র সমানুভবে জড়িয়ে গেলাম। প্রাককথনে প্রথম বাক্যেই লেখক বলেছেন বাঙাল বাড়ির দ্বিতীয় প্রজন্মের মেয়ে হিসেবে পার্টিশন শব্দটির সঙ্গে পরিচিতি জন্মাবধি। দেশভাগ কেতাবি ...
  • দুটি পাড়া, একটি বাড়ি
    পাশাপাশি দুই পাড়া - ভ-পাড়া আর প-পাড়া। জন্মলগ্ন থেকেই তাদের মধ্যে তুমুল টক্কর। দুই পাড়ার সীমানায় একখানি সাতমহলা বাহারী বাড়ি। তাতে ক-পরিবারের বাস। এরা সম্ভ্রান্ত, উচ্চশিক্ষিত। দুই পাড়ার সাথেই এদের মুখ মিষ্টি, কিন্তু নিজেদের এরা কোনো পাড়ারই অংশ মনে করে না। ...
  • পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি
    দিলীপ ঘোষযখন স্কুলের গণ্ডি ছাড়াচ্ছি, সন্তোষ রাণা তখন বেশ শিহরণ জাগানাে নাম। গত ষাটের দশকের শেষার্ধ। সংবাদপত্র, সাময়িক পত্রিকা, রেডিও জুড়ে নকশালবাড়ির আন্দোলনের নানা নাম ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের মধ্যে। বুঝি না বুঝি, পকেটে রেড বুক নিয়ে ঘােরাঘুরি ফ্যাশন হয়ে ...
  • দক্ষিণের কড়চা
    (টিপ্পনি : দক্ষিণের কথ্যভাষার অনেক শব্দ রয়েছে। না বুঝতে পারলে বলে দেব।)দক্ষিণের কড়চা▶️এখানে মেঘ ও ভূমি সঙ্গমরত ক্রীড়াময়। এখন ভূমি অনাবৃত মহিষের মতো সহস্রবাসনা, জলধারাস্নানে। সামাদভেড়ির এই ভাগে চিরহরিৎ বৃক্ষরাজি নুনের দিকে চুপিসারে এগিয়ে এসেছে যেন ...
  • জোড়াসাঁকো জংশন ও জেনএক্স রকেটপ্যাড-১৪
    তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায়...আসলে যে কোনও শিল্প উপভোগ করতে পারার একটা বিজ্ঞান আছে। কারণ যাবতীয় পারফর্মিং আর্টের প্রাসাদ পদার্থবিদ্যার সশক্ত স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। পদার্থবিদ্যার শর্তগুলি পূরণ হলেই তবে মনন ও অনুভূতির পর্যায় শুরু হয়। যেমন কণ্ঠ বা যন্ত্র ...
  • উপনিবেশের পাঁচালি
    সাহেবের কাঁধে আছে পৃথিবীর দায়ভিন্নগ্রহ থেকে তাই আসেন ধরায়ঐশী শক্তি, অবতার, আয়ুধাদি সহসকলে দখলে নেয় দুরাচারী গ্রহমর্ত্যলোকে মানুষ যে স্বভাবে পীড়িতমূঢ়মতি, ধীরগতি, জীবিত না মৃতঠাহরই হবে না, তার কীসে উপশমসাহেবের দুইগালে দয়ার পশমঘোষণা দিলেন ওই অবোধের ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

বুদ্ধদেবের ঘুমঘর *

উদয়ন ঘোষচৌধুরি




একটানা গোঁগোঁ হাওয়া আর ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। দু জনেই একটা করে গাছের ডাল কুড়িয়েছি, ওয়াকিং স্টিকের বদলে। অন্ধের মতো হাতড়ে পা ফেলছি। রাস্তার শেষটুকু যেন উঁচু হয়ে ঠেলে উঠেছে। বরফের হাঁচোড়-পাঁচোড়ে ক্যারদানিটা কিছু বেশিই। খাদ যথেষ্ট খাড়াই। নিশ্চিত জানি, অল্প এদিক ওদিক পা রাখলেই হড়কে খাদে ঢুকে যাব। সিঙ্গালিলার জঙ্গলে ঝিঙ্গালিলা জন্তু-টন্তু বেরিয়ে আসা বিচিত্র নয়। হঠাৎ অনেকটা ওপরে একটা আলোর চলাফেরা, কিছু যেন কেউ বলছে। হ্যাঁ, ওই তো বাপির হেডটর্চ, আমাদের খুঁজছে। চেঁচিয়ে সাড়া দিই, আওয়াজ ওদিকে পৌঁছয় না। একসময় মুখোমুখি, আলোর ভরসা পেয়ে সোয়াস্তি। আরও ওপরে দেবুদা দাঁড়িয়ে। সামনে আর্মি ক্যাম্পের টিমটিমে আলো। আটটা বাজে। দুর্যোগের আদিমতায় সব শুনশান। নিঝুম হোটেলগুলো ডুবে আছে ফুট দুয়েক বরফে। ছেঁড়াখোঁড়া মেঘে নক্ষত্রদের জলসা। বাপি এসে আগেই একটা থাকার ঘর জুটিয়ে ফেলেছে। থ্রি-বেডেড খুপরিতে চারজনের ঠাঁই। পৌঁছে-যাওয়া মাত্র চন্দ্রানীর তিড়িংবিরিং শুরু। কোত্থেকে একটা সান্তাক্লজের টুপি জুটিয়েছে, সেটা পরে লাফায় খানিক। অতঃপর ডিনারে গরম ডাল-রুটি সাঁটিয়ে জানলার ফুটোয় কম্বল গুঁজে খুশিয়াল ঘুম।

সকালে ঘনঘোর মেঘ। সঙ্গে কাঁদুনে বরফ। দাপুটে হাওয়ায় বরফকুচিরা ঢুকছে ঘরে। আমি গ্লাভস নিয়ে যাইনি, বেকায়দায় তালু ঘষে ঘ্যাম নিচ্ছি। এদিকে আর-এক কেলো, হোটেলের মালিক এক বালতির বেশি জল দিচ্ছে না। দুর্যোগের দুনিয়ায় তার পাইপে জল উঠছে না, নিচে থেকে টেনে তুলতে হচ্ছে। অধঃপতনের দিকে আঙুল দেখিয়ে সে যা বোঝাল, মনে হল, এখান থেকে প্রায় গঙ্গাসাগরের ডিসট্যান্স। ওদিকে দেবুদা পার্শ্বঘরবাসিনী দুই মেম-যুবতী পেয়ে খুশগপ্পে মশগুল। বাপি উলটো দিকের জানলায় একটি সানগ্লাসিনীকে দেখে আপ্রাণ তেষ্টায় স্মার্ট। সাহায্যের আশা-লতা কিছুই না পেয়ে সঙ্গে আনা নিউজ-পেপার নিয়ে টয়লেটে ঢুকি। বুঝতে পারি, মানবসভ্যতায় কাগজের ব্যবহার এখনও অনেক দিন টিকবে।

সান্দাকফু থেকে এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা, লোৎসে, আর মাকালু দ্যাখা যায়। সামনের শৈলমালাকে বলে ‘স্লিপিং বুদ্ধ’, একসঙ্গে দেখলে মনে হয় যেন শ্বেতশুভ্র বুদ্ধ শুয়ে ঘুমোচ্ছেন। এই ধুমাধার মেঘালু পরিবেশে ক্যামেরা বের করে কোনও লাভ নেই, কিছুই ঠাওর হয় না। হোটেলের দেয়ালে টাঙানো ছবিতেই বুদ্ধকে ঘুমোতে দেখি। উনি নিশ্চিন্তে ঘুমোন, আমি বরং ব্রেকফাস্ট সেরে ছাতা মাথায় নামার রাস্তা ধরি। আজ পৌঁছতে হবে তুমলিং, এখান থেকে উনিশ কিমি। জীবনে কখনও নিচে যাওয়ার মধ্যেও কোনও তৃপ্তি যে লুকিয়ে থাকতে পারে, সেটা একমাত্র এই পাহাড়ে উঠলেই বোঝা যায়।

বিকেভঞ্জন থেকে বরফ তীব্রতর। শশী কপুরের প্রেমাতুর দৃশ্যের মতো, অবিরল ঝরঝর। হাতে, মাথায়, জুতোয় বরফদানা। রাস্তায় কোথাও আঠালো বরফ-কাদা, কোথাও হার্ড-আইস। হার্ড-আইস এক অতি মারাত্মক জিনিস। স্বচ্ছ কাঁচের মতো, দেখে বোঝাও যায় না। পা পড়লেই নিমেষে পপাত, ঠ্যাং ভাঙা বা মাথা ফাটার জন্যে যথেষ্ট। তার মধ্যেই বাপি আমাদের মার্চপাস্ট করিয়ে স্নো-ফলের ভিডিও নেয়। রক্ষে এইটুকু যে, এদিকের রাস্তা অনেক চওড়া আর কম খাড়াই। কুঁড়ে পর্বতপ্রেমীদের জন্যে এদিক দিয়ে ল্যান্ডরোভার চলে। কালপোখরি পৌঁছে চা-ডিমভাজা খেতে খেতে পর দিনের আমোদটা ছকা হল, তুমলিং থেকে টংলু উঠে ধোত্রে হয়ে নামব। শুনেছি, ধোত্রের পথে ঘন গাছগাছালি – আমার লোভটা তাই কিছু বেশিই। বাইরে বরফ এতক্ষণে থেমেছে, তবে মেঘ জমাট। কালপোখরির মিশকালো জলে প্রেম ফোটাচ্ছে মেঘমল্লার। দেখতে না দেখতে নেমে এল বৃষ্টি। গা ও গায়ের বরফদানা ঝেড়ে তার ভেতরেই আবার শুরু হাঁটা।

গৈরিবাস পর্যন্ত হুড়মুড় বৃষ্টি। আমার জগার্স চপচপে। তবে পাহাড়ি বৃষ্টির মজা হচ্ছে, একবার থামলে শুকোতে সময় নেয় না। দেবুদার সঙ্গে বাপি এগিয়ে গেছে। পেছনে আমরা দু জন। ধীরে সুস্থে পা ফেলছি। গৈরিবাসের আর্মি ক্যাম্পের পাশে এক সৈনিক মাছ ধুচ্ছে, দুপুরের আয়োজন। এখান থেকে জৌবাড়ির পথ খাড়াই আর গাম্বাট এবড়োখেবড়ো পাথর। খারাপ ওয়েদারের জন্যে পথ একদম ফাঁকা, ওপরে উঠতে কেউই বোধ হয় সাহস নিচ্ছে না। তাতে আমাদের আনন্দ দ্বিগুণ। যত দূর চোখ যায়, নিঃসীম শিলালিপি। যত দূর বুক যায়, অপরিসীম নিঃশ্বাস। পেছন থেকে গান ভেসে আসে। দেখি, পেটাই স্বাস্থ্যের এক যুবক। পরনে পুরনো বেলবটম। হাতে ঢাউস ব্যাগ। পকেটের মোবাইলে কিশোর কুমার। দূরের কোনও গ্রামে থাকে। নেপালি আশ্রিত নয়, একদম খাঁটি বাংলা বলে। এদিকের হোটেলে আর আর্মিদের কাছে মাছ বিক্রি করে। আশ্চর্য হয়ে যাই তার পেশার মাধুর্যে। ভোর থেকে, কিছু না হোক, তিরিশ কিমি স্বচ্ছন্দ একা হেঁটে মাছ দিয়ে যায় রোজ। এমন বাঙালির জন্যে গর্ব হয়। আমাদের ল্যাদ-মার্কা পদক্ষেপে তাল মেলাতে না পেরে একসময় সে বিদায় নেয়। পাথুরে আঁকাবাঁকায় দৃপ্ত মিলিয়ে যায় ‘মুসাফির হুঁ ইয়ারোঁ, না ঘর হ্যায় না ঠিকানা...’।

ধুঁকতে ধুঁকতে জৌবাড়ি। নেপালের ছোট্ট গ্রাম, যদিও রাজনৈতিক সীমানায় কারুরই কোনও বিশেষ মাথাব্যাথা নেই। পৌঁছে দেখি, বাপি-দেবুদা একটা রেস্টুরেন্টে চা-টোস্ট বলে রেখেছে। আহা, দুপুর তিনটের চোঁচোঁ খিদেয় অমৃত। জৌবাড়ি ছাড়িয়ে আদিগন্ত বুগিয়াল। নেপালের আর্মি ক্যাম্প, এক কামরার কাঠের ঘর, কেউ কোত্থাও নেই। মেঘ সরে গেছে, স্কুল-বালিকার প্রথম প্রেমের মতো মাসুম রোদ্দুর। ঝর্ণায় স্নান করছে পুঁচকে ওয়ালক্রিপার। ক্যামেরা তাক করতেই লাল-কালো বাহারি পালক দুলিয়ে ভীষণ ব্যস্ত উড়ে গেল সে। বিকেল পাঁচটা। দূরে ডান দিকে দ্যাখা যাচ্ছে নীলাদির মায়ের চোর্তেন, ওটাই তুমলিং। নীলাদি এই অঞ্চলের জনপ্রিয় মহিলা। বিয়ে-থা করেননি, স্কুলে পড়ান, নানান রকম উন্নতির কাজ করেন, এবং দারুণ দক্ষতায় একটি হোটেল চালান। আমরা ওখানেই আজ রাত কাটাব। আর হঠাৎ বাঁ দিকে চোখ পড়তেই চমকে যাই। তোলা-উনুনের ধোঁয়ার মতো মেঘকুণ্ডলী ফাটিয়ে উঁকি দিচ্ছে মোলায়েম কাঞ্চনজঙ্ঘা। দিনের শেষ আলোয় তাকে দ্যাখাচ্ছে যেন ছিঁড়ে যাওয়া ভোরবেলার অস্বচ্ছ স্বপ্ন।

(শেষ)

* 'আগামীকাল' পত্রিকায় প্রকাশিত

160 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন