উদয়ন ঘোষচৌধুরি RSS feed

মোদ্দা ব্যাপার হল, বাঙালি সব জানে। সব মানে, সঅঅঅব। ব্রহ্মা যা জানে না, বাঙালি তা-ও জানে। মোদী থেকে মারাদোনা – লাইফে কে কি করতে পারল না, বাঙালি জাস্ট একটা বিড়ি খেতে খেতে বলে দেবে। উদয়ন বাঙালি, তাই সে-ও সব জানে। অন্তত সেরকমই মনে করে সে। সিনেমা নিয়ে, বইপত্র নিয়ে, বেড়ানোর গপ্পো নিয়ে, আর আরও হ্যানত্যান ইত্যাদি নিয়ে প্রচুর ভাঁটায়। সেইসব বুকনিবাতেলা এবার আপনার ক্লিকে। প্রকাশিত বই : উদোর পিণ্ডি, সৃষ্টিসুখ, ২০১৪; লিঙ্গ নেই মৃত্যু নেই, উবুদশ, ২০১২

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • আমাদের চমৎকার বড়দা প্রসঙ্গে
    ইয়ে, স-অ-অ-অ-ব দেখছে। বড়দা সব দেখছে। বড়দা স্রেফ দেখেনি ওইখানে এক দিন রাম জন্মালেন, তার পর কারা বিদেশ থেকে এসে যেন ভেঙেটেঙে মসজিদ স্থাপন করল, কেন না বড়দা তখন ঘুমোচ্ছিলেন। ঘুম ভাঙল যখন, চোখ কচলেটচলে দেখলেন মস্ত ব্যাপার এ, বড়দা বললেন, ভেঙে ফেলো মসজিদ, জমি ...
  • ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ?
    যেকোন নারকীয় ধর্ষণের ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়ে সামনে আসার পর নাগরিক হিসাবে আমাদের একটা ঈমানি দায়িত্ব থাকে। দায়িত্বটা হল অভিযুক্ত ধর্ষকের কঠোরতম শাস্তির দাবি করা। কঠোরতম শাস্তি বলতে কারোর কাছে মৃত্যুদন্ড। কেউ একটু এগিয়ে ধর্ষকের পুরুষাঙ্গ কেটে নেওয়ার ...
  • তোমার পূজার ছলে
    বাঙালি মধ্যবিত্তের মার্জিত ও পরিশীলিত হাবভাব দেখতে বেশ লাগে। অপসংস্কৃতি নিয়ে বাঙালি চিরকাল ওয়াকিবহাল ছিল। আজও আছে। বেশ লাগে। কিন্তু, বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনার প্রবল ক্ষোভ ও অপমানে আপনার কি খুব পরিশীলিত, গঙ্গাজলে ধোওয়া আদ্যন্ত সাত্ত্বিক শব্দ মনে পড়ে? না ...
  • The Irishman
    দা আইরিশম্যান। সিনেমা প্রেমীদের জন্য মার্টিন স্করসিসের নতুন বিস্ময়। ট্যাক্সি ড্রাইভার, গুডফেলাস, ক্যাসিনো, গ্যাংস অব নিউইয়র্ক, দা অ্যাভিয়েটর, দ্য ডিপার্টেড, শাটার আইল্যান্ড, দ্য উল্ফ অব ওয়াল স্ট্রিট, সাইলেন্টের পরের জায়গা দা আইরিশম্যান। বর্তমান সময়ের ...
  • তোকে আমরা কী দিইনি?
    পূর্ণেন্দু পত্রী মশাই মার্জনা করবেন -********তোকে আমরা কী দিইনি নরেন?আগুন জ্বালিয়ে হোলি খেলবি বলে আমরা তোকে দিয়েছি এক ট্রেন ভর্তি করসেবক। দেদার মুসলমান মারবি বলে তুলে দিয়েছি পুরো গুজরাট। তোর রাজধর্ম পালন করতে ইচ্ছে করে বলে পাঠিয়ে দিয়েছি স্বয়ং আদবানীজীকে, ...
  • ইশকুল ও আর্কাদি গাইদার
    "জাহাজ আসে, বলে, ধন্যি খোকা !বিমান আসে, বলে, ধন্যি খোকা !এঞ্জিনও যায়, ধন্যি তোরে খোকা !আসে তরুণ পাইওনিয়র,সেলাম তোরে খোকা !"আরজামাস বলে একটা শহর ছিল। ছোট্ট শহর, অনেক দূরের, অন্য মহাদেশে। অনেক ছোটবেলায় চিনে ফেলেছিলাম। ভৌগোলিক দূরত্ব টের পাইনি।টের পেতে দেননি ...
  • ছন্দহীন কবিতা
    একদিন দুঃসাহসের পাখায় ভর করে,ছুঁতে চেয়েছিলাম কবিতার শরীর ।দ্বিখন্ডিত বাংলার মত কবিতা হয়ে উঠলোছন্দহীন ।অর্থহীন যাত্রার “কা কা” চিৎকারে,ছুটে এলোপ্রতিবাদী পাঠক।ছন্দভঙ্গের নায়কডানা ভেঙ্গে পড়িপুঁথি পুস্তকের এক দোকানে।আলোক প্রাপ্তির প্রত্যাশায়,যোগ ধ্যানে কেটে ...
  • হ্যালোউইনের ভূত
    হ্যালোউইন চলে গেল। আমাদের বাড়িতে হ্যালোউইনের রীতি হল মেয়েরা বন্ধুদের সঙ্গে ট্রিক-অর-ট্রিট করতে বেরোয় দল বেঁধে। পেছনে পেছনে চলে মায়েদের দল। আর আমি বাড়িতে থাকি ক্যান্ডি বিতরণ করব বলে। মুহূর্মুহূ কলিং বেল বাজে, আমি হাসি-হাসি মুখে ক্যান্ডির গামলা নিয়ে দরজা ...
  • হয়নি
    তুমি ভালবাসতে চেয়েছিলে।আমিও ।হয়নি।তুমিঅনেক দূর অব্দি চলে এসেছিলে।আমিও ।হয়নি আর পথ চলা।তুমি ফিরে গেলে,জানালে,ভালবাসতে চেয়েছিলেহয়নি। আমি জানলামচেয়ে পাইনি।হয়নি।জলভেজা চোখে ভেসে গেলআমাদের অতীত।স্মিত হেসে সামনে এসে দাঁড়ালোপথদুজনার দু টি পথ।সেপ্টেম্বর ২২, ...
  • তিরাশির শীত
    ১৯৮৩ র শীতে লয়েডের ওয়েস্টইন্ডিজ ভারতে সফর করতে এলো। সেই সময়কার আমাদের মফস্বলের সেই শীতঋতু, তাজা খেজুর রস ও রকমারি টোপা কুলে আয়োজিত, রঙিন কমলালেবু-সুরভিত, কিছু অন্যরকম ছিলো। এত শীত, এত শীত সেই অধুনাবিস্মৃত কালে, কুয়াশাআচ্ছন্ন পুকুরের লেগে থাকা হিমে মাছ ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

বুদ্ধদেবের ঘুমঘর *

উদয়ন ঘোষচৌধুরি




একটানা গোঁগোঁ হাওয়া আর ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। দু জনেই একটা করে গাছের ডাল কুড়িয়েছি, ওয়াকিং স্টিকের বদলে। অন্ধের মতো হাতড়ে পা ফেলছি। রাস্তার শেষটুকু যেন উঁচু হয়ে ঠেলে উঠেছে। বরফের হাঁচোড়-পাঁচোড়ে ক্যারদানিটা কিছু বেশিই। খাদ যথেষ্ট খাড়াই। নিশ্চিত জানি, অল্প এদিক ওদিক পা রাখলেই হড়কে খাদে ঢুকে যাব। সিঙ্গালিলার জঙ্গলে ঝিঙ্গালিলা জন্তু-টন্তু বেরিয়ে আসা বিচিত্র নয়। হঠাৎ অনেকটা ওপরে একটা আলোর চলাফেরা, কিছু যেন কেউ বলছে। হ্যাঁ, ওই তো বাপির হেডটর্চ, আমাদের খুঁজছে। চেঁচিয়ে সাড়া দিই, আওয়াজ ওদিকে পৌঁছয় না। একসময় মুখোমুখি, আলোর ভরসা পেয়ে সোয়াস্তি। আরও ওপরে দেবুদা দাঁড়িয়ে। সামনে আর্মি ক্যাম্পের টিমটিমে আলো। আটটা বাজে। দুর্যোগের আদিমতায় সব শুনশান। নিঝুম হোটেলগুলো ডুবে আছে ফুট দুয়েক বরফে। ছেঁড়াখোঁড়া মেঘে নক্ষত্রদের জলসা। বাপি এসে আগেই একটা থাকার ঘর জুটিয়ে ফেলেছে। থ্রি-বেডেড খুপরিতে চারজনের ঠাঁই। পৌঁছে-যাওয়া মাত্র চন্দ্রানীর তিড়িংবিরিং শুরু। কোত্থেকে একটা সান্তাক্লজের টুপি জুটিয়েছে, সেটা পরে লাফায় খানিক। অতঃপর ডিনারে গরম ডাল-রুটি সাঁটিয়ে জানলার ফুটোয় কম্বল গুঁজে খুশিয়াল ঘুম।

সকালে ঘনঘোর মেঘ। সঙ্গে কাঁদুনে বরফ। দাপুটে হাওয়ায় বরফকুচিরা ঢুকছে ঘরে। আমি গ্লাভস নিয়ে যাইনি, বেকায়দায় তালু ঘষে ঘ্যাম নিচ্ছি। এদিকে আর-এক কেলো, হোটেলের মালিক এক বালতির বেশি জল দিচ্ছে না। দুর্যোগের দুনিয়ায় তার পাইপে জল উঠছে না, নিচে থেকে টেনে তুলতে হচ্ছে। অধঃপতনের দিকে আঙুল দেখিয়ে সে যা বোঝাল, মনে হল, এখান থেকে প্রায় গঙ্গাসাগরের ডিসট্যান্স। ওদিকে দেবুদা পার্শ্বঘরবাসিনী দুই মেম-যুবতী পেয়ে খুশগপ্পে মশগুল। বাপি উলটো দিকের জানলায় একটি সানগ্লাসিনীকে দেখে আপ্রাণ তেষ্টায় স্মার্ট। সাহায্যের আশা-লতা কিছুই না পেয়ে সঙ্গে আনা নিউজ-পেপার নিয়ে টয়লেটে ঢুকি। বুঝতে পারি, মানবসভ্যতায় কাগজের ব্যবহার এখনও অনেক দিন টিকবে।

সান্দাকফু থেকে এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা, লোৎসে, আর মাকালু দ্যাখা যায়। সামনের শৈলমালাকে বলে ‘স্লিপিং বুদ্ধ’, একসঙ্গে দেখলে মনে হয় যেন শ্বেতশুভ্র বুদ্ধ শুয়ে ঘুমোচ্ছেন। এই ধুমাধার মেঘালু পরিবেশে ক্যামেরা বের করে কোনও লাভ নেই, কিছুই ঠাওর হয় না। হোটেলের দেয়ালে টাঙানো ছবিতেই বুদ্ধকে ঘুমোতে দেখি। উনি নিশ্চিন্তে ঘুমোন, আমি বরং ব্রেকফাস্ট সেরে ছাতা মাথায় নামার রাস্তা ধরি। আজ পৌঁছতে হবে তুমলিং, এখান থেকে উনিশ কিমি। জীবনে কখনও নিচে যাওয়ার মধ্যেও কোনও তৃপ্তি যে লুকিয়ে থাকতে পারে, সেটা একমাত্র এই পাহাড়ে উঠলেই বোঝা যায়।

বিকেভঞ্জন থেকে বরফ তীব্রতর। শশী কপুরের প্রেমাতুর দৃশ্যের মতো, অবিরল ঝরঝর। হাতে, মাথায়, জুতোয় বরফদানা। রাস্তায় কোথাও আঠালো বরফ-কাদা, কোথাও হার্ড-আইস। হার্ড-আইস এক অতি মারাত্মক জিনিস। স্বচ্ছ কাঁচের মতো, দেখে বোঝাও যায় না। পা পড়লেই নিমেষে পপাত, ঠ্যাং ভাঙা বা মাথা ফাটার জন্যে যথেষ্ট। তার মধ্যেই বাপি আমাদের মার্চপাস্ট করিয়ে স্নো-ফলের ভিডিও নেয়। রক্ষে এইটুকু যে, এদিকের রাস্তা অনেক চওড়া আর কম খাড়াই। কুঁড়ে পর্বতপ্রেমীদের জন্যে এদিক দিয়ে ল্যান্ডরোভার চলে। কালপোখরি পৌঁছে চা-ডিমভাজা খেতে খেতে পর দিনের আমোদটা ছকা হল, তুমলিং থেকে টংলু উঠে ধোত্রে হয়ে নামব। শুনেছি, ধোত্রের পথে ঘন গাছগাছালি – আমার লোভটা তাই কিছু বেশিই। বাইরে বরফ এতক্ষণে থেমেছে, তবে মেঘ জমাট। কালপোখরির মিশকালো জলে প্রেম ফোটাচ্ছে মেঘমল্লার। দেখতে না দেখতে নেমে এল বৃষ্টি। গা ও গায়ের বরফদানা ঝেড়ে তার ভেতরেই আবার শুরু হাঁটা।

গৈরিবাস পর্যন্ত হুড়মুড় বৃষ্টি। আমার জগার্স চপচপে। তবে পাহাড়ি বৃষ্টির মজা হচ্ছে, একবার থামলে শুকোতে সময় নেয় না। দেবুদার সঙ্গে বাপি এগিয়ে গেছে। পেছনে আমরা দু জন। ধীরে সুস্থে পা ফেলছি। গৈরিবাসের আর্মি ক্যাম্পের পাশে এক সৈনিক মাছ ধুচ্ছে, দুপুরের আয়োজন। এখান থেকে জৌবাড়ির পথ খাড়াই আর গাম্বাট এবড়োখেবড়ো পাথর। খারাপ ওয়েদারের জন্যে পথ একদম ফাঁকা, ওপরে উঠতে কেউই বোধ হয় সাহস নিচ্ছে না। তাতে আমাদের আনন্দ দ্বিগুণ। যত দূর চোখ যায়, নিঃসীম শিলালিপি। যত দূর বুক যায়, অপরিসীম নিঃশ্বাস। পেছন থেকে গান ভেসে আসে। দেখি, পেটাই স্বাস্থ্যের এক যুবক। পরনে পুরনো বেলবটম। হাতে ঢাউস ব্যাগ। পকেটের মোবাইলে কিশোর কুমার। দূরের কোনও গ্রামে থাকে। নেপালি আশ্রিত নয়, একদম খাঁটি বাংলা বলে। এদিকের হোটেলে আর আর্মিদের কাছে মাছ বিক্রি করে। আশ্চর্য হয়ে যাই তার পেশার মাধুর্যে। ভোর থেকে, কিছু না হোক, তিরিশ কিমি স্বচ্ছন্দ একা হেঁটে মাছ দিয়ে যায় রোজ। এমন বাঙালির জন্যে গর্ব হয়। আমাদের ল্যাদ-মার্কা পদক্ষেপে তাল মেলাতে না পেরে একসময় সে বিদায় নেয়। পাথুরে আঁকাবাঁকায় দৃপ্ত মিলিয়ে যায় ‘মুসাফির হুঁ ইয়ারোঁ, না ঘর হ্যায় না ঠিকানা...’।

ধুঁকতে ধুঁকতে জৌবাড়ি। নেপালের ছোট্ট গ্রাম, যদিও রাজনৈতিক সীমানায় কারুরই কোনও বিশেষ মাথাব্যাথা নেই। পৌঁছে দেখি, বাপি-দেবুদা একটা রেস্টুরেন্টে চা-টোস্ট বলে রেখেছে। আহা, দুপুর তিনটের চোঁচোঁ খিদেয় অমৃত। জৌবাড়ি ছাড়িয়ে আদিগন্ত বুগিয়াল। নেপালের আর্মি ক্যাম্প, এক কামরার কাঠের ঘর, কেউ কোত্থাও নেই। মেঘ সরে গেছে, স্কুল-বালিকার প্রথম প্রেমের মতো মাসুম রোদ্দুর। ঝর্ণায় স্নান করছে পুঁচকে ওয়ালক্রিপার। ক্যামেরা তাক করতেই লাল-কালো বাহারি পালক দুলিয়ে ভীষণ ব্যস্ত উড়ে গেল সে। বিকেল পাঁচটা। দূরে ডান দিকে দ্যাখা যাচ্ছে নীলাদির মায়ের চোর্তেন, ওটাই তুমলিং। নীলাদি এই অঞ্চলের জনপ্রিয় মহিলা। বিয়ে-থা করেননি, স্কুলে পড়ান, নানান রকম উন্নতির কাজ করেন, এবং দারুণ দক্ষতায় একটি হোটেল চালান। আমরা ওখানেই আজ রাত কাটাব। আর হঠাৎ বাঁ দিকে চোখ পড়তেই চমকে যাই। তোলা-উনুনের ধোঁয়ার মতো মেঘকুণ্ডলী ফাটিয়ে উঁকি দিচ্ছে মোলায়েম কাঞ্চনজঙ্ঘা। দিনের শেষ আলোয় তাকে দ্যাখাচ্ছে যেন ছিঁড়ে যাওয়া ভোরবেলার অস্বচ্ছ স্বপ্ন।

(শেষ)

* 'আগামীকাল' পত্রিকায় প্রকাশিত

199 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন