উদয়ন ঘোষচৌধুরি RSS feed

মোদ্দা ব্যাপার হল, বাঙালি সব জানে। সব মানে, সঅঅঅব। ব্রহ্মা যা জানে না, বাঙালি তা-ও জানে। মোদী থেকে মারাদোনা – লাইফে কে কি করতে পারল না, বাঙালি জাস্ট একটা বিড়ি খেতে খেতে বলে দেবে। উদয়ন বাঙালি, তাই সে-ও সব জানে। অন্তত সেরকমই মনে করে সে। সিনেমা নিয়ে, বইপত্র নিয়ে, বেড়ানোর গপ্পো নিয়ে, আর আরও হ্যানত্যান ইত্যাদি নিয়ে প্রচুর ভাঁটায়। সেইসব বুকনিবাতেলা এবার আপনার ক্লিকে। প্রকাশিত বই : উদোর পিণ্ডি, সৃষ্টিসুখ, ২০১৪; লিঙ্গ নেই মৃত্যু নেই, উবুদশ, ২০১২

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • দক্ষিণের কড়চা
    গরু বাগদির মর্মরহস্য➡️মাঝে কেবল একটি একক বাঁশের সাঁকো। তার দোসর আরেকটি ধরার বাঁশ লম্বালম্বি। সাঁকোর নিচে অতিদূর জ্বরের মতো পাতলা একটি খাল নিজের গায়ে কচুরিপানার চাদর জড়িয়ে রুগ্ন বহুকাল। খালটি জলনিকাশির। ঘোর বর্ষায় ফুলে ফেঁপে ওঠে পচা লাশের মতো। যেহেতু এই ...
  • বাংলায় এনআরসি ?
    বাংলায় শেষমেস এনআরসি হবে, না হবে না, জানি না। তবে গ্রামের সাধারণ নিরক্ষর মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আজ ব্লক অফিসে গেছিলাম। দেখে তাজ্জব! এত এত মানু্ষের রেশন কার্ডে ভুল! কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানলাম প্রায় সবার ভোটারেও ভুল। সব আইকার্ড নির্ভুল আছে এমন ...
  • যান্ত্রিক বিপিন
    (১)বিপিন বাবু সোদপুর থেকে ডি এন ৪৬ ধরবেন। প্রতিদিন’ই ধরেন। গত তিন-চার বছর ধরে এটাই বিপিন’বাবুর অফিস যাওয়ার রুট। হিতাচি এসি কোম্পানীর সিনিয়র টেকনিশিয়ন, বয়েস আটান্ন। এত বেশী বয়েসে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এসি সার্ভিসিং করা, ইন্সটল করা একটু চাপ।ভুল বললাম, অনেকটাই চাপ। ...
  • কাইট রানার ও তার বাপের গল্প
    গত তিন বছর ধরে ছেলের খুব ঘুড়ি ওড়ানোর শখ। গত দুবার আমাকে দিয়ে ঘুড়ি লাটাই কিনিয়েছে কিন্তু ওড়াতে পারেনা - কায়দা করার আগেই ঘুড়ি ছিঁড়ে যায়। গত বছর আমাকে নিয়ে ছাদে গেছিল কিন্তু এই ব্যপারে আমিও তথৈবচ - ছোটবেলায় মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল ঘুড়ি ওড়ানো "বদ ছেলে" দের ...
  • কুচু-মনা উপাখ্যান
    ১৯৮৩ সনের মাঝামাঝি অকস্মাৎ আমাদের বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ(ক) শ্রেণী দুই দলে বিভক্ত হইয়া গেল।এতদিন ক্লাসে নিরঙ্কুশ তথা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করিয়া ছিল কুচু। কুচুর ভাল নাম কচ কুমার অধিকারী। সে ক্লাসে স্বীয় মহিমায় প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করিয়াছিল। একটি গান অবিকল ...
  • 'আইনি পথে' অর্জিত অধিকার হরণ
    ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম ও কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে, দীর্ঘসংগ্রামে অর্জিত অধিকার সমূহকে মোদী সরকার হরণ করছে— আলোচনা করলেন রতন গায়েন। দেশে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি লাগু হওয়ার পর থেকেই দক্ষিণপন্থার সুদিন সূচিত হয়েছে। তথাপি ১৯৯০-২০১৪-র মধ্যবর্তী সময়ে ...
  • সম্পাদকীয়-- অর্থনৈতিক সংকটের স্বরূপ
    মোদীর সিংহগর্জন আর অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতাকে চাপা দিয়ে রাখতে পারছে না। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে ভারতের অর্থনীতি সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। সংকট কতটা গভীর সেটা তার স্বীকারোক্তিতে ধরা পড়েনি। ধরা পড়েনি এই নির্মম ...
  • কাশ্মীরি পন্ডিত বিতাড়নঃ মিথ, ইতিহাস ও রাজনীতি
    কাশ্মীরে ডোগরা রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর তাদের আত্মীয় পরিজনেরা কাশ্মীর উপত্যকায় বসতি শুরু করে। কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মানুষেরাও ছিলেন। এরা শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেনি। দেশভাগের পরেও এদের ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে পড়াশোনা করেছে। অন্যদিকে ...
  • নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ
    "তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে ?আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে ..."সেই অক্ষরগুলোকে ধরার আরেকটা অক্ষম চেষ্টা, আমার নতুন লেখায় ... এক বন্ধু অনেকদিন আগে বলেছিলো, 'আঙ্গুলের গভীর বন্দর থেকে যে নৌকোগুলো ছাড়ে সেগুলো ঠিক-ই গন্তব্যে পৌঁছে যায়' ...
  • খানাকুল - ২
    [এর আগে - https://www.guruchan...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

বুদ্ধদেবের ঘুমঘর *

উদয়ন ঘোষচৌধুরি




একটানা গোঁগোঁ হাওয়া আর ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। দু জনেই একটা করে গাছের ডাল কুড়িয়েছি, ওয়াকিং স্টিকের বদলে। অন্ধের মতো হাতড়ে পা ফেলছি। রাস্তার শেষটুকু যেন উঁচু হয়ে ঠেলে উঠেছে। বরফের হাঁচোড়-পাঁচোড়ে ক্যারদানিটা কিছু বেশিই। খাদ যথেষ্ট খাড়াই। নিশ্চিত জানি, অল্প এদিক ওদিক পা রাখলেই হড়কে খাদে ঢুকে যাব। সিঙ্গালিলার জঙ্গলে ঝিঙ্গালিলা জন্তু-টন্তু বেরিয়ে আসা বিচিত্র নয়। হঠাৎ অনেকটা ওপরে একটা আলোর চলাফেরা, কিছু যেন কেউ বলছে। হ্যাঁ, ওই তো বাপির হেডটর্চ, আমাদের খুঁজছে। চেঁচিয়ে সাড়া দিই, আওয়াজ ওদিকে পৌঁছয় না। একসময় মুখোমুখি, আলোর ভরসা পেয়ে সোয়াস্তি। আরও ওপরে দেবুদা দাঁড়িয়ে। সামনে আর্মি ক্যাম্পের টিমটিমে আলো। আটটা বাজে। দুর্যোগের আদিমতায় সব শুনশান। নিঝুম হোটেলগুলো ডুবে আছে ফুট দুয়েক বরফে। ছেঁড়াখোঁড়া মেঘে নক্ষত্রদের জলসা। বাপি এসে আগেই একটা থাকার ঘর জুটিয়ে ফেলেছে। থ্রি-বেডেড খুপরিতে চারজনের ঠাঁই। পৌঁছে-যাওয়া মাত্র চন্দ্রানীর তিড়িংবিরিং শুরু। কোত্থেকে একটা সান্তাক্লজের টুপি জুটিয়েছে, সেটা পরে লাফায় খানিক। অতঃপর ডিনারে গরম ডাল-রুটি সাঁটিয়ে জানলার ফুটোয় কম্বল গুঁজে খুশিয়াল ঘুম।

সকালে ঘনঘোর মেঘ। সঙ্গে কাঁদুনে বরফ। দাপুটে হাওয়ায় বরফকুচিরা ঢুকছে ঘরে। আমি গ্লাভস নিয়ে যাইনি, বেকায়দায় তালু ঘষে ঘ্যাম নিচ্ছি। এদিকে আর-এক কেলো, হোটেলের মালিক এক বালতির বেশি জল দিচ্ছে না। দুর্যোগের দুনিয়ায় তার পাইপে জল উঠছে না, নিচে থেকে টেনে তুলতে হচ্ছে। অধঃপতনের দিকে আঙুল দেখিয়ে সে যা বোঝাল, মনে হল, এখান থেকে প্রায় গঙ্গাসাগরের ডিসট্যান্স। ওদিকে দেবুদা পার্শ্বঘরবাসিনী দুই মেম-যুবতী পেয়ে খুশগপ্পে মশগুল। বাপি উলটো দিকের জানলায় একটি সানগ্লাসিনীকে দেখে আপ্রাণ তেষ্টায় স্মার্ট। সাহায্যের আশা-লতা কিছুই না পেয়ে সঙ্গে আনা নিউজ-পেপার নিয়ে টয়লেটে ঢুকি। বুঝতে পারি, মানবসভ্যতায় কাগজের ব্যবহার এখনও অনেক দিন টিকবে।

সান্দাকফু থেকে এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা, লোৎসে, আর মাকালু দ্যাখা যায়। সামনের শৈলমালাকে বলে ‘স্লিপিং বুদ্ধ’, একসঙ্গে দেখলে মনে হয় যেন শ্বেতশুভ্র বুদ্ধ শুয়ে ঘুমোচ্ছেন। এই ধুমাধার মেঘালু পরিবেশে ক্যামেরা বের করে কোনও লাভ নেই, কিছুই ঠাওর হয় না। হোটেলের দেয়ালে টাঙানো ছবিতেই বুদ্ধকে ঘুমোতে দেখি। উনি নিশ্চিন্তে ঘুমোন, আমি বরং ব্রেকফাস্ট সেরে ছাতা মাথায় নামার রাস্তা ধরি। আজ পৌঁছতে হবে তুমলিং, এখান থেকে উনিশ কিমি। জীবনে কখনও নিচে যাওয়ার মধ্যেও কোনও তৃপ্তি যে লুকিয়ে থাকতে পারে, সেটা একমাত্র এই পাহাড়ে উঠলেই বোঝা যায়।

বিকেভঞ্জন থেকে বরফ তীব্রতর। শশী কপুরের প্রেমাতুর দৃশ্যের মতো, অবিরল ঝরঝর। হাতে, মাথায়, জুতোয় বরফদানা। রাস্তায় কোথাও আঠালো বরফ-কাদা, কোথাও হার্ড-আইস। হার্ড-আইস এক অতি মারাত্মক জিনিস। স্বচ্ছ কাঁচের মতো, দেখে বোঝাও যায় না। পা পড়লেই নিমেষে পপাত, ঠ্যাং ভাঙা বা মাথা ফাটার জন্যে যথেষ্ট। তার মধ্যেই বাপি আমাদের মার্চপাস্ট করিয়ে স্নো-ফলের ভিডিও নেয়। রক্ষে এইটুকু যে, এদিকের রাস্তা অনেক চওড়া আর কম খাড়াই। কুঁড়ে পর্বতপ্রেমীদের জন্যে এদিক দিয়ে ল্যান্ডরোভার চলে। কালপোখরি পৌঁছে চা-ডিমভাজা খেতে খেতে পর দিনের আমোদটা ছকা হল, তুমলিং থেকে টংলু উঠে ধোত্রে হয়ে নামব। শুনেছি, ধোত্রের পথে ঘন গাছগাছালি – আমার লোভটা তাই কিছু বেশিই। বাইরে বরফ এতক্ষণে থেমেছে, তবে মেঘ জমাট। কালপোখরির মিশকালো জলে প্রেম ফোটাচ্ছে মেঘমল্লার। দেখতে না দেখতে নেমে এল বৃষ্টি। গা ও গায়ের বরফদানা ঝেড়ে তার ভেতরেই আবার শুরু হাঁটা।

গৈরিবাস পর্যন্ত হুড়মুড় বৃষ্টি। আমার জগার্স চপচপে। তবে পাহাড়ি বৃষ্টির মজা হচ্ছে, একবার থামলে শুকোতে সময় নেয় না। দেবুদার সঙ্গে বাপি এগিয়ে গেছে। পেছনে আমরা দু জন। ধীরে সুস্থে পা ফেলছি। গৈরিবাসের আর্মি ক্যাম্পের পাশে এক সৈনিক মাছ ধুচ্ছে, দুপুরের আয়োজন। এখান থেকে জৌবাড়ির পথ খাড়াই আর গাম্বাট এবড়োখেবড়ো পাথর। খারাপ ওয়েদারের জন্যে পথ একদম ফাঁকা, ওপরে উঠতে কেউই বোধ হয় সাহস নিচ্ছে না। তাতে আমাদের আনন্দ দ্বিগুণ। যত দূর চোখ যায়, নিঃসীম শিলালিপি। যত দূর বুক যায়, অপরিসীম নিঃশ্বাস। পেছন থেকে গান ভেসে আসে। দেখি, পেটাই স্বাস্থ্যের এক যুবক। পরনে পুরনো বেলবটম। হাতে ঢাউস ব্যাগ। পকেটের মোবাইলে কিশোর কুমার। দূরের কোনও গ্রামে থাকে। নেপালি আশ্রিত নয়, একদম খাঁটি বাংলা বলে। এদিকের হোটেলে আর আর্মিদের কাছে মাছ বিক্রি করে। আশ্চর্য হয়ে যাই তার পেশার মাধুর্যে। ভোর থেকে, কিছু না হোক, তিরিশ কিমি স্বচ্ছন্দ একা হেঁটে মাছ দিয়ে যায় রোজ। এমন বাঙালির জন্যে গর্ব হয়। আমাদের ল্যাদ-মার্কা পদক্ষেপে তাল মেলাতে না পেরে একসময় সে বিদায় নেয়। পাথুরে আঁকাবাঁকায় দৃপ্ত মিলিয়ে যায় ‘মুসাফির হুঁ ইয়ারোঁ, না ঘর হ্যায় না ঠিকানা...’।

ধুঁকতে ধুঁকতে জৌবাড়ি। নেপালের ছোট্ট গ্রাম, যদিও রাজনৈতিক সীমানায় কারুরই কোনও বিশেষ মাথাব্যাথা নেই। পৌঁছে দেখি, বাপি-দেবুদা একটা রেস্টুরেন্টে চা-টোস্ট বলে রেখেছে। আহা, দুপুর তিনটের চোঁচোঁ খিদেয় অমৃত। জৌবাড়ি ছাড়িয়ে আদিগন্ত বুগিয়াল। নেপালের আর্মি ক্যাম্প, এক কামরার কাঠের ঘর, কেউ কোত্থাও নেই। মেঘ সরে গেছে, স্কুল-বালিকার প্রথম প্রেমের মতো মাসুম রোদ্দুর। ঝর্ণায় স্নান করছে পুঁচকে ওয়ালক্রিপার। ক্যামেরা তাক করতেই লাল-কালো বাহারি পালক দুলিয়ে ভীষণ ব্যস্ত উড়ে গেল সে। বিকেল পাঁচটা। দূরে ডান দিকে দ্যাখা যাচ্ছে নীলাদির মায়ের চোর্তেন, ওটাই তুমলিং। নীলাদি এই অঞ্চলের জনপ্রিয় মহিলা। বিয়ে-থা করেননি, স্কুলে পড়ান, নানান রকম উন্নতির কাজ করেন, এবং দারুণ দক্ষতায় একটি হোটেল চালান। আমরা ওখানেই আজ রাত কাটাব। আর হঠাৎ বাঁ দিকে চোখ পড়তেই চমকে যাই। তোলা-উনুনের ধোঁয়ার মতো মেঘকুণ্ডলী ফাটিয়ে উঁকি দিচ্ছে মোলায়েম কাঞ্চনজঙ্ঘা। দিনের শেষ আলোয় তাকে দ্যাখাচ্ছে যেন ছিঁড়ে যাওয়া ভোরবেলার অস্বচ্ছ স্বপ্ন।

(শেষ)

* 'আগামীকাল' পত্রিকায় প্রকাশিত

169 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন