ফরিদা RSS feed

প্রচ্ছন্ন পায়রাগুলি

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা... বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ পরিবর্তন হওয়ার দিন
    বিএনপি এখন অস্তিত্ব সংকটে আছে। কিন্তু কয়েক বছর আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না। ক্ষমতার তাপে মাথা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল দলটার। ফলাফল ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড মেরে হত্যার চেষ্টা। বিরোধীদলের নেত্রীকে হত্যার চেষ্টা করলেই ...
  • তোমার বাড়ি
    তোমার বাড়ি মেঘের কাছে, তোমার গ্রামে বরফ আজো?আজ, সীমান্তবর্তী শহর, শুধুই বেয়নেটে সাজো।সারাটা দিন বুটের টহল, সারাটা দিন বন্দী ঘরে।সমস্ত রাত দুয়ারগুলি অবিরত ভাঙলো ঝড়ে।জেনেছো আজ, কেউ আসেনি: তোমার জন্য পরিত্রাতা।তোমার নমাজ হয় না আদায়, তোমার চোখে পেলেট ...
  • বার্সিলোনা - পর্ব ২
    বার্সিলোনা আসলে স্পেনের শহর হয়েও স্পেনের না। উত্তর পুর্ব স্পেনের যেখানে বার্সিলোনা, সেই অঞ্চল কে বলা হয় ক্যাটালোনিয়া। স্বাধীনদেশ না হয়েও স্বশাসিত প্রদেশ। যেমন কানাডায় কিউবেক। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই মনে হয় এরকম একটা জায়গা থাকে, দেশি হয়েও দেশি না। ...
  • বার্সিলোনা - পর্ব ১
    ঠিক করেছিলাম আট-নয়দিন স্পেন বেড়াতে গেলে, বার্সিলোনাতেই থাকব। বেড়ানোর সময়টুকুর মধ্যে খুব দৌড় ঝাঁপ, এক দিনে একটা শহর দেখে বা একটা গন্তব্যের দেখার জায়গা ফর্দ মিলিয়ে শেষ করে আবার মাল পত্তর নিয়ে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে ভোর রাতে রওনা হওয়া, আর এই করে ১০ দিনে ৮ ...
  • লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া
    -'একটা ছিল লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া।আর ছিল একটা নীল ঝুঁটি মামাতুয়া।'-'এরা কারা?' মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড়ো করে অদ্ভুত লোকটাকে জিজ্ঞেস করে।-'আসলে কাকাতুয়া আর মামাতুয়া এক জনই। ওর আসল নাম তুয়া। কাকা-ও তুয়া বলে ডাকে, মামা-ও ডাকে তুয়া।'শুনেই মেয়েটা ফিক করে হেসে ...
  • স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি
    স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি। আমি স্টার্ট-আপ কোম্পানিতে কাজ করছি ১৯৯৮ সাল থেকে। সিলিকন ভ্যালিতে। সময়ের একটা আন্দাজ দিতে বলি - গুগুল তখনও শুধু সিলিকন ভ্যালির আনাচে-কানাচে, ফেসবুকের নামগন্ধ নেই, ইয়াহুর বয়েস বছর চারেক, অ্যামাজনেরও বেশি দিন হয়নি। ...
  • মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার
    [আজ বের্টোল্ট ব্রেশট-এর মৃত্যুদিন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে যিনি সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন ব্রেশটিয় আঙ্গিক, সেই মৃণাল সেনকে নিয়ে একটি সামান্য লেখা।]ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কীভাবে যেন পরিচালক ত্রয়ী সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল এক বিন্দুতে এসে মিলিত হন। ১৯৫৫-তে মুক্তি ...
  • দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল পড়ে
    পড়লাম সিজনস অব বিট্রেয়াল গুরুচন্ডা৯'র বই দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল। বইটার সঙ্গে যেন তীব্র সমানুভবে জড়িয়ে গেলাম। প্রাককথনে প্রথম বাক্যেই লেখক বলেছেন বাঙাল বাড়ির দ্বিতীয় প্রজন্মের মেয়ে হিসেবে পার্টিশন শব্দটির সঙ্গে পরিচিতি জন্মাবধি। দেশভাগ কেতাবি ...
  • দুটি পাড়া, একটি বাড়ি
    পাশাপাশি দুই পাড়া - ভ-পাড়া আর প-পাড়া। জন্মলগ্ন থেকেই তাদের মধ্যে তুমুল টক্কর। দুই পাড়ার সীমানায় একখানি সাতমহলা বাহারী বাড়ি। তাতে ক-পরিবারের বাস। এরা সম্ভ্রান্ত, উচ্চশিক্ষিত। দুই পাড়ার সাথেই এদের মুখ মিষ্টি, কিন্তু নিজেদের এরা কোনো পাড়ারই অংশ মনে করে না। ...
  • পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি
    দিলীপ ঘোষযখন স্কুলের গণ্ডি ছাড়াচ্ছি, সন্তোষ রাণা তখন বেশ শিহরণ জাগানাে নাম। গত ষাটের দশকের শেষার্ধ। সংবাদপত্র, সাময়িক পত্রিকা, রেডিও জুড়ে নকশালবাড়ির আন্দোলনের নানা নাম ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের মধ্যে। বুঝি না বুঝি, পকেটে রেড বুক নিয়ে ঘােরাঘুরি ফ্যাশন হয়ে ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

অন্দরমহলে অনুরূপ

ফরিদা

কিছুদিন ধরেই একটা আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। কী যেন একটা নেই, মানে ছিল, এখন হারিয়ে যেতে বসেছে এমন একটা কিছু বোধ আসছিল বারবার। একটা ক্ষোভ। ঠিক ধরা পড়ছিল না, সামনে আসতে পারছিল না – কী যেন একটা হারাতে বসেছে সে। সে মানে অনুরূপ বিশ্বাস।
একটা রাগ হচ্ছিল তার। হারিয়েছে, হারিয়ে যাচ্ছে কিছু একটা – ঠাহর করা যাচ্ছে সেটা কিন্তু ঠিক সেটা কী তা বোঝা যাচ্ছে না। এ এক অদ্ভুত অস্বস্তি। আকাশের অনেক উঁচু থেকে বিন্দু বিন্দু শূন্যতা নেমে আসছে তার চারধারে – অন্ধকারের মতো। ঠিক অন্ধকার নয়, অন্ধকার কখনো আকাশ থেকে নামে না। ওঠে। পাহাড়ের গায়ের হঠাৎ আটকে পড়া এক ঝাঁক কুয়াশা যেমন – নেমে আসছিল শূন্যতা। ঠিক কুয়াশাও নয় যেন, কুয়াশায় শূন্যতাবোধ থাকে কিন্তু তা এত বিন্দু বিন্দু হয়ে নামে না। যার এমন বোধ হয়েছে সেইই বুঝতে পারবে কিছুটা হয়ত। ভাবছিল অনুরূপ বিশ্বাস। কুয়াশায় দৃশ্য আড়াল করে দেওয়ার মতো ধীরে ধীরে শব্দ মুছে যাচ্ছিল তার মুখের কথার মতো।
একটা চালু ব্যবস্থার মতো হচ্ছিল এটা। ছিল, আছে, থাকবে, তবু তার দৈনন্দিন ব্যবহারের একটা আধটা শব্দ হঠাৎ করে নেই। যেমন স্নানে যাওয়রা আগে দেখতে পাওয়া সাবানের কেসে সাবানটা হঠাৎ নেই। শেষ হয়ে যায় নি সেটা। নিশ্চিত। পুরো আস্ত না হলেও অর্ধেকের বেশি সাবান তো ছিলই। খানিকটা তেমন। এই যে নেই হওয়াটা আগে থেকে বোঝা যায় নি। ব্যবহারের আগে অবধি তা নিয়ে কোনোমাত্র সংশয়ের জায়গাও ছিল না। সে সামান্য সাবান সে তার জায়গাতেই থাকে। থাকবে। এমনটাই হয়ে আসছে। সে এমন ধোঁকা দিলে চলে?
প্রথম টের পেল যখন বেশ অবাক হয়ে গেছিল সে। এমন আচমকা হল ব্যাপারটা। কোথায় সে যেন যাচ্ছিল সেদিন অনুরূপ। নাকি ফিরছিল। এখন সেটা অবান্তর হয়ে গেছে। এমন চমকে গিয়েছিল সে তারপরে তার আর মাথাতেই ছিল না সে যাচ্ছিল না ফিরছিল, কারণ তারপরে তার গন্তব্যে আর পৌছনো সম্ভব হয় নি।
হয়ছিল কি – অনুরূপ হাঁটছিল। সে সচরাচর হাঁটে। ঠেকায় না পড়লে বাসে ট্রামে সে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। সেদিন ও হাঁটছিল। একটা কুকুর, আপাত নিরীহ রাস্তার কুকুর কি কারণে যেন তাকে তাড়া করে হঠাৎ। এমনিতে সাদামাটা অনুরূপ বেশ ভিতু প্রকৃতির মানুষ হয়েও ঘুরে দাঁড়িয়েছিল সে সেদিন। বোধ হয় বিরক্তিতেই। কুকুরটাও বোধ হয় ভয় দেখানর পরিকল্পনা ছিল – যদি কেউ ভয় পায়, একটু তাড়া করে যাবে বরং। বেশি দৌড় লাগালে সে বড়জোর পায়ের ডিমে দাঁতের দাগ বসাবে – তাকে তাড়া করিয়ে ক্লান্ত করে দিয়েছে এই অপরাধে। অনুরূপ ঘুরে তাকাতেই সেসব অঙ্ক মিলল না দেখে সে একটু বিব্রত কিছুটা বা। জানে, এবার ছূটে আসতে পারে পাথরের টুকরো কিম্বা বাছাবাছা গালাগাল, কিম্বা দুটোই একসঙ্গে।
তার বদলে দেখল লোকটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে কিন্তু কিছু বলতে না পারে হাতড়াচ্ছে হাওয়া –
কিছু বলতে পারছে না অনুরূপ। এই সামান্য কুকুরের সামনে শব্দের এই বিরূপ ব্যবহারে সে লজ্জিত। কী বলে যেন – ঈশ... কী সহজ কিছু কথা। সে জানত। নিশ্চিত জানত। সহজ কথাগুলো রয়েছে, থাকবে, দরকারে তু বললেই ল্যাজ নেড়ে সামনে আসবে। পরুষ বাক্য যেমন হয়। বদখত দেখতে মানে শুনতে, কিন্তু খুব কাজের। লোক লৌকিকতার আনন্দঘন মূহূর্তে পরিশীলিত রুচিবান যে সব শব্দরা আসে যায় - এরা তেমন নয়। এরা বরং আসে বিয়েবাড়ির পরের দিন ঝাঁটা বালতি হাতে আবর্জনা পরিষ্কার করে আগের রাতের বেঁচে থাকা অল্প টকে যাওয়া সুখাদ্য সংগ্রহ করে ওরা। মানুষ যেমন আগের সন্ধ্যার সাজগোজ ছেড়ে ফেলে ঘরোয়া পোশাকে আগের দিনে কথাবার্তার টকে যাওয়া নিন্দেমন্দ্যতে ব্যাপৃত হয়ে সাধারণ হয়ে যায়, সেইরকম কথা এরা সব। এদের ডাকতে হয় না, এমনিতে আসে হাজারে হাজারে লাখে লাখে, সময় বিশেষে মানুষ বরং চেষ্টা করে যায় এদের আটকাতে।
তবু অনুরূপ, এমন কথাগুলো খুব কম সময়েই সামনে আনতে পেরেছে এযাবৎ। তার চেয়েও দুর্বলতর কাউকে পেলে সে আপ্লুত হয় এই ভেবে যে এবারে তার মনে মনে বলা সাধারণ প্রাকৃত প্রতিক্রিয়া সমূহকে অনায়াসে বাইরে আনতে পারে। সে ভয় পায় সবাইকে যাদের সঙ্গে সচরারাচর দেখা সাক্ষাৎ হয়ে থাকে আর কি। অফিসের বস থেকে পাশের টেবিলের সহকর্মী সবাইকে সমীহ করতে করতে এমন হয়ে গেছে যে অফিসের দারোয়ানটা অবধি তাকে দেখে বিড়িটাও ঢেকে রাখে না।
শুধু তার একমাত্র প্রতিপক্ষ চা- ওলা ছেলেটা।
সে ছেলে না লোক সেটা নিয়ে ধন্দ থেকে যায়। কাঁচুমাচু মুখে চায়ের গেলাস এনে রাখে সে টেবিলে টেবিলে সাড়ে দশটার কিছু পরে। ক্ষয়াটে চেহারা, নড়বড়ে। অনুরূপ একমাত্র এর কাছেই বাঘ। - আজ গেলাসে দাগ কেন? চায়ের গেলাসে এত ভর্তি করে চা দেয় নাকি? ঈশ... এত কম চা - পয়সা কম দিই নাকি? কী রে - চা তো জুড়িয়ে গঙ্গাজল করে এনেছিস, ভেবেছিসটা কি আমরা সব গরু গাধা?
অনুরূপের মেজাজ ভালো থাকলেও সে ঝাড়ে চা ওলাটাকে – একটু মজা নিতে, বেশির ভাগ দিনই খারাপ থাকে তার মেজাজ – তখন ঝাল মিটিয়ে নেয় সে। তার চেয়ে মিয়োনো লোক এই পৃথিবীতে থাকে কী করে এটা তার বড় আশ্চর্য মনে হয়। কোথায় যেন একমাত্র শ্লাঘাবোধ ভাঙাচোরা রাস্তায় চলতে চলতে হঠাৎ সহজ ঢালু রাস্তায় এসে খেই হারিয়ে ফেলে। সে সহ্য করতে পারে না চা ওলাটাকে।
এই সব প্রতিক্রিয়া বড় সহজ তার কাছে। তবু সেই কুকুরটার সামনে বেভুল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বোধ হয় অনন্তকাল। নাঃ শব্দগুলো ছেড়ে চলে গেছে তাকে।
কার কাছে খুঁজবে এখন সেই হারানো শব্দ। তেমন কাছের বলতে কেউ নেই তার। কোনোকালেই বন্ধু টন্ধু বড় একটা ছিল না তার, চেনাশোনা কিছু লোকজন আছে বটে – সে তো সবাইকারই থাকে, তারা আবার বেশির ভাগ সময়েই অনুরূপকে কাঠি করে কি সামনে কি পিছনে। সে এতদিনে জেনে গেছে তার বুদ্ধিশুদ্ধি বড় একটা নেই। আগে বোধ হয় কিছু কিছু ছিল যার সুবাদে এই সরকারী চাকরী লেগে গেছে তারপর ভোঁতা হয়ে গিয়েছে সে বহুদিন।
মনে না পড়া শব্দ তাকে জ্বালিয়ে খায় সারাদিনমান। শেষমেষ সে কুকুরটাকে বলে এসেছিল – এই ব্যাঙের চা তোর মুখে ছুঁড়ে মারব- শুয়ার কোথাকার! এই পরাজয় তাকে কুড়ে কুড়ে খেতে থাকে।
বাড়ি ফেরার পথে একটা উপায় মাথায় আসে তার। সব কাজটাজ – মানে রাস্তার কলে আটটার জল তোলা, রান্না চাপানো, এইসব ছেড়েছুড়ে সে পড়ে তার ওপরের তাকে ডাঁই করে রাখা পুজাবার্ষিকীগুলো নিয়ে। প্রতিবছর কালীপুজোর পরে সে কেনে বাজারচলতি সাত আটটা করে পূজাবার্ষিকী – তার দৃঢ় বিশ্বাস হয়, আজকের মতো ঘটনা আগে সে পড়েছে কোনো একটা উপন্যাসে। সে তার সেই পাঁচ বছরের ধুলো পড়া সম্পত্তি নিয়ে বসে থাকে। কোন একটা উপন্যাসে যে ছিল ঘটনাটা– তার প্রচ্ছদ কেমন ছিল যেন। একটা নিশ্চিত চিহ্ন ছিল, বলে আবছা কিছু মনে পড়ে তার। হয়ত প্রচ্ছদ দেখেই বলে দিতে পারবে সে। দু-চারটে বই ঘাঁটতেই তার অল্প অল্প মনে পড়ে গেল যেন গল্পটার অনেক কিছু। সেই উপন্যাসের নায়কটা ছিল গ্রামের এক মেধাবী ছাত্র। উচ্চমাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করে কলকাতার কলেজে সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল, আর সেখানে নানান কান্ডকারকাখানা নিয়েই গল্পটা।
অনেক রাত্রি হয়ে গেল দেখতে দেখতে। জল তোলা হয় নি। ভাতটাত তো দূর-অস্ত। চারপাশে ডাঁই হয়ে থাকা পুরনো পুজাবার্ষিকীর ভিড়ে অনুরূপ এতক্ষণ ঘুরে বেড়িয়েছে আর এখন তার সেই উপন্যাসটার আগাপাশতলা সব মনে পড়ে গেলে শেষ অবধি সে বুঝতে পারল সে উপন্যাসটা তার খুব চেনা, কিন্তু আজ অবধি লেখা হয় নি। এটা তার নিজের গল্পই ছিল।
ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুমের মধ্যেও হানা দিয়েছিল কুকুরটা। এমনকি কুকুরটাও অনেক চেষ্টা করেছে অনুরূপ স্বপ্নে দেখছিল তার হারিয়ে যাওয়া সাধারণ শব্দগুলো উদ্ধারের। সকালে উঠে অফিস যাওয়ার ইচ্ছে বা ক্ষমতা কোনোটাই হচ্ছিল না যেন। তবু গেল সে। এটা তার সাপ্তাহিক রিপোর্টের দিন। খুব অসহায় লাগছিল। এতদিন ধরে লোকের মুখঝামটা খেয়ে এসেছে সে, প্রায় চুপচাপ, আর যখন কাউকে কিছু একটা ফেরৎ দিতে যাবে অন্ততঃ একটা অংশ- তখন তার থেকেই সেইসব শব্দ পুরো হাওয়া? এটা অবিচার নয়?
একটা ঘোরের মধ্যে অফিস পৌছল অনুরূপ। আজ সেই কুকুরতাকে আর রাস্তায় দেখে নি সে। ভাগ্যিস। আজ তাড়া করলে কী করত সে – হয়ত পালাতে হতো তাকে। কিম্বা চুপচাপ সহ্য করতে হতো তাকে সে ঘেউ ঘেউ ডাক। যেমন সে শুনতে থাকে অফিসে বসের কাছে। চা-ওলাটা আসছে দেখল। আজ অনেক দূর থেকেই দেখল আজ। একটা বড় কেটলি আর ছ-সাতটা কাচের গ্লাস নিয়ে সে ঢুকে চা দিতে থাকছিল। বেশ খুশি খুশি দেখাচ্ছে চা-ওলাটিকে যেন। সামনের টেবিলের চ্যাটার্জীদা যে কিনা অনুরূপকে কথায় কথায় ডাউন দিয়ে খুব মজা পান তার সামনেও চা –ওলাটা কী স্বাভাবিক। কী একটা প্রশ্ন করল চ্যাটার্জী টা আর দেখ কেমান দাঁত বার করে হাসছে দেখ। আর তারপরেই অনুরূপের টেবিলের সামনে আসবে চা-ওলাটা। চোখাচুখি হয়া এড়িয়ে যেতে অনুরূপ ফাইলে চোখ গুঁজল। একটা চা-ওলা কে দেখছে সে এটা মোটেও লোক জানাজানির ব্যাপার হওয়া উচিৎ নয়।
কিন্তু অনুরূপ জানে চ্যাটার্জীর এটা একটা কৌশল। যেহেতু সে চা-ওলাটাকে একটু কড়কে দেয় তার সঙ্গে এত গলে পড়ে কথা বলবে যে লোকে ভাববে সে কিনা কত মানবদরদী। মহাপুরুষ যেন। চায়ের গ্লাসে দাগ দেখলেও অনুরূপকে শুনিয়েই কী নরম করে বলার ঘটা তার। সবই অনুরূপকে শুনিয়ে একথাও তার জানা। এর মধ্যেই চা ওলাটা তার টেবিলের সামনে। অনুরূপ তাকাল তার দিকে ফাইল থেকে চোখ তুলে। তার টেবিলের সামনে এলেই লোকটা এমন কুঁকড়ে আরো ছোটোখাটো হয়ে গেল যেন। এটা তো আগে খেয়াল করেনি সে।
আর বলতে বলতেই সেই বিপদটা হল। চায়ের গ্লাস থেকে চা চলকে পড়েছে তার টেবিলের অনেকটা জায়গায়- ফাইলেও লেগেছে কিছুটা। এর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া আশঙ্কা করে ভয়ে নীল হয়ে গেছে চা-ওলাটা। আজ যেন অনুরূপ ওকে মেরেই ফেলবে। সারা অফিসও যেন কাজ টাজ ফেলে এই টেবিলের দিকে তাকিয়ে আছে।
অনুরূপ দাঁড়িয়ে পড়েছে চেয়ার থেকে। হাতে তুলে নিয়েছে পেপার ওয়েট টা। আর তখনি আবার হল ব্যাপারটা। একটা শব্দ মাথায় আসছে না। শূন্য থেকে শূন্যতর হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ অসাধারণ প্রতিক্রিয়ার কোনো শব্দ যেন তার নেই। শব্দের সঙ্গে সঙ্গে তার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার বাকি অংশটা যেন সাপোর্টের অভাবে ধুপ করে পড়ে গেল। একটা বিষণ্ণ হাসি ছাড়া কিছু এল না আর। ড্রয়ার থেকে ঝাড়ন বের করে মুছতে থাকল অনুরূপ।
আধাখ্যাঁচড়া রিপোর্টটা কোনোমতে শেষ করে শরীর ভালো নয় বলে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল লাঞ্চ আওয়ারে। এর জন্য সোমবার যথেষ্ট ভোগান্তি আছে জেনেও তড়ঘড়ি বাড়ি গেল সে।
বাড়ি বলতে একটা ভাড়া ঘর, চৌকি, আলনা একটা সস্তার টেবিলে চেয়ার দেয়ালে দড়িতে ঝোলানো কিছু জামা কাপড়। চৌকির তলায় দু তিনটে স্যুটকেস। এক কোণে রান্নার ব্যবস্থা হীটারে। চৌকির দিকের দেওয়ালে একটা উঁচু তাক মতো জায়গা, ব্যস। কলঘর এজমালি।
হয়ত ব্যাপারটা এত সিরিয়াস কিছু নয়। কালকে কুকুরের সামনে যেটা হল তার অভিঘাতে এত বিচলিত হয়ে আজ চা-ওলার সামনে ঘতে গেল। একটু ভালো ঘুম হলে হয়ত সেরে যাবে তার। একটু ঘুম দরকার হয়ত স্নায়ুকে বিশ্রাম দিতে। আর তখনই নেমে আসতে দেখেছিলে সে বিন্দু বিন্দু শূন্যতাকে।
ঘুম ভাঙতেই সব পরিষ্কার। কাচের মতো, ঝকঝকে। এতদিন একটা ঘোলাটে ভাব থাকত যেন, যেটা অনুরূপ জানত না। জানা সম্ভব ছিল না তার। এখন কী স্পষ্ট নদীনালা, গাছপালা, বারান্দা ওলা বাড়িগুলো। ওই তো ওই রাস্তাটা, হেঁটে গেলে একটু পরেই কুমারসীমা গ্রাম তারপর আসবে বিশালাক্ষী হাওড়। শ্মশানের পাশ দিয়ে শর্টকাট করলে তার গ্রাম একটু পরেই।
অসীম এক শূন্যতায় ডুবে যেতে যেতে এক স্পষ্টতর পৃথিবীতে এগিয়ে যাচ্ছিল অনুরূপ। আর কোনো শব্দ নেই আর কোনো কথা নেই। শান্তি। সর্বত্র শান্তি।


230 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: দ

Re: অন্দরমহলে অনুরূপ

আরে বাহ

Avatar: ranjan roy

Re: অন্দরমহলে অনুরূপ

কী লেখা, কী লেখা!
একজন কবিই এমন মায়াবী লেখা লিখতে পারে।
Avatar: `

Re: অন্দরমহলে অনুরূপ

খুব ভালো লেখা।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন