উদয়ন ঘোষচৌধুরি RSS feed

মোদ্দা ব্যাপার হল, বাঙালি সব জানে। সব মানে, সঅঅঅব। ব্রহ্মা যা জানে না, বাঙালি তা-ও জানে। মোদী থেকে মারাদোনা – লাইফে কে কি করতে পারল না, বাঙালি জাস্ট একটা বিড়ি খেতে খেতে বলে দেবে। উদয়ন বাঙালি, তাই সে-ও সব জানে। অন্তত সেরকমই মনে করে সে। সিনেমা নিয়ে, বইপত্র নিয়ে, বেড়ানোর গপ্পো নিয়ে, আর আরও হ্যানত্যান ইত্যাদি নিয়ে প্রচুর ভাঁটায়। সেইসব বুকনিবাতেলা এবার আপনার ক্লিকে। প্রকাশিত বই : উদোর পিণ্ডি, সৃষ্টিসুখ, ২০১৪; লিঙ্গ নেই মৃত্যু নেই, উবুদশ, ২০১২

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা... বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ পরিবর্তন হওয়ার দিন
    বিএনপি এখন অস্তিত্ব সংকটে আছে। কিন্তু কয়েক বছর আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না। ক্ষমতার তাপে মাথা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল দলটার। ফলাফল ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড মেরে হত্যার চেষ্টা। বিরোধীদলের নেত্রীকে হত্যার চেষ্টা করলেই ...
  • তোমার বাড়ি
    তোমার বাড়ি মেঘের কাছে, তোমার গ্রামে বরফ আজো?আজ, সীমান্তবর্তী শহর, শুধুই বেয়নেটে সাজো।সারাটা দিন বুটের টহল, সারাটা দিন বন্দী ঘরে।সমস্ত রাত দুয়ারগুলি অবিরত ভাঙলো ঝড়ে।জেনেছো আজ, কেউ আসেনি: তোমার জন্য পরিত্রাতা।তোমার নমাজ হয় না আদায়, তোমার চোখে পেলেট ...
  • বার্সিলোনা - পর্ব ২
    বার্সিলোনা আসলে স্পেনের শহর হয়েও স্পেনের না। উত্তর পুর্ব স্পেনের যেখানে বার্সিলোনা, সেই অঞ্চল কে বলা হয় ক্যাটালোনিয়া। স্বাধীনদেশ না হয়েও স্বশাসিত প্রদেশ। যেমন কানাডায় কিউবেক। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই মনে হয় এরকম একটা জায়গা থাকে, দেশি হয়েও দেশি না। ...
  • বার্সিলোনা - পর্ব ১
    ঠিক করেছিলাম আট-নয়দিন স্পেন বেড়াতে গেলে, বার্সিলোনাতেই থাকব। বেড়ানোর সময়টুকুর মধ্যে খুব দৌড় ঝাঁপ, এক দিনে একটা শহর দেখে বা একটা গন্তব্যের দেখার জায়গা ফর্দ মিলিয়ে শেষ করে আবার মাল পত্তর নিয়ে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে ভোর রাতে রওনা হওয়া, আর এই করে ১০ দিনে ৮ ...
  • লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া
    -'একটা ছিল লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া।আর ছিল একটা নীল ঝুঁটি মামাতুয়া।'-'এরা কারা?' মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড়ো করে অদ্ভুত লোকটাকে জিজ্ঞেস করে।-'আসলে কাকাতুয়া আর মামাতুয়া এক জনই। ওর আসল নাম তুয়া। কাকা-ও তুয়া বলে ডাকে, মামা-ও ডাকে তুয়া।'শুনেই মেয়েটা ফিক করে হেসে ...
  • স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি
    স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি। আমি স্টার্ট-আপ কোম্পানিতে কাজ করছি ১৯৯৮ সাল থেকে। সিলিকন ভ্যালিতে। সময়ের একটা আন্দাজ দিতে বলি - গুগুল তখনও শুধু সিলিকন ভ্যালির আনাচে-কানাচে, ফেসবুকের নামগন্ধ নেই, ইয়াহুর বয়েস বছর চারেক, অ্যামাজনেরও বেশি দিন হয়নি। ...
  • মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার
    [আজ বের্টোল্ট ব্রেশট-এর মৃত্যুদিন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে যিনি সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন ব্রেশটিয় আঙ্গিক, সেই মৃণাল সেনকে নিয়ে একটি সামান্য লেখা।]ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কীভাবে যেন পরিচালক ত্রয়ী সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল এক বিন্দুতে এসে মিলিত হন। ১৯৫৫-তে মুক্তি ...
  • দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল পড়ে
    পড়লাম সিজনস অব বিট্রেয়াল গুরুচন্ডা৯'র বই দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল। বইটার সঙ্গে যেন তীব্র সমানুভবে জড়িয়ে গেলাম। প্রাককথনে প্রথম বাক্যেই লেখক বলেছেন বাঙাল বাড়ির দ্বিতীয় প্রজন্মের মেয়ে হিসেবে পার্টিশন শব্দটির সঙ্গে পরিচিতি জন্মাবধি। দেশভাগ কেতাবি ...
  • দুটি পাড়া, একটি বাড়ি
    পাশাপাশি দুই পাড়া - ভ-পাড়া আর প-পাড়া। জন্মলগ্ন থেকেই তাদের মধ্যে তুমুল টক্কর। দুই পাড়ার সীমানায় একখানি সাতমহলা বাহারী বাড়ি। তাতে ক-পরিবারের বাস। এরা সম্ভ্রান্ত, উচ্চশিক্ষিত। দুই পাড়ার সাথেই এদের মুখ মিষ্টি, কিন্তু নিজেদের এরা কোনো পাড়ারই অংশ মনে করে না। ...
  • পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি
    দিলীপ ঘোষযখন স্কুলের গণ্ডি ছাড়াচ্ছি, সন্তোষ রাণা তখন বেশ শিহরণ জাগানাে নাম। গত ষাটের দশকের শেষার্ধ। সংবাদপত্র, সাময়িক পত্রিকা, রেডিও জুড়ে নকশালবাড়ির আন্দোলনের নানা নাম ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের মধ্যে। বুঝি না বুঝি, পকেটে রেড বুক নিয়ে ঘােরাঘুরি ফ্যাশন হয়ে ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

রূপ-রুবারু (৫)

উদয়ন ঘোষচৌধুরি

টিমের সঙ্গে গতকাল কথা হয়ে গেছিল। ওরা বলে দিয়েছিল, এখানেই আজ এসে পৌঁছবে। দশটা নাগাদ অনেকটা নিশ্চিন্তে আমরা হাঁটতে বেরোই। ক্ষেত পেরিয়ে গ্রাম ছাড়িয়ে পাহাড়ি হরিয়ালির ভেতর দিয়ে এলোমেলো চলতে চলতে এসে পড়ি পিণ্ডারের গায়ে একটা তেকোনা দ্বীপ-মতো জায়গায়। বাংলো টাইপের কন্সট্রাকশন উঠছে। জনাদুই মিস্ত্রি পাথর ভাঙছে। জানতে পারি, নতুন একটা সরকারি হাসপাতাল হচ্ছে। অনেকটা জমি জুড়ে, বেশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে। হাসপাতাল তো হচ্ছে, ওষুধ-ডাক্তার? মিস্ত্রিদের, দেখলাম, সে বিষয়ে মাথাব্যথা নেই। ঢাল বরাবর এগোতে থাকি। প্রচুর ছাগল নিয়ে তাদের পালক চলেছে। সে জানায়, এটাই জাইতলি যাওয়ার পথ। বাঃ, তাহলে এগোনো যাক! রাস্তাতেই বাকিদের দ্যাখা পেয়ে গেলে একসঙ্গে ফেরা যাবে। আসলে এভাবে একা-একা এতদিন চলে একটু হাঁফিয়েও পড়েছি। রাস্তাটা দারুণ মনে ধরে যায়। নদীর ঢাল বরাবর উঠে-নেমে গেছে। জঙ্গল বেশ ঘন। মাটি অব্দি রোদ আসে না। ফলে একটু এক্সট্রা ঠাণ্ডা। খানদুই কাঠের ব্রিজ। এগোতে এগোতে পেয়ে যাই পিণ্ডার আর সুন্দরডোঙার সঙ্গম। স্রোতের গর্জন ছাড়া কোনও শব্দই সেখানে নেই। ও, হাতে একতাড়া খাতা নিয়ে একটা লোক আসছে। হাঁটাতেই বোঝা যায়, সে স্থানীয় নয়। জানতে পারি, বাঘেশ্বর থেকে তাকে পাঠানো হয়েছে। সঙ্গমের পাশেই নতুন জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ শুরু হবে। খানিকটা গড়াপেটা হয়েছে। সে এসেছে ইন্সপেকশনে। বুঝতে পারি, ভালই প্ল্যান। এখান থেকে বিদ্যুৎ দুয়ে ও বেয়ে আমাদের ফ্ল্যাটবাড়ি রোশন করবে। আর নদীগুলোর বারোটা বাজবে। আরও ধস নামবে। তা হোক, তবু আমার দেশের ‘উল্লতি’ হোক! ‘ছাইনিং কান্ট্রি’ হতে গেলে দাম তো দিতেই হবে! সঙ্গম পেরিয়ে সুন্দরডোঙার তীরে গিয়ে বসে থাকি আমরা। বিরাট বিরাট পাথরের খাঁজে খাঁজে জলরাশির একটানা মূর্ছনা। বহু বছরের গাঢ় শ্যাওলা। তারা এতটাই বড় হয়ে গেছে যে, চারাগাছ বললেও চলে। সামনে মেঘের মাঝে মাইকতলি। আলোর আঁজলা মাখানো তার শরীরে। মুশকিল হল, এরকম বসলেই নেশা পেয়ে যায়। চোখ বুজে আসে। আর সেটাই হচ্ছে আমাদের। ঘড়ির ঘর বারোটা পেরিয়েছে, সে খেয়ালই নেই।



অনেকক্ষণ বাদে দেখি, জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে কেউ আসছে। বছর বাইশ-তেইশের যুবক। পায়ে রবারের সস্তা চপ্পল। হাতে দশ লিটার নীল কেরোসিন ছলাক ছলাক করছে। মুখটা দেখেই চন্দ্রানীর মালুম হয়, এই-ই বলওন্তজির ছেলে মোহন। হাসতে হাসতে সে আমাদের ভাল-মন্দ খবর নেয়। অন্তত তার গ্রাম অব্দি যেতে পারলাম না বলে একটু আক্ষেপ করে। আমরা খাতি ফেরার রাস্তা ধরি। একটু বাদেই খচ্চরে সামান চড়িয়ে পৌঁছে যায় রূপজি। মোহন লেগে যায় দুপুরের খাবার বানাতে। খানিক বাদেই পুরো টিম এসে যায় সেখানে। একঘণ্টা যেতে না যেতেই সকলের খাবার রেডি হয়ে যায়। গত প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা যে জায়গাটা প্রায় মানুষশূন্য ছিল, সকলের হুল্লোড়ে সেটা খানিক বদলে যায়। গ্রামের লোকেরা যাতায়াতের রাস্তায় অবাক তাকিয়ে দ্যাখে আমাদের অদ্ভুত পোশাকআশাক। বিকেলে তারাজি অবিশ্বাস্য সস্তায় গ্রাম থেকে কচি ছাগলের মাংস (চারশো টাকায় আড়াই কিলো) নিয়ে আসে। কাঠের উনুনে হ্যারিকেনের আলোয় অনুপম মাংস রাঁধল মোহন। সকলের জন্যে রান্না খাওয়ানো বাসন-ধোয়া – সমস্ত কাজে সে এত দ্রুত ও দক্ষ – একসময় আমাদেরই লজ্জা করতে লাগল। লজ্জার দুই কারণ। এক, ট্রেকিং-এর মূল মজা নিজের কাজ নিজে করে নেওয়া। এখানে মোহন শুধু রেঁধে খেতেই দিচ্ছে না – আমাদের এঁটো থালাও টেনে নিয়ে ধুয়ে আনছে। আমাদের যেকোনও আবদারে তার বিন্দুমাত্র ‘না’ নেই। হিন্দিতে যাকে বলে ‘হাসমুখলাল’। আর দু নম্বর, অনেকেই তাজ্জব হতে পারে, ছেলেটি গ্র্যাজুয়েট। একটি শিক্ষিত যুবক আমাদের সব কাজ হাসিমুখে করে দিচ্ছে। একটি টেকনিক্যাল ট্রেনিং কমপ্লিট করে সে গুড়গাঁওতে কয়েকমাস চাকরিও করেছে। মুশকিল হল, সমতল শহরে সে নিজেকে মানাতে পারেনি। চাকরি ছেড়ে সে ফিরে এসেছে বাবা-জ্যাঠার পারিবারিক কাজে। পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় টনটনে কর্তব্যজ্ঞান। যেখানেই থাকুক, দিনে একবার ফোন করে বোন হংসীর খোঁজ নেয়। ভবিষ্যতে ওর ইচ্ছে, NIM থেকে ট্রেনিং নিয়ে পুরোদস্তুর প্রফেশনাল পাহাড়ি গাইড হওয়ার।



আর এরপর থেকে শুধু দেখে গেলাম রূপজিকে। সঙ থেকে এই পুরো এলাকায় – এমনকি যখন আমরা একা ঘুরছিলাম – যেকোনও গ্রামে যেকোনও মানুষকে এই লোকটার নাম বলতেই চিনে যায়। একসময় মনে হয়েছিল, পাথর ফুল পাখি ঝর্নাও বোধহয় লোকটাকে চেনে। যেকোনও সময় যেকোনও পরিস্থিতিতে রূপজির কণ্ঠস্বরে একটাই ভলিউম। যেকোনও দুর্দশায় সারল্যের হাসি মেখে বলতে পারে ‘দাদা, আপ চিন্তা মত করো!’ কেউ বলে না দিলে বিশ্বাস করা কঠিন এই লোকটা ছাড়া সুন্দরডোঙা ট্রেক করা প্রায় অসম্ভব। আর সে নিজেও তা বিশ্বাস করে না। নিজের পরিচয় দ্যায় ‘মোটবাহক’ হিসেবে। মনে করে, তার পালিত খচ্চর দিয়ে পাহাড়ের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় টুরিস্টদের মাল পৌঁছে দেওয়াই তার কাজ। অথচ কুমায়ুনের চপ্পা-চপ্পা লোকটার মুখস্থ। কোনদিন কতটা এগোনো হবে, কোথায় থাকা হবে, কোথায় তাঁবু ফ্যালা উচিৎ – এইসব পরামর্শ দ্যায় সে সুহৃদের মতো। গ্লেসিয়ারের নিচে চিড় খাওয়ার আওয়াজটুকুও ওর কান এড়ায় না। সঙ্গে সঙ্গে সাবধান করে দ্যায় ফিরে যাওয়ার জন্যে। ঝড়-বৃষ্টিতে আমরা যখন গোমড়াথেরিয়াম, ঠায় ভাবি কখন পবনবাবু সদয় হবে, রূপজি নিখুঁত বলে দ্যায় বৃষ্টি-থামার টাইমিং। আর আমরা ক্যাবলা বনে যাই, লোকটার কাছে ঘড়ি মোবাইল এসব কিছুই নেই। সারাদিনের ধকলে আমরা যখন বিশ্রাম করি, ও তড়তড়িয়ে চলে যায় এদিকওদিক। জোগাড় করে আনে রান্নার কাঠ বা তাঁবু গরম-রাখার ঘাস। তারপর রেঁধে সকলকে পেট পুরে খাইয়ে তবে নিশ্চিন্ত হয়। নিজেদের জন্য কিছু বাঁচল কি বাঁচল না সেটুকুও খেয়াল রাখে না। ভুল করেও যদি মুখ ফুটে কিছু চেয়ে ফেলি, সেই জিনিস যতই অসাধ্য হোক, জোগাড় করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। নিজে সামান্য কিছু খেয়ে শুয়ে পড়ে বাইরে একটা টেবিল বা বেঞ্চের ওপর ছেঁড়া কম্বল পেতে। কারণ সারারাত খচ্চর পাহারা দিতে হয় ওকে, নইলে ওরা পালাবে। কথায় কথায় জানলাম, গ্রামে ওর নাতির ছেলে আছে। হিসেব করে দেখলাম, যতই কমবয়েসে বিয়ে হয়ে থাক, লোকটা মিনিমাম পঞ্চাশ পেরিয়েছে। গায়ে চব্বিশ ঘণ্টা একটাই ঝলঝলে সোয়েটার, হাতার কাছে উল বেরিয়ে গ্যাছে। কখনও-সখনও তার ওপর চাপিয়ে নেয় কালো একটা জোব্বা। পায়ের জুতোটা প্লাস্টিকের, গোড়ালি ক্ষয়ে ক্ষয়ে দু পাটি দু দিকে কাত হয়ে আছে। পাহাড় সম্পর্কে সুচারু জ্ঞান; অথচ অসম্ভব নম্র, ভদ্র আর বিনয়ী মানুষটাকে যখন টানা দু দিন সামনাসামনি দেখি, সত্যি বলছি, প্রণাম করতে ইচ্ছে হয়েছিল। (না, আমি প্রণাম করিনি। ভেবে দেখেছিলাম, তাহলে ওনার বিনয়কে হয়ত অশ্রদ্ধা করা হত।) এই অঞ্চল যদি সত্যিই ‘দেবভূমি’ হয়ে থাকে, তাহলে এই মানুষগুলোই প্রকৃত দেবতা।



খাতি থেকে পিণ্ডারি আর দু দিনের পথ। পেছনের পাহাড়ে খাড়াই উঠে পাঙ্গু টপেও যাওয়া যায়। পাঙ্গু থেকে কুমায়ুনের বেশ চওড়া ভিউ পাওয়া যায়। খানিকটা আলোচনার পর ক্যাপ্টেন সিদ্ধান্ত নিল, ফেরার রাস্তাই ধরা হোক। পরদিন ফিরে এলাম ধাকুরি। নরওয়ে থেকে আণ্ডা-বাচ্চা সমেত চৌত্রিশ জনের একটা দল এসেছে সেখানে। সমস্ত ঘর তারাই বুক করে ফেলেছে। মাঠে ভলিবলের নেট লাগিয়ে গুষ্টিসুখের উল্লাসে তারা মাতোয়ারা। অগত্যা বাবাই বাপি আর শীর্ষেন্দু একধারে তাঁবু খাটিয়ে ফেলল। লছমনজির গুমটিতে একটা ছোট ঘর পাওয়া গ্যালো। ঘরটা জুড়ে একটা তক্তাপোশ। বস্তা বেছানো। দিনের বেলাতেও সে ঘরে মোম জ্বালতে হয়। ঠাণ্ডা-বৃষ্টি-কফি-মুড়ি-পকোরা ভাগাভাগি করে সেরাত কাটালাম।



পথ চিনে নেওয়ায় আর আট-দশ দিন কেটে যাওয়াতে চন্দ্রানীর উচ্চতাজনিত সমস্যা আর হচ্ছিল না। পরদিন দুপুরনাগাদ হুড়হুড়িয়ে সোজা নেমে আসি সঙ-এ। ঠিক হয়, সঙ-এর বাড়িতে লাঞ্চ সেরে বিকেলে ফিরে যাব বাঘেশ্বরে। এই কয়েকদিনে ধস সারিয়ে রাস্তা ঠিক হয়ে গ্যাছে। সঙ থেকেই ডাইরেক্ট গাড়ি পেতে আর কোনও সমস্যা নেই। মোহন চটপট বানিয়ে দ্যায় ভাত-ডাল-বাঁধাকপি। খবর পেয়ে হংসীও তাড়াতাড়ি চলে আসে স্কুল থেকে। চন্দ্রানী বেঁচে-যাওয়া লজেন্স চকলেট হংসীর স্কুলের বাচ্চাদের জন্যে বিলিয়ে দ্যায়। পরিচিত একটি সুমো ঠিক করে তার মাথায় মালপত্র বেঁধে ফ্যালা হয়। রূপজিকে তার চার্জ জিগ্যেস করলে, সে কোনও হিসেবই বলতে পারে না। আমরা নিজেরাই হিসেব করে নিই, তার পারিশ্রমিক ও খচ্চরের ভাড়া মিলিয়ে হয়েছে দশহাজার টাকা। টাকাটা হাতে নিয়ে সে গুনেও দ্যাখে না। ফ্যালফ্যালিয়ে বসে থাকে ঘাসের ওপর। শীর্ষেন্দু জড়িয়ে ধরে তাকে। সে আরও সংকুচিত হয়ে যায়। হংসী সকলকে ‘নমস্তে’ করে। তার চোখ ভিজে গিয়েছে। বিদায়বেলায় কাউকেই কিছু বলে উঠতে পারি না আমি, শুধু বিড়বিড় করি, ‘খুশ রহো’।



গাড়ি স্টার্ট নিতেই সকলে খুব গম্ভীর আর চুপ হয়ে যায়। বাইরে থাকার দরুন হিন্দিটা বাকিদের তুলনায় সড়গড়, তাই ড্রাইভারের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে আমিই তার পাশে। গাড়ি স্পিড তুলছে। পেছনে মুছে যাচ্ছে হংসীর হাত-নাড়া। গম-ঝাড়া থামিয়ে সহসা স্ট্যাচু হয়ে যাচ্ছে রাস্তার পাশের অচেনা বৌটা। গড়িয়ে আসা সর্দিটা চেটে নিতে গিয়ে ঘাবড়ে আমাদের দেখছে একটা শিশু। আমরা প্রস্তুত হচ্ছি আমাদের নিয়ত সিঁড়ি-সম্পর্ক-সাপ-সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়তে। হঠাৎ পেছন ঘুরে দেখি, গাড়ির পিছুপিছু হাত নাড়তে নাড়তে পাহাড়ি বাঁকের ঢাল পেরিয়ে দৌড়ে নামছে রূপজি। অরিজিৎদা মুখ নামিয়ে চশমার কাঁচ মুছছে। শীর্ষেন্দুর নিচের ঠোঁট থরথর করছে। বাপি খুব মন দিয়ে কার্গোর পকেটে কিছু দরকারি যেন খুঁজছে। আর আমি একদম অকারণেই বাবাই-এর ওপর চেঁচিয়ে উঠছি, ‘জানলার কাঁচগুলো তুলে দে তো! বড্ড ধুলো ঢুকছে!’



(শেষ)

237 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: দ

Re: রূপ-রুবারু (৫)

যাহ শেষ হয়ে গেল!! খুব দারুণ লেগেছে। আরো এমন গল্প থাকলে লিখে ফেলুন
Avatar: san

Re: রূপ-রুবারু (৫)

খুব সুন্দর লেখা।
Avatar: ম

Re: রূপ-রুবারু (৫)

ভারী চমৎকার লাগলো।
Avatar: de

Re: রূপ-রুবারু (৫)

কি ভালো লাগলো!
Avatar: IM

Re: রূপ-রুবারু (৫)

রূপ জি বলতে রূপ সিঙ্গ দানূ?
Avatar: উদয়ন

Re: রূপ-রুবারু (৫)

হ্যাঁ, উনিই।
Avatar: JOY

Re: রূপ-রুবারু (৫)

খুব ভালো লাগলো
Avatar: 00

Re: রূপ-রুবারু (৫)

বাক্যি হরে গেল ! লিখুন, থামবেন না।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন