উদয়ন ঘোষচৌধুরি RSS feed

মোদ্দা ব্যাপার হল, বাঙালি সব জানে। সব মানে, সঅঅঅব। ব্রহ্মা যা জানে না, বাঙালি তা-ও জানে। মোদী থেকে মারাদোনা – লাইফে কে কি করতে পারল না, বাঙালি জাস্ট একটা বিড়ি খেতে খেতে বলে দেবে। উদয়ন বাঙালি, তাই সে-ও সব জানে। অন্তত সেরকমই মনে করে সে। সিনেমা নিয়ে, বইপত্র নিয়ে, বেড়ানোর গপ্পো নিয়ে, আর আরও হ্যানত্যান ইত্যাদি নিয়ে প্রচুর ভাঁটায়। সেইসব বুকনিবাতেলা এবার আপনার ক্লিকে। প্রকাশিত বই : উদোর পিণ্ডি, সৃষ্টিসুখ, ২০১৪; লিঙ্গ নেই মৃত্যু নেই, উবুদশ, ২০১২

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ইতিহাসবিদ সব্যসাচী ভট্টাচার্য
    আধুনিক ভারতের ইতিহাস চর্চায় সব্যসাচী ভট্টাচার্য এক উল্লেখযোগ্য নাম। গবেষক লেখক শিক্ষক এবং শিক্ষা প্রশাসক হিসেবে তাঁর অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। সবসাচীবাবুর বিদ্যালয় শিক্ষা বালিগঞ্জ গভর্মেন্ট হাই স্কুলে। তারপর পড়তে আসেন প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাস বিভাগে। ...
  • পাগল
    বিয়ের আগে শুনেছিলাম আজহারের রাজপ্রাসাদের মতো বিশাল বড় বাড়ি! তার ফুপু বিয়ে ঠিকঠাক ‌হবার পর আমাকে গর্বের সাথে বলেছিলেন, "কয়েক একর জায়গা নিয়ে আমাদের বিশাল বড় জমিদার বাড়ি আছে। অমুক জমিদারের খাস বাড়ি ছিল সেইটা। আজহারের চাচা কিনে নিয়েছিলেন।"সেইসব ...
  • অশোক দাশগুপ্ত
    তোষক আশগুপ্ত নাম দিয়ে গুরুতেই বছর দশেক আগে একটা ব্যঙ্গাত্মক লেখা লিখেছিলাম। এটা তার দোষস্খালন বলে ধরা যেতে পারে, কিন্তু দোষ কিছু করিনি ধর্মাবতার।ব্যাপারটা এই ২০১৭ সালে বসে বোঝা খুব শক্ত, কিন্ত ১৯৯২ সালে সুমন এসে বাঙলা গানের যে ওলটপালট করেছিলেন, ঠিক সেইরকম ...
  • অধিকার এবং প্রতিহিংসা
    সল্ট লেকে পূর্ত ভবনের পাশের রাস্তাটায় এমনিতেই আলো খুব কম। রাস্তাটাও খুব ছোট। তার মধ্যেই ব্যানার হাতে একটা মিছিল ভরাট আওয়াজে এ মোড় থেকে ও মোড় যাচ্ছে - আমাদের ন্যায্য দাবী মানতে হবে, প্রতিহিংসার ট্রান্সফার মানছি না, মানব না। এই শহরের উপকন্ঠে অভিনীত হয়ে ...
  • লে. জে. হু. মু. এরশাদ
    বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটা অধ্যায় শেষ হল। এমন একটা চরিত্রও যে দেশের রাজনীতিতে এত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল ছিল, এ এক বিরল ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যুদ্ধ না করে কোন সামরিক অফিসার বাড়িতে ঘাপটি মেরে বসে ছিলেন ...
  • বেড়ানো দেশের গল্প
    তোমার নাম, আমার নামঃ ভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম --------------------...
  • সুভাষ মুখোপাধ্যায় : সৌন্দর্যের নতুন নন্দন ও বামপন্থার দর্শন
    ১৯৪০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পদাতিক’। এর এক বিখ্যাত কবিতার প্রথম পংক্তিটি ছিল – “কমরেড আজ নবযুগ আনবে না ?” তার আগেই গোটা পৃথিবীতে কবিতার এক বাঁকবদল হয়েছে, বদলে গেছে বাংলা কবিতাও।মূলত বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে সভ্যতার ...
  • মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র ভুবন
    মৃণাল সেনের জন্ম ১৯২৩ সালের ১৪ মে, পূর্ববঙ্গে। কৈশোর কাটিয়ে চলে আসেন কোলকাতায়। স্কটিশ চার্চ কলেজ ও কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে পড়াশুনো করেন। বামপন্থী রাজনীতির সাথে বরাবর জড়িয়ে থেকেছেন, অবশ্য কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ...
  • অলোক রায় এবং আমাদের নবজাগরণ চর্চা
    সম্প্রতি চলে গেলেন বাংলার সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্ট গবেষক অধ্যাপক অলোক রায়। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের শেষ দিক থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ছয় দশক জুড়ে তিনি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের বিভিন্ন দিক নিয়ে লেখালেখি করেছেন। এর মধ্যে বাংলা ...
  • দুই ক্রিকেটার
    ক্রিকেট মানেই যুদ্ধু। আর যুদ্ধু বলতে মনে পড়ে ষাটের দশক। এদিকে চীন, ওদিকে পাকিস্তান। কিন্তু মন পড়ে ক্রিকেট মাঠে।১৯৬৬ সাল হবে। পাকিস্তানের গোটা দুয়েক ব্যাটেলিয়ন একা কচুকাটা করে একই সঙ্গে দুটো পরমবীর চক্র পেয়ে কলকাতায় ফিরেছি। সে চক্রদুটো অবশ্য আর নেই। পাড়ার ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

রূপ-রুবারু (৪)

উদয়ন ঘোষচৌধুরি

এবারে ধরেছি ঢালু। মাঝেমধ্যে অল্প চড়াই। হালকা গাছগাছালি আর প্রচুর পাখি। বেশিরভাগেরই নাম জানি না। দেখলাম আকাশে পাক খাচ্ছে খানদুই হিমালয়ান ঈগল। ক্যাঁক্যাঁ করে মাত করছে ঝাঁক ঝাঁক টিয়া। সবুজ আর কমলা কাঠঠোকরা। উসকোখুসকো ঝুঁটিয়ালা সিপাহি বুলবুল। হলুদ ঠোঁটের ময়না। লম্বা লেজওলা ট্রিপাই, ম্যাগপাই। অসংখ্য খুদে পাখির দল নালিশে আর উস্তমখুস্তমে ভরিয়ে তুলেছে ঝোপঝাড়। কিছুটা দূর থেকে আমাদের মাপছে কালোমুখের হনুমান বাহিনী। একেকটার মোটা আর বাঁকা ল্যাজ দেখেই ‘রামায়ণ’-এর ওপর বিশ্বাস বেড়ে যায়। দুয়েকটা ফটো তোলার পর মনে হল, যেরকম নির্নিমেষ ওরা এদিকেই তাকিয়ে আছে, হঠাৎ লাফিয়ে এসে আক্রমণ করাটা নিছক কল্পনা না-ও হতে পারে। ‘বাঁদুরে থাবড়ায় ক্যামেরা খুইয়ে আত্মঘাতী’ – ব্রেকিং নিউজ ফ্ল্যাশ হিসেবে কতটা লাগসই ভাবতে ভাবতে ফটো তোলার লোভে নিরস্ত থাকি। ছবির মতো ছোট দুটো গ্রাম – ভগবানপুর আর ওয়াছম – পেরিয়ে এসে পড়ি ঘন জঙ্গলের মধ্যে। দুধারে বিরাট বিরাট গাছ। তাদের শরীরে মাখামাখি হয়ে আছে ইয়ত্তাহীন লতাগুল্ম ফার্ন পরগাছা। কোথাও আচমকা নিশ্চুপ হেসে উঠছে আশ্চর্য উজ্জ্বল ফুল। বাঁদিকে গহন খাদ। ডানদিকে উঁচু পাহাড়ি দেয়াল বেয়ে প্রপাতধারা নামছে কোথাও কোথাও। আলো আছে মোটামুটি, কিন্তু জমি অব্দি রোদ পৌঁছয় না। কিছু কিছু জায়গায় পাতা পচে শ্যাওলায় হড়হড়ে। অসতর্ক থাকলে পপাৎ আছাড়। নিচের দিকে চোখ রেখে হাঁটছি। একটা বাঁকের মুখে হঠাৎ ওপরে তাকিয়ে বিস্মিত ভয়। জায়গাটা বেশ ঘুপচি মতো। পাথরের খাঁজে খাঁজে বহু বছরের শুকনো পরগাছা দড়ি পাকিয়ে ঝুলছে। অনেক ওপর থেকে লাফিয়ে নামছে সফেন জলধারা। অনেক হাজার বছর আগে, এসব অঞ্চলে পথ ভুলে কেউ কি এসে পড়েছিল, আর এমনই কোনও দৃশ্যের মুখোমুখি কল্পনা করেছিল শিবের জটায় গঙ্গার নেমে আসার রূপ? চলতে চলতে একসময় টের পাই, রাস্তাটা ছুঁয়ে ফেলেছে ওইসব বিশাল গাছেদের মাথা। খাদের গায়ে গায়ে একটু ঝুঁকে মাঝে মাঝে মেখে নিচ্ছি মরণরোমাঞ্চ। অনন্তযোদ্ধা বৃক্ষরাশিদের দেখতে দেখতে মনে মনে তাদের প্রণামও করে ফেলি। ওরাই তো আসল ঈশ্বর!



এদিকে, আরেঃ, সামনে বিশাল ছাতা কাঁধে বলওন্তজি! আমাদের দেখে সে-ও খুব অবাক। জানায়, দেবীকুণ্ড-নাগকুণ্ডে দু দিন কাটিয়ে বন্ধুরা আজ ফিরছে কাঠালিয়া থেকে জাইতলি। ওদের সঙ্গে আছে তার দাদা রূপজি আর ছেলে মোহন। একটা জরুরী কাজে নিজেকে যেতে হচ্ছে দেরাদুন। কবে ফিরবে ঠিক নেই। হয়ত আমাদের সঙ্গে এ যাত্রায় আর দ্যাখা হবে না। টিমের বাকিদের সঙ্গে কিভাবে যোগাযোগ করে খবর দেওয়া যায় – ভাবতে ভাবতে সে জানায়, আরও কিছুটা গেলে দউ নামে গ্রাম পাবো। সেখানে তার এক তুতোভাই আছে – লাল সিং। ফোনের টাওয়ার থাকলে এবং বাড়িতে কাউকে পাওয়া গেলে, সে নিশ্চয়ই জাইতলিতে জানিয়ে দেবে আমাদের কথা। লালজির ওখানে থাকারও ব্যাবস্থা আছে, আমরা চাইলে সেখানেও বিশ্রাম নিতে পারি। বলওন্তজিকে বিদায় জানিয়ে আর ফেরার দিন কাঠগোদামে পারলে একবার দ্যাখা করার অনুরোধ করে আমরা এগোতে থাকি। টিমের খবর জানতে পেরে ভাল লাগছে। জঙ্গলের ঘনত্ব একটু একটু করে পাতলা হচ্ছে। একটা বাঁক ঘুরতেই যেন পুরো যশ চোপড়ার সিনেমাটিক বিউটি! ঝকঝকে জামা গায়ে আকাশ দাঁড়িয়ে। কিছুটা দূরে দূরে বর্ফিলি পাহাড়। এখান থেকে পাশাপাশি মাইকতলি রেঞ্জ আর নন্দাকোট পরিষ্কার দৃশ্যমান। পথ এখন অনেকটাই সমতলীয় সুন্দর। খুব বেশি চড়াই-উতরাই নয়। কোথাও কোথাও বিশাল পাথর ঝুঁকে রয়েছে – যেন এখনও পতনের নির্দেশ আসেনি। জায়গায় জায়গায় রামদানার ক্ষেতি। মোরগঝুঁটির মতো গর্বিত লাল রামদানা ফুলেরা সেই ক্যানভাসের মুকুট হয়ে আছে। বেলা বেশ গড়িয়েছে। সকালের রুটি-তরকারি অনেকক্ষণ গায়েব। পেট চোঁচোঁ। কিন্তু আশেপাশে কিছুই যে দেখি না! খানিক হেঁটে গিয়ে একটা চা-দোকান পেলাম। আমাদের দেখে একটা মেয়ে সাংঘাতিক কাশতে কাশতে বেরিয়ে এল। বোঝাই যাচ্ছে, তার শরীরের অবস্থা খুব খারাপ। কিন্তু আশ্চর্য, প্রথামাফিক সে কোনও ওষুধপত্র কিছুই চাইল না। দাদাগোছের কাউকে ডেকে দিয়ে সে আবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। তার দাদা চা-বিস্কুট খাওয়াল। আমাদের জল ফুরিয়ে গেছিল। সংলগ্ন ঝর্ণার কল থেকে সে জল ভরে এনে দিল।



আরও খানিক এগিয়ে দউ গ্রাম। গ্রামটা শুরুর একটু আগে আরেকটা থাকার জায়গা দেখলাম। অন্নপূর্ণা হোটেল। আমার মতোই ভাষা-ধর্ষক কোনও বাঙালি-ভাইকে দিয়ে বেচারি মালিক একটা পোস্টার লিখিয়েছিল। সেই জাতভাই স্থানীয় উচ্চারণ মতে বুঝে নিয়ে বাংলায় লিখে গ্যাছে ‘আনপোনা হোটেল’। আমরা চারদিকে কত যে চারাপোনা বাংলার সোনাপোনা ছারখার করছি – তার আর ইয়ত্তা কি! (ফেরার পথে, গৌতমদা অবশ্য বানানটা ঠিক করে দ্যায়।) দউ শুরুর মুখেই ক্ষেতে একজনকে পেলাম। লালজির নাম বলতেই দু হাতে একগাদা গাঁজাপাতা ডলতে ডলতে জানাল, সে-ই মহাপুরুষ লাল সিং। বলওন্তজির নাম করে তাকে সব জানালাম আর বললাম, তুমুল খিদে পেয়েছে। সে তার ছেলেকে ডাকল। ছেলে প্রচুর ভেবেচিন্তে জানাল, দুপুর গড়িয়ে গ্যাছে, উপস্থিত ম্যাগি করে দেওয়া যেতে পারে। ম্যাগিতে একটু সবজি কিছু মেশানো যায় কি না, জিগ্যেস করায় সে দ্যাখাল, খানিকটা পালংশাকের তরকারি বেঁচে রয়েছে। চমৎকার, বহুৎ আচ্ছা! চনচনে খিদের দুপুরে গ্যালগ্যালে ম্যাগির মাথায় ল্যাদল্যাদে পালংশাক কেউ ট্রাই করেছে কি না, জানি না – তবে এটুকু বলে দিতেই পারি, স্বাদ অনবদ্য! খিদে মিটলে লালজি এল। ততক্ষণে সে গাঁজাপাতা সাইজ করে ফেলেছে এবং জাইতলিতে ফোন করে বলে দিয়েছে আমাদের এখানে পৌঁছনোর কথা। গল্প করতে করতে জানতে চাই, এই যে পথের ধারেই খোলাখুলি এরকম গাঁজার চাষ ও ব্যবসা – ভয় করে না? খুব অবাক হয়ে সে জানতে চায়, কিসের ভয়? বলি, এসব তো নিষিদ্ধ – জেল-জরিমানা ইত্যাদি। যেন খুব মজার গল্প – এরকম হোহো হাসিতে ফেটে পড়ে সে। বলে, দাদা, ওসব নিচে আপনাদের শহরে হয়! এ হল পাহাড় – কেউ আসে না! আসলেও পালিয়ে যায়! কে কাকে ধরবে! গুম মেরে থাকি। এখানের মানুষরাই এই অঞ্চলকে ‘দেবভূমি’ বলে ও মানে। অনেক জায়গায় সরকারি সাইনবোর্ডেও সে কথা লেখা আছে। কিন্তু ভেতরের এই ঘুণ দেবত্বকে নামিয়ে দিতে পারে যেকোনও দিন! খলিধারেই জেনেছিলাম, পিণ্ডারির পথে কোনও দুই বিদেশি গেস্টহাউস খুলছে। এই রাস্তায় পর্যটন শিল্পের উন্নতি কতটা প্রভূত হবে – সে সন্দেহ থাকলেও, ফরেনারদের গাঁজার বিজনেস সুপারহিট হতে বেশি সময় নেবে না। অরিজিৎদা পরে কথাপ্রসঙ্গে বলেছিল, এখন খাল কাটার কাজ চলছে। কুমির যখন ঢুকবে, তখন কেউই বাঁচবে না! ভাবলে খারাপ লাগে। লোভ আর টাকার চাহিদা ক্রমশই গিলে চলেছে মানুষের অন্তঃস্থিত দেবত্ব।



লালজি সেখানেই রাত কাটাতে বললেও আমরা সিদ্ধান্ত নিই, আরও একটু এগিয়ে যাওয়ার। গাছেদের চিলেকোঠায় বিকেলের পেয়ারাপাকা রোদ। দূর থেকেই টের পাচ্ছি পিণ্ডার নদীর গর্জন। ওই নদীটা পেরিয়ে খাতি গ্রাম। ঠিক করেছি, আজ ওখানেই থেকে যাব। ঝুপসি সবুজ রাস্তায় দেখি গ্রামেরই একটি বউ কাস্তে হাতে চলেছে, সম্ভবত জ্বালানী বা গরুর জন্যে ঘাস সংগ্রহে। পাহাড়িরূপ তাকে অহংকারের বদলে দিয়েছে অনামিক সারল্য। উপরন্তু পরনের সালোয়ার, সোয়েটার, টিপ, ও লিপস্টিক – সবই লাল। একটু দোনামোনা গলায় বলি, আপকা এক ফটো লে সকতা হুঁ? আরেব্বাপরে! সে কি ভাবল, কে জানে! হাতের কাস্তে নামিয়ে সাততাড়াতাড়ি খুলে ফেলল সোয়েটার ও ওড়না! কিন্তু আমি তো ওই সর্বাঙ্গ লালিমাই চাই। তাকে নিরস্ত করে বললাম, ওগুলো পরেই থাকুন, আমি ওরকমই ছবি নেব। লজ্জা-লজ্জা মুখে সে আবার সব গায়ে চড়ায়। পিণ্ডার পেরিয়ে একটু ওপরে উঠে সবুজ ক্ষেতের মাঝে পেলাম সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি একটা হোটেল। সঙ্গম কটেজ। তালাবন্ধ। মূল গ্রাম আরও প্রায় এক কিমি দূরে। আশেপাশে কেউই নেই। সামনেই চোখ তুললে নন্দাকোট। জায়গাটা দারুণ মনে ধরে গ্যালো। বন্ধ দরজার পাশেই বসে পড়লাম। ভাবটা এমন, ঘর যখন আছে কেউ না কেউ তো আসবেই!



হ্যাঁ, তাই হল। অল্পক্ষণের ভেতরেই এসে পড়ল মালিক তারা সিং। কাল সারারাত তার দেড় বছরের ভাইপো ককিয়েছে। সকাল হতেই তাকে নিয়ে রওনা হতে হয়েছিল বাঘেশ্বরের উদ্দেশ্যে। কাছাকাছি হাসপাতাল ওখানেই। মনে মনে হিসেব করে নিই, ওইটুকু একটা বাচ্চা সমস্ত যন্ত্রণা নিয়ে কুড়ি-বাইশ কিমি পেরিয়ে, যদি সঙ থেকে গাড়ি পায়, তা-ও ঘণ্টাদুয়েক পেরিয়ে যাবে জাস্ট চেক করাতে। নাঃ, আমার শহুরে মন কাঁপে না। বরং ঘর খুলিয়ে আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ি আরামের তদবিরে। আমি এই ভেবেই ক্ষুধার্ত হই যে, সারাদিন তেমন কিছুই খাইনি। তারাজি যদিও তাদের সঙ্গে পুরো রাস্তা যায়নি, তবুও সে ক্লান্ত ছিল। কিন্তু রোমে থাকার প্রবচন মেনে সে লেগে পড়ে কাজে। জাইতলিতে মোহনকে ফোন করে সে জানিয়ে দ্যায়, আমরা দুই টিমভ্রষ্ট আজ খাতিতে রাত কাটাব। অল্প চা খেয়ে আর রাতের খাবার বলে হাঁটতে বেরোই গ্রামের দিকে। মূল রাস্তা থেকে আলাদা হয়ে ক্ষেত আর বিছুটিঝোপের মাঝবরাবর কলেজি-মেয়ের সিঁথির মতো সরু একটা পথ ঢুকেছে। একদম পাশেই একটা বউ রাইয়ের চাষ করছে। লালচে চোখ। বারবার শব্দ করে সর্দি টানছে। কথায় কথায় জানতে পারি, এই তারাজির স্ত্রী। দিনচারেক হল তার জ্বর। হরেক আলাপচারিতায় সে জিগ্যেস করে, আমাদের ক্ষেতিবাড়ি আছে কি না! নেই এবং কোনওদিন করিনি শুনে ভারি আশ্চর্য ও হতাশ হয়। বলে, ক্ষেতি নেহি করতে হো, তো ফির ক্যা করতে হো! মাইরি বলছি, জীবনে নিজেকে আর কখনও এতটা অকেজো মনে হয়নি।



খাতি গ্রামটা এই পুরো অঞ্চলের মধ্যে উন্নততম দেখলাম। পাহাড়ি স্রোত কাজে লাগিয়ে অনেকগুলো কলের ব্যবস্থা। বেশ কয়েকটা পাবলিক টয়লেট। এই পুরো সভ্যতার একমাত্র পোস্ট অফিস (এবং সেটা চালু) আছে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দরজায় তালা ও সেটি ভেঙে ঝুলছে। খোঁজ করে জানলাম, ডাগদারসাব বেশ কয়েক বছর হল কেটে পড়েছে। নতুন কেউ আসেনি। ওষুধ কিছুই থাকে না। ফাটাদেয়ালে একটি জীর্ণ লাল-হলুদ বাণী – ‘দুটির বেশি নৈব চ’। কিন্তু জ্বরে যেখানে রামভরোসা – জন্মনিরোধক সেখানে বাতুলতাই। সুতরাং ঘরে ঘরে ছানাপোনার রমরমা। কেউ বাঁচছে, কেউ মরছে। ছেলেমেয়েরা এখানে একেবারে অল্পবয়েসেই বিয়ে করে ও বাপ-মা বনে যায়। ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছই গ্রামের শেষমাথায় এক মন্দিরে। শুনলাম, উহা কালীর স্থান। মূর্তি সেখানে চট দিয়ে ঢাকা। অদ্ভুত এই ব্যবস্থার কারণ নাকি লোকাল বেওয়ারিশ কুত্তার নির্ঘণ্টহীন আক্রমণ থেকে দেবীকে বাঁচানো। এক লালমুখো ফরেনার, দেখলাম, আমাদের দিকে তাকাতে তাকাতে মন্দিরের পেছনের প্রায়ান্ধকার ঘরগুলোতে ঢুকে গ্যালো। তার ও বাকিদের ভাবটা এমন, সে হেবি পরিচিত আর আমরাই বাইরের মাল। সন্ধ্যে নেমে আসতে বাকি নেই। পায়ে পায়ে পৌঁছই পেছনের ঘরগুলোর কাছে। আলো-আঁধারিতে বুঝতে বাকি থাকে না, এটি একটি গাঁজার ঠেক। শক্তির সাধনা ও গাঁজার আরাধনা – এমন সহাবস্থান এই প্রথম পেলাম। যদিও কেউ কোথাও বিন্দুমাত্র ভয় দ্যাখায়নি, তবু সহসা চন্দ্রানীর শরৎচন্দ্রীয় নারীসত্ত্বা হালুশথালুশ জেগে ওঠে। তার মনে হয়, এরা বুঝি এখুনি আমাদের বন্দী করে ফেলবে ও সড়কি-বল্লম নিয়ে ঠ্যাঙাতে আসবে। সেই অশেষ প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে আমরা পাঁইপাঁই দেবালয় ত্যাজিয়া কটেজের রাস্তা ধরি।



সাড়ে সাতটার ভেতরেই ডিনার শেষ। তারাজি ‘গুড নাইট’ করে গ্রামের পথে ফিরে গ্যালো। দৃষ্টিসীমান্তে কোথথাও কেউ নেই। কৃষ্ণপক্ষ শুরু হয়ে গ্যাছে। চাঁদ উঠতেও সময় লাগবে। বাইরে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। সামনে ফাঁকা ক্ষেত। পেছনে পাহাড়। ডানদিকে দূরে গ্রামের দিক থেকে দুচারটে আলোর ভ্রষ্ট হাতছানি। ভুল করে ডেকে ফেলছে একটা গৃহহীন কুকুর। বাঁদিকে নদী আর জঙ্গল। কুকুরের মিয়ানো ডাক ছাড়া শব্দ বলতে পিণ্ডারের গর্জন। কিছুটা পায়চারি করে টের পাই হিমেল শিশিরের খুনসুটি। বাইরে ঘন ঘাস আর ঘরে কাঠের খাঁজে ও তুলোর গদিতে পাহাড়ি বিছে বা সাপ থাকা বিচিত্র নয়। খুব ঠাণ্ডায় যদিও শীতল রক্তের প্রাণীরা টেঁকে না, তবু সম্ভাবনা উড়িয়ে দিতে পারি না। তাছাড়া এখনও সেরকম ঠাণ্ডাও পড়েনি। এই প্রথম টের পাই, মানুষ ছাড়া মানুষ কত একা! যেন এক বিচ্ছিন্ন গ্রহ। এ সমস্ত এখন চন্দ্রানীকে বলাও যাবে না। এমনিতেই দুর্বল শরীরে সে হেঁটে চলেছে, তার ওপর এই চাপ খেয়ে গেলে আর ঠ্যাকায় কে! চোখ তুলে দেখি, আকাশের কালো চাদর ফুটো ফুটো করে ঝলসে উঠছে নক্ষত্রদের ক্লাসরুম। তিরধনুক হাতে একেবারে সামনেই কালপুরুষ দাঁড়িয়ে। দু পা চিতিয়ে। দৃপ্ত ভঙ্গি। গোড়ালির কাছে একনাগাড়ে জ্বলছে লুব্ধক। মনে পড়ে যায়, ছোটবেলায় প্রথম একেই চিনিয়েছিল বাবা। সেই থেকেই জানি, যেখানেই যাই, কালো রাস্তায় আলো নিয়ে আমাকে পাহারা দ্যায় সাহসী একটা লোক। আমাকে বাঁচিয়ে রাখে তার শান্তঋজুতা।

(ক্রমশ)

177 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: dd

Re: রূপ-রুবারু (৪)

খুব দারুন ভাষা। নিশ্চয়ই নিয়মিত কবিতা লেখেন।

ভেরী লাভলি।
Avatar: tc

Re: রূপ-রুবারু (৪)

খুব ভাল লাগছে পড়তে। আশা করে আছি পরের পর্বগুলোর জন্য।
Avatar: দ

Re: রূপ-রুবারু (৪)

ķই চমত্কার!!

যাই আগের পর্বগুলো খুঁজে পড়ি।



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন