উদয়ন ঘোষচৌধুরি RSS feed

মোদ্দা ব্যাপার হল, বাঙালি সব জানে। সব মানে, সঅঅঅব। ব্রহ্মা যা জানে না, বাঙালি তা-ও জানে। মোদী থেকে মারাদোনা – লাইফে কে কি করতে পারল না, বাঙালি জাস্ট একটা বিড়ি খেতে খেতে বলে দেবে। উদয়ন বাঙালি, তাই সে-ও সব জানে। অন্তত সেরকমই মনে করে সে। সিনেমা নিয়ে, বইপত্র নিয়ে, বেড়ানোর গপ্পো নিয়ে, আর আরও হ্যানত্যান ইত্যাদি নিয়ে প্রচুর ভাঁটায়। সেইসব বুকনিবাতেলা এবার আপনার ক্লিকে। প্রকাশিত বই : উদোর পিণ্ডি, সৃষ্টিসুখ, ২০১৪; লিঙ্গ নেই মৃত্যু নেই, উবুদশ, ২০১২

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া
    -'একটা ছিল লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া।আর ছিল একটা নীল ঝুঁটি মামাতুয়া।'-'এরা কারা?' মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড়ো করে অদ্ভুত লোকটাকে জিজ্ঞেস করে।-'আসলে কাকাতুয়া আর মামাতুয়া এক জনই। ওর আসল নাম তুয়া। কাকা-ও তুয়া বলে ডাকে, মামা-ও ডাকে তুয়া।'শুনেই মেয়েটা ফিক করে হেসে ...
  • স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি
    স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি। আমি স্টার্ট-আপ কোম্পানিতে কাজ করছি ১৯৯৮ সাল থেকে। সিলিকন ভ্যালিতে। সময়ের একটা আন্দাজ দিতে বলি - গুগুল তখনও শুধু সিলিকন ভ্যালির আনাচে-কানাচে, ফেসবুকের নামগন্ধ নেই, ইয়াহুর বয়েস বছর চারেক, অ্যামাজনেরও বেশি দিন হয়নি। ...
  • মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার
    [আজ বের্টোল্ট ব্রেশট-এর মৃত্যুদিন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে যিনি সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন ব্রেশটিয় আঙ্গিক, সেই মৃণাল সেনকে নিয়ে একটি সামান্য লেখা।]ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কীভাবে যেন পরিচালক ত্রয়ী সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল এক বিন্দুতে এসে মিলিত হন। ১৯৫৫-তে মুক্তি ...
  • দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল পড়ে
    পড়লাম সিজনস অব বিট্রেয়াল গুরুচন্ডা৯'র বই দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল। বইটার সঙ্গে যেন তীব্র সমানুভবে জড়িয়ে গেলাম। প্রাককথনে প্রথম বাক্যেই লেখক বলেছেন বাঙাল বাড়ির দ্বিতীয় প্রজন্মের মেয়ে হিসেবে পার্টিশন শব্দটির সঙ্গে পরিচিতি জন্মাবধি। দেশভাগ কেতাবি ...
  • দুটি পাড়া, একটি বাড়ি
    পাশাপাশি দুই পাড়া - ভ-পাড়া আর প-পাড়া। জন্মলগ্ন থেকেই তাদের মধ্যে তুমুল টক্কর। দুই পাড়ার সীমানায় একখানি সাতমহলা বাহারী বাড়ি। তাতে ক-পরিবারের বাস। এরা সম্ভ্রান্ত, উচ্চশিক্ষিত। দুই পাড়ার সাথেই এদের মুখ মিষ্টি, কিন্তু নিজেদের এরা কোনো পাড়ারই অংশ মনে করে না। ...
  • পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি
    দিলীপ ঘোষযখন স্কুলের গণ্ডি ছাড়াচ্ছি, সন্তোষ রাণা তখন বেশ শিহরণ জাগানাে নাম। গত ষাটের দশকের শেষার্ধ। সংবাদপত্র, সাময়িক পত্রিকা, রেডিও জুড়ে নকশালবাড়ির আন্দোলনের নানা নাম ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের মধ্যে। বুঝি না বুঝি, পকেটে রেড বুক নিয়ে ঘােরাঘুরি ফ্যাশন হয়ে ...
  • দক্ষিণের কড়চা
    (টিপ্পনি : দক্ষিণের কথ্যভাষার অনেক শব্দ রয়েছে। না বুঝতে পারলে বলে দেব।)দক্ষিণের কড়চা▶️এখানে মেঘ ও ভূমি সঙ্গমরত ক্রীড়াময়। এখন ভূমি অনাবৃত মহিষের মতো সহস্রবাসনা, জলধারাস্নানে। সামাদভেড়ির এই ভাগে চিরহরিৎ বৃক্ষরাজি নুনের দিকে চুপিসারে এগিয়ে এসেছে যেন ...
  • জোড়াসাঁকো জংশন ও জেনএক্স রকেটপ্যাড-১৪
    তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায়...আসলে যে কোনও শিল্প উপভোগ করতে পারার একটা বিজ্ঞান আছে। কারণ যাবতীয় পারফর্মিং আর্টের প্রাসাদ পদার্থবিদ্যার সশক্ত স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। পদার্থবিদ্যার শর্তগুলি পূরণ হলেই তবে মনন ও অনুভূতির পর্যায় শুরু হয়। যেমন কণ্ঠ বা যন্ত্র ...
  • উপনিবেশের পাঁচালি
    সাহেবের কাঁধে আছে পৃথিবীর দায়ভিন্নগ্রহ থেকে তাই আসেন ধরায়ঐশী শক্তি, অবতার, আয়ুধাদি সহসকলে দখলে নেয় দুরাচারী গ্রহমর্ত্যলোকে মানুষ যে স্বভাবে পীড়িতমূঢ়মতি, ধীরগতি, জীবিত না মৃতঠাহরই হবে না, তার কীসে উপশমসাহেবের দুইগালে দয়ার পশমঘোষণা দিলেন ওই অবোধের ...
  • ৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড
    পুরোনো কথার আবাদ বড্ড জড়িয়ে রাখে। যেন রাহুর প্রেমে - অবিরাম শুধু আমি ছাড়া আর কিছু না রহিবে মনে। মনে তো কতো কিছুই আছে। সময় এবং আরো কত অনিবার্যকে কাটাতে সেইসব মনে থাকা লেখার শুরু খামখেয়ালে, তাও পাঁচ বছর হতে চললো। মাঝে ছেড়ে দেওয়ার পর কিছু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

রূপ-রুবারু (৩)

উদয়ন ঘোষচৌধুরি

ফরিদা খানুম যতই বলুন ‘আজ যানে কি জিদ না করো...’ – একবার বেরিয়ে পড়লে, অন্তত এইরকম রাস্তায়, যেকোনও দিকে এগোতেই হয়। সকালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, বাকিরা এগিয়ে যাক বলওন্তজির সঙ্গে – চন্দ্রানীর দেখভাল করতে আমি থেকে যাব ধাকুরিতেই। তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। বাকিদের ফিরে আসতে এখনও সাত-আটদিন লাগবে। ততদিন বাঘেশ্বর ফিরে আমরা অন্য কিছু জায়গা ট্রাই করতে পারি। টুকরো কথার পরামর্শে, রুটি-তরকারি খেয়ে ও বেঁধে, একে একে সকলে যখন পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নিচের জঙ্গলের রাস্তায় মুছে গ্যালো – ধাকুরির খোলা মাঠ আর অপার আকাশের মাঝে দাঁড়িয়ে নিজেকে বেশ অসহায় মনে হল। বাংলোর চৌকিদার হায়াত সিং আর চা-দোকানি লছমন সিং-এর সঙ্গে নানা অকারণ গপ্পো জুড়ে খানিক সময় কাটিয়ে ক্যামেরা বাগিয়ে বেরলাম। এলোমেলো কিছু ছবি তুলে দুপুরে ফিরতেই হায়াতজি গরমাগরম খাবার এনে দিল। চওড়া পাঁচিলে মুঠো মুঠো রোদের ভাঁজে বসে সে খাবারের স্বাদ-ই অন্য! এই অব্দি যদিও ঠিক ছিল, খাওয়ার পরই আবার শুরু হল চন্দ্রানীর বমি। সে একেবারেই নেতিয়ে পড়ল। আমার কাছে রাখা যাবতীয় ট্যাবলেট জবাব দিল। কাল রাত থেকেই তাকে ওআরএসের জল দিয়ে টিকিয়ে রাখা হচ্ছিল। ততক্ষণে বেলা দুটো পেরিয়েছে। নিচের দিকে ফেরাই শ্রেয় মনে করলাম। কিন্তু অর্ধেক রাস্তা পেরনোর আগেই সন্ধ্যে নামবে! সঙ্গে দুখানা রুকস্যাক – যা একার পক্ষে বওয়া অসম্ভব! আপ-ডাউন করা কোনও মালবাহী খচ্চর যদি পাওয়া যায় এবং সে ফাঁকা থাকে, খানিক সুরাহা হয়। কিন্তু এই জনহীন উপত্যকায় কোথায় কে! সাড়ে চারটে নাগাদ দেখি খানকতক খচ্চরের পিঠে বোঝা চাপিয়ে কালো জোব্বা-পরা একটা লোক এল। হায়াত সিং পরিচয় করিয়ে দিল। রূপচাঁদ সিং। খেয়াল হল, এই-ই বলওন্তজির দাদা – যে জাইতলি থেকে বাকিদের নিয়ে যাবে মাইকতলির দিকে। কোঁচকানো চোখেমুখে হাসির প্রলেপ। মুখ দেখে বয়েস বোঝা দুঃসাধ্য। কণ্ঠস্বর একটু খোনা। সব শুনে সে বলল, ‘সামানকে লিয়ে চিন্তা মত করো, দাদা! সামান ইধার ছোড় দেনা! কল হম পৌঁছা দেগা! আপ দিদিকো সামহালো!’ বলে, সে এগিয়ে যায় পালিত পশুদের নিয়ে নিজের রাস্তায়। সারারাত এরপর চন্দ্রানী গোঙাল। আমি ও হায়াতজি অনেক চেষ্টা ও অনুরোধেও তাকে কিছুই খাওয়াতে পারলাম না। এই ঘরটাতে কাল যখন সাতজন ছিলাম, সকলের কথাবার্তায় বিশালতা অনেকটাই ঢেকে ছিল। আজ ফাঁকা ঘরে ঠাণ্ডাটাও বেশি কামড়ে ধরছে। বাইরে চতুর্দশীর চাঁদ। দূরের বরফ-মাখা শৃঙ্গেরা শ্বাপদের ধারালো দাঁতের মতো ঝকঝক করছে। আধা-ঘুম আধা-জাগায় টর্চের উদ্বেগে সেরাত কাটালাম।



সকাল হতেই হায়াতজি কিছু পরোটা বানিয়ে দিল। একটা কাগজে সেগুলো মুড়ে, ব্যাগপত্র তারই জিম্মা করে বেরিয়ে পড়লাম। কপালে থাকলে, আবার হয়ত কখনও দ্যাখা যাবে। দুঃখ-দুঃখ মুখ করে দুজনেই হাঁটছি। বারবার পেছনে তাকিয়ে দেখে নিচ্ছি রূপোয় মোড়া পাহাড়ি শিখর অথবা নির্ভেজাল কুঠারের ফলা। দুপুর নাগাদ, পথেই দেখি, আমাদের ব্যাগেরা খচ্চরের পিঠে চেপে নামছে। নিয়ে আসছে রূপজির এক ভাইপো, কৃষ্ণা। মাঝে একবার রাস্তা হারিয়ে আমরা অল্প এলোমেলো। চন্দ্রানী সেখানে হারাল মেজাজ। বিকেলের মাঝামাঝি পৌঁছলাম খলিধার। সেরাত সেখানেই রেস্ট করার সিদ্ধান্ত নিলাম। গোপালজির যত্নে ও আড্ডায় দারুণ কাটল।



পরদিন বিকেলে নেমে এলাম সঙ-এ। হংসী দারুণ উল্লসিত। তক্ষুনি দোকান থেকে জিনিসপত্র এনে কি রাঁধবে, কি খাওয়াবে ভাবতে বসল। চন্দ্রানীর দুদিনের দুর্বলতা ফুৎকারে ভ্যানিশ। উড়ন তুবড়ি হয়ে সে-ও লেগে পড়ল কাজে। গ্রামের কিছু মেয়ে-বউ জুটে সবাই মিলে কলকলিয়ে মাত করে দিল। সকলেই জানাল, শরীর খারাপে ফিরে এসে দারুণ বুদ্ধির কাজ করেছি। বাকি দিনগুলো কোন কোন চুলোয় কাটানো যায় – সেবিষয়ে অনেকেই জ্ঞানভাণ্ডার উপুড় করে দিল। তবু কোনওটাই ঠিক পছন্দ হয় না। আমার চোখে লেগে ওপরে ফেলে-আসা বিস্তীর্ণ প্রান্তর – যেখানে ঘাসেদের নিউজ চ্যানেলে লেখা হয় পাথুরে আত্মার খবর। এ যেন বুফেতে খাবার দেখিয়ে আসল সময়ে ধরানো হল দু টুকরো মাংস! মনমরা হয়ে গরুর ল্যাজ মোচড়ানো কিংবা তরুণীর ওড়না ফেরানোর ছবি তুলে আমি সময় কাটাই। কোনও কাজ না-পেয়ে পরদিন দুপুরের রান্নাটাও আমিই করলাম। চন্দ্রানী বেশ বুঝছিল, অসময়ে এভাবে নিচে ফিরে আসায় আমি দুমড়ে গেছি। লাঞ্চের পর তার অকল্পনীয় আত্মবিশ্বাস ফিরে এল। এবং আমরা নিঃসন্দেহে অভূতপূর্ব এক সিদ্ধান্ত নিলাম, আবার ওপরে উঠব। একাই। নো খচ্চর। নো গাইড। ঠিক হল, শরীর-টরির ভুলে হাঁটতে থাকব যতটা পারি। যেখানে পারব না, রেস্ট করব। বাকিরা ফিরে এলে একসঙ্গেই নামা হবে নিচে।



একটা স্যাক রেখে দিলাম হংসীর ঘরে। আরেকটা স্যাকে খুব প্রয়োজনীয় জামাকাপড় ভরে বেরিয়ে পড়লাম সন্ধ্যে সাড়ে পাঁচটায়। আপাতত টার্গেট খলিধার। চাঁদরাত চলছে। সন্ধ্যে অল্প পেরলেও রাস্তা দ্যাখা যাবে। অর্ধেক এগিয়ে আসার পর বুঝলাম, একটু হঠকারিতাই করে ফেলেছি। ঘন কালো মেঘ নামছে সামনে। বিদ্যুৎ চমকাল কয়েকবার। কালচে সবুজ একটা সাপ দ্রুত পেরিয়ে গ্যালো পায়ের সামনে দিয়ে। কিছুক্ষণের ভেতরেই বৃষ্টি এসে পড়ল ঝমঝমিয়ে। ভারি হবে ভেবে, ছাতা রেখে এসেছি নিচে। দুজনে শুধুমাত্র উইন্ডচিটার মাথায় চড়াই ভাঙতে থাকি প্রায়ান্ধকারে। (এটা শুনে, পরে, শীর্ষেন্দু যাচ্ছেতাই ধাঁতানি দিয়েছিল।) সাড়ে সাতটার কাছাকাছি ফরেস্ট অফিসে পৌঁছে গোপালজিকে ডাকাডাকি করে বের করি। ঠাণ্ডায় অন্ধকারে এসব জায়গাতে আটটাতেই কম্বলের তলায় মাঝরাত। গোপালজি সাংঘাতিক অবাক হয়। আমাদের সাহসের প্রশংসাও করে। অল্প যা তরকারি বেঁচে ছিল, কয়েকটা রুটি বানিয়ে তাই আমাদের খেতে দ্যায়। পাহাড়ি বর্ষার আমেজে ঘুম আসতে দেরি হয় না।



রাত্রেই বৃষ্টি কেটে গেছিল। একদম সকালেই বেরিয়ে পড়লাম আবার ধাকুরির দিকে। গোপালজি পথে খাওয়ার জন্যে আলুর পরোটা আর ডিমের ভুজিয়া বানিয়ে দিয়েছে। এবারের যাত্রায় খিদেটা তাই বেশি মোচড় দিল না। আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ। আগের বারের মতো রোদ নেই। বেশ একটু হাওয়া চলছে আজ। যদিও শুধু দুজনেই, তবু এবারের হাঁটাটা খুব একটা কষ্ট লাগছে না। রাস্তাটা চিনে যাওয়া একটা কারণ হতে পারে। পথের দুই চা-দোকানি আমাদের দেখে বেশ অবাক। শরীর খারাপ হয়ে নিচে গিয়ে আবার দু দিনের মধ্যে এই খাড়াই ভেঙে ওপরে ফিরে আসার ক্ষমতা নাকি খুব কম লোকই দেখিয়েছে। নিজেরাই ল্যাজ উঁচু করে নিজেদের পিঠ থাবড়ে দিই। পথের মাঝে দূরের একলা বাড়ি থেকে ছুটে আসে একটা বাচ্চা ছেলে। মেরেকেটে বছর আটেক হবে। ভাল করে হিন্দিটাও বলতে পারে না। যেকোনও কথায় ‘ইয়েস’ বলাই তার অভ্যেস। প্রথমে দাঁত-ব্যথার ওষুধ চাইল। আমাদের কাছে ছিল না। কিছু লজেন্স বের করে দিলাম। দুম করে বলে বসল, ‘চরস চাহিয়ে?’ ভাবলাম, ভুল শুনেছি, বা ভাষার সমস্যা। নাঃ, তা নয়। বারদুই বাজিয়ে বুঝি, সে সত্যিই চরস বা গাঁজার কথাই বলছে। চমকে যাই। গোপালজির কথা মনে পড়ে। খুব দুঃখ করছিল, সাদাসরল এই পাহাড় ক্রমশ খারাপ হয়ে যাচ্ছে নেশার কবলে আর ব্যবসায়। কিছু ভারতীয় তো বটেই, সস্তায় বিদেশ ভ্রমণ করতে-আসা সাদাচামড়ার দল এখানে গাঁজা পেয়ে যায় সহজে ও সুলভে। আগে খেয়াল করিনি, এইবারে চিনে নিয়েছি, পথের দুধারে গাঁজাগাছের অঢেল খোলাখুলি চাষ। গোপালজি আরও বলছিল, একপেয়ালা দারু দিলে এখানের মানুষকে কিনে ফ্যালা যায়। পৃথিবীর সবথেকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, যাকে ‘রাষ্ট্র’ বলি – তার উপভোগিরা পাঁচ বছরে একবার দ্যাখা দ্যান আর দারুর বদলে ভোট নিয়ে মসনদে যান। এদের লেখাপড়ার উপযুক্ত স্কুল নেই, স্কুল থাকলেও টিচার নেই, হাসপাতাল নেই, থাকলেও ডাক্তার নেই (ডাক্তার অ্যাপয়েন্ট করলেও সে রিজাইন মেরে পালিয়ে যায়), ওষুধ নেই, লাইট নেই – এরা কি বোঝে ‘ভোট’ কি? ‘দেশ’ কি? অথচ, সম্ভবত, আমাদের মিলিটারির অধিকাংশ জোগান দ্যায় পাহাড়। আদিখ্যেতা না-করে, সেটারও তল খুঁড়লে দ্যাখা যাবে, গরিবি আর আধুনিক শিক্ষাহীনতাই এর মূল। এই বাচ্চাটাও, নিঃসন্দেহে পারিবারিক সমর্থনেই, বুঝে ফেলেছে ধান-গম কিছু না, গাঁজা বেচে বেশ কামানো যেতে পারে। চাই কি, একটা শাঁসালো ফরেনারকে খুশ করলে মোটা ইনকাম, ভাঁজভাঙা ট্র্যাকস্যুটটাও উপরি জুটে যেতে পারে! বাচ্চাটাকে একটু বোঝানোর চেষ্টা করি। যদিও সেসবে ওর ছিটেফোঁটা আগ্রহ নেই।



হায়াতজির আশ্রয়ে পৌঁছতে দুপুর দুটো পেরল। অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ও দ্রুততায় সে চা পরোটা অমলেট বানিয়ে আনল। জুতো-জামা ছেড়ে সেসব সাঁটিয়ে সবেমাত্র বসে একটু আয়েশ করব ভাবছি, দক্ষিণের দিক থেকে ঘনিয়ে এল নিকষ কালো বৃষ্টি। সঙ্গে সোঁসোঁ হাওয়া। কিছুক্ষণের মধ্যে শিল পড়তে আরম্ভ হল। একেকটি শিলের সাইজ প্রায় পিংপং বল। বাংলোর টিনের চালে সে যেন দুরমুশের আওয়াজ। অথবা দুরমুশ নয়, শিয়ালদা স্টেশনে পিক আওয়ারে ছুটন্ত ভিড়ের শব্দ। তাকিয়ে দেখি, সামনের ঘাসজমি শিলে ঢেকে প্রায় সাদা। দূরের সমস্ত শৃঙ্গ মেঘে মেঘে ভর্তি। টিমের বাকিদের জন্যে বেশ চিন্তা শুরু হল। আরও ওপরে যদি ওয়েদার এরকম খারাপ হয়, তাহলে ওরা ফেঁসে যাবে। ফিরতেও দেরি হয়ে যাবে। এ এক সাংঘাতিক আদিম অবস্থা। ওদের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব মেরেকেটে পঁয়ত্রিশ কিমি – অথচ যোগাযোগের কোনও উপায় নেই। বিএসএনএলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় – কিন্তু প্রথমত, আমাদের কাছে সেটা নেই; দ্বিতীয়ত, সেই নেটওয়ার্কও তথৈবচ। একমাত্র ভরসা যদি জাইতলির দিক থেকে কেউ এদিকে আসে, তারা কেউ কিছু জানাতে পারে। অথবা এদিক থেকে কেউ গেলে আমরা জানিয়ে দিতে পারি। সাতপাঁচ ভাবছি আর মনের ভেতর জিইয়ে রাখছি যোগাযোগের বিশ্বাস – ধীরে ধীরে বৃষ্টিটা কমতে লাগল। বারান্দা থেকে দেখি, দক্ষিণে তখনও কৃষ্ণধূম মেঘ। উত্তরের মেঘমালা বেশ সাদা নির্ভার। সূর্যসাহেব অস্তের আয়োজনে। পশ্চিমী আগুনে-ছটা ঢেকে দিয়েছে দুদিকের মেঘ। বিশাল এক ক্যানভাসে সাদা-কালোর মিশেল আর ব্যাকগ্রাউন্ডে ফেটে বেরোচ্ছে লাভার উষ্ণীষ। কয়েকটা ফটো তোলার পর মনে হল, ধুস! ফটো দিয়ে এ জিনিসের কিছুই বোঝানো যাবে না। আর ওই ভিউ-ফাইন্ডার তাক করে ঘুরে বেড়ানোর থেকে নিজে বরং বুক ভরে দেখি। কতরকমের বর্ণাঢ্য আয়োজন রকমারি ডিজাইন যে লক্ষ-কোটি বছর ধরে হয়ে আসছে – আমরা দ্যাখার সময়ই পাই না।



হাওয়া আর বৃষ্টি থামতেই ঠাণ্ডা নামল জাঁকিয়ে। হায়াতজি ডিনারে এনে দিল মাশরুমের সুপ, ভুনা খিচুড়ি, পাঁপড়, আচার, আলুভাজা। আরও লাগবে কি না, চন্দ্রানীর মুখে টেস্ট লাগছে কি না – এসব সে বারবার বিনীত জিজ্ঞাসা করল। বাজি রেখে বলছি, কোনও তারাওলা হোটেলেও এমন মার্জিত যত্ন ও স্বাদু খাবার কোনওদিন পাইনি। খাওয়া শেষে বারান্দার বাইরে একটু হাঁটতে বেরলাম। চমৎকার আকাশ। চুরি করে ধরা পড়ে-যাওয়া বাচ্চাদের মতো মুখনিচু শান্ত মেঘ। কে বলবে, ঘণ্টাখানেক আগে এরাই তাণ্ডব করেছিল! চাঁদের আলগা মুখ। ঠিক যেন হাউসিং-এর নতুন বউটা স্নানের পর ব্যালকনিতে ম্যাক্সি টাঙাতে এসে টের পেয়েছে পাড়ার বর্বরতম লুচ্চাটা ঘাড় উঁচিয়ে তারই দিকে তাকিয়ে। লজ্জায় তার পা গ্যাছে ফ্যালফ্যালিয়ে। এঃ, ভারি তো চাঁদের ছিরি! বয়েই গেছে আমার ওকে দেখতে! আজ কি ইস্কুল থেকে তারারা ফেরেনি?



(ক্রমশ)

179 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: উদয়ন ঘোষচৌধুরি

Re: রূপ-রুবারু (৩)

৩ নম্বরটা মিস করে গেছিলাম। খুব ভাল লাগছে পড়তে। বাঃ
Avatar: 4z

Re: রূপ-রুবারু (৩)

ইকি!!!! কমেন্ট আমি করলাম তো!!!
Avatar: pi

Re: রূপ-রুবারু (৩)

উদয়ন, একটা লেখার নিচেই কমেন্ট অ্যাপেন্ণ্ড করে পরের পর্বগুলো দিতে পারিস, তাহলে সব এক জায়গায় পরপর থাকবে।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন