উদয়ন ঘোষচৌধুরি RSS feed

মোদ্দা ব্যাপার হল, বাঙালি সব জানে। সব মানে, সঅঅঅব। ব্রহ্মা যা জানে না, বাঙালি তা-ও জানে। মোদী থেকে মারাদোনা – লাইফে কে কি করতে পারল না, বাঙালি জাস্ট একটা বিড়ি খেতে খেতে বলে দেবে। উদয়ন বাঙালি, তাই সে-ও সব জানে। অন্তত সেরকমই মনে করে সে। সিনেমা নিয়ে, বইপত্র নিয়ে, বেড়ানোর গপ্পো নিয়ে, আর আরও হ্যানত্যান ইত্যাদি নিয়ে প্রচুর ভাঁটায়। সেইসব বুকনিবাতেলা এবার আপনার ক্লিকে। প্রকাশিত বই : উদোর পিণ্ডি, সৃষ্টিসুখ, ২০১৪; লিঙ্গ নেই মৃত্যু নেই, উবুদশ, ২০১২

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • বদল
    ছাত্র হয়ে অ্যামেরিকায় পড়তে যারা আসে - আমি মূলতঃ ছেলেদের কথাই বলছি - তাদের জীবনের মোটামুটি একটা নিশ্চিত গতিপথ আছে। মানে ছিল। আজ থেকে কুড়ি-বাইশ বছর বা তার আগে। যেমন ধরুন, পড়তে এল তো - এসে প্রথম প্রথম একেবারে দিশেহারা অবস্থা হত। হবে না-ই বা কেন? এতদিন অব্দি ...
  • নাদির
    "ইনসাইড আস দেয়ার ইজ সামথিং দ্যাট হ্যাজ নো নেম,দ্যাট সামথিং ইজ হোয়াট উই আর।"― হোসে সারামাগো, ব্লাইন্ডনেস***হেলেন-...
  • জিয়াগঞ্জের ঘটনাঃ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষতা
    আসামে এনার্সি কেসে লাথ খেয়েছে। একমাত্র দালাল ছাড়া গরিষ্ঠ বাঙালী এনার্সি চাই না। এসব বুঝে, জিয়াগঞ্জ নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছিল। যাই হোক করে ঘটনাটি থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতেই হবে। মেরুকরনের রাজনীতিই এদের ভোট কৌশল। ঐক্যবদ্ধ বাঙালী জাতিকে হিন্দু মুসলমানে ভাগ করা ...
  • অরফ্যানগঞ্জ
    পায়ের নিচে মাটি তোলপাড় হচ্ছিল প্রফুল্লর— ভূমিকম্পর মত। পৃথিবীর অভ্যন্তরে যেন কেউ আছাড়ি পিছাড়ি খাচ্ছে— সেই প্রচণ্ড কাঁপুনিতে ফাটল ধরছে পথঘাট, দোকানবাজার, বহুতলে। পাতাল থেকে গোঙানির আওয়াজ আসছিল। ঝোড়ো বাতাস বইছিল রেলব্রিজের দিক থেকে। প্রফুল্ল দোকান থেকে ...
  • থিম পুজো
    অনেকদিন পরে পুরনো পাড়ায় গেছিলাম। মাঝে মাঝে যাই। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়, আড্ডা হয়। বন্ধুদের মা-বাবা-পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। ভাল লাগে। বেশ রিজুভিনেটিং। এবার অনেকদিন পরে গেলাম। এবার গিয়ে শুনলাম তপেস নাকি ব্যবসা করে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। একটু পরে তপেসও এল ...
  • কাঁসাইয়ের সুতি খেলা
    সেকালে কাঁসাই নদীতে 'সুতি' নামের একটা খেলা প্রচলিত ছিল। মাছ ধরার অভিনব এক পদ্ধতি, বহু কাল ধরে যা চলে আসছে। আমাদের পাড়ার একাধিক লোক সুতি খেলাতে অংশ নিত। এই মৎস্যশিকার সার্বজনীন, হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ে জনপ্রিয়। মনে আছে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় একদিন ...
  • শুভ বিজয়া
    আমার যে ঠাকুর-দেবতায় খুব একটা বিশ্বাস আছে, এমন নয়। শাশ্বত অবিনশ্বর আত্মাতেও নয়। এদিকে, আমার এই জীবন, এই বেঁচে থাকা, সবকিছু নিছকই জৈবরাসায়নিক ক্রিয়া, এমনটা সবসময় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না - জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-পরিণ...
  • আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার চাই...
    দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা বুয়েটে পড়ার সুযোগ পায়। দেশের সবচেয়ে ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহে বুয়েট। সেই প্রতিষ্ঠানের একজন ছাত্রকে শিবির সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলল কিছু বরাহ নন্দন! কাওকে পিটিয়ে মেরে ফেলা কি খুব সহজ কাজ? কতটুকু জোরে মারতে হয়? একজন মানুষ পারে ...
  • ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৭
    চন্দ্রপুলিধনঞ্জয় বাজার থেকে এনেছে গোটা দশেক নারকেল। কিলোটাক খোয়া ক্ষীর। চিনি। ছোট এলাচ আনতে ভুলে গেছে। যত বয়েস বাড়ছে ধনঞ্জয়ের ভুল হচ্ছে ততো। এই নিয়ে সকালে ইন্দুবালার সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে। ছোট খাটো ঝগড়াও। পুজো এলেই ইন্দুবালার মন ভালো থাকে না। কেমন যেন ...
  • গুমনামিজোচ্চরফেরেব্বাজ
    #গুমনামিজোচ্চরফেরেব্...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

রূপ-রুবারু (২)

উদয়ন ঘোষচৌধুরি

সকাল সাতটায় চাড্ডি ম্যাগি গিলে আমাদের যাত্রা হল শুরু। সঙ ছাড়িয়ে এলোমেলো ঘরবাড়ি নদীর ধার ঝোপঝাড় ধরে হাঁটা। পাহাড়মালা আর গাছেদের গায়ে গায়ে সকালের ছিটে এসে পড়ছে। প্রতিটি স্তরে খেলা করছে মহারশ্মিছোঁয়া। ক্ষেতে কাজ করছে বেশিরভাগ মেয়েরাই। যদিও হাল দেওয়ার কাজটা পুরুষরাই করছে। মেয়েরাই, দেখলাম, গরু ও মোষের পাল নিয়ে চরাতে চলেছে পাহাড়ের ঢালে। ছেলেদের, দেখলাম, ছাগলের পাল সামলাতে। (ছাগলরা কি নারীশাসন মানতে অনিচ্ছুক? কে জানে!) সব্জি বলতে, সাধারণত, রাইশাক আর প্রায় সিমের সাইজের বিনস। রাই থেকে যে মশলা ও তেল হয়, তা অনেকে জানেও না। কেউ কেউ জানলেও এখানে সেসব তৈরির কথা কেউ ভাবেনি। কাঁচালঙ্কা এখানের মাটিতে হয় না। শীতের সময়ে মুরগি বাঁচতে পারে না, তাই কোনও পোলট্রি নেই। চিকেনের ফরমাশ হলে, হয় নিচে থেকে নিয়ে আসতে হবে, নতুবা দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে কিনতে হবে। বছরে এক-আধবার মাংস খাওয়ার ইচ্ছে জাগলে, গ্রামের লোকেরা একত্রে চাঁদা তুলে ছাগল কাটে। একেকটির দাম দু-আড়াই হাজারের কম নয় (এখানের মানুষের কাছে তা অনেক।) তারপর সকলের ভেতর মাংস বিলি হয়। অনেকটা ঈদের কোরবানির মতো। মাংস জোগাড়ের আরেকটি গুপ্তউপায় এখানে দেখেছি। চরতে চরতে পাহাড়ের খাদে বা নদীর স্রোতে পা পিছলে কোনও ছাগল পড়ে মারা গেলে, এরা কুড়িয়ে আনে। শর্ত, অন্য মাংসাশী বন্যজন্তুর দ্যাখা না-পাওয়া এবং টাটকা অবস্থায় মাংসটা নিতে পারা। অবশ্য শীতের সময়, বা যে জায়গাগুলোয় বরফ থাকে, মোটামুটি বেশ কিছুদিন মৃত মাংসে পচন ধরে না।



খরস্রোতের ধার বরাবর কিছুটা দূরে দূরে পাথর সাজিয়ে সাজিয়ে ছোট ছোট ঘর। কোনওটার দরজা ভেজানো, কোনওটার মাথায় শুধুই শেকল, কোনওটায় নাম-কা-ওয়াস্তে তালা। স্রোতের একটা অংশ এক্সট্রা নালা কেটে দ্রুততর বানিয়ে ঘরগুলোর পিঠে ঢুকিয়ে দেওয়া। আবার পেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে জলরাশি। খানচারেক দ্যাখার পর বোধগম্য হয়, এটা জলশক্তিকে সরাসরি কাজে লাগিয়ে গম ভাঙার কল। ওই বিপুল জলবেগ ভেতরে একটা ভারি চাকা ঘোরাচ্ছে, যেটা পিষে দিচ্ছে সোনালি দানা। একটু অন্যরকম হলেও ‘ড্রিমস’-এর শেষ গল্প ‘দ্য উইন্ডমিল ভিলেজ’ মনে পড়ে গ্যালো। জ্বালানির কাজে মূলত কাঠ ভরসা। পরিবারে কারুর কারুর কাজ, সারাদিন জঙ্গল ঝেঁটিয়ে পড়ে-থাকা শুকনো ডালপালা সংগ্রহ করে আনা। হোটেল বা চা-দোকান থাকলে, বনবিভাগে দরখাস্ত করে গাছ কাটার বরাত পেতে হয়। ডাক্তার এখানে কল্পনা। জ্বর-গা ব্যথার ওষুধের জন্যে এদের ভরসা আমাদের মতো পর্যটক। নারীপুরুষ নির্বিশেষে, এরা টুরিস্ট দেখলে, নানা শরীর খারাপের কথা বলে ওষুধ চায়। অনেকসময়ই সেই ওষুধ জমিয়ে রাখে প্রকৃত অসুখের অপেক্ষায়। ব্যবহারের দিন আসতে আসতে হয়ত এক্সপায়ারি ডেট পেরিয়ে যায়। কিন্তু এরা ওসব বোঝে না। সঙ গ্রামে শুনলাম, একটি ডাক্তার বিরাজমান। খোঁজ নিয়ে জানলাম, বাঘেশ্বর না কোথায় তিনি এক কেমিস্টের দোকানে কিছুদিন কাজ করেছিলেন। তারপরই একদিন ভেতরের অগ্নীশ্বর চ্যাটার্জি জেগে ওঠে। গ্রামে ফিরে তিনি ডাগদারসাব বনে যান।



ইস্কুলের ছেলেমেয়েরা চলেছে খুচরো খুচরো দলে। এরকম রিমোট জায়গায় ঘুরতে গেলেই আমাদের দলে প্রত্যেকের কাছে থাকে পাঁচমিশেলি লজেন্স। আমরা সেগুলো পথে দ্যাখা-পাওয়া বাচ্চাদের হাতে ধরাই। এতে দুটো কাজ হয়। এক, খুশিটা সহজে ভাগ হয়ে যায়। দুই, ওদের হরেকরকম্বা ছবি তোলা যায়। অরিজিৎদা সোৎসাহে লজেন্স বিলোচ্ছে ও ছবি তুলছে। (এখানে বলে দিই, আমরা তখন জানতাম না, পাহাড়িদের লজেন্স খাওয়ানো বিষ দেওয়ার সামিল।) বাচ্চাগুলোর নির্ভেজাল মুখ দেখে মনে হল, ইস্কুল বা পড়াশোনা নিয়ে ওরা বিন্দুমাত্র চিন্তিত নয়। বরং যেন এই রাস্তা ঝোপঝাড় মাসুমরোদের কুসুমগন্ধ নিয়ে পথ হাঁটাটাই ওদের একমাত্র লক্ষ্য। (আমরা কেন যে মরতে মরতে দশ কিলোর ব্যাগ তুলে দিদির দাবড়া ও মায়ের থাবড়া খেয়ে বাংলার পাঁচ হয়ে লেখাপড়া করি!)



আঃরে! এদিকে একেবারে সামনেই গোঁগোঁ শব্দে পাহাড়ি নদী। বড় বড় পাথরের চট্টান ভেদ করে বইছে। এটা পেরিয়ে যেতে হবে ওপারের গ্রাম লোহারখেতে। দেখি, সাঁকো পাতা হয়েছে সদ্য-কাটা তিনটে সরু গাছ দিয়ে। গাছগুলোর গায়ে তখনও সবুজ ছালের আভা। সাঁকো থেকে নদীপেটের ফারাক ফুটচারেক। স্থানীয় মানুষেরা দিব্যি পেরিয়ে যাচ্ছে। হেব্বি উৎসাহ দিয়ে বীরের মতো সকলকেই ওপারে পাঠিয়ে দিলাম। ট্রাপিজ কায়দায় বাকিরা পেরচ্ছে – এরকম লোম-খাড়া ফটো নিলাম। অতঃপর আমার হাওয়া টাইট হইল। কাঁচা সাঁকোর দিকে তাকিয়ে বিশ্বাস হারিয়ে ফেললাম। আশেপাশের স্রোতের আওয়াজে কালা হলাম। নিচের পাথরগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হল, ওরা আমারই পদস্খলনের জন্যে ওত পেতে আছে। আমার পা আটকে গ্যালো। ওপার থেকে অনেক আহ্বানেও আমি নড়তে পারলাম না। অগত্যা বাপি ফিরে এসে হাতে টান দিল। আমি সাড় ফিরে পেলাম এবং আলেকজান্ডারের মতো নদী পেরলাম। এখানে আস্তে করে বলে নিই, বাপি নেহরু ইন্সটিটিউট অফ মাউন্টেনিয়ারিং (NIM) থেকে ট্রেইন্ড ও সার্টিফায়েড। অতএব সে একজন হেঁক্কোর ট্রেকার।



প্রথমে পৌঁছলাম খলিধার। আপার লোহারখেত নামেই জায়গাটা খ্যাত। সঙ থেকে দূরত্ব পাঁচ কিমি। এখানে কপকোট বনবিভাগের অফিসে ছাড়পত্র বানাতে হল। কেননা, এরপর থেকে বাকিটা ফরেস্টের এলাকা। একসপ্তাহের অনুমোদন পেতে গেলে মাথাপিছু ষাট টাকা। অষ্টম দিন থেকে মাথা ও দিনপিছু কুড়ি টাকা। এছাড়াও গাইড, কুলি, খচ্চর, তাঁবু – এসবেরও হিসেব ধরা হল। আমাদের মিনিমাম বারো দিনের প্রোগ্রাম। সব মিলিয়ে টাকাটা বেশ কড়কড় করছে। অফিসার চৌবেসাব একটু মায়া করল। সম্ভবত ক্যাপ্টেনের অসামান্য কাঁচুমাচু এক্সপ্রেশন আর অলৌকিক হিন্দিই তার কারণ। চৌবেজি শুধু একসপ্তাহের চার্জ নিয়ে আমাদের বাধিত করল। এখানে ফরেস্টের ডরমিটরি আছে। ভাড়া শয্যাপিছু একশ টাকা। মিলসিস্টেমে খাবার পাওয়া যায়। নিরামিষ থালাপিছু ষাট টাকা। দেখাশোনা ও রান্না করে চৌকিদার গোপাল সিং।



খলিধার থেকে উঠব ধাকুরি। এখান থেকে দূরত্ব আট কিমি। বলে রাখি, পাহাড়ি রাস্তায় সমতলের মাপ ভাবলে বেজায় ঠকতে হয়। এখানে জমিকে পয়েন্ট করে মাপা মুশকিল, তাই ধরা হয় বায়বীয় দূরত্ব (aerial distance)। মানে, ক পাহাড় থেকে খ পাহাড়ে যদি বাতাসে ভেসে সোজা যাওয়া যায়, তাহলে হয়ত হবে এক কিমি। কিন্তু কার্যত পাহাড়ে এঁকেবেঁকে পাক খেয়ে আসলি পথ হয়ত পাঁচ কিমি। যেকোনো ম্যাপে যদিও বলা থাকবে মাপ ওই এক কিমিই। সঙ থেকে ধাকুরি – পুরো রাস্তাটাই খাড়া চড়াই। ঠাঠা রোদ্দুর। বড় গাছ কম, তাই ছায়াও কম। সুতরাং খুব ভাল হয়, যদি আগের রাতে খলিধারে এসে রেস্ট করে নেওয়া যায়। আর একদম প্রথম ভোরে বেরিয়ে রাস্তাটা মেরে দিতে হবে। তাহলে চড়াইয়ের কষ্টটা গায়ে বেশি লাগবে না।



কাগজপত্র বানিয়ে বেরোতে বেরোতে প্রায় দশটার কাছাকাছি। রোদ চিড়বিড় রাস্তা। চারপাশ ধুধু। গরম পাথর। অনেক অনেক দূরে পাহাড়ের গায়ে গায়ে ঝুলনে সাজানো ঘরবাড়ি। ধাপ কেটে কেটে তৈরি ক্ষেত। মানুষের খুব একটা পাত্তা নেই। যদিও পিণ্ডারি-কাফনির কারণে ট্রেকারদের কাছে এটি পপুলার পথ – কিন্তু রাস্তা ধসের জন্যে অনেকেই প্রোগ্রাম ক্যানসেল করেছে। আমরা সাতজনও, দক্ষতা আর ফিটনেসের তারতম্যে, বেশ এগিয়ে পিছিয়ে গেছি। একদম পেছনে অরিজিৎদা ও চন্দ্রানীর সঙ্গে হাঁটছি আমি। একদম ধীরেসুস্থে। ঘাম এবং খিদে – দুটোই বাড়ছে। পকেটের চকলেট আমসত্ত্ব বাদামচিট কাঁহাতক চেবানো যায়! মাঝে মাঝে ঘণ্টার ধাতব আওয়াজে উৎসুক হচ্ছি। মনে হচ্ছে, হয়ত কোনও মালবাহী খচ্চর আসছে। সঙ্গে থাকবে তার পালক। হোক না ভিনভাষী, তবু মানুষের দ্যাখা পাওয়া যাবে তো! হা হতোস্মি, এ যে নিচের খাদে হেলতে দুলতে গলা নাড়িয়ে ঘাস চিবুচ্ছে একটা গরু। সত্যি, ঘণ্টার কি মায়া! কিন্তু আমরা এমতভাব একেবারেই কেউ কাউকে জানাচ্ছি না – পাছে সঙ্গীর মনোভাব দুর্বল হয়ে যায়! অরিজিৎদা তাই তারস্বরে ‘ঋত্বিক ঘটক কতটা স্মরণীয়’ বোঝাচ্ছে। আমি জানাচ্ছি বেদব্রত পাইনের নাসা ছেড়ে ফিল্মমেকার হওয়ার কাহিনি। জাগতিক গল্পে চন্দ্রানীর খুব একটা হুঁশ নেই। নরম দুলের মত বেগুনি ঘাসফুল আবিষ্কারে সে ব্যস্ত। খিদের চোটে মুখ থেকে যখন ‘হুঁ হাঁ’ ব্যতীত বাক্য সরছে না, তখন দেখি, ভেঙে-পড়া একটি ব্রিজের গায়ে বসে আছে বলওন্তজি আর গৌতমদা। স্যাক থেকে ছাতু চিনি বের করে স্বর্গীয় শরবৎ খাওয়াল গৌতমদা। প্রত্যেকের ফুরিয়ে-আসা বোতল নিয়ে নিচের ঝর্ণা থেকে জল ভরে আনল বলওন্তজি। আমরা আবার এগিয়ে চললাম।



রাস্তায় দুটো চা-দোকান পাওয়া গ্যালো। দুটিতেই চা-বিস্কুট-নমকিন হল। বিকেল তিনটে নাগাদ মরিয়া হয়ে বলওন্তজিকে শুধালাম ‘আর ঠিক কতটা?’ সামনের পাহাড়ের মাথায় উড়ন্ত এক মেঘের গোলা দেখিয়ে সে জানাল, আমাদের গন্তব্য ওইখানেই। এরপর আরও বারদুই জিগ্যেস করে দেখলাম, প্রতিবারই সে মেঘ দ্যাখায় এবং প্রাকৃতিক কারণেই মেঘের স্থান পরিবর্তন হয়ে যায়। বাধ্য হলাম হাল ছাড়তে। বরং সামনের আদিগন্ত ঢালু ঘাসজমিতে (যাকে বুগিয়াল বলে) বসে পড়াই শ্রেয়। ওপরের আকাশটাকে কেউ যেন উজালা ঢেলে ধুয়ে দিয়েছে। হাতে একটা আঁকশি থাকলে খানকয় মেঘ পেড়ে ফ্যালা যেত। দার্শনিক হতে হতে অরিজিৎদা প্রায় ঘুমিয়ে পড়ছিল। তাই গা ঝেড়ে আবার চলা শুরু। সূর্যের ক্ষাত্রধর্ম ততক্ষণে বেশ প্রশমিত। পৌঁছলাম ধাকুরি টপ। প্রচুর ঘণ্টা ও মানতের লাল কাপড় টাঙানো একটি ছোট মন্দির, যার ভেতরে কোনও মূর্তি নেই। বাঁদিকের রাস্তায় আরও দু কিমি উঠলে স্থানীয় দেবী চিলঠা মাঈ-এর মন্দির। শুনলাম, সকালের দিকে আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে ওখান থেকে পাওয়া যায় প্রায় সমস্ত কুমায়নি শিখরের ভিউ। ডানদিকে চোখ পড়তেই দ্যাখা গ্যালো দূরের বালজোয়ারি, পানোয়ালি দ্বার, মাইকতলি আর নন্দাকোটের জিরো পয়েন্টে বরফ পড়ছে। ধকধকে সাদা হয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে। আঃ, যেন সব শ্রম মুছে যাচ্ছে। একমাত্র এই পাহাড়ের রূপ দেখলে বোঝা যায় – নিজেকে শান্ত রেখেও কি করে উঁচু থাকা যায়!



এবার ডানদিকের ঢলানে এক কিমি নেমে পৌঁছব ধাকুরি। বাপি, বাবাই ও শীর্ষেন্দু সেখানে আগেই পৌঁছে ভাড়া নিয়েছে পিডব্লুডি বাংলোর একটি ঘর। বিশাল ঘর, তিনখানা খাট, স্পেসিয়াস বাথরুম, সামনে ও পেছনে চওড়া বারান্দা। ভাড়া দিনপিছু একশ কুড়ি টাকা। শীর্ষেন্দু তাড়াতাড়ি সকলকে ডবল ডিমের অমলেট চা খাইয়ে দিল। আর নিজে লেগে পড়ল ডিনারের জোগাড়ে। সন্ধ্যে নেমে এসেছে। লাইট নেই। ভরসা কেরোসিন-ল্যাম্প মোমবাতি বা নিজের টর্চ। সামনের ভ্যালিটা সম্পূর্ণ খোলা। এখানে চারপাশে গাছপালাও বেশি। ওপরের দিকে তুষারপাতের ফলে জাঁকিয়ে এল ঠাণ্ডা হাওয়া। আমরা ঘরে দরজা ভেজিয়ে। আর শীর্ষেন্দু একাই বাইরের ঠাণ্ডায় কাঠের উনুনে বানিয়ে চলল খিচুড়ি ডিমসেদ্ধ। এদিকে সারাদিনের অনিয়ম অনাহার চড়াইয়ের ধকলের পর হঠাৎ ঠাণ্ডায় চন্দ্রানীর শুরু হল বমি পেটব্যথা। শরীরের তাপ নেমে যেতে লাগল। আমাদের সঙ্গে নিয়ে আসা ট্যাবলেটেও কোনও সুরাহা হল না। অনেক চেষ্টাতেও রাতে তাকে কিছুই খাওয়ানো গ্যালো না।

(ক্রমশ)

147 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: dd

Re: রূপ-রুবারু (২)

চিন্তায় থাকলাম।

চন্দ্রানীর এরম একটা সঙীন অবস্থায় টই থেমে গ্যালো। ডবোল ডিমের মামলেট থেকেই বোধয় এসব শুরু।
Avatar: k

Re: রূপ-রুবারু (২)

নেভার, মানে কক্ষনো না।
ডবোল ডিমের মামলেট একটি স্বর্গীয় জিনিষ, অমৃততুল্য। তার থেকে কারো এরকম সঙীন অবস্থা হতেই পারে না।

বরং অরিজিত্দার বিলোনো ওই বিষাক্ত লজেন্সগুলোকেই চন্দ্রানীদেবীর এইরূপ অবস্থার জন্য অক্লেশে দায়ী করা যায়।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন