Abhishek Mukherjee RSS feed

Abhishek Mukherjeeএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • দক্ষিণের কড়চা
    গরু বাগদির মর্মরহস্য➡️মাঝে কেবল একটি একক বাঁশের সাঁকো। তার দোসর আরেকটি ধরার বাঁশ লম্বালম্বি। সাঁকোর নিচে অতিদূর জ্বরের মতো পাতলা একটি খাল নিজের গায়ে কচুরিপানার চাদর জড়িয়ে রুগ্ন বহুকাল। খালটি জলনিকাশির। ঘোর বর্ষায় ফুলে ফেঁপে ওঠে পচা লাশের মতো। যেহেতু এই ...
  • বাংলায় এনআরসি ?
    বাংলায় শেষমেস এনআরসি হবে, না হবে না, জানি না। তবে গ্রামের সাধারণ নিরক্ষর মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আজ ব্লক অফিসে গেছিলাম। দেখে তাজ্জব! এত এত মানু্ষের রেশন কার্ডে ভুল! কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানলাম প্রায় সবার ভোটারেও ভুল। সব আইকার্ড নির্ভুল আছে এমন ...
  • যান্ত্রিক বিপিন
    (১)বিপিন বাবু সোদপুর থেকে ডি এন ৪৬ ধরবেন। প্রতিদিন’ই ধরেন। গত তিন-চার বছর ধরে এটাই বিপিন’বাবুর অফিস যাওয়ার রুট। হিতাচি এসি কোম্পানীর সিনিয়র টেকনিশিয়ন, বয়েস আটান্ন। এত বেশী বয়েসে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এসি সার্ভিসিং করা, ইন্সটল করা একটু চাপ।ভুল বললাম, অনেকটাই চাপ। ...
  • কাইট রানার ও তার বাপের গল্প
    গত তিন বছর ধরে ছেলের খুব ঘুড়ি ওড়ানোর শখ। গত দুবার আমাকে দিয়ে ঘুড়ি লাটাই কিনিয়েছে কিন্তু ওড়াতে পারেনা - কায়দা করার আগেই ঘুড়ি ছিঁড়ে যায়। গত বছর আমাকে নিয়ে ছাদে গেছিল কিন্তু এই ব্যপারে আমিও তথৈবচ - ছোটবেলায় মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল ঘুড়ি ওড়ানো "বদ ছেলে" দের ...
  • কুচু-মনা উপাখ্যান
    ১৯৮৩ সনের মাঝামাঝি অকস্মাৎ আমাদের বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ(ক) শ্রেণী দুই দলে বিভক্ত হইয়া গেল।এতদিন ক্লাসে নিরঙ্কুশ তথা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করিয়া ছিল কুচু। কুচুর ভাল নাম কচ কুমার অধিকারী। সে ক্লাসে স্বীয় মহিমায় প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করিয়াছিল। একটি গান অবিকল ...
  • 'আইনি পথে' অর্জিত অধিকার হরণ
    ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম ও কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে, দীর্ঘসংগ্রামে অর্জিত অধিকার সমূহকে মোদী সরকার হরণ করছে— আলোচনা করলেন রতন গায়েন। দেশে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি লাগু হওয়ার পর থেকেই দক্ষিণপন্থার সুদিন সূচিত হয়েছে। তথাপি ১৯৯০-২০১৪-র মধ্যবর্তী সময়ে ...
  • সম্পাদকীয়-- অর্থনৈতিক সংকটের স্বরূপ
    মোদীর সিংহগর্জন আর অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতাকে চাপা দিয়ে রাখতে পারছে না। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে ভারতের অর্থনীতি সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। সংকট কতটা গভীর সেটা তার স্বীকারোক্তিতে ধরা পড়েনি। ধরা পড়েনি এই নির্মম ...
  • কাশ্মীরি পন্ডিত বিতাড়নঃ মিথ, ইতিহাস ও রাজনীতি
    কাশ্মীরে ডোগরা রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর তাদের আত্মীয় পরিজনেরা কাশ্মীর উপত্যকায় বসতি শুরু করে। কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মানুষেরাও ছিলেন। এরা শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেনি। দেশভাগের পরেও এদের ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে পড়াশোনা করেছে। অন্যদিকে ...
  • নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ
    "তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে ?আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে ..."সেই অক্ষরগুলোকে ধরার আরেকটা অক্ষম চেষ্টা, আমার নতুন লেখায় ... এক বন্ধু অনেকদিন আগে বলেছিলো, 'আঙ্গুলের গভীর বন্দর থেকে যে নৌকোগুলো ছাড়ে সেগুলো ঠিক-ই গন্তব্যে পৌঁছে যায়' ...
  • খানাকুল - ২
    [এর আগে - https://www.guruchan...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ডিটেক্‌টিভ বেওমকেশ বাকশি! (স্পয়লর আছে)

Abhishek Mukherjee

বেওমকেশ বাকশির সহিত আমার প্রথম পরিচয় হইয়াছিল বোধকরি বিশ্ববিদ্যালয়ের কমনরূমে।

পয়সার আমার টানাটানি থাকার কথা ছিল না, কিন্তু পিতৃদেব যে শুধু দ্বিতীয়বার দার পরিগ্রহ করিলেন তাহাই নহে, উপরন্তু চাকরি হইতে বিতাড়িত হইলেন। তিনি ঠিক কী করিতেন জানা নাই, কিন্তু শুনিয়াছি আফিম-কোকেন জাতীয় নিষিদ্ধ বস্তু লইয়া নানাবিধ পরীক্ষানিরীক্ষা করিতেন।

স্থির করিয়াছিলাম, কৌমার্যব্রত অবলম্বন করিয়া সাহিত্যচর্চায় জীবন অতিবাহিত করিব, কিন্তু সে গুড়ে বালুকাকণা। পিতৃদেব একদিন বেবাক নিরুদ্দেশ হইলেন।

কিন্তু ও কথা যাক্‌। এই কাহিনী বেওমকেশের। বেওমকেশ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র। শুনিয়াছিলাম সে অতিশয় বুদ্ধিমান্‌। কীভাবে, কেন এই সুনাম তাহার জুটিয়াছিল, ইতিহাস তাহা মনে রাখে নাই। কিন্তু জানিতাম, সে বুদ্ধিমান্‌, তাই আচমকা তাহার শরণাপন্ন হইলাম।

বেওমকেশ মহা খলিফা ছেলে। সে কোনওরূপ সহানুভূতিজ্ঞাপক কথা তো কহিলই না, উপরন্তু বুঝাইতে বসিল পিতৃদেব কীভাবে নিরুদ্দিষ্ট হইয়া থাকিতে পারেন। আমি বরাবরের রগচটা, যুক্তির ধার ধারি না, ধাঁই করিয়া মুষ্ট্যাঘাত করিলাম।

ব্যাস্‌, অমনি বেওমকেশ কফিহাউসে গিয়া চা আর আলুভাজা খাইতে বসিয়া গেল। তাহার পর কোনওরূপ ভণিতা ছাড়াই একদিন বেওমকেশ আর আমার বাক্যালাপের পুনরায় সূচনা ঘটিল।

বেওমকেশের জীবনে ইতিপূর্বে লীলার রূপ ধারণ করিয়া মদনদেব আবির্ভূত হইয়াছিলেন, কিন্তু মদনদেবের লীলা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নহে। লীলা বেওমকেশকে পত্রপাঠ লেঙ্গি মারিয়া কোন্‌ এক গোল্ড মেডালিস্টকে বিবাহ করিল।

সেই শুরু। তাহার পর হইতে বেওমকেশ জেমস বন্ডের ভাষায় কথা বলে। আমাকে সে নাম বলিল, “বাকশি। বেওমকেশ বাকশি।”

চমৎকৃত হইলাম। সন ১৯৪৩। সিনেমা দূর অস্ত, ফ্লেমিংসাহেব বন্ডকাহিনী লিপিবদ্ধ করিতেও শুরু করেন নাই। কলিকাতা শহরে নাম বলিবার এইরূপ পদ্ধতি অভূতপূর্ব। আমিও বলিলাম, “ব্যান্ডো। আজিট্‌ ব্যান্ডো।”

অবিলম্বে মিত্রতার সূচনা হইল। যাহাকে ইংরেজিতে বলে বন্ড।

***

বেওমকেশ অবিলম্বে এক মেসে গিয়া উপস্থিত হইল। মেসের মালিক এবং ম্যানেজার অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি। বেওমকেশ পুনরায় নাম বলিল, “বাকশি। বেওমকেশ বাকশি।”

জনৈক ব্যক্তির পায়ে সম্ভবতঃ গুলি লাগিয়াছিল, ম্যানেজারসাহেব ‘এমন-তো-হইয়াই-থাকে’ গোছের মুখ করিয়া বলিলেন, “গুহা। আনুকুল গুহা।” বেওমকেশ পত্রপাঠ মেস-গুহায় প্রবেশ করিল।

গুহামানব মেসের অন্যান্য বাসিন্দাদের সহিত আলাপ করাইয়া দিলেন। বেওমকেশের পাশে এক চীনেম্যান, তাহার নাম কানাই। নির্ঘাত লুকাইয়া আরশোলা খায়।

আমার পাশের ভদ্রলোকের নাম প্রফুল্ল রায়, বীমা কোম্পানির এজেন্ট। আমি স্তম্ভিত হইয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “সে কী, আপনার তো গ্রামোফোন-পিন ঘটনার আগে আসার কথা নয়!”

প্রফুল্ল রায় হাসিল। এক একজন লোক আছে, তাহাদের মুখ দেখিতে বেশ সুশ্রী, কিন্তু হাসিলেই মুখের চেহারা বদলাইয়া যায়। দেখিলাম, প্রফুল্ল রায়েরও তাহাই হইল। জিজ্ঞাসা করিলাম, “আপনি কি অতিরিক্ত পান খান?”

প্রফুল্ল রায় ফিসফিস করিয়া বলিল, “খাই, তবে ব্যোমকেশের গল্পে।”

“অর্থাৎ?”

“অর্থাৎ, বুঝ লোক জান যে সন্ধান।”

বুঝিলাম। যেখানে প্রফুল্ল রায় সেখানেই পান। ব্যোমকেশের কাহিনীতে সে পান খাইত। বেওমকেশের কাহিনীতেও পানের মুখ্য ভূমিকা অবশ্যম্ভাবী।

পরিস্থিতি অনুকূল দেখিয়া গুহাবাবুকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “এত যে খাওয়াইতেছেন, এ তো ১৯৪৩ সন! মন্বন্তর না? চাল বাড়ন্ত, কলকাতার চাল আসছে বর্মা থেকে, দাম আকাশছোঁয়া, রাস্তাঘাটে মানুষ সামান্য ফ্যানের জন্য হাহাকার করছে...”

গুহাবাবু স্মিত হাসিলেন। “এই তো হেঁটে এলেন, একটাও বুভুক্ষু মানুষ দেখতে পেলেন? ওসব ইতিহাসে হয়েছিল। বেওমকেশের গল্পের ব্যাপারই আলাদা।”

মানিতে বাধ্য হইলাম। ভৃত্য আরেক দফা ভাত দিয়া গেল। লক্ষ্য করিলাম, সে অতিশয় ক্ষীণজীবী, হাত ঠকঠক করিয়া কাঁপিতেছে।

নাম জিজ্ঞাসা করিলাম। পুঁটিরাম। তাহার ঐ এক অসুখ, হাত স্থির হয় না।

***

পরদিন সকালে বেওমকেশ গঙ্গার ধারে আসিয়াছিল, জনৈকা মহিলা কস্ট্যুম পরিয়া গঙ্গায় ঝাঁপ দিলেন। আমি বলিতে গেলাম, ১৯৪৩, গঙ্গায় মড়া ভাসিতেছে... কিন্তু দেখিলাম, তাহার চিহ্নমাত্র নাই।

ভাবিলাম, বেওমকেশের কাহিনীতে সবই সম্ভব। জিজ্ঞাসা করিলাম, “বেওমকেশ? ইনি কে? ইনি কি গুপ্তচর?”

বেওমকেশ হাসিল। “নাঃ। মনে হয় ইনি মাতাহারি হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু হয়ে উঠতে পারেন নি। এঁর নাম আঙুরীদেবী, ইনি অভিনেত্রী।”

“আঙুরীদেবী?”

“আঙুর শুনেছ তো?১৯৪৩ মানে টালিগঞ্জের আদিযুগ। ইনি স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়। মনে করে দেখো, ইনি কদলীবালা নামেও অভিনয় করেছেন।”

“কিন্তু বেওমকেশ... স্বস্তিকা... আঙুর...”

“তুমি একটা ইয়ে। এখন না দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে? নাৎসীদের চিহ্ন কী?”

মুহূর্তমধ্যে দিব্যদৃষ্টি লাভ করিলাম।

আঙুরীদেবী অতিশয় লাস্যময়ী মহিলা। ইতিমধ্যে সত্যবতীর আবির্ভাব ঘটিয়াছে। সত্যবতী সেলাই করে এরূপ প্রমাণ পাই নাই, কাজে থিম্বল-সংক্রান্ত জটিলতা নাই। মেডিকাল বইয়ের লাল পেন্সিলের দাগের প্রশ্নই ওঠে না, কারণ সুকুমার এখানে স্বাধীনতা-সংগ্রামী।

আঙুরীদেবী জিজ্ঞাসা করিলেন, “বেওমকেশবাবু, আপনি কি ব্যক্তিগত প্রপার্টিতে ঢুকে থাকেন?”

বেওমকেশ অদম্য। “কোথাও তো লেখা ছিল না যে প্রপার্টি আপনার ব্যক্তিগত।”

আঙুরীদেবী হাসিয়া উঠিলেন। “আপনার বেডরূমের বাইরেও তো লেখা থাকে না যে ব্যক্তিগত, আমি কি ঢুকি?”

অকাট্য যুক্তি। অবিলম্বে প্রস্থান করিলাম।

***

আঙুরীদেবী বাথটবে শুইয়া ছিলেন। আকণ্ঠ সাবানের ফেনা, তাহার উপরে দুগ্ধফেননিভ মসৃণ ত্বক। বোম্বাইয়ের ভবিষ্যৎ নায়িকাকুল লাক্স মাখিয়া এইরূপ স্নান করিয়া বিখ্যাত হইবেন। অপরূপ সে লাক্সারি।

বেওমকেশ প্রবেশ করিয়া মূঢ়বৎ দাঁড়াইয়া রহিল, অতঃপর চক্ষু নামাইয়া নিল। আঙুরীদেবী বলিলেন, “নারীর জীবনে স্নানের থেকেও ব্যক্তিগত কী, জানেন?”

বেওমকেশ জীবনে এইরূপ প্রশ্নের সম্মুখীন হয় নাই, নির্বাক চক্ষে আঙুরীদেবীর নিরাবরণ কণ্ঠদেশ পর্যবেক্ষণ করিতে লাগিল।

“ব্যাগ। আপনি আমার ব্যাগ ঘেঁটেছেন, এরপর স্নানের সময় আপনি থাকুন-না থাকুন, আমার কিছু যায় আসে না।”

এহেন যুক্তির বেড়াজালে পরাজিত হইয়া বেওমকেশ পত্রপাঠ প্রস্থান করিল।

***

ইতিমধ্যে নানাবিধ ঘটনা ঘটিতেছিল। গুহাবাবু ও বেওমকেশ কারখানার তালা ভাঙিতে গিয়া বিহারী দরোয়ানের হাতে ধরা পড়িলেন। বেওমকেশ গুহাবাবুকে বলিল ইংরেজি বলিতে, তিনিও প্যারী সরকারের ফার্স্টবুক ভুলিয়া “মেরি হ্যাড্‌ আ লিট্‌ল্‌ ল্যাম্‌” আবৃত্তি করিতে লাগিলেন।

কারখানায় পিতৃদেবের মৃতদেহ আবিষ্কার হইল; তাহার পর মানুষ টপাটপ্‌ খুন হইতে লাগিল। ওয়াটানাবে নামক জাপানী দন্তচিকিৎসকের চেম্বার গিয়া শুনিলাম মধ্যাহ্নভোজনের পর তাঁহার চিকিৎসায় রুচি থাকে না; তখন তিনি জাপানী ভাষার ক্লাস নেন।

শুনিয়াছিলাম পুরাতন কলিকাতার অধিকাংশ দন্তচিকিৎসক চীনদেশোৎপন্ন ছিলেন। জাপানদেশীয় ভদ্রলোকের এইরূপ দ্বিবিধ কার্যকলাপ শুনিয়া বিস্মিত হইলাম। ভক্তি আরও বাড়িয়া গেল, যখন ওয়াটানাবে বেওমকেশের উপর ক্যারাটের প্যাঁচ কষাইলেন।

ফিরিয়া আসিয়া বেওমকেশ কহিল, “আই অ্যাম আ মোরন।”

১৯৪৩এর কলিকাতায় এইরূপ ভাষা শুনিতে আমি অভ্যস্ত ছিলাম না। “বেওমকেশ, মোরন মানে কী?”

“মোরন মানে জানো না? মোরনদশা!”

মোরন ইত্যাদি বলিয়া বেওমকেশের বায়ু কুপিত হইল, পেটের রোগ দেখা দিল। সত্যবতী মেসে উপস্থিত হইল, কিন্তু তাহা নিতান্তই সমাপতন। সে আসিয়াই বেওমকেশের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করিতে ব্যগ্র হইয়া উঠিল, আর বেওমকেশকে বলিল, সুকুমারকে বাঁচাইতে পারিলে বেওমকেশ যাহা চাহিবে, সে তাহাই দিবে।

সত্যবতী যাইবার পর বেওমকেশকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “ঘর অন্ধকার করে রেখেছিলে কেন?”

“একে নোয়ার এফেক্ট বলে। তুমি বুঝবে না। এখানে দরকার ছিল না, কিন্তু তাও এটা দেওয়াটা স্টাইল।”

অগত্যা চুপ করিলাম। সেই রাত্রে বেওমকেশ হেরোইন খাইয়া চুন-খয়ের দিয়া দেওয়ালে শিল্পকর্ম সম্পন্ন করিল। পরদিন সে এক কেমিক্যাল ল্যাবরেটরিতে উপস্থিত হইয়া লীলার স্বামীর সন্ধান করিল। ভাবিলাম বেওমকেশ তাহাকে উত্তমমধ্যম দিবে, কিন্তু সে রক্তপরীক্ষা করাইয়া প্রস্থান করিল।

শীঘ্রই বেওমকেশ আক্রান্ত হইল। আমি সকলকে উত্তমমধ্যম দিলাম (আজিট ব্যান্ডো অত্যন্ত বলবান্‌ ব্যক্তি), কিন্তু জানিতে পারিলাম এই ঘটনার হোতা স্বয়ং ডেপুটি কমিশনার উইল্কি। যাবতীয় পরিশ্রম জলে যাইল, লাভের মধ্যে জানিতে পারিলাম আমাদের মেসের চীনেম্যান স্বয়ং পুলিশ কর্মচারী।

***

অতঃপর শেষ দৃশ্য। বেওমকেশ কাহিনী বলিল সকলকে। গুহাবাবু হাসিতে লাগিলেন। ভাবিলাম, তাহার হাঁপানির টান উঠিয়াছে, কিন্তু এ সত্যই হাসি।

গুহাবাবু এক হেরোইন পাচারকারী; জাপানীদের সঙ্গে হাত মিলাইয়া তিনি কলিকাতা দখল করিতে চান। এই মন্বন্তরের বাজারে কলিকাতা দখল করিলে জাপানীদের আদৌ লাভ হইবে কিনা তাহা ভাবিতে বসিলাম, কিন্তু উপলব্ধি করিলাম বেওমকেশের কাহিনীতে অন্নাভাব হয় না।

জানিতে পারিলাম আঙুরীদেবীর প্রকৃত নাম ইয়াসমিন; তিনি একজন গুপ্তচর (মাতাহারি হইবার শখ ছিল কিনা তাহা অজানাই রহিয়া গেল) এবং গুহাবাবুর প্রেমিকা। রেঙ্গুনে তাঁহাদের প্রেমের সূচনা ঘটিয়াছিল। গুহাবাবুর প্রকৃত নাম ইয়ুং গন। রেঙ্গুনের নাম যে পরবর্তীকালে ইয়ঙ্গন হয়, তাহা সম্ভতঃ ইয়ুং গনের নামেই।

ইয়াসমিন গুলি চালাইল, কিন্তু ইয়ুং গন অজর অমর অদাহ্য। তিনি শুধু যে অক্ষত রহিলেন তাহাই নহে, ছুরিকাঘাতে প্রেমিকাকে হত্যা করিলেন। অতঃপর সাইরেন বাজিতে লাগিল ও দুর্ধর্ষ অন্ধ চৈনিক দস্যু দলবল লইয়া আসিয়া পড়িল ও ইয়ুন গংকে লইয়া প্রস্থান করিল।

পরদিন প্রভাত। বসন্ত পঞ্চমী। আমি বাগ্‌দেবীর পূজারী, কিন্তু সরস্বতী পূজার ব্যাপারে আমার বিশেষ আগ্রহ নাই। পুঁটিরামকে চা করিতে বলিলাম, আর মুগ্ধদৃষ্টিতে দেখিলাম, সুকুমারের প্রাণরক্ষার বিনিময়ে বেওমকেশ সত্যবতীকে বিবাহ করিতে চায়।

দুর্ধর্ষ চৈনিক দস্যুদের হত্যা করিয়া অন্যত্র ইয়ুন গং বেওমকেশের উপর প্রতিশোধ লইতে বদ্ধপরিকর হইলেন। বেওমকেশ তাহা জানিতেও পারিল না।


যেমন আমি জানিতে পারিলাম না, বেওমকেশ কেন জানিতে চাহিয়াছিল, আমি তাহার অপেক্ষা জ্যেষ্ঠ না কনিষ্ঠ। “অর্থমনর্থম্‌”এ একটা ব্যাখ্যা ছিল বটে, কিন্তু বেওমকেশ তাহার ধার ধারে নাই।

***

উড়ন্ত বেওমকেশের দুরন্ত ছায়াছবির এখানেই পরিসমাপ্তি।

680 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 7 -- 26
Avatar: ম

Re: ডিটেক্‌টিভ বেওমকেশ বাকশি! (স্পয়লর আছে)

চমৎকারঃ)))
শজারুর কাঁটা নিয়েও একটা রিভিউ লেখার দাবী রইলো।
Avatar: I

Re: ডিটেক্‌টিভ বেওমকেশ বাকশি! (স্পয়লর আছে)

ফাটাফাটি! হায় হায়, ফিল্মটা দেখি নি !
Avatar: ঋজু গাঙ্গুলি

Re: ডিটেক্‌টিভ বেওমকেশ বাকশি! (স্পয়লর আছে)

অনবদ্য রিভিউ। বাজারি "আহা-উঁহু" এবং ফেসবুকে কিছু অতিবিপ্লবীর কড়াপাক আস্ফালন দেখে সিনেমাটা দেখার বাসনা জাগলেও সেই ধুনকিটা কেটে গেল এই লেখা পড়ে। থ্যাংকু।
Avatar: Tim

Re: ডিটেক্‌টিভ বেওমকেশ বাকশি! (স্পয়লর আছে)

এটা গোলা হয়েছে, ভেবেছিলাম সিনেমাটা দেখে নিয়ে পড়বো, তবু পড়েই ফেল্লাম। ঃ-)
Avatar: s

Re: ডিটেক্‌টিভ বেওমকেশ বাকশি! (স্পয়লর আছে)

ব্যাপক ঃ-)
ব্যোমকেশ নিয়ে যেই সিনেমা করতে গেছে সেই ছড়িয়ে লাট করেছে, সেই লিস্টিটে রায়মশাই, চাটুজ্জ্যেবাবু, দত্তদা, ঘোষবাবু, বাঁড়ুজ্জ্যেবাবু সব আছে।
Avatar: lcm

Re: ডিটেক্‌টিভ বেওমকেশ বাকশি! (স্পয়লর আছে)

হা হা!
সিনেমাটা দেখতে হচ্ছে
Avatar: san

Re: ডিটেক্‌টিভ বেওমকেশ বাকশি! (স্পয়লর আছে)

ভয়ে সিনেমাটা দেখার আগে পড়ছিলাম না :-D দুর্দান্ত হয়েছে !
তবে সিনেমাটা না দেখলে একটা দারুণ কান্ড ( কান্ডই বটে) মিস করতাম ।
Avatar: S

Re: ডিটেক্‌টিভ বেওমকেশ বাকশি! (স্পয়লর আছে)

"YOU GET TO KNOW THE REAL VALUE OF A FILM AFTER SIX MONTHS," SAID DIBAKAR

http://movies.ndtv.com/bollywood/dibakar-banerjee-trying-to-change-the
-taste-of-movie-watching-public-753522


তার মানে সিনেমা ফ্লপ করেছে।
Avatar: aka

Re: ডিটেক্‌টিভ বেওমকেশ বাকশি! (স্পয়লর আছে)

খাসা রিভিউ, সিনেমাটা দেখতেই হচ্ছে। ঃ)
Avatar: দ

Re: ডিটেক্‌টিভ বেওমকেশ বাকশি! (স্পয়লর আছে)

দারুণ।

হ্যালো হ্যালো মাইক টেস্টিং ..... ২ ও ৩ নং মন্তব্যের মালিককে ভাটিয়া৯তে ডাকা হচ্ছে। ভাটে একটু কীবোর্ডের ধুলো দেবেন স্যার।
Avatar: একক

Re: ডিটেক্‌টিভ বেওমকেশ বাকশি! (স্পয়লর আছে)

অভিষেক আবার একটা চরম নোংরা পিস নাবিয়েচে :D :D :D
Avatar: T

Re: ডিটেক্‌টিভ বেওমকেশ বাকশি! (স্পয়লর আছে)

খিকজ...কাল দেকেছি...মানে লাস্ট আধঘন্টা আর দেখিনি...রিভিউটা অসা হইয়াছে...
Avatar: Nina

Re: ডিটেক্‌টিভ বেওমকেশ বাকশি! (স্পয়লর আছে)

এক ঘর উইথ দক্ষিণ্দিক খোলাঃ-)))
Avatar: সিকি

Re: ডিটেক্‌টিভ বেওমকেশ বাকশি! (স্পয়লর আছে)

:-)))
Avatar: anandaB

Re: ডিটেক্‌টিভ বেওমকেশ বাকশি! (স্পয়লর আছে)

আমার একটাই আশংকা, দিবাকর বাবু না আবার এটার সীকযেল বানিয়ে ফেলেন কয়েক বছর বাদে, সেখানে হয়ত চোরাবালির জমিদার কে দিয়ে মেঘরাজ-কে খুন করিয়ে দেবেন, মেদিনীর সাথে ইয়ে ধরা পড়ে যাবার ভয়ে

imdb -এর রেটিং দেখলাম ৮ দশমিক তিন - কারা যে এসব রেট্ করে ভগাই জানে
Avatar: শঙ্খ

Re: ডিটেক্‌টিভ বেওমকেশ বাকশি! (স্পয়লর আছে)

ফাটাফাটি অভিষেক!! অবিশ্যি অভিষেকের লেখা বরাবরই ভালো লাগে।
Avatar: মৌ

Re: ডিটেক্‌টিভ বেওমকেশ বাকশি! (স্পয়লর আছে)

চুপি চুপি বলি, এই রিভিউটা আগেই পড়েছিলাম, কিছু বলার ছিল না ফ্যাক ফ্যাক করে হেসে গেছিলাম। সে সমস্ত বন্ধুরা সিনেমাটা দেখার জন্য প্ল্যান করছিলো তাদের লেখাটা ই-মেইল করেদি। আমি ঠিক করেছিলাম দেখবো না, টোরেন্ট থেকে নামাবো। কিন্তু কপাল খারাপ, বিটকেল বন্ধুদের কে কবে পাশ কাঁটাতে পেরেছে! ফাঁদে পড়ে চলে গেলাম। ভাগ্যিস গেলাম। তিনটে শরদিন্দুর গল্পের অংশ নিয়ে দিবাকরের ব্যোমকেশ দারুণ লাগলো। ৪০শের কলকাতার সাথে ব্যাকগ্রাউন্ডে রক মিউজিক একটা ঘোরের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। ব্যোমকেশকে নিয়ে বা ব্যোমকেশ চরিত্র নিয়ে যত সিনেমা বা সিরিয়াল হয়ছে তার ভিতরে এই সিনেমাটা আমার কাছে বেস্ট। তবে ব্যোমকেশ হিসাবে রাজিত কাপুর এখনও প্রথম।
এই রকম আর্ট, ডিরেকশান, সিনেম্যাটগ্রাফির ছোঁয়া যদি থাকে তালে প্রচণ্ডভাবে চাই এই সিনেমার সিকুয়েল হোক।
৭০ ছুঁই ছুঁই ব্যোমকেশ ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় শজারুর কাঁটা নিয়ে একটা রিভিউ নামুক। :P
Avatar: Biplob Rahman

Re: ডিটেক্‌টিভ বেওমকেশ বাকশি! (স্পয়লর আছে)

জট্টিল! হাস্তেইয়াছি, হাস্তেইয়াছি =))
Avatar: de

Re: ডিটেক্‌টিভ বেওমকেশ বাকশি! (স্পয়লর আছে)

সিনিমা দেখার পর রিভিউটি অতি খাসা লাগলো!
Avatar: Sayantani

Re: ডিটেক্‌টিভ বেওমকেশ বাকশি! (স্পয়লর আছে)

কত নম্বর বার পড়লাম গুনিনি-- খারাপ লেভেলের ভালো লিখেছ :P

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 7 -- 26


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন