Kaushik Ghosh RSS feed

Kaushik Ghoshএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • বিনম্র শ্রদ্ধা অজয় রায়
    একুশে পদকপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অজয় রায় (৮৪) আর নেই। সোমবার ( ৯ ডিসেম্বর) দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। অধ্যাপক অজয় দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা অসুখে ভুগছিলেন।২০১৫ ...
  • আমাদের চমৎকার বড়দা প্রসঙ্গে
    ইয়ে, স-অ-অ-অ-ব দেখছে। বড়দা সব দেখছে। বড়দা স্রেফ দেখেনি ওইখানে এক দিন রাম জন্মালেন, তার পর কারা বিদেশ থেকে এসে যেন ভেঙেটেঙে মসজিদ স্থাপন করল, কেন না বড়দা তখন ঘুমোচ্ছিলেন। ঘুম ভাঙল যখন, চোখ কচলেটচলে দেখলেন মস্ত ব্যাপার এ, বড়দা বললেন, ভেঙে ফেলো মসজিদ, জমি ...
  • ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ?
    যেকোন নারকীয় ধর্ষণের ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়ে সামনে আসার পর নাগরিক হিসাবে আমাদের একটা ঈমানি দায়িত্ব থাকে। দায়িত্বটা হল অভিযুক্ত ধর্ষকের কঠোরতম শাস্তির দাবি করা। কঠোরতম শাস্তি বলতে কারোর কাছে মৃত্যুদন্ড। কেউ একটু এগিয়ে ধর্ষকের পুরুষাঙ্গ কেটে নেওয়ার ...
  • তোমার পূজার ছলে
    বাঙালি মধ্যবিত্তের মার্জিত ও পরিশীলিত হাবভাব দেখতে বেশ লাগে। অপসংস্কৃতি নিয়ে বাঙালি চিরকাল ওয়াকিবহাল ছিল। আজও আছে। বেশ লাগে। কিন্তু, বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনার প্রবল ক্ষোভ ও অপমানে আপনার কি খুব পরিশীলিত, গঙ্গাজলে ধোওয়া আদ্যন্ত সাত্ত্বিক শব্দ মনে পড়ে? না ...
  • The Irishman
    দা আইরিশম্যান। সিনেমা প্রেমীদের জন্য মার্টিন স্করসিসের নতুন বিস্ময়। ট্যাক্সি ড্রাইভার, গুডফেলাস, ক্যাসিনো, গ্যাংস অব নিউইয়র্ক, দা অ্যাভিয়েটর, দ্য ডিপার্টেড, শাটার আইল্যান্ড, দ্য উল্ফ অব ওয়াল স্ট্রিট, সাইলেন্টের পরের জায়গা দা আইরিশম্যান। বর্তমান সময়ের ...
  • তোকে আমরা কী দিইনি?
    পূর্ণেন্দু পত্রী মশাই মার্জনা করবেন -********তোকে আমরা কী দিইনি নরেন?আগুন জ্বালিয়ে হোলি খেলবি বলে আমরা তোকে দিয়েছি এক ট্রেন ভর্তি করসেবক। দেদার মুসলমান মারবি বলে তুলে দিয়েছি পুরো গুজরাট। তোর রাজধর্ম পালন করতে ইচ্ছে করে বলে পাঠিয়ে দিয়েছি স্বয়ং আদবানীজীকে, ...
  • ইশকুল ও আর্কাদি গাইদার
    "জাহাজ আসে, বলে, ধন্যি খোকা !বিমান আসে, বলে, ধন্যি খোকা !এঞ্জিনও যায়, ধন্যি তোরে খোকা !আসে তরুণ পাইওনিয়র,সেলাম তোরে খোকা !"আরজামাস বলে একটা শহর ছিল। ছোট্ট শহর, অনেক দূরের, অন্য মহাদেশে। অনেক ছোটবেলায় চিনে ফেলেছিলাম। ভৌগোলিক দূরত্ব টের পাইনি।টের পেতে দেননি ...
  • ছন্দহীন কবিতা
    একদিন দুঃসাহসের পাখায় ভর করে,ছুঁতে চেয়েছিলাম কবিতার শরীর ।দ্বিখন্ডিত বাংলার মত কবিতা হয়ে উঠলোছন্দহীন ।অর্থহীন যাত্রার “কা কা” চিৎকারে,ছুটে এলোপ্রতিবাদী পাঠক।ছন্দভঙ্গের নায়কডানা ভেঙ্গে পড়িপুঁথি পুস্তকের এক দোকানে।আলোক প্রাপ্তির প্রত্যাশায়,যোগ ধ্যানে কেটে ...
  • হ্যালোউইনের ভূত
    হ্যালোউইন চলে গেল। আমাদের বাড়িতে হ্যালোউইনের রীতি হল মেয়েরা বন্ধুদের সঙ্গে ট্রিক-অর-ট্রিট করতে বেরোয় দল বেঁধে। পেছনে পেছনে চলে মায়েদের দল। আর আমি বাড়িতে থাকি ক্যান্ডি বিতরণ করব বলে। মুহূর্মুহূ কলিং বেল বাজে, আমি হাসি-হাসি মুখে ক্যান্ডির গামলা নিয়ে দরজা ...
  • হয়নি
    তুমি ভালবাসতে চেয়েছিলে।আমিও ।হয়নি।তুমিঅনেক দূর অব্দি চলে এসেছিলে।আমিও ।হয়নি আর পথ চলা।তুমি ফিরে গেলে,জানালে,ভালবাসতে চেয়েছিলেহয়নি। আমি জানলামচেয়ে পাইনি।হয়নি।জলভেজা চোখে ভেসে গেলআমাদের অতীত।স্মিত হেসে সামনে এসে দাঁড়ালোপথদুজনার দু টি পথ।সেপ্টেম্বর ২২, ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

একটা অসমাপ্ত গল্প (পর্ব: ৪৫-)

Kaushik Ghosh

৪৫।

গরম পড়তে শুরু করেছে। ঘরের পাখাটা না চালালে কিছুক্ষণ পরেই বিজবিজে ঘাম হতে শুরু করে। ওতে অসুবিধে হয়না রতনের। ওদের ক্যাম্পাসের তাপমাত্রা বাকি হাওড়া জেলার তাপমাত্রার চাইতে খানিকটা কম। পাশেই বোট্যানিক্যাল গার্ডেন। অন্য পাশ থেকে আসে গঙ্গার শীতল হাওয়া। তা ছাড়া কযাম্পাসের ভেতরে এত গাছ গাছালী…
গরম তেমন অনুভব হয়না।

সামনে একটা পরিক্ষা আছে। স্ট্রেঙথ অফ মেটিরিয়াল। টিমোশেঙ্কোর বইটা টেবিলের ওপরে খোলা । এনুয্যাল পরিক্ষার ঢের দেরি এখনও । পরিক্ষা নিয়ে কোনো দিন দুঃশ্চিন্তা না করলেও একটা চাপ চিরকালই ওর ওপরে কাজ করেছে। আজকাল সেই চাপটা আর অনুভব করেনা ও। সুপ্তোত্থিত মানুষের চোখ থেকে ধীরে ধীরে যেমন করে ঘুম কাটে, সেই ভাবে কলেজের একটা একটা ক্লাস টেস্ট ওর ওপর থেকে কাটিয়ে দিচ্ছে পরিক্ষার চাপ। তবে চাপ না থাকলেও প্রয়োজনীয় পড়াটা অবশ্যই করে নেয় রতন। ওটা মজ্জায় ঢুকে গেছে ওর, চাইলেও লেখাপড়ায় ঢিলে দিতে পারবে না ও।

রোজ সন্ধ্যের মতই আজও ঘরে নেই রঞ্জন । ও রাত জেগে পড়ে। রতন রাতে জাগতে পারেনা। নবদ্বীপে থাকতে রাতে ঘুমনোর সময় ঘরে আলো জ্বললে ঘুমোতে পারতো না রতন। এখন সব অভ্যেস হয়ে গেছে।

জানলা দিয়ে একটা ফুলের গন্ধ এসে নাকে লাগছে। কি ফুল কে জানে! কিন্তু গন্ধটা বেশ। একটু বাইরে গিয়ে দাঁড়াবে কি? বইটা মুড়ে রেখে ঘরের বাইরে এল রতন। হস্টেলের বেশিরভাগ ছেলেই এই সময়টায় থাকেনা। কেউ আড্ডায় কেউ বা খেলার মাঠে থাকে। হস্টেলটা প্রাণ পায় ডিনারের পরে।

আজকাল আর ফুটবল খেলতেও তেমন ইচ্ছে করেনা রতনের। পড়ার চাপ কিছু নেই, কিন্তু এমনিই ভালো লাগেনা। বালু আর রঞ্জন খুব অল্প পড়েই ভালো নম্বর পায়। ওরা জানে কি করে সিলেক্টিভ লেখাপড়া করতে হয়। রতন পারেনা। পরিক্ষার আগমন মনের ওপরে তেমন চাপ তৈরি না করলেও বেছে বেছে পড়া ওর দ্বারা হয়না। সিলেবাসে যা অছে যতটা আছে, তার সবটুকু খুঁটিয়ে না পড়লে শান্তি হয়না কিছুতেই।

ওদের হস্টেলটার পেছনে একটা ছোট্ট মাঠ আছে। ইউক্যালিপটাস গাছ দিয়ে ঘেরা। সন্দ্ধ্যের ছায়ায় মাঠটা নিঃঝুম হয়ে থাকে। মাঝে মাঝেই এখানটায় এসে বসে রতন। বেশ লাগে।

একটা গাছের পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে বসল রতন। বাইরেটায় সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে, ঘরের ভেতরের গরমটা আর অনুভূত হচ্ছেনা। মাথাটা একটু খালি করে নিয়ে আবার গিয়ে বসবে পড়তে। মায়ের চিঠি পেয়ে গত মাসে একবার নবদ্বীপ যেতে হয়েছিলো। গণেশকে নিয়ে খুব চিন্তায় ছিলো মা। মারামারি করে নবদ্বীপ ছাড়তে হয়েছে গণেশকে। রতন যেদিন নবদ্বীপে গিয়ে পৌঁছলো, সেদিন স্টেশন থেকে বাড়ি আসার পথেই বুঝেছিলো হাওয়া কতটা গরম। মলয় কুন্ডুর ছেলেরা বাদুড়তলার মোড়ে মাটিতে ফেলে পিটিয়েছে রতনকে। হয়ত মেরেই ফেলতো, কিন্তু কেউ একজন পার্টি অফিসে গিয়ে সময় মতন খবর দিয়েছিলো। মনোরঞ্জন কাকা লোকজন নিয়ে এসে বাঁচিয়েছিলেন রতন কে। তারপর যে কদিন থেকেছে নবদ্বীপে, পাড়ার বাইরে আর বের হয়নি। ফেরার দিনও মনোরঞ্জন কাকা ট্রেনে তুলে দিয়েছিলেন।

কলকাতায় গণেশ ভালোই আছে। একদিন গেছিলো রতন ক্রীক রো তে গণেশের কাছে। সবই ভালো কিন্তু গণেশকে কতদিন ওখানে থাকতে হবে তা জানা নেই। ওখানকার কমরেডরা তো বললেন অন্তত এক বছরের আগে যেন গণেশ নবদ্বীপে না ফেরে। কিন্তু এই এক বছর ওর পড়াশুনোর কি হবে? জিজ্ঞেস করা হয়নি রতনের। তবে তাতে গণেশের কোনো হেলদোল আছে বলে মনে হয়না। ও দিব্ব্যি আছে।

এবার নবদ্বীপে গিয়ে কিরনের সাথে বিশেষ কথা হয়নি। বাড়ির যা অবস্থা! গণেশকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তা তো আছেই তার ওপরে বাবার শরীরটা ভালো হচ্ছেনা কিছুতেই। ব্যবসাটা এখন পুরোপুরি মেজ জ্যাঠাই দেখাশোনা করছেন। বাবার পক্ষে কলকাতায় আসার প্রশ্নই ওঠে না। মায়ের মনের ওপরে কতটা চাপ পড়ছে তা বুঝতে পারে রতন। ওর পক্ষে এই মুহুর্তে মাকে কোনো রকম সাহায্য করা সম্ভব নয়। বি।ই পাশ করার আগে কিই বা করতে পরে ও! পাঁচ বছর! বড় লম্বা সময়।

ফুলের গন্ধটা আলাদা করে আর নাকে লাগছে না এখন। চোখ বন্ধ করে পা দুটোকে মাটির ওপরে টান করে বসল রতন। এদিক ওদিক থেকে নানান শব্দ ভেসে আসছে। কলেজে ভর্তী হওয়ার পর থেকে বেশ কয়েকবার কলকাতায় গেছে ওরা দল বেঁধে। এপার থেকে ফেরি ধরে প্রীন্সেপ ঘাট। ভারী সুন্দর জায়গা প্রীন্সেপ ঘাট। নবদ্বীপের ঘাট গুলোর মতন ভাঙ্গাচোরা আর কর্দমাক্ত নয়। অবশ্য কলকাতার বা হাওড়ার অন্য ঘাট গুলো প্রীন্সেপ ঘাটের মতন সুন্দর নয়। জেটি পেরোলেই ভীড়, কাদা আর নোংরা!

স্কলারশীপের টাকা অল্প অল্প করে বাঁচাতে শিখেছে ও। শেষ বারে কলকাতা গিয়ে আমিনিয়ার বিরিয়ানি খেয়েছে । অমৃত! মেট্রোতে সিনেমা দেখে সকলে দল বেঁধে ঢুকেছিলো আমিনিয়ায়। ইংরাজি সিনেমা – এল ডোরাডো। ওর জীবনের এক অভূতপূর্ব ঘটনা। মানুষের জীবন কতটা বিচিত্র, তা আজকাল অল্প অল্প করে বুঝতে শুরু করেছে রতন। মাস ছয়েক আগেই এই কলেজ, মেট্রো সিনেমা হ'ল বা কলকাতা শহরটা ওর কাছে ছিলো অম্পূর্ণ অজ্ঞাত; কোনো ধারনাই ছিলোনা। আজ যখন ও ধীরে ধীরে ওর নতুন জীবনটার সাথে পরিচিত হচ্ছে, ও বুঝতে পারছে একটা মানুষের জীবন চিরদিন এক থাকতে পারেনা। থাকা উচিৎও নয় - তাতে স্থবিরতা আসে।

বালুটা আজকে এখনো খোঁজ করতে এল না তো? আজকাল বালুকে ও টুকিটাকি কিনে খাওয়ায়। বড় ভালো লাগে ওর। এই মাঠটার খবর বালুই ওকে প্রথম দিয়েছিলো। তখন র্যাগিং পিরিয়ড চলছে। সিনিয়রদের হাতে বেদম হেনস্থা হওয়ার পর দুজনে এসে বসত এই মাঠটায়। তাই রতন ঘরে না থাকলেও বালু ওকে খুঁজতে প্রথমে আসবে এই মাঠটায় আর তা না হলে গঙ্গার পাড়ে। বালুর আসার হলে এতক্ষণে এখানে এসে যেত ঠিকই। একবার তবে বালুর ঘরটা থেকে ঘুরে আসা যাক।

বালুর রুমমেট অমিত। মেক্যানিক্যাল। খুব বড় বাড়ির ছেলে। রতন কে দেখে বলল, "নদে যে! আয় বোস। বালু কোথায় রে?"
-বোঝো! আমি তো ওকেই খুঁজতে এলাম।
- সে কি রে! বালুর খবর তুই জানিস না!!
হ্যা হ্যা করে খানিকটা হেসে নিল অমিত। বিড়ি খাবি? অমিত জানে রতন সিগ্রেট খায় না। এখানে সিগ্রেট বিড়ি নির্বিশেষে সবই বিড়ি।
- তা তোদের পার্টি কি বলছে রে!

অমিতের রাজনীতি তে কোনো আগ্রহ নেই। বামপন্থী রাজনীতি তে তো নয়ই। অবশ্য থাকার কথাও নয়। ওরা অন্য শ্রেণীর মানুষ। এলীট। অবশ্য রতনই বা কোন প্রোলেতারিয়েত! পেটি বুর্জুয়া হয়েও তো ওরা দুই ভাই পার্টির সাথে জড়িত। জ্যোতি বসুও তো এলীট।
হেসে বলল, আজকাল আর তেমন মিটিঙে যাই না রে! সময় হয়না।

আসলে কলকাতা শহরটা এতটাই কম চেনে রতন যে একা একা এখনো ধর্মতলা অঞ্চলে যাওয়ার সাহস জুটিয়ে উঠতে পারেনা। মিটিঙ গুলো বেশির ভাগই ওখানেই হয়। অবশ্য মিটিঙে না গেলেও খবর রাখে। পার্টি একট কগজ বের করতে শুরু করেছে। পনের দিন অন্তর একটা সংখ্যা। গণশক্তি। আর তা ছাড়া ভেতরের টুকিটাকি খবর মনোরঞ্জন কাকার কাছ থেকে এবার নবদ্বীপে গিয়ে পেয়েছে। গণেশের কাছে যখন গেছিলো, তখনো দলের এটা ওটা খবর নিয়েছে রতন। আসলে ন'কাকার মন রাখতে গিয়ে যে পার্টিটা করতে শুরু করেছিলো, সেটা ওর চিন্তনকে আবৃত করতে শুরু করেছে ওর অজান্তেই। গণেশের ওখানেই ও শুনেছে যে পার্টির ভেতরে দর্শনগত বিতর্ক শুরু হয়েছে। কোঅর্ডিনেশন কমিটি বলে কিছু একটা গঠন হতে চলেছে চারু মজুমদার, সুশীতল রায়চৌধুরি ও আরো অনেকের নেতৃত্বে। বাংলার বাইরে থেকে সত্যনারায়ন সিংহ, লক্ষণ সিংহের মতন নেতারাও থাকবেন।

পার্টি কি আবার ভাগ হবে? জিজ্ঞেস করেছিলো রতন। গণেশের সাথে একই ঘরে যে দাদাটা থাকে সে অল্প হেসে বলেছিলো, সে তো সময়ই বলবে কমরেড! এ সমস্ত কথা অমিত কে বলার মানে হয়না। বলা উচিৎ ও নয়।

পার্টি ভাঙলে কি করবে গণেশ? হঠাৎই ছোটো ভাইয়ের জন্য মনটা অস্থির হয়ে উঠল রতনের।
"আমি উঠি রে অমিত। বালু এলে একবার আমার ঘরে যেতে বলিস।"

নিজের ঘরে ঢুকে অবাক হবার পালা রতনের। বালু আর রঞ্জন নিচু গলয় কথা বলছে নিজেদের মধ্যে।

ওকে দেখে ওঠে দাঁড়ালো বালু। "নদে, একটা টেলিগ্রাম আছে রে তোর। "

টেলিগ্রামটা বালুর হাত থেকে নিল রতন। ওর নামে এই প্রথম কোনো টেলিগ্রাম এল। ধুসর হলদেটে কাগজের ওপরে সব কটা বড় হাতের ইংরাজি অক্ষর -

FATHER SERIOUSLY ILL COME SOON
৪৬।
আর কটা মাস পরেই শুরু হবে টেস্ট। হায়ার সেকেন্ডারির আগে একবার নিজেদের প্রস্তুতি দেখে নেওয়ার পরিক্ষা। আজকাল আর তাই রোজ রোজ স্কুলে যায়না শোভা। বাড়িতে পড়া গুলো ঝালিয়ে নেয়। যে কথা জীবনে কোনোদিন মনে হয়নি, তাই ইচ্ছে করে আজকাল – এবারের দুটো পরিক্ষায় রমার চাইতে বেশি নম্বর পেতে হবে। পাবেই। ও জানে। সব কটা পেপারেই ভালো মতন প্রস্তুতি হয়েছে। একদম ঝরঝরে।

সকাল থেকে পড়ছে তাই এবার একটু ওঠাই যায়। বই খাতা মুড়ে রেখে ঘরের বাইরে এল শোভা। দাদা বৌদি গোমো চলে যাওয়ার পরে ওদের জন্য তৈরি ঘরটা এখন শোভা আর কিরনের পড়ার ঘর হয়েছে। বাড়িতে এখন অনেক জায়গা। মেজদি আসে শণিবার বিকেলে আর সোমবার ফার্স্ট ট্রেনে চলে যায়। শণিবার রাতে এই ঘরটায় শুয়ে শুয়ে খুব গল্প করে ওরা তিন বোনে। মেজদিকে একটা কথা বলবার জন্যে শোভার পেট ফেটে যাচ্ছে কিন্তু কিরন ওকে মাথার দিব্যি দিয়েছে – বলেছে মেজদিকে বললে ও নাকি গঙ্গায় ঝাঁপ দেবে। শোভাও জানতোনা এতদিন। রতনদার বাবা গৌর কাকা যেদিন মারা গলেন, সেদিন জেনেছিলো শোভা – কিরন রতনদাকে ভালোবাসে। রতনদাও ভালোবাসে কিরনকে।অনেক নাকি চিঠি চাপাটি চলেছে দুজনের মধ্যে। কিরনটার পেটে পেটে এত !
ওসব মাথার দিব্যি টিব্বি-তে বিস্বাস নেই শোভার, কিন্তু প্রত্যেক বার মেজদি এলে ও একটা 'এই বলে দিলাম' ভাব দেখায় আর তাতে কিরনের মুখের যে অবস্থাটা হয় সেটা খুব উপভোগ করে শোভা। মেজদিকে বলে দিলে সেই মজাটা আর থাকবে না। আর তা ছাড়া মেজদি তো জানবেই একদিন।
হঠাৎ মনের মাঝে মেঘ করে উঠল শোভার। ওর জন্যও তো কখনো চিঠি আসতে পারে কলকাতা থেকে! বিশ্বনাথদা তো ওখানেই আছে, একটাও কি চিঠি লিখতে পারে না! বিশ্বনাথদা কি ভুলে গেল শোভাকে? এতোগুলো দিন হয়ে গেল, একবারের জন্যও তো এলো না নবদ্বীপে! কলকাতা কি তবে কেড়েই নিলো বিশ্বনাথদা কে শোভার কাছ থেকে?
মনের ভেতরটা অস্থির অস্থির লাগছে। বারন্দাটায় বেড়িয়ে এসে মনের মাঝের উথাল পাতাল সামলাতে লাগলো শোভা। বিশ্বনাথদা কে ওর যে অদেয় কিছুই নেই - এটা কি বোঝে না বিশ্বনাথ দা! অবশ্য কিই বা আছে শোভার, যা দিয়ে ও ভোলাতে পারে বিশ্বনাথ দা কে! না। ভোলাতে ও চায়না। কোনো দানও চায় না ও বিশ্বনাথের কাছ থেকে। শোভা ভালোবাসতে জানে। আর সেই ভালোবাসার বদলে হাত পেতে ফিরতি ভালোবাসা চাইবে ও? না, এতো ছোটো মন ওর নয়। কিন্তু যাকে ভালোবাসলাম, তার কাছ থেকে প্রেমের প্রাপ্তিস্বিকার -এটুকুও কি খুব বেশি চাওয়া?
বেলা দশটা বাজতে চলল। বাড়িতে কেবল শোভা আর মা। পাড়াটাও যেন ঝিমিয়ে রয়েছে। গৌর কাকার মৃতুটা বড্ড আকস্মিক। অসুস্থ হয়ত ছিলেন, কিন্তু অসুখ কি মানুষের করেনা! উনি যে আর সেরে উঠবেন না, সে কথা কেইই বা ভেবেছিলো। রতনদার জন্য খারাপ লাগছে। ফিফ্থ ইয়ার অবধি পড়াশুনাটা চালাবে কি করে কে জানে! গৌর কাকার কাজ মিটে যাওয়ার পর রতনদা যেদিন শিবপুরে ফিরে গেল, সেদিন ছন্দা কাকিমার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিলো না। রতনদা যে কাকিমার কতটা, তা শোভা জানে। রতনদা নিজের মনের ভেতরের ঝড় ঝাপটা গুলো চাপা দিয়ে হস্টেলে ফিরেছে - এ কথা ঠিক। কিন্তু কাকিমা কি নিয়ে থাকবে? বাড়ি ভর্তি লোকের মাঝে কাকিমা যে কতটা একা।।।।
কিরনটা খুব চাপা স্বভাবের। মুখে কিছু না বললেও শোভা জানে মনে মনে ও রতনদার জন্য অস্থির হয়ে পড়ছে। রতনদার এখন যা মানসিক অবস্থা, তাতে এই সময়টায় কিরন ওর কাছাকাছি থাকলে মনে একটু জোর পেত হয়ত। কিন্তু তা তো হবার নয়!

গত সপ্তাহে মেজদি এসে বলল ও নাকি চন্দননগরে পার্টিতে নাম লিখিয়েছে। অশোকদের পার্টি। রাতে শুয়ে ওরা তিন বোনে যখন গল্প করছিলো, তখন বলেছে। নবদ্বীপে থাকতে মেজদি কখনো রাজনীতি নিয়ে খুব একটা উৎসাহ দেখায়নি। হঠাৎ করে মেজদির এ হেন সিদ্ধান্ত তাই অবাক করেছিলো শোভাকে। অবশ্য অবাক হলেও, অখুশি হয়নি শোভা। প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে নিজের রুচি অনুযায়ী বাঁচার। মেজদির জীবন, মেজদিই ঠিক করবে কি ভাবে চলবে। আর তা ছাড়া রাজনীতি সচেতনতা প্রত্যেক শিক্ষিত মানুষেরই থাকা উচিৎ। প্রতক্ষ্য বা পরোক্ষ্য।

অশোকরা এখন হাওয়ায় উড়ছে। ওদের পার্টি যৌথ ভাবে ক্ষমতায়। অনেক আশা করে মানুষ ওদের ভোট দিয়েছে। রাতারাতি কিছু পাল্টাবে না, কিন্তু আশা করতে তো দোষ নেই! নতুন সরকারের বয়স তো সবে কয়েক মাস। রাজনীতির প্রতি শোভা তেমন আকর্ষণ বোধ করেনা কোনো দিনই। তবে রাজনীতির ত্বত্ত গুলোর ভেতরের লজিক গুলো নিয়ে মনে মনে নাড়াচাড়া করতে দিব্যি লাগে ওর!
বারন্দাটায় রোদ পড়তে শুরু করেছে। মে মাস শেষ হতে চলল, রোদের তেজ আছে। ঘরে ঢুকে এল শোভা। বাবার ঘরে ঢুকে খবরের কাগজটা তুলে নিল। প্রথম পাতার একটা খবরে চোখ আট্কে গেল ওর। উত্তরবঙ্গের নক্সালবাড়ি বলে একটা গ্রামে দু জন শিশু সহ ন' জন পুলিশের গুলিতে মারা গেছে। মৃতদের নাম - খরসিং মল্লিক, ধনেশ্বরি দেবি, সীমাশ্বরি মল্লিক, নয়নেশ্বরি মল্লিক, সুরুবালা বর্মন, সোনামতি সিং, ফুলমতি দেবি, সংসারি সাইবনি,গৌদ্রু সাইবনি। শিশুদের নাম তালিকায় নেই।
কেন গুলি চালালো পুলিশ? খবরের ভেতরে ঢুকে গেল শোভা। মৃতেরা সকলে গরীব চাষি।ফসলের দাবিতে আন্দোলন করছিলো, আর তাই পুলিশের গুলি। যে ফসল ফলায়, তাকে আলাদা করে সেই ফসলের জন্য আন্দোলন করতে হবে কেন? এই সরকারের পুলিশ কি তবে আগের সরকারের পুলিশের মতই রয়ে গেল?
মনটা খারাপ হয়ে গেল। বাচ্চা গুলো নিশ্চয়ই ওদের মায়ের কোলেই ছিলো। ক্ষিদের জ্বালায় কাঁদছিলো কি? না, মনটাকে অন্যদিকে ঘোরাতে হবে। নিজের ঘরে চলে এল শোভা। তাক থেকে গানের খাতাটা বের করলো। গান শেখা বন্ধ হয়ে গেছে অনেকদিন। সরগম দিয়ে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে ভূপালীতে - ওর শেখা একমাত্র রাগ। অনেকগুলো সাদা পাতা পড়ে রয়েছে তার পর থেকে। আর কোনোদিন কি ভরবে পাতা গুলো? শোভা জানে, ভরবে না।
সা রে গা পা ধা সা', সা' ধা পা গা রে সা। অনেকগুলো চলন লিখিয়েছিলেন গুরুজী। শোভার সব চাইতে ভালো লাগতো - গা পা ধা পা ধা ধা সা'। একটা গানও তুলেছিলো। গাইবে একবার? মুরলী অধর ধর শ্যাম সুন্দর।।।।
মায়ের একটা পুরোনো তানপুরা সারিয়ে নিয়েছিলো গান শিখবে বলে শোভা। বিশ্বনাথদা কলকাতায় চলে যাবার পর থেকে আবার ধুলো খাচ্ছে ওটা। হাতের সামনের একটা কাপড় টেনে নিয়ে তানপুরাটাকে ঝেরে পুছে নিয়ে বসল শোভা। অনেকদিন পরে গাইতে বসেছে। গলার জড়তা স্পষ্ট ধরা পড়ছে কানে। চোখ বুজে গাইলে মনঃসংযোগ বজায় থাকে - চোখ দোটো তাই বুজে নিল শোভা। সুখ মন্দির যদু বংশ দিবাকর।।।। ধীরে ধীরে লয়ে ফিরছে গলাটা।

শীষ মুকুট সোহ্ত করভূষণ
পীত বসন তন তদিত শ্যাম ঘন

বিশ্বনাথদা যদি নাও মনে রাখে শোভাকে, তবু ও সারা জীবন মনে রাখবে বিশ্বনাথদা কে। যা পেয়েছে বিশ্বনাথ দার কাছে থেকে, তার বেশি যদি কিছু নাও পায়, তাতেও দুঃখ নেই শোভার।
স্থায়ীতে আবার ফেরত গেল শোভা, শেষ লাইনটা একবারের বেশি গাইতে বারন করেছেন গুরুজী, তাতে নাকি মজাটা চলে যায়।

গলাটার অবস্থা ভালো নয়। মুনিজন মানস হন্স বিবুধবর। চোখ খুলে অবাক হল শোভা। মা বসে আছে চেয়ারে।

-এই ভর দুপুরে কেউ ভূপালী গায়? ভূপালী তো রাতের রাগ!
-জানি মা! কিছু করার ছিলোনা তাই ।।।।।
-কাকার গলাতেও বেশ খুলতো ভূপালী।
-কাকা মানে তোমার রবি কাকা? বল না মা, তোমার সেই সময়কার কিছু কথা।
- কি আর কথা বল! সবই তো শুনেছিস, আর কি কিছু শোনার বাকি আছে নাকি তোর?
-তবু বলো না মা!

মায়েরা মেয়েদের বন্ধু হয়ে যায় একটা বয়সের পরে। নাকি মেয়েরা বন্ধু হয় মায়ের? জীবনের এই মোড়টাকে বেশ উপভোগ করেন ছবি আজকাল। লিপি বা সুধা - কারুর সাথেই সেই সখ্যতা ওনার গড়ে ওঠেনি, যা ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে শোভার সাথে। আসলে সন্তানদের মধ্যে যার ভেতরে নিজের ছায়া দেখতে পায় বাবা মায়েরা, তাদের প্রতিই হয়ত বেশি স্নেহ বর্ষিত হয়। তাদের সাথেই হয়ত চলে হৃদয়ের আদান প্রদান। কিন্তু তা সত্ত্বেও সন্তান কে সকল কথা বলা চলে কি? ছবি কি পেরেছেন শোভাকে বলতে আলেকের কথা? কোনোদিন পারবেন কি?

মায়ে-মেয়েতে গল্প জমে উঠেছে। গল্প মানে একতরফা গল্প। শোভা শুধুই স্রোতা। কিন্তু তাতে ওর উত্সাহের ঘাটতি নেই। বেশির ভাগ ঘটনাই ওর আগে শোনা, তবু ভালো লাগে বারে বারে শুনতে।

দড়জায় কড়া নাড়ার শব্দ। এই সময় কে? দড়জা খুলতেই চমক লাগলো। অবিনাশ কাকা। এই সময় তো কাকা আসেন না কখনো?
-শোভা মা, ভালো আছো তো? মা কে ডাকো।
-আপনি ভেতরে আসুন কাকা।
শোভার মন বলছে বিশ্বনাথদার কোনো খবর আজ পাওয়া যাবে অবিনাশ কাকার কাছ থেকে। মাকে ডেকে আনতে গেল শোভা।

-অবিনাশ বাবু আজকে এই সময়ে? খবর সব ভালো তো?
- তা ভালোই খবর। তাই আজকে সকাল সকাল আসতে হল ভাড়াটা নিতে। ও বেলায় কর্তামশায়ের সাথে একবার তেঘড়ি পাড়া যেতে হবে মেয়ে দেখতে। বিশুর বিয়ের তোড়জোর শুরু করেছেন কর্তা মশাই। তারপর কাল থেকে কর্তা মশাই আরো দু এক জায়গায় যাবেন পাত্রী দেখতে, আসবেন সেই ৭ তারিখে। আমাকে তাই কটা দিন ব্যস্তই থাকতে হবে। দুটো দিন আগেই তাই চলে এলাম ভাড়াটা নিতে, কিছু মনে করবেন না।
-বিশ্বনাথ জানে?
-ওর আর এখন থেকে জানার কি আছে মা! মেয়ে পছন্দ হোক আগে!
-কিন্তু বিশ্বনাথেরও তো একটা পছন্দ অপছন্দ আছে। মা বোধহয় শোভার হয়ে কথা চালিয়ে যাচ্ছে। ভীষণ লজ্জা লাগছে শোভার। বলতে ইচ্ছে করছে, দোহাই মা! চুপ করো। আমার জন্য তোমাকে এতটা ছোটো হতে হবে না, নিজের কাছেও না।

ভাড়ার টাকাটা বুক পকেটে ঢুকিয়ে উঠে পড়লেন অবিনাশ কাকা।
-আজ আসি মা! শোভা মা দড়জাটা দিয়ে দাও, দিনকাল ভালো নয়।

দ্ড়জাটা বন্ধ করে দিলো শোভা। মায়ের চোখের দিকে তাকাতে খুব লজা করছে। পায়ে পায়ে নিজের ঘরে ঢুকে পলিটিক্যাল সায়েন্সের বইটাখুলে বসল। বইয়ের দিকে তাকিয়ে মনটাকে শান্ত করতে লাগলো শোভা। বিশ্বনাথ দার বিয়েটা ঠিক হয়ে গেলে এক দিক দিয়ে ভালোই হয়। দোটানার মধ্যে বেঁচে থাকা বড় কষ্টের।

৪৭়

তরল আগুন গলা দিয়ে নেমে পাকস্থলি হয়ে মাথায় ক্রীয়া করতে শুরু করেছে় পাশে বসে থাকা মেয়েটা অর্থহীণ বকবক করে চলেছে সমানে় বন্ধ দড়জার ওধারে ঘুঙুর আর তবলার বোল মাঝে মাঝে চাপা পড়ে যাচ্ছে সমবেত জনের হাসির হররায়়
বউবাজারের এই ঠেকটার খবর পারেখজীর থেকেই পেয়েছে বিশ্বনাথ় পারেখজী অবশ্য বলেছিলো বিশ্বনাথকে কষ্ট করে এতটা আসতে হবে না‚ যা দরকার তা হ্যারিসন রোডের ফ্ল্যাটেই পৌঁছে দেবে ও় কিন্তু রাজি হয়নি বিশ্বনাথ ় ওখানে গুরুজী আছেন়
নেশাটা ধরেছে ভালোই় তামাকটাও সেরা জাতের় গড়গড়ার নলের দিকে হাত বাড়ালো বিশ্বনাথ ় আজকাল সন্ধ্যে হলেই এখানে চলে আসে ও় কখনো বা পারেখজীর প্রাইভেট নৌকায় চড়ে গঙ্গার বুকে রাত কেটে যায়় সারাটা দিন ব্যাবসার খাটাখাটনির পরে সুরা আর সাকিতেই নিজেকে ডুবিয়ে রাখে বিশ্বনাথ় গান শেখার আর কোনো স্পৃহা বোধ হয়না আজকাল় গুরুজীর গলা থেকেও সুর একরকম বিদায়ই নিয়েছে বলা চলে় আর তা ছাড়া গান গাইতে গেলে যে মনঃসংযোগ দরকার হয়‚ তা আর করে উঠতে পারেনা আজকাল ়

বাবা ওর বিয়ের এক রকম ঠিকই করে ফেলেছেন ় তারিখটুকুই যা ঠিক হয়নি় পাত্রী কে‚ কি রকম দেখতে‚ তা নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই ওর় কারন সে মেয়ে আর যেই হোক শোভা নয়় একটা শেষ চেষ্টা করে দেখেছিলো ও় মা কে চিঠিতে লিখেছিলো শোভার কথা ় কিন্তু তাতে হিতে বিপরিত হল ় শোভাদের ও বাড়ি থেকে উঠে যেতে হল় শোভার বাবাকে ডেকে পাঠিয়ে যথেষ্ঠ অপমান জনক কথাও শুনিয়েছে বিশ্বনাথের বাড়ির লোকেরা় অবিনাশ কাকা বলেছেন এ সব কথা বিশ্বনাথকে় গত মাসে কলকাতায় অসেছিলেন অবিনাশ কাকা ব্যবসার কাজ দেখতে় বিশ্বনাথ জানে কাজটা ছুতো় এই খবরটুকুই দেওয়ার জন্য বিশ্বনাথের কাছে এসেছেন অবিনাশ কাকা় উনি না এলে এ সকল কথা ও জানতেই পারতোনা কোনোদিন় খবরটা পাওয়া মাত্র বিশ্বনাথ বলেছিলো‚ আমি এক্ষুনি নবদ্বীপে যাবো! অবিনাশ কাকা মানা করেছিলেন় বলেছিলেন‚ গিয়ে কি করবে? শোভাদের কাছে যাবে? গরীব হতে পারে‚ কিন্তু ওরা বড় মানি লোক় যে অপমান ওঁনাদের করা হয়েছে‚ তা শুধু তোমার যাওয়াতে মুছে যাবে না়

অনেকখন চুপ করে বসে ছিলেন অবিনাশ কাকা় যাওয়ার আগে বলেছিলেন‚ আমাকে যদি একবার আগে বলতে‚ তবে হয়ত কিছু করতে পারতাম় আমি নিজে কর্তা মশাইয়ের সাথে গিয়ে পাত্রীর বাড়িতে কথা বলে এসেছি় এখন আর কিছু করা যাবে না়
- যদি আমি এ বিয়ে না করি? জিজ্ঞেস করেছিলো বিশ্বনাথ়
অল্প হেসে অবিনাশ কাকা বলেছিলেন‚ কর্তা মশাইকে তো তুমি চেনো! সম্পত্তি থেকে তোমাকে বঞ্চিত করতে একবারও ভাববেন না়
-চাই না আমি ও সম্পত্তি!
-তুমি তো অতটা ছেলেমানুষ নও বিশ্বনাথ! মন দিয়ে ব্যাবসার কাজ দেখো় বিয়ের তারিখ ঠিক হলে পর কর্তা মশাই নিজেই তোমাকে জানাবেন়
অবিনাশ কাকা চলে যাওয়ার পর অনেকখন চুপচাপ বসেছিলো বিশ্বনাথ় এ কথা সত্যি যে কলকাতায় এসে ও বাজারের মেয়েদের কাছে এসেছে - কিন্তু সে তো প্রযোজনে ় শোভাকে ও ভালোবাসে ় কিন্তু পারিবারিক সম্পত্তি ছাড়া নিজের জীবিকা নির্বাহ করবার পন্থা তো ওর জানা নেই! বংশানুক্রমে ওরা পারিবারিক জমিজিরেত বা ব্যবসা দেখেই জীবিকা নির্বাহ করেছে‚ আর আজ যদি হঠাৎ করে বাবা ওকে ত্যাজ্য পুত্র করেন‚ তবে ওর পক্ষে কি করে সম্ভব একটা বিকল্প জীবিকার সাহায্যে জীবন ধারন করা? চিরকাল ও সুখের মাঝেই মানুষ হয়েছে‚ আজ নতুন করে কৃচ্ছসাধন শিখতে পারবেনা বিশ্বনাথ়
হাতের গেলাসটা খালি হয়ে গেছে় মেয়েটাও খেয়াল করেছে় তাড়াতাড়ি ভরে দিলো অর্ধেকটা় বাকি অর্ধেকটায় সোডা় গেলাসটা বিশ্বনাথের হাতে তুলে দিচ্ছিলো মেয়েটা় হাতের ইশারায় নামিয়ে রাখতে বললো বিশ্বনাথ় বাধ্য ভৃত্যের মতন আদেশ পালন করলো মেয়েটা় এরা হল কাম শ্রমীক় অল্প বিস্তর গান বাজনা জানে‚ ভদ্রলোকের সাথে কথা বলতে জানে় কিন্তু সে সবেরই দরকার হয় ওই শেষ গন্তব্যের জন্য ় বিছানা়

মেয়েটার শরিরটা কচি বেতের মতন় নেশার ঘোরে মুখটা ঝাপসা লাগছে যেন একটু় বুকের ওড়নাটা হাত দিয়ে সরিয়ে দিলো বিশনাথ ় মেয়েটার ঠোঁটের কোনে অল্প হাসি় অল্প গান বাজনা অল্প মদের পরেই খদ্দেরদের আসল চাহিদা জেগে ওঠে - শরীর় শুধু গান শোনার জন্য কেউ পয়সা দেয়না ় ফরাস থেকে উঠে ঘরের এক কোনে রাখা বিছানাটার দিকে এগিয়ে গেল মেয়েটি় শরীর থেকে একটা একটা করে কাপড় খসাচ্ছে় এই ছোকরা বাবু যা মদ গিলেছে‚ তাতে বিশেষ কিছু করতে পারবে বলে মনে হয়না় ভালো় শরীরের ওপর ধকল কম যাবে ়
মিনিট দশেক পরে ঘরটা থেকে বেড়িয়ে এল বিশ্বনাথ় বাইরে পারেখজীর ক্যাডিল্যাক দাঁড়িয়ে আছে় ড্রাইভার চেনা লোক় প্রথম প্রথম এ পাড়ায় আসতে সংকোচ হত ওর় মনে হত সারা রাস্তার লোক যেন ওরই দিকে তাকিয়ে আছে় আজকাল আর মনে হয়না়

-সোজা কি বাড়ি যাবেন স্যর ?
-না ় একটু স্ট্র্যান্ড রোড ধরে হাওয়া খেয়ে তারপরে বাড়ি ঢুকবো়

রাত বেশি হয়নি মনে হচ্ছে় রাস্তায় লোকজন অনেক় অবশ্য কলকাতায় কখনই বা রাত হয়! হাতের ঘড়িটার দিকে তাকাতে ইচ্ছে করছে না় শরীর শান্ত হওয়ার সাথে সাথে মাথাটাও একটু ঠান্ডা হয়েছে যেন় জানলার কাঁচ নামিয়ে দিয়েছে বিশ্বনাথ় স্ট্র্যান্ড রোড পৌঁছোতে মাথাটা অনেকটাই হাল্কা লাগছে় গঙ্গার হাওয়া ঝাপটা মারছে মুখে‚ মাথায়় সীটের ওপরে গা এলিয়ে দিলো বিশ্বনাথ় নবদ্বীপে কি করে ফিরবে ও? শোভার সাথে যদি দেখা হয় কখনো‚ তবেই বা কি বলবে? কোনো উত্তর নেই ওর কাছে়
গাড়ির ভেতরে অন্ধকার। চোখ বুঁজে পড়ে রয়েছে বিশ্বনাথ। শোভাকে তো ও কোনো কথা দেয়নি, তবে এত আত্মগ্লানী হচ্ছে কেন ওর? অশান্ত মন যা বুঝছে না, তা হল - কথাটা নিজের অজান্তেই হয়ত ও নিজেকে দিয়ে ফেলেছিলো। আর তাই এই তোলপাড়। মানুষ যে সব চেয়ে বেশি নিজেকে ভালোবাসে! তাই তার যত ভালো লাগা মন্দ লাগা - সবই নিজের জন্য। অপরের জন্য য্খন মন কাঁদে, তা আসলে কাঁদে নিজেরই জন্য।
হ্যারিসন রোডের দিকে গাড়ি ঘুরে গেছে। গঙ্গার হাওয়ার বদলে গাড়ির খোলা জানলা দিয়ে ওর চোখে এখন ঝাপটা মারছে স্ট্রীট ল্যাম্পের উজ্জ্বল আলো। বাসার দিকে যত এগোচ্ছে গাড়ি, মনের ভেতরের অশান্ত ঝড়টা ততই প্রকট হচ্ছে। বাসায় ফিরতে ইচ্ছে হয়না আজকাল। গুরুজীর উপস্থিতিটা নিজেকে নিজের আযনার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। রাস্তায় বড় কোলাহল। ওফ! চোখ দুটো আবার বন্ধ করে ফেলল বিশ্বনাথ।
ফ্ল্যাটের কাছে চলে এসেছে গাড়ীটা। গাড়ি থেকে নেমে, কামিজের পকেট থেকে এক খামচা নোট তুলে ড্রাইভারটার হাতে ধরিয়ে দিলো বিশ্বনাথ। মাথাটা অল্প অল্প দুলছে। সিঁড়ি ধরে আস্তে আস্তে তিনতলায় উঠলো ও। ফ্ল্যাটের খোলা দড়জাটার পাশে চাকরটা দাঁড়িয়ে আছে।

-কি রে, তুই শুয়ে পড়িসনি?
- বাবু, একটা কথা ছিলো!
-কাল সকালে বলিস। যা এখন।

চাকরটা তবু দোনা মোনা করছে। মাইনে বাড়াতে বলবে হয়ত। মরুক গে!

বসার ঘরে পা দিয়ে গুরুজীর ঘরের দিকে চোখ গেল। ঘরটা অন্ধকার। পায়ে পায়ে ঘরের দিকে এগোল। সাবধানে ঘরের ভেতরে একবার উঁকি মারলো। কিছু দেখা যাচ্ছে না। আলো জ্বাললে কি গুরুজীর ঘুম ভেঙে যাবে? সাবধানে একবার আলোটা জ্বালতেই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠলো। গুরুজী বিছানায় নেই। বাথরুমে গেছেন হয়ত। খাটের লাগোয়া দেওয়াল দুটোতে চোখ পড়তেই শরীরটা কেঁপে উঠলো বিশ্বনাথের। ছবি দুটো নেই। গহরজান আর মণিকর্নিকা ঘাটের ছবি। পেছন ঘুরতেই চাকরটা হাত বাড়িয়ে একটা চিঠি দিলো। কিছু মাথায় ঢুকছে না বিশ্বনাথের।

-গুরুজী কোথায় গেলেন?
-জানিনা বাবু!
-হারামজাদা! জুতিয়ে তোর পিঠের ছাল তুলে নেব! মাথায় রক্ত উঠে গেছে বিশ্বনাথের। এই শরীর নিয়ে কোথায় গেলেন গুরুজী?
-আমি কি করবো বাবু! সন্ধ্যেবেলায় উনি আমাকে কটা জিনিস আনতে পাঠালেন। ফিরে এসে দেখলাম উনি নেই আর টেবিলের ওপর এই চিঠিটা পড়ে আছে।
ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁঅপছে চাকরটা।


ঝটকা মেরে চাকরটার হাত থেকে চিঠিটা নিল ও। দেবনাগরিতে লেখা কাঁপা কাঁপা অক্ষর। উর্দু ঘেঁসা হিন্দি। মাথায় কিছুই ঢুকছে না। খাতার পাতা ছিঁড়ে লিখেছেন চিঠিটা।

বেটা বিশ্বনাথ,
পহলেবার হম কব মিলে থে তুমহে ইয়াদ হ্যায়? মুঝে তো নহি। লেকিন ইতনা জরুর ইয়াদ হ্যায় কি পহলে হি দিন তুম মুঝে ভা গয়ে থে। তুমমে য়ো বাত থি। দিন গুজরে, হমারে বিচ কে তালুকাত গহরে হুয়ে। মেরে আগে পিছে কোই নহি হ্যায় - ইয়ে মেরা তকদির হ্যায়, বদনসীবি নহি। ইসলিয়ে তুম্হারে পাস ঠহরনা মুঝে নামুনাসিফ নহি লগা থা। সোচা থা কি মেরা অওলাদ হোতা তো তুম্হারে য্যাসা হি হোতা। লেকিন ম্যায় গলত সোচা থা। ওয়ালেদ অওর অওলাদ কা রিস্তা মুকম্মল করনে কে লিয়ে কোই শর্তেঁ লাগু নহি হোতি। বহৎ সোচ কে দেখা কি, ম্যাঁ তুমহারা গুরু হি রহ গয়া - মন সে তুমহারা বাপ ন বন পায়া। বাপ বন পাতা, তো ইস মন্জর মে তুম্হে অকেলা ন ছোড় পাতা।
উস্তাদ অওর শাগরিদ কা রিস্তা বাপ-বেটা য্যায়সা নহি। উসে মুকম্মল হোনা পড়তা হ্যায়। উসকে লিয়ে ইয়ে জরুরি নহি কি শাগরিদ বহৎ কাবিল হো; জরুরি হ্যায় কি শাগরিদ কো সিখনে কি ভুখ হো!

জীন্দগী মে হমনে ভি মহব্বত কি থী। অওর তুমহারে হি তরহা ওয়হ মহব্বত ভী মন্জীল তক ন পহুচ পাই। ক্যাসে পহুঁচতি? ইজহার যো কর না পায়া! লেকিন মেরি হরকতেঁ তুমহারে য্যাসী ন থী। খ্যার, তুম তুম অউর ম্যাঁয় ম্যাঁয় হুঁ। তুমহে শায়দ ইয়ে জাননে কি তমন্না হো রহি হ্যায় কে ওয়হ কওন থী। জানতে তো উসে সভী হেঁ, লেকিন উনকা নাম তুমহে য়া ফির কিসি অওর কো বতানা ম্যাঁয় ঠিক নহি সমঝতা।
আজ মুঝে লগ রহা হ্যায় কি তুমহে মেরি জরুরৎ নহি। ইসলিয়ে তুম্হারে পাস বে বজহ ঠহরনা ভী মুঝে মুনাসিফ নহি লগতা।

খুশ রহনা।
- অনন্তপ্রকাশ ত্রিবেদী। ।

নেশাটা কেটে গেছে। মাথাটাও তাই পরিষ্কার লাগছে। গুরুজীকে না নিয়ে আর বাড়ি ফিরবে না বিশ্বনাথ। তার জন্য সারা দেশ যদি ঘুরতে হয়, তো তাই ঘুরবে। নবদ্বীপে আসার আগে গুরুজী থাকতেন কাশিতে - ব্যস, এইটুকুই জানে ও। ওতেই হবে। ওই কাশি থেকেই খোঁজা শুরু করবে ও গুরুজীকে। তারপর আর যেখানে যেখানে যেতে হয় যাবে ও, কিন্তু খালি হাতে কিছুতেই বাড়ি ফিরবে না।


৪৮।

ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িঙ ক্লাসটা বরাবরই ভালো লাগে রতনের। কয়েকটা আইসোমেট্রিক প্রোজেকশন করতে দিয়ে স্যর বাইরে বেরিয়েছেন। দুটো হয়ে গেছে।একটু বিশ্রাম নিয়ে নেওয়া যেতেই পারে। টি টাকে ড্রয়িঙ বোর্ড থেকে নামিয়ে মাটিতে রাখলো ও। ড্রয়িঙ শীটটার চার কোন থেকে ক্লীপ গুলো কে খুলে শীট কে গুটিয়ে হোল্ডারে ঢোকালো। টুলটায় বসে ড্রয়িঙ বোর্ডটায় মাথা নামিয়ে রেখে একটু চোখ বুজলো। চোখ বুঝতেই মায়ের মুখটা ভেসে উঠলো। বাবার পরলৌকিক কাজ সেরে যেদিন কলেজে ফিরে আসবে, সেদিন মা খুব কান্নাকাটি করছিলো।

বাবার সঙ্গ নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে কোনো দিনই পায়নি ও। কিন্তু তবু তো মানুষটা ছিলো! কলকাতায়। সপ্তাহান্তে বা মাসান্তে একবার বাড়ি আসবে - এটা জানতো ও। যে কটা দিন বাবা বড়িতে থাকতো, মনের ভেতরটা অপেক্ষাকৃত তরতরে থাকতো। খুব একটা যে কথা হতো তা নয়, কিন্তু মনটা অনেক ফুরফুরে থাকতো। মনে হত, যেন একটা আশ্রয়, একটা আচ্ছাদন রয়েছে। নিজেকে অনেক সুরক্ষিতও মনে হত যেন বা।

বাবা যে সারা জীবন থাকেনা, এই বোধটাই এতদিন হয়নি ওর! পড়াশুনা ছাড়া এতদিন সংসারের আর বিশেষ দায় দায়িত্ব কিছু নিতে হয়নি ওকে। এবার ধীরে ধীরে সব শিখতে হবে। পাঁচটা বছর কি করে চলবে ওর লেখাপড়া - জানে না। সংসারেরই বা কি হবে? জ্যাঠা আছেন, কিন্তু ওনার রোজগারই বা কি? রুগী দেখে কোনোক্রমে চলে একরকম। স্কলার শীপের টাকায় ওর নিজের পড়া চলে যাবে একরকম করে। আর কিছুটা রোজগার করে বাড়িতে পাঠাতে পারলে মায়ের কিছুটা সুরাহা হবে। কিন্তু তাতে কি সংসারের সব খাঁই মিটবে? ও আসার আগে মেজ জ্যাঠা বলেছে ব্যবসার অবস্থা ভালো নয়। বাবার অবর্তমানে একা মেজজ্যাঠার পক্ষে ব্যবসা দেখাও সম্ভব নয়, তাই উনি তুলেই দেবেন ব্যবসাটাকে। ব্যবসা তুলে দিয়ে ছোটোখাটো একটা চাকরি ধরবেন। রতন বলেছিলো, আমাদের তাহলে কি হবে? মেজজ্যাঠা বলেছিলেন, ভগবান আছেন, উনিই দেখবেন। রতনের মনে হয়েছিলো একবার বলে, ব্যবসা বিক্রী হলে পরে আমাদের ভাগের টাকাটা মায়ের নামে যদি লিখে দেন তবে বড় ভালো হয়। ট্রেন ধরার তারা ছিলো। বলতে পারেনি। রতন জানে কোনোদিন বলতেও পারবে না ও।


বাবা মানে আসলে বাড়ির উঠোনের পেয়ারা গাছাটার মতন - যেদিন থাকেনা সেদিন বোঝা যায় গাছটা কতটা ছায়া দিতো! নিজের অজান্তেই চোখ দুটো ভিজে উঠলো। সবার অলক্ষ্যে চোখ মুছে ড্রয়িঙ বোর্ডটা থেকে মাথাটা তুললো রতন। স্যর এখোনো ফেরেননি। বাবা চলে যাওয়ার পর দুনিয়াটাকে নতুন করে চিনছে রতন। চেনা মুখ গুলোও যে কতটা অচেনা হয়ে যায়! জ্যাঠা অবশ্য বলেছেন, একদম চিন্তা করবি না, আমি বেঁচে থাকতে তোদের কোনো কিছুর অসুবিধে হবে না। কিন্তু জ্যাঠার মনে আন্তরিকতা যতটা, ক্ষমতা ততটা নেই। আর এই বয়সে মানুষটার ওপরে অতিরিক্ত চাপ দিতে ইচ্ছে করেনা রতনের। গতকাল মন্দিরতলার কাছে একটা মাড়োয়ারি দোকানে কথা বলে এসেছে। রোজ সন্ধ্যেলায় গিয়ে হিসেবের খাতাটা দেখে দিয়ে আসতে হবে। নিজের অবস্থা পুরোটাই বলেছিলো রতন। লালাজী বলেছিলো, দেখেন, এ সোব কাজের জন্য হামি সাত রুপিয়ার বেশি কাউকে দিই না। কিন্তু আপনি বিপোদে পড়িয়েছেন, বিদ্যার্থী আদমি আছেন - আপনাকে আমি মাসে দশ টাকা দিবো। কি চলবে তো? বালু শুনে বলেছে, লালা তোকে দশ টাকা দেবে? ঢপ মেরেছে! মাসের শেষে গেলে দেখিস না কত রকম ফ্যাকড়া তোলে।তা সে যাই হোক, এ ছাড়া তো রতনের এই মূহুর্তে অন্য কোনো উপায় নেই! আর তা ছাড়া লালাজীর কথা বার্তা শুনে খারাপ লাগেনি ওর। মানুষকে প্রথমেই অবিশ্বাস করতে শেখেনি ও। সত্যিই যদি দশটা টাকা মাসের শেষে পায়, তবে অনেকটাই সুরাহা হবে ওর।

বাবা মারা গেছে আজ প্রায় মাস দুয়েকের ওপর হতে চললো। নবদ্বীপ থেকে ফিরে আসার পরে কিছুতেই মন বসাতে পারতো না পড়াশুনায়। বন্ধুরা জোর করে ধরে বেঁধে নিয়ে গেছে মেট্রো, নিউ এম্পায়ারে সিনেমা দেখাতে। ইচ্ছে করত না। এখন আস্তে আস্তে লয়ে ফিরছে জীবন। আসলে জীবনের নিয়মই তাই। সে বহতা নদী, কারুর জন্য থেমে থাকা তার ধর্ম নয়।
এখনো মাঝে মাঝে বাবার জন্য ভীষণ মনটা কেমন করে ওঠে, কিন্তু ব্যাথাটা সয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। গত মাসে একবার হাওড়া স্টেশনের বাইরে কিরনদের আগের বাড়িওয়ালার ছেলে বিশ্বনাথদার সাথে দেখা হয়েছিলো। হন হন করে স্টেশনে ঢুকছিলো। রতন অবশ্য কথা বলেনি, বিশ্বনাথদাও দেখেনি রতনকে। নবদ্বীপে যাচ্ছিলো কি? কিন্তু ওই সময় তো নবদ্বীপের কোনো ট্রেন নেই! তবে হয়ত অন্য কোথাও যাচ্ছিলো। হাতে অবশ্য মালপত্র কিছু দেখতে পায়নি রতন। হবে কিছু একটা !

কিরনরা নতুন একটা বাড়িতে উঠে গেছে। কিরন চিঠিতে লিখেছে। কিন্তু কারন কিছু লেখেনি। বলেছে দেখা হলে বলবে। বাড়িওয়ালা কি ভাড়া বাড়াচ্ছিলো? পুজোর সময় নবদ্বীপে না গেলে জানা যাবে না কারনটা। কিরন লিখেছে, শোভা নাকি জানে ওদের ব্যাপারটা। কিন্তু রতন কিরনকে চিঠি লিখবে, না কি এই একতরফা চিঠিই চলবে, সে বিশয়ে কিছু লেখেনি। বাড়ি গেলে এবার জিজ্ঞেস করে নেবে কিরনকে।
এর মধ্যে গণেশের কাছেও একবার গেছিলো রতন। গণেশের জন্য এই মূহুর্তে নবদ্বীপে ফেরার কোনো সম্ভাবনা তৈরি হয়নি, ও তাই কলেজ স্ট্রীটের একটা বইয়ের দোকানে কর্মচারির কাজ নিয়ে নিয়েছে। কথাটা প্রথমবার শুনে একটু ধাক্কা খেয়েছিলো রতন। একটা অপরাধবোধ কাজও করেছিলো। ছোটো ভাই কাজ করবে আর ও বড় হয়ে নিশ্চিন্তে লেখাপড়া করবে? বলেছিলো, তাহলে আমিও বরং পাকাপাকি কোনো একটা কাজ নিয়ে নিই। তুই পড়বি না, আর আমি পড়ব - এটা ঠিক দেখায় না। গণেশ বুঝিয়েছিলো ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া ছেড়ে কোনো লাভ নেই। এই কটা বছর কোনোক্রমে চালিয়ে দিতে পারলে পর ইঞ্জিনিয়ার হয়ে রতনই সংসারের হাল ফেরাতে পারবে। রতন তবু বলেছিলো, আমাদের বাড়িতে তো কেউ কখনো এ কাজ করেনি! গণেশ সাথে সাথে উত্তর দিয়েছিও - সে তো কেউ আগে ইঞ্জিনিয়ার ও হয়নি, তাতে কি?
-কিন্তু তোর পড়াশুনো? একটা শেষ চেষ্টা করেছিলো রতন।
হেসেছিলো গণেশ। বলেছিলো, পড়তে যে আমার ভালো লাগে না সে তোর চাইতে ভালো আর খুব কম লোকেই জানে। আর তা ছাড়া নবদ্বীপে তো আগে ফিরি, তারপর না হয় লেখাপড়া আবার শুরু করব খন!

গণেশের কচি মুখটার দিকে তাকইয়ে বড় মায়া লাগছিলো রতনের। এই কটা মাস বাড়ির বাইরে কমিউনে থেকে কত বড় হয়ে গেছে ওর ভাইটা। ভালো ফুটবল খেলত। স্বপ্ন দেখতো মোহনবাগানে খেলবে। কে জানে, কোনোদিন ওর সে স্বপ্ন পুরন হবে কিনা! কিন্তু উপায়ই বা কি! কমিউনে বসে বসে আর কতদিনই বা খাওয়া যায়। তা ছাড়া কোনো কাজই ছোটো নয়। মধ্যবিত্ত পরিমণ্ডলে বড় হয়ে ওঠার এই এক জ্বালা। ছোটো থেকেই মাথার ভেতরে দেগে যায় ভালো কাজ, ছোটো কাজ। লালার দোকানে কাজটা নিতে তাই আর রতনের কোনো মনঃকষ্ট হয়নি। বরং কাজটা না নিলেই ওর মনে একটা অপরাধবোধ কাজ করতো। পরের দুটো ড্রয়িং নিয়ে বসল রতন। ওদিকে বালু আর পাকার মধ্যে কি একটা বিষয় নিয়ে যেন কথা কাটাকাটি হচ্ছে। ছেলেমানুষি কোনো ব্যাপার হবে। ফ্রেঞ্চ কার্ভ ব্যবহার করতে স্যর বারন করেছেন। ফ্রী হ্যান্ড কার্ভ আঁকতে অবশ্য রতনের কোনো অসুবিধে হয়না। তবে আজকাল আর একাগ্র ভাবে পড়তে পারেনা ও। মাথার ভেতরে একটা বিনবিনে চিন্তা সর্বদাই ঘুরঘুর করে - শেষ অবধি পড়াতা চালাতে পারবে তো ও? মাথা থেকে চিন্তার ঝুল গুলো ঝেড়ে ফেলে ড্রয়িং শীটে মনোনিবেশ করলো রতন। মন দিয়ে চারটে আইসোমেট্রিক ফীগার শেষ করলো। স্যর ফিরে এসেছেন। শীটটা বোর্ড থেকে খুলে স্যরের টেবিলে নিয়ে গেল রতন।
-হয়ে গেছে তোমার? গুড!
বুক পকেট থেকে চশমাটা চোখে লাগিয়ে রতনের শীটটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন স্যর বিজন বাবু। মাথা নাড়ছেন মাঝে মাঝে। শীট থেকে মাথা তুলে বললেন, তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? ফ্রন্ট ভিউতে রেকট্যাঙ্গেল আছে, টপ ভিউতে আছে সারকেল! আরে সিলিন্ডার হবে, সিলিন্ডার! অফ অল দ্য পিপল, তুমি যদি এ সব ভুল কর।।।প্রোফাইল প্লেনের ক্লাসেও বেশ কটা সিলি মিস্টেক করেছিলে। না, না, এত অমনোযোগ তো ঠিক কথা নয়! যাও,গীয়ে ঠিক করে নিয়ে এসো।

সীটে ফিরে এল রতন। মনটাকে যে কিছুতেই এক যায়গায় করতে পারছে না রতন! সত্যিই যদি পড়শুনা ছাড়তেই হয় তবে কষ্ট হবে খুবই, কিন্তু মেনে নেবে ও। না মেনে উপায় নেই। তা ছাড়া মায়ের পাশে দাঁড়ানোর চাইতে বড় কোনো কর্তব্য এই মূহুর্তে ওর সামনে আর নেই।

তবে পড়া যদি ছাড়তেই হয়, তবে ওইসব টুকিটাকি কাজ আর ও করবে না। হাওড়াতে প্রচুর চটকল। তারই কোনো একটায় মজুরের কাজ নেবে ও। যাদের রাজনীতিটা এতদিন করেছে, তাদের জীবনটাও একবার বেঁচে দেখে নেবে না হয়!


৪৯।

ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠেই গোছ গাছ শুরু করে দিয়েছিলো শোভা। মা নিজের ব্যাগ গতকাল রাত্রেই গুছিয়ে রেখেছে। আজ থার্ড ট্রেনে কলকাতায় যাবে ওরা দুজনে। শোভা আর মা। খুব একটা কিছু গোছানোর কিছু নেই, তবু।।।।
মাঝের কটা মাস বড্ড হুড়মুড়িয়ে কেটেছে। নাকি ধীর তালে? পড়তে পড়তে চোখে অন্ধকার দেখেছে । থেকে থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, কিন্তু উপভোগ করেছে ক্লান্তিটাকে। হায়ার সেকেন্ডারি পরিক্ষা শেষ হয়েছে গতকাল। রেজাল্ট বেরুতে এখনো মাস তিনেক। টেস্টের রেজাল্ট বেশ ভালোই হয়েছিলো। রমার চাইতে মোট ত্রিশ নম্বর বেশি। ফাইন্যালেও শোভাই বেশি পাবে। ও জানে। পাবেই।

কলকাতায় গিয়ে প্রথমে উঠবে বড়মামার বাড়িতে। তারপর।।।।। এখানটাতেই একটু খেই হারিয়ে যাচ্ছে ওর বারে বারে। অবশ্য খুব বেশি চিন্তা ও করছে না - মা তো থাকবে সাথে!

টেস্টের আগে হঠাৎ এক কান্ড! এর ওর মুখ থেকে শোভারা খবর পেল বিশ্বনাথদা গুরুজীকে খুঁজতে কোথায় যেন চলে গেছে। কোথায় গেছে, তা বাড়ির লোককে জানিয়ে যায়নি। আজও নবদ্বীপের কারুর কাছে কোনো খবর নেই - না বিশ্বনাথদার না গুরুজীর! গুরুজীই বা হঠাৎ কেমন করে হারিয়ে গেলেন তাও শোভা জানেনা। অবশ্য বিশ্বনাথদার সাথে দেখা হলে জেনে নেওয়া যাবে সে সব। কিন্তু দেখা হবে কি? মা অবশ্য বলেছে, নিশ্চয়ই হবে।

অবিনাশ কাকা ওদের নতুন বাড়ি খুঁজে এসেছিলেন দেখা করতে। বিশ্বনাথদার বড়ির লোকেদের ব্যবহারের জন্য বাবার কাছে ওনাদের হয়ে মার্জনা চেয়ে নিয়েছিলেন। আর শুনিয়েছিলেন এই খবর - বিশ্বনাথ শুধু একটা চিঠি লিখে চলে গেছে, গুরুজীকে না নিয়ে ফিরব না। কোথায় গেছে, কবে আসবে কিচ্ছুটি লিখে যায়নি। যাওয়ার আগে অবিনাশ কাকা শোভাকে আলাদা করে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, বড় হোয়ো। শক্ত হোয়ো।
অবিনাশ কাকা চলে যাওয়ার পরে মা ডেকেছিলো শোভাকে। মাটির দিয়ে তাকিয়ে ছিলো শোভা। মা বলেছিলো, তোর কোনো চিন্তা নেই, আমি খুঁজে দেব তোর বিশ্বনাথ কে।
-মা!
শোভা বলেছিলো, আমি ওকে ভুলে গেছি মা! তা ছাড়া ওদের বাড়ির লোকেরা বাবার সাথে যে ব্যবহার করেছে তা কি তুমি ভুলে গেলে?
-তাতে বিশ্বনাথের দোষটা কোথায়? একজনের অপরাধের দায়ভার অন্যের ঘাড়ে চাপানোর শিক্ষা তো আমি তোমাদের কোনোদিন দিইনি!
-কিন্তু মা, বিয়ের প্রস্তাবে তো ও না করতে পারতো?
-করেছিলো কিনা সেটা জানলি কি করে? আর যদি নাইই করে থাকে, সেটাও তো জানা দরকার। এই কটা মাস মন দিয়ে পড়। জীবনে তোদের অনেক বড় হতে হবে।
মায়ের কথা রেছেছে শোভা। ওই কটা মাস দিনরাত এক করে পড়েছে ও। আজকে মায়ের কথা রাখার দিন। মায়ের কথা ভাবতে ভাবতেই মা এসে ঢুকলো ঘরে।"তাড়াতাড়ি স্নানে যা, তারপর বাবার ভাতটা বেড়ে দিস একবার। আমি একবার ছন্দাদির কাছ থেকে ঘুরে আসব। তার আগে ঘর দোর গুলো ঠিকঠাক করে যেতে হবে। এতগুলো দিন থাকবো না, কিরনকেই তো একা হাতে সামলাতে হবে সব।"
-কেন মা, মেজদির তো পরিক্ষা সামনের সপ্তাহে শেষ। ও তো থাকবে। চিন্তা করছো কেন?
-পরিক্ষা শেষ, কিন্তু ওর পার্টির কাজ থাকবে না? তাড়াতাড়ি স্নানে যা!
মা যে মেজদীর পার্টি করাটা এত সহজ ভাবে নেবে, সেটাও কখনো ভাবেনি শোভা। এই ক মাসে মা কে নতুন ভাবে চিনল শোভা। হয়ত শুধু শোভা নয়, বাড়ির আর সকলেই। চিরকালের লিবেরাল বাবাও মেজদির কাছ থেকে ওর পার্টিতে নাম লেখানোর খবরে বলেছিলো - পার্টি করনের লগে আমার আপত্তি নাই, কিন্তু মাইয়া মানুষ পুলিশের লাঠি খাইয়া মাথা ফাটাইয়া আসবি, হেইডা আমি ঠিক নিতা পারতাসি না। মা বলেছিলো, কেন? সব অধিকার কি শুধু ছেলেদের? অশোক তো সুধার চাইতে কত ছোটো। ও যদি পার্টি করতে পারে সুধাও করবে। আমার ব্যক্তিগত মত ওই পার্টির সাথে মেলে না। কিন্তু জীব্নটা সুধার। ওর পছন্দ অপছন্দ আমি অন্তত ঠিক করে দেব না।
মা বলেছিলো, শুধুমাত্র মেয়ে বলেই কোনো কাজ করবে বা করবে না এ কেমন কথা? কাজটা যদি তোমার মন থেকে ঠিক বলে মনে হয়, তবে অবশ্যই করবে! সেদিনের পর থেকে মা কে যেন আরো বেশি করে ভালোবেসে ফেলেছিলো শোভা। বিশ্বনাথদা কে খুঁজে পাবে কিনা জানে না ও। যদি খুঁজে পায় তো ভালো, না পেলেও মেনে নেবে সহজে। মায়ের সাথে এই খুঁজতে বেরোনোটাই ওর কাছে বড়, খুঁজে পাওয়াটা নয়।


শোভা স্নানে গেল। মেয়েটাকে দেখে ভালো লাগছে। মাঝের একটা সময় বড় বিমর্ষ ভাবে গেছে ওর। বিশ্বনাথকে খুঁজতে ছবি একা পারবেন না। বড়দার সাহায্য নিতেই হবে। সব শুনে বড়দা বলেছে, আমি নিজে গাড়ী চালিয়ে নিয়ে যাব তোদের। ছবি বারন করেছিলো। বলেছিলো তুমি শুধু সঙ্গে থেকো। গাড়ী চালাতে গেলে তোমার ওপরে ধকল যাবে। বড়দা বলেছিলো, থার্টি ফাইভে একবার বাই রোড কাশ্মীর ট্রীপ হয়েছিলো মনে আছে? মেজো তো লাকনো'র পর থেকে বসে গেল। তারপর তোদের এই শর্মাই পুরোটা ড্রাইভ করেছিলো - টু এন্ড ফ্রো!
-তখনকার সাথে তোমার এখনকার বয়সের তুলনা চলেনা বড়দা!
- শাট আপ! এখনো রোজ হেঁটে ক্লাবে যাই, হেঁটে আসি! পার্ক সার্কাস থেকে ময়দান ক'মাইল তার হিসেব রাখিস? আয়াম জাস্ট ফিফটি টু!
জীবনে এই প্রথমবার কারুর কাছে কোনো সাহায্য চাইলেন ছবি। কোনো হীণমন্যতা বোধ হয়নি তাতে। সন্তানের জন্য সব করা যায়। তা ছাড়া এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে বুঝেছেন - নিজের মানুষদের কাছ থেকে চেয়ে নেওয়াতে কোনো অগৌরব নেই! সামান্য বুঝতে একটু দেরি হয়ে গেল, এই যা! বিশ্বনাথকে খুঁজতে বেরোনোটা দরকার। তা না হলে শোভাও ছবির মতন একজন অসুখি মানুষ হয়ে কাটাবে সারাটা জীবন। মা হয়ে সেটা কিছুতেই হতে দেবেন না ছবি। তা ছাড়া ভবিষ্যতে সত্যিই যদি শোভার সাথে কোনোদিন ছেলেটার বিয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়, সে ক্ষেত্রেও ছেলেটাকে মানুষ হিসেবে জেনে নেওয়ার একটা দায় ওনার থেকেই যায়।

আসলে ছেলেটাকে খুঁজতে যাওয়া শুধু শোভার জন্যই নয়, নিজেকেও খুঁজতে চলেছেন ছবি। পঁচিশ বছর আগের একটা অসমাপ্ত গল্প দিয়ে যে যাত্রার শুরু, সেই পথের নতুন বাঁকে এসে নিজেকেই খুঁজতে চলেছেন ছবি আজকে। জীবনে কোনোদিন পিছু ফিরে দেখেননি। কিন্তু ফিরে দেখতে হয়। কোনো না কোনো একটা বাঁকে এসে ঘাড় ঘুড়িয়ে একবার দেখে নিতেই হয় নিজের ফেলে আসা পদচিহ্ন। আজ তাই বিশ্বনাথকে খুঁজতে প্রথমেই যাবেন কলকাতায়। ছবির ফেলে আসা কলকাতা। শোভার জন্য নয়, নিজের জন্য। সেখান থেকে কাশি। শোভা বলেছিলো, কাশিতে নাকি ওরা লোক পাঠিয়ে অনেক খোঁজ করেছে। কউকেই পাওয়া যায়নি। না বিশ্বনাথদাকে, না গুরুজীকে। ছেলেমানুষ। বোঝে না যে সকলের খোঁজা আলাদা। আসলে তো নিজেকে খোঁজা! আজ তাই মা মেয়ে মিলে খুঁজতে বেরোবেন নিজেকে নিজেকে। হাতে সময় মোটে তিন মাস। নিজের সঙ্গে নিজের দেখা হওয়ার জন্য অনেক সময়। অনেক পুরোনো কথা মনে আসছে। কার্সিয়াঙের স্কুল, শ্যাম বাজারের বাড়ি, রবিকাকা, মিসেস ও'ব্রায়ান, আলেক।।।। সুখ, এক অবর্ননিয় সুখে চোখ দুটো খালি খালি ঝাপসা হয়ে আসছে। পুরনো স্মৃতি গুলো বারে বারে টোকা মেরে যাচ্ছে মাথার ভেতরে।

বাবার কথা মনে হচ্ছে বারে বারে। বাবা, তুমি কি একবার, শুধু একবার আমার সাথে আলেক কে খুঁজতে যেতে পারতে না?


(সমাপ্ত)


497 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: potke

Re: একটা অসমাপ্ত গল্প (পর্ব: ৪৫-)

এটার একটা সিক্যুয়েল দাবী করে গেলাম,ক্লাসিক!!!
Avatar: kaushik

Re: একটা অসমাপ্ত গল্প (পর্ব: ৪৫-)

ইচ্ছে তো আছে। দেখি, ক'বছর লাগে! :)


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন