অবন্তিকা RSS feed

দিবারাত্রির চব্য

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • পাহাড়ে শিক্ষার বাতিঘর
    পার্বত্য জেলা রাঙামাটির ঘাগড়ার দেবতাছড়ি গ্রামের কিশোরী সুমি তঞ্চঙ্গ্যা। দরিদ্র জুমচাষি মা-বাবার পঞ্চম সন্তান। অভাবের তাড়নায় অন্য ভাইবোনদের লেখাপড়া হয়নি। কিন্তু ব্যতিক্রম সুমি। লেখাপড়ায় তার প্রবল আগ্রহ। অগত্যা মা-বাবা তাকে বিদ্যালয়ে পাঠিয়েছেন। কোনো রকমে ...
  • বেঁচে আছি, আত্মহারা - জার্নাল, জুন ১৯
    ১এই জল, তুমি তাকে লাবণ্য দিয়েছ বলেবাণিজ্যপোত নিয়ে বেরোতেই হ'লযতক্ষণ না ডাঙা ফিকে হয়ে আসে।শুধু জল, শুধু জলের বিস্তার, ওঠা পড়া ঢেউসূর্যাস্তের পর সূর্যোদয়ের পর সূর্যাস্তমেঘ থেকে মাঝে মাঝে পাখিরা নেমে আসেকুমীরডাঙা খেলে, মাছেরা ঝাঁক বেঁধে চলে।চরাচর বলে কিছু ...
  • আনকথা যানকথা
    *****আনকথা যানকথা*****মোটরবাইক ঃ ইহা একটি দ্বিচক্রী স্থলযান। পেট্রল ডিজেল জাতীয় জীবাশ্ম জ্বালানির সাহায্যে চলে। বিভিন্ন আকারের ও বিভিন্ন ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরবাইক আমরা দেখিতে পাই। কোন কোন বাইকের পাশে ক্যারিয়ার থাকে। শোলে বাইক আজকাল সেরকম দেখিতে পাওয়া যায়না। ...
  • সরকারী পরিষেবার উন্নতি না গরীবকে মেডিক্লেম বানিয়ে দেওয়া? কোনটা পথ?
    এন আর এস এর ঘটনাটি যে এতটা স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে উঠতে পারল এবং দেখিয়ে দিল হাসপাতালগুলির তথা স্বাস্থ্য পরিষেবার হতশ্রী দশা, নির্দিষ্ট ঘটনাটির পোস্টমর্টেম পেরিয়ে এবার সে নিয়ে নাগরিক সমাজে আলোচনা দরকার।কিন্তু এই আলোচনা কতটা হবে তাই নিয়ে সংশয় আছে। কারণ ...
  • জুনিয়র ডাক্তারদের ধর্মঘট ও সরকারের ভূমিকা
    হিংসার ঘটনা এই তো প্রথম নয়। ২০১৭ ফেব্রুয়ারীতে টাউনহল খাপ পঞ্চায়েত বসিয়ে বেসরকারি হাসপাতালের ম্যানেজমেন্ট কে তুলোধোনা করার পর রাজ্যে ১ নতুন ক্লিনিক্যাল এস্তব্লিশমেন্ট অ্যাক্ট চালু হয়েছিল। বলা হয়েছিল বেসরকারি হাসপাতাল গুলি র রোগী শোষণ বন্ধ করার জন্য, ...
  • ব্রুনাই দেশের গল্প
    আশেপাশের ভূতেরা – ব্রুনাই --------------------...
  • 'বখাটে'
    তেনারা বলতেই পারেন - কেন, মাও সে তুঙ যখন ঘোষণা করেছিল, শিক্ষিত লোকজনের দরকার নেই, লুম্পেন লোকজন দিয়েই বিপ্লব হবে, তখন দোষ ছিল না, আর 'বখাটে' ছেলেদের নিয়ে 'দলের কাজে' চাকরি দেওয়ার কথা উঠলে দোষ!... কিন্তু, সমস্যা হল লুম্পেনের ভরসায় 'বিপ্লব' সম্পন্ন করার পর ...
  • ডাক্তার...
    সবচেয়ে যে ভাল ছাত্র তাকেই অভিভাবকরা ডাক্তার বানাতে চায়। ছেলে বা মেয়ে মেধাবী বাবা মা স্বপ্ন দেখে বসে থাকল ডাক্তার বানানোর। ছেলে হয়ত প্রবল আগ্রহ নিয়ে বসে আছে ইঞ্জিনিয়ারিঙের কিন্তু বাবা মা জোর করে ডাক্তার বানিয়েছে এমন উদাহরণ খুঁজতে আমাকে বেশি দূর যেতে হবে ...
  • বাতাসে আবারও রেকর্ড সংখ্যক কার্বন-ডাই-অক্সাইড, কোন পথে এগোচ্ছে পৃথিবী?
    সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদন বলছে বায়ুতে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ আবারও বেড়ে গেছে। এই নিয়ে প্রতিবছর মে মাসে পরপর কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পেতে বর্তমানে বায়ুতে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ রেকর্ড সংখ্যক। গত মাসে (মে-তে) কার্বন ডাই অক্সাইডের ...
  • ফেসবুক রোগী
    অবাক হয়ে আমার সামনে বসা ছেলেটার কান্ড দেখছি। এই সময়ে তার আমার পাশে বসে আমার ঘোমটা তোলার কথা। তার বদলে সে ল্যাপটপের সামনে গিয়ে বসেছে।লজ্জা ভেঙ্গে বলেই ফেললাম, আপনি কি করছেন?সে উৎকণ্ঠার সাথে জবাব দিলো, দাঁড়াও দাঁড়াও! 'ম্যারিড' স্টাটাস‌ই তো এখনো দেইনি। ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

তোমার নাম... আমার নাম...

অবন্তিকা পাল


প্রিয় শাল্মলী,

আজ অনেকটা পথ একসাথে হাঁটলাম আমরা l পায়ে পায়ে l তুমি সামনে, পরনে কটকি প্রিন্ট কুর্তা, কপালে বড় লাল টিপ l শ’তিনেক মানুষের মিছিলে তোমার পিছনে আমি, পশ্চিমি পোশাকে l আমদের বয়সের তফাত বিস্তর l আমাদের জন্মের জড়, বেড়ে ওঠার গল্প, শিক্ষার পরিসর, সবই বেশ পৃথক l আমরা পরস্পরের প্রেমিকাও নই l তবু আমরা গান গাই, হাত ধরে রাস্তা পেরোই, ছুটির সন্ধ্যেয় কফি খাই একসঙ্গে l তুমি আমার কথা ভেবে একা বেরিয়ে কিনে আনো গোলাপি নোটবই l আমি তোমার জন্য বেছে রাখি মল্লিকা সেনগুপ্তর কাব্যগ্রন্থ l তারপর যখন তুমি বাঁ হাতের মুঠো শক্ত করে শুন্যে তোলো, আমি যখন দৃপ্ত হাঁটি প্রতিবাদী মিছিলে, আর আমরা আওয়াজ তুলি- ‘তোমার নাম আমার নাম/ কামদুনি মধ্যমগ্রাম’, তখন মনে হয় আদপেই তোমার আমার বেঁচে থাকায় বড় একটা প্রভেদ নেই l

তুমিও ইতিহাস পড়েছো শাল্মলী, তাই বলি শোনো, আমার মার যখন বিয়ে হয়, তখন তার বয়স আঠেরো পেরোতে সামান্য বাকি l ‘শ্বশুরবাড়ি’ আধুনিক, অতএব বাড়ির বড় বৌমা টুয়েলভ পাশের পর ভর্তি হয় কলেজে l তিন বছর যাবৎ যৌথ পরিবারের ঝক্কি সামলে দিনে খুব বেশি হলে ঘন্টা দুই পড়াশুনো করে সে বি.এ পাশ করে, যদিও ইতিহাসের অনার্সটা কেটে যায় মাঝরাস্তায় l রেজাল্ট বেরোবার পর যে সামান্য উদ্যোগটুকু দু’বাড়ির যেকোনো একজন পুরুষকে নিতে হত সেটা হল, পাশের সারটিফিকেট সংগ্রহ করা, যা কোনো অজ্ঞাত কারণে কেউই করে উঠতে পারেনি l মায়ের স্কুল শিক্ষিকার চাকরিটা শেষপর্যন্ত হাতছাড়া হয়ে যায় l তুমি বলতেই পারো ’৭৫-’৭৬ সালে এটা তেমন অস্বাভাবিক কিছু ছিল না l সত্যিই অস্বাভাবিক নয় l যদিও রোকেয়ার ‘অবরোধবাসিনী’র হাত ধরে তার বহু আগে বাঙালি নারী স্বাধীনতা শব্দের সাথে পরিচিত হয়েছে, যদিও সত্তর দশকের প্রথমদিক থেকেই ভিনদেশে শুরু হয়ে গেছে নারী আন্দোলন, তবু এসবের ছোঁয়াচ তখনও কোলকাতা থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরের একটি গ্রামে বসবাসকারী নারী পুরুষদের জীবনে লাগেনি l আমার মা, বুঝলে শাল্মলী, খুব রং ভালবাসত l এখনও বাসে l লাল, খয়েরি, সবুজ, আকাশি, হলুদ, কমলা, ময়ুরকণ্ঠী, টিয়া- ভিন্ন ভিন্ন ঝলমলে রং l অথচ পুরুষতান্ত্রিক ‘শ্বশুরবাড়ি’তে প্রসাধন ছিল গর্হিত কাজ l বছর কয়েক আগে মা বিউটি পার্লার থেকে একদিন পরিপাটি সেজে রানি ক্লিওপেট্রার মতো হেঁটে এল l আমি আমার নতুন কেনা ডিজিটাল ক্যামেরায় অনেকগুলো ছবি তুলে দিয়েছিলাম l দেখিয়েওছিলাম আমার এক প্রেমিক বন্ধুকে l বলেছিলাম- ‘আমার মা, কী সুন্দর সেজেছে দ্যাখ !’ উত্তরে সে কি বলেছিল জানো? বলেছিল- ‘এর সাথেই তো প্রেম করা যায় দিব্যি !’ সেই মুহূর্তে ওকে সপাটে একটা থাপ্পড় মারতেই ইচ্ছে হয়েছিল, কিন্তু এখন আর ওর ওপর কোনো রাগ নেই আমার ! ছেলেটির স্ত্রী, যার বয়স এখন বেয়াল্লিশ, জীবনে চারবার গর্ভবতী হয় l প্রথম সন্তান পেটে আসে বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই l তখন ‘স্বামী’র রোজগার নগণ্য তাই একপ্রকার জোর করেই তার গর্ভপাত করিয়ে আনা হয় l দ্বিতীয় সন্তান জন্ম নেয় উভয়ের ইচ্ছাতে l অতঃপর তৃতীয়বার l একটোপিক প্রেগনেনসি l মৃত্যুর সাথে লড়ে ক্লান্ত ছিল মেয়েটা l আর মা হতে চায়নি l আর ছেলেটা বোধ হয় ভেবেছিল পুত্রসন্তানের পিতা হবে এইবার l ‘দুর্ভাগ্যবশত’ চতুর্থবারের গর্ভসঞ্চারেও তাদের কন্যাসন্তানই জন্মায় l এ সমস্ত গল্প ওই কালোকোলো ছোটোখাটো চেহারার মেয়েটা তাদের দক্ষিণের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমায় বলেছিল l আসলে আমাকে নয়, সেদিন সে নিজের সাথে কথা বলছিল নিজেই, যেমনভাবে নাটকের শানু রায়চৌধুরী তার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির চড়াই-উতরাইগুলোকে ভাগ করে নিত দেওয়ালের সাথে, পাথরের সাথে !

পুরুষতান্ত্রিকতা একটা ‘কনসেপ্ট’ শাল্মলী, যা নারী বা পুরুষ যে কেউ তার মস্তিষ্কে লালন করতে পারে বা করেও থাকে l যে পুরুষটি প্রকাশ্য রাস্তায় পুরনো বান্ধবীর সঙ্গে দেখা হওয়ার পুলকে মুহ্যমান হয়ে মেয়েটির উদর আর নিতম্ব ইদানিং কত স্ফীত হয়েছে তাই নিয়ে রঙ্গ তামাশা করার সাথে সাথে অন্য পুরুষদেরও মস্করায় অনুপ্রেরণা জোগালো এবং এই বান্ধবীটি, যে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বা প্রতিবাদ না করে হেসে উড়িয়ে দিল- এরা উভয়ের কিন্তু পুরুষতন্ত্রের প্রতক্ষ বা পরোক্ষ প্রশ্রয়দাতা l তুমি প্রশ্ন করতেই পারো- সর্বদা এত প্রতিক্রিয়াশীল হওয়ার আছেটা কি ! একটু খেয়াল করলে দেখবে, নব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে ছেলেরা মেয়েদের নিয়ে যে মজাগুলো করে থাকে, সেগুলো ভীষণরকম ‘সেক্সিস্ট হিউমার’ l কলেজে শীর্ণা মেয়েটির নামকরণ করা হয় ‘নিমাই’ আর পৃথুলা মেয়েটিকে ডাকা হয় ‘লাউ বা চালকুমড়ো’ নামে l তুমি কি মনে করো না এ ধরণের যৌন রসিকতাও কোনো না কোনোভাবে যৌন অপরাধীকে সুড়সুড়ি দেয়? অন্ধকার গলিতে অফিসফেরত মহিলার ওড়নায় টান মেরে যখন চারজন সাইকেল আরোহী বলে যায়- ‘কী জিনিস বানিয়েছ গুরু’, তার মূলেও থাকে ওইসব যৌন রসিকতারই আদি-বোধ? শ্লীলতাহানির কথা ছেড়ে দিলাম l দৈনন্দিনতাতেই দ্যাখো, মেয়েদের চেহারা, গায়ের রং, পোশাক পরিচ্ছদ নিয়ে চর্চার অন্ত নেই l কোমরের মাপ আঠাশ থেকে বত্রিশ হলেই রে রে করে তেড়ে আসবে পুরুষতন্ত্র l হয় মেয়েটিকে বাধ্য করবে আধপেটা খেতে, নয়তো ক্রমাগত ‘ঠাট্টা’ করতে করতে তাকে এমন এক পরিস্থিতিতে নিয়ে গিয়ে ফেলবে যেখানে পৌঁছে তাকে ভালো থাকার জন্য বেছে নিতে হবে এক বা একাধিক ‘অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট’l আর এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দেশি বিদেশি ওষুধ কোম্পানিগুলো ক্রমাগত বাজারে ছাড়তে থাকবে স্লিমিং ক্যাপসুল l ভুলে যেও না শাল্মলী, যে পুরুষতন্ত্র মেয়েদের ‘উদ্বুদ্ধ’ করে ওজন কমাতে, সেই পুরুষতন্ত্রই বাজারে আনে ‘প্যাডেড ব্রা’ l সাম্প্রতিককালে মার্কিন বিজ্ঞানীরা বললেন: কার্টুন ছবিতে সিন্ডারেলা রাপুনজেল বা স্নো হোয়াইট-দের যেসব ছবি আঁকা হয় সেগুলো ভয়ানক অবৈজ্ঞানিক – বায়োলজিকালি মেয়েদের কব্জি, কাঁধ, ছেলেদের তুলনায় চওড়া – তাই অবিলম্বে এ ধরণের অ্যানিমেশন বন্ধ করতে হবে যা মেয়েদের চেহারা সম্পর্কে শিশুমনে ভুল ছবি চিত্রিত করে l আমার এক ষোড়শী রোগিনী তার স্কুলের ‘প্রিয় বন্ধু’র চোখে ‘সুন্দরী’ হয়ে ওঠার তাগিদে ওজন কমাতে শুরু করে এবং আমার কাছে এক বছর পর যখন এসে পৌঁছয়, তখন সে অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসার শিকার l জল খেলেও বমি করে ফেলছে, সঙ্গে প্রবল রক্তাল্পতা l আরেক তুতো দিদির কথা মনে পড়ল হঠাৎ l আই আই টি-র ছাত্রী ছিল মেয়েটা l মনকাড়া রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইত l কিন্তু শরীরের ওজন একশোর কাছাকাছি, তাই তার কোনো ‘বয়ফ্রেন্ড’ জোটেনি কখনও l আচমকাই একদিন সে অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করেছিল, আর তার মৃতদেহ প্রায় দু’দিন পড়েছিল ভাড়া বাড়ির ভেতরে, যেখানে সে একাই থাকত শেষদিকটায় l বিপণনের বিশ্বে মার্কিন বিজ্ঞানী আর মনস্তত্ত্ববিদদের ওই গবেষণা কতদূর ফলপ্রসু হবে আমি জানিনা, কেবল এটুকুই প্রার্থনা, যেন আর কোনো নারীকে শুধুমাত্র তার চেহারার জন্য পৃথিবী এভাবে ব্রাত্য করে না রাখে l

একটা মজার গল্প বলি l হপ্তাখানেক আগে হাসপাতালের ইনডোরে রোগীর বাড়ি থেকে এক ভদ্রলোক এলেন দেখা করতে l তিনি পেশায় মৌলবী l কথা বলতে বলতে প্রায় মিনিট কুড়ি পার হল l তাঁর কাছে যা শুনলাম তা কিঞ্চিত এইরকম: এক দেশে এক রাজা ছিল- সে খুব দুরাচারী আর দুশ্চরিত্র- সুন্দরী মেয়ে দেখলেই তার সাথে সম্ভোগ করার জন্য সেপাই সান্ত্রী দিয়ে তাকে তুলে আনতো- সে কন্যার বয়স আট হোক বা আটচল্লিশ, রূপবতী হলে রাজার হাত থেকে আর রেহাই নেই- স্বধর্মের জেনানাদের বাঁচাতে তখন এক মৌলবী উপায় বাতলালো, মহিলাদের বোরখা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হোক যাতে দুষ্টু রাজার আর তাদের প্রতি কুনজর না পড়ে- এভাবেই প্রচলন হল বোরখার l মৌলবীর বক্তব্য শেষ হতেই দুম করে বলে বসলাম- ‘হতচ্ছাড়া রাজাকে শূলে চড়ানোর বদলে মেয়েদের ঢেকে রাখা, এ কি ন্যায্য বিচার হল মৌলবী সাহেব? দোষ করলো রাজা আর ফল ভুগবে মহিলারা?’ মৌলবী চটলেন l তারপর সামলে নিয়ে অউরতের আব্রু টাব্রু বিষয়ে জ্ঞানদান করে কেটে পড়লেন l তো শাল্মলী, এই আমাদের পুরুষতান্ত্রিকতা যা নিজেদের সুবিধার্থে যেকোনোপ্রকার আষাঢে গপ্পো সাজিয়ে মেয়েদের আড়াল করে রাখতে চায় বোরখা অথবা ঘোমটার পেছনে l না আমার বোরখা বা ঘোমটায় কোনো ছুঁৎমার্গ নেই l যেটা নিয়ে আপত্তি সেটা হল- আব্রুর নামে ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে কোনো কিছুকে চাপিয়ে দেওয়া l লিঙ্গ নির্বিশেষে চল্লিশ পেরোলে মানুষের চোখে চালসে হয় যখন সে একইসাথে দূরের আর কাছের জিনিসগুলোকে অস্পষ্ট দেখতে শুরু করে l আমার মনে হয় বয়স-নিরপেক্ষভাবেই পুরুষতান্ত্রিকতা আদতে একপ্রকার সামাজিক চালসে আর নারীবাদ তার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক প্রতিষেধক l একজন গ্রামের মেয়ে, যাকে ষোলো বছর বয়সে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আর দু’বছর বয়স বাড়িয়ে বিয়ে দিয়ে দেয়া হল; একজন মফঃস্বলী স্ত্রী, যে দিনের পর দিন প্রাতঃকৃত্যের মতো স্বামী-সহবাস করলো; একজন শহুরে প্রৌঢা, যে মেনোপজকে নারীত্বের অবসান ভেবে ভেঙে পড়ল প্রবল- নারীবাদ কিন্তু এদের সকলের মুক্তির কথাই বলে l আমি কিভাবে ফুরফুরে বাঁচব শাল্মলী, যখন আমি দূরের কোনো জায়গায় কাজে গেলে আমার সঙ্গী চরম উৎকণ্ঠায় ঘন্টায় ঘন্টায় এস এম এস পাঠিয়ে আমার অক্ষত শরীর মনের খবর নিতে থাকে? আমি কি করে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে যাবো যখন আমি জানি আগামীকাল সকালে কাগজের পাতায় বা টিভি চ্যানেলে একটা না একটা শ্লীলতাহানি বা ধর্ষণের ঘটনা জানবোই? নারীবাদ মস্তিষ্কে চেপে বসা কোনো ভূতুড়ে খামখেয়াল নয় যাকে ওঝাবিদ্যা বা ডাকিনীতন্ত্র দিয়ে তাড়ালেই ল্যাঠা চুকে যায় l নারীবাদ একটা নিরন্তর লড়াই, যে লড়াই নারী স্বাধীনতা-প্রত্যাশী, কিন্তু যে লড়াইটা নারী-পুরুষ-ভিন্নলিঙ্গ নির্বিশেষে লড়ে যেতে হবে আমাদের সকলকে l একটা ধর্ষণ ঘটে যাওয়ার পর ধর্ষকের ফাঁসি হল কি হল না তা নিয়ে মাথা ঘামানোর চেয়ে অনেক বেশি জরুরি আজ, ধর্ষণের উৎসগুলোকে খুঁড়ে বার করা l জরুরি, উপড়ে ফেলা সেই পুরুষতন্ত্রকে যা আদপে ধর্ষণ নামক ক্ষমতাপ্রদর্শনের শেকড় l আর এও উপলব্ধি করা যে পুরুষতন্ত্র-বিদ্বেষী হয়ে ওঠা মানেই পুরুষবিদ্বেষী হওয়া নয় কখনোই l

আজ অনেকটা পথ একসাথে হাঁটলাম আমরা- দিল্লির জন্য, কামদুনির জন্য, পার্কস্ট্রিটের জন্য, মধ্যমগ্রামের জন্য l আমরা আমাদের জন্যও কি হাঁটলাম না শাল্মলী? তোমার জন্য? আমার জন্য? ওই রূপান্তরকামী কমরেড, সেও তো আমাদের জন্যই গলা তুললো আজ ! আমদের প্রত্যেকের হাঁটার ছন্দ, স্লোগানের সুর, মিলে গেল বলেই তো ওই সামান্য হেঁটে চলা একটা মিছিলের রূপ নিল, যে মিছিলের সব্বাই তোমার আর আমার মতো, আমাদের জন্য একটা নিরাপদ, মুক্ত, আর বাসযোগ্য পৃথিবীর স্বপ্ন দ্যাখে !


499 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 2 -- 21
Avatar: দ

Re: তোমার নাম... আমার নাম...

অসম্ভব ভাল লাগল লেখাটা।

এই টিপিক্যাল পুরুষতান্ত্রিক জোকগুলো নির্বোধ স্থুল রসিকতাগুলোর প্রতিবাদ করলে, আপত্তি জানালে শুনতে হয় ব্যঙ্গ বিদ্রুপ কটুবাক্য। এই গুরুতেই যেখানে যথেষ্ট সংখ্যক সমমন্ষ্ক মানুষ রয়েছে, সেখানেও এই নিয়ে কম কটুবাক্য শুনি নি।

একেবারে ঠিক ঠিক লিখেছেন। অনেক ধন্যবাদ জানবেন।
Avatar: সিকি

Re: তোমার নাম... আমার নাম...

ভালো লাগল।
Avatar: byaang

Re: তোমার নাম... আমার নাম...

যে কথাগুলো অনেকদিন ধরে বলতে চেয়েছি, বলে উঠতে পারি নি নানা কারণে, আজ সেই লেখাগুলৈ পড়তে পেয়ে ভারি স্বস্তিবোধ করলাম।
লেখাটার জন্য অনেক ধন্যবাদ।
Avatar: aranya

Re: তোমার নাম... আমার নাম...

খুব খুব ভাল লেখা
Avatar: রোবু

Re: তোমার নাম... আমার নাম...

খুব সুন্দর লেখা।
Avatar: dipankar

Re: তোমার নাম... আমার নাম...

ভীষণ ভালো লাগলো লেখাটা
Avatar: hu

Re: তোমার নাম... আমার নাম...

পুরুষতান্ত্রিকতা আর নারীবাদের সাদাকালো ছকে ঘুঁটি সাজাতে সাজাতে যেন আমরা বোর্ডের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ধূসর মুখগুলিকে ভুলে না যাই। নারীদেহের স্থূলত্ব বা শীর্ণত্ব নিয়ে প্রচলিত কৌতুকগুলির পাশাপাশি উচ্চতায় খাটো অথবা কিছুটা নারীসুলভ পুরুষদের প্রতি বরাদ্দগুলি ভুলে যাওয়া একপেশেমি হবে। বিয়ে হয়ে যাওয়ার দোহাই দিয়ে যাকে লেখাপড়া ছাড়িয়ে সংসারে জুতে দেওয়া হল তার সাথে খুব বেশি তফাত নেই এমন ছেলের যাকে ছেলে হয়ে জন্মেছে বলেই টাকা রোজগার করতেই হল যেনতেন প্রকারে। ক্রমাগত অন্যের ঠিক করে দেওয়া মাপকাঠিতে বাঁচবার চেষ্টা করাটাই একটা বড় বালাই। পুরুষতন্ত্র নামে তাকে ডাকা যেতেই পারে।
Avatar: Blank

Re: তোমার নাম... আমার নাম...

হুচি কে ক।
যা বলার ছিল তা বলে দিয়েছে।
Avatar: দ

Re: তোমার নাম... আমার নাম...

হু এর মন্তব্যে একটু বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম। হু-এর কথাগুলো ঠিক, একমত ও বটে।
কিন্তু এখানে কী প্রসঙ্গে? মানে এই লেখায় কি সেরকম কিছু বলা হয়েছে?
Avatar: রোবু

Re: তোমার নাম... আমার নাম...

না, বাকি গুলো ঠিক আছে, একটা তে আমার আপত্তি আছে। "বিয়ে হয়ে যাওয়ার দোহাই দিয়ে যাকে লেখাপড়া ছাড়িয়ে সংসারে জুতে দেওয়া হল তার সাথে খুব বেশি তফাত নেই এমন ছেলের যাকে ছেলে হয়ে জন্মেছে বলেই টাকা রোজগার করতেই হল যেনতেন প্রকারে।" - এই দুটো বোধ হয় তুলনীয় নয়। টাকা রোজগার করা অনেকসময়ই বাধ্যতা মূলক হয়ে পরে, একটা বয়সের পর। সেখানে কোনো চয়েস দেওয়া একেবারেই অসম্ভব হয়ে যায় অনেক ক্ষেত্রেই। সুযোগ না থাকলে ছেলে এবং মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই। আমি তো আমার আর আমার খুড়তুত বোনের পরিস্থিতিতে কোনো তফাত দেখিনি।
তবে সুযোগ থাকলে ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে কাউকেই যেন চাকরিতে বা সংসারে জুতে না দেওয়া হয়, এটা অবশ্যই চাইব।
Avatar: hu

Re: তোমার নাম... আমার নাম...

না, এখানে কিছু বলা হয়নি তো। সেজন্যই বলে দিলাম। এইদিকটা না দেখলে পুরুষতন্ত্রের একটা খন্ডিত রূপই চোখে পড়ে শুধু। যে পুরুষতন্ত্র মেয়েদের পীনপয়োধরা গুরুনিতম্বিনী দেখতে চায়, সেই একই পুরুষতন্ত্র ছেলেদের জন্যও মাপকাঠি নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। দুইতরফেই যোগ্যতামান স্পর্শ করতে না পারলে অপমান আছে, আত্মবিশ্বাস হারাতে হারাতে একদিন হেরে যাওয়া আছে। যখনই একদিকের গল্প শুনি অন্যদিকটাও মনে পড়ে যায়। সেই স্বগোতক্তিটাই লিখেছিলাম।
Avatar: Blank

Re: তোমার নাম... আমার নাম...

জিনিসটাকে পুরুষতন্ত্র বলতেই আমার আপত্তি আছে।
প্যাডেড ব্রা এর পাশাপাশি লিঙ্গ বর্দ্ধক যন্ত্রপাতি র যে পরিমান অ্যাড চারদিকে চলে, সরু কোমরের ওপর মাসলের পাহাড় বানাবার জন্য অজস্র রকমের স্টেরয়েড যে ভাবে নিয়মিত ইউজ হয়, সেগুলো সম্পুর্ন বাদ পরে যায় 'পুরুষতন্ত্র' কথাটার আড়ালে।
Avatar: hu

Re: তোমার নাম... আমার নাম...

রোবু, আমাদের জেনরেশনের কথা বা আরো স্পেসিফিকালি বললে আমাদের জেনরেশনের আলোকপ্রাপ্তদের দিয়ে সব বিচার হয় না। লেখিকা শুরু করেছেন তাঁর মা-কে দিয়ে। ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ আনব না। ঐ জেনরেশনের মহিলাদের যদি দেখি - তাঁদের কাছে টাকা রোজগার করতে বাইরে বেরোনোটা বাধ্যতামূলক ছিল না। অনেকেই করেছেন। ছকের বাইরে গিয়েই করেছেন। টাকা রোজগার করবে বাড়ির পুরুষ, সংসার দেখবে মেয়ে - এই প্রত্যাশা দুতরফেই অনবশ্যক চাপ। আর তার দায়বহন দুতরফেই ক্লান্তিকর।
Avatar: jhiki

Re: তোমার নাম... আমার নাম...

হু কে পোচ্চুর ক। যা যা বলার ছিল হু বলে দিয়েছে।
Avatar: শ্রাবণী

Re: তোমার নাম... আমার নাম...

হুচি ঠিকঠাক বলেছে.......একচোখ বুজে দেখায় আমরা বেশীরভাগেরাই দড়, সে যে চোখই হোক না কেন!
লেখাটা ভালো।
Avatar: dhurandhar

Re: তোমার নাম... আমার নাম...

যে পুরুষতন্ত্র মেয়েদের ‘উদ্বুদ্ধ’ করে ওজন কমাতে, সেই পুরুষতন্ত্রই বাজারে আনে ‘প্যাডেড ব্রা’ খুব ভালো
লেখা

Avatar: PM

Re: তোমার নাম... আমার নাম...

লেখাটা ভালো। হুচির বলা কথাও দরকারী। সংসারে পুরুষরা "প্রোভাইডার" এই সাঃ নিঃ নিপাত যাক পুরুষতন্ত্রের সাথে
Avatar: Ishani

Re: তোমার নাম... আমার নাম...

কলম অক্ষয় হোক !
Avatar: K.S.

Re: তোমার নাম... আমার নাম...

খুব খুব ভালো লাগলো। আপনার কলম চলতে থাকুক।
Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: তোমার নাম... আমার নাম...

সংহতি। জয় হোক!

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 2 -- 21


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন