খবর্নয়? (৩রা মে)


লিখছেন --- খবরোলা অ্যান্ড কোং


আপনার মতামত         



এবারের খবর্নয়? : সন্ত্রাস এবং অন্যান্য

লঙ্কা কান্ড
বেশ কিছুদিন ধরেই খবরের শিরোনামে রয়েছে শ্রীলঙ্কা। তামিল টাইগারদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষের যুদ্ধ ঘোষণা এবং যুদ্ধের ফলে ক্রমশ: কোণঠাসা হয়ে যাওয়া LTTE রা, সব মিলিয়ে রাজাপক্ষের মুখে এখন সাফল্যের চওড়া হাসি। আর সেই হাসির ফাঁকেই চাপা পড়ে যাচ্ছে শ্রীলংকার বর্তমান রাজনৈতিক এবং গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি, যা এই যুদ্ধের থেকে কম ভয়ানক নয়। প্রেসিডেন্ট তার যুদ্ধটা শুধু মাত্র তামিল টাইগারদের বিরুদ্ধেই শুরু করেননি, সেই একই যুদ্ধ তিনি অনেকদিন থেকেই শুরু করে দিয়েছেন দেশের মধ্যে। এই যুদ্ধে তিনি প্রতিপক্ষ হিসেবে বেছে নিয়েছেন বিরোধী দল গুলোকে এবং সেই সমস্ত মিডিয়াকে যারা তার কাজের সমালোচনায় মুখর হয়। তাই বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে সমস্ত বিরোধী কন্ঠকে চাপা দেওয়ার এক ভয়ানক চেষ্টা এবং তার পুরোটাই সরকারী ক্ষমতার (অপ)ব্যবহার করে।

গত তিন বছরে অন্তত পাঁচ জন বিরোধী পক্ষের সাংসদ খুন হয়ে গেছেন, নিখোঁজ হয়েছেন আরো অনেকেই। সমস্ত ক্ষেত্রেই তদন্তের ব্যপারে আশ্চর্য নীরব থেকেছে পুলিশ, এবং আজ অব্দি কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় নি। সবচেয়ে বড় আঘাত নেমেছে মিডিয়ার ওপর। ২০০৯ এর জানুয়ারীতে Sunday Leader এর চিফ এডিটর বিক্রমাতুঙ্গের মৃত্যু হয় অজ্ঞাত আততায়ীদের হাতে। সরকারী কাজকর্মের সমালোচনা করা এবং সরকারের অপদার্থতা তুলে ধরার জন্য বহুদিন থেকেই টার্গেট হয়ে ছিলেন ইনি। এমনকি মৃত্যুর আগে তাঁর লেখা শেষ প্রবন্ধে তিনি মন্তব্য করে গিয়েছিলেন যে " When finally I am killed, it will be the government that kills me "। শুধু ইনি নন, ২০০৯ তেই ঠিক এভাবে আততায়ীদের হাতে প্রান হারিয়েছেন অন্তত ৮ জন সাংবাদিক। নিখোঁজ হয়ে গেছেন আরো অনেকেই। দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন বহু।

অজানা বন্দুকধারীদের হাতে মারা গেছেন Uthayan পত্রিকার রিপোর্টার রাজিবরামন, নিলম পত্রিকার এডিটর চন্দ্রবোস সুথহরন। নিখোঁজ হয়েছেন Thinakural পত্রিকার সাংবাদিক সুব্রমনিয়াম রমচন্দ্রন এবং নিমালারাজা। সব ক্ষেত্রেই আশ্চর্য নিষ্ক্রিয়তা দেখিয়েছে পুলিশ। অবশ্য এটাই প্রথম নয়, এর আগে ২০০৬ তে আক্রমণ হয়েছিলো Uthayan পত্রিকার অফিসে। সেই ঘটনার তদন্ত আজও শেষ হয় নি। গত ২৫শে অক্টোবর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ৫ টি বেসরকারী এফ এম স্টেশন। একইভাবে আটকে দেওয়া হয়েছে Tamilnet নামের ওয়েবসাইটটিকে, যা LTTE অধ্যুষিত জায়গা সম্পর্কে খবর আনার জন্য বিখ্যাত ছিল। Agence France-Presse এর এক সাংবাদিক জানান যে এমনকি সাদ্দাম জমানার ইরাকেও সাংবাদিকরা এত আতঙ্কের মধ্যে থাকতেন না।

শুধু 'অজানা' আততায়ীরা নয়, সমান ভাবে সন্ত্রাস সৃষ্টি করছেন সরকারী মন্ত্রীরাও। কিছুদিন আগেই শ্রম মন্ত্রী Mervyn Silva দলবল পাকিয়ে হামলা চালান Rupavahini র অফিসে, এবং মারধোর করেন নিউজ এডিটরকে। Daily Mirror এর সম্পাদিকাকে সরাসরি হুমকি দেন প্রেসিডেন্টের ভাই, যিনি নিজেও শ্রীলংকার প্রতিরক্ষা সচিব। এই তালিকা শেষ হওয়ার নয় কিছুতেই। ক্রমশ: বেড়েই চলেছে এই সংখ্যা। নিখোঁজ মানুষের সংখার দিক থেকে রেকর্ড করেছে শ্রীলংকা। Reporters sans frontiers (RSF) এর বিচারে মানবাধিকার এবং নিরাপত্তার দিক থেকে শ্রীলংকার স্থান ১৬৫ (১৭৩ টি দেশের মধ্যে)। এক ভয়ানক চাপা আতঙ্ক ছড়িয়ে রয়েছে সর্বত্র, আর জোর করে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে সব বিরোধী কন্ঠ কে। আরো জানতে হলে পড়ুন,
www.rsf.org , www.nytimes.com , radicalnotes.com

অথবা দেখতে পারেন এই ভিডিওটিও:
ibnlive.in.com


লালগড় ১
লোকসভা নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যেই সম্প্রতি একটি সর্বভারতীয় তথ্য অনুসন্ধানকারী দল ঘুরে গেলো লালগড়। দশ সদস্যের এই দলে ছিলেন এক প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত, সুপ্রীমকোর্টের আইনজীবি, অর্থনীতিবিদ, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক, লেখক ও ছাত্রেরা। ১০ই ও ১১ই এপ্রিল, দলটি লালগড় ও বেলপাহাড়ি যায়। স্থানীয় মানুষ, পুলিশ প্রশাসন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের সাথে কথা বলে তাঁরা একটি "ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং' রিপোর্ট তৈরি করেছেন। এই রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, লালগড়ের বেশীরভাগ মানুষই সুরক্ষিত পরিবেশে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পক্ষে। তাঁরা ভয় পাচ্ছেন পুলিশি সহযোগিতায় সিপিএম-এর দলীয় বাহিনীর সন্ত্রাসকে।

এই ভয় অমূলক কিছু নয়। ২০০০ সাল থেকে উপর্যুপরি মাওবাদী দমনের ছুতোয় পুলিশের এই বল্গাহীন অত্যাচার চলেই যাচ্ছে, মুখ্যমন্ত্রীর কনভয়ে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণের পর যা চরমে পৌঁছয়। । ২০০৮-এর ২রা নভেম্বর, মুখ্যমন্ত্রীর কনভয়ে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটে শালবনিতে। আর এই ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে পুলিশ ৫০ কিমি দূরে লালগড় থেকে গ্রেপ্তার করে তিন স্কুলপড়ুয়া সহ সাতজনকে। সারা অঞ্চল তোলপাড় করে চালানো হয় তল্লাশি - বেধড়ক মারধোর করা হয় বৃদ্ধ ও মহিলাদেরও। শেষরক্ষা অবশ্য হয়নি - সাজানো কেস আদালতের রায়ে মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে। অত্যাচার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় আদিবাসীরা "পুলিশি সন্ত্রাস বিরোধী জনগণের কমিটি' গঠন করে এলাকা থেকে পুলিশ ও শাসকদলের কর্মীদের হঠিয়ে দেন।

স্থানীয় মানুষ, বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্টভাবেই জানা যাচ্ছে যে লালগড়ে শাসক দলের বাহিনীর তাণ্ডব চালিয়েছে, এবং তা চলেছে পুলিশের উপস্থিতিতেই। অতএব আহতদের চিকিৎসা বা মৃতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ জাতীয় প্রশ্নের উত্তর নিÖপ্রয়োজন। অন্দোলনকারীদের আগ্নেয়াস্ত্র মজুদের সরকারী গল্পও ধোপে টিকছে না, কারণ দুদিনের মধ্যে তথ্য অনুসন্ধানকারী দলটি, এমনকি ২০০ সশস্ত্র পুলিশের সামনে মিছিলের সময়েও, হাতুড়ি, কাস্তে, কুড়ুল আর তীর-ধনুকের বেশী কিছুর দর্শন পান নি।

লালগড়ে পুলিশি সন্ত্রাস বিরোধী জনগণের কমিটি এলাকার মধ্যে পুলিশ বা নিরাপত্তারক্ষীদের প্রবেশে বাধা দিচ্ছে, এ কথা অবশ্যই সত্যি। কিন্তু একই সঙ্গে জনগণের কমিটি স্পষ্টভাবেই জানাচ্ছে- তারা শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে আগ্রহী। নির্বাচনের ছুতোয় পুলিশকে এলাকায় ঢুকতে না দিলেও, ভোটকর্মীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব তারা নিজেরাই নেওয়ার প্রস্তাব রেখেছে।

জনগণের কমিটির সাংগঠনিক কাঠামোটি ও অত্যন্ত কৌতুহলোদ্দীপক। প্রত্যেক গ্রামের আঞ্চলিক ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকছে ৫ মহিলা ও ৫ পুরুষের একটি গ্রাম কমিটির হাতে। পুলিশকে অর্ধচন্দ্র দেওয়া ইস্তক গ্রাম পঞ্চায়েত চলছে সুষ্ঠুভাবে। তিন বছরের পরিত্যক্ত একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পুনরায় চালু করার ব্যাপারে আন্দোলনকারীদের উৎসাহ চোখে পড়ার মতো। সকাল ৭টায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দরজা খোলার আগে ২০০ মানুষের ভিড় জমে। সামগ্রিক ছবিটা, আদতে, কিছু বংশানুক্রমে শোষিত মানুষের আত্মরক্ষা ও উন্নয়নের দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার।

সূত্র :
kafila.org , sanhati.com(1) , sanhati.com(2) , sanhati.com(3) , sanhati.com(4)

লালগড় ২
লালগড়ে হিংসা কি নিতান্তই একতরফা? এই লেখা চলাকালীনই এলাকায় খুন হলেন কয়েকজন সিপিএম নেতা-কর্মী। বিনপুরে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে মারা গেলেন ৩ ভোটকর্মী। আর এর মধ্যেই একটি বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে মাওবাদী শীর্ষনেতা কোটেশ্বর রাও ওরফে কিষেণজী লালগড়ে তাঁদের সরব উপস্থিতির কথা জানালেন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, যে ২০০০ সালে, প্রাথমিকভাবে শাসকদলের সঙ্গে জোট বেঁধে তাঁরা কেশপুর এলাকায় "গরীবের পক্ষে' লড়াই শুরু করেছিলেন। সিপিআইএম সেসময়ে তাঁদের অস্ত্র সাহায্যও করে। পরবর্তীকালে নন্দীগ্রাম কান্ডে তাঁরা অস্ত্র পান বিরোধী দলের কাছ থেকে। আর লালগড়ে তাঁরা একক ভাবেই "লড়ছেন'।

এই "লড়াই'তে গরীব ঘর থেকে আসা নিচু তলার পার্টিকর্মীদের হত্যা করে কি লাভ হচ্ছে, এই প্রশ্নের উত্তরে কোটেশ্বর রাও বলেন, এ পর্যন্ত যতগুলি হত্যা মাওবাদীদের পক্ষ থেকে ঐ এলাকায় করা হয়েছে, তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খুনগুলি করা হয়েছে, সমস্ত "যুক্তি' এবং "বোঝানো' ব্যর্থ হবার পরেই। বেশ কিছুদিন আগে যে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে আস্ত একটি মেডিকাল টিমকে উড়িয়ে দেবার ঘটনাটিকে অবশ্য তিনি "ভুল' হিসেবেই স্বীকার করেন। বাকি হত্যাগুলির ২০% ক্ষেত্রে তাঁদের আরও "বোঝানো' উচিত ছিল বলেও তিনি মনে করেন। এইসব সিদ্ধান্তগুলি নেবার আগে যাতে আরও চিন্তাভাবনা করা হয়, সে নিয়ে তাঁদের পার্টি মধ্যে একটি শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়াও চালু হয়েছে, বলে জানালেও, হিংসার রাজনীতি ছেড়ে আসার কোনো ইঙ্গিত তিনি দেননি। তথাকথিত মুক্ত এলাকাগুলিতে সিপিএম সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলির রাজনীতি করার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রসঙ্গে তাঁর কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায়নি সাক্ষাৎকারটিতে। ফলে একদিকে আদিবাসীদের "মূল স্রোত'এ আনার জন্য প্রশাসনের "বোঝানো', অন্যদিকে "সঠিক' পথে আনার জন্য মাওবাদীদের "বোঝানো', সঙ্গে হিংসা ও খুনজখম, জঙ্গলমহলে আপাতত: চলছে, চলবে।
timesofindia.indiatimes.com

আমেরিকা ও সিআইএ
সব শেষে একটি ছোট্টো খবর। ছোটো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। খোদ আমেরিকায় ছাত্র বিক্ষোভের কারণে Central Intelligence Agency (CIA) - কে তাদের রিক্রুটমেন্ট সেশন বন্ধ করে দিতে হল ইউনিভার্সিটি অফ ইলিনয়ের একটি ক্যাম্পাসে। গত ৯ই এপ্রিল ইউনিভার্সিটি অফ ইলিনয়, আরব্যানা-শ্যাম্পেনে সিআইএর একটি রিক্রুটমেন্ট সেশনে যৌথভাবে বিক্ষোভ দেখায় ক্যাম্পাস অ্যান্টি-ওয়ার নেটওয়ার্ক, ইরাক ভেটারেন্স এগেইন্‌স্ট দ্য ওয়ার এবং ইন্টারন্যাশনাল সোস্যালিস্ট অর্গ্যানাইজেশন। সম্পুর্ন শান্তিপূর্ণ এই বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বিক্ষোভকারী ছাত্ররা কেউ কেউ আবু ঘ্রাইব বা বাগরাম জেলের বন্দীদের পোষাকে এসেছিলেন। পুলিশ ডেকে বিক্ষোভকারীদের বাইরে বার করে দিতে চাইলেও পুলিশ অবশ্য ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দেখানোর অধিকার মেনে নেয় ও তাদের সরিয়ে দিতে অস্বীকার করে। সিআইএ -র বিভিন্ন প্রকাশ্য ও গোপন জেলে সন্ত্রাসবাদী সন্দেহে আটক বন্দীদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার, সমস্ত আন্তর্জাতিক ও জাতীয় মানবাধিকার আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিনা বিচারে তাদের দিনের পর দিন আটকে রাখা, ও এই ব্যাপারে সাধারণ নাগরিক এবং সারা বিশ্বের কাছে তথ্য গোপন করার বিরুদ্ধেই ছিল এই বিক্ষোভ। শেষ পর্যন্ত রিক্রুটমেন্ট সেশন বন্ধ করে সিআইএর পিছু হঠাকে বিরাট জয় হিসেবেই দেখছেন বিক্ষোভকারী ছাত্র ও স্থানীয় অ্যাক্টিভিস্ট-রা।

www.ucimc.org



৩রা মে, ২০০৯