খবর্নয়? (৯ মার্চ)


লিখছেন --- খবরোলা অ্যান্ড কোং


আপনার মতামত         




আজকের খবরগুলি ৮ ই মর্চ উপলক্ষে। সেই ১৯১১ তে ক্লারা জেটকিন, আলেকসান্দ্রা কোলনতাই দের হাত ধরে সমান অধিকার অর্জনের, মানুষের মতন বাঁচার অধিকার অর্জনের লড়াই শুরু যে দিনটাতে। আজ ও চলছে সমানে। আরো কতদিন চালাতে হবে কে জানে। সেই লড়াইয়ের ই কিছু সেভাবে খবর না হয়ে ওঠা খবরের খন্ডচিত্র রইলো আজকের খবর্নয়(?) তে ।


কঙ্গো
--------
""গত দশ বছর ধরে এই হাসপাতালে এসেছেন অসংখ্য মহিলা যারা শুধু ধর্ষণই নয়, অকথ্য শারীরিক অত্যাচারের শিকার। আক্ষরিক অর্থেই নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে তাদের যৌনাঙ্গ। বেশিরভাগই অল্পবয়সী মেয়ে, সবে বয়:সন্ধি পেরোনো। মল মুত্রে মাখামাখি অবস্থায় এদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। এই অবস্থায় এদের হাসপাতালে ভর্তি করা, কোনো ধরনের পরিচর্যা করা খুবই কঠিন। আমরা এখানে এসেছি কারণ আমরা আশা রাখি আমাদের কথা পৃথিবী শুনবে। এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মেয়েদের ওপর এই অত্যাচার কোনো ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।''- ৯ই ফেব্রুয়ারী ডেমোক্র্যাসি নাউ চ্যানেলের জন্য এমি গুডম্যান-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই কথাগুলি জানালেন ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো-র ( DRC ) গাইনোকলজিস্ট ড: ডেনিস মুকওয়েগে। কঙ্গো-র খুবই অল্প কয়েকটি হাসপাতাল, যেখানে ধর্ষিতা ও মিউটিলেটেড মহিলাদের চিকিৎসা হয়, ড: মুকওয়েগে-র প্যান্‌জি হাসপাতাল তার মধ্যে একটি। তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা গত এক দশক ধরে ২১০০০ এরও বেশি ধর্ষিতা ও মিউটিলেটেড মহিলার চিকিৎসা করেছেন।

গত এক দশকে কঙ্গো-তে বিভিন্ন সময়ে সাতটি আর্ম্‌ড্‌ গ্রুপ ক্ষমতা দখল করে। সরকারি মিলিটারি সহ প্রতিটি আর্ম্‌ড্‌ গ্রুপই মেয়েদের ওপর নির্বিচারে অত্যাচার চালিয়েছে। এ বছরের গোড়া থেকে এখনো অবধি কঙ্গো-র যুদ্ধ বিধ্বস্ত অঞ্চলে মারা গেছেন ৯০০ মানুষ এবং ধর্ষিত হয়েছেন অগুনতি মহিলা। পৃথিবীর বাকি সমস্ত জায়গার মতই এখানেও মেয়েদের ওপর অত্যাচার ও ধর্ষণ যুদ্ধেরই অঙ্গ। কি ভাবে বন্ধ করা যায় এই অত্যাচার? ড: মুকওয়েগে অবশ্য কোনো আশা দেখতে পাচ্ছেন না। মিলিটারির ভয়ে কেউ সাক্ষ্য দিতে চায় না। তাঁর আশংকা প্যান্‌জি হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়া মেয়েরাও হয়তো আবার এই পরিস্থিতির শিকার হবেন। তাঁর মতে এই যুদ্ধ, গণধর্ষণ, গণহত্যা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া বন্ধ করা অসম্ভব।

এই যুদ্ধ ও নির্বিচার গণধর্ষণের মূল কারণ হল কঙ্গো-র প্রাকৃতিক সম্পদ ""কোল্‌টান''। কোল্‌টান হল নিওবিয়াম আর ট্যান্টালাম ধাতুর আকরিকের স্থানীয় নাম। আপনার আমার ল্যাপটপ, সেল ফোন, ডিজিটাল ক্যামেরা, ভিডিও গেম কনসোল থেকে নানা ধরনের ইলেকট্রনিক জিনিস বানাতে লাগে এই খনিজ। কাজেই এর বড় ক্রেতা মূলত প্রথম বিশ্ব, রাশিয়া আর চিনের মতো দেশগুলি। দীর্ঘদিন ধরে এই খনিজ সম্পদ দখলের লড়াই চলছে কঙ্গো-র প্রতিবেশী দেশ উগান্ডা, বুরুন্ডি, রোয়ান্ডা এবং তাদের প্রক্সি মিলিশিয়াদের মধ্যে - যার বলি হচ্ছেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ আর অসংখ্য মহিলা।

তবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন কঙ্গো-র নির্যাতিতা মহিলারা। তাঁরা শুরু করেছেন Stop Raping Our Greatest Resource: Power to the Women and the Girls of the DRC নামে এক ক্যাম্পেন। ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে গোমা, বুনিয়া আর বুকাভু শহরে এই দাবীতে ব্যাপক জমায়েত ও বিক্ষোভ হয়। প্রতিটি শহরে জমায়েতে অংশ নেন ৮০০০-১০০০০ মহিলা, অফিশিয়াল-দের সামনে তাঁরা খোলাখুলি বলেন তাঁদের ওপর ভয়াবহ অত্যাচারের কথা। সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন, আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন ভ্যাজাইনা মনোলগের স্রষ্টা ইভ এন্সলার, দাবী তুলেছেন - এই ধর্ষণ ও অত্যাচার এক্ষুনি বন্ধ করতে হবে। পাশে দাঁড়িয়েছেন UNICEF ও। এই অসাধারণ সাক্ষাৎকারটির লিংক - http://www.democracynow.org/2009/2/9/playwright_v_day_founder_eve_ensler

ইরাক
-------
প্রায় ৬০ শতাংশ মহিলা জানালেন যে নিরাপত্তার অভাবই তাঁদের উদ্বেগের মূল কারণ। ৪০ শতাংশেরও বেশি মহিলা জানালেন যে ২০০৬ ও ২০০৭ এর তুলনায় তাঁদের নিরাপত্তার হাল আরও খারাপ হয়েছে। ৫৫ শতাংশ মহিলা হিংসার শিকার। ২৫ শতাংশ মহিলা আবার রোজকার খাবার জলই পান না। আর ৪০ শতাংশ মহিলার ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায় না। না-পাওয়ার তালিকায় আরও আছে বিদ্যুত, চিকিৎসা, মানবিক সাহায্য, পেনশন। এর ওপর ১২ শতাংশ ঘরোয়া হিংসার শিকার। এটা হল "মুক্ত' ইরাকে মহিলাদের অবস্থা। অক্সফ্যাম এবং আল-আমাল অ্যাসোসিয়েশন এর উদ্যোগে করা সার্ভেতে অংশ নেওয়া ১৭০০ মহিলা জানালেন তাঁদের অবস্থার কথা, তাঁদের পরিবারের রোজকার জীবনের কথা। ইরাকের পাঁচটি অঞ্চল - বাগদাদ, বসরা, কারকুক, নাজাফ, ও নিনেভে-তে মহিলাদের মধ্যে করা এই সার্ভে হয়তো পুরো ইরাকের ছবিটা তুলে ধরে না, কিন্তু এই খন্ডচিত্র থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে গত ৬ বছর ধরে ইরাকি মহিলারা প্রতিদিন তাঁদের অধিকার হারাচ্ছেন, নি:শব্দে, তলিয়ে যাচ্ছেন অসম্ভব দারিদ্রের মধ্যে। পুরো রিপোর্টটি পাওয়ার জন্য দেখুন - http://www.oxfam.org/en/pressroom/pressrelease/2009-03-08/iraqi-women-in-grip-silent-emergency-despite-security-gains

আমেরিকা
----------
আমরা দেখছি, পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন-এর প্রয়োজনীয়তাকে শিল্পমহল, সরকার ও মিডিয়ার দিক থেকে বারেবারে প্রশ্নচিহ্নের মুখে ফেলা হচ্ছে। সংশয় প্রকাশ করা হছচছে, শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে শ্রমিক সংগঠনগুলির ভূমিকা নিয়ে। এই পটভূমিকায়, আসুন দেখি, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিক সংগঠন কিভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে- Center for economics and Policy Research -এর একটি গবেষণাপত্রে ( Unions and Upward Mobility for Women Workers ) John Schmidt দেখালেন মহিলা শ্রমিকদের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হচ্ছে সংগঠিত হবার মধ্যে দিয়ে ( http://www.zmag.org/znet/viewArticle/20664 )। তাঁর গবেষণা প্রমাণ করলো, আমেরিকার unionized মহিলা শ্রমিকদের বেতনহার অসংগঠিতদের তুলনায় প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ বেশি। এছাড়াও সংগঠিত আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে মহিলা শ্রমিকরা আদায় করে নিচ্ছেন পেনশন ও হেলথ ইনসিওরেন্স সংক্রান্ত বেশ কিছূ সুযোগসুবিধাও। মহিলা শ্রমিকদের মধ্যে ইউনিয়ন এতোটাই সফল যে, শুধুমাত্র হাইস্কুল পাশ মহিলা শ্রমিকরা ইউনিয়নের মাধ্যমে যে বেতনহার বা আনুষঙ্গিক সুবিধা পাচ্ছেন, তা ইউনিভারসিটি গ্‌র্‌যাজুয়েট অসংগঠিত কর্মরতাদের থেকেও বেশ কিছুটা বেশি। এবং প্রায় সমস্ত ধরণের শিল্পের ক্ষেত্রেই এই এক-ই চিত্র দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ আমেরিকা মুলুকেও শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা হচ্ছে দাবীদাওয়া আদায়ের সংগঠিত লড়াইয়ের মধ্যে দিয়েই-প্রাসঙ্গিক থাকছে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনগুলি।

পাকিস্তান
-----------
মেয়েটির অপরাধ তার ভাই প্রেমে পড়েছিল যে মেয়ের, সে বিরোধী উপজাতির। মোড়ল সভার বিচারে অভিযুক্ত ভাই কে ছেড়ে দেবার আবেদন জানয় মেয়েটি। আবেদন মঞ্জুর ও হয়। একটি শর্তে। পারিবারিক শাস্তি স্বরূপ মেয়েটিকে গণধর্ষণ করা হবে।
আর করা হয় ও।
না, মেয়েটি এরপর আত্মহত্যা করেনি। তার সমাজে ধর্ষিত হওয়া অনপনেয় কলঙ্ক, এমনকি, 'অপরাধ' জেনেও। সাহস করে অভিযোগ করেছিল। বলেছিল, ধর্ষিতা নয়, ধর্ষণকারী প্রকৃত অপরাধী। এই ঘটনা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল দেখী ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার। আর সেই চাপে নতি স্বীকার করে নজিরবিহীনভাবে শাস্তি দেওয়া হয় অপরাধীদের।

বলিউডি ফিল্মের প্লট মনে হচ্ছে?
উঁহু। হলিউড।
সিটি অব গড এর সহ পরিচালিকা কাটিয়া লুন্ডের পরবর্তী ফিল্মের গল্প এটি।
তবে গল্প হলেও সত্যি।
এই সিনেমার সাথে বাস্তবের কোনো ঘটনা বা চরিত্রের মিল নেহাত কাকতালীয় নয়। এটি পাকিস্তানের মুখতার মাইয়ের জীবনের ঘটনা। যাকে নিয়ে এতদিনে বেস্ট সেলার গল্প লিখে ফেলেছেন নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক ক্রিস্তফ, বানিয়েছেন ভিডিও, ফোটো স্টোরি, 'Women giving hope to Women in Pakistan' । যেগুলোর প্রচার, পুন:প্রচার এই সাত বছর ধরে বিচারাধীন কেস কে মানুষের স্মৃতি থেকে ভুলতে দেয়নি।

লড়াই কিন্তু শেষ হয়নি। এই গত মাসেও, The News এর রাউফ ক্লাসরা আর war against rape সংস্থার কর্ণধার নাইম সাদিক জানাচ্ছেন,ঐ এলাকার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এখনো মাই ও তাঁর পরিবারকে চাপ দিয়ে চলেছেন, কেস প্রত্যাহারের জন্য। আশ্চর্যজনক ভাবে, PPP র মত কোন রাজনৈতিক দলের একজন মহিলা নেত্রীও একবারের জন্য অপরাধীদের শাস্তি দাবী করেননি। আশার কথা, এই ফিল্মটি বানানো হলে, পাকিস্তানের একটি স্বাধীন ডিজিট্যাল নেটওআর্ক এই বিতর্কিত চিত্রটি সারা দেশে দেখাবার বন্দোবস্ত করবে। আর আমরা আশা করবো, মুখতার মাই হয়ে উঠতে পারবেন Women giving hope to Women এর এক সফল উদাহরণ।
http://www.countercurrents.org/isa070309.htm