এই সপ্তাহের খবর্নয় ( ডিসেম্বর ৭)


লিখছেন --- খবরোলা অ্যান্ড কোং


আপনার মতামত         


শীত এসে গেল। ক্রমশ কমে আসছে তাপমাত্রা, গরম জামারা সূর্যের আলো দেখছে ইতিউতি, ছুটির দরখাস্তর ফাইলটা মোটাসোটা হচ্ছে প্রতিদিন, হাওয়ায় খুশি খুশি ভাব। এই সপ্তাহের খবর্নয়, তাই, খুব হালকা আর মজাদার হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু হলো না। কথায় আছে, Man proposes but God disposes . তাই এই সপ্তাহের খবর্নয় ছেয়ে থাকছে শুধুই সমস্যা, যাদের জন্য রোজ লক্ষ লক্ষ শব্দ খরচ হয়। আমরা তো ""শিক্ষিত ও প্রগতিশীল"", আসুন কিছু শব্দ অপচয় করে সেটাই প্রমাণ করি।

সমস্যা এক: সন্ত্রাসবাদ

একথা আজ আর কারুর অজানা নেই যে, ইসলাম ধর্মাবলম্বী সমস্ত মানুষই সন্ত্রাসবাদী। তাঁরা হয় আল-কায়দার লোক, নয় লাদেনের জামাই। সবাই জানে, তাই বিশ্বের কোন প্রান্তে বিস্ফোরণ হলেই মুসলমানদের গতিবিধির ওপর কড়া নজর রাখা হয়। মুম্বই এর সাম্প্রতিক উগ্রপন্থী হানার পরে যথারীতি মুসলিম দেখলেই নাড়িনক্ষত্র বিচার করা শুরু হয়েছে। সমস্ত এয়ারপোর্টে মুসলমানদের জন্য আলাদা ""খাতির"", সেরকম সেরকম ""বন্ধু"" দেশ হলে যখন তখন তল্লাশি বা আটক করা, এসবও শুরু হয়ে গেছে জোরকদমে। বা বলা ভালো, আগে থেকেই চলছিলো, এখন আরো বেশী করে হচ্ছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি গ্লাসগো বিমানবন্দরে প্রতিবাদ করেন বেশ কিছু মুসলমান যাত্রী। অভিযোগ , ঐ সমস্ত যাত্রীদের প্রায় তিন ঘন্টা করে আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ চালান ""স্পেশাল ব্রাঞ্চের"" অফিসাররা। আরো অভিযোগ, সমস্ত অমুসলমান যাত্রীদের এই ""সতর্কতামূলক"" ব্যবস্থা থেকে বাদ দেওয়া হয়, তাদের যাতায়াতে তেমন বিঘ্ন ঘটানো হয়নি। এসব ক্ষেত্রে যা হয়, প্রতিবাদ হওয়ার পরেই আইনি কূটকচালি শুরু হয়ে গেছে। প্রশাসকদের খুব পছন্দের কয়েকটি কথার মধ্যে একেবারে ওপরের দিকে থাকে দুটি বাক্য। এক: আমরা একটা তদন্ত কমিটি তৈরী করছি। দুই: কমিটির রিপোর্ট খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সমস্যা দুই: সন্ত্রাসবাদ

জামাত-উল-দাওয়া পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের একটি স্কুল। মিডিয়া দীর্ঘদিন ধরে প্রচার করে আসছে, উল্লিখিত স্কুলটি পাকিস্তানী উগ্রপন্থী সংগঠন লস্কর-এ- তৈবার ধাত্রীভূমি। এখানেই নাকি ভবিষ্যতের জেহাদীদের তালিম দেওয়া হয়, তাদের অস্ত্রশিক্ষা দেওয়ার জন্য নাকি অত্যাধুনিক ব্যবস্থাপনা আছে স্কুল ক্যাম্পাসেই। যদিও কোনো প্রমাণ দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি কেউ। মিডিয়ার এত উৎসাহ, অথচ কোথাও অস্ত্রশিক্ষার ছবি বেরোয়নি। কিন্তু প্রমাণ নেই তো কি, মুম্বই হামলার পরে লস্করের সাথে সাথে জামাতের নামও আবার ভাসতে শুরু করেছে হাওয়ায়। খুব সম্ভবত এই ""খ্যাতি""র চাপ আর নিতে না পেরেই, জামাত থেকে সম্প্রতি আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলো দেশ বিদেশের বেশ কিছু সংবাদসংস্থাকে, যার মধ্যে বিবিসি-ও ছিলো। সাংবাদিকরা স্কুল এলাকা ঘুরে দেখেছেন খুঁটিয়ে। লাহোর থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে এই স্কুল প্রায় ৭৫ একর জমি নিয়ে তৈরী। জামাতের মুখপাত্র জানিয়েছেন, "" আমাদের স্কুলে খুব ভালো ল্যাবরেটরি আছে বিজ্ঞানশিক্ষার জন্য। ইংরেজী ও বিজ্ঞানের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। ছেলেদের এবং মেয়েদের জন্য আলাদা মাদ্রাসা এবং হোস্টেল আছে। এই মুহূর্তে এখানে ৫৩০ জন ছাত্র ও ৩৪৫ জন ছাত্রী পড়াশোনা করে।""

বিবিসির রিপোর্ট বলছে, জঙ্গী সংগঠনের সাথে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, বরং আরো পাঁচটা স্কুলের মতই লেগেছে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হালচাল। কেমিস্ট্রি ল্যাবে কেউ বোমা বানাচ্ছিলো বলে খবর নেই, বরং একটা সদ্য নির্মিত হাসপাতাল পাওয়া গেছে। সাংবাদিকরা বলেছেন, ""এই স্কুল যদি জঙ্গী তৈরীর কাজে ব্যবহৃত হয়, তবে স্বীকার করতেই হবে যে তারা গোপনীয়তায় বিশ্বাস করে না, কারণ আমরা স্কুলের প্রতিটি অন্ধিসন্ধি দেখে এসেছি। ওঁরাই দেখিয়েছেন।""

এরকম স্কুল পাকিস্তানে আরো আছে। এরকম স্কুল পৃথিবীতেই আরো অনেক থাকা সম্ভব। এরকম স্কুল, মানে এমন স্কুল যেখানে মুসলমান ছাত্রছাত্রীরা পড়াশুনো করে। হয়ত একদিন প্রমাণ হবে যে সত্যিই ওরা সন্ত্রাসবাদী। হয়ত একদিন প্রমাণিত হবে যে ওরা নির্দোষ। কিন্তু যাই ঘটুক, অভিযোগের আঙুল তোলা বন্ধ হবে না। ততদিন ধরে সমস্বরে আমরা বলতে থাকবো ""ওরা জঙ্গী"", যতদিন না জামাত-উল-দাওয়া লস্করের শাখা সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

সমস্যা তিন: সন্ত্রাসবাদ

আট-দশ-বারো বছরের বাচ্চারা এ-কে-৪৭ চালাচ্ছে দেখতে কেমন লাগে? গর্ব হয়? মনে হয় কি, এরা কত প্রতিভাবান? এমনিতে ঐ বয়সের ছেলেমেয়েরা যখন তিরিশ-চল্লিশ বছরের পেশাদারদের মত অভিনয় করে বা গান গেয়ে নেচে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখে, তখন বাবা-মায়ের গর্ব ও প্রতিবেশীদের হিংসে হওয়াই দস্তুর। আজকাল একটা কথা খুব শোনা যায়, "" ক্রিয়েটিং অপর্চুনিটি ""। জনপ্রিয় অনুষ্ঠানে ছোটো ছেলেমেয়েদের ""প্রতিভা"" প্রদর্শনের সুবিধে আগে ছিলো না, এখন হয়েছে। কিন্তু ছোটোদের হাতের টিপ কেমন, বা যুদ্ধটুদ্ধ করার প্রতিভা আছে কিনা যাচাই হবে, সেরকম ট্যালেন্ট-হান্ট এখনও অপ্রতুল। এই অব্যবস্থার মধ্যে যদিও উজ্জ্বল নাম ""তামিল টাইগার""। বহুদিন ধরেই শ্রীলঙ্কার এই জঙ্গী সংগঠন বাচ্চাদের ব্যবহার করে আসছে। একজন দুজন নয়, বেশ কিছু কিশোর তামিল টাইগারের হয়ে লড়ছে। ২০০৪ সালে তামিল টাইগার থেকে সরে এসে সরকার পক্ষের হয়ে লড়তে শুরু করে একদা জঙ্গী-অধুনা জঙ্গীবিরোধী দল টি-এম-ভি-পি। দেখা যাচ্ছে, শুধু এই ছোটো শাখা সংগঠনেই ১৩৩ জন আছে যারা আঠারো বছরের নিচে। ইউনিসেফের সাথে এক চুক্তি থাকার ফলে শ্রীলঙ্কা সরকার এই কিশোরদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে বাধ্য করছে এখন। আমরা জানিনা এই ১৩৩ জন, ওরা স্বাভাবিক জীবন বলতে কি বুঝবে। ওদের ""স্বাভাবিক"" করে তুলতে সবার আগ্রহের অন্ত নেই, মিডিয়া চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে, এসব দেখলে সত্যি আশা জাগে। সত্যযুগ আসতে আর দেরী নেই। যদিও কেউ কেউ এই (অ)সময়েই জানতে চাইছেন, বাকিদের কি হবে? আরো বহু কিশোর এখনও তামিল টাইগারের হয়ে লড়ছে, তাদের কি হবে? ১৩৩ জনকে যেদিন ""স্বাভাবিক"" হতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো, সেদিনই হয়ত দ্বিগুণ সংখ্যক শিশুর হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছে । যদিও আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, এইসব ছোটোখাটো ব্যাপারে নাক গলানো সরকারের কাজ নয়।



ডিসেম্বর ৭ , ২০০৮