বংশোপক্রমণিকা


লিখছেন --- রঙ্গন


আপনার মতামত         


"যেখানে যত বাঁশঝাড় সর্বত্র চোখের জল! যত বাঁশ আছে সবাই কাঁদছে।"- আজকালের প্রতিবেদন,
বসিরহাট, ৮ই নভেম্বর

এতদিন কাঁদে নি কেন সেটাই আশ্চর্য। এখন বাঙালীর দেবার জিনিষ বলতে তো বেঁচে আছে এই একটি। যে উদ্ভিদ চিত্রশিল্পীর অনুপ্রেরণা, গৃহস্থের মঙ্গলচিহ্ন, রন্ধনের উপকরণ, বাঙালী তার নামে বজ্জাতির আখড়া একটি ট্যাক্সো আপিসের নামকরণ ছাড়া কিছুই করে উঠতে পারল না। বাঁশ তো কাঁদবেই। যে বাঁশের ফিলামেন্টে প্রথম কৃত্রিম আলোকরশ্মি জ্বলে উঠল, যে বাঁশের কেল্লায় তিতুমীর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মহান যুদ্ধ লড়ে গেলেন, যে বাঁশঝাড়ের মাথায় চাঁদ উঠলে কাজলাদিদির কথা মনে পড়ত, এখন সেই বাঁশ শুধু দেবার জন্য? একসময় বাঙালী কিন্তু বাঁশের যথেষ্ট কদর করত। তখন শত্রুকে নির্বংশ হবার অভিশাপ দেওয়া হত, এবং বন্ধুকে বংশরক্ষা বা বংশবৃদ্ধির শুভেচ্ছা জানানো হত। হায় বাঁশ, তোমার সে দিন নাই। এখন তুমি স্রেফ দেওয়ার জন্য, নেওয়ার জন্য নও।

এই মহা-উর্বর এবং মাল্টিফসলী বঙ্গভূমিতে বহুপ্রকার বাঁশ হওয়া সম্ভব। ব্রহ্মচর্যে স্কুল-বাঁশ, গার্হস্থ্যে সংসার-বাঁশ, বাণপ্রস্থে হসপিটাল-বাঁশ এবং সন্ন্যাসে শ্মশান-বাঁশ, বাঁশের একটি বহুলপ্রচলিত ট্যাক্সোনমি। কিন্তু এই লেখাটিতে আমরা সেই সব বাঁশ নিয়েই দুই একটি কথা বলব, যারা শুধু বহুলপ্রচলিতই নয়, বহুলপ্রচারিতও বটে।

এক, সরকারী বাঁশ। এই প্রজাতির বাঁশ সবথেকে সহজলভ্য। সব গাছের মধ্যে বাঁশ সবথেকে তাড়াতাড়ি বাড়ে, আর সব বাঁশের মধ্যে এই বাঁশ সবথেকে তাড়াতাড়ি বাড়ে। এতই সুলভ, শস্তা এবং টিঁকাও যে একে শুধু বাঁশ না বলে পাতিবাঁশও বলা যেতে পারে। যতদিন দেশ আছে, ততদিন এই বাঁশ আছে। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও এই বাঁশ অতিসহজে ফলানো যায়। ছাউনিওয়ালা চার দেয়াল এবং একটি সাইনবোর্ড থাকলেই এই বাঁশের চাষ সম্ভব। ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে বৃটিশরা ডালহৌসী স্কোয়ার, নামান্তরে বি বা দী বাগের ধারে এই বাঁশের ফলন শুরু করেছিলেন। এই বাঁশের অসংখ্য উপপ্রজাতির মধ্যে পুলিশ-বাঁশ ও উকিল-বাঁশ সবথেকে কার্যকরী। শত্রুর জীবন "হেল" করে দেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষও অল্প আয়াসে এবং সামান্য অর্থব্যয়ে এই বাঁশ ব্যবহার করতে পারেন।

দুই, রাজনৈতিক বাঁশ। এই বাঁশ সরকারী বাঁশের মতই সহজলভ্য এবং উচ্চফলনশীল, কিন্তু বেশির ভাগ বাঁশ স্বল্পায়ু হওয়ায় দু তিনরকম বাঁশই বড় অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। সরকারী বাঁশের সাথে এই প্রজাতির বাঁশের আর একটি মিল হল- এরা পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ভারতের অন্যান্য রাজ্যে সহজেই বেড়ে উঠতে পারে। তবে পশ্চিমবঙ্গের মাটি ও জলবায়ু এইজাতীয় বাঁশের জন্ম ও বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত অনুকূল বলে মানা হয়। সাধারণত: শরৎকালে এইজাতীয় বাঁশের ফলন ও বৃদ্ধি কম হয়। বাকি দশমাস রাজ্যের প্রতি কোণে এই বাঁশ বিনা আয়াসেই দৃশ্যমান। অমাবস্যা-পূর্ণিমা ইত্যাদি বিশেষ তিথিতে যেমন নদী বা সমুদ্রে জল বেড়ে ওঠে, তেমনই বছরের কিছু তিথিতে এই বাঁশের বিস্তর বাড়বৃদ্ধি হয়। সেই সব বিশেষ দিনে সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বের হন না এবং সবার সব কাজকর্ম বন্ধ থাকে।

তিন, সাম্যবাদী বাঁশ। এই বাঁশ সরকারী বা রাজনৈতিক বাঁশের মত সারা ভারতে সহজলভ্য নয়। সাধারণত: পশ্চিমবঙ্গ, কেরল ও ত্রিপুরা রাজ্যে এই বাঁশের চাষ হয়ে থাকে। এই প্রজাতির সমস্ত বাঁশ বাঁদিকে হেলে বাড়তে থাকে। যদিও সাম্যবাদী, এই বাঁশের দৈর্ঘ্য কিন্তু বিভিন্নরকম হতে পারে। সব থেকে বড় বাঁশকে পলিটব্যুরো বলা হয়ে থাকে এবং একদম ছোটো বাঁশকে লোকাল কমিটি বলা হয়। এই বাঁশের গোড়ায় রাশিয়ান, চীনে বা কিউবান জৈব সার দিলে ফলন আরও ভালো হয়। এই প্রজাতির এত বেশি উপপ্রজাতি আছে যে তাদের নাম লেখার জন্য একটি আলাদা ম্যানিফেস্টো দরকার। তবে সাধারণত: এই বাঁশের এক উপপ্রজাতি অন্য উপপ্রজাতিকে বাড়তে দেয় না, এবং পারলেই ধ্বংস করে ফেলে। এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে মতাদর্শগত সংগ্রাম বলা হয়ে থাকে। ব্যতিক্রম হিসেবে যদি অনেক উপপ্রজাতির বাঁশ একই জায়গায় দেখা যায়, তাদের বাঁশফ্রন্ট বলা হয়।

চার, রাবীন্দ্রিক বাঁশ। এই প্রজাতির বাঁশ বিরল না হলেও দুর্লভ, সূক্ষ্ম এবং পেলব। পশ্চিমবঙ্গের মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু এই বাঁশের বৃদ্ধির পক্ষে উপযোগী। এদের স্বল্পদৈর্ঘ্য ও স্বল্পপ্রস্থের জন্য অনেকে এদের কঞ্চিও বলে থাকেন, তবে কে না জানে বাঁশের থেকে কঞ্চি ইত্যাদি ইত্যাদি। সাধারণত: শিক্ষাক্ষেত্র ও সংস্কৃতিক্ষেত্রের বিভিন্ন বেয়াড়া লোকজনকে টাইট দেবার জন্য এই বাঁশ ব্যবহার করা হয়। এই বাঁশের রক্ষক ঠাকুরের নাম গুরুদেব। বাঁশ নিয়ে গুরুদেবের বাঁধা সুন্দর সুন্দর গান আজও শুনতে পাওয়া যায়, যথা "তোমার বাঁশ কোথা গো পথিক ওগো" অথবা "এ পরবাঁশে রবে কে"। এই বাঁশ একজন গায়কের গান গাওয়া বন্ধ করার ব্যাপারে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল। তারপরেই গায়ক দাড়ি রাখেন এবং পূর্ববঙ্গীয় ভাষায় গান লেখা শুরু করেন। এই বাঁশের সূক্ষ্মতার পরিচয় তাঁর একটি পূর্ববঙ্গীয় গানে সুচারুভাবে ফুটে উঠেছে- "কেরা হ্যারা আমারে গায়তায় দিল না/ আমি বোঝতাম পারলাম না।" কঞ্চির শক্তি বোঝা সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্যিই দু:সাধ্য।

পাঁচ, সুশীল বাঁশ। এই বাঁশ হাইব্রিড প্রজাতির বাঙালী বাঁশ। এই বাঁশের নব্বই শতাংশ সাম্যবাদী বাঁশ ও রাবীন্দ্রিক বাঁশের সংকরায়ন ঘটিয়ে উৎপাদন করা হয়। এই বাঁশ আগেও ঝোপেঝাড়ে অজস্র সংখ্যায় পাওয়া যেত, কিন্তু গত দুই বছরে বাঁশীয় প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলে এখন কৃত্রিম উপায়ে উচ্চফলনশীল চাষ সম্ভব হয়েছে। তবে এখনও এই বাঁশ বছরের সব সময় দেখা যায় না। কেবলমাত্র রাজনৈতিক দুর্যোগ, দাঙ্গা ও প্রাণহানি হলেই এই বাঁশ দেখা যেতে পারে। যদিও এই বাঁশ সংখ্যায় খুব কম, এদের বর্ণাঢ্য চেহারার জন্য এরা সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ঘর সাজানোর ফুল, চোরকাঁটা এবং বিছুটিপাতার বিকল্প ছাড়া এক্সপোর্ট কোয়ালিটির এই বাঁশের বিশেষ কোনো ব্যবহারিক উপযোগিতা নেই।

এই পাঁচ প্রজাতির বাঁশ ছাড়াও আর বহু বাঁশ আছে যারা সংখ্যা ও শক্তিতে ক্ষীণ হলেও নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর। যেমন মাওবাদী বাঁশ যা সাম্যবাদী বাঁশের একটি বিশেষ উপপ্রজাতি হলেও এদের জন্ম বা বৃদ্ধি সবই মাটির তলায়। অথবা কর্পোরেট বাঁশ, যা বহু চেষ্টা সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপকমাত্রায় চাষ করা সম্ভব হয় নি। বৈজ্ঞানিক অনুমান যে সাম্যবাদী বাঁশের অধিক ফলনের ফলে জমির রাসায়নিক চরিত্র বদলে যায়, ফলে কর্পোরেট বাঁশ ঠিকভাবে বাড়তে পরে না। লবণহ্রদের লবণাক্ত জমির একটি মাত্র ক্ষুদ্রাংশে এই বাঁশকে স্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়।

সবকিছু শেষ হয়, শুধু দিদির নাটক, বামফ্রন্ট সরকারের রাজত্ব ও বাঁশের তালিকা শেষ হয় না। কিন্তু এই তালিকা আর বাড়ালে উত্যক্ত বাঙালী পাঠক ও পাঠিকা বাঁশাতিরিক্তভাবে বাঁশপেটা করতে পারেন। তবে, মনে মনে কেটে পড়ার আগে খুড়তুতো কবির বলিষ্ঠ দুই লাইনে বাঙালীর একবিংশ শতকের ইশতেহার লিখে গেলাম-

এ বিশ্বকে এ শিশুর বাঁশযোগ্য করে যাব আমি-
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।

পাগলা চুলকে নে!

নভেম্বর ১৬, ২০০৮