এই সপ্তাহের খবর্নয় (আগস্ট ৩১)


লিখছেন --- খবরোলা অ্যান্ড কোং


আপনার মতামত         


বাঁদরেও পারে
---------------

ছোট্ট থেকে মিতুলের মা মিতুলকে শেখায়, কোনও খাবার একা একা খাবে না, ভালো খাবার হলে, সবাইকে দিয়ে খেতে হয়, সবার সাথে মিলেমিশে খেতে হয়। ... বাঁদরের মা বাঁদরছানাকে এইরকমভাবে শেখায় কিনা জানা যায় নি, তবে বাঁদরেও দিয়ে থুয়ে খাওয়া পছন্দ করে। অন্যের সাথে মিলেমিশে খাবার যে মজা, অন্যকে কিছু দেবার মধ্যে নিজের ভেতরকার যে আনন্দ, তা বাঁদরের মধ্যেও বিলক্ষণ প্রকাশ পায়। আমেরিকান গবেষকরা গবেষণা করে দেখেছেন।

কাপুচিন বাঁদরদের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়েছিল, দেখা গেল, তারা ক্রমাগতই সতীর্থদের মধ্যে নিজেদের খাবার ভাগ করে নেবার চেষ্টা করছে, যদি একই খাঁচার মধ্যে আর কোনও বাঁদর থাকে তো। একা থাকলে অন্য কথা। আটলান্টার এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের Yerkes রিসার্চ সেন্টারের গবেষকরা দেখেছেন, "সহৃদয়তা' শব্দটা কেবলমাত্র মানুষের ডিকশনারিতেই নেই, বাঁদরেও সহৃদয় হতে জানে। এমনকি চেনা পরিচিতদের "কেয়ার' নেওয়া, তাদের ভালোমন্দের ব্যাপারে ভাবা, এসব ব্যাপারেও যথেষ্ট পারদর্শী এই কাপুচিন বাঁদরেরা।

ঐ রিসার্চ সেন্টারের লিভিং লিঙ্কস সেন্টারের ডিরেক্টর ফ্রান্স ডি ওয়ালের নেতৃত্বে আটজন মহিলা বাঁদরকে নিয়ে এই পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। চারটে খাঁচায় জোড়ায় জোড়ায় রাখা হয়েছিল তাদের। প্রথমে তাদের দিয়ে একটা টোকেন পছন্দ করানো হয়েছিল, যে টোকেনটার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হত, এবারের খাবার কেবল তাদের একজনকেই দেওয়া হবে, অথবা, তারা দুজনে মিলে ভাগ করে খেতে পারে। এবং দু ক্ষেত্রেই সেই জোড়ার একজন বাঁদরকে একই পরিমাণ খাবার দেওয়া হয়েছিল। বাঁদরেরা টোকেনের মাধ্যমে অপশন কী করে বাছছিল, তা যদিও ডি ওয়াল জানান নি, তবে তিনি জানিয়েছেন, বাঁদরেরা অত্যন্ত ব্যগ্রভাবে, ক্রমাগত দ্বিতীয় অপশনটাই বেছে নিচ্ছিল। সঙ্গিনীকে খাবার দেওয়ার মধ্যে, তাকে নিজের সাথে খেতে দেখার মধ্যে যে আনন্দ, তা সম্ভবত প্রথম বাঁদরটি হারাতে চাইছিল না। এই দয়ালুতা, সহৃদয়তা, যা মানুষের মধ্যে খুব সহজেই গড়ে ওঠে পাশাপাশি একসাথে থাকার মাধ্যমে, যাকে বলে social closeness , তা বাঁদরের অনুভূতিতেও বিরল নয়। এবং, সবচেয়ে বড় কথা, এই ভাগবাঁটোয়ারার সামাজিকতা, কেবল খাঁচার মধ্যেই ঘটে না, উন্মুক্ত প্রকৃতির মাধ্যেও তাদের এইভাবে প্রাপ্ত খাবার ভাগ করে, পাশাপাশি বসে খেতে দেখা গেছে।



বটিকা কোরিয়া-কা
-----------------

গিরিডির তিলুবাবু বেঁচে থাকলে এই কোরিয়ান বিজ্ঞানীদের দু হাত তুলে আশীর্বাদ করতেন, অন্ততপক্ষে পুজাবার্ষিকী থেকে আমরাও বটিকা ইন্ডিকার ওপরে একখানা আনকোরা ডায়েরি উপহার পেয়ে যেতাম। তা যখন হবার নয়, কী আর করা!

ব্যাপারটা হচ্ছে, কোরিয়ান বিজ্ঞানীরা এমন একধরণের চাউমিন আবিষ্কার করেছেন, যা দীর্ঘক্ষণ ক্ষিধের অনুভূতি ঠেকিয়ে রাখতে সাহায্য করে, মানে সোজা কথায় অনেকক্ষণ ক্ষিধে পায় না। স্রেফ কর্ন আর সয়াবিন দিয়ে বানানো এই চাউমিনের দ্বারা আপ্যায়িত হয়ে লোকজন দাবি করেছেন যে, তাঁদের পেট অনেক দীর্ঘক্ষণ ভরা-ভরা লেগেছে।

উত্তর কোরিয়া এমনিতেই খাদ্যশস্যের জন্য অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল। তার ওপরে গেল মাসেই UN থেকে চেতাবনী এসেছে, দশকের চূড়ান্ততম খাদ্যসংকট এল বলে। কিন্তু দেশের কমিউনিস্ট সরকার এ ব্যাপারে একেবারে কর্ণপাত করেন নি। অতএব, বিজ্ঞানীরা নিজেরাই উঠেপড়ে লেগে পড়েছিলেন বিকল্প খাদ্যের সন্ধানে। তারই ফসল এই সয়াবিন নুড্‌লস। সাধারণ নুড্‌লস খাবার ঠিক যতক্ষণ পরে ক্ষিদে পায়, তার অন্তত দ্বিগুণ সময় পর্যন্ত ক্ষিদেকে আটকে রাখতে পারে এই নয়া নুড্‌লস।

আর কিছুদিনের মধ্যেই উত্তর কোরিয়ার বাজারে হৈ হৈ করে এসে পড়ছে এই নতুন সয়াবিন নুড্‌লস, যে উত্তর কোরিয়ায় ইতিমধ্যেই দশ লক্ষ লোক মারা গেছেন, স্রেফ খেতে না পেয়ে, ১৯৯০-এর দশকে। তার সাথে প্রাকৃতিক বিপর্যয় আর কমিউনিস্ট সরকারের অপদার্থতা তো ছিলই।

অনেক বড় বড় আমলাশোল বিরাজ করে এই পৃথিবীতে। অনেক চোখ ধাঁধানো আলো আমাদের দেখতে দেয় না সেখানকার অনাহার।

মিস বিউটিফুল নান
--------------------

এক ইটালিয়ান রেভারেন্ড তাঁর সঙ্গে প্রার্থনারত নানদের সমবেত অনুরোধে বার খেয়ে খুব শিগগিরই অর্গানাইজ করতে চলেছেন এক বিশ্বজোড়া "মিস সিস্টার ২০০৮ কনটেস্ট'। রেভারেন্ড অ্যান্টোনিও রুঙ্গি-র আশা, এই প্রতিযোগিতা নানদের বিশ্বজোড়া ক্যাথলিক চার্চের জগতে নানদের দেবে আরও বেশি ভিজিবিলিটি, আর ধ্বংস করতে সক্ষম হবে এক খুব সাধারণ প্রচলিত ধারণা, যে নান মানেই বয়স্ক, অসুন্দর, ডাল টাইপের একজন মহিলা।

প্রকৃতপক্ষে কোনও র‌্যাম্পে নয়, রেভারেন্ড অ্যান্টোনিওর ব্লগে এই প্রতিযোগিতা আরম্ভ হতে চলেছে সেপ্টেম্বর মাসে। সারা দুনিয়া থেকে নানেরা তাঁদের সেবামূলক কাজের কাহিনি আর তাঁদের ফোটো এই ব্লগে পাঠাতে পারবেন। এর পর এক মাস তাঁর ব্লগ খোলা থাকবে সারা বিশ্বের পাঠকের জন্য, যাঁরা সেই সমস্ত সেবামূলক কাজের ফিরিস্তি আর ছবি দেখে কোনও একজন বা একাধিক নানকে "মডেল' হিসেবে মনোনীত করবেন। বেশি ভোট পাওয়া নান অবশ্যই জিতবেন মিস সিস্টার ২০০৮ প্রতিযোগিতা।

এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেবার জন্য কোনও নানকে বেদিং সুটে শরীর দেখাবার প্রয়োজন নেই। আবার চিরাচরিত পদ্ধতিতে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে ক্যামেরার সামনে পোজ দেবারও দরকার নেই। এটা সম্পূর্ণ ভাবে নানেদের ওপরেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তাঁরা ইচ্ছে করলে মাথার ঢাকা খুলেই নিজেদের মুখের ছবি পাঠাতে পারেন। সেটুকুই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে। নেপ্‌লসের এক স্কুলের হেডমাস্টার, রেভারেন্ড অ্যান্টোনিওর বক্তব্য, আমরা কোনো নানকে বলছি না যে, বেদিং সুটে এসে দাঁড়ান ক্যামেরার সামনে। কিন্তু তার মানে এ-ও বলছি না যে নান হতে গেলে কুৎসিত হতেই হবে। মেয়েদের বহিস্থ সৌন্দর্য ঈশ্বরের দান, সেটাকে লুকিয়ে রাখাও আমাদের উদ্দেশ্য নয়।

যথারীতি, ইতিমধ্যেই প্রচুর পরিমাণে সমালোচিত হয়েছে অ্যান্টোনিওর এই আইডিয়া, প্রাথমিকভাবে ক্যাথলিক টিচার্স অ্যাসোশিয়েশনের কাছ থেকে। তাঁদের মুখপাত্র অ্যালবার্টো জিয়ান্নিও বেশ রাগতভাবেই সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ঈশ্বরের সেবায় যাঁরা সারা জীবনের জন্য নিয়োজিত, এ তাঁদের ভক্তি নিয়ে একধরণের পরিহাস করা হতে চলেছে।

ঈশ্বর এখন ওপর থেকে এই বিউটি কনটেস্টকে কী চোখে দেখবেন, তা সদাপ্রভু ঈশ্বরের ওপরেই নির্ভর করছে। আমাদের জানার কোন উপায় নেই ।

ছড়িয়ে পড়ছে ডেড জোন
-----------------------

এ যেন ক্যানসারের মত ব্যাপার! শরীরের ক্যানসার আক্রান্ত একটি কোষ যেমন দ্রুত বংশবিস্তার করে সারা শরীরে ছড়িয়ে দেয় ক্যানসারের জীবাণু, সমুদ্রেও আছে সে রকম ক্যানসার আক্রান্ত অংশ। ডেড জোন। যেখানের জলে মেশানো আছে এত কম পরিমাণ অক্সিজেন, যা জীবনধারণের পক্ষে যথেষ্ট নয়। ভার্জিনিয়া ইনস্টিট্যুট অফ মেরিন সায়েন্সের গবেষকদের অনুসন্ধান অনুযায়ী এই ডেড জোন কোনও একটি সমুদ্রের নেচার নয়, পরস্পর যুক্ত সাগর মহাসাগরের মধ্যে এই ডেড জোন ক্রমশই প্রসারিত হয়ে চলেছে। মেরে ফেলছে সামুদ্রিক বিভিন্ন প্রজাতি। বিপন্ন হচ্ছে ইকোসিস্টেম। আমরা মানুষরা, যারা সমুদ্র থেকে তুলে আনা বিভিন্ন জীব খেয়ে জীবনধারণ করি, টান পড়ছে আমাদের খাবারের ভাঁড়ারেও।

এই মুহুর্তে সারা পৃথিবীর জলভাগে অন্ততপক্ষে ৪০০টিরও বেশি ডেড জোন খুঁজে পাওয়া গেছে। মাত্র দু বছর আগে ইউনাইটেড নেশন্‌স এর মাত্র অর্ধেক ডেড জোন খুঁজে পেয়েছিল। মানে দু বছরে তারা সংখ্যায় হয়ে গেছে দ্বিগুণ। মেরে ফেলছে সামুদ্রিক মাছ, কাঁকড়া, আরও অনেক প্রজাতি।
এই সব ডেড জোনের মধ্যে অনেকগুলিই অনেক বছরের পুরনো, কিন্তু আবার, অনেকগুলিই একেবারে ফ্রেশ, নতুন।

কীভাবে তৈরি হয়, এই সব ডেড জোন?
এক ধরণের সামুদ্রিক শৈবাল, মানুষের সৃষ্ট দূষণই যাদের প্রধান খাদ্য, তারা বংশবিস্তার করছে তত দ্রুত, যত দ্রুত মানুষ ছড়াচ্ছে দুষণ, সমুদ্রের বুকে। এরা প্রধানত সমুদ্রের ওপর এক ধরণের আচ্ছাদন তৈরি করে ফেলে, যার ফলে বাতাসের অক্সিজেন মিশতে পারে না জলে; জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের ভাঁড়ার কমতে থাকে। এখন, এই সব শৈবালদের খাবার কী?
বিভিন্ন ধরণের ফার্টিলাইজার, কলকারখানার বর্জ্য আর পোড়া খনিজ তেল। বিপুল পরিমাণে এরা মিশে চলেছে সমুদ্রের জলে, প্রতিদিন, প্রতি ঘন্টায়। বাড়িয়ে চলেছে এই ডেড জোন তৈরি করা শৈবালদের।

তা হলে উপায়? রাতারাতি তো আর প্রাক্‌-কারখানা যুগে ফিরে যাওয়া অর সম্ভব নয় আজকের মানুষের পক্ষে, আবার এই রকম চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে সমুদ্রজাত কোনও খাদ্যই আর মজুত থাকবে না হোমো স্যাপায়েন্সদের ভাঁড়ারে। অতএব, নিতে হবে মধ্যপন্থা। মানুষকেই চেষ্টা করতে হবে যাতে সমুদ্রে দূষণের পরিমাণ কমানো যায় আস্তে আস্তে।

মূলত দক্ষিণ গোলার্ধে ছড়াচ্ছে এই ডেড জোনের পরিমাণ, স্বাভাবিকভাবেই, কারণ দক্ষিণ গোলার্ধে জলভাগ বেশি। দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া আর এশিয়ার ধার জুড়ে ক্রমশ বংশবিস্তার করে চলেছে এই সামুদ্রিক অল্‌গিরা। এমনকি সম্প্রতি চীনের ইয়াংৎজে নদীর মুখেও এই রকম ডেড জোন পাওয়া গেছে। ইনস্টিট্যুটের বিজ্ঞানী রবার্ট ডিয়াজ বলেছেন, যদিও আমরা ৪০০ মত ডেড জোন খুঁজে বের করেছি, প্রকৃতপক্ষে তার সংখ্যা এর থেকেও অনেক, অনেক বেশি হতে পারে আজকের পৃথিবীতে।
মানুষ কি শুনবে, সমুদ্রের আর্তস্বর?

আগস্ট ৩১, ২০০৮