এই সপ্তাহের খবর্নয় (আগস্ট ৩)


লিখছেন --- খবরোলা অ্যান্ড কোং


আপনার মতামত         


মিথ্যা প্রমাণিত হল হিটলারি তত্ত্ব
-------------------------------

পূর্ব ডেনমার্কের দু-হাজার বছরের পুরনো এক কবরখানা থেকে উদ্ধার হয়েছে বেশ কিছু দেহাবশেষ, বিজ্ঞানীদের অপরিসীম আগ্রহ জাগিয়ে। সেই সব দেহাবশেষ পরীক্ষা করে তাঁরা যা জানতে পেরেছেন, তা হিটলার প্রবর্তিত বহুচর্চিত আর্যজাতিতত্ত্বকে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। দুহাজার বছর আগেকার সেই সব দেহাবশেষে এত ধরণের জেনেটিক ভেরিয়েশন পাওয়া গেছে, যা-যা আজকের পৃথিবীর মানুষের দেহে পাওয়া যায়। ইউনিভার্সিটি অফ কোপেনহেগেন থেকে সম্প্রতি অ্যামেরিকান জার্নাল অফ ফিজিকাল অ্যান্‌থ্রোপলজিতে প্রকাশিত এক রিসার্চ পেপারে এর ওপরে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যা নাজিদের সযত্নলালিত "নর্ডিকরাই সুপিরিয়র' আইডিয়ার মূলে কুঠারাঘাত করে। কারণ সেই সব দেহাবশেষে এমন অনেক জিন ছিল, যা তথাকথিত আর্যদের জিনের সাথে মেলে না। এবং এই সমস্ত অনার্য জিনের এত বিপুল সম্ভার পাওয়া গেছে ডেনমার্কে, উত্তর ইউরোপে, যে জায়গা হিটলারের সিউডো-সায়েন্টিফিক মতবাদ অনুযায়ী আর্যদের উৎপত্তিস্থল। হিটলার বিশ্বাস করতেন উত্তর ইউরোপের এই রেস্‌ মনুষ্যপ্রজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠতম এবং এরাই পৃথিবীর অধিনায়কত্ব করার যোগ্যতা রাখে; এবং এই রেসের বাড়বাড়ন্ত ঘটাবার জন্য তিনি জার্মান এবং নরওয়েজিয়ানদের মধ্যে বিয়েশাদির প্রকল্পও চালু করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছায়ায় আচ্ছন্ন চল্লিশের দশকের ইউরোপ তথা সমগ্র পৃথিবীতে এই সুপিরিয়র রেস-এর তত্ত্ব ইন্ধন জুগিয়েছিল কুখ্যাত হলোকাস্টের, যে তত্ত্ব শ্রেষ্ঠতম মনুষ্যপ্রজাতি হিসেবে রিপ্রেজেন্ট করেছিল আর্য তথা জার্মানদের, আর নিকৃষ্টতম হিসেবে ইহুদীদের। কোপেনহেগেন ইউনিভার্সিটির প্রকাশিত পেপার জানাচ্ছে, এটা সম্পূর্ণ অবাস্তব যে উত্তর ইউরোপ তথা স্ক্যান্ডিনেভিয়ার (ডেনমার্ক নরওয়ে আর সুইডেনকে একত্রে স্ক্যান্ডিনেভিয়া বলা হয়) বাসিন্দারাই কেবলমাত্র বিশুদ্ধ আর্য জিনের অধিকারী। সেই কবরখানার দেহাবশেষগুলোই স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে যে আজ থেকে দু-হাজার বছর আগেও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার লোকজনের সাথে যথেষ্ট মিশ্রণ ঘটেছিল বাকি পৃথিবীর সমস্ত রকম জিনের, এবং সমস্ত মিলেমিশেই স্ক্যান্ডিনেভিয়ান প্রজাতি তৈরি, আজ থেকে দু-হাজার বছর আগেও, আজও। বিশুদ্ধ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান জিন বলে আলাদা কোনও সুপিরিয়র জিন আগেও ছিল না, কখনও হয়ও নি। এমনকি অনেক পুরনো, সেই লৌহযুগের এক ডেনিশের দেহাবশেষের ডিএনএ অ্যানালিসিস করে তাতেও অ্যারাবিয়ান জিনের চিহ্ন পাওয়া গেছে। আরেক দেহাবশেষে পাওয়া গেছে সাইবেরিয়ানের জিন। সুতরাং হিটলারি তত্ত্ব যে পুরোপুরি অবৈজ্ঞানিক আর ঢপ, সে ব্যাপারে আর কোনওই সন্দেহ নেই। কেবল এ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে অনেক দেরি হয়ে গেল। প্রায় ষাট বছর দেরি।

পেরুর মমি
------------
রন্‌টয় নামে পেরুর এক প্রাচীন শহরে এক মমি পাওয়া গেছে। তার চোখের ওপর লাগানো ধাতব প্লেট, হাঁটুতে উল্কির দাগ। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, এই সব চিহ্ন প্রমাণ দিচ্ছে যে এই মমিটি কোনও অভিজাত ব্যক্তির। সম্ভবত এই মমিই সেই রহস্যময় Chancay গোষ্ঠীর, যারা আনুমানিক দশম শতাব্দীতে রাজত্ব করত পেরুতে, হুয়াউরা নদীর অববাহিকায় ছিল এদের দাপট। পরে ১৪৭৬ সালে ইনকারা এসে এদের হারিয়ে অধিকার করে নেয় পেরুর এই অঞ্চল। মমিটি যে ব্যক্তির, মৃত্যুকালে তাঁর বয়েস ছিল আনুমানিক তিরিশ বছর। এই বিশেষ পেরুভিয়ান প্রজাতিটি সম্পর্কে এতদিন বিশেষ কোনও তথ্য আহরণ করা সম্ভব হয় নি। বিভিন্ন ফার্ম বা ইন্ডাস্ট্রি পত্তনের সময়ে মাটি খোঁড়ার সময়ে এলোমেলোভাবে এই Chancay প্রজাতির কিছু কিছু অবশেষ পাওয়া গেছে পেরুতে, কিন্তু তা সমীক্ষা চালাবার পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। এই প্রথম এই প্রজাতির একটি সম্পূর্ণ অক্ষত মমি পাওয়া গেল। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের অর্থসাহায্যে চলা এই অভিযান এবং গবেষণার কর্ণধার নেলসন এবং তাঁর সঙ্গীরা সপ্তাহের পর সপ্তাহ সময় নিয়েছেন ধীরে ধীরে মমির ওপরের আবরণ খুলতে। বেশ কয়েক পরতে জড়ানো মমিটির একের পর এক আচ্ছাদন খুলে দিয়েছে সেই যুগের সেই প্রজাতির এতদিন অনাবিষ্কৃত জগৎ। আচ্ছাদনের গায়ে আঁকা ছিল ছবি, Chancay দের ছবি। পরতের ভেতর পাওয়া গেছে বেশ কিছু তুলোর বল। মমির হাতে জড়ানো ছিল একটি খালি ব্যাগ আর উলের গোলা। কিছু ভুট্টার দানাও পাওয়া গেছে আচ্ছাদনের ভেতর। ভুট্টা সেই সময়ের পেরুতে খুব মূল্যবান ছিল, খাদ্য হিসেবে এবং চিচা নামক এক ধরণের বীয়ার তৈরির উপাদান হিসেবে। কাকে যে উৎসর্গ করা হয়েছিল এই ভুট্টার দানা, তা নিয়ে গবেষণা চলছে এখনও, কারণ আজ পর্যন্ত জানা যায় নি Chancay রা "ভগবান' হিসেবে ঠিক কী ধরণের কনসেপ্টের উপাসনা করত। গবেষণা জানাচ্ছে মমিটির নাড়িভুঁড়ি তার পায়ুপথ দিয়ে বের করে নেওয়া হয়েছিল, ঠিক যেভাবে মিশরীয়রা মৃতদেহের নাড়িভুঁড়ি বের করে নিতেন দেহটিকে সংরক্ষণ করার জন্য। মমিটির পরণে ছিল দুটি টিউনিক। আরও আশ্চর্যের বিষয়, মমির ঠিক মাথার কাছেই রাখা ছিল ৩০ সেন্টিমিটার লম্বা মমির একটি হুবহু রেপ্লিকা, মমির মতই পোষাক পরানো। মমির ডান হাঁটুতে পাওয়া গেছে একটি উল্কির দাগ, যা তখন কেবলমাত্র অভিজাতরাই ধারণ করত।

উভলিঙ্গে জেহোভা
--------------------------
জেহোভা -- ভগবানের অজস্র নামের মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় এক নাম। হিব্রু বাইবেলের পাতায় পাতায় ঈশ্বরকে বোঝাবার জন্য যে Tetragrammaton ব্যবহার করা হয়েছে, তারই এক সর্বজনগ্রাহ্য উচ্চারণ হল জেহোভা। হিব্রু বাইবেলে ৬৮২৩ বার লেখা আছে শব্দটা, কিন্তু যেহেতু পুরোনো হিব্রুতে কোনো স্বরবর্ণ ব্যবহার করা হতনা কখনো, তাই এই Tetragrammaton এর উচ্চারণ যারা শোনেনি, তাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় এর আসল উচ্চারণ কি। আর সেজন্যই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে মূল কথা। ৫৮৬ আই তে প্রথম হিব্রু মন্দির ধ্বংসের পরেই এই কথার ব্যবহার কমতে থাকে। তখন থেকে শুধুমাত্র মন্দিরের পুরোহিতরা উচ্চারণ করতেন এই কথা। পরে ৭০ আই তে দ্বিতীয় মন্দির ধ্বংসের সাথে সাথে হারিয়ে যায় এই কথা। হিব্রু YHWH কে জিহোভা বলেই ডাকা শুরু হয় পরবর্তীকালে।
তবে হয়ত সেই রহস্য সমাধানের পথে প্রায় অনেকটাই হেঁটে ফেলেছেন Pleasantville Community Synagogue এর প্রধান রাব্বি মার্ক সমেথ। এই নিয়ে বহুদিনের গবেষণা তাঁর। সম্প্রতি তিনি জানান যে এই শব্দের মূল রহস্য লুকিয়ে আছে শব্দটাকে পড়ার মধ্যে। যদি শব্দটাকে উল্টো করে পড়া হয়, তবে শব্দটা দাঁড়ায় হিব্রু He এবং She । সমেথের মতে, এই একটা শব্দ দিয়েই বোঝানো হয়েছে ঈশ্বরের বিশালত্ব। একই সাথে He এবং She দিয়ে তৎকালীন ধর্মগুরুরা ঈশ্বরের সার্বজনীনতা বোঝাতেন। তাই ঈশ্বরের রূপক হিসেবে এই কথাটা লেখা হতো সর্বত্র। প্রায় বছর দশ আগে সমেথের মাথায় আসে এই ধারণা। গত দশ বছর ধরে তিনি শুধু প্রমাণ খুঁজে গেছেন তাঁর ধারণার সমর্থনে। আর এতদিনে তিনি পৌঁছেছেন তাঁর সিদ্ধান্তে। তাঁর মতের সমর্থনে তিনি বলেন যে হিব্রু বাইবেলের পাতায় পাতায় এভাবেই ঈশ্বরকে দুই লিঙ্গের উপরে স্থান দেওয়া হয়েছে। একই সাথে পুরুষ আর নারীর শক্তি নিয়েই ঈশ্বরের বিমূর্ত ভাবনা মূর্ত হয়েছে।
তবে সমেথের এই গবেষণা আঘাত হেনেছে বহুদিনের পুরনো ধারণাতে। বহু মানুষই ঈশ্বরকে এক বিশাল পুরুষ হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। সেই ভাবেই বিভিন্ন জায়গায় পরিচয় দেয়া হয় জিহোভার। সেই মতের বিরুদ্ধে গিয়ে সমেথের নতুন চিন্তাভাবনা। Central Conference of American Rabbis এর পরবর্তী সংখ্যায় প্রকাশিত হতে চলেছে সামাথের লেখা। নি:সন্দেহে আলোড়ন জাগাবে সেটা, আর একই সাথে হয়তো সত্যি সমাধান খুঁজে দেবে বহুযুগ আগে হারিয়ে যাওয়া এক শব্দে ধাঁধার।

আগস্ট ৩, ২০০৮