এই সপ্তাহের খবর্নয় (৬ই জুলাই)


লিখছেন --- খবরোলা এন্ড কোং


আপনার মতামত         


শেক্ষপীরের আপন দেশে
----------------------
অনেক দিন আগে, মনে পড়ছে, পঁচিশে বৈশাখের আগে পরে দূরদর্শন একটা সার্ভে মত করেছিল, আজকের বাঙালি রবীন্দ্রনাথকে কতটুকু জানে-টানে। তাতে টিভি ক্যামেরায় মুখ দেখাবার সুযোগ পেয়েছিলেন শহর কলকাতার আপিসবাবু থেকে মেদিনীপুরের চাষীর বউ পর্যন্ত। গ্রামের লোকজন দেখা গেছিল অনেকেই রবীন্দ্রনাথের নাম পর্যন্ত শোনে নি। কলকাতার এক ভদ্রলোক তো রবীন্দ্রনাথের নাম শুনেই এমন আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন, "তাঁর মত এত বড় একজন শিল্পস্রষ্টা, একাধারে কবি, গায়ক, পেইন্টার, রাজনীতিক ...' ওখানেই থামিয়ে অ্যাঙ্কর তাঁকে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা স্মৃতি থেকে বলতে বলায় তিনি প্রচন্ড আবেগের সাথে হাত পা নেড়ে আবৃত্তি করেছিলেন "দুর্গম গিরি কান্তার মরু'।

এই কয়েক বছর আগেও খোদ নয়াদিল্লির পার্লামেন্টে আজ তকের সার্ভেতে দেখা গেছিল অনেক এমপি জানেনই না ভারতের জাতীয় সঙ্গীত কী, কারুর মতে বন্দেমাতরম শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচনা।

অথচ এই নলেজগুলো তো নিতান্তই এলিমেন্টারি। খুব বেশি হলে বছর ছয় সাত বছর বয়েসেই একজন শিশু জেনে ফেলে এই সব প্রশ্নের উত্তর, যদি সে যে কোনও ফর্মাল স্কুলে পড়ে থাকে।

কিন্তু দেশটা যদি হয় খোদ বিলেত? সেখানে তো ভারতের মত এত অশিক্ষা অজ্ঞানতার অন্ধকার নেই। প্রায় সমস্ত শিশু সেখানে স্কুলে যায়, পড়াশোনা করে! সেই ব্রাইটনরা যদি মহামতি শেক্ষপীরের প্রথম নাম পর্যন্ত বলতে না পারে?
সেই ঘটনাই ধরা পড়েছে ব্রিটেনের এক ইনফর্মেশন ওয়েবসাইটের পরিচালিত সার্ভেতে। সাত বছরের শিশুদের জানা উচিৎ, এমন দশটি প্রশ্ন রাখা হয়েছিল সার্ভেতে অংশ নেওয়া ব্রাইটনদের সামনে। দেখা গেল অধিকাংশই জানাচ্ছেন শেক্‌সপীয়রের প্রথম নাম ওয়াল্টার, সুইডেনের রাজধানী অসলো, কিংবা দুইয়ের কিউব চব্বিশ।

প্রায় ২০০০ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্রাইটন অংশ নিয়েছিলেন এই সার্ভেতে। দশে দশ পেয়েছেন মাত্র পাঁচ শতাংশ, এবং তিন শতাংশ পেয়েছেন দশে এক। গড়ে দশে ছয় পেয়েছেন অংশগ্রহণকারীরা। দক্ষিণ পূর্ব ও দক্ষিণ পশ্চিম ব্রিটেনে এই গড় ছিল দশে সাত, উত্তর পশ্চিমে তা' দশে তিন। এই সার্ভে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কী ভয়াবহ অবস্থায় গিয়ে পৌঁছেছে রাণীর দেশের স্কুলগুলি। ন্যুনতম সাধারণ জ্ঞানগুলো পর্যন্ত ছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে অক্ষম হয়েছে তারা।

সাতাত্তর শতাংশ skilful শব্দের বানান লিখতে পারেন নি ঠিকমত, পঁয়ত্রিশ শতাংশ জানতেন না হেপ্টাগনের সাতটি বাহু, আটান্ন শতাংশ সুইডেনের রাজধানীর নাম জানতেন না, কেউ কেউ মনে করেন গ্যথেসবার্গ, কেউ কেউ এমনকি ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কিকেই সুইডেনের রাজধানী বলে মনে করেন। বারো শতাংশ জানিয়েছেন শেক্‌সপীয়রের প্রথম নাম ওয়াল্টার, আট শতাংশ জানিয়েছেন অষ্টম হেনরী ১৯০০ সালে সিংহাসনে বসেছিলেন। শুধু ভারতের শিক্ষাব্যবস্থাকে গাল দিলে হবে?

কুকুরের ধনসম্পত্তি
-------------------
হিক্‌ক্‌ ... কুকুর বলে কি মানুষ নয় নাকি? পোষা কুকুর কত লোকের প্রাণাধিক প্রিয় হয়, আদরের টাইগার কি ভুলুকে ছেড়ে থাকতে হতে পারে বলে কত মেয়ে বিয়ে করতে পর্যন্ত রিফিউজ করেছে বিভিন্ন বাংলা সিনেমায়, কিন্তু সম্পত্তির লেখাপড়া কুকুরের নামে?

হুঁ হুঁ বাওয়া, এমন ঘটনাও ঘটেছে। ঘটেছে কোথায় আবার? বিশ্ব-ঔদার্যের মহান দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সে দেশের রিয়েল এস্টেট টাইকুন লিওনা হেম্‌সলি মৃত্যুর আগে উইল করে কিছু টাকাকড়ি নিজের কুকুর "ট্রাবল'এর নামে রেখে গেছেন। মাত্র বারো মিলিয়ন ডলার। এবং সে-ও রেখে গেছেন নিজের নাতিপুতিকে সর্বতোভাবে বঞ্চিত করে। নাতিপুতিরা এর বিরুদ্ধে কোর্টে মামলা করেছে কিনা তা জানা যায় নি, তবে ম্যানহাটানের এক কোর্টের ফয়সালায় তারা এই বিপুল সম্পত্তি থেকে কিছু কিছু পেয়েছে। বাকি টাকা চ্যারিটি ট্রাস্ট ব্যয় করবে সারমেয়প্রজাতির উন্নতিকল্পে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে নি:সহায় হয়ে পড়া কুকুরদের সাহায্য করাই শুধু নয়, এই টাকা ব্যয় করা হবে কুকুরঘটিত বিভিন্ন রোগব্যাধি দূর করার কাজেও। রেবিস ভাইরাস নির্মূলকরণ, কুকুরদের অত্যধিক বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি কাজেও ব্যয় হবে এই ফান্ডের টাকা।

সাতাশি বছর বয়সে লিওনাদেবী সজ্ঞানে সাধনোচিত ধামে গমন করেছেন গত আগস্টে। স্বর্গ থেকে তিনি নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছেন তাবৎ পৃথিবীর সারমেয়কুল প্রবলবেগে লাঙ্গুল আন্দোলনপূর্বক তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে।

উড়ুক্কু গাড়ির গবেষণায়
---------------------
স্যার ক্লাইভ সিনক্লেয়ারের নাম শুনেছেন? স্পেকট্রাম কম্পিউটার তাঁর আবিষ্কার। এ ছাড়াও তাঁর খ্যাতি আছে ইলেকট্রিক উড়ন্ত গাড়ি তৈরির প্রচেষ্টায় অবদানের জন্য, যদিও তা সফল হয় নি। আশির দশকে সেই প্রচেষ্টা বিফল হবার পর কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। কিন্তু স্বপ্ন দেখার অভ্যেস তিনি এখনও ছাড়েন নি। যদিও প্রত্যক্ষভাবে তিনি এখন আর কোনও ফ্লাইং কারের প্রজেক্টে যুক্ত নন, তবু আবার তিনি সেই জিনিস নিয়ে নাড়াচাড়া করার খেয়ালে মেতেছেন। সম্প্রতি বিবিসিতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বেশ কিছু কথা বলেছেন পার্সোনাল ট্র্যান্সপোর্টে যুগান্তর নিয়ে-আসতে-পারা এই প্রজেক্ট সম্পর্কে। তিনি জানিয়েছেন, ফ্লাইং কার তৈরি করা একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার নয়। এই গাড়ি তৈরি হলে তা অবশ্যই অটোমেটিক কনট্রোলড হতে হবে, কারণ মানুষকে রাতারাতি উড়তে শেখানো সম্ভব নয়। কিন্তু একবার এই গাড়িতে অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারলে যে কেউ নিজের বাড়ি থেকে এই গাড়িতে চেপে যে কোনও ডিরেকশনে উড়তে উড়তে গিয়ে পৌঁছতে পারে নিজের গন্তব্যে।

আশির দশকে, স্যর ক্লাইভ সিনক্লেয়ার এই গাড়ির নাম দিয়েছিলেন পার্সোনাল ফ্লাইং মেশিন, বা C5 । আবার এর ওপর কাজ শুরু হয়েছে। সিনক্লেয়ারের মতে, বিশ্বজুড়ে বেড়ে চলা তেলের দামের সাথে মোকাবিলা করতে এই ইলেকট্রিক পাওয়ারড ফ্লাইং মেশিনই একমাত্র ভরসা হতে পারে।

১৯৯২ সালে স্যর ক্লাইভ Zike নামে এক ইলেকট্রিকচালিত বাইসাইকেল বানিয়ে পৃথিবীকে তাক লাগাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দূ:খের বিষয়, জনতার কাছে তখন তাঁর এই আইডিয়া পপুলার হয় নি। লোকে নেয় নি। বর্তমানে তিনি A-bike নামে এক ফোল্ডিং বাইসাইকেল তৈরিতে ব্যস্ত আছেন, এবং প্রচন্ড আশাবাদী যে এই হাল্কা ফোল্ডিং সাইকেল বিশালভাবে জনপ্রিয় হবে। ইলেকট্রিক ফ্লাইং মেশিনের প্রজেক্টে ফিরে যাবার আগে তাই এই ইলেকট্রিক বাইক জগতে জনপ্রিয় হওয়া তথা তাঁর সাফল্য মেলা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, ইলেকট্রিক কার তৈরির কাজে ফিরে যেতে হলে দরকার অনেক টাকা, অনেক বেশি ইনভেস্টমেন্ট।

আশা করি, তাঁর A bike বিশালভাবে জনপ্রিয় হবে আজকের পৃথিবীতে।

'অঙ্ক কি কঠিন'
-------------------
অঙ্ক জিনিসটাকে আমাদের অনেকেরই তেমন সুবিধের লাগতো না। অঙ্ক পরীক্ষার আগের রাত্রে তো ভয়ের চোটে জ্বর আসবেই, কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই জ্বর পরের দিন সকালেই কমে যেত আর আমাদের পরীক্ষা দিতে যেতে হতো। এই নিয়ে মনের মধ্যে ক্ষোভ কিছু কম ছিলনা। অঙ্ক পরীক্ষা মানেই আসলে শিক্ষক আর ছাত্রদের মধ্যে এক সংগ্রামী ইতিহাস আর অঙ্কবিহীন এক মুক্ত জগৎ দেখার স্বপ্ন দুচোখে। তবে এই জগতে কিন্তু এমন মুক্তাঞ্চল সত্যি আছে। সেই জায়গা খুঁজতে গেলে আপনাকে যেতে হবে আমাজনের পিরাহা ট্রাইবদের মধ্যে। এদের মধ্যে এখনো অব্দি অঙ্ক নামের বিষয়টা ততটা জনপ্রিয় হয়নি।

প্রায় লুপ্ত এই উপজাতির জনসংখ্যা আপাতত ৩০০ র কাছাকাছি। এদের নিয়েই গবেষণা চালাচ্ছেন MIT Brain and cognitive science এর গবেষক এডওয়ার্ড গিবসন। ওনার কাছ থেকেই জানা গেল যে পিরাহাদের এখনো কোনো নাম্বার সিস্টেম নেই। 'কিছু' আর 'অনেক', মোটামুটি এমন দুটো শব্দ দিয়েই ওদের সমস্ত রকমের সংখ্যাভিত্তিক কাজ চলে। আর এই দুটো কথা দিয়েই এদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায় সুন্দরভাবে। তাই এরা কখনো জটিল সংখ্যা তত্ত্বের কথা ভাবে নি।

এর আগে ২০০৪ এও এদের নিয়ে কিছু গবেষণা হয়েছিল, তখন গবেষকরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে এরা তিন রকমের সংখ্যা জানে, 'এক', 'দুই' এবং 'অনেক'। কিন্তু গিবসন জানান যে এরা আসলে 'এক' এবং 'দুই' এর মধ্যেও তফাৎ করতে পারে না। দশটি আলাদা জিনিস সামনে রেখে পরীক্ষা করা হয় এদের ওপর। দেখা যায় যে ১ থেকে ৪ অব্দি সব কিছুই এদের কাছে 'এক', আর তার বেশী হলেই সেটা 'দুই' বা 'অনেক' হয়ে যায়। অর্থাৎ কাউন্টিং ব্যপারটা এদের মধ্যে নেই, এরা শুধু মাত্র তুলনামূলক একটা বিচার করতে পারে। এটাই গবেষকদের কাছে এক নতুন ব্যাপার। এতদিন ভাবা হতো যে কাউন্টিং ব্যপারটা মানুষের চিন্তাভাবনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, সমস্ত মানুষই কিছু না কিছু অঙ্ক কষতে পারে। কিন্তু পিরাহা উপজাতির মানুষরা এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এমনকি কোনো দুটো বস্তুর ম্যাচিং করার ক্ষেত্রেও এদের ক্ষমতা বেশ সীমিত।

আপাতত আরো গবেষণা চলবে এদের চিন্তা ভাবনা আর বুদ্ধিবৃত্তি নিয়ে। গবেষকদের ধারণা যে এর মাধ্যমেই একদিন হয়তো প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষদের চিন্তাভাবনাকে স্পর্শ করে দেখা যাবে, হয়তো intelligence এর বির্বতনের পথ টাও যাবে বোঝা।

জুলাই ৬, ২০০৮