খবর্নয় (মার্চ ৩০)


লিখছেন --- মিঠুন ভৌমিক


আপনার মতামত         


নিরুদ্দেশ সম্পর্কে .......
------------------------

সপ্তাহে চারদিন ভোর চারটে বেজে পনেরো মিনিটে টড ম্যাথিউজের দিন শুরু হয়। এগারো ঘন্টা কাজের পর ছুটি। আধ মাইল দূরের পাহাড়ঘেরা বাড়িতে তখন বেলা পড়ে এসেছে। স্ত্রী লোরি, দুই পুত্র ডিলান আর ডেভিনকে খানিকটা সময় দিতে না দিতেই, সময় ফুরিয়ে আসে। পরবর্তী সাত-আট ঘন্টা টড কাটান অন্য এক জগতে, আক্ষরিক অর্থেই যা মৃতদের দেশ। তাঁর কাজের টেবিলে ছড়িয়ে থাকে নানা আকারের অসংখ্য মানবকরোটির ক্ষুদ্র সংস্করণ, কম্পিউটারের স্ক্রিন জুড়ে অজস্র মুখ-- মর্গে তোলা আলোকচিত্র, স্কেচ, ফরেনসিক রিকনস্ট্রাকশান .... হাজার হাজার মুখ আন্তর্জালে ভেসে উঠতে থাকে। সেইসব মৃত মুখ, যাদের পরিচয় তো দূরের কথা, নামই জানা যায় নি।

টড, বারবারা, রকি, ন্যান্সিরা সেইসব অচেনা নামহীন মুখগুলোতে পরিচয়ের আলো ফেলার কাজে স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসেছেন। ১৯৯৯ সালে তৈরী হওয়া Doe নেটওয়ার্কের স্বেচ্ছাসেবক এঁরা সকলেই। এই প্রতিষ্ঠান বিগত কয়েক বছর ধরে কাজ করছে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মানুষদের পরিচয় জানতে। তার পাশাপাশি তারা কাজ করছে অশনাক্ত মৃতদেহের পরিচয় নির্ণয়ের কাজও। কাজের ক্ষেত্র উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়া।

মৃতদের পরিচয় নিয়ে টডের মাথাব্যথা শুরু প্রায় দুই দশক আগে, নিতান্তই গল্পের ছলে লোরি বলেছিলেন পুরোনো এক পারিবারিক কাহিনী। ১৯৬৮ সাল নাগাদ, কেন্টাকির জর্জটাউনে তখন লোরিরা থাকতেন, একবার পথ চলতে কিসে যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ে যান লোরির বাবা। ভালো করে দেখে বোঝা যায় সেটা একটা ক্যানভাসে মোড়া মৃতদেহ। মোড়ক খুলতেই বেরিয়ে পরে বাদামী চুলের বাচ্চা মেয়ের লাশ। সেই মেয়ের নামধামপরিচয় কিছু জানা যায় নি অনেক চেষ্টা করেও। স্থানীয় বাসিন্দারা মেয়েটির নাম দেন, Tent girl . পুলিশও যথারীতি তদন্ত বন্ধ করে দেয় কিছুদিন পরে। এই ঘটনা শোনার পরেই টড ইন্টারনেট ঘেঁটে খবর জোগাড় করতে শুরু করেন এই বিষয়ে। দেখা যায় ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে একটা নেটওয়ার্ক, অনেক নতুন স্বেচ্ছাসেবী কাজ করছেন, আরো অনেকেই অপেক্ষায়।

Doe ' র স্বেচ্ছাসেবীদের কাজের ধরণ খুব সহজ। তাঁরা দুটো ডেটাবেস ব্যবহার করেন। একটা নিখোঁজ ব্যক্তিদের, অন্যটা অশনাক্ত মৃত ব্যক্তিদের। এরপর ডি এন এ, পুলিশের রিপোর্ট, ফোটোগ্রাফ মিলিয়ে দেখার চেষ্টা হয় এই দুই তথ্যকে এক বিন্দুতে আনা যায় কিনা। বলা বাহুল্য, সেই কাজে তাঁরা অনেকটাই সফল। সাফল্য আছে বলেই অনেক স্বেচ্ছাসেবী এই কাজকে নিজেদের পেশার থেকেও বেশি গুরুত্ব দেন।

বারবারার কথাই ধরা যাক। পেশায় ব্যাঙ্ক কর্মী রাতের বেশিরভাগ সময়টাই কাটিয়ে দেন অনামী এক বালকের পরিচয় জানতে, নীল ব্যাগে মোড়া যার মৃতদেহ পড়েছিলো dupage county ' র গভীর জঙ্গলে। তালিকায় অনেক নাম। অবসরপ্রাপ্ত ম্যানেজার রকি, যাঁর সময় কাটে সেই মেয়েটির নাম জানতে যাকে ১৯৮১ সালে শ্বাসরোধ করে খুন করে Route 55 এর ধারে ফেলে গিয়েছিলো কেউ। কিংবা ৫৪ বছরের ন্যান্সি, যাঁর টেবিলে শনাক্ত হওয়ার অপেক্ষায় ১৯৭৬ এর ডিসেম্বরে খুন হওয়া এক অন্ত:স্বত্তা তরুণী, যাঁকে প্রথমে শ্বাসরোধ করে মেরে, মৃত্যু নিশ্চিৎ করতে গুলি করে, তারপর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ টুকরো টুকরো করে কেটে তিনটি স্যুটকেসে ভরে ইন্টারস্টেট ৮০'র এক ব্রিজ থেকে ফেলে দেওয়া হয়। ন্যান্সির কাছে হত্যে দিয়ে আছে পায়ে রূপালী নেল পালিশ পরা সেই মেয়েটিও, যার মৃতদেহ ""মামিফায়েড"" অবস্থায় একটি পরিত্যক্ত রেলরোড টানেলে পাওয়া যায় ২০০০ সালে।

এইসব স্বেচ্ছাসেবকদের অনেকেরই নিজেদের জীবনের সাথে জড়িয়ে গেছে এই অনুসন্ধান। কেউ তাঁর হারিয়ে যাওয়া ভাইকে খুঁজে বেড়ান, কেউ অনেক বছর আগে হারানো বন্ধুকে খোঁজেন অজস্র মৃতমুখের সারিতে। এ এমন এক নেশা, যেখানে সাফল্যের আনন্দে মিশে থাকে কোনো না কোনো পরিবারের স্বজনবিয়োগের দু:খ। ব্যর্থতার হতাশায় মিশে থাকে এক চিলতে আশা- হয়ত সে বেঁচে আছে এখনও কোথাও।

জীবনের দাম
------------

ডলারের দাম নিম্নগামী, ফলত: জীবনযাত্রার পান থেকে বিলাসিতার চুন খসে যাবে বলে যাঁরা দু:স্বপ্ন দেখছেন তাঁদের জন্য সুখবর। কয়েক হাজার ডলারে আজকাল জীবন্ত মানবশিশু কেনা যাচ্ছে। দাম সত্যিই কমলে এমনটা হতো? বিজ্ঞাপনে প্রকাশ,আপাতত স্টকে একটিমাত্র শিশুকন্যা আছে। তবে ক্রেতামহলে ভালো সাড়া পেলে অবিলম্বে আরো অনেক ""প্রোডাক্ট"" বাজারে ছাড়া হবে।
ভাবছেন এইসব গল্পকথা? গঞ্জিকাসেবনের ফল? বেশ, সল্ট লেক সিটির পুলিশ প্রধানকে জিগ্যেস করুন। ওঁরা এখন একুশে মার্চ লোকাল অনলাইন কেনাকাটার ওয়েবসাইট KUTV.com ( কি গভীর ইঙ্গিতবাহী নাম ! )-এ প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপনের নেপথ্যচারীকে খুঁজতে ব্যস্ত। বিজ্ঞাপিত শিশুকন্যাটির বয়স ৬ মাস, তাকে অনেক ভালো ভালো বিশেষণ দিয়ে বিক্রি হতে সাহায্য করেছেন বিক্রেতা। যেমন ধরুন, "used, but , beautiful" কিংবা " ... affectionate with so much love to offer." দাম চাওয়া হয়েছে মাত্র ৬৫৬০ ডলার। ওয়েবসাইটে নথিভুক্ত তথ্য অনুযায়ী ( যা শতকরা নিরানব্বই দশমিক নয় নয় ভাগ মিথ্যে হওয়ার কথা) ঐ কৃতী ব্যক্তির নাম Pauline Burgman .

এই অত্যাধুনিক প্রয়াসকে চ্যালেঞ্জ জানাতেই কিনা কে জানে, দক্ষিণ ইতালির এক সার্কাস কোম্পানী ১৯ বছরের একটি মেয়েকে পিরানহাপূর্ণ ট্যাঙ্কে সাঁতরাতে বাধ্য করে খবরের শিরোনামে চলে এসেছে। দেরিতে হলেও পুলিশ এসেছিলো, এবং তদন্ত শেষে একের পর এক চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। জানা গেছে, এক বুলগেরিয়ান দম্পতি ও তাদের দুই কন্যা, যাদের বয়স যথাক্রমে ১৯ এবং ১৬, দ র্ঘদিন ধরে সার্কাসমালিকের কাছে দাসত্ব করছে। প্রতিশ্রুত অর্থের এক তৃতীয়াংশ দিয়ে তাঁদের দিনে ১৫-২০ ঘন্টা খাটানো হচ্ছিলো। বড়ো মেয়েটিকে পিরানহা-ট্যাঙ্কে ও ছোটো মেয়েটিকে বিষাক্ত সাপ ও মাকড়শার সংস্পর্শে রেখে দর্শকদের চিত্তবিনোদন করতে গিয়েই মালিকেরা সমস্যায় পড়ে যান। নয়ত জন্তু সরবরাহ করার ট্রাকের এক কোণে দিব্যি দিন কেটে যাচ্ছিলো ঐ দাস-পরিবারের। তবে খাবারের কোনো অসুবিধে ছিলো একথা নিন্দুকেও বিশ্বাস করবে না। এই সেদিন, সার্কাসমালিক এনরিকো রাফায়েল ইংগ্রেসিয়ার ইস্টার লাঞ্চের ভুক্তাবশেষ মাংসটুকু ওদের পাতে তুলে দেওয়া হয়েছিলো, নেহাত কলিকাল তাই, নইলে সবাই মানতো এসবই আপনজনের প্রতি ভালবাসার প্রকাশ। সে যাই হোক, ১৯ বছরের গিসি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে যখন জল থেকে উঠে আসতে চাইছিলো, এনরিকো ওর মাথাটা জলে আরো বেশি করে চুবিয়ে দিচ্ছিলেন। এইসব দেখে জনৈক দর্শক খামোখাই উত্তেজিত হয়ে পুলিশে খবর দিয়ে দেন। পরে দেখা যায়, ১৬ বছরের ওলগার অবস্থাও আশঙ্কাজনক। তার সারা গায়ে সাপের ছোবলের দাগ, বিষক্রিয়ায় ও অত্যাচারে প্রায় সংজ্ঞাহীন সেই কিশোরীকে তার বাবা-মা-দিদির সাথেই আপাতত নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠানো হয়েছে। নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠানো হয়েছে এনরিকোকেও , পুত্র ও জামাই সমেত।

যন্তর মন্তর
-----------

আসুন, এক ঝলকে দেখে নেওয়া যাক গবেষণাগারের আনাচে কানাচে কি হলো গত কয়েকদিনে। প্রথমেই আসি হাওয়াই এর Walter Wagner ও তার সহযোগী Luis Sancho র কথায়। এই দুজন মিলে মামলা ঠুকে দিয়েছেন লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের কাজ বন্ধ করার দাবিতে। ওঁদের আশঙ্কা, এল এইচ সি হঠাৎ করে এমন কোনো নতুন কণা তৈরী করে ফেলতে পারে, যা আসেপাশে সমস্ত পদার্থকে বদলে দিতে পারে, অথবা গবেষণাগারেই একটা মাইক্রো ব্ল্যাক হোল তৈরী হয়ে যেতে পারে কোনো দুর্ঘটনায়। তাই এই কাজ বন্ধ হওয়া দরকার। এদিকে বহুচর্চিত এই অত্যাধুনিক প্রোজেক্টের কাজ জোরকদমে এগিয়ে চলেছে, বিজ্ঞানীরা আশায় আছেন কাজ শেষ হলে অনেক সৃষ্টিরহস্যের জটিল ধাঁধার উত্তর পাওয়া যাবে, এমন সময় এই বিপত্তি। তবে আশার কথা এই, খুব নাটকীয় কিছু না ঘটলে গবেষণার কাজ হয়ত ব্যহত হবে না, কারণ বিজ্ঞানীরা যুক্তি দিয়ে এই মামলার বিরোধিতায় নেমে পড়েছেন।

বেশ কিছুদিন ধরেই দেখা যাচ্ছিলো, পৃথিবীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় প্রদক্ষিণরত মহাকাশযানের গতিবেগ পাল্টে যাচ্ছে। প্রায় বছর দশেক আগে থেকেই এর কারণ নিয়ে ভাবনা চিন্তা শুরু হয়, পরে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সাধারণ যান্ত্রিক ত্রুটি বা লিকেজের কথা বলা হয়েছিলো। পরে অবশ্য একাধিকবার একই ঘটনা চলতে থাকায় বিকল্প কারণ হিসেবে অভিকর্ষের নিয়মগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু হয়েছে।

পৃথিবী কবে ধ্বংস হবে, সে নিয়ে আমাদের গবেষণা ও কৌতূহলের অন্ত নেই। যদিও সবাই জানি, আজকে যারা এই তর্ক করছি তারা কেউ ততদিন বেঁচে থাকবো না। জন্মান্তর থাকলেও না। কারণ বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, তার ঢের আগেই প্রাণের শেষ চিহ্নটুকুও লোপ পেয়ে যাবে এই নীলচে-সবুজ গ্রহ থেকে। আনুমানিক সাড়ে সাত বিলিয়ন বছর পরে সূর্য, যা আমাদের অস্তিত্বের উৎস, পরিণত হবে রেড জায়েন্টে। তারপর মা যেভাবে সন্তানকে কোলে টেনে নেয়, ঠিক সেইভাবে পৃথিবীকে গ্রাস করবে সে। এক কণা কর্পূরের মত উবে যাবে সব। অবশ্য তার অনেক আগেই, আজ থেকে সাড়ে তিন বিলিয়ন বছরের মধ্যেই ( যদি না যুদ্ধ-টুদ্ধ করে আমরা নিজেরাই সুবন্দোবস্ত করে ফেলি) পৃথিবী থেকে সমস্ত সজীব বস্তু বিলুপ্ত হয়ে যাবে। মজা হলো, পৃথিবীতে প্রাণের সূচনাও প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন বছর আগেই হয়েছিলো। সেই হিসেবে আমরা এক অপূর্ব সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সমস্ত জীবজগৎকে অখন্ড সত্ত্বা ধরলে, তা আজ মধ্যবয়সে পৌঁছলো। সাড়ে সাত বিলিয়নের ফাঁড়া কাটাতে এখন থেকেই কাজ শুরু হয়েছে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, সান্টা ক্রুজে। কয়েক শতাব্দী ধরে চলার কথা এই প্রোজেক্ট, যা শেষ ও সফল হলে লেখা হবে এক অনন্য কল্পবিজ্ঞান।

মার্চ ৩০, ২০০৮