খবর্নয় (ফেব্রুয়ারী ৩)


লিখছেন --- দ্বৈপায়ন বসু


আপনার মতামত         


কাদা খোঁচা
-------------
কাদাখোঁচা পাখী দেখেছেন তো সকলেই। ছোট্টবেলায় ভাবতাম সত্যি হয়তো এরা কাদামাটি খায় ক্ষিদে পেলে। পরে জেনেছিলাম যে এরা নরম কাদামাটি খুঁড়ে পোকামাকড় বার করে খায়। আচ্ছা সত্যি কি এমন কোনো প্রাণী জীবজগতে আছে যারা কাদামাটি খেয়ে জীবন কাটায়? নাহ, এর উত্তর খোঁজার জন্য গুগল খুলে বসতে হবে না, এমনকি আফ্রিকার কোনো এক গভীর জঙ্গলের কোনো এক নাম না জানা প্রাণীর কথাও ভাবতে হবে না। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের দিকে এক ছোট্ট দেশ আছে হাইতি নামে। সেই দেশের অজস্র মানুষ আপাতত মাটি আর কাদা খেয়েই দু' বেলা নিজেদের পেট ভরাচ্ছেন।

লাতিন আমেরিকার দেশ গুলো মধ্যে সবচেয়ে গরীব দেশ এই হাইতি। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা বহুদিন থেকেই খুব খারাপ। এর সাথে বর্তমানে যুক্ত হয়েছে বিশ্বায়নের জ্বালা। বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বাড়ার সাথে সাথে বেড়ে গেছে চাষ-আবাদের পেছনে খরচ। পাম্প চালানো, ক্ষেতে জল সরবরাহ করা, খাদ্য শস্য পরিবহণ এই সমস্তকিছুর পেছনেই খরচ হচ্ছে আকাশছোঁয়া। ফলে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে থাকা দেশগুলোতে খাদ্যশস্যের দাম বেড়ে গেছে প্রায় ৪০%। আর হাইতি নামক দেশটির ওপর তার ফল দাঁড়িয়েছে মারাত্মক। কত Saline হাইতির সমুদ্র তীরবর্তী একটি অঞ্চল। এখানকার দোকানগুলোতে একবাটি চাল বিক্রি এখন হচ্ছে ৬০ সেন্টে। ডিসেম্বরেও এর দাম ছিল ৫০ সেন্টের নীচে। গত বছর দাম ছিল ৩০ সেন্টেরও কম। সমান ভাবে দাম বেড়েছে অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যেরও। তাই বাধ্য হয়ে মাটি খেয়ে পেট ভরাচ্ছেন এই অঞ্চলের মানুষ। কত Saline এর যে কোনো বসতি এলকায় গেলে দেখা যাবে সারি দিয়ে শুকোচ্ছে মাটির বিস্কুট। সামান্য ক্যালসিয়াম মেশানো এই বিশেষ মাটি আসে Hinche র মালভুমি থেকে। স্থানীয় বাজারে আসার পর এই মাটির মধ্যে ফেলা হয় কিছু সবজির টুকরো। জল মিশিয়ে মেখে ফেলা হয় মাটি আর সব্জি। তারপর সেই কাদা দিয়ে বানানো হয় বিস্কুট। রোদে শুকিয়ে নিয়ে সেই কাদার বিস্কুটই বিক্রি করা হয় বাজারে। বিস্কুট পিছু দাম পড়ে ৫ সেন্টের মতন। হাইতির বেশীর ভাগ মানুষের দৈনিক উপার্জন যেখানে ২ ডলারেরও কম, সেখানে এই কাদার বিস্কুটই একমাত্র ভরসা মানুষের। এক একটা বিস্কুট পেট ভর্তি রাখে অনেকক্ষণ। মাটি থাকার জন্য অ্যাসিডিটিও হয় না। আবার হজম হয় না বলে ক্ষিদেটাও পায়না অনেকক্ষণ। কিন্তু সামান্য ক্যালসিয়াম ছাড়া কোনো খাদ্যগুণই মেলেনা এই মাটি থেকে। ফলে অপুষ্টির শিকার শিশুরা। বেড়ে গেছে শিশুমৃত্যুর হার। এছাড়া নোংরা অস্বাস্থ্যকর মাটির জন্য প্যারাসাইটজনিত উপসর্গ চতুর্দিকে। অথচ এই মুহুর্তে মানুষগুলোর সামনে আর কোনো রাস্তাই খোলা নেই।

আপাতত UN থেকে জারি হয়েছে ফুড এমারজেন্সি অ্যালার্ট। প্রতিবেশী দেশগুলোকে ডাক দেওয়া হচ্ছে সাহায্যের জন্য। আশা রাখবো এই মানুষগুলো কোনোদিন হয়তো সত্যিকারের মানুষের খাবার খেতে পারবে। Charlene , তার ছোট বাচ্ছা গুলোর মুখে দুটো ভাত তুলে দিতে পারবে। Marie Noel এর ছোট ছেলেগুলো মাটির বিস্কুটের জন্য আর ঝগড়া করবে না।

সরকারী ক্ষমা
-------------------
অস্ট্রেলিয়া, এই দেশটির কথা মনে করলেই, সবার আগে মনে আসে সেই দেশের প্রাচীন অধিবাসীদের কথা। হারিয়ে যাওয়া অথবা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া অনেকগুলি উপজাতি আর পশ্চিম থেকে আসা ঔপনিবেশিকদের গল্প । এক রক্তাক্ত ইতিহাস আর তারপর ক্রমশ দখল হয়ে যাওয়া জমি, খাদ্য, মানুষ। হ্যাঁ, মানুষ দখলেরও পালা একসময় শুরু হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ায়। ক্রীতদাস হিসেবে ধরে আনা নয়, সরকারী ভাবে ঘোষণা করে একসময় উঠিয়ে নিয়ে আসা হতো অনেক ছোট ছোট শিশুকে। তাদের দোষ ছিল একটাই, জাতিগত ভাবে তারা ছিল মিশ্র। দুর্ভাগ্যক্রমে তাদের রক্তে মিশে ছিল 'সভ্য' অস্ট্রেলিয়ার রক্ত। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে অস্ট্রেলিয়ান সরকার আইন বানায় যে উপজাতির পরিবারে জন্মানো যে কোনো মিশ্ররক্তের শিশুকে আর সেই উপজাতির সাথে থাকতে দেওয়া যাবে না। যেহেতু তাদের শিরায় সামান্য হলেও বয়ে চলেছে 'সভ্য' রক্ত, তাই সরকারের 'মহান' কর্তব্য হলো সেই রক্তকে রক্ষা করা, উপজাতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে, সরকারি ছত্রছায়ায় এই শিশুদেরকে আলাদা ভাবে 'মানুষ' করা।

এই ভয়ঙ্কর নীতির কোপে পড়ে ১৯১৯ থেকে ১৯৭০ অবধি প্রায় এক লাখেরও বেশী শিশুকে তুলে নিয়ে আসা হয় তাদের পরিবার থেকে। মাতৃহারা হয় অজস্র শিশু। ক্রমশ ক্ষোভ আর হতাশা বাড়তে থাকে উপজাতিদের মধ্যে। শেষ অবধি চাপের মুখে পরে সত্তরের দশকে অস্ট্রেলিয়া সরকারের তরফ থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় এই নীতি। পরে ১৯৯৭ সালে একটি কমিশনের রিপোর্টে প্রকাশিত হয় যে, কেড়ে আনা এই শিশুদের বেশীর ভাগই মানসিক অবসাদের শিকার। আর শুধু এই শিশুরাই নয়, মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে আছে সেই মানুষেরাও, যাদের হাত থেকে ছিনিয়ে আনা হয়েছিল এই ছোট শিশুগুলোকে। কমিশন থেকে তৎকালীন সরকারের ওপর চাপ দেওয়া হয় যে, সরকারের উচিৎ উপজাতিগুলোর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং তাদেরকে আর্থিক ভাবে সাহায্য করা। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী John Howard এর মন:পূত হয় নি সেই প্রস্তাব। তারপর থেকেই শুরু হয় দেশ জোড়া আন্দোলন। অস্ট্রেলিয়ার সাধারণ মানুষের তরফ থেকেও উঠে আসে ধিক্কার। অবশেষে এতদিনে স্বীকৃতি পেতে চলেছে সেই আন্দোলন। সদ্য ক্ষমতায় আসা লেবার পার্টির প্রধানমন্ত্রী Kevin Rudd সরকারী ভাবে ক্ষমা চেয়েছেন এই ঘটনার জন্য। লেবার পার্টির Indigenous Affairs Minister জেনি জানান যে আগামী মাসে সরকারের তরফ থেকে ক্ষমা চাওয়া হবে এই ' Stolen generation ' তৈরী করার জন্য। সরকার থেকে জানানো হবে যে এই ঘটনার সমস্ত দায় অস্ট্রেলিয়া সরকারের এবং কোনোভাবেই অস্ট্রেলিয়ার কোনো সাধারণ মানুষ এর জন্য দোষী নন। সরকারও লজ্জিত এই ধরনের আইন প্রণয়ন করার জন্য। তবে ক্ষতিপুরণ দেওয়ার ব্যপারের এখনো কিছু জানাননি জেনি।

Stolen Generations Alliance থেকে ক্রিস্টিনা জানান যে সরকারের তরফ থেকে এই ক্ষমা প্রার্থনা তাঁদের কাছে নৈতিক জয়ের মতন। বহু মানুষ বহুদিন ধরে লড়াই চালিয়েছেন এই ভয়ঙ্কর আইনের বিরুদ্ধে। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে এই ক্ষমা প্রার্থনার মধ্যে। এছাড়া এই ঘটনার মাধ্যমে সরকারের সাথে উপজাতিগুলোর সম্পর্কের বরফ গলারও সুযোগ রয়েছে। তবে স্বভাবত:ই খুশী নন বিরোধী নেতা Brendan Nelson । গত ১২ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকার পর, সদ্য ক্ষমতাচ্যূত Liberal Party র এই নেতার মতে উপজাতিদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার থেকেও অনেক দরকারী কাজ আছে সরকারের। সরকারের উচিৎ সেই সব ব্যাপারে মনোযোগ দেওয়া।


ব্যথাহীন
------------
আচ্ছা ভেবে দেখুন তো, মানুষের যদি কোনো ব্যথা বেদনা না থাকে তবে কেমন হবে? সবার আগে তো পেন-কিলার ট্যাবলেট গুলোর বিক্রি বন্ধ হয়ে যাবে। আর কি হবে? আপনারা বরং সেই সব আকাশকুসুম নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু করুন, আর তার ফাঁকে আমি আপনাদের এমন এক অদ্ভুত প্রাণীর গল্প শোনাই, যার বেদনা বা যন্ত্রণা বোধ সত্যি খুব কম। প্রাণীটি হলো naked mole rat । পুর্ব আফ্রিকার দিকে পাওয়া যায় এই অদ্ভুত প্রাণীটি। কুৎসিত দর্শন এই প্রাণীটির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এরা স্তন্যপায়ী হয়েও ঠান্ডা রক্তের। মাটির নীচে অন্ধকার গর্তে বসবাস এই প্রাণীগুলোর। সম্প্রতি University of Illinois এর একদল গবেষক গবেষণা করছিলেন এই প্রাণীগুলোর ওপর। এদের গায়ের চামড়া নাকি অসম্ভব রকম সেনসিটিভ। চোখের দৃষ্টি খুব দুর্বল বলে, এদের স্পর্শগ্রহণ ক্ষমতা খুব বেশী। এই গবেষণার সময়েই হঠাৎ বিশেষজ্ঞরা দেখেন যে বেশ কিছু রাসায়নিক পদার্থ, যেগুলোর ছোঁয়ায় অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের জ্বালাযন্ত্রণা শুরু হয়, সেগুলো এই naked mole rat এর ওপরে কাজ করে না। ঘুমন্ত ইঁদুরগুলোর পায়ে সামান্য অ্যাসিড ঠেকিয়ে পরীক্ষা চালান গবেষকরা। কিন্তু কোনো সাড়া আসে না ইঁদুরগুলোর তরফ থেকে। অথচ ঐ সমান পরিমাণ অ্যাসিডে সাড়া দিয়েছে প্রায় অন্য সমস্ত জীব।

বিশেষজ্ঞদের মতে এই প্রাণীগুলোর সাড়া দেওয়ার ক্ষমতাটা একটু অন্যরকম। মাটির অনেক নীচে বাস করার জন্য, এদেরকে জীবন কাটাতে হয় এমন এক পরিবেশের মধ্যে যেখানে কার্বন ডাই অক্সাইডের ঘনত্ব খুব বেশী। এমনিতে কার্বন ডাই অক্সাইডের ঘনত্ব ০.১% থেকে বেড়ে ৫% হয়ে গেলেই মানুষের চোখ নাক জ্বালা করা শুরু হয়। কারণ এই বিশেষ গ্যাসটির একটি অ্যাসিডিক এফেক্ট আছে। সেখানে এই mole rat রা শ্বাস প্রশ্বাস নেয় এমন এক পরিবেশে যেখানে কার্বন ডাই অক্সাইডের ঘনত্ব ১০% এর ও বেশী। সেই কারণেই হয়তো এদের নার্ভাস সিস্টেম এমন ভাবে তৈরি হয়েছে যাতে অ্যাসিডিক অনুভূতি এদের খুব কম থাকে। আপাতত গবেষকরা দেখতে চলেছেন এই অদ্ভুত প্রাণীদের প্রতিবেশীরাও একই রকম ক্ষমতার অধিকারী কিনা। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমরা এমন কোনো প্রাণীও পেয়ে যাবো, যাদের ব্যথা বেদনা জাতীয় কোনো অনুভুতি ই নেই।

ফেব্রুয়ারী ৩, ২০০৮