খবর্নয় (ডিসেম্বর ৯)


লিখছেন --- দ্বৈপায়ন বসু


আপনার মতামত         


ভোটে ভায়াগ্রা
--------------
সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি যে আমাদের দেশে ভোট এলেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় ভোটারদের ঘুষ দিয়ে খুশী করার ব্যপারে। বাড়িতে পৌঁছে যায় চালের বস্তা, নতুন জামা,শাড়ি আরো কত কিছু। তবে শুধু ভারত নয়, এসব ব্যপারে পিছিয়ে নেই থাইল্যান্ডও। টাকা দিয়ে ভোট কেনা তো থাইল্যান্ডের রাজনীতির অঙ্গ হয়ে গেছেই - তবে সেই সব ছাড়িয়ে যাচ্ছে এইবারের থাইল্যান্ডের নির্বাচন। টাকা নয়, এবারে ভোট কেনা শুরু হয়েছে ভায়াগ্রা দিয়ে। পাথুম থাই অঞ্চলের একটি রাজনৈতিক দল "পিপলস পাওয়ার পার্টি" এই গুরুতর অভিযোগ জানিয়েছে তাদের বিরোধী পার্টিগুলোর বিরুদ্ধে। এই পার্টিরই এক প্রার্থীর ভাই, সায়ান নোপচা লিখিতভাবে এই অভিযোগটি তোলেন গত বৃহস্পতিবার। মূলত বয়স্ক ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্যই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো শুরু করেছে তাদের ভায়াগ্রা প্রচার। যে কোনো উৎসব বা পার্টি মিটিং এ লুকিয়েচুরিয়ে অকাতরে বিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে ভায়াগ্রা। যদিও এই ওষুধ ডাক্তারের অনুমতি ছাড়া খাওয়া নিষেধ, কিন্তু থাইল্যান্ডে খোলা বাজারেই পাওয়া যায় এই জিনিস। আর এতদিনে ভোটে জেতার অস্ত্র হিসেবেও একে কাজে লাগানো শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো।

এমনিতে থাইল্যান্ডের এই নির্বাচনে প্রশাসনের কড়াকড়ি চলছে খুব বেশী মাত্রায়। যে কোনো ধরনেরই ঘুষ দেওয়া নিষিদ্ধ হয়ে গেছে, এমন কি ভোটার দের মধ্যে টি-শার্ট বিলি করা বা তাদের সফট ড্রিংক্স খাওয়ানো দন্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে এই ভাবে ভায়াগ্রা দিয়ে ভোট কেনার অভিযোগ সেই দলের পক্ষে খুবই গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। যদি এই অভিযোগ শেষ অব্দি প্রমাণিত হয়, তবে সেই প্রার্থী এবং দলকে হয়তো এবারের ভোটে দাঁড়াতে দেওয়া হবে না। আর যাঁরা যাঁরা ঘুষ নিয়েছেন তাঁদের ১০ বছর অবধি জেল হতে পারে।

প্রায় ৪২০০ প্রার্থ্রী লড়ছেন এবারের নির্বাচনে, রয়েছে ৪১ টা পার্টি। পার্লামেন্টের লোয়ার হাউসের ৪৮০ টা সীটে হবে এবারের নির্বাচন। আগামী ২৩শে ডিসেম্বর আমরা জানতে পারবো যে এই 'তোমাকে শেখাবো ভায়াগ্রা' ক্যাম্পেন কত টা সফল হলো।

মোবাইলে গল্প
--------------
গত কয়েক বছরে আমাদের চারদিকে মোবাইল ফোনের ব্যবহার বেড়ে গেছে প্রচন্ড হারে। রাস্তা ঘাটে যেদিকে তাকাও, সেদিকেই দেখতে পাবে মোবাইল ফোনে ব্যস্ত লোকজন। দরকারী কথাবার্তা থেকে শুরু করে বন্ধু বান্ধবদের সাথে আড্ডা, গল্প সবেতেই রয়েছে মোবাইল। তবে শুধু যে আড্ডা মারতে বা গল্প করতে আজকাল মোবাইল ব্যবহার হচ্ছে তা নয়, গল্প পড়তেও শুরু হয়েছে মোবাইলের ব্যবহার। শুনতে খুব আশ্চর্য লাগলেও জাপানের সর্বত্র এখন নতুন হুজুগ হলো মোবাইলে গল্প পড়া। গত ছয় মাসে জাপানের বেশীর ভাগ 'টপ সেলিং ফিক্‌শন' গুলো প্রকাশিত হয়েছে মোবাইলে।

কেইতাই শৌসেতু বা মোবাইল ফোনে প্রকাশিত বই জাপানের প্রকাশনার জগতে এক নতুন সংযোজন। সাধারণ মানুষ, বিশেষত টিন-এজার দের মধ্যে প্রচন্ড ভাবে বেড়ে চলেছে এর জনপ্রিয়তা। কইজোরা ( The love sky ) নামে একটি বই, মোবাইলে প্রকাশিত হওয়ার পর বিক্রি হয়েছে প্রায় ১.২ মিলিয়ন। এক হাইস্কুল ছাত্রীকে নিয়ে লেখা এই বইটা। স্কুলের ছাত্র ছাত্রী দের মধ্যে প্রচন্ড জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই বইটা। মোশিমো কিমিগা নামে একটি বই বিক্রি হয়েছে প্রায় চার লক্ষের ওপর। প্রতিদিন বেড়ে চলেছে মোবাইল বই এর গ্রাহকদের সংখ্যা। হাজার হাজার নতুন গ্রাহক আসছেন তাঁদের মোবাইলে এই নতুন ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। এমনিতেই মোবাইল ফোনের ডাটা সার্ভিসের দিক থেকে জাপান খুব উন্নত। ইউরোপ বা আমেরিকায় ডাটা সার্ভিস চালু হওয়ার অনেক আগে থেকেই জাপানে শুরু হয়েছিল এই সার্ভিস। এখন তাতে যোগ হলো একটা নতুন মাত্রা। তবে আবার উঠে আসছে সেই পুরনো একটা প্রশ্ন, প্রিন্ট মিডিয়ার দিন কি সত্যি তাহলে শেষ হয়ে আসছে...


আমেরিকা আমেরিকা
--------------------
আমেরিকা নিয়ে চিন্তা ভাবনা, আলাপ আলোচনার শেষ নেই মানুষের। রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক, সমস্ত রকমের ক্ষেত্রে কোনো না কোনো ভাবে উঠে আসে আমেরিকার নাম। এমনকি আমেরিকার মানচিত্রটিও হয়ে উঠতে পারে একটি আস্ত রহস্যের খনি। সম্প্রতি তার ই প্রমাণ মিলেছে ওয়াশিংটনের লাইবেরী অফ কংগ্রেসে, যেখানে টাঙানো হয়েছে ৫০০ বছরের পুরনো একটি মানচিত্র। এই বিশেষ মানচিত্রটার বৈশিষ্ট্য হলো যে, আজ অবধি পাওয়া 'আমেরিকা' লেখা মানচিত্রে মধ্যে এটি সব থেকে প্রাচীন।

ঠিক ৫০০ বছর আগে, ১৫০৭ সালে এই মানচিত্রটি আঁকেন এক জার্মান শিল্পী মার্টিন ওয়াল্ডসীমুলার। ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকাতে পা রাখার প্রায় ১৩ বছর বাদে লরেন এর ডিউকের ইচ্ছেতে ফ্রান্সে বসে এই নতুন পৃথিবীর মানচিত্রটি তৈরী করেন ওয়াল্ডসীমুলার। ম্যাপ তৈরীর সময় তিনি সাহায্য নেন প্রায় ১৩০০ বছর আগে আঁকা টলেমীর ম্যাপের আর আমেরিগো ভেসপুচির বর্ণনার। ওয়াল্ডসীমুলার নিজেই স্বীকার করেন যে আমেরিগো ভেসপুচির নাম থেকেই আমেরিকা নামটা তিনি লেখেন ম্যাপে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় অনেক গুলো প্রশ্ন। এই ম্যাপ আঁকার প্রায় ৬ বছর পরে ওয়াল্ডসীমুলার নিজে অন্য একটি ম্যাপ আঁকেন যেখানে উনি আমেরিকা কে "Terra Incognita" বলে উল্লেখ করেন, যার মানে অজানা জায়গা। কেন যে মানচিত্র শিল্পী প্রথমে জায়গাটির নাম আমেরিকা রেখে পরে তা পাল্টে ফেলেন, তা আজ ও অজানা।

সম্প্রতি প্রথম মানচিত্রটি পরীক্ষা করতে গিয়ে আরো অনেক নতুন প্রশ্নের মুখে পড়েছেন বিশেষজ্ঞরা। মানচিত্রে আমেরিকার পশ্চিমে দেখা গেছে বিশাল একটা সমুদ্রের ছবি। অথচ তখনো অবধি আমেরিকার পশ্চিমে পৌঁছননি কোনো ইউরোপিয়ান। ভাস্কো বালবোয়ার প্রশান্ত মহাসাগর অভিযান ছিল, ১৫১৩ তে এবং ম্যাজেলানের পৃথিবী প্রদক্ষিণ শেষ হয় ১৫২০ তে। অথচ এই সবের বহু আগেই আমেরিকার পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগরের ছবি এঁকেছেন ওয়াল্ডসীমুলার। সেই সময় আমেরিকার প্রায় পুরোটাই ছিল অজানা। অথচ এই মানচিত্রে দক্ষিণ আমেরিকার আকার মোটামুটি ভাবে সঠিক। এমন কি অনেক জায়গায় তফাত আছে মাত্র ৭০ মাইলের মতন। কোনো তথ্য ছাড়াই কি ভাবে এই ধরনের একটি মানচিত্র আঁকা সম্ভব? এই ধরনের অজস্র প্রশ্ন নিয়ে চাপান উতোর চালাচ্ছেন ওয়াশিংটনের লাইব্রেরী অফ কংগ্রেসের বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে এই মানচিত্রটি রাখা আছে আর্গন গ্যাস ভর্তি একটি ফ্রেমের মধ্যে। আগামী ১৩ ই ডিসেম্বর থেকে সর্বসাধারণের সামনে হাজির করা হবে একে। উৎসাহীরা চাইলে একবার দেখে আসতে পারেন ৫০০ বছরের পুরনো এই অদ্ভুত মানচিত্র টিকে।


সাদা কালো রিপোর্ট
-----------------
আবার একবার সাদা কালোর সমস্যা নিয়ে শিরোনামে উঠে এসেছে আমেরিকা। সম্প্রতি ওয়াশিংটনের জাস্টিস পলিসি ইনস্টিটিউট এর এক রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে যে ড্রাগ নেওয়ার অপরাধে জেলে যাওয়ার হার, সাদাদের থেকে কালোদের ক্ষেত্রে অনেক বেশী। এই রিপোর্ট অনুসারে প্রায় ১৭৫,০০০ মানুষের জেল হয়েছে ড্রাগ নেওয়ার অপরাধে যার মধ্যে ৫০% ই হলেন কৃষ্ণাঙ্গ, যেখানে জনসংখ্যার মাত্র ১৩% মানুষ রা হলেন কৃষ্ণাঙ্গ। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে সর্ষের মধ্যে ভুত পেয়েছেন এই জাস্টিস পলিসি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপকরা।

আমেরিকার ড্রাগ সংক্রান্ত ফেডারেল আইন এমন ভাবে লেখা আছে যাতে শাস্তি বেশী পায় কৃষ্ণাঙ্গরা। কালো মানুষদের মধ্যে সব চেয়ে বেশী বিক্রি হয় ক্র্যাক, যেখানে সাদা মানুষ রা কোকেনে অভ্যস্ত বেশী। ফেডারেল আইন অনুসারে মাত্র ৫ গ্রাম ক্র্যাক সাথে থাকা মানেই হাজত বাস অনিবার্য, এদিকে কোকেনের ক্ষেত্রে ঐ মাত্রা হল ৫০০ গ্রাম। এছাড়াও স্থানীয় পুলিশ ড্রাগ ধরার জন্য সবচেয়ে বেশী অভিযান চালায় কৃষ্ণাঙ্গ এলাকাগুলোতে, অথচ কলেজ ক্যাম্পাস বা শ্বেতাঙ্গ এলাকা, যেখানে সমান ভাবে ড্রাগের প্রকোপ বর্ত্তমান, সেই সব জায়গাতে পুলিশের দেখা পাওয়া যায় না। এছাড়াও দেখা গেছে যে শ্বেতাঙ্গদের গ্রেপ্তারের পরে অনেক সময়ই মানবিক কারণের অজুহাতে তাদের ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ , যেমন সংসারে সমস্যা, বা একাকিত্ব, বা আশ্রয়হীনতা ইত্যাদি। অথচ কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ গ্রেপ্তার মানেই তার পেছনে পড়েছে সামাজিক অবক্ষয় আর নষ্টচরিত্রের ছাপ। এই সবের ফলে আমেরিকার জেলগুলোতে বেড়ে গেছে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের সংখ্যা। আপাতত জাস্টিস পলিসি সংস্থাটি চাইছে কি ভাবে ড্রাগে আসক্ত ব্যক্তিদের আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা যায়। আশা করা যায় এই কাজে তাঁরা সফল হবেন একদিন, কিন্তু তাদের সমীক্ষা আবার একবার প্রশ্নচিহ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে আমেরিকার তথাকথিত অ্যান্টি রেসিস্ট ভাবমুর্তিকে।

ডিসেম্বর ৯, ২০০৭