একটি প্রমাণসাপেক্ষ কথোপকথন


লিখছেন --- হাট্টিমাটিম


আপনার মতামত         


সেদিন হঠাৎ করেই ঘোড়াদার সাথে দেখা হয়ে গেল রাস্তায়। যাঁরা ঘোড়াদাকে চেনেন না, তাঁদের জ্ঞাতার্থে জানাই, ঘোড়াদা মোটেই ঘোড়া নন, এমনকি কোন চতুষ্পদ জন্তুর সাথেই তাঁর কোন সম্পর্ক নেই। যেদিন ঘোড়াদার জন্ম হয়, অনেক বছর আগে সেইদিনটিতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ""গোরা"" উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। ঘোড়াদার বাবা দিঘাইবাবু (এই নামের ইতিহাসও অতি প্রাচীন, পরে সময় করে কখনও বলা যাবে) রীতিমত সাহিত্যরসিক ছিলেন, ""পিটুলিগোলা সাহিত্যসমাজ"" এর বার্ষিক অধিবেশনে কান্নিক দে'র উত্তরাধুনিক কবিতা শুনে আবেগতাড়িত হয়ে মূর্ছা যাওয়ার মাধ্যমেই তিনি প্রথমবার প্রচারের আলোয় আসেন। ক্ষণজন্মা ছেলের নামকরণে দিঘাইবাবু কোন ঝুঁকি নেন নি। অনেক ভেবেচিন্তে, শেষ পর্যন্ত ঐ গোরা নামটাই সবার মনে ধরে। কিন্তু গোরাদা ছোটবেলা থেকেই ঘোর দেশপ্রেমিক। গোরা বলতে একসময় ইংরেজদের বোঝানো হত, তাই গোরাদা সেটা পাল্টে ""ঘোরা"" করার চেষ্টা করে। কিন্তু এই উদ্দেশ্য সফল হয় না, এবং ""ঘোরা"" অনেক হাত ঘুরে শেষে চারপেয়ে দ্রুতগামী প্রাণীতে পরিণত হয়।

সে যাই হোক, খাঁটি সমাজসেবক হওয়ার দরুণ প্রশাসনের ওপর থেকে নিচমহল, মুখ্য থেকে গৌণ সমস্ত রাজনৈতিক দলের প্রধান অপ্রধান সমস্ত নেতার সাথে ঘোড়াদার দহরম-মহরমের কথা আমরা জানতাম। তাই রাজ্য তথা দেশের এই মহা দুর্দিনে তাকে পেয়েই সবাই মিলে চড়াও হয়ে নানা প্রশ্ন করতে শুরু করলাম। সমস্ত প্রশ্নের উত্তরই ঘোড়াদার নোটবুকে টুকে রাখা ছিলো। তাই প্রশ্ন করামাত্রই বিন্দুমাত্র সময় না নিয়ে নির্ভুলভাবে বক্তৃতা করে যেতে থাকলো ঘোড়াদা। আমাদের কাছে টেপ রেকর্ডার ছিলোনা, তাই খাপছাড়া ভাবে যতটুকু মনে আছে তুলে দিচ্ছি এখানে।

প্রথমেই ঘোড়াদাকে সংবিধান নিয়ে কিছু বলতে বলা হল।
ঘো: সংবিধান সম্পর্কে একটা কথাই বলার। সংবিধান আমাদের ভগবান। ঈশ্বর যেরকম আমাদের জীবনে কখনো অভিশাপ, কখনও আশীর্বাদ হয়ে নেমে আসেন, সাধারণ মানুষের জীবনেও সংবিধানের ভূমিকা ঠিক সেরকম। বুঝতে পারলি না? বেশ আরেকটু খোলসা করে বলি। মনে কর, সামনে ভোট আসছে। সমস্ত দলের প্রার্থীরা দরজায় দরজায় ঘুরছেন। হাজার হাজার লিফলেট। সেগুলো পড়ে তোরা বেজায় বিচলিত হয়ে পড়েছিস। সবাইকেই ভোট দিতে ইচ্ছে করছে, মনে হচ্ছে, আহা! এদের সবাইকেই জিতিয়ে দিলে দেশে আর কোন অভাব থাকতো না। কি, মনে হয় না এরকম? কিন্তু ইচ্ছে করলেও সেটা সম্ভব না। কেন? না, সংবিধানের অনুশাসন মেনে সেটা হবার জো নেই। আবার দেখ, যখন এইসব দলের নেতারা জিতে দায়িত্বে আসেন, তখন তাঁরা এমনসব কাজ করেন, যে মনে হয় আলতো করে তুলে সভ্য সমাজের বাইরে রেখে আসি। কি, ঠিক না? কিন্তু সেটাও অসম্ভব, কারণ, ঐ সংবিধান। কাজে কাজেই ...........
(এই পর্যন্ত বলতেই ভয়ে ভয়ে চারদিক দেখে নিয়ে তড়িঘড়ি আমরা প্রসঙ্গ পাল্টে রিজওয়ানুরের মৃত্যু নিয়ে দুকথা বলতে বললাম)
ঘো: এই ব্যাপারে আমার নতুন করে কিছু বলার নেই। যা বলার সব খবরের কাগজেই বেরিয়েছে। শুধু ঠিক জায়গা থেকে পড়ে নিতে হবে।
(আমরা অবাক হয়ে জানতে চাইলাম ""ঠিক"" জায়গাটা কি ব্যাপার?)
ঘো: ঠিক জায়গা মানে, যে যেরকমটা চায়, সেইরকম কাগজ। আজকের দিনে অ্যাবসলিউট ট্রুথ বলে কিছু হয় না। যে যেটা শুনতে ভালবাসে, সেটাই তার কাছে সত্যি। ট্রায়াল অ্যান্ড এরর মেথডে জেনে নে কোন কাগজের প্রতিবেদন তোর পক্ষে সবথেকে কম বেদনাদায়ক হয়। আরো সহজ করে বললে, কোন কাগজ পড়লে টুকটাক চুরিচামারি করলে, কাজে ফাঁকি দিলে বা ঘুষ নিলে রাতে চোঁয়া ঢেকুর উঠবে না। তারপর সেই কাগজকে সত্য বলে আঁকড়ে ধর। এই একবার আঁকড়ে ধরার পরে কিন্তু আর পাল্টি খাওয়া চলবে না। মনে রাখতে হবে, "" সত্যের জন্য সবকিছু ত্যাগ করা যায় ....."" ইত্যাদি।
(পরের প্রসঙ্গ ছিলো, অবধারিতভাবেই, নন্দীগ্রামের ঘটনাবলী। ভয়ানক খুশি হয়ে ঘোড়াদা বলতে শুরু করলো।)
ঘো: এই যে এক্ষুনি তোদের বলছিলাম, পরম সত্য বলে কিছু হয়না, নন্দীগ্রাম তার দুর্দান্ত উদাহরণ। ভেবে দ্যাখ, সেই ঋগ্বেদের পরে এই একটা বিষয় পাওয়া গেল, যার কোন লিখিত ডকুমেন্টেশন নেই। কোন সন্দেহাতীত প্রমাণ নেই। সবটাই শোনা কথা। এ জিনিষ পৃথিবীর আর কোথাও ভাবা যেত?
(আমরা মৃদু আপত্তি তুললাম এখানে। আমাদের অনেকেই আজকাল মন দিয়ে বাংলার সাথে সাথে ইংরেজী পত্রিকাও পড়ি। সবাই গুনগুন করে নানা প্রমাণ দিতে শুরু করল। বাঁ হাতটা আলগোছে তুলে ঘোড়াদা সবাইকে শান্ত করে বক্তৃতা জারি রাখল)
ঘো: অর্ডার, অর্ডার! এর মধ্যেই ভুলে গেলি সংবিধানের কথা? সবাই বলছে প্রমাণ নেই, তবু বিশ্বাস হচ্ছে না? সংসদীয় গণতন্ত্রে, জানিস কি, একইসাথে প্রশাসনের আর বিরোধীদের বিবৃতি বিশ্বাস করা সংবিধানের খিলাফ?
(আবার আমরা চঞ্চল হয়ে উঠে প্রতিবাদ করে বললাম, সবাই তো প্রমাণ আছে বলছে। নেই কে বলল? )
ঘো: শাসক বলছে প্রমাণ আছে বিরোধীরা দোষী। বিরোধীরা বলছে ঠিক তার উল্টো। দুটো-ই যখন বিশ্বাস করা যাবে না, তখন এর মানে হল, দুজনেই মিথ্যে বলছে। অর্থাৎ, কোন প্রমাণ নেই। আমার সাথে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে সবার। দায়িত্ব নিয়ে বলছি, কেউ কিচ্ছু টুকে-এঁকে-ঢেকে আনতে পারেনি। নো ক্যামেরা, নো অডিও, নাথিং। এখানে সেখানে যা দেখাচ্ছে, সেগুলো সব দীঘায় শুটিং করা।
( আমরা তবু প্রশ্ন করতে যেতেই ঘোড়াদা বাজখাঁই গলায় ধমকালো। ভয়ে ভয়ে প্রসঙ্গান্তরে চলে গেলাম। বুদ্ধিজীবীদের প্রতিক্রিয়া আর সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ নিয়ে জানতে চাওয়া হল।)
ঘো: মন দিয়ে বিভিন্ন কাগজে লেখাগুলো পড়। উফ্‌ফ, কি লিখেছেন সবাই। আমার মতে প্রত্যেকটা প্রবন্ধ প্রাইজের জন্য নমিনেটেড হওয়া উচিত। পড়তে পড়তে চোখে জল এসে যায় ..... ( বলতে বলতে সত্যি সত্যি ঘোড়াদা টিসু পেপার বের করে চোখ মুছতে লাগলো। আমরা ভয়ানক ব্যস্ত হয়ে জল আর হাতপাখার বাতাস দিয়ে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করলাম। ঘড়ি ধরে পুরো দেড় মিনিট কেঁদে ঘোড়াদা সুস্থ হয়ে আবার বলতে লাগলো )
ঘো: আর সাধারণ মানুষ? সাধারণ মানুষ কাকে বলে? জানিস না তো! ভেবে দ্যাখ, সাধারণ মানুষ বলে কিছু হয়ই না। ওরে পাগল, মানুষেরা সবাই, কি বলে যেন, অমৃতের পুত্রকন্যা, তাদের আবার সাধারণ অসাধারণ কি? সুতরাং সাধারণ মানুষ বলে কিসু নেই। আর, যারা নেই তাদের আবার প্রতিবাদ কি? এখন উৎসবের মরসুম চলছে, দুগ্গা-কালী-লক্ষ্মীপুজো শেষ, ভাইফোঁটাও ফুরিয়ে গেছে, তাই একটু হাঁটা প্র্যাক্টিস করছে সবাই। বইমেলা আসছে না? তাছাড়া, তোরা কি মনে করিস এই ব্যানারহীন আন্দোলন, মিছিল, মোমবাতি, এসব চলতে দেওয়া হবে? ভেবে দ্যাখ বাছারা, যদি এগুলো তোরাই করতে শুরু করিস, তাহলে যারা দিনের পর দিন কঠোর অধ্যবসায় নিয়ে শকুনের মত একদৃষ্টে চেয়ে আছে, কখন একটা গোলমাল বাধবে, কখন কটা লোক মরবে, তাদের ব্যবসার কি হবে? আর তাদেরই বা কি হবে যারা সারা বছর মিছিল-মিটিং আর ধর্মঘট করাটাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে? হুঁ হুঁ বাবা, এসব বুঝতে হয়। নইলে .......
আমাদের মুখের ভাব ক্রমশই কঠিন হয়ে উঠছিলো হয়ত। তাই একটা আড়মোড়া ভেঙ্গে চট করে উঠে পড়লো ঘোড়াদা। তারপর অদ্ভুৎ কায়দায় একটা ট্যাক্সি থামিয়ে উঠে পড়ল। আমরা হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
যদিও এই ঘোর কাটতে সময় লাগল না। আমরাও নিজের নিজের গন্তব্যস্থলে চললাম। যত রাগই হোক, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এসব ঘটনা তো ক্ষণস্থায়ী ঢেউ বই কিছু নয়। আমরা যেমন জানি এই সারসত্য, তেমনি জানে ""ওরা"" ও। তাই নানারঙের পতাকা নিয়ে ""ওরা"" অপেক্ষায় থাকে, কবে আমাদের ইচ্ছাশক্তির ভাঁড়ারে টান পড়ে, কবে আমরা তুচ্ছ স্বার্থের জন্য বিচ্যুত হই। তখনই ""ওদের"" সেরা সুযোগ। আজকাল বাজারে একটা কথা খুব চালু। পুনর্দখল!

ডিসেম্বর ২, ২০০৭