সুশীলবাবুর মানেবই


লিখছেন --- সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়


আপনার মতামত         


লেখকের নিবেদন : পরীক্ষা সামনে এসে যাওয়ায় অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে মানেবইটি প্রকাশ করতে হল। বেশ কিছু ইম্পর্ট্যান্ট প্রশ্ন বাদ পড়ে গেল, যা দ্বিতীয় সংস্করণে যোগ করে দেবার চেষ্টা করা হবে। মূল বই পড়ার সময় ও সুযোগ অনেকের হয়না। এই বইটি সেই ছাত্রছাত্রীদের কাজে লাগলে নিজেকে ধন্য মনে করব।

মানুষ কয় প্রকার?

প্রকার টকার নেই, চন্ডীদাস বলেছিলেন, সবার উপরে মানুষ সত্য। মহামতি মার্কস বলিয়াছিলেন, দুই প্রকার -- শোষক ও শোষিত। কিন্তু এসব আসলে ভুলভাল কথা। চন্ডীদাস আউটডেটেড, মার্কস বুলশিট। শোষক-শোষিত, ডান-বাম, এমনকি সিপিএম-তৃণমূল, এইসব এখন চুকে-বুকে গেছে, "হার্মাদ' কবি সোজা-সাপ্টা জানিয়ে দিয়েছেন, মানুষ আসলে দুই রকম -- সুশীল ও হার্মাদ।

সুশীল ও হার্মাদের মূল পার্থক্য কি? বিশদে বর্ণনা কর।

সিম্পল। হার্মাদরা ভালো এবং সুশীলরা খারাপ। কবি বলেছেন "সুশীলের চেয়ে হার্মাদরা নি:সন্দেহে ভালো' (জয়দেব বসু,আজকাল, ২১ শে নভেম্বর)। ব্যস। কবি আরও বলেছেন,
১। এতদিন যারা সরকারের অলিন্দে বিভিন্ন আবদার নিয়ে ঘুরঘুর করলেন এবং
২। ১৪ই নভেম্বর (সরকারবিরোধী) মিছিলে হাঁটলেন, তাঁরাই সুশীল।
এর থেকে একটা জিনিস স্পষ্ট বোঝা যায়, যে, আপনি যদি সরকারের বিভিন্ন অলিন্দে ঘুরে ঘুরে চটির শুকতলা ক্ষইয়ে ফেলেন,ইলেকট্রিক কানেকশন বা জলের লাইনের জন্য নেতা-হাফনেতা-মস্তান-কেরানি-অফিসার মিলিয়ে যদি মোট চোদ্দ জনের কাছে আপনাকে ঘুরতে হয়, তার মানে হল আপনি "বিভিন্ন আবদার নিয়ে ঘুরঘুর করছেন', এবং সেটা খুব খারাপ কাজ। আর দিনের পর দিন সেই কাজ করতে করতে দৈবাৎ যদি রেগে গিয়ে একদিন মিছিল করে ফেলেন, তবে আপনি নি:সন্দেহে সুশীল। আর আপনাকে যদি যথাযথ কানেকশন থাকে, হাঁটাহাঁটি না করেই যদি কাজ উদ্ধার করতে পারেন, তবে আপনি হার্মাদ। এই সরকার আপনারই সরকার। এবং একেই ইংরিজিতে গণতন্ত্র বলে।

উন্নয়নের পথ কি?

ঐকমত্য। খুন করি, ডাকাতি করি, আমাদের সঙ্গে একমত থাকুন। অ-সুশীল শিল্পপতি বলে দিয়েছেন "নিজের রাজ্যের স্বার্থের ক্ষেত্রে গুজরাটে সব দল এক' (সত্যব্রত দে,আজকাল, ২২ শে নভেম্বর)। এখন গুজরাটের পথই আমাদের পথ। সব কথায় একমত হোন। নয়তো চুপচাপ থাকুন। এখন স্পেশালাইজেশানের যুগ, যার-যার কাজ তিনি করুন, অন্যের ফিল্ডে নাক গলাবেন না। রাজনীতি করবেন রাজনীতিকরা, লুটেপুটে খাবে মস্তানরা, বেওসা করবেন ব্যবসায়ীরা, বুদ্ধিজীবীরা খামোখা এইসব ব্যাপারে নাক গলাবেন কেন? রবীন্দ্রনাথ কি কবিতা না লিখে বোম বেঁধেছেন, না আইনস্টাইন ফিজিক্স ছেড়ে ইজরায়েলের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন? শিল্পপতি সাফ বলে দিয়েছেন, "বুদ্ধিজীবীদের তো হওয়ার কথা সক্রেটিসের মতো। যিনি দর্শনে মশগুল, চিন্তায় মশগুল। লাভ-ক্ষতির অঙ্ক কষতে বয়েই গেছে'। সমাজ-সচেতনতা? গণতান্ত্রিক অধিকার? জাস্ট চেপে যান। শিল্পপতি বলে দিয়েছেন "সরকার টাটাদের জমি দিল অনেক সহজ শর্তে। অনেক সুবিধে দিল। দেবেনা কেন? ... টাটাকে দেবেনা তো কাকে দেবে?'(আজকাল, ২২ শে নভেম্বর) একমত হোন। প্রশ্ন-টশ্ন একদম নয়। এখন উন্নয়ন চলছে। কথা বলতে হলে একটি কথাই বলতে পারেন -- "ইয়েস স্যার'। জল উঁচু? ইয়েস স্যার। জল নিচু? ইয়েস স্যার। মহানেতা একবার বলবেন গুন্ডারা কেউ গুন্ডা নয়, সব সাদা পোশাকের পুলিশ,ইয়েস স্যার। পরদিন বলবেন, আমি কি জানি ওরা কারা? ইয়েস স্যার। তসলিমার রাজ্য ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত, ইয়েস স্যার। নানা ভুল বলে ফেলেছিলাম, ইয়েস স্যার।

ঋত্বিক বলেছিলেন ভাবা প্র্যাকটিস করুন। সেসব ভুলে যান। এখন মন দিয়ে ইয়েস স্যার বলা প্র্যাকটিস করুন। পারেন তো ভালো, আখেরে লাভ হবে। নইলে আপনি সুশীল, আপনার বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক সংগ্রাম চালানো হবে।

রাজনৈতিক সংগ্রাম কি?

সোজা বাংলা। মারব এখানে লাশ পড়বে শ্মশানে। খুন করব, কিন্তু ডেডবডি পাওয়া যাবেনা। ছুরি মারতে হলে গ্লাভস পরে মারব, হাতে রক্ত লাগবেনা। নন্দীগ্রাম বিষয়ে অ-সুশীল সাহিত্যিক বলেছেন "যেকোনো মানুষের মৃত্যুই আমাকে বেদনার্ত করে। রক্ত আমিও দেখতে পারিনা। ... অগণ্য চতুষ্পদ বন্যপ্রাণী এবং জলচর-স্থলচর পাখি মারার পর কখনই আমি তাদের চামড়া ছাড়াইনি বা পালক ছাড়াইনি। ভালো মার্কসম্যান হিসাবে নির্ভুল নিশানাতে গুলি করেই খুশি হয়েছি, মৃত পশুপাখির কাছেও যেতে পারিনি'(বুদ্ধদেব গুহ,আজকাল, ১৭ই নভেম্বর)। দূর পাল্লার রাইফেল থেকে নির্ভুল নিশানায় গুলি করে মানুষ মারুন, মেরে অপার আনন্দ লাভ করুন। নিজে না পারলে গোটা রাজ্য থেকে পেশাদার বন্দুকবাজদের ডেকে আনুন। কিন্তু চামড়া ছাড়াবেন না, হাতে রক্ত লাগবে যে।

আমাদের রাজনৈতিক সংগ্রাম চলছে চলবে।

নভেম্বর ২৫, ২০০৭