খবর্নয় ( নভেম্বর ১৮)


লিখছেন --- দ্বৈপায়ন বসু


আপনার মতামত         


জীবন্ত বৃষ্টি
------------
আজ থেকে প্রায় বছর ছয়েক আগে, ২০০১ এর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে কেরালার বেশ কিছু জায়গায় লাল বৃষ্টি হয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেছিলেন যে প্রচন্ড জোরে একটা আওয়াজ শোনা যেত আর তার পরেই শুরু হতো বৃষ্টি। সাদা জামায় পড়লে, লালচে দাগ হয়ে যেত জামায়। কিন্তু এই ধরনের লাল বৃষ্টি, হলুদ বৃষ্টির কথা তো আমরা প্রায়ই শুনে থাকি। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা যাকে অতিরিক্ত দূষণের ফল বলে মনে করেন। তাহলে এই ছয় বছর পরে কেরালার লাল বৃষ্টি আবার কেন খবরের শুরুর দিকে? এর উত্তর দিতে পারেন ডক্টর গডফ্রে লুইস, যিনি সেই সময়ে মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিদ্যা বিভাগে ছিলেন। কেরালার লাল বৃষ্টির কথা শুনে তিনি সেই সময়ে সংগ্রহ করেন বৃষ্টির জল। গত ছয় বছর ধরে বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছেন উনি।

বৃষ্টির জলকে যখন মাইক্রোস্কোপের নীচে রাখা হয় প্রথম, তখন একটা অদ্ভুত জিনিস দেখা যায়। পুরো তরল পদার্থ টা আসলে লালচে রঙের, জীবন্ত কোষের মতন দেখতে কোনো পদার্থের সমষ্টি। কোষগুলো গড়ে প্রায় ১০ মাইক্রন বড়, অর্থাৎ আমাদের লোহিত কণিকার থেকে একটু বড়। এর পর বহু দিন ধরে চলে নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা। প্রায় ৩০০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের মধ্যে ফেলা হয় লাল বৃষ্টির কোষগুলোকে। সাথে বাড়ানো হয় চাপ। প্রায় ৩০০ পাউন্ড প্রতি বর্গ কিলোমিটার চাপ অব্দি দেয়া হয় এদের ওপরে। অদ্ভুত ভাবে এই অতিরিক্ত তাপ আর চাপে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে কোষগুলো। মাইক্রোস্কোপের নীচে দেখা যায় বড় লাল কোষগুলোর ভেতরে ছোট ছোট সাদা কোষ তৈরি হচ্ছে। একটা মাদার সেলের মধ্যে প্রায় ১৫ টার কাছাকাছি ডটার সেল জন্ম নিচ্ছে। যদিও এরা প্রথমে সাদা রঙের থাকছে, কিন্তু ক্রমশ এরা বড় আর লালচে হয়ে উঠছে, একসময়ে মাদার সেলকে ফাটিয়ে বেরিয়ে আসছে এরা। এই ধরনের রেপ্লিকেশান প্রসেস দেখা যায় ইষ্ট সেলের মধ্যে। তাই প্রথম প্রথম এগুলো কে ইষ্ট সেল বলে মনে করেছিলেন অনেকে, কিন্তু সম্প্রতি দেখা গেছে সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যপার। এই লাল বৃষ্টি কোষের কোথাও DNA নেই। অথচ অদ্ভুতভাবে DNA ছাড়াই এরা চালিয়ে যাচ্ছে রেপ্লিকেশান প্রসেস। এই লাল বৃষ্টিকে আইসোট্রপিক রেসিও টেস্ট করাবার জন্য পাঠানো হয় ক্কর্নেল ইউনিভারসিটিতে। সেখানে পাওয়া যায় হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন অ্যালুমিনিয়াম ইত্যাদি। কিন্তু পাওয়া যায় নি ফসফরাস, যা DNA র অন্যতম উপাদান। কার্ডীফ ইউনিভারসিটির অ্যাস্ট্রোবায়োলজি সেন্টার থেকেও একই রিপোর্ট এসেছে। আপাতত লাল বৃষ্টির রি-প্রোডাকশান পদ্ধতি আলোড়ন তুলে দিয়েছে বিশেষজ্ঞ মহলে। হয়তো প্রাগৈতিহাসিক যুগের কোনো বিশেষ মুহুর্তে, DNA গঠনের আগে এই ভাবেই শুরু হয়েছিল রি-প্রোডাকশান পদ্ধতি, জীব জগতের বিস্তার। উত্তরের জন্য আমরা অপেক্ষায় রইলাম।

সোনালী ডেসার্ট
--------------
ভাল মন্দ খাওয়ার পরে, শেষ পাতে একটু মিষ্টি না হলে কি চলে? সে এ পারের বাঙালী হোক, বা ওপারের আমেরিকান, মিষ্টি নিয়ে আদিখ্যেতা সবার সমান। কিন্তু সেই আদিখ্যেতা যে কোন স্তরে পৌঁছাতে পারে, তার এক আশ্চর্য উদাহরণ হলো নিউ-ইয়র্কের সেরেন্ডিপিটি ৩ রেস্টুরেন্ট। সম্প্রতি এই রেস্টুরেন্ট, তাদের ডেসার্টের মেনুতে এমন একটা হট চকোলেট রেখেছিল যার প্রতি কাপের দাম ২৫,০০০ ডলার!
Frrrozen Haute Chocolate নামের এই ডেসার্ট, আপাতত বিশ্বের সবচেয়ে মহার্ঘ্য ডেসার্ট। ১৪ টা দেশ থেকে সংগ্রহ করা ২৮ রকমের কোকোর সাথে দুধ মিশিয়ে, তাকে ঠান্ডা করে তৈরি করা হয়েছে এই ডেসার্ট। তার ওপরে ছড়ানো থাকছে ৫ গ্রাম ২৪ ক্যারাটের সোনা, অবশ্যই খাবার জন্য। এর পরে থাকছে ক্রীম আর La Madeline au Truffle । এমন স্বর্ণখচিত ডেসার্ট যে পাত্রে পরিবেশন করা হবে, তার বাহার ও কিছু কম নয়। সোনার তৈরি যে গবলেটে এই হট চকোলেট দেয়া হয়, তার গায়ে লাগানো থাকে ১ ক্যারাটের হীরে। সাথে থাকে সোনার তৈরী চামচ। খাবার পর, এই সমস্ত কিছু সাথে করে নিয়ে চলে আসতে পারেন খাদ্য রসিক রা।

এতদিন মহার্ঘ্য ডেসার্ট বলতে লোকে বুঝতো Fortress Aquamarine , যাতে থাকতো রায় ৮০ ক্যারাটের Aquamarine la Á। দাম ছিল ১৪,৫০০ ডলার। এতদিনে তাকেও ছাড়িয়ে গেলো এই নতুন ডেসার্ট।


দ্য ভিঞ্চি কোড
-------------------------------
ড্যান ব্রাউনের লেখা বাজারে আসার পর থেকে ভিঞ্চি কোড নিয়ে লোকের আগ্রহ কম ছিল না। তবে এতদিনে হয়তো সত্যি খুঁজে পাওয়া গেল লিওনার্দোর লেখা কোনো লুকনো, গোপন কোড। কিন্তু নাহ, এর পেছনে কোনো রহস্যের গন্ধ শুঁকতে যাওয়া বৃথা। Giovanni Maria Pala নামক এক মিউজিসিয়ানের দাবী যে ভিঞ্চির আঁকা লাস্ট সাপার ছবিটির মধ্যে লুকনো আছে একটি মিউজিকাল নোট, যাকে ডিকোড করতে সক্ষম হয়েছেন উনি। ১৪৯৪ থেকে শুরু করে চার বছর ধরে মিলানের চার্চের দেয়ালে আঁকা হয়েছিল দ্য লাস্ট সাপার ছবিটি। যীসাসের শেষ খাওয়া তাঁর ১২ জন অনুচরের সাথে। সেখানে যীসাসের ঘোষণা, যে এঁদের মধ্যে কেউ হয়তো বিশ্বাসঘাতকতা করবে তাঁর সাথে। সেই শুনে সবার অবাক হয়ে যাওয়া। এই বিশেষ মূহুর্তটা ধরা আছে ছবিটির মধ্যে। এখন ছবিটির অন্য একটা দিক নতুন করে সামনে এলো। তবে এর আগেও একবার এমন দাবী উঠেছিল। এর আগে অনেক বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন যে অনুচরদের হাতের বিভিন্ন ভঙ্গিমা কোনো gregorian chant এর নোটস হলেও হতে পারে। সে কথাতেই উৎসাহ বোধ করেন জিওভানি পালা। ২০০৩ থেকে শুরু করেন এই নিয়ে পড়াশুনা। ছবির বিভিন্ন অংশ নিয়ে শুরু হয় অ্যানালিসিস।

খাওয়ার টেবলটাকে বেস ধরে উনি এঁকে ফেলেন নোটস এর পাঁচটা লাইন। লাইনের ওপর থাকা রুটি থেকে শুরু করে যীসাসের নিজের হাত, তার অনুচরদের হাত, প্রত্যেকটা এক একটা নোটসএর ছবি নেয়। শেষ অব্দি চার বছরের চেষ্টায় উদ্ধার হয় ৪০ সেকেন্ডের এই নোটস। উদ্ধার করার পরে প্রথম প্রথম মনে হয়েছিল খুব অর্থহীন এই নোটস। শেষে ডানদিক থেকে পড়া শুরু করতেই ধরা পড়ে আসল চেহারা। প্রসঙ্গত: উল্লেখযোগ্য যে ডানদিকে লেখাই ছিল ভিঞ্চির নিজস্ব স্টাইল। পালার মতে পাইপ অর্গানে বাজানোর জন্য তৈরি এই নোটস। টেম্পোর দিকটা খুব স্লো হলেও খুব মিউজিকাল। পুরো নোটস টা শুনতে লাগে একটা requiem এর মতন। উৎসাহীরা চাইলে পড়ে দেখতে পারেন পালার লেখা La Musica Celata (The Hidden music) বইটি। পালার বইটা হয়তো সত্যি নতুন কোনো "dark secret' এ আলো ফেলতে পারল না, কিন্তু রেনেসাঁসের এই মহান আর্টিস্টের বিশাল প্রতিভার একটা নতুন দিক দেখালো নি:সন্দেহে।

নভেম্বর ১৮, ২০০৭