সমালোচনা বিষয়ে কয়েকটি অবান্তর কথা


লিখছেন --- হাট্টিমাটিম


আপনার মতামত         


উচ্চশিক্ষিত(/তা) এবং সংস্কৃতিবান (/বতী) বাঙালীমাত্রেই সমালোচনা করতে ভালবাসেন। তাঁদের সমালোচনা যুগপৎ "ইরেজার' আর "শার্পনার'এর কাজ করে। ভন্ড, ক্লিশে, অপ্রয়োজনীয় লেখক-গায়ক-আঁকিয়েরা কখনো সমালোচনার দাপটে "ইরেজিত' হয়ে স্রষ্টা থেকে ভোক্তায় পরিণত হন। অন্যদিকে আবার কম ধারালো প্রতিভাবানেরা সমালোচনার শার্পনারে আরো চোখা হয়ে প্রবল বেগে পাঠক-শ্রোতা-দর্শককে নব নব সৃষ্টির খোঁচায় ব্যাকুল করে তোলেন। ধনের মত সমালোচনার-ও মূল ধর্মই হল, অসাম্য। সেখানে মুড়ি-মিছরি একদর হবার ভয় নেই মোটেই। প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য, এই প্রবন্ধে শুধু আ-মরি বাংলা ভাষার সাথে সম্পর্কিত সমালোচনা এবং কৃতি সমালোচকদের কথাই বলা হচ্ছে, অন্য ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের মোটেই মাথাব্যথা নেই। মানে হল, হয় মাথা নেই অথবা ব্যথা নেই;কারন দুটো-ই নেই এরকম হতে পারেনা, যদিও দুটো-ই আছে এমনটা দুর্লভ নয়; আবার একটা না থাকলে অন্যটা থাকবে কিনা সেটাও ভাবার বিষয়। পাঠক, এই অপূর্ব বাক্যবিন্যাসটি লক্ষ্য করুন। সমালোচকের মস্তিষ্ক ও হৃদয়ের মূল সুরটি ধরার জন্য আপনার ইন্টেলেকচুয়াল কম্পাঙ্কের কিছুটা ফাইন টিউনিং প্রয়োজন। যথার্থ সমালোচক এরকম অসংখ্য বাক্যবন্ধের সাহায্যে যখন কাটাকুটি খেলতে থাকবেন তখন যেন আপনার অবস্থা চাকা বসে যাওয়া কর্ণের মত না হয়। অতএব ভগবানে ভয় আর পিছিয়ে পড়াকে জয় করে শিখতে থাকুন।

তো, যে কথা হচ্ছিল। যেহেতু সাম্য নিয়ে কোন বাড়াবাড়ি নেই, তাই সমালোচক প্রথমেই দেখে নেন, স্রষ্টা কোন পর্যায়ভুক্ত। উচ্চবংশজাত কুকুরের যেমন সার্টিফিকেটের অভাব হয় না, ""প্রকৃত প্রতিভাবান'' স্রষ্টাও তেমনি সমালোচকের কৃপাদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হন না। আদর্শ সমালোচকের সংজ্ঞায় আছে সমালোচক অবশ্যই বিষয়টির সম্পর্কে অভিজ্ঞ হবেন, বিষয়টি তাঁর জ্ঞানের পরিধির মধ্যে যেন অবশ্যই থাকে, তিনি যেন নিরপেক্ষ হন ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন, সেই শৈশব থেকেই আমরা জেনে আসছি যে আদর্শ বলে কিছুই হয়না ( সেই বয়েল ও চার্লসের সূত্র স্মরণ করুন), তাই আদর্শ সমালোচক বলে কিছু হওয়া অসম্ভব। যাঁদের আমরা দেখি, তারা সবাই আপাত-আদর্শ সমালোচক। যেমন ধরুন, ক-বাবু একটি কেতাব লিখলেন। নাম ""গৃহপালিত পশু প্রজনন''। তুখোড় সমালোচক খ-দেবী ( ইনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ""বাংলা সাহিত্যে মাছি"" বিষয়টি পড়ান ও গবেষণা করেন) বইটা না পড়েই ""পশু প্রজননের'' বংশলোপ করে দিলেন। আদর্শ সমালোচনার সংজ্ঞায় খ-দেবী ফেল। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে খ-দেবী তাঁর গবেষণা পত্রের জন্যে প্রশংসিত হবেন, কারন বিখ্যাত পাবলিশিং হাউস,অখ্যাত পশুচিকিৎসক, কুখ্যাত সমাজবিরোধী এবং দুর্দান্ত বুদ্ধিজীবীরা ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে পৃথক মঞ্চ থেকে তাঁকে সমর্থন করবেন। পরে অবশ্য খ-দেবীর কাব্যগ্রন্থ ""মক্ষিরানী পক্ষিরাজ'' ক-বাবুর লেখায় তুলোধনা হবে, সাথে থাকবেন আরেকদল বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণির বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান। উভয় সমালোচনাই একটি বিশেষ শ্রেণির কাছে আদর্শ এবং অপরপক্ষের কাছে পক্ষপাতদুষ্ট। জনগণ, অবহিত হোন, ইহাই সমালোচনার নতুন ফান্ডা (নামান্তরে ফান্ড-প্রসূত সমালোচনা)।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে , অভিজ্ঞতা ও নিরপেক্ষতার বালাই বিদেয় হয়ে সমালোচনা আগের থেকে অনেক মুক্ত ও উদার হয়েছে। আজকাল সমালোচনা করার জন্য মূল সৃষ্টি সম্পর্কে সম্যক ধারনা না থাকলেও চলে। সত্যি বলতে কি, না থাকলেই বরং সমালোচনা বেশি মৌলিক হয়। সৃষ্টি হয় সমালোচনা সাহিত্য। কিন্তু ভাল জিনিসের কদর কে আর কবে বুঝেছে? তাই নিন্দুকেরা বলাবলি করে যে এই নিও-সমালোচনা (অর্থাৎ কিনা ""সমালোচনা কে আপন করে নিও'') সৎ প্রচেষ্টাকে খুন করছে, মৌলিক সৃষ্টির স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে, সমালোচনা আরো গঠনমূলক হওয়া উচিত। অবশ্য কেউ কেউ চিৎকার করলেই শুনতে হবে এমন কোন কথা নেই। তাই অনাগত, নবাগত এবং সমবেত সমালোচকদের প্রতি আবেদন , আপনারা অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে ক্ষেত্রবিশেষে কোমল বা কঠোর সুরে লিখে যান। আপনাদের কথায় কিছু শিল্পসামগ্রী সম্পর্কে মানুষ আগ্রহ হারাবে, বাকিগুলো পছন্দ না হলেও নিমের পাঁচন ভেবে গিলে নেবে কিন্তু এইসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আপনারা বিচলিত হবেন না। কেউ লেখা-গাওয়া-আঁকা বন্ধ করে অভিমানে গোঁজ হয়ে থাকলেও আপনারা কর্তব্যচ্যুত হবেন না। অন্যদিকে শিল্পরসিকদের কাছে আবেদন, বিশেষজ্ঞ সমালোচকদের কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলুন। ওনারা ভাল বললেই বস্তুটিকে মাথায় তুলুন, বাজে বললেই জামানত বাজেয়াপ্ত করে উচিত শিক্ষে দিন। সংস্কৃতির শত্রুদের ক্ষমা করবেন না।

নভেম্বর ১১, ২০০৭