মানবিক হয়েই ম্‌ত্যু - বাঁদররা কী ভাবছে


লিখছেন --- অরিন্দম চক্রবর্তী


আপনার মতামত         


রোজ রাতে পাঁচজন বাঁদরের সঙ্গে গল্প করি আমি । গল্প যেরকম হয় আর কি , হ - য- ব - র - ল টাইপের । যেমন ধরুন - পৃথিবীর সব জোকস সর্দারজীদের নিয়ে কেন হয় ? বাঙালি মেয়েরা "মা" হয়ে গেলে কেমন একটা হয়ে যায় ! চাকরিতে ছেলেদের "মেয়ে বস" আর মেয়েদের "ছেলে বস" কতটা জরুরী , ঘরে বাইরে শাশুড়ি আর বৌ-এর সর্ম্পকের সঙ্গে দিল্লী ও বঙ্গের রাজনীতিতে সি পি এম আর কংগ্রেসের কতখানি মিল ও আমিল , এবছর ইলিশের দামটা কেন এত চড়া , ইত্যাদি ইত্যাদি ।

গতকাল রাত্রে বাড়ির উল্টোদিকের কদমগাছে বসে পা দোলাচ্ছি আর সিগারেট ফুকছি এমন সময় ওরা সদলবলে এল। প্রথম থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম আজ ওদের মাথায় চড়তে দেবনা । রোজরোজ আমাকে ওরা খুব হ্যাটা দেয় । মনেমনে ঠিক করে রেখেছিলাম আজ আসল বিষয়ে যাওয়ার আগে ওদের বুঝতে দেবনা ঠিক কোন বিষয়ে আজ আলোচনা করব । ওরা এল । গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসল । তবে ওরা হল আমার পূর্বপুরুষ , তাই ওদের চোখকে ফাঁকি দেওয়া আমার পক্ষে খুব কঠিন কাজ । যা ভেবেছি ঠিক তাই , হেসে জিজ্ঞেস করল - কি হে !
চুপচাপ যে , মনটন খারাপ নাকী ?
একটু গম্ভীর মুখ করে বললাম , না ।
- তাহলে ?
- ভাবছি ।
- কী ?
একটু কায়দা মেরে হাতে ধরা সিগারেটটা দেখিয়ে বললাম , মানুষের জীবনটা অনেকটা সিগারেটের মতন । কীরকম দগ্ধ হতে হতে একসময় স্তব্ধ হয়ে যায় ।
- এই রে , আজ আবার মরণমুখী কেন ? তুমি তো "জীবনমুখীর" দলে ছিলে !
- না , আসলে ক"দিন ধরে মনটা খুব বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে ।
- কেন বৌ-এর সঙ্গে গোল বাঁধিয়েছো নাকী ?
- কেন বৌ ছাড়া আর কি কোন বিষয় নেই , যত্তসব ! খুব রাগ হল ব্যাটাদের ওপর । মনেমনে বললাম , ইডিয়েট। ভদ্দরলোকের গালাগাল ।
- তাহলে ?
- এই বিজয়ের ঘটনায় মনটা কেমন হয়ে গেছে । টি ভি তে দেখেছো তো ?
- হ্যাঁ , দেখেছি । খুউউব মর্মান্তিক ঘটনা ।
- মর্মান্তিকতো বটেই , তার চেয়েও যে জিনিসটা বেশী ভাবাচ্ছে , তা হল , আমরা কোথায় যাচ্ছি কে তা জানে ?
- কলিকাল , তাই অন্ধকারে দেখা যায়না ভাল ।
- খুব রাগ হল । বললাম , ঠাট্টা করছো ?
- না , না ঠাট্টা করবো কেন ?
- তাহলে !
- এমনি বললাম ।
- তাই বল । আসল ক্রাইসিসটা বুঝতে পারছ? আমরা কী আমানবিক হয়ে যাচ্ছি !
- এটা ঠিক , তোমাদের সামাজিক দায়িত্বটা একটু কমে গেছে । দায়বদ্ধতা তলানিতে ।
- গুলি মারো দায়বদ্ধতা , একটু মানবিকতা থাকলেই যথেষ্ট ।
আগুনে ঘি পড়ল । লাফ মেরে একজন সামনে এসে আমার গাল টিপে বলল , দেখ দেখ , মুখময় কেমন একটা প্রতারক সরলতার ছাপ স্পষ্ট ।
- এ কথা বলছ কেন ?
- কেন বলবনা বল ! তোমরা কখনও ভেবে দেখেছ একজন মানুষ মানবিক না হয়ে শুধুমাত্র ঠিকঠিক দায়-দায়িত্ব পালন করেই সমাজের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারে ।
অমি একটু রেগে গিয়ে বললাম কী বলছো তোমরা ? মানবিকতা হল মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম ।
কথাটা শেষ হলনা ওরা সমস্বরে চেঁচিয়ে বলল , মানবিকতা হল ধামা যা দিয়ে তোমরা তোমাদের দায়বদ্ধতাকে চাপা দাও ।
- কীরকম ?
- দাঁড়াও তোমাকে একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাই - ধর দু"জন বন্ধু রাØতা দিয়ে যাচ্ছে । সামনে একজন মহিলা এল । হাতে তোবড়ানো বাটি , কোলে দুর্বল শিশু । ভিক্ষে চাইল । ওরা দিল । প্রথমজন , দ্বিতীয়জনকে জিজ্ঞেস করল , তুই কেন পয়সা দিলি ? দ্বিতীয়জনের চটজল্‌দি উত্তর , আহা ! গরীব মানুষ খেতে পায়না তাই দিলাম । তোমরা যেরকম বলে থাক আর কি !
এবার দ্বিতীয়জন বলল আমি দিলাম কেন দেওয়া উচিৎ বলে । অভাবী মানুষকে সাহায্য করা উচিত । মানুষ হিসাবে আমি আমার সামাজিক দায়কে অস্বীকার করতে পারিনা । এরথেকে কী বুঝলে ?
- কী আর বুঝব ।
- ওমা ! এর থেকেতো একটা জিনিস পরিষ্কার হল , প্রথমজনের কাছে "মানবিকতা" অহঙ্কারের অলঙ্কার আর দ্বিতীয়জনের কাছে দায়বদ্ধতা একটি মৌলিক ধর্ম । এইরকম আরো অনেক অনেক উদাহরণ দিতে পারি । আসল কথাটা কী জান ভায়া , বর্ণপরিচয়ে যেগুলোকে দায়বদ্ধতা বলা হয়েছে তাকে তোমরা মানবিকতা বলে ধরে নিয়েছ । তাই যুক্তিহীন শিক্ষা-সংস্ক্‌তি তোমাদের সামাজিক সঙ্কটের মুখে ফেলে দেয় বারবার । অবশ্যি অন্যভাবে দেখলে মানতেই হবে তোমরা মহা ঢ্যামনা !
- একথা বলছ কেন ?
- বলবনা ! মানবিকতাকে গ্লোরিফাই করতে করতে তোমরা এমন একটা জায়গায় নিয়ে গেছ , যে এর প্রয়োগে নিজেকে মহামানব করে দেখানোর সহজতম রাস্তা আজ তোমাদের নখদর্পনে । আর মজাটা কী জান , যখন তুমি কোন বিষয়কে অযথা গ্লোরিফাই করবে তখন তাকে
সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করার জন্য তোমাদের মধ্যে কোন তাগিদ কাজ করবেনা । নিজেদের দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্ম্মকে চাপা দেওয়ার জন্য তখন ঠিক একটা অজুহাত খাড়া করে দেবে । এই যেমন বিজয়ের ম্‌ত্যুর পর একজন বিখ্যাত সাহিত্যিক বললেন - উচ্চবিত্ত পাড়ায় বলে এইরকম ঘটনা ঘটল কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্ত পাড়ায় বা কলকাতার মধ্যে হলে এটা হতনা । কী করে ও এটা বলল বলোতো ! খোদ বৌবাজারেই দিনদুপুরে এক ভদ্রলোক গাড়ীতে হেলান দিয়ে মারা গিয়েছিলেন সে ঘটনা কী ভুলে গেল ব্যাটা ।
- এটা ঠিক বলেছ ।
- শুধু কী এটা ! অরো আছে । গাড়ীর সামনে পথচারী পড়ায় বিজয় ব্রেক কষেছিল , এটা কী কোন মানবিক কাজ , তুমিই বল ? অথচ বাঙালির নেকুপুষু মস্তিষ্কে তরঙ্গ উৎপন্নকারী পত্রিকাটি প্রথম পাতায় হেডিং দিল - মানবিক হয়েই ম্‌ত্যু ------ । কী সব এলোঝেলো কনসেপ্ট ।
বিজয় কিন্তু জানত পথচারীকে বাঁচানো ওর কর্তব্য তাই ব্রেক চাপতে কসুর করেনি । বুঝেছিলেন সেই ভদ্রলোক তাই সল্টলেকের রাস্তা থেকে রক্তাক্ত শিশুটিকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন হাসপাতালে , বলেছিলেন , নাম ছাপবেননা কাগজে , কারণ এমনকিছু করিনি যাতে নাম ছাপাতে হবে । ওদের কাছে কিন্তু মানবিকতার থেকেও দায়বদ্ধতা বেশী মূল্যবান । তোমাদের কাছে নয় । তুমিও তো ২১শে সেপ্টেম্বরের কাগজ দেখে
পুঁটিকে এসে বললে , পুঁটি তুমি কী ভাল কাজ করেছ । মহান কাজ ।
- কেন পুঁটি মহান কাজ করেনি ? (এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি , পুঁটি হল ওদের পাঁচজনের মধ্যে একমাত্র মহিলা)
- না ! পুঁটি সেদিন হাওড়ার সাঁতরাগাছি গিয়েছিল । তারপর ফেরার পথে দেখে একটা বিড়াল ছানা পথে পড়ে আছে । ও ওকে বুকে তুলে নিল , দুধটুধ খাওয়াল । একটু কোলে করে এ ডালে সে ডালে ঘুরল । আমরা এগুলোকে কোন মহান কাজ হিসাবে দেখিনা , তোমরা দেখ । তাই তোমরা ২১ তারিখের কাগজে পুঁটির ছবি ছাপিয়ে দিলে । শোন , এগুলো আমরা করেই থাকি । এ নিয়ে আমাদের কোন গর্ববোধ নেই ।
বাঁদরদের দাপটে আমি তখন নাকানি-চোবানি খাচ্ছি , তবু একটা মরিয়া চেষ্টা করলাম । বললাম , তারমানে আমাদের অভিধানে "দায়বদ্ধতা" নেই ?
এক্কেবারে ক্লীনবোল্ড করে দিল । বলে কী , আছে আছে , তোমাদেরও দায়বদ্ধতা আছে , তবে তা - সেতু প্রসঙ্গে ।
এরপর আর বসে থাকিনি , ডাল থেকে নেমে সোজা দৌড় দিলাম বেডরুমের দিকে । কারণ আমার মতন মধ্যবিত্ত শিক্ষিত লোকেরতো আরও একটা দায়বদ্ধতা আছে । নাইট লাইফ । ১০ মিনিটের খেল । তবে সে অন্য গল্প । অন্য কোনদিন ।
---------------------------------------------------------------------------------------------------------
পু:- ওপরে যে দু"একটি খিস্তি খেউড় আছে তা একান্তই বাঁদরেদের নিজস্ব ভাষা, কারণ ভদ্রলোকেদেরতো একটা দায়বদ্ধতা আছে । তাঁরা বেডরুমে ওসব ব্যবহার করেন কিন্তু খোলা পাতায় এবং প্রকাশ্যে ওসব করেননা ।

সেপ্টেম্বর ৩০, ২০০৭