পালনা


লিখছেন শমীক মুখোপাধ্যায়


আপনার মতামত         


শূন্যে দুলছে একটা শিশুদোলনা। হা-হা হাওয়ায় ওদিক যাচ্ছে, এ দিক আসছে, একটা শিশুদোলনা। পালনা।

কয়েকমাস আগে একটা হরর মুভি দেখেছিলাম এক জনপ্রিয় হিন্দি নিউজ চ্যানেলে। সত্যি ঘটনা, তবে ভয়ঙ্কর ঘটনাগুলোকে গ্রাফ, স্কেচ, নাট্য রূপান্তর ইত্যাদি আর চাটনি আচার সহযোগে এমনভাবে পৌঁছে দেওয়া হয় আমাদের ড্রয়িং রুমে, মনে হতেই পারে যে, আমরা রাত এগারোটায় মুভি চ্যানেল খুলে কোনও ভয়ের সিনেমা দেখছি।

যে লোকটা হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে স্টেটমেন্ট দিচ্ছিল টিভি ক্যামেরার সামনে, বেশ শক্তপোক্ত গোছের চেহারা, মানে, এক ধরণের অ্যাপিয়ারেন্স থাকে না, যাদের দেখলেই মনে হয়, এ লোক কখনও কাঁদতে জানে না, টাফ ম্যান, সেই রকমের মুখ। মুখ্যত সেই জন্যেই খবরের দিকে মন দিলাম। কী কারণে এই রকমে রেকটা লোক কাঁদছে? কী হয়েছে?

না, লোকটার কোনও সর্বনাশ হয় নি। এক পরিত্যক্ত শিশুকন্যা সে খুঁজে পেয়েছে। পঞ্জাবের মত রাজ্যে এটা খুব বড় কোনও ঘটনা নয়। কন্যাসন্তানের জন্ম এই সব এলাকায় এতই অযাচিত যে কন্যাভ্রূণ বা সদ্যোজাত শিশুকন্যাকে নিকেশ করে ফেলার জন্য এখানে নুনের ঢিবি, দুধের বাটি কিংবা পরিত্যক্ত কুয়োর অভাব কোনওদিন ঘটে না। অভাব হয় না আরও নিত্যনতুন অনেক অনেক ইনোভেটিভ আইডিয়ার। সেই রকমই ঘটনা।

ছ'ফুট লম্বা দুটো পাঁচিল চলে গেছে পাশাপাশি। দুটো পাঁচিলের মধ্যেকার গ্যাপ দেড় ফুটের মত হবে। সেই সরু পরিসরের মধ্যে কেউ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গেছে তিন দিন বয়েসের একটি সদ্যোজাত শিশু। তার অপরাধ, যৌনচিহ্নে সে মেয়ে।

সকালে, পাঁচিল বরাবর রাস্তাটা দিয়ে হাঁটার সময়ে শিশুটির কান্না কানে আসে এই লোকটির। পাঁচিলের ওপর চড়ে ঐ সরু পরিসরের মধ্যে নামার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় সে, অবশেষে কিছু লোকজনের সাহায্যে কান্নার উৎস নির্ণয় করে, তার কাছে দেওয়াল ভেঙে, নিজের হাতকে জখম করে বের করে আনে ক্ষতবিক্ষত সদ্যোজাতকে।

অত:পর মিডিয়া, উৎসুক লোকজনের উঁকিঝুঁকি, স্থানীয় নার্সিং হোমে শিশুটির উপযুক্ত চিকিৎসা এবং সেই অনাথ সদ্যোজাতকে দত্তক নিতে উৎসুক দম্পতিদের ভিড়, সবই আমরা প্রত্যক্ষ করি চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে, নিজেদের বসার ঘরে, ঘটনাস্থল থেকে সামান্যই দূরে। দেখি, রোমাঞ্চিত হই, কিছুক্ষণ পরে চলে যাই চ্যানেল থেকে চ্যানেলান্তরে। কেবল ভুলতে পারি না, লোকটার কান্না, কোন্‌ সে বাবা, কোন্‌ সে মা, কী এমন চাপের মুখে পড়ে একেবারে জানে মেরে না ফেলেও, নিজের গর্ভজাত, নিজের ঔরসজাত সন্তানকে এমনভাবে ছুঁড়ে ফেলতে পারে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে, কেবল সেই কথাই বার বার করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে বলতে লোকটা কাঁদছিল, তার দিকে তাক করে থাকা ক্যামেরার দিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে। সত্যিকারের কান্না।

সকলে জানে। স্থানীয় লোক থেকে সংসদে বক্তৃতা দিতে থাকা মন্ত্রীমহোদয়, সকলেই জানেন ভারতের প্রতিটি প্রদেশে কীভাবে বিপজ্জনক হারে কমে চলেছে মেয়েদের অনুপাত, কীভাবে আনওয়ান্টেড মেয়েশিশুদের মুছে ফেলতে বদ্ধপরিকর হয়ে উঠছে ভারতের কিছু অংশে গ্রামের পর গ্রাম, সাহায্যে এগিয়ে আসছে দলে দলে গ্রাম থেকে মফস্বল, মফস্বল থেকে রাজধানীর অজস্র আলট্রাসোনোগ্রাফি ল্যাবের দল, সফলভাবে মেয়েশূন্য হয়ে ওঠার কথা ঘোষণা করে চলছে পঞ্জাব হরিয়ানা রাজস্থানের গ্রামের পর গ্রাম। গর্বভরে গ্রামের মুখিয়া টিভি চ্যানেলকে বাইট দেন, হমারি য়ঁহাপে বরাতি আতি নহী, বরাতিয়াঁ য়ঁহাসে নিকলতি হৈ। বরযাত্রী এখানে বাইরে থেকে আসে না, এখান থেকে কেবলই বরযাত্রী বেরোয়।

সরকার চেষ্টা করে নি, করে না বলা উচিৎ নয়। রেডিও টিভি হোর্ডিং ব্যানার যতরকমভাবে জনহিতকর প্রচার চালানো সম্ভব, সমস্তই সরকার করে এসেছে, করে চলেছে এতদিন, আজও। কাজ হয় নি কিছুই। উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম, ভারত রাষ্ট্রের কোণায় কোণায় যেমন দহেজ নেবার বা দেবার চল আজও বিলুপ্ত হয়ে যায় নি কঠোর আইন প্রণয়ন সত্বেও, ঠিক তেমনই এই কন্যাশিশু বা কন্যাভ্রূণ হত্যার সুপ্রাচীন রীতি আজও নির্মূল করা যায় নি আইন প্রণয়ন করেও।

অসহায় সরকার তাই, এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে আচমকা ঘোষণা করে ফেললেন এক প্রকল্পের কথা। নাম, পালনা। ক্রমহ্রসমান সেক্স রেশিওর মূল্যায়নে আতঙ্কিত মহিলা ও শিশুকল্যাণ দপ্তর জানালেন, তাঁরা প্রতি রাজ্যের জেলায় জেলায় একটি করে পালনা তথা ক্র্যাড্‌ল স্থাপন করবেন। যে সমস্ত বাপ-মা কন্যাসন্তানের জন্ম দিতে ইচ্ছুক নন, বা জন্মের পরে তার কোনও দায়িত্ব নিতেও ইচ্ছুক নন, তাঁরা যেন সেই শিশুকে বা ভ্রূণকে মেরে না ফেলেন, কুয়োয় বা ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে না দেন, তাঁরা যেন তাঁদের জেলার সদর দফতরে এসে সেই পালনায় সেই শিশুকন্যাকে অ্যাবান্‌ডন করে যান। সরকার সেই শিশুকে রক্ষা করবে, পালন করবে। পিতামাতাকে আর তার দায়িত্ব নিতে হবে না। তবে হ্যাঁ, ভবিষ্যতে যদি কখনও পিতামাতা তাঁদের মন পরিবর্তন করেন, তাঁরা এসে মেয়েকে ফিরিয়ে নিয়েও যেতে পারেন। সরকার সানন্দে ঘরের মেয়েকে ঘরে ফেরৎ পাঠাবে।

অসামান্য প্রকল্প, সন্দেহ নেই তিলমাত্র। অহিংসা, ক্ষমা, বুদ্ধ, গান্ধি ইত্যাদির দেশ ভারত। সেখানে এমন অন্যায় অসদাচার বন্ধ করার জন্য এর চেয়ে ভালো অহিংস পদ্ধতি আর কী হতে পারে? এর পর আর কন্যাসন্তানে অনিচ্ছুক দম্পতিকে শিশু বা ভ্রূণহত্যার দায়ভার কাঁধে নিয়ে আইনের চোখে দোষী হতে হবে না। সরকার আছে তো ... আর আছে, পাল্‌না। এক ধাক্কায় আলট্রাসোনোগ্রাফির ল্যাবগুলোতে অবৈধ ভাবে ভ্রূণের লিঙ্গনির্ধারণের প্রবণতা কমে যাবে, আর দরকারই পড়বে না, ছেলে হোক বা মেয়ে, কী ফরক প্যাহেন্দা ইয়ারোঁ? ছেলে হলে বাপ মায়ের নাম রওশন করবে, আদরের লাডলা হয়ে দুদুভাতু খাবে, মেয়ে হলে পরে ঐ একবার জেলাশহরে যাতায়াতের বাসভাড়ার খরচটা শুধু যা লাগবে। সরকার যদি এর সাথে মেয়েবাচ্চাদের ক্ষেত্রে ডেলিভারির চার্জটাও দিয়ে দিত, তো আর কোনও কথাই ছিল না। তা সে যাক, সে-ও হয়ে যাবে হয় তো কখনও। স্বামীদের আর কিছু করতে হবে না, সন্তানেচ্ছা হলেই বউকে নিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেই হবে। এন্ডলেস এফর্ট, যদি প্রথমবার মিলনে মেয়ে হয়, তো পালনা, যদি দ্বিতীয়বারেও মেয়ে হয়, তো পালনা, যদি তৃতীয়বারেও মেয়ে হয় ... থামলে চলবে না, যতক্ষণ না ছেলে জন্মাচ্ছে।

ভারতের রাজ্যে রাজ্যে অরফ্যানেজগুলো ভরে যাবে অসংখ্য অনাথ মেয়েশিশুতে, প্রত্যেকের দায়িত্ব সরকারের, ইতিমধ্যেই সরকারি হোমগুলিতে পুরুষ আবাসিক, কর্তৃপক্ষ, পুলিশ, রাঁধুনি, চাকর ইত্যাদি প্রভৃতিরা যে ভাবে শিশুকন্যা ও কিশোরী যুবতীদের মায়ামমতা ও রূপকথা দিয়ে ঘিরে রাখেন, ঠিক সেইভাবেই আরও বেশি বেশি সেই রকম পুরুষদের দরকার পড়বে হোমে হোমে, এত মেয়েকে সামলানো তো চাট্টিখানি কথা নয়, অনেকেই উৎসাহী হয়ে স্বত:প্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসবেন এইসব 'অসহায়া' কন্যাদের সাহায্যার্থে।

আজ ভারতে প্রতি হাজার জন ছেলের পাশে রয়েছে ৯৩৩ জন মেয়ে। হরিয়ানায় সংখ্যাটা প্রতি হাজার ছেলের পাশে ৮৬১ জন মেয়ে, পঞ্জাবে একটু ভালো অবস্থা, সেখানে সংখ্যাটা ৮৭৬, রাজধানী দিল্লিতে ৮২১।

কিন্তু চিন্তা করার কিছু নেই, এইভাবে পাল্‌নায় চড়ে সরকারী ও বেসরকারী নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে নারীকূল বেড়ে উঠবে, বেঁচে উঠবে, হয় তো সেদিনও কনট প্লেসের রাস্তায় প্রকাশ্য দিবালোকে কিছু ছেলে ছিনিয়ে নেবে তাদের সম্মান, হয় তো তারও আগে জুভেনাইল হোমের গরাদের অন্ধকারে আরও অনেক, অনেক কিছু ঘটে যাবে, হয় তো সেদিনও সংসদ ভবনে অজস্র বিতর্ক আর ঘোটালার নিচে চাপা পড়ে যাবে বহুপ্রতীক্ষিত মহিলা সংরক্ষণ বিল, কিন্তু তাতে কী? সেই সব মেয়েরা বেঁচে তো থাকবে, এক উন্নত, সুন্দর, ভবিষ্যতের ভারতের জন্য। তাদের অনেকে আবার ফিরে যাবে মন পরিবর্তন হওয়া বাবা মায়ের কাছে, আবার অপরিসীম আবেগে 'বাবা-মা' বলে জড়িয়ে ধরবে তাদেরই, সিনেমায় যেমন দেখা যায়, প্রয়োজনে সেই সব বাবা মায়ের উপার্জনের উপায়ও হয়ে যাবে তারা। মন্ত্রী রেণুকা চৌধরী বলেছেন, অন্তত তাদের মেরে তো ফেলা হবে না জন্মের পরে বা আগে। সেক্স রেশিওতে সমতা আনাটাই মুখ্য উদ্দেশ্য।

সত্যি সুন্দর প্রচেষ্টা। মহৎ প্রচেষ্টা। কেবল কিছু পাগল চেঁচিয়ে যাবেই সমস্ত সরকারি প্রকল্পের বিরুদ্ধে, কিছু সরকারসৃষ্ট পাগলামির বিপক্ষে। ভেবেই যাবে, বিচার করেই যাবে, এর থেকে মৃত্যুও ভালো কিনা!

রাস্তা দেখা যাচ্ছে না। চারদিকে ধূ ধূ শূন্যতা। রুক্ষ হাওয়ায় নি:শব্দে দুলছে একটি শিশুদোলনা। পালনা। তাতে শোয়ানো একটি মৃতদেহ। একটি সদ্যোজাত শিশুকন্যা। সদ্যমৃতও বটে।

জুন ১৭, ২০০৭