বৃহত্তর স্বার্থ


লিখছেন -- সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়


আপনার মতামত         


অবশেষে হুগো শাভেজও পথে এলেন। বোঝা গেল, ক্ষমতার নাম আসলে বাবাজি। এবং বিকল্প টিকল্প নয়, তার পথ আসলে একটিই। মাসখানেক আগে ব্যান করা হল ভেনিজুয়েলার জনপ্রিয়তম টিভি চ্যানেল গুলির মধ্যে একটিকে, যার নাম রেডিও ক্যারাকাস টেলিভিশন বা সংক্ষেপে আরসিটিভি। টেকনিক্যালি অবশ্য ঠিক ব্যান না, ভেনিজুয়েলা সরকার আরসিটিভির সম্প্রচারের লাইসেন্স রিনিউ করেনি মাত্র। নি:সন্দেহে ব্যানের চেয়ে জিনিসটা শুনতে ভালো, কিন্তু সুনামি শব্দটা শ্রুতিমধুর বলে তো আন্দামানের লোকজনের তাতে কিছু উপকার হয়নি। তাই হরেদরে ব্যাপারটা একই হল, কারণ আইনত: লাইসেন্স বিনা ভেনিজুয়েলার আকাশে কোনো ফ্রি চ্যানেল সম্প্রচার করা অসম্ভব।

যার ঘাড়ে খাঁড়া নামল, সেই আরসিটিভির বিরুদ্ধে অভিযোগ হল :
এক। শাভেজ সরকারের বিরুদ্ধে টানা অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে আরসিটিভি।
দুই।নির্বাচিত শাভেজকে যেবার ক্ষমতাচ্যুত করে কদিনের জন্য জেলে পুরেছিলেন জনাকতক সামরিক কর্তা, আরসিটিভি সেবার গণতন্ত্র টনতন্ত্রকে জলাঞ্জলি দিয়ে নেমে পড়েছিল ক্যু এর সমর্থনে।
তিন।শোনা যায় সেই সময় রাস্তার দাঙ্গার দায় শাভেজের সমর্থকদের ঘাড়ে চাপানোর জন্য আরসিটিভি টিভি ফুটেজ জালও করেছিল।
চার।ভেনিজুয়েলা সরকারের কর্তাব্যক্তিরা আরও ক ধাপ এগিয়ে দাবী করেন, যে, ক্যু এর পিছনের গোপন পরিকল্পনার অংশীদার এই বিশেষ চ্যানেলটি।

যেকোনো ব্যানের পক্ষেই শাসকগোষ্ঠী, চিরকালই এই জাতীয় অভিযোগ এনে থাকেন। এবং, বলাবাহুল্য এই বাঁধা গতের অভিযোগের উত্তরে রিহার্সাল দিয়ে তৈরি রাখা কিছু উত্তরও আমাদের হাতে আছে। যথা: ক্যু এর পরিকল্পনা কারা করেছিল যদি এতদিন ধরে জানাই থাকে, তো ব্যাটাদের গ্রেপ্তার করে জেলের ঘানি টানাননি কেন এতোদিন? আর অপপ্রচার? বেশ করেছে করেছে। কারও যদি গণতন্ত্রের বদলে সামরিক একনায়কতন্ত্র পছন্দ হয়, এবং সে বুক বাজিয়ে সেই পছন্দের কথা বলতে পারে, সে একশবার বলবে। নাদান জনগণ, অশিক্ষিত জনগণ, দরিদ্র জনগণ, চন্ডাল মেথর মুচি দরিদ্র জনগণ, সেই অপপ্রচারের বিষ গিলে নিজের পায়ে নিজে কুড়ুল মারতে পারে, অতএব জনতার "বৃহত্তর স্বার্থে' আমি সরকারি হেডমাস্টার, ইশকুল পালিয়ে সিনেমা দেখা রুখে দেবার জন্য কাছেপিঠের যাবতীয় সিনেমাহলের উপর বুলডোজার চালিয়ে দিলাম, এই জাতীয় মহৎ কর্মে আজকাল আর হাততালি পাওয়া যায়না। গেছে সেদিন, চিরতরে গেছে, যখন পুঁজিবাদী অনুপ্রবেশ রোখার জন্য চিনের প্রাচীরের স্টাইলে বানানো হত লৌহ যবনিকা, আর তার আড়ালে খাদহীন মহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ তরুণ-তরুণীরা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চুপিচুপি বানাতেন এক বিচিত্র বস্তু, যার নাম জনতার স্বর্গ।

অতএব, এই কলিযুগের দুনিয়াজোড়া নাস্তিকরা তো ননই, এমনকি নাদান ভেনিজুয়েলাবাসী, যাদের অপপ্রচারের বিষমদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য শাভেজের এই বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত, দিনের শেষে দেখা যাচ্ছে, সেই ভেনিজুয়েলাবাসীই গপ্পোটি খাননি। ডাটানালিসিস নামে একটি ভেনিজুয়েলীয় সংস্থা সমীক্ষা করে জানিয়েছে, যে, দেশের সত্তর শতাংশ মানুষ এই তথাকথিত "ব্যান' এর বিরুদ্ধে। যদিও পঁয়ষট্টি শতাংশ মানুষই শাভেজের সমর্থক। কিন্তু তাঁরা শাভেজের এই সিদ্ধান্ত হজম করতে পারেননি। "বৃহত্তর স্বার্থ' নামক শ্রুতিমধুর যে ঝুমঝুমিটি বাজিয়ে এতদিন নাবালক জনতাকে বাগে রাখা যেত, সেই হ্যামলিনের বাঁশিটি তার যাদুজাগতিক অতিন্দ্রীয় ক্ষমতা চিরতরে হারিয়েছে। ""টিভিতে "অসব্য' ছবি দেখলে বখে যাবে, অতএব তোমার বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবেই তোমাকে অসব্য ছবি দেখা দেখে বঞ্চিত করছি'', এই জাতীয় আরোপিত ব্রহ্মচর্যে বখে যাওয়া জনতার আর বিশেষ আগ্রহ নেই। বা, ""দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তোমার জমিটা একটু দাও তো ভায়া, শিল্প বানাবো, তাতে আখেরে তোমারই লাভ হবে'', এসব শুনলে অশিক্ষিত লোকে এখন কোদাল-কাটারি নিয়ে তাড়া করছে। "বৃহত্তর স্বার্থ' নামক কোনো যাদুকাঠি এই দুনিয়ায় আর নেই, যার টুপি দিয়ে জনতাকে বশে রাখা যাবে, এই কলিকালে আর কোনো গুরুবাক্য নেই, যা শুনে দলে দলে লোকে আগে প্রাণ দেবার দেবার জন্য কাড়াকাড়ি করবে। হুগো শাভেজ এই কথাটি মনে রাখলে ভালো করবেন।

তাঁর যাত্রাপথে আমাদের শুভেচ্ছা রইল।