মান-সম্মান


এল. সি. মিত্র


আপনার মতামত         


মান - শব্দটা শুনলেই প্রথমে মনে হয় "মান সম্মান'-এর কথা। অনেকের অবশ্য থমাস মান-এর কথা মনে হয়, তবে আমি সেই দলে নই। "কূটকচালি' করার পক্ষে একটা আদর্শ সাবজেক্ট। বড় অদ্ভুত জিনিস, পাবার সাথে সাথে ফাউ হিসেবে আসে হারাবার ভয়। ছাতা-র সাথে মিল লক্ষনীয়, ফুটো হলে তো কথাই নেই। প্রাণীকূলের মধ্যে মানুষের কাছেই এর কদর বেশী । অনেক মানুষের কাছে, "মান' > "প্রাণ',-- অন্য প্রাণীদের নিয়ে এতটা শোনা যায় না। লোকে সাধারনত: এ জিনিস খুইয়ে হতাশ হয়ে বসে থাকেন, মান-সম্মান খুইয়ে রিল্যাক্স করে আরামসে শুয়ে আছেন এরকম মানুষ থাকলেও তাদের কথা খুব একটা আলোচনা হয় না।

মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি হলে জনগন বিব্রত হন। তবে সংবাদ মাধ্যম গুরুত্ব দিলে অনেকে মাইন্ড করেন না। এই টানাটানি অনেক সময় কেব্‌ল টিভি-তে লাইভ দেখায়, সব নয়, কেস বাই কেস। টানাটানিতে সক্রিয় ভুমিকা নেওয়া কারও কারও পেশা, রুটি-রুজি। "মান'-হানির মামলা মোকদ্দমায় অনেক কোম্পানী অনেক টাকা খরচা করে থাকেন। অর্থাৎ শুধু প্রাণী নয়, ছোট-বড় কোম্পানী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পার্টি এরকম অনেক কিছুরই এ জিনিস থাকে। "গর্ব' শব্দটির সাথে খুব নিবিড় সম্পর্ক এর, "গড়ব'-র সাথেও ভাল যোগাযোগ - যেমন দেশ বা মানুষ বা পার্টি গড়া। ইদানীং এই তালিকায় "শিল্প গড়া' ঢুকেছে, রাজ্যের "মান সম্মান'-কে সঙ্গে নিয়ে।

নানাভাবে এ জিনিস পাওয়া যায়। জন্মসুত্রে সব মানুষই (বা পার্টি/প্রতিষ্ঠান/দেশ) একটু আধটু পেয়ে থাকেন। তালমিছরির বিজ্ঞাপণের মতন ইয়ার্কি নয়, এর আসল নকল নিয়ে অনেকেই সিরিয়াস সন্দেহ প্রকাশ করে থাকেন। গুণীজনে বলে থাকেন - প্রতিভা, নিষ্ঠা, পরিশ্রমের ফল হিসেবে যখন এ জিনিস পাওয়া যায় সেটাই আসল। তবে এটা সেই উনিশশো বৃটিশ সালের ল্যাকপ্যাকে লিগেসি ধারনা হতে পারে। কখনও আলটপকা এক থাবড়া সম্মান এসে গায়ে পড়তে পারে, এরকম হলে অনেকে প্রত্যাখ্যান করেন। তাতে করে নিউটন-এর তৃতীয় সূত্র ধরে মান-সম্মান বেড়ে যেতে পারে, তবে একটু রিস্কি। অনেকে যাচাই করে নেন, সম্মান যথেষ্ট সম-মান এর হল কিনা। উত্তরাধিকার সুত্রেও কিছুটা পাওয়া যায় (সঙ্গে খানিকটা প্যাঁকও ফ্রি-তে আসতে পারে)। যারা এভাবে পান, তাদের অনেকের রক্তের রং নীল হয়। আরও নানা ভাবে পাওয়া যায় - এই যেমন - কম বল খেলে বেশী রান করলে, লটারি জিতলে, অফিসে প্রোমোশন পেলে, ক্লাসে অংকে সর্ব্বচ্চ নম্বর পেলে, ভোটে জিতলে... । এছাড়াও, ভয় দেখিয়ে পাওয়া যায়, জালি করেও পাওয়া যায়, (ডিউ সম্মান) আদায় করা যায়, ভালোবেসে পাওয়া যায়।

"সম্মান' এর ওজন এবং ঘনত্বের রকমফের আছে। খুব ঠুনকো হতে পারে। ভারী হতে পারে। মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া সম্ভব, অনেকে দেনও। স্পর্শকাতর হতে পারে,সেক্ষেত্রে "মান' সহজেই ফুলে "অভিমান' হয়ে যায়।

"সম্মান'-এর ব্যবহার বহুমুখী। প্রতিবাদের অস্ত্র হতে পারে, যেমন রবীন্দ্রনাথ-এর নাইটহুড বর্জন। অর্জন-এর থেকে বর্জন বেশী আলোচ্য হতে পারে, এই যেমন ইদানীং কলকাতা-য় নাট্য আকাদেমি-র সদস্যপদ। মৃত্যুর পরেও চান্স থাকে ("মরণোত্তর") পাবার, থাকে চুরি যাবার সুযোগ। ভারী ডাইনামিক একটা ব্যাপার, যেমন কারও দয়া বা করুণা-ও সম্মান হতে পারে, রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন - অন্যের অনুগ্রহে আমাদের সম্মান। এক আশ্‌চর্য বস্তু - পাওয়া যায়, দেওয়া যায়, ভাগ করে নেওয়া যায়, মরে যাবার পরেও থেকে যায়, আবার কেড়েও নেওয়া যায়।

আমাদের সবথেকে বেশী পৃষ্ঠপোষকতাহীন সম্মান দিয়েছে এই পৃথিবী, অন্য প্রাণীদের তুলনায় আরামে বাঁচতে দিয়েছে, প্রাণ ভরে নি:শ্বাস নিতে দিয়েছে। কিন্তু আমরা আজও সেই সম্মান ভাগ করে নিতে শিখলাম না। মাঝে মধ্যে সন্দেহ হয় আমরা এই সম্মানের যোগ্য তো!