জনতার দরবার


লিখছেন -- সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়


আপনার মতামত         


জনতা এক।
------------
পশ্‌চাদ্দেশ দেখানোর ঐতিহ্য আমাদের বহুদিনের। সেই পুরাকালের কথা, যখন একাই মঞ্চ কাঁপাতেন সুমন চাটুজ্যে আর তাঁর বাক্যগুলি যাদুকরের ছুরির মতো মঞ্চ থেকে উড়ে এসে আমাদের বুকে বিঁধে ঝাঁকে ঝাঁকে লক্কা পায়রা উড়িয়ে দিত, সেযুগে একদা সুমনবাবু অকস্মাৎ মঞ্চে পিছনঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন, ও বলেছিলেন, ওমুক সংবাদপত্রের শ্রী অমুক চন্দ্র অমুক, এই দেখুন আমার পশ্‌চাদ্দেশ। বলাবাহুল্য, সাংবাদিকটি সেদিন প্রেক্ষাগৃহের প্রথম সারি আলো করে বসে ছিলেন। সুমনের যুক্তি ছিল অতীব সিম্পল। আপনাদের আছে সংবাদপত্র, আমার আছে মঞ্চ। কাগজে আপনি যা খুশি লেখেন, কোনো জবাবদিহি করেননা, মঞ্চেও আমি যা খুশি করব। কোনো জবাবদিহিতে বাধ্য নই। আহা, যেন, তোমার আছে বন্দুক, আর আমাদের আছে ক্ষুধা। মনে আছে, এই আঁভাগার্দ বিপ্লবীয়ানায় মুগ্‌ধ ও হতচকিত আমরা, কাগজে কাগজে প্রতিবাদের ঝড়কে হেলায় উড়িয়ে দিয়ে সে যুগে কত বিমোহিত করতালিতে ভরিয়ে দিয়েছি প্রেক্ষাগৃহ, আর যাদুকরের ঝোলা থেকে বেরোনো পায়রারা উড়ে গেছে এদিক-সেদিক দুনিয়াদারির পথে।

তখন কে জানত, ইতিহাস ঘুরে ঘুরে আসবে। কে জানত, দশক ঘুরতে না ঘুরতেই আর এক টিভি শিল্পী শ্রদ্ধেয় শ্রী বিনয় কোঙার পশ্‌চাদ্দেশ দেখানোর এই কলাকৌশলটিকে একটি উচ্চতর মাত্রায় নিয়ে যাবেন। দুজন সামাজিক অ্যাকটিভিস্টকে পশ্‌চাদ্দেশ দেখানোর সুপ্রস্তাব দেবেন। কল্পনা করতে ভালো লাগে, এই বাক্য উচ্চারণের পর, উঠে দাঁড়ালেন বিনয় কোঙার,উঠে দাঁড়ালেন বুক চিতিয়ে, এবং ঘুরে দাঁড়ানোর পর টিভি ক্যামেরা প্রত্যক্ষ করল তাঁর পশ্‌চাদ্দেশ। সেই নিয়ে পুনরায় কাগজে কাগজে প্রতিবাদের ঝড়, সমর্থকদের সাহসী করতালি,ব্যক্তিগত প্রতিবাদের একটি ফর্ম হিসাবে পশ্‌চাদ্দেশ দেখানোকে ভাবা যায় কিনা এই নিয়ে গম্ভীর বিতর্ক ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু হায়, এরকম হয়নি। ব্যক্তি নয় সমষ্টি, একক নয় যৌথখামার, ইত্যাদি নীতিকথা মেনে, পরিবর্তে, আগেই বলা হয়েছে, পশ্‌চাৎ প্রদর্শনের কলাটিকে উচ্চতর মাত্রায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ব্যক্তি নয় এখন সাংগঠনিক পশ্‌চাৎ প্রদর্শনের যুগ। সত্য মিথ্যা জানা নেই, এক বাঙালী লেখিকার বিবরণে জানা গেল, বিনয়বাবু স্বয়ং নন, তাঁর সংগঠনের কর্মীরা ঐ দুই কর্মীকে পশ্‌চাদ্দেশ দেখিয়েছেন। বস্ত্র রেখে না উন্মোচন করে দেখিয়েছেন, তা আমাদের জানা নেই, এবং এ নিয়ে শালীনতার সীমাকে লঙ্ঘন করা হয়েছে কিনা তা নিয়েও আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। কারণ শালীনতার সংজ্ঞা যুগে যুগে বদলায়, আর অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে হামলা করার চেয়ে শান্তিপূর্ণভাবে পশ্‌চাদ্দেশ দেখানো যে ভালো কাজ, এ নিয়েও কোনো সন্দেহ নেই।

শালীনতা নয়, আমরা শুধু পশ্‌চাৎ প্রদর্শনের এই উচ্চতর ও উন্নততর ধাপটিকে খুঁটিয়ে দেখব। অর্থনীতির ভাষায় একে বলে সমবন্টন। মার্কসীয় পরিভাষায় বলা হয় উৎপাদনের উপকরণের সামাজিক মালিকানা, আর সাদা বাংলায় একে বলা যেতে পারে ব্যক্তিগত পশ্‌চাৎ প্রদর্শনের উন্নততর বিকল্প একমাত্র যৌথ পশ্‌চাৎ প্রদর্শন। এই পদ্ধতির বিউটি হল, ইহা ব্যক্তিনির্ভর নহে। ফলে সাকসেস অনিবার্য। এই পদ্ধতিতে, প্রথমে একজন নেতার মাথায় আইডিয়াটি আসিবে, কিন্তু তিনি তাহা এক্সিকিউট করিবেননা। পরিবর্তে সংগঠনের রাজ্যস্তরের কমিটিতে নিয়ে যাবেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ যদি আশু কর্তব্য হিসাবে দুই মহিলাকে পশ্‌চাদ্দেশ দেখানোর ব্যাপারে একমত হন, তবে নির্দেশ যাবে জেলা স্তরে। গম্ভীর আলোচনার পর জেলাস্তরের নেতৃবৃন্দ এতে কোনো আপত্তি না করলে, স্থানীয় স্তরে কম্যান্ডমেন্টটি পাস করে দেওয়া হবে। স্থানীয় নেতারা ঈশ্বরের এই নির্দেশটি মেনে অনুগত কর্মীদের নির্দিষ্ট স্থানে ও নির্দিষ্ট সময়ে জড়ো করবেন। তাঁরা মিছিল করে আসবেন, লাইন করে দাঁড়াবেন এবং নেতা পিঁইইইই করে বাঁশি বাজানো মাত্র সকলে পিছন ফিরে একযোগে পশ্‌চাদ্দেশ দেখাবেন।

এইভাবে গণ আন্দোলন, গণ সংগ্রাম ও গণরিয়ার মতো পশ্‌চাদ্দেশ প্রদর্শনও একটি গণচরিত্র পাবে। অশালীনতার অভিযোগ ফেল মেরে যাবে, কারণ, মামু, ধরবে কাকে, এযে জনতার কার্যক্রম। জনতার মুখ আমরা দেখেছি, জনতার লড়াই দেখেছি, আসুন এবার দেখি জনতার পাছা।

জনতা দুই।
-----------
এই বাজারে জনতা বিষয়ক আরেকটি ছোটো চুটকি। সত্যমিথ্যা জানা নেই।

এও সেই পুরাকালের ঘটনা। ভারতের এক কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ স্তরের একটি মিটিং এ সেদিন ঝড়। কি? না রুমানিয়ার পতন হয়েছে। এর মাস কয়েক আগেই সর্বোচ্চ স্তরের একজন নেতা সেথায় যান, এবং রুমানিয়ান পার্টির পার্টি কংগ্রেস ভিসিট করে এসে সর্বোচ্চ স্তরের পার্টি পত্রিকায় একটি জ্বালাময়ী প্রবন্ধ লেখেন। সেই প্রবন্ধে তিনি দাবী করেছিলেন, রুমানিয়ান পার্টি নেতৃত্বের সর্বসম্মত পুনর্নিবাচন প্রমাণ করে, যে চাওসেস্কুর নেতৃত্বের উপর রুমানীয় জনতার অখন্ড আস্থা আছে। বলাবাহুল্য, এর দিন কতক পরেই সমাজতান্ত্রিক রুমানিয়া পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে যায়।

তো, সেই প্রবন্ধ নিয়েই মিটিং এ খুব হই হট্টগোল হচ্ছিল। জনৈক কমরেড তো এই লেখা ছাপানোর কৈফিয়তই চেয়ে বসলেন। আর যায় কোথায়, সর্বোচ্চ স্তরের সেই নেতাও প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, আপনি কি বলছেন, আমি পার্টিকে মিথ্যা বলেছিলাম? মিথ্যা কথা লিখেছিলাম? অত:পর মিটিং হইল মেছো হাটা। প্রবীণতর এক সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতা তখন সকলকে শান্ত করে বললেন, "আপনারা দয়া করে চুপ করুন। হে অমুক চন্দ্র অমুক, আপনিও পার্টিকে মিথ্যা বলেননি। রুমানিয়ান নেতৃত্বও আপনাকে মিথ্যা বলেননি'।

ক্লাইম্যাক্সের অপেক্ষায় সবাই তখন চুপ। প্রবীণতর নেতা একটু কেশে বললেন "আসলে রুমানিয়ার জনগণই পার্টিকে মিথ্যা কথা বলেছিল'।