টিলোস রেডিও, বরং কন্ঠ ছাড়ো জোরে


লিখছেন -- সুমেরু মুখোপাধ্যায়


আপনার মতামত         


যুদ্ধ আর বাণিজ্যের বেলোয়রি রৌদ্রের দিনে আমার টিলোসে প্রবেশ, যখন হাঙ্গেরীয় অর্থে টিলোস, নিষেধ। বুদাপেস্ট শহরে এখনো বসন্ত এই এলাম এই এলাম করছে, এবেলা রোদ তো ওবেলা বৃষ্টি, তার মধ্যে টুকি দেওয়া ফুল এবং টিলোস রেডিও। নিচে একটা ছোট্ট বার, পাশে কুড়ি আসনের সিনেমা হল, বাইরে যে সব পোষ্টার লটকে আছে তাতে ফিল্ম সোসাইটি গোছের হাওয়া। তারপর দুকদম এগোতেই অন্ধকার।টিলোস টিলোস অন্ধকার, কিম্বা যে আকাশে কাস্তের মত বাঁকা চাঁদ ওঠে - ডুবে যায়, কানে এল, হ্যাঁ বন্ধুগন, অরুন্ধতি রায়ের কন্ঠ! ইংরাজি ভাষায়। ... সিমিলার্লি ইন ইন্ডিয়া নট হান্ড্রেড্‌স বাট মিলিয়ন্স ও আস উড বি অ্যাশেমড অ্যান্ড অফেন্ডেড ইফ উই ওয়ার ইন এনিওয়ে ইম্পলিকেটেড উইথ দ্য প্রেসেন্ট ইন্ডিয়ন গভমেন্টস ফ্যসিস্ট পলিসিজ হুইচ অ্যাপার্ট ফ্রম দ্য পার্পেট্রেশন ওফ স্টেট টেররিজিম ইন দ্য ভ্যালি অফ কাশ্মীর ইন দ্য নেম অফ ফাইটিং টেররিজ্‌ম হ্যাভ অলসো টার্ণড ব্লাইন্ড আই টু দ্য রিসেন্ট স্টেট সুপার্ভাইজড প্রোগরাম অ্যাগেনস্ট মুসলিম ইন গুজরাট। ইট উড বি ওবসার্ভড টু থিংক দ্যাট দোজ হু কৃটিসাইজ দ্য ইন্ডিয়ান গভমেন্ট আর অ্যান্টি ইন্ডিয়ান, অলদো দ্য গভমেন্ট ইটসেলফ ইটসেল্ফ নেভার হেসিটেট টু টেক দ্যাট লাইন...আমি ঠোক্কর খেতে খেতে উপরে যেতে থাকি, সন্দেহ নেই, টিলোস রেডিওতেই পৌঁছেছি।

ঘরে আলো খুব কম, দেওয়ালের রঙ সাদা নয়, কেননা সার দেওয়া গ্রামাফোন রেকর্ডেরাও ঢেকে গেছে পোস্টারে পোস্টারে এবং আলো সত্যিই খুব কম। শেষ হয় অরুন্ধতি কন্ঠ বিস্তর কূটকচালির পর, যার সবটা আমার পক্ষে এখানে দেওয়া সম্ভব নয়, তবু শেষটুকু দি, কেননা আমাদের কাছে ভাষা ছাড়া কিছুই নেই প্রমাণযোগ্য। শেষে স্লোগান সমবেত হয় ও সকলে উঠে দাড়ায়... ইন এবিলিটি টু সি অ্যা ওয়র্ল্ড ইন টার্মস আদার দ্যেন দোজ দ্য এস্টাবলিশমেন্ট হ্যাজ সেট আউট ফর ইউ, ইফ ইউ আর নট বিশি, ইউ আর তালিবান। ইফ ইউ ডু নট লাভ আস, ইউ হেট আস। ইফ ইউ আর নট গুড, ইউ আর ইভিল। ইফ ইউ আর নট উইথ আস, ইউ আর টেররিষ্ট।... সেদিন শনিবার সকাল, তখন ও কানে আসেনি নন্দীগ্রাম, এক ঘন্টা ভারতীয় সঙ্গীতের অনুষ্ঠান এবং সেখানে গেলে দেখা পাব এক ভারতীয় বন্ধুর, এর বেশি কিছু ভাবিনি! সকলে চেঁচাচ্ছে আর সেটা সম্প্রচারিত হচ্ছে সারা বুদাপেস্টে। পরে, আলাপ হওয়ার পরে, জেনেছি এদের নব্বই শতাংশ ইংরাজি জানেনা তবু তারা চেঁচায়, তবু চেঁচায়, তবু তারা টের পায় কামানের স্থবির গর্জনে বিনষ্ট হতেছে সাংহাই।


বেলা অতিক্রান্ত, প্রচুর বিয়ারের পর ক্ষিদে অন্তরহিত,স্বর্গে পৌছাবার লোভ সিদ্ধার্থও গিয়েছিল ভুলে, ভারতীয় সংগীতের অনুষ্ঠান বহু বহু আগে শেষ, কখন ও শুনছি অদ্ভূত সব গান কখনো কথকতা, প্রতিটাই অবশ্য স্লোগান হয়ে যায়, আমাদিগকের ভাষা কি সলোমানের বিচার? ৯০.৩ হাংগেরীর সর্বাধিক প্রচারিত রেডিও নয় হওয়ার কথাও নয়, কিন্তু মজাটা এইখানে যাদের বয়স কুড়ি থেকে তিরিশ তাদের আশি শতাংশ এই রেডিওর ভক্ত। যেখানে কোন বিঞ্জাপণ নেই, ভণিতা নেই, কেবল কন্ঠ ছাড় জোরে। সুর ভাসে বাতাসে পরক্ষণেই তা চাপিয়ে যায় কন্ঠের প্রবলে দেখা যায় ভাষা ভিদেশী হলেও একে একে যুক্ত হতে থাকে বন্ধুরা, সানাইয়ে সংগীত যন্ত্রে ট্রিস্টানের নবম সিম্ফনি/ কতদূর যাবে, এ যে ঢের বড় সমুচ্চ বিহার/ সেনেটের শত প্রান্তে মেথি খোঁজে ইঁদুরের শ্রেনী, হ্যাঁ বন্ধুরা আমি গলা মেলাতে থাকি, আই অ্যাম পাল্‌স বলে চিনা সংগীতে বা দক্ষিন আফ্রিকার, রেবেল মিউজিকে, আমি যেন অনেকদিন পরে চেঁচাচ্ছি, আর আছড়ে পড়ছি অন্য ইতিহাসে, হ্যাঁ বন্ধুরা এখানে বসেই বাঁশি নামিয়ে এদের সাথে গলা মিলিয়েছিলেন হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, ও হরি তিনি কেন? বন্ধুরা আমার মুখের দিকে তাকায়, কেন? কেন? কেন? না, আমার বেশ লাগে, আমিও তো নত মুখে হেঁটে যাই রোজ, ভাঁজ করে রাখি খবরের কাগাজ রোজ, সহসা পাল্টে যাই চ্যানেলে চ্যানেলে, এই তো ভাল, চেঁচিয়ে নিলাম একটু!

গত দশ বছরে মাত্র একবারই পুলিশ বন্ধ করেছিল ছয় মাসের জন্য, টিলোস রেডিও। তাও নিতান্তই ধর্মীয় কারণে, কেউ গালমন্দ করেছিল জিউসদের। প্রায় দুহাজার লোক এখানে পালা করে অনুষ্ঠান করেন, বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষার অত্যাচারিত মানুষ, রজার ওয়াটর্স থেকে হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, হ্যাঁ বন্ধুরা, এদের অর্থানুকূল্যেই চলে টিলোস রেডিও, কন্ঠ ছাড়ে জোরে, ইথারে ইথারে,আর আমাদের? আর আমাদের? আর আমাদের? দু:সাহসি কেউ নেই যে এসে পেচ্ছাপ করবে মুখে/ জানে কামড়ে দেবো, জানে অংগহানি হলে বুদ্ধদেব/কে পুনর্গঠিত করবে পাগলা রামকিংকর বেজ চাড়া?/ জীবনেই একবার শিল্প-অনুরাগিনীর কাছে/ ন্যাংটার উদ্ধৃত অংশ হাতড়ে বলেছিলুম, কী ভাবেন/ শিল্পই যথেষ্ট? কেন কার্তুজ লটকানো হলো দেহে?... না বন্ধুরা একথা আমি আমি বলিনিকো, সেই যে শক্তি চাটুজ্জে সে বলেছিল, আমার কোন দোষ নেই, স্যার, আমাকে মারবেন না।