সুস্থ প্রতিযোগিতা


লিখছেন -- সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়


আপনার মতামত         


প্রতিযোগিতা এক
----------------
আমেরিকা মহাদেশে এখন প্রতিযোগিতার হাওয়া। এমনিতেই আমেরিকায় বচ্ছর বচ্ছর একটি মেগামোচ্ছব কাম মহাপ্রতিযোগিতা হয়, যার নাম অস্কার। দুনিয়া জোড়া ফিল্ম দিগগজদের নাক সিঁটকানোর পরেও আহা, তাহার গ্ল্যামার বেড়েই চলেছে। এবং নিয়ম করে প্রতি বছর শোনা যাচ্ছে, একটি ভারতীয় সিনেমা এবার "বিশ্বজয়ী' হবেই। কার বিশ্ব, কে জয় করে, এসব কূট প্রশ্ন তুলে জিনিসটাকে ঘুলিয়ে দেবার দরকার নেই, মোদ্দা জিনিসটা যা হচ্ছে, বচ্ছরভর ঢাক বাজছে, ঢোল বাজছে, সাতমন তেল পুড়ছে, কিন্তু রাধিকা নাচিতেছেনা, দিনশেষে মার্কশিটে গোল্লা নিয়ে হাসি-হাসি মুখে (হাসি-হাসি, কারণ অংশগ্রহণটাই আসল, জয় নয়) বাড়ি ফিরছে যুগন্ধর হিন্দি সিনেমা। এবছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি, প্রতিযোগিতার শেষে "ভালো খেলিয়াও পরাজিত' তকমা নিয়ে ফিরছে কি যেন একটা ভারতীয় সিনেমা।

ওদিকে খাল পার হলেই ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে মহাসমারোহে আয়োজিত হতে চলেছে ঝিঁঝির কততম যেন বিশ্বকাপ। ব্যাটবল বাগিয়ে,সামনে ক্যামেরাম্যান পিছনে মন্দিরা বেদি আর চারদিকে এ-কে ফর্টিসেভেনধারী গুচ্ছের কম্যান্ডো টম্যান্ডো নিয়ে হাজির হয়ে গেছে ভারতীয় ক্রিকেট দল, সঙ্গে এন্তার শুভকামনা ও ধূম ক্রিকেট জ্বর। টিম কদ্দিন টিকবে কে জানে, তাই শুরুর মাসখানেক আগে থেকেই দেশপ্রেমের বন্যা, টিভিতে পার্ট বাই পার্ট দেখানো হচ্ছে বিজ্ঞাপন, যেন মিনি সোপ অপেরা। শোনা যাচ্ছে,এই সুযোগে তিরাশির ক্যাপ্টেন "জবাব নেহি' কপিলদেব আবার বিজ্ঞাপনের জগতে রি এন্টি পেতে চলেছেন,জামাইকার সমুদ্রতটে শীঘ্রই বসতে চলেছে পাওভাজির দোকান, আর বঙ্গীয় দাদা নাকি বিশ্বকাপ শেষে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জেই থেকে যাবার ইচ্ছা পোষণ করেছেন।

প্রতিযোগিতা নাম্বার তিন হল পুঁজি টানার প্রতিযোগিতা। বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সুবিখ্যাত মিষ্টি আম নিয়ে আমেরিকা চলেছেন কি যেন একটা কনফারেন্সে, সঙ্গে ছায়াসঙ্গী শিল্পমন্ত্রী। এ নিয়ে বেশি ফচকেমি করা উচিত নয়, কারণ কেসটা সিরিয়াস। দেশ, জাতি, শিল্পায়ন ও উন্নয়নের মতো ঘ্যামা ঘ্যামা প্রশ্ন এর সঙ্গে জড়িত। তবুও ছোট্টো একটা ফুট কাটবার লোভ সামলানো যাচ্ছেনা। আমেরিকা যাচ্ছেন যান, প্রতিযোগিতায় নামছেন নামুন, কিন্তু জিতে গেলে কি হবে ভেবেছেন? যদি ট্রফি পেয়েই যান, অর্থাৎ প্রচুর পুঁজিপতি যদি শিল্প বানাতে হবে বলে বঙ্গে ধাবিত হন, তবে তাদের জায়গা দেবেন কোথায়? যা অবস্থা বানিয়েছেন, তাতে জমি নেব বললেই লোকে দা-কাটারি নিয়ে শাড়ি-লুঙ্গি গুটিয়ে তাড়া করছে। কিসের জমি কার বৃত্তান্ত পরের কথা, কিন্তু জমি নেব শুনলেই, মার শালাকে। এই রকম অবস্থা কোনো বহুজাতিকের সিইও বানালে তার নির্ঘাত চাকরি যেত, আমাদের মন্ত্রীদের কদাচ যাবেনা একথা সত্য। কিন্তু কমরেড, শিল্পটা হবে কোথায়, আকাশে? তাই খেলতে যাচ্ছেন, খেলুন, আমাদের শুভকামনা আপনার সঙ্গে আছে, কিন্তু প্লিজ, ট্রফি জিতবেননা যেন।

প্রতিযোগিতা দুই
----------------
কিন্তু এহ বাহ্য। আমেরিকা মহাদেশে এই বসন্তের শ্রেষ্ঠ প্রতিযোগিতা, এই বছরের মেগাস্য মেগাতম ইভেন্ট হল হৃদয় জয়ের প্রতিযোগিতা। অংশগ্রহণ করছেন মহাদেশের দুই মেগা ব্যক্তিত্ব। একজন টেক্সাসের ধনকুবের পিতার সুযোগ্য সন্তান, তাঁর নাম করলে অনেকের হাঁড়ি ফাটে বলে নাম বলা যাচ্ছেনা, তবে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্টের বর্তমান প্রেসিডেন্ট। মধ্যপ্রাচ্যে তেল দখল করতে দুনিয়াজোড়া অভূতপূর্ব দাঙ্গা বাধানোর পর এতোদিনে তিনি বুঝতে পেরেছেন যে ঘরের মাঠে অলরেডি তিন গোল খেয়ে বসে আছেন। একা কাস্ত্রোতে রক্ষা নাই, শাভেজ দোসর। গোটা লাতিন আমেরিকাতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশ: বেশি বেশি করে অপ্রিয় হয়ে পড়েছে। অত:পর করণীয় কি? সমস্ত দন্ড, ইনক্লুডিং রাজদন্ড পৌরুষের প্রতীক, অতিব্যবহারে শিথিল হয়ে পড়ে, অকারণে পাথরে গোঁতালে বাইসনের শিংও ভোঁতা হয়ে যায়। অতএব দন্ড ও শিং সরিয়ে রেখে গণতান্ত্রিক পথে জনচিত্ত জয়ের মহৎ উদ্দেশ্যে রামরথে চড়ে বেরিয়ে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট। ব্রাজিল থেকে শুরু করে মেক্সিকো পর্যন্ত অনেকগুলি দেশে তিনি উদারতা ও গণতন্ত্রের পাঠ দেবেন বলে শোনা যাচ্ছে।

জনচিত্তজয়ের এই কম্পিটিশানে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন, কে আবার, হুগো শাভেজ। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে শয়তান টয়তান বলেই তিনি ক্ষান্ত দেবেন, একথা মনে করার বিশেষ কারণ নেই। অতএব বুশ রামরথে চড়েছেন খবর পাওয়া মাত্রই, তিনিও বিকল্প রথে লাতিন আমেরিকার পথে পথে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন ব্রাজিলে,ছাত্রদের এন্তার বিক্ষোভের মধ্যেই সস্তায় ইথানল দেবার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন,শাভেজ তখন আর্জেন্টিনায়, এবং সোচ্চারে জানিয়ে দিচ্ছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টকে "হিপোক্রেসির জন্য গোল্ড মেডেল' দেওয়া উচিত। বুশ যেদিন উরুগুয়েতে পৌঁছচ্ছেন, শাভেজ সেদিনই লাগোয়া বুয়েনস এয়ারসে আয়োজন করেছেন মহার‌্যালি, এবং সংবাদসংস্থা জানাচ্ছে, সেটা স্রেফ মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খোরাক করার জন্য। ব্রাজিল, উরুগুয়ে হয়ে বুশের রথযাত্রা শেষ হচ্ছে গুয়াতেমালা-মেক্সিকোয়, আর শাভেজের পাল্টা যাত্রা শেষ হচ্ছে, যতদূর জানা যাচ্ছে, বলিভিয়ায়। তো, যাত্রাশেষ যেখানেই হোক না কেন, এই গপ্পের মরাল স্পষ্ট। ইরাকে যা ডান্ডাবাজি হয়েছে হয়েছে, সেসব অতীত। ইরান, উত্তর কোরিয়া বিরোধীদের অপপ্রচার মাত্র, গোলাবারুদের যুগ শেষ। এখন শুধু গণতন্ত্র আর সুস্থ প্রতিযোগিতা। এখন শুধু ভাষণের বন্যা। মিসাইলের জবাবে আর মিসাইল নয়, মুন্ডুর জবাবে মুন্ডু নয়, এখন থেকে শুধু লেকচারের জবাবে পাল্টা ভাষণ, প্রতিশ্রুতির বদলে পাল্টা প্রতিশ্রুতি। এবং অবশ্যই প্রতিযোগিতার নিয়ম মেনে এখানে অংশগ্রহণই আসল, জয়পরাজয় না।

এইভাবেই, আশা করা যাচ্ছে, মানবাত্মার চিরমুক্তি হবে। প্রেমবন্যায় বৃন্দাবন হয়ে যাবে দুনিয়া। আসুন বুশ সাহেবের কাছ থেকে, গণতন্ত্র আর সুস্থ প্রতিযোগিতার আদর্শে অনুপ্রাণিত হই।