বই ও ময়দান


লিখছেন -- সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়


আপনার মতামত         


মানুষ ঠিক কয় প্রকার? বিস্তর গবেষণাতেও অধরা থাকা এই মোক্ষম তথ্য অবশেষে জানা গেল এই বসন্তে। জানা গেল, যে, গোটা মানবজাতিকেই মোটামুটি দুটি অব্যর্থ ভাগে ভাগ করে ফেলা যায়। ময়দানপ্রেমী, এবং বইপ্রেমী। তাঁরাই ময়দানপ্রেমী, যাঁরা কদাচ বই পড়েননি, শুধু ময়দানে চরতে ভালোবাসেন। শহরবাসী হলেও তাঁদের বাড়ি ঘরদোর পছন্দ নয়, তাঁরা মূলত: মাঠে চরেন ও ঘাসপাতা খান, বাড়িতে জায়গার অভাব না থাকা সত্ত্বেও ময়দানেই টেবিলচেয়ার পেতে বসেন, খান দান ও বই বিক্রি করে আন্দোলন করেন। এঁরা ময়দানে বসে কোর্টকে গালমন্দ করে চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করেন, এবং কদাচ জলের ধারে,অর্থাৎ লবণহ্রদে যাননা।

অন্যদিকে বইপ্রেমী তাঁরাই, যাঁরা কস্মিনকালে ময়দানে পা রাখেননি, সমাজ ও রাজনীতি সচেতন নয়, শুধু বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে থাকেন। সেবার বইমেলায় যখন আগুণ লেগেছিল, তখন এঁরা পার্কস্ট্রিট মেট্রো স্টেশনে বসে বেহালা বাজাচ্ছিলেন। আর এবার ময়দান হারানোর শোকে এঁরা কাতর তো হনইনি বরং ভেড়ার পালের মতো দলে দলে সল্টলেকে গিয়ে জমা হয়েছেন।

সোজাসাপ্টা এই বিভাজনে যাঁরা ভ্রূ কুঁচকে তাকাচ্ছেন, তাঁদের অবগতির জন্য আরও জানানো যাচ্ছে, যে, ময়দানপ্রেমী ও বইপ্রেমী, এই দুইটি প্রজাতিরই স্পষ্ট কিছু চরিত্রলক্ষণ দেখা যায়। দুটি প্রজাতিই পৃথিবীর বুকে মোটামুটি সমান সমান সংখ্যায় বিরাজ করে। উভয় দিকেই আছেন প্রখ্যাত মানুষজন। স্বনামধন্য ময়দানপ্রেমীদের মধ্যে রয়েছেন নাট্যকার মুখ্যমন্ত্রী, ক্রীড়াপ্রেমী সংবাদপত্র সম্পাদক, প্রখ্যাত কবি ও সাহিত্যিকবৃন্দ। এঁরা মূলত: আবেগ ও মেলোড্রামাপ্রবণ, চেষ্টা করলেই কে-সিরিজের যেকোনো অপেরায় অভিনয় করে স্বচ্ছন্দ্যে জীবিকানির্বাহ করতে পারেন। এই গোষ্ঠীর কেউ কেউ টিভি চ্যানেলে বঙ্গের সমস্ত বাড়িতে একটি করে বই খুলে তার সামনে মোমবাতি জ্বালিয়ে রেখে প্রতিবাদ জানানোর অভূতপূর্ব প্রস্তাব দেন। হাইকোর্ট নামক বর্গীর হাত থেকে ময়দানকে রক্ষা করতে না পেরে কেউ কেউ মিডিয়ার সামনে অশ্রুজল ত্যাগ করেন, বিভিন্ন চ্যানেলে সেই দৃশ্য বর্ণনকালে পাঠিকার কণ্ঠ ভারি হয়ে আসে, জলসাঘরের সেট থেকে সোজা উঠে আসা সেই করুণ দৃশ্য দেখে নিতান্ত পাষণ্ড ব্যতীত বাকি সকলের অশ্রুসংবরণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

অন্যদিকে বইপ্রেমী প্রজাতিতে রয়েছেন মড়া বাঁচানো আর হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করা ছাড়া যাবতীয় অলৌকিক ক্ষমতায় পারদর্শী অমিতবল মন্ত্রী, বিশিষ্ট বাংলা নিউজ চ্যানেল, এবং অবশ্যই কবি ও সাহিত্যিকবৃন্দ। এই প্রজাতির রথী-মহারথীরা মূলত: সুপারম্যান, ফলে আবেগের ধার ধারেননা। ময়দানের ঘাস, ধূলোর গন্ধ, মাটির ছোঁয়া, গভীর ঐতিহ্য, ইত্যাদি প্রবল সেন্টিমেন্ট নিয়ে এঁদের কোনো মাথাব্যথা নেই। বাঙালির সংস্কৃতি স্থানবিশেষের উপর নির্ভরশীল নয়, বলে এঁরা মাইক ফোঁকেন। ময়দানপ্রেমীদের পিছনে ছুরি মেরে অবলীলায় সল্টলেকে দৌড় দেন, এবং অলৌকিক ক্ষমতাবলে এমন একটি বইমেলার উদ্বোধন করে দেন, যেখানে একটিও বই নেই। এছাড়াও, বইহীন বইমেলায় প্রবেশ করতে হলে যে কোনো টিকিট লাগবেনা তা বুক ঠুকে জানিয়ে জনসাধারণকে কৃতার্থ করেন।

একথা অবশ্য অনস্বীকার্য, যে, এই দুটি প্রজাতির মধ্যবর্তী কিছু ধূসর অঞ্চলও আছে। মানবজগতে এই দুইটি প্রজাতির স্পষ্ট বিভাজন সত্ত্বেও, জানা যাচ্ছে, যে, একটি মধ্যবর্তী অংশও বিরাজমান, যাঁরা বইপ্রেমীও বটে ময়দানপ্রেমীও বটে। এঁরা বইমেলার পরিচালকবৃন্দ, যাঁদের সংক্ষেপে গিল্ড বলে ডাকা হয়ে থাকে। এঁরা কিছুটা অনাথ, খানিকটা বইপ্রেমী, অর্ধেক ময়দানপ্রিয় এবং বাকিটুকু শরনার্থী। এঁদের শরীর সল্টলেকে থাকলেও মন পড়ে আছে ময়দানে, এঁদের ধড় বইপ্রেমী হলেও মুন্ডু ময়দানাভিমুখী। নিজেদের মেলাকে নিজেরাই ব্যর্থ প্রমাণ করতে এঁরা উদগ্রীব। উগ্র ময়দানপন্থী সংবাদপত্র সম্পাদক এঁদের সর্বসমক্ষে বিশ্বাঘাতক বললে তাঁরা ভুল হয়ে গেছে স্যার বলে অধোবদন হন, আর বইমেলায় নাগাড়ে মাইক ফুঁকে নিজেদের শরনার্থী বলে প্রচার করেন। সেই প্রচার থেকে যে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়, তা হল, পূর্ব বাংলা থেকে একদা যে লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিটে মাটি হারিয়ে এপার বাংলায় আশ্রয় নিতে এসেছিলেন, ময়দান থেকে উচ্ছেদ হয়ে সল্টলেক স্টেডিয়ামে বইমেলার চলে আসাও একটি সেই ঘটনার সঙ্গে তুলনীয় একটি ট্র্যাজেডি।

এই অবধি পড়ে যাঁরা ভাবছেন, গিল্ড নামক এই ধূসর অঞ্চলটির অস্তিত্ব মানবজাতির দুটি ভাগের তত্ত্বকে দুর্বল করছে, তাঁরা অবশ্যই ভুল ভাবছেন। ব্যতিক্রম তত্ত্বকে নাকচ নয়, প্রমাণই করে। মনে রাখতে হবে, যে, দিন ও রাতের মাঝে আছে গোধূলি, নারী ও পুরুষের মাঝে রয়েছে "যে জন আছে মাঝখানে', বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েতের মাঝখানে আছে মধ্যবিত্ত। একই ভাবে বইপ্রেমী ও ময়দানপ্রেমী নামক দুইটি প্রজাতির মধ্যে রয়েছে একটি ধূসর এলাকা। কালক্রমে এই বিভাজন স্পষ্টতর হবে, মধ্যবিত্তের মতো ধূসর এলাকা হাওয়া হয়ে যাবে পৃথিবী থেকে, ইহাই বিজ্ঞান। অতএব এই দুইপ্রজাতির থিয়োরি বিজ্ঞানসম্মত ও দুর্ভেদ্য। ইয়ার্কি নয়, আমরা, বঙ্গজাতি, একদা হেলায় লঙ্কা জয় করেছি, বাংলা গানকে জীবনমুখী ও জীবনবিমুখ নামক দুটি ভাগে ভেঙেছি,দুনিয়াকে ভেঙেছি প্রগতিশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল এই দুই টুকরোয়, ভাঙাভাঙি আমাদের হাতের মোয়া, চিনের প্রাচীরের গায়ে দুচারটে পিংপং বল ছুঁড়ে এই দুর্ভেদ্য দুর্গকে অত সহজে ডিসমিস করা যাবেনা।

কাজেই তক্কোটক্কো নয়, আমাদের শ্রেণীবিভাজনের থিয়োরি মেনে নিন। যদি আপনি সল্টলেক স্টেডিয়ামে গিয়ে থাকেন, তো কক্ষনো ময়দান যাননি, এবং আপনি বইপ্রেমী। আর যদি ময়দানে পা দিয়ে থাকেন, তো ময়দানপ্রেমী, যুবভারতীতে আপনার টিকির ছায়াও কখনও দেখা যায়নি। আপনার সমর্থনই আমাদের পথ চলবার পাথেয়। নমস্কার।