বৈধ অনুপ্রবেশ ও একটি রিয়ালিটি শো


লিখছেন অর্পণ


আপনার মতামত         


অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা এই প্রবন্ধের বিষয়বস্তু নয়। এইটুকু হোমো-স্যাপিয়েন্সত্ব এখনো অবশিষ্ট আছে যে ওদের নিয়ে ক্যাওড়ামো করলে পাব্লিক ভালোভাবে নেবেনা। তাই বৈধই সই। তাছাড়া যেসব ব্যতিক্রমী পাঠকবর্গ (লিঙ্গ নির্বিশেষে) সমØতরকমের হ-য-ব-র-ল লেখা পড়ার আগে মনোযোগ দিয়ে শিরোনামটি পড়ে নেন এই ডিস্‌ক্লেমার তাদের জন্যও নয়। এ হলো বৈধ অনুপ্রবেশের ব্যতিক্রমী গপ্পো। আর এই উত্তর-আধুনিক, উত্তর-ঔপনিবেশিক আর উত্তর-গুরুচন্ডা৯ যুগেও অনুপ্রবেশ আর বৈধ শব্দদুটি পাশাপাশি কি করে সহবাস করে সেই নিষ্পাপ ভাবনায় যারা আবিল হচ্ছেন, তাদের প্রভূত সহানুভূতি আর একচিমটে তিতিক্ষা ফ্রীতে দিয়ে আসুন যাওয়া যাক পরের প্যারায়।

অভিবাসন মানব সভ্যতার মোস্ট অ্যানসিয়েন্ট কনসেপ্ট। আর সবকিছু এটাসেটা হাবিজাবির মতো আজকাল অভিবাসনের বৈধতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দেয় রাষ্ট্রযন্ত্র (আর সবকিছু বলতে কে রাষ্ট্রদ্রোহী, কে বহিরাগত আর কে মাওবাদী, এইসব মামুলি বিষয়আসয়। তা সেইসব ম্যাও সামলানোর দায়িত্ব এই লেখকের নয়)। বৈধ প্রবেশ আর অবৈধ প্রবেশ আমরা বেশ বুঝি। পাঠক মনে করুন, আপনি যখন দীর্ঘ হাওয়াইউড়ান শেষে স্পাউসপুত্রকন্যা বগলে হাসি হাসি মুখব্যদান করে লাইন লাগান আপনার মার্কামারা ভিসার পাতাখানি হাতে ধরে। প্রতীক্ষার শেষ হলে তকমাআঁটা তন্বী যুবতী মিষ্টি একগাল হেসে তার পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে বলে "ওয়েলকাম, এতদিন কোথায় ছিলেন'। উটি হলো বৈধ। কারণ আপনার কাগজপত্র আছে। তাতে সরকারী সিলমোহর আছে। না থাকলে অবৈধ। তখন তাদের কপালে আর হাওয়াইযাত্রা নাই, ভিসা অফিসার নাই, হাইস্কিলড মাইগ্রান্টের ল্যাপটপের ঝোলা কাঁধে রোয়াবি নাই। তবে পুরোটাই হ্যাভ্‌স আর হ্যাভ্‌নটদের গল্প নয়। এদেরও আছে নিজস্ব কিছু স্বরলিপি। যথা পোকামাকড়ের মতো কাঁটাতার পেরোনো, উড়ন্ত সীসার বুলেটের ট্র্যাজেক্টরি, পোকামাকড়ের মতো বংশবিস্তার নতুন ভূখণ্ডের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে গিয়ে। সবই ঐ পালানোর গল্প। কেউ বৈধ আর কেউ অবৈধ। হ্যাভ্‌স আর হ্যাভ্‌নটস, সব্বার।

তবে সুধী পাঠকমাত্রই জানেন সাব-অল্টার্নদের নিয়ে আমিষ নিরামিষ গদ্য ফাঁদা ইদানীং অতি হিপ ব্যপার। না, নতুন কিছু বিপ্লব-টিপ্লব কেউ ডাউনলোডায়নি, নতুন বোতলে লেবেল এঁটে সেই পুরোনো শ্যাম্পন ফিরি চলছে। চিরকালই অঢেল অ্যাশ ও আরামে কিছুদিন থাকলে প্রবল চুলকানি শুরু হয়, চোঁয়া ঢেকুরও ওঠে, অ্যান্টাসিডে কাজ না দিলে রাজার ছেলে রাজ্যপাট-দারা-পুত্রের মায়া কাটিয়ে বৃক্ষতলে ডেরা বাঁধেন। একালে অত উচ্চকোটির তপস্যায় আর চিঁড়ে ভেজে না, গরিষ্ঠ নামক জাদু সহজিয়া পথের সাধক ও দর্শক। হলিউড-বলিউডের হুরপরীরা হতকুচ্ছিত তেএঁটে সব জায়গা থেকে গাদাগাদা বাচ্চা দত্তক নিয়ে নিজেকে ও সমস্ত মানবতাকে ধন্য করেন আর আমাদের মতো জনতা গাবগাবিয়ে তাই গিলি। তাবৎ সেলিব্রিটিকুল তাদের খ্যাতির পোশাক খুলে রেখে নাইতে নামেন মিডিয়া নামক পুষ্করিণীতে, তার জলে আপনার মুখ আপুনি দেখেন ও দেখান। সমবেত মর্ষকামিতার পরাকাষ্ঠায় (ও স্পনসরের পয়সায়) তেনাদের আহা-এম্নিও-হতে-পারত গোত্রের অসেলিব্রিটীয় আমজীবনের হদ্দমুদ্দ দেখে গণ হিস্টিরিয়ার বন্যা বয় ক'দিন। তারপর যেমন বেণী তেমনি রয়ে যায়, সবাই সব ভুলে যায়। শুধু চোখের জল মুছে ব্রিটনি স্পিয়ার্স নেড়া হন।

যারা একে বলেন আদিখ্যেতা তারা হয় রিয়ালিটি শো দেখেননি অথবা ওভারডোজে বৈরাগী হয়েছেন। প্রথমটি হলে চিন্তার কিছু নেই, কালের নিয়মে একদিন একদাবিপ্লবী-অতিবিপ্লবী-প্রতিক্রিয়াশীল-ফড়ে-দালাল সব একঘাটে বসে জল খাবে। দ্বিতীয়টি হলে কিঞ্চিৎ চিন্তার কথা। রোজ রোজ নতুন জিনিস মার্কেটে আসবে কেমনে? হ্যাঁ, ইদিকে দেখুন প্রকৃতিতে ভ্যাকুয়াম বলে কিছু থাকতে নেই, থাকতে পারে না (ছোট্টোবেলা থেকে শুনে আসা যখন)। তো সেই অলিখিত ফতোয়াকে সাপোর্ট জানিয়ে মার্কেটে অবশেষে এসে পড়েছে একপিস আল্টি হাতেগরম রিয়ালিটি শো, থুড়ি নতুন থীমের অ্যামিউজমেন্ট পার্ক। তবে ওই সবপেয়েছির দেশে নয়, তার খানিক দক্ষিণে, মেক্সিকো সিটি থেকে ১২০ মাইল উত্তরে এল আলবার্তো নামে ছোট্ট ইণ্ডিয়ান জনপদে। তা এখানে কর্তৃপক্ষ বিশাল প্রান্তর জুড়ে সাজিয়েছেন খা খা ঊষর ভূমি, কাঁটাগাছের জঙ্গল, কাদাভরা নদী, বিপজ্জনক পাথুরে চড়াইয়ের ল্যান্ডস্কেপ। উদ্দেশ্য একটাই পার্কে এসে লোকজন পয়সা দিয়ে ট্রেকিং করবে আর তারিয়ে তারিয়ে চাখবে লুকিয়েচুরিয়ে সীমান্তরক্ষীর চোখে ধুলো দিয়ে মেক্সিকো আর আমেরিকার বর্ডার পেরোতে কেমন লাগে। ডলারধারী পর্যটকেরা যাতে পুরো মজা লুটতে পারে তার জন্য রয়েছে সাজিয়ে রাখা ট্রাক আর ভাড়া করা পথপ্রদর্শক যারা তাদের পালাতে সাহায্য করে। অবশ্যই ওই সাজানো মামুর (গুচ'র নয়) দল, তাদের নকল আগ্নেয়াস্ত্র, ধূর্ত সারমেয়বাহিনী আর গাম্বাটের মতো চেল্লাতে থাকা লাল-নীল আলোওলা গাড়ির চোখ এই সব এড়িয়ে। প্রাণপণে পালাতে থাকে তারা যেমন একদিন পালিয়েছিল কিছু লোক তাদের ফেলে আসা বাস্তুভিটে, ভাষা, আচারপ্রথা, কিছু রূপকথা, কিছু হাসিভরা চোখের দৃশ্য আর হাঁ করে গিলতে আসা দারিদ্র্য থেকে। যে অনির্বাণ যাত্রার শেষে থাকে উজ্জ্বল আলোর স্বপ্ন, সভ্যতার জারজ সন্তান হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে যাবার নিশ্চয়তা। যেমনটি তারা ক্রমাগত করতে থাকবে অনাগত ভবিষ্যতেও। সব ঐ পালানোর গল্পই।

অনুপ্রবেশকারী সাজা পর্যটকের দল ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে এগোবার আগে পাবলো মার্টিনেজ, যে কিনা ওই পার্কে একজন গাইডের কাজ করে, পুরো গ্রুপকে নাতিদীর্ঘ একটি ভাষণ দেয়। মোদ্দা কথা ও যা বলে তা অনেকটা এরকম : ""অনুপ্রবেশকারীর জীবনের ইতিহাস গৌরবের নয়। আমরা আমাদের পরিবার, ভাষা, পৃথিবী সব ত্যাগ করে এগোই। আমাদের কৌমভাবনা ত্যাগ করতে হয়। এসব করার উদ্দেশ্য একজন সত্যিকারের অনুপ্রবেশকারীর মনন বুঝতে চেষ্টা করা''।

তবে কিনা নকল পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র যেমন নকল, তেমনি আপনার হাতে ধরে রাখা হ্যান্ডিক্যামখানি আসল। বেড়ে কনসেপ্টখানি শেষমেষ। কোনো রাখঢাক নেই, গুড়গুড় নেই, সতীপনা নেই, হে দারিদ্র্য তুমি মোরে করেছ মহান টাইপের গভীর বাণীটানি নেই। এক একদা শরণার্থী পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্ম এই থীম পার্কের খবরটা প্রথমবার জানতে পেরে অন্ধ রাগে বোবা হয়ে ছিল কিছুক্ষণ। লিখতে গিয়ে সে বুঝতে পারে তার সে অনুভূতি কতটা মেকী। বুঝতে পারে এই গল্পে নিয্যস যা আছে তা নিকষ বাস্তব। যেখানে হাতধরাধরি করে থাকে পোকামাকড়ের বেআইনি অভিবাসন ও তাকে পণ্য করে বেঁচে থাকা গরীব দেশের আট আনার বাণিজ্য। একটি কথা ও অন্যটি কাহিনী। দিবসের যখন অবসান হয় দুটোই তখন প্রখর সত্যি।

কে না জানে পণ্য হিসাবে আবেগের কোনো বিকল্প নেই।