বিজ্ঞানস্ট্যাম্প


লিখছেন সোমনাথ দাশগুপ্ত


আপনার মতামত         


রিচার্ড লেয়ার্ড "হ্যাপিনেস" নামের একটা চোদ্দ অধ্যায়ের বই লিখে পেঙ্গুইন থেকে ছাপিয়েছেন বলে নয়, অনির্বাণ চাটুজ্জে সে বইয়ের রিভিউ লিখে এ সংখ্যার গায়েগতরে দেশ-টার দাম তিরিশ টাকা করার পথে সাহায্য করেছেন বলেও নয়, লেখাটায় উন্নয়ন আর জি.ডি.পি.র সঙ্গে সুখে থাকার গুরুচণ্ডা৯য় অসমীকরণের রাজনৈতিক ফোড়ন রিক্যাপিচুলেটেড বলেও নয়, "ব্রেন ফিজিওলজী", "ইলেকট্রোএনসেফ্যালোগ্রাম" আর "ব্রেন স্ক্যান" বিজ্ঞানস্ট্যাম্পগুলো মাঠে নেমেই কী-বোর্ড চুলকে দিল। অর্থনৈতিক গবেষণার প্যারামিটার নেওয়া হচ্ছে মানুষের ভালো থাকার বোধটিকে, এবং তা স্রেফ ডিক্লারেশন নির্ভর নয় আর, হাই ফাই যন্ত্রপাতি প্রমাণিত। অর্থাৎ প্রশ্নাতীত একটি থিওরাইজেশনের পথ তৈরি হচ্ছে।
সুখ কি, কোন কোন ভ্যারিয়েবেলের সাথে এর কেমন ধরণের সমানুপাতিক ব্যাস্তানুপাতিক বা গুণানুপাতিক সম্পর্ক, ম্যারিকার সুখ-সংরক্ষণ সূত্র ও তার এলোমেলোপনার স্ট্যাণ্ডার্ড ডেভিয়েশন মাপা - আপনার পছন্দ হোক বা না হোক, আজকের অর্থনৈতিক রিসার্চের হেভি ডিমাণ্ডেড একটা প্রশাখা। সুখের মত একটা সুক্ষ্ম বায়বীয় বিষয় নিয়ে, যা প্রতিপাদ্য, আপনার নিজস্ব মতামতের কোনো গুরুত্ব নেই। আপনি মশাই জানেন কি, সুখ কারে কয়? কানের খোল সাফ করে শুনুন, আপনার মাথার বাঁদিকের ইলেকট্রিক চলাফেরা ডান দিকের চেয়ে বেশি হলে আপনি হচ্ছেন গিয়ে সুখী মানুষ। উল্টোটা হলেই আপনার দু:খে চোখের জল ফেলার সময় সমাগত। কূটপ্রশ্নের তালিকা ধরিয়ে দিয়ে, ঘড়ি হাতে, কড়ায় গণ্ডায় উত্তর বুঝে নিয়ে সুখ-অসুখের কোয়ালিটেটিভ মাপামাপির দিন-কে অতএব আলবিদা।

ক্বচিৎ ফিউচারদর্শন

ইত্যাকার কেমিক্যাল লোচা মেপে ফেলার জন্যে সায়েন্স মহাশয় ফুটোস্কোপ বানাচ্ছেন। সুতরাং আয় তোর মুণ্ডুটা দেখি। অবিলম্বে জানা যেতে চলেছে, বাঁ কানের ঠিক উপরের দুই বর্গসেমি জায়গায় ইলেকট্রিক সিগনালের আধিক্য মানে বিরক্তি (পেছন থেকে বিভু ভট্‌চাযের টাকে চাঁটি মেরে ব্রেনস্ক্যান করে এটা জানা যায়), কপালের ঠিক মাঝখান থেকে ইলেকট্রিক চলাচলের সাডেন ফল্‌ - অর্থাৎ হতাশা (কৌন বনেগা করোরপতি' র এক প্রতিযোগী ২৫ লাখ থেকে অডিয়েন্স পোলের লাইফলাইনে ভুল জবাবে ছয় চল্লিশে নামার পর তার এনসেফ্যালোগ্রাম), এমনকি শিরদাঁড়া বরাবর নামতে থাকা ইলেকট্রন স্রোতের হুড়োহুড়ি বাড়া দেখেই বোঝা যাবে সঙ্গমের ডিজায়ার (বিয়েবাড়ি ফেরত ১০০০ কাপল্‌-এর ইলেকট্রোঅ্যানালিসিস)। আবিষ্কৃত হতে চলেছে মিনি রিমোট ইলেকট্রোসেন্সর। M R E । ট্রাউসারের পকেটে রেখে বসের চাঁদির দিকে তাক করে যদি বোঝা যায় মুড ভালো (ইলেকট্রোকাউন্ট ৩২ ন্যানোঅ্যাম্পিয়ারের কম) তবেই পি. এল. এর অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে এগোবেন। বৌয়ের অজান্তে ঘাড়ের দু ইঞ্চি পেছনে M R E ধরে যদি দ্যাখেন ইলেকট্রোডিডাক্ট ৮৪ ন্যানোঅ্যাম্পসের বেশি, রাতের রান্নার মন খুলে প্রশংসা করুন (বাকিটা বিবাহিতরা বুঝবেন বলে সেন্সর করা হল। ছেলের হৃৎপিণ্ডের ম্যাগনেটোসেন্সর ৫৫ ছাড়ালেই তৈরি হোন, ভাবি বৌমার মুখদর্শন জলদিই হতে পারে।
এহেন ফাজলামি দেখে যাদের বাঁ কানের উপরে ইলেকট্রিক সিগনাল বাড়ছে, তাদের জন্যে সিরিয়াস খবর। গবেষণার বাজার চূড়ান্ত গরম। সেমিনারবিদরা প্রমাণ করছেন, তৃতীয় বিশ্বে গাড়ি উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের প্রকৃতিচেতনা হাস পাচ্ছে, যদিও উন্নয়নশীল দেশের মোট প্রকৃতিচেতনা সংরক্ষিত। কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে পরিবেশবিদদের গ্রীণারী প্রোপাগ্যাণ্ডা ও কৃষিজমিবাঁচাও আন্দোলনের সিনার্জিস্টিক এফেক্ট। দুÖপ্রাপ্য নিদর্শণ থেকে রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের D N A অ্যানালিসিস রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রকৃতিচেতনার আপারলিমিট নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রভূত সাহায্য পাওয়ায় অর্থনীতিবিদেরা বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক অগ্রগতিকে ধন্যবাদ জানাবেন নির্ঘাৎ। অধুনা জানা যেতে চলেছে, আরো বহু অজানা তথ্য। যথা: মানুষের এনকোডিং টেনডেন্সি তার জন্মদেশের তুলসিপাতা উৎপাদনের সম্বৎসরিক গড় ভ্যালুর সমানুপাতিক। এভাবে ভারতে প্রাপ্ত কম্পিউটার প্রোগ্রামারদের ঈর্ষণীয় সংখ্যাধিক্যের হাতে গরম কারণ পেয়ে কর্মসংকোচনজুজু-ভীত বিল ক্লিন্টন জিওফার্মালজিস্টদের তুলসীপাতা নিয়ে গবেষণায় বিশেষ ফাণ্ডিং বিল পাশ করাবেন এবং সাথে সাথে ভারত সরকারের তরফ থেকে রাখা তুলসিপাতা সংক্রান্ত কিছু বিশেষ পেটেন্টের অনুমোদন স্থগিত হয়ে যাবে বলেও আশঙ্কা।

যেহেতু ব্রেনস্থ বৈদ্যুতিক ডিসব্যালেন্সই প্রকৃত প্রস্তাবে সুখ-অসুখের বিজ্ঞান-স্ট্যাম্পিত কারণ, কিছু ফক্কর ছোকরার সাজেশন : হামলে পড়ে উন্নয়ন আর জিডিপির ইক্যুয়েশন না কষে মানুষকে সুখে রাখার জন্যে বৈদ্যুতিক চিকিৎসাপদ্ধতির আসান সমাধান কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মাথায় গজাল মেরে ঢোকানো হোক। মস্তিষ্কের বিদ্যুৎব্যালেন্স কর্মসূচী-উত্তর পৃথিবীতে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে মাইল মাইল শান্তিকল্যান।

আপত্তি

তাত্বিক আলোচনা ও গবেষণা হামেশাই সুচারু ঘোড়ার ডিম প্রসব করে। বিভিন্ন গামা গামা থিওরিবিদ পরস্পরের অসম্মতিসাপেক্ষ গোছা গোছা গবেষণাপত্রের জন্ম দিয়ে সেমিনারে সেমিনারে লড়াই করে কালাতিপাত করে থাকেন, এবং তাতে আমজনতার কিৎসু আসে যায় না, কারণ, স্বীকৃত যে, গো-এষণা শেষে খুঁজে পাওয়া গরুটি সবসময় হারানোটি নাও হতে পারে। কিন্তু মানুষ, যার কিনা - ধারালো নখ নেই, তীক্ষ্ম দাঁত নেই, ঝাঁঝালো নাক নেই, দূর-দৃষ্টি নেই, খাড়া কান নেই, নেই পেশীর দোকান - তার মা, ব্র্যাকেটে বিজ্ঞান, আছে। বিশ্বাসযোগ্যতার শেষ প্যারামিটারটিকেও রেহাই দেওয়া হল না। I S I এর মতই রণে বনে খাটে ও কমোডে জন্মানো সমস্ত থিয়োরির ওপরে এবার লাগাতে হবে এই বিজ্ঞান স্ট্যাম্প, এবং আমরা, অত:পর বিশ্বাস করতে বাধ্য হব, হেনস্‌ প্রুভড, যে হারানো গরুটিকেই খুঁজে পাওয়া গেল।