ফলেই পরিচয়


লিখছেন -- সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়


আপনার মতামত         


ফলেই পরিচয় -১
----------------

নেপালের আকাশে নাকি এখন লাল তারা জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। স্বৈরাচারী রাজা পিছু হঠেছেন। ক্ষমতাচ্যুত হলেন বলে। এখন একদা বিপ্লবীদের হাতে গণতন্ত্রের বিজয়পতাকা। দীর্ঘদিনের বিরাট লড়াইয়ের শেষে এসেছে বিজয়। বিজয়ী বীররা তাই নামিয়ে রেখেছেন অস্ত্র। সেই অস্ত্রের পরিমান এতই বেশি, যে, ভারত থেকে পাঠানো হয়েছে অস্ত্র রাখার কন্টেনার। সেখানে অস্ত্রশস্ত্র জমা রাখার পর তালা বন্ধ করে একটি চাবি নিয়েছেন প্রচন্ড। অন্য ডুপ্লিকেট চাবিটি ঠিক কার কাছে জমা আছে, সেটা এই মূহুর্তে জানা না গেলেও, এই আনন্দের মূহুর্তে আমরা আর সেসব নিয়ে মাথা ঘামাবোনা। আজ আনন্দের দিন। আজ বহুদিন পরে বিজয় এসেছে ফিরে। আজ আমরা, অর্থাৎ আমি আর আমার চিরপুরাতন পাড়াতুতো প্রেমিকা খেঁদি , হলইবা রিমেক, শাহরুক খানকে দেখব মন দিয়ে।

এবং হলইবা রিমেক, আজ এই আনন্দের মূহুর্তে আমরা নেতাদের পদতলে বসে আবার নেপালের কমরেডদের কঠোর সংগ্রামের কথাও শুনব। বীরত্বের লোকগাথায় মোহিত হব। এবং ভুলে যাব, অতি অবশ্যই ভুলে যাব, যে, এই কদিন আগে, নেপালের মাওবাদীদের উত্থানে আমরা কি প্রচন্ড চিন্তিত ছিলাম। ভুলে যাব, যে, আমাদের রাষ্ট্রনেতারা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের তকমা লাগিয়ে এই ক'মাস আগেই নেপালের রয়্যাল আর্মিকে গুচ্ছ অস্ত্রশস্ত্র এবং নৈতিক সমর্থন জুগিয়েছেন। ভুলে যাব, যে, নেপালের মাওবাদী একাধিক শীর্ষনেতা ও বেশ কিছু কর্মী সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্রের অপরাধে ভারতের জেলে বন্দী আজও। আর নেপাল থেকে বিহার হয়ে অন্ধ-দন্ডকারণ্য পর্যন্ত বিস্তৃত বহুল প্রচারিত রেড করিডোর? ধুর মশাই, ও তো ইতিহাস। যত তাড়াতাড়ি ভুলতে পারেন ততই মঙ্গল।

তবে হ্যাঁ, এই থিয়োরি আবার ভারতীয় মাওবাদীদের উপর প্রয়োগ করবেননা। এ ব্যাটারা গুন্ডা-বদমাশ। খুনি। নরাধম। দেশের আভ্যন্তরীন নিরাপত্তার পক্ষে সবচেয়ে বড়ো বিপদ। এরা সন্ত্রাস সৃষ্টি করে। গুলিগোলা চালিয়ে ক্ষমতা দখল করার চেষ্টা করে। এরা প্রায় সন্ত্রাসবাদী। একটু-আধটু এনকাউন্টার, দুচাট্টে খুনখারাপি, অল্প করে সালভা জুডুমই এ ব্যাটাদের আদর্শ ওষুধ। জানেননা, বীরাপ্পনও জঙ্গলে থাকতো, আর এই ব্যাটারাও জঙ্গলে থাকে? তাহলে, তফাতটা কোথায়, অ্যাঁ?

আসল কথা হল, সালভাদর দালি আর মাকালীকে আলাদা করে চিনতে শিখুন। নেপালি কমরেডদের সঙ্গে এদের গুলিয়ে ফেলবেননা।সোজা কথাটা সোজা করে বুঝে নিন। নেপালের ওরা হল ভালো মাওবাদী, আর এরা হল কালো মাওবাদী। কেন জিজ্ঞাসা করছেন? কিসুই তো বোঝেননা মশাই। ভেরি সিম্পল। শিবাজীকে আওরঙ্গজেব পাহাড়ি ইঁদুর বলেছিলেন জানেন? মাদ্দা কথা হল, যারা যুদ্ধে যেতে তারা হয় বীর, আর যারা জেতেনা, তারা ডাকাত, কিংবা পাহাড়ি ইঁদুর। সিম্পল।


ফলেই পরিচয় -২
----------------

শুধু নেপালেই নয়, আমেরিকার আকাশেও এখন বিপ্লবের লাল তারা। টি-শার্ট-পোস্টার-টুপি আর দাড়ি তো সেই কবে থেকেই আছে, চে গুয়েভারাকে নিয়ে হঠাৎ ফিল্মেরও ঢল নেমেছে। ওয়াল্টার সালেসের দুহাজার চার সালে বানানো মোটরসাইকেল ডায়ারিজ নামক সিনেমাটি অনেকদিন ধরেই বাজার ফাটাচ্ছিল। কানে চাট্টি পুরষ্কার জিতে আসার পর সানড্যান্সের মতো নাকউঁচু ফেস্টিভ্যালে স্ট্যান্ডিং ওভেশন পেয়েছিল, যা নাকি পুরষ্কারের বাড়া। "ওসব আঁতেলদের কারবার' বলে নাক কোঁচকাচ্ছেন? কোঁচকাবেননা। আমজনতার উৎসব অস্কারও বাগিয়েছে ফিল্মটি, "ফিল্মের জন্য রচিত শ্রেষ্ঠ গান' না কি একটা হাবিজাবি ক্যাটিগরিতে, দুহাজার পাঁচে।

এখন আবার শোনা যাচ্ছে হলিউডের বিরাট নাম স্টিভেন সোডারবার্গ চে কে নিয়ে একটি ফিল্ম বানাতে চলেছেন। ফিল্মটি বাজারে আসবে নাকি দুহাজার আটে। কাহিনী দূরস্থান, নামধামও এখনও ফাইনাল হয়নি, কিন্তু তা নিয়েও হট্টগোলের শেষ নেই। দক্ষিণপন্থীরা ক্ষেপে লাল। যে লোকটা টোটালিটারিয়ানপনার শেষ কথা, কিউবায় লেবার ক্যাম্প বানানোর হোতা (যেখানে সমকামী আর রাজনৈতিক বিরোধীদের রাখা হত), হিউম্যান "কিলিং মেশিন' বানানোর পক্ষে ওকালতি করেছে, সে শেষকালে মুক্তচিন্তা আর স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে দাঁড়াল, এমনকি হলিউডেও? শেষে কি ঘরের মধ্যে থেকেই ঘর দখল হয়ে যাবে নাকি? অন্যদিকে বামপন্থীদেরও অস্বস্তির যথেষ্ট কারণ আছে। কমিউনিজম ফমিউনিজম বুঝিনা বস, চে ইজ চে, বলে এতদিন পপস্টাররা চে'র মুখ আঁকা টিশার্ট পরে লম্ফঝম্প করেছেন, এই অবধি ঠিক ছিল, কিন্তু শেষে হলিউডও চে'কে ব্র্যান্ড বানিয়ে ফেলল? বল মা তারা দাঁড়াই কোথা।

এমনিতেই, কে না জানে চে লোকটি সুবিধের ছিলনা। সকলেই একে নিয়ে সমস্যায় পড়েছে। লোকটিকে নিয়ে আমেরিকার যে সমস্যা ছিল, সিআইএ জনিত সেসকল কেচ্ছা জানতে কারো বাকি নেই। কিন্তু বামপন্থীরা? দিকে দিকে ভিয়েতনাম চাই বলেই শুধু ক্ষান্ত দেয়না যে লোক, ভুতের কিল খেয়ে সুখের ইডেন থেকে বন্দুকহাতে নেমে এসে বলিভিয়ার জঙ্গলে হাতে কলমে ভিয়েতনাম বানাতে নেমে পড়ে, তার সঙ্গে কোনো জাগতিক চেতনাসম্পন্ন লোকের মতামতের মিল হওয়া অসম্ভব। মাওপন্থী, এমনকি দুনিয়াজোড়া আলট্রা নামে খ্যাত মাওপন্থীরাও তাই চেকে আলট্রা-লেফট বলে সমালোচনা করেছে, কিউবা আর বলিভিয়া দুজায়গাতেই প্রথাগত কমিউনিস্ট পার্টি বিপ্লবের সময় চে/ফিদেলকে রেগুলার গাল পাড়ত। এই লোকটিকে নিয়ে সমস্যা কখনও মেটেনি।

তো, সেসব পারস্পরিক খিস্তিখাস্তার ইতিহাস এখন আমরা ভুলে যাব। চে'কে এখন আমরা লাতিন আমেরিকার বিপ্লবের প্রতিমূর্তি বলে পুজো করব। বলিভিয়ার অপারেশানের কথাও ভুলে যাবে হলিউড। চে এখন দুনিয়াজোড়া বিদ্রোহের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রতীক যে। থিয়োরি-ফিয়োরি তো ব্যাক-ক্যালকুলেশন করে পরে মিলিয়ে দেওয়া ইশকুল বেলা থেকেই শিখেছি আমরা। আর এও শিখেছি, যে, আসল কথা হল রেজাল্ট। রেজাল্টে চে'কে কেউ বিট করতে পেরেছে আজ পর্যন্ত? যে যেখানেই যত বড়ো-বড়ো বাত দিক, লাতিন আমেরিকায় আমেরিকার নাকের ডগায় বসে বিপ্লব আর কি কেউ করেছে?

তো, সেই কথাই হচ্ছিল। থিয়োরি ফিয়োরি গুলি মারুন। মোদ্দা কথা হল, যুদ্ধে জিতলে আপনি হবেন ছত্রপতি শিবাজী, আর না জিতলে পাহাড়ি ইঁদুর। ফুলস্টপ।