দুই বিন্দু জল


লিখছেন -- সোমনাথ দাশগুপ্ত


আপনার মতামত         


আলপটকা বৃষ্টি হয়ে স্টার থিয়েটারে, অধুনা সিনেমা, দুফোঁটা জল ঢুকেছে বলে কত কথা! নাকি, সেখানে তখন মুখ্যমন্ত্রী ভাষণ দিচ্ছিলেন। হাতিবাগানে তো আর প্রখর বর্ষাকালেও জল জমে না! গোমুখ্যু ইঞ্জিনিয়ার আর আকাট রাজমিস্ত্রির হাতে পড়েই নেথাৎ, আহা, অমন ঐতিহ্যঘৃতগন্ধী বিল্ডিংটা মবলগ চুলকে গেল গা! সাংস্কৃতিক শীর্ষনেতৃত্বের জমানায় তাই প্রকৃত কালপ্রিট ঢুঁড়ে, দামড়ে সিধে করার প্রেসকপি নোটিস গেছে বলে শোনা যায়। এসব শাক সরিয়ে শহর কলকাতার জলনিকাশী ব্যবস্থার কানকো উল্টে যাঁরা লাল না কালচে বিচারের বেহায়া আঁতলামো মারাচ্ছেন, তাদের জন্যে চালুনি ছাড়া অন্য কোনো নাম বরাদ্দ নেই।

যে শহরের লোকজনের সিভিক সেন্স পচে হাসপাতালের জেনারেল ওয়ার্ডের মতো গন্ধ বেরোয়, তাদের আবার বায়নাক্কা! এই যে সারাদিন দুটাকার পান-গুটখা কিনে শহর রঙিন করার মহাব্রত পালন, দেওয়াল বা ল্যাম্পপোস্টের সাথে ছুটকো-ছাটকা আবর্জনার বন্ধুত্ব দেখলেই সারমেয়-আনন্দে প্যান্টের জিপ খুলে দাঁড়িয়ে যাওয়া - এগুনোর শাস্তি পেতে হবে না? এই যে এত শ্লোগান লাগানো হল গাছে গাছে - "বাড়িতে পায়খানা করুন"" কেউ শোনে? পথের ধারে যেসব ঢালু জায়গার নাম ব্রিটিশ ঠাকুর্দা "ড্রেন" দিয়ে গেছিল, রবিমামার হামা টানার সাথে সাথে সেসব শুকনো খটখটে - নাকি পয়:প্রণালী - তে গুচ্ছখানেক পাগল, ভিখিরি আর কেলে প্যাংলা ছানা-পোনা লেলিয়ে দেবে তার বেলা? কুকুর-বেড়াল-গোরু-ছাগল বাড়িতে যা যা পোষা যায় সবাইকে দিয়ে পথঘাটগুলোকে জনপ্রিয় শৌচালয় করে তুলে এখন আবার বড় বড় কথা? কুঁড়ো-কাচড়ার জঞ্জালে খাল নদী হাইড্রেন বুজিয়ে কলকাতা থেকে জল বেরোবার সব আউটলেট বন্ধ করেছে কে? এখন বৃষ্টি হলে ঐ ড্রেনের পাঁক আর নিজেদের অপকর্মের ফল ভুগতে হবে না - মামদোবাজি? কালো কালো জলে গু আর প্লাস্টিক ভাসবে। সেই জলে হাঁটু অবধি ডুবিয়ে পথে চলতে হবে। একেই ইংরিজিতে বলে টিট ফর ট্যাট। বাংলায় এ নিয়ে ঢিল ও পাটকেলের গল্প আছে। এবং শোনা যায়, জনৈক পলিতকেশ বৃদ্ধ একটি দামড়া কবিতা লিখে বলে গিয়েছেন - জগতের সমস্ত অন্যায়-অবিচার-ভুল-ভ্রান্তি-অসুবিধের সার্বজনীন সমাধান করার চেয়ে নিজেকে শুধরে নেওয়া ঢের সহজ। অবশ্য কবিতাটিকে বজরং দল রিবক বা নাইকির প্রাচ্য পূর্বজন্মের প্রমাণ হিসেবে প্রচার করে বলে বাজারে গুজব।

এ পর্যন্ত পড়েই যাঁরা কলকাতার জন্যে আক্ষেপের দুধে জ্বাল দিচ্ছেন সি পি এম বিরোধীতার রাবড়ি বানাবেন বলে, তাঁদের জন্যে, নদীর এপার-এর দীর্ঘশ্বাস খানিক চেপে ওপারে, এমনকি চেন্নাই গিয়ে দেখে আসার খোলা আমন্ত্রণ ও থাকবে। এয়ারপোর্ট থেকে রাজভবন যাওয়ার পথে যারা পুরো কাঁচ তুলে দিয়ে এ সি ঝলসে ধাঁ, তাদের বাদ দেওয়াই গেল। কিন্তু ফুটপাথ ধরে হেঁটে যেতে গেলেই প্রতি দশ সেকেণ্ড অন্তর নাকে অ্যাসিড ঢেলে দেওয়া কাকে বলে বোঝা যাবে। রাস্তাঘাটে ঝাঁটা চালিয়ে যেখানে যেখানে ছোটো খাটো জঞ্জালের গাদা, কিংবা যেখানে একটু কাদা জমে আছে তার পাশেই দেওয়াল ভেজানোর অধিকার স্বত:সিদ্ধ। পথের পাশে ঝাঁঝরি মানেই নির্ঘাৎ সাজানো কমোড। এই তো হালত। শহর বিদ্বেষীরা গ্রাম জিন্দাবাদ স্লোগান কপচানোর আগে আয়না দেখুন। সেখানকার ভোরবেলার-মাঠ আর বর্ষাভাসার গল্প নাহয় বাকিই রইল। "নিজের খচরামো নিজে না সারালে লেঙ্গি খাবেই" - কর্পোরেশনে নালিশ করতে গেলে এসব সরকারী ভাষ্যের নীতিবাক্য কানের বারান্দার ঝুলবে। চালুনি হয়ে জন্মালে সূঁচের ফুঁটোর শ্লীলতা বিচার করা চলবে না। এবং গেরুয়া চমকানো জনৈক নরেন দত্ত প্রদত্ত উপনিষদ ঘাঁটা স্পিরিচুয়াল আপলিফট্‌মেন্টের বাণী সমস্ত এস্ট্যাবলিশমেন্টের রিসেপশনে ফ্রেমে বাঁধাই, ঝুলবে।

ডিম ও মুরগির মধ্যে প্রাচীণত্ব নিয়ে প্রাগৈতিহাসিক তক্কাতক্কি চলছে। ডারউইন তখনো জন্মাননি বলে মানুষের ক্ষেত্রে এ সমস্যা সমাধানে টেস্টামেন্টে ঈশ্বরের হাতের প্রয়োজন ও পড়েছে। সিস্টেম ও ব্যক্তিমানুষের পারস্পরিক পুতুলনাচের ইতিকথার হিস্টিরিসিস লুপ ব্যাকগ্রাউণ্ডে সেঁটে নবারুণ ভট্টাচার্য নামের এক ফ্যাতাড়ু একের পর এক প্রবন্ধ লিখে চলেছেন - মানুষের বেঁচে থাকা, আচরণ ও চিন্তাগত প্রক্রিয়াকে কিভাবে তার পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা ডিকটেট করে তাই নিয়ে, আর সেগুলো শোনা যায় হাসির গল্প হিসেবেও বাজারে কেউ একটা পড়ে না। নইলে জানা যেত, ঘেন্না থেকেই থুতু জমে ওঠে মুখে। নিজের অবস্থানের প্রতি আত্মসমর্পন ও অসহ্য সিস্টেমের অংশ হয়ে ওঠার মধ্যে অসহায়তা শুধু নয় মিশে থাকে যথেষ্ট আত্মগ্লানিও। যাতে ঘৃণা, তাই করতে থাকার মধ্যে সভ্যতা ও শ্লীলতার সংজ্ঞার প্রতি শেষ পর্যন্ত যে প্রত্যাখ্যান মিশে আছে সে তো বিদ্রোহই।

তাহলে কথা দাঁড়াল - আম পাব্লিক আরো হারামি হতে থাকলে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কমে যায় কিনা। নগরপাল বলছেন, ভোর হলেই লোকে হাফপ্যান্ট পরে শহরের রাস্তায় বকলেসে বেঁধে কুকুরের কোষ্ঠ সাফ করতে বেরোলে আমরা কি পিছনে পিছনে বাটি হাতে ঘুরবো, যে, কখন প্রাণীটি তলপেটে চাপ অনুভব করবে? হক কথা। আইনে বেঁধে পাহারাওলা কচলে অমন সকালচারীদের ঘাড় ধরে ফাইন কামানোর টেকনিক তো মাথায় গজাল মেরে না ঢোকালে ঢুকবে না। লোকে গুজরাট কে দেখেও শেখে। হেলমেট না পরে গাড়ি চালানোয় ৫০ টাকা ফাইন জারি করে তিন মাসে বরোদার থানায় টাঁকশাল হয়ে গেল। তব্বে?
লোকে জঞ্জাল আর প্লাস্টিক ফেলে নিকাশি বন্দোবস্ত জাম করে দিচ্ছে - এতখানি অন্তর্ঘাতের সম্মুখীন হয়েও, কই, আমরা তো দেখি না শহরের হাইড্রেনগুলোর মধ্যেকার মাল প্রায় সলিড হয়ে যাওয়ার আগে সেগুলো পরিষ্কার করা হচ্ছে, এবং পরের বৃষ্টিতে ধুয়ে আবার ঐ ড্রেনে গিয়ে পড়ার আগে তাদের অন্যত্র সরানো হচ্ছে? লোকে তো বলে শহরের নিচের ড্রেনপাইপে বোল্ডার জমে গেছে। গঙ্গা কাটার ড্রেজার এনে কেটে তুলতে হবে।
বিদেশের মাটিতে পা দিয়েই নাকি বাঙালীর খচরামো রোগ পট্‌ করে সেরে যায়। "আ:! প্রভুর দেশ!" - বলে নাকি তারা এখানে সেখানে গুটখার পিক কি গয়ের ছেটায় না। এমত সাইকোপ্যাথির কলার টিউন অ্যানালাইজ করে কি দেখা হয়েছে, যে, সে দেশের চক্কাস পথঘাটের দিকে তাকালে খোদ থুতুই ড্রপ খেতে লজ্জা পাবে? বেশি কথা থাক, পথে ও প্ল্যাটফর্মে অনেক শৌচালয়ই তো বানানো হয়েছে। একটাতেও দাঁড়ানো যায়? সমস্ত দূরপাল্লার ট্রেনের ল্যাট্রিন পরিষ্কারের ফাণ্ডা কি? রেলট্র্যাকের ওপরেই কিনা?

জনতার গদ্দারির ঢাল হাতড়ে পরিচ্ছন্নতার দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারী মুরুব্বিরা আপন আপন দালালী বুঝে নিয়ে চোখ বুজিয়ে পান চিবিয়ে সাড়ে চার ঘন্টার কর্মদিবস মানাবেন - এ খোরাক মেনে নিতে তাই বেশ তেতো ঠেকে। অবশ্য নিতম্বের নিচে যতক্ষণ স্পঞ্জের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত আর পথে ঘাটে চলার জন্যে যতক্ষণ হুটার লাগানো গাড়ি, চোখের চামড়ার থিকনেস বাড়িয়ে নেওয়াটাই সবচেয়ে সুবিধের। নাচের তালে গোলমাল হলে পেয়াদা এসে হাঁকে - উঠোনের ঢাল কেন ঠিক নাই। বক্তৃতার মাঝে ফুটপাত উপছে মার্বেলের মেঝেতে নর্দমার কালো দুর্গন্ধ জল এসে ঢুকলে খোঁজ পড়ে - বাড়িটা বানিয়েছে কোন উজবুগ। স্লুইস গেট খুলে জল এসে ফুটপাত থেকে ঘুমন্ত শিশু ভাসিয়ে নিয়ে গেলে তলব পড়ে - শালারা ফুটপাতে থাকে কেন! নাজায়েজ শহর সন্তানের দল! সমাজ যাদের একটা বাসযোগ্য ছাদ, নাকি মৌলিক অধিকার, অনিবার্য শারীরিক প্রয়োজন মেটানোর ন্যূনতম ব্যক্তিগত স্পেস দিয়ে উঠতে পারেনি, তাদের চোপা চালায় - "বাঞ্চোৎ! রাস্তায় হাগিস! রাস্তায় মুতিস! বাপের জমিদারি?"