মোহিনী মিডিয়া


লিখছেন -- অমিত মজুমদার


আপনার মতামত         


শিশুকাল থেকে শুনে আসছি একপ্রকার পতঙ্গ শিকারী ফুল আছে। বিনয়ের সাথে আমরা বলতেই পারি,সত্যি কথা। এই অপরূপ মোহিনী ফুলটি, আহা, নাম তার মিডিয়া। ইমোশন রূপ পতঙ্গ, তা সে সস্তাই হোক বা তার তিন প্রকার রূপভেদই হোক, সুতোর টান অতীব নিঁখুত। পরতে পরতে সাজানো ক্রীম আর ক্যারামেল, মাঝে একটু বিরতি,- বুদ্ধিদীপ্ত অ্যালমন্ড। নেহাত গদগদ ভাব অসহ্য ঠেকলে একটু আধটু মরিচ মিশিয়ে দেওয়া - যা আমরা হামেশাই করে থাকি সঠিক অভিপ্রায় ব্যতিরেকেই। এই মিডিয়ার বহুরূপ। আমাদেরই মনন ও উৎকর্ষের খুপরি জরিপ করে তার এই দিন দুগনি রাত চৌনি শ্রীবৃদ্ধি। মৃত্যু নেই, জরা নেই। শুধু ফুলে ওঠা আছে, ফেঁপে ওঠা অমৃত বেলুন। এঁকে নমস্কার কর।

দিনান্তে দিদি কিছু বলেছেন। তা উনি বলেই থাকেন। ঢোঁড়া বলে কি সাপ নয়! ওদিকে ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন চলল সমানে রিলে রেস। যদি বয়স্ক লোকটি কিছু বলেন। গাড়ির দরজা বন্ধ না হওয়া অব্দি এই পিছু নেওয়া, প্রকারান্তরে ছেঁকে ধরা। যদি এই চরম বিরক্তিতে কোনভাবে শিকে ছিঁড়ল তো পোয়াবারো - শত্তুরের মুখে দিয়ে ছাই, আমরা খেউড় বেচে খাই! সাথে সাথে পর্দায় উত্তেজিত মুখেদের ছবি এবং বিভিন্ন আঙ্গিকে তাঁর কথার পুনরাবৃত্তি, নিজস্ব ভাষায়, রস ঘন রহস্যও ঘন। এই পর্ব বহুদিন চলেছে - কালের প্রভাবে আপাতত স্তিমিত। তবে কিনা, অষ্টোত্তর শতনামের প্রভাবে এই ফুলটির রূপ ও বদলায়, নানাবিধ। রাত্তিরবেলা জীপ নিয়ে ঘোরা, কোথায় পুলিশকর্মী ডিউটিতে বসে ঝিমুচ্ছে, মার পাঁচব্যাটারি। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আত্মগোপনের চেষ্টা দেখি, হেসে কুটিপাটি হই। নে বোঝ ঠ্যালা, কর্তব্যে গাফিলতি! সত্যি, শালারা কিরকম ফাঁকি মারে! বাইটের পর বাইট, আত্মতৃপ্তির হাসিতে ঘর ভরে যায়। আমরা অনুভব করতে পারি সততা আর কর্তব্যপরায়ণতার মুল্য কতখানি। ক্রমশ ভুলে যেতে থাকি নিজেদের অস্তিত্ব, সংযোগ সমাজের সাথে। আর তার সাথে জড়িয়ে থাকা এই শব্দলির স্থান। অতি পুরাতন একটি শব্দ ক্রমশ তার স্থান আরো পাকা করে নিতে থাকে - আত্মপ্রবঞ্চনা। অথচ শিশুকাল থেকে শুনে আসছি---------------

নাচায় পুতুল যথা দক্ষ বাজিকরে, তেমতি নাচাও তুমি অর্বাচীন নরে। বুধিয়া থেকে প্রিন্স হয়ে মৃত্যুঞ্জয়। মাঝপথে কেলিয়ে পড়ে গেলেও খেলা এখনও চলছে। ঘরে ঘরে বসে থাকা উৎকন্ঠিত চোখ নিয়ে, বাজারে হাটে আলোচনা, ওঠে কি ওঠে না। পরিশেষে অজস্র বিজ্ঞাপন পরিশোভিত হয়ে ধরতাই - উঠেছে, উঠেছে! উঠিল বিশ্বে সে কি কলরব, সে কি মা ভক্তি, সে কি মা হর্ষ। একই সাথে উঠলাম আমরাও। এতক্ষণ ধরে বাথরুম চেপে রাখা, কাপের পর কাপ চা, পকোড়া, সময়ের তুষ্টিনাশ। একি আত্মত্যাগ নয়, একি সহমর্মিতা নয়! তাহলে তোমার চোখ নেই বন্ধু, চোখ নেই। চোখ থাকলে দেখতে পেতে, প্রিন্স নয়, উঠে এল বিপণন। এ বড় সুখের সময় নয় এবং বলা বাহুল্য তার আর পর নেই। যেমন অনেকের ই জানা নেই,- স্বাভাবিকত্ব আনার চেষ্টায় ফুটপাথ থেকে তুলে এনে অভিনয় করানো এবং পরিশেষে ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পাওয়া সেই ছেলেটি এখন কোথায়। সিনেমাটির নাম ছিল ""সালাম বম্বে''।

একটি ছোট্ট বিরতির পর, সঙ্গে থাকুন।

দাদার পার্কস্ট্রীটে শপিং করতে আসা জমাট খবর, পাশাপাশি চ্যালেঞ্জার সৌরভ। প্রয়াত সোমনাথ হোড়ের গুরুতর অসুস্থতা তখনও অব্দি শুধুমাত্র ফ্ল্যাশলাইন। নানা পাটেকর, শর্মিলা ঠাকুর বিভিন্ন পূজা উদ্বোধনে এসেছেন - বিশদ বিবরণ। জন আব্রাহাম উদ্বোধন সেরে বিপাশার বাড়িতে শেষমেষ বাঙালী খাবার খেতে যেতে পারবেন কিনা - খবর চলছে। অস্বাভাবিক নয়। এঁরা শিল্পী, আমাদের মনের খোরাক যোগান। ভি জি যোগ দীর্ঘকাল যাবৎ অসুস্থ,বিনয় মজুমদার বেঁচে থেকেও নেই, আলি আকবর খান পুর্ণাঙ্গ সরোদ বাদনের ক্ষমতা বয়সোজনোচিত কারণে হরিয়েছেন - এঁরা কেউ খবর হতে পারেন নি। প্রায়শই অসুস্থ থাকা ভীমসেন যোশী ও পারেন নি। নেহাৎ মারা গেলে এঁদের কেউ কেউ হয়ত পারবেন। আমরা তুলে নেবো রিমোট, অথব ওল্টাবো পাতা, আরো উন্নত কোন এক রিমোটের অঙ্গুলিহেলনে।

বসন্তে এনেছি হাবা যুবকের হাসি। শরতে এনেছি বন্যা। বন্যা পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতির খবর আছে। মানুষের লাশ,স্রেফ লাশ হয়ে যাওয়ার খবর আছে। বন্যাদুর্গতদের ত্রাণ ও ক্ষতিপুরণের খবর আছে। ভাসমান যুবা আছে। চলমান ছবি আছে। শুধু প্রশ্ন নেই। কোনো প্রশ্ন নেই কোনোখানে। গ্রামের কথা না তোলাই ভালো - ওরা আবার মানুষ ছিল কবে! কিন্তু খোদ কোলকাতাই বা বারবার ভাসে কেন! চাপান উতোর ব্যতিরেকে আজও কোন পন্থা বের হয়ে আসে না কেন, যা হেডলাইন হয়ে সতেজ হয়ে থাকবে! হায়, নিম্নচাপ সরে গেছে, হেডলাইনও সরে গেছে, যাবে। পরবর্তী বন্যার অপেক্ষায় পরিসংখ্যান, শুধু পরিসংখ্যান হয়ে থেকে যাবে।

আমরা তো খবর হতে চাই না। অমাদের দু:খ, প্রত্যাশা ও প্রপ্তির ফারাক, ক্ষোভ ও তার ফেটে না পড়া - এদের ও খবর হওয়ার কোন প্রয়োজন দেখিনা। এদের পিছনের ধামা চাপা দেওয়া কথাগুলো বেরিয়ে এসে মুখ দেখাক। আঘাত পড়ুক, বারবার। বৃথা আশা, তবু ততদিন আমরাও দম ধরে থাকি - বন্যায়, খরায়, দাঙ্গা পরিস্থিতিতে,ঘিরে থাকা রাজনীতির আবর্তে,- মাথা তুলবো বলে, শেষ হয়ে যাওয়ার কিছুটা আগে।