L§VLQ¡9 5


শয়রর


আপনার মতামত         


          ধরুন আর মারুন


রক ভিজে গেছে বলে চায়ের দোকানে বর্ষার দিনে গুলতানি করছেন? পাড়ার মোড়ে হেজিয়ে হেজিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন? পাশের বাড়ির মেয়ের স্কার্টের দৈর্ঘ্য নিয়ে আলোচনায় অরুচি এসে গেছে? জীবনে উত্তেজনার নতুনতর খোরাক খুঁজছেন? হাতে প্রচুর সময়, কিন্তু তা দিয়ে কি করবেন জানা নেই? কিচ্ছু ঘাবড়াবেননা। ফোকটে দেশসেবা করার মোক্ষম সুযোগ এখন আপনার সামনে। দুনিয়াময় চতুর্দিকে এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে ভাইরাস,ব্যাকটেরিয়া, ম্যালেরিয়ার মশা, প্লেগের ইঁদুর, আর গুচ্ছের সন্ত্রাসবাদী। ছারপোকা টিপে মারার দক্ষতায় ধরুন আর মারুন। সময়ও কাটবে সন্ত্রাসবাদও ঢিট হবে আর দেশসেবক হিসাবে আপনার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে পৃথিবীর ইতিহাসে। কিকরে করবেন? খুব সোজা। পড়ে নিন, সন্ত্রাসবাদী দমনের তিনটি সহজ উপায়:

এক) দলবল জুটিয়ে চৌরাস্তার মোড়ে গিয়ে চারদিকে ভালো করে তাকান। যে অগুন্তি লোক সামনে-পিছন ডাইনে-বাঁয়ে, তার মধ্যে গোটা দশেক সন্ত্রাসবাদী অবশ্যই আছে। শুধু খড়ের গাদা থেকে বেছে বেছে তুলে নেবার অপেক্ষা। চক্ষু মুদে স্মরণ করুন বাংলা রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনীর শেষ্ঠ স্রষ্টা জটায়ুকে। চিন্তা করুন জেমস বন্ডকে। ডাকতে থাকুন লোকনাথ বাবাকে। চিন্তাশক্তিকে স্বপনকুমারের মতো প্রসারিত করুন। এবার চোখ খুলে সামনেই যে ব্যাটাকে দেখে সন্দেহ হবে, সেই সন্ত্রাসবাদী। নি:সন্দেহে। তবে হ্যাঁ, নি:সন্দেহ হবার আগে জাস্ট মিলিয়ে নিন, যে, ব্যাটার উস্কোখুস্কো চুলদাড়ি আর ময়লা জামাকাপড় আছে তো? আর বাই এনি চান্স গায়ের চামড়া সাদা নয় তো?

দুই) এবার পিছন থেকে ব্যাটাকে "এই শালা থাম থাম' বলে আওয়াজ দিন। তারপর "থামবি? নইলে কিন্তু টেংরি খুলে নেব রে বাঞ্চোৎ' বলে হেভি থ্রেট করুন। মনে রাখবেন, মিনমিন করে ডাকলে হবেনা, গলায় যেন বাজখাঁই রকমের জোর থাকে। যদি আপনার হুঙ্কার শুনে মাল থেমে যায় তো এতো পরিশ্রম জলে গেল। যদি ভয় পেয়ে দৌড়তে থাকে, শিওর জানবেন ঐটা সন্ত্রাসবাদী ই।

তিন) এবার পিছন থেকে দলবল নিয়ে তাড়া করুন। তারপর খপ করে ধরে ফেলে শুরু করুন জনতার বিচার। কি করবেন সে আপনাদের হাতে। পুলিশে দিতে পারেন, ন্যাংটো করে ওঠবোস করাতে পারেন, মোটর সাইকেলের চাকায় হাত পা ঢুকিয়ে একটা একটা করে মড়মড় করে ভেঙে দিতে পারেন, অথবা এতো ঝকমারিতে না গিয়ে স্রেফ খুলিটা ফাটিয়ে দিতে পারেন।

যাই করুন না কেন, মাল যেন পালাতে না পারে। তাহলেই জগতের ইতিহাসে আপনার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা হবে, আর পরকালে হবে অক্ষয় স্বর্গবাস।




          মেধাসত্ত্ব



বুদ্ধিজীবীদের সামনেও ইতিহাসের খেরোর খাতায় নাম ওঠানোর অব্যর্থ সুযোগ এই একই ধাক্কায়। রাস্তার মোড়ে "হইলেও হইতে পারে' ঘটিচোরকে খুঁটিতে বেঁধে প্রতিবাদী জনতা উত্তাল পিটছে, রাস্তার ধারের ইটপাটকেল গুলোর সদ্ব্যবহার হচ্ছে পোটেনশিয়াল চোরের দুচারটে পাঁজরা আর নাক-চোখ ভেঙে বা গেলে দেবার কাজে, তারপর দিনের শেষে বেনামী লাশ পড়ে থাকছে খুঁটির গায়ে ন্যাংটো হয়ে, তার রক্তের উপর ভনভন করছে মাছি, আর প্রতিবাদী বীর যুবক গায়ে পারফিউম লাগিয়ে বৌ-বাচ্চা বগলে বান্টি আউর বাবলি দেখতে যাচ্ছেন নাইট শোতে, এই জিনিস অ্যাদ্দিন যে শৌখীন বুদ্ধিমানদের হজম হচ্ছিল না, স্রেফ সন্দেহের বশেই হত্যাকে যারা "সভ্যতাবিরোধী' আখ্যা দিয়ে চিল্লামিল্লি করতে অভ্যস্ত ছিলেন, লন্ডন কান্ডের পর তাঁদের অযথা ন্যাকাপনা বন্ধ হবে আশা করা যায়। সন্দেহ হলেই মেরে ফেলো, পরে আলতো করে সরি বলে, রক্তের গন্ধ ডিওডোর‌্যান্টে ঢেকে ফেলে বান্ধবীকে নিয়ে সোজা চলে যাও ডিনার পার্টি,এই এখন আন্তর্জাতিক বিধিলিপি। চোখের নিচে গুচ্ছের হাইটেক কাজল থেবড়ে টিভির সামনে গভীর শোকপ্রকাশ করবেন দুনিয়ার স্বঘোষিত মোড়লরা, শেষে আস্তে করে যোগ করবেন "প্রয়োজনে এরকম আরও হবে' এবং অনুষ্ঠান শেষে মেক আপ তুলে সিধে চলে যাবেন গ্রীষ্মাবকাশে, সভ্য জগতের এই নব্য টেস্টামেন্টের সঙ্গে ক্রমে ক্রমে সক্কলকেই মানিয়ে নিতে হবে।

তবু যাদের একটু কিন্তু কিন্তু লাগবে, যে সমস্ত অতিসক্রিয় বুদ্ধিমানেরা কোনো একটা বিষয়ে চিল্লামিল্লি না করতে পারলে রাতে ঘুমোতে পারেননা, তাঁদের প্রতিবাদের জন্য একটা অন্য অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া যেতে পারে। মানবাধিকারটারের বাজে বস্তাপচা রিডান্ড্যান্ট বুলিটুলি ছেড়ে এই গ্যাটোত্তর যুগে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইট্‌স নিয়ে একটু ঠান্ডা হয়ে চিন্তাভাবনা করুন দিকি। আমাদের দেশের আদি ও অকৃত্রিম গণপিটুনির ধারণাকে স্রেফ বিনা রয়্যালটিতে গাপ করে দেবে বিলেত আমেরিকা? কোনো প্রতিবাদ হবেনা? চেঁচাতে হলে এই নিয়ে চেঁচান, প্রতিবাদ করতে হলে এনিয়ে লিখে ফাটান, আন্দোলনে সাফল্য এলে পেটেন্ট বাবদ দেশেরও দুপয়সা আসবে, আর আপনার নামও ইতিহাসে উঠে যাবে পট করে।