মানুষ হিশেবে আমার অপরাধসমূহ - হুমায়ুন আজাদ


লিখছেন তারেক


আপনার মতামত         


বইয়ের প্রচ্ছদে "হিশেব'- বানান এভাবেই দেয়া আছে। লেখকের নাম যখন হুমায়ুন আজাদ, এ বানান তখন আর অবাক করেনা আমাকে। হুমায়ুন আহমেদ আর হুমায়ুন আজাদ দু'জন ভিন্ন মানুষ। প্রথমবার নাম শুনে অনেকেই দু'জনকে গুলিয়ে ফেলেন, সে জন্যেই এটা বললাম।

আমার পড়া হুমায়ুন আজাদের প্রথম বই - "সব কিছু ভেঙ্গে পড়ে'। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে লেখা বই। সব রকম সম্পর্ক। বাবা-মা'র সাথে, ভাই বা বোনের সাথে, স্বামী-স্ত্রী বা পুত্র-কন্যাদের সাথে। সে বইয়ের মূল চরিত্রে ছিলেন একজন প্রকৌশলী, যিনি সড়ক বানান, আর ব্রীজ। মানে সেতু। ব্রীজ বানাতে বানাতে একসময় মানুষের সম্পর্কগুলোকেও তিনি ব্রীজ বলে ভাবা শুরু করেন। একসময় দেখা যায়, এ সম্পর্কগুলো তার বানানো ব্রীজগুলোর মতই কী অসহায়ভাবে ভেঙ্গে পড়ছে! বই পড়ে যে কখোনো যন্ত্রনা পাওয়া যায়, হুমায়ুন আজাদের বই পড়ার আগে আমার এই ধারনাই ছিলো না। অসম্ভব যন্ত্রনা দেয় তাঁর বই,অথবা বলা ভাল- পীড়া দেয়। নিজেকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়। চারপাশের সোজা সরল জগতের ধারনা এক লহমায় উড়িয়ে দিয়ে তিনি যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখান, কেমন করে আমাদের চারপাশের সব কিছু ভেঙ্গে পড়ছে।

মানুষ হিসেবে আমার অপরাধসমূহ- স্বীকারোক্তিমূলক বই। তাঁর প্রায় সব বইয়ের চরিত্ররাই নিজের সাথে নিজে প্রচুর কথা বলে, নিজেকে হাসায়, নিজেকে
বুঝায়। নিজেকে অভিশাপ দেয়। এই বইয়েও তিনি একজন মানুষকে দিয়ে তাঁর অপরাধের স্বীকারোক্তি করিয়েছেন। খানিকটা অবাক হয়েছি যখন দেখলাম "অপরাধী' হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন একজন আপাত:স্‌ৎ সরকারী আমলা-কে। আমাদের দেশের সরকারী বড় আমলাদের অসততা কিংবদন্তীতূল্য, কিন্তু তাঁর গল্পের নায়ক, যার নাম আনিস, একজন স্‌ৎ সরকারী আমলা। পুরো বইটা আনিসের মুখ দিয়ে বলানো নিজের গল্প। তার অপরাধ ও অপরাধবোধের বর্ণনা। হুমায়ুন আজাদের বর্ণনাভঙ্গি একান্তই তাঁর নিজস্ব। অন্য কারো সাথে মেলে না তা। বইয়ের শুরুতে আনিসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেলোয়ার ও তার বউ ডলি-র কথা আছে। "" বিয়ের ম্‌ঞ্চে দেলোয়ারের বউকে দেখে আমি একটু কেঁপে উঠি,সামান্য একটু কাঁপন;- আমার চোখ তার বউয়ের চিবুকের ওপর গিয়ে পড়েছিল, একটি কাঁধের ওপর গিয়ে পড়েছিল; তা আমাকে কম্পিত করে, কিছুটা ঈর্ষারও জন্ম দেয়; এবং আমি ভয় পাই।'' দেলোয়ার ও ডলি একদিন আনিসকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়। ফেরিঘাটের কাছে আসতেই আনিস নেমে পড়ে গাড়ি থেকে, কারন, "" একসময় আমার মনে হয় গাড়ি সুগন্ধে নয়, মাংসের গন্ধে ভরে উঠছে, সোনালি মাংসের ভেতর থেকে গন্ধ উঠে আসছে; তখন গাড়ি থেকে বেরিয়ে লাফিয়ে পড়তে আমার ইচ্ছে হয়।'' আনিস নেমে যাবার পর ডলিকেও নেমে যেতে বলে দেলোয়ার, এবং ডলি নেমে যাবার পর ফেরিতে গাড়ি ওঠানোর সময় পেছন থেকে ট্রাকের ধাক্কায় পানিতে পড়ে যায় দেলোয়ারের গাড়ি। দেলোয়ার মারা যায়। মূলত এখান থেকেই আনিসের অপরাধবোধের শুরু।

কিংবা হয়ত এখান থেকে নয়। আরো আগে দেলোয়ার যেবার আনিসকে নিয়ে ব্রোথেলে গিয়েছিল, দু'জন দু'দিকে চলে যাবার পর, খানিক সময় কাটিয়ে আবার ওরা একসাথে হলে, দেলোয়ার জিজ্ঞেস করেছিল আনিস কিছু ""করেছে কি-না?'' আনিস করেছিল। কিন্তু দেলোয়র জানাল সে কিছু করে নি, সে শুধু দেখতে এসেছিল, করতে নয়। তখনো আনিসের ভীষন অপরাধবোধ হয়েছিল। "" নিজেকে আমার খুব খারাপ মনে হয়। আমার আর ভালোদের সাথে মেশা ঠিক হবে না। যে মেয়েটিকে দেখে আমি কেঁপে উঠি, যাকে আমার খুব ভাল মনে হয়, তার দিকে আমি আর তাকাবো না। সে তার মামার সাথে বেবিতে যাক, তার দুলাভাইয়ের সাথে বেবিতে যাক, আমি আর কষ্ট পাবো না। - - - দেলোয়ারকে দেখলেই, তারপর, আমার মনে অপরাধবোধ জেগে উঠতো। - - আমি অনেক কিছুই ছোঁয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম; ফুল, আমার কাছে পবিত্র মনে হতো, তাই আমি আর কোন ফুল ছুঁইনি; আমার ভয় হতো ছুঁলেই পবিত্র
ফুলটি অপবিত্র হয়ে যাবে।''

দেলোয়ার মৃত্যু আনিসকে এই অপরাধবোধ থেকে মুক্তি দিয়েছিল। আর এই মুক্তি তাকে নতুন অপরাধবোধে জড়িয়ে নিয়েছিল।

দেলোয়ারের বাবা-মা আনিসকে জিজ্ঞেস করে কেন দেলোয়ারকে গাড়িতে রেখে ওরা দু'জন নেমে গিয়েছিল। ওরা কি জানত দেলোয়ার পানিতে পড়ে যাবে? আনিস বলেছিল ও লজ্জিত নেমে যাবার জন্যে। কিন্তু তার আসলে লজ্জা পাবার কোন কারন ছিল না। যদিও দেলোয়ার বাবা- মা ওদের দু'জনকে সন্দেহ করেছিলেন। ডলির বাবা-মা আনিসকে দেখেন ডলির ত্রাণকর্তা হিসেবে। এবং একসময় আনিস আর ডলির বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের পরেও আনিস দেলোয়ারের কথা মনে করে শুধু। প্রতি মূহুর্তে ওর মনে হতে থাকে, ডলি যেন দেলোয়ারেরই বউ, ওর নিজের নয়। এদিকে ডলি সন্তান নিতে চায়, কিন্তু আনিস চায় না। "" হয়তো আমি মানুষ নই, মানুষ হলে মানুষ জন্ম দিতে হয়; কিন্তু আমি সত্যিই বুঝে উঠতে পারি না মানুষ জন্ম দিয়ে কী সুখ? - - - মানুষকে কি আমি ঘেন্না করি? কখনো ভেবে দেখি নি। মানুষ প্রজাতিটি টিকিয়ে রাখার একটা দায়িত্ব আছে আমার? রক্তে আমি তেমন কোন সংকেত পাই নি। ডলি হয়তো পাচ্ছে। প্রকৃতি আর সভ্যতা হয়তো তার রক্তে বেজে চলছে, তাকে নির্দেশ দিয়ে চলছে মানুষ বানানোর। - - - আমার ইচ্ছে করে না। মানুষ তৈরি করার কথা ভেবে আমি কোন সুখ পাই না।''

একসময় ডলি ছেড়ে যায় আনিসকে। আনিস আরো গভীরভাবে নিজের জীবন কাটাতে থাকে। তার একসময়কার বন্ধু,স্কুলে পরীক্ষায় খারাপ করা বন্ধু, ওর থেকে সব কিছুতে যে পিছিয়ে থাকতো, যার সাথে তার একমাত্র স্মৃতি হলো কোন এক বস্তিতে দেয়ালের ফুটো দিয়ে মেয়েদের গোসলের দৃশ্য দেখা, সে বন্ধু নানা কাজের আব্দার নিয়ে আসে তার কাছে, বিনিময়ে অনেক টাকর লোভ। আনিস সেই বন্ধুকে নিরাশ করে। না, কোন অপরাধবোধ থেকে নয়, অথবা তার সততা প্রমাণের জন্যে নয়। শুধুমাত্র নিজের ইচ্ছের বশবর্তী হয়েই। কিন্তু এদিকে সে অন্য অনেক আমলার, বিশেষত তার চেয়ে সিনিয়র অনেকের অনেক অন্যায় আব্দার মেনে নিতে বাধ্য হয়। অনেকের স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করে। কিন্তু কোথাও সে শান্তি খুঁজে পায় না। জীবনের প্রতিটি কাজে সে অপরাধবোধ করতে থাকে। আনিসের বয়স বেড়ে চলে। তার বয়স যখন চুয়ান্ন, তখন সে তার বাড়ির কাজের লোকের বালিকা মেয়েটিকে মুগ্‌ধ করে নিজের স্বভাব দিয়ে। সেই মুগ্‌ধ বালিকা নিজের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নিজের সব কিছু আনিসের কাছে সমর্পন করে। সেটুকু গ্রহন করে আনিস, কোন এক সময় তার মনে হয়, হয়ত এটুকুর জন্যেই জীবন কাটিয়ে দেয়া, হয়ত এটুকুর জন্যেই এত অপেক্ষা। কিন্তু পরমূহুর্তেই সে প্রচন্ড অপরাধবোধ করে।

স্বগত সংলাপের মতন এ বইটি শেষ হয় এভাবে:
" --- অফিসে গিয়ে আমি এক পেয়ালা কফি খাই, কফিটা খেতে আমার অনেক সময় লাগে, সময় লাগাতে আমার ভাল লাগে, কাউকে ঘরে ঢুকতে নিষেধ করে দেই, কোন টেলিফোন ধরি না। আমি পদত্যাগপত্র লিখি, মাত্র একটি বাক্য; সহকারীর হাতে দিয়ে বেরিয়ে পড়ি। বাইরে এসে রিকশা নিই, রিকশাঅলা জানতে চায় কোথায় যাব, আমি শুধু বলি, "চালাও'। আমার ইচ্ছে করে শহর ছেড়ে যেতে, এখনই ছেড়ে যেতে, আর না ফিরতে। শহরকে আমার অচেনা মনে হয়, চিনতে ইচ্ছে করে না। রিকশাঅলাকে আমি শহরের বাইরে যেতে বলি, সে একটি খেতের পাশে এসে জানতে চায় আমি নামবো কি না। আমার ভালো লাগে, আমার নামতে ইচ্ছে করে, আমি নামি, হাঁটতে থাকি, হেঁটে হেঁতে অনেক দূর যেতে ইচ্ছে করে, অনেক দূরে, আমি হাঁটতে থাকি; আমি হাঁটি,আমি হাঁটতে থাকি, শহর ছেড়ে অনেক দূরে যেতে থাকি, আমি হাঁটতে থাকি। '

বইটি পড়তে পড়তে অনেকবার থামতে হয়েছে আমাকে। একটানা পড়তে পারি নি কখনই। একটানা পড়ে যাবার যন্ত্রণাটুকু সবসময় আমার জন্যে সহনশীল ছিল না আসলে। এ জন্যে খানিক পর পর নিজেকে বিশ্রাম দিয়েছি। সেই বিশ্রামের কথা লেখক জানতেন কি না, অথবা ভেবেছিলেন কিনা জানি না, কিন্তু, ঐ সময়টুকুই আসলে পাঠককে নিজের অপরাধগুলোকে ভেবে দেখার সুযোগ করে দেয়। মানুষ "হিশেবে' নিজের অপরাধগুলোর মুখোমুখি করে দেয়, বড় প্রচন্ডভাবে।
----------------------------*------------------------------------------------------

হুমায়ুন আজাদকে নিয়ে আরো কিছু কথা বলার ছিল।
একাধারে কবি, সমালোচক, প্রাবন্ধিক ও ভাষাবিজ্ঞানী ছিলেন তিনি। তাঁকে সবসময় প্রথাবিরোধী ও বহুমাত্রিক লেখক বলা হতো। প্রথম কথাটির সাথে অনেকাংশে আর দ্বিতীয় কথাটির সাথে পুরোপুরি একমত আমি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। আলটপকা মন্তব্যের জন্যে বিখ্যাত ছিলেন তিনি। সমসাময়িক অনেক কবি-লেখকদের প্রতি তার অবজ্ঞা ছিল, এবং সেসব প্রকাশও করে ফেলতেন নির্দ্বিধায়। হুমায়ুন আহমেদকে "অপন্যাস' লেখক বলা ছাড়াও এই মূহুর্তে আরেকটা কথা মনে করতে পারছি, সায়েন্স ফিকশনগুলোকে "লেখা' বলেই গণ্য করতেন না তিনি। বলতেন, ওসব হলো
বৈজ্ঞানিক ভুতের গল্প!

জীবদ্দশায় অনেকের অপ্রিয় ছিলেন। আমার অবশ্য মনে হয়, অপ্রিয় হওয়াটাকে তিনি উপভোগ করতেন। তাঁর অনেক মন্তব্য বা মতের সাথে একমত হতে পারি নি অনেক সময়, অনেক কথাকেই ভুল মনে হয়েছে, কিছু কিছু ব্যাপারকে মনে হয়েছে বাড়াবাড়ি, কিন্তু কোন কিছুই তাঁর অসাধারন সব লেখা থেকে মন ওঠাতে পারে নি। লেখার ধাঁচে তিনি সত্যিই প্রথাবিরোধী আর বহুমাত্রিক। আমার ইচ্ছে ছিল এই বইয়ের আলোচনায় যত বেশি সম্ভব কোটেশন তুলে দেব বই থেকে, কিন্তু তাহলে এই আলোচনা আদৌ শেষ করতে পারতাম কি না সে ব্যাপারে সন্দেহ হওয়ায় বিরত থেকেছি। কিন্তু , ওঁর লেখার স্টাইলের সাথে সবাইকে পরিচিত করতে না পারার দু:খটা রয়েই গেল। এরকম করে আর কেউ লিখেন নি কোনদিন। এরকম এক শব্দের পরে আরেক শব্দ, সেই শব্দ থেকে বহু বাক্যের বের হয়ে আসা, তারপর সেই বাক্যরা আবার নীড়ে ফেরার মত করে আগের শব্দে ফিরে আসা, এমনটা আর কেউ করেন নি কখনো।

কিশোরদের জন্যেও লিখেছেন তিনি। আমার কাছে সবচেয়ে ভাল লাগে তার গ্রন্থের নামকরন। কবিতার বইগুলোর নাম এরকম, অলৌকিক ইস্টিমার,
সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে, যতই গভীরে যাই মধু যতই ওপরে যাই নীল,কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু। শিশুকিশোরদের জন্যে লিখেছেন: লাল নীল দীপাবলী বা বাংলা সাহিত্যের জীবনী, বুকপকেটে জোনাকিপোকা, আমাদের শহরে একদল দেবদূত। উপন্যাসের নামকরনেও স্বাতন্ত্র ছিল, সব কিছু ভেঙ্গে পড়ে; শুভব্রত, তার সম্পর্কিত সুসমাচার; কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ, নিজের সঙ্গে নিজের জীবনের মধু, অথবা ফালি ফালি করে কাটা চাঁদ। সিমোন দ্য বোভোয়ার-এর দ্য সেকেন্ড সেক্স এর অনুবাদও করেছিলেন দ্বিতীয় লিঙ্গ নাম দিয়ে।

বলা হয়ে থাকে তাঁর সবশেষ উপন্যাসটি ( পাক সার জমিন সাদ বাদ)- বের হবার পরে, মৌলবাদীরা খুব বেশি ক্ষেপে গিয়েছিল। ২০০৪ এর ফেব্রুয়ারির কোন এক সন্ধ্যায় বইমেলা থেকে ফিরবার পথে তারা হুমায়ুন আজাদকে আক্রমন করে। বেশ কিছুদিন হাসপাতালের ইন্টেন্সিভ কেয়ারে থাকার পরে তিনি বেঁচে ওঠেন। (ইচ্ছে করে সুস্থ্য কথাটা ব্যবহার করি নি। ) তার কিছুদিন পরেই জার্মানীর ঙউগ সোসাইটির আমন্ত্রনে মিউনিখ যান। পাঁচদিন পর নিজের কক্ষে তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

তাঁকে আক্রমনকারী সন্ত্রাসীরা ধরা পড়েছিল কি-না, বা শাস্তি পেয়েছিল কি না মনে করতে পারছি না।