এই আমাদের কোলাকুলি, লেখালিখি, ফেলে চুমু আর গোঁজামিল। পড়ুনঃ হোক্কলরব - ম্যাডক্স ও লাবণি নিয়ে যে দু চারকথা আমি জানি

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--3


           বিষয় : শঙ্খনীল কারাগার
          বিভাগ : বই
          বিষয়টি শুরু করেছেন : indo
          IP Address : 194.150.177.9          Date:04 Jan 2006 -- 05:56 PM




Name:  indo           Mail:             Country:  

IP Address : 194.150.177.9          Date:04 Jan 2006 -- 06:12 PM

শঙ্খনীল কারগার
------------------------------


বাংলাদেশের বইপত্তর নিয়ে লেখালিখি পড়বার সাধ অনেকদিনের। সূর্যদীঘল বাড়ি, খোয়াবনামা তুললামও, তারেক যদি কিছু লেখে, এই ভেবে। তো তারেক কিছুই লেখেনি, নাকি হাতের কাছে বইপত্তর নেই। আমারো ঐ একই সমস্যা। কৃষ্ণকলি আবার অনুযোগ করল। সত্যি কথাই। কিন্তু কি করবো ; আমি তো ভেবেছিলাম অন্যে লিখবে।
ওপাড়ার লেখকদের মধ্যে প্রথম পড়ি হাসান আজিজুল হককে। তারপরে হুমায়ূন আহমেদ। আমি জানি না,হুমায়ূন আহমেদ সম্বন্ধে বাংলাদেশী অথবা এদেশী এলিটদের কি প্রতিক্রিয়া। জনপ্রিয় ও শস্তা এইরকম কোনো সমীকরণের একটা ব্যাপার আছে বোধ হয় কোথাও, ঠিক জানিনা। এত কম জেনে বুক রিভিউ করা কি উচিৎ, এই ভেবে কিছু লিখিনি,যদিও এদেশে এসে নানান লাইব্রেরী থেকে কুড়িয়ে কাছিয়ে বেশ কয়েকটা হুমায়ূন আহমেদ যোগাড় করে ফেলেছি; কিছু পড়া হয়ে গেছে, কয়েকটা এখনো বাকি।
শেষ পড়লাম এই বইটা,শঙ্খনীল কারাগার। নন্দিত নরকে-র সমসাময়িক। ভূমিকায় লেখক লিখেছেন:

সোমেন চন্দের লেখা অসাধারণ ছোট গল্প 'ইঁদুর' পড়ার পরই নিম্ন মধ্যবিত্তদের নিয়ে গল্প লেখার একটা সুতীব্র ইচ্ছা হয়। 'নন্দিত নরকে', 'শঙ্খনীল কারাগার' ও 'মনসুবিজন' নামে তিনটি আলাদা গল্প প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লিখে ফেলি।

প্রায় আগাগোড়া উত্তম পুরুষে লেখা এই বইয়ে এক নিন্ম মধ্যবিত্ত বাঙ্গালী পরিবারের বড়ভাই খোকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। এ গল্পের কথক সে-ই। সংসারের বড় মেয়ে রাবেয়া খোকার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়। নীচে যমজ বোন রুনু-ঝুনু, ছোট ভাই মন্টু। মা-র আবার বাচ্চা হবে। অল্প মাইনের চাকরি করা ভীতুমত বাবা একটু কেমন অসহায়।
খোকার লজ্জা করে, মা-র কি হয়েছে, কি অসুখ-কেউ জিগ্গেশ করলে সহজে উত্তর দেওয়া যায় না। মা-র ভালোবাসা না পাওয়ার চাপা কষ্টে খোকার তেষ্টা পায়। 'সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে মা আমাদের গরিব ঘরে এসেছেন বলেই তাঁর অসামান্য রূপের কিছু কিছু আমরা পেয়েছি। তাঁর আশৈশব লালিত রুচির কিছুটা (ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ হলেও) সঞ্চারিত হয়েছে আমাদের মধ্যে। শুধু যার জন্য তৃষিত হয়ে অছি সেই ভালোবাসা পাইনি কেউ। রাবেয়ার প্রতি একটি গাঢ় মমতা ছাড়া আমাদের কারো প্রতি তাঁর কোন আকর্ষণ নেই। মার অনাদর খুব অল্প বয়সে টের পাওয়া যায়, জেমন আমি পেয়েছিলাম। রুনু-ঝুনুও নিশ্চয়ই পেয়েছে। অথচ আমরা সবাই মিলে মাকে কি ভালো-ই না বাসি।
এমন এক সাদামাটা পরিবারের সাদামাটা গল্প। মানুষের জন্ম হয়,ভালবাসা ও বিচ্ছেদ। মৃত্যু। কোনো বীর থাকে না,অন্তত: দেখে তো তাই মনে হয়, ভাঙ্গাচোরা গলিপথে তবুও বৃষ্টি শেষ হলে কাঠালিচাঁপার গন্ধ ভেসে আসে। যেমন আমাদের ছোট বেলায় আসতো।
এই কিম্ভুত পৃথিবীর কিমাকার ডায়নামো, গলিত ও ফাজিল আয়না এ বেঁচে থাকার হদিশ পায় নি কেমন করে যেন। যেন মৌল অনুভবগুলি এখনো কোথাও সব কলুষ বাঁচিয়ে টিকে আছে , শেষ ডাইনোসরদের মত। স্বপ্নে যেমন হয়, তীব্র সুখ, তীব্র বিষাদ। সন্ধ্যানদীর তীরে বিষণ্নতা আর ভালোবাসা আঙ্গুল ছুঁয়ে বসে থাকে, যখন একটা একটা করে তারা ফুটে উঠবে পুরনো পৃথিবীর ফুরিয়ে আসা আকাশের বুকে। যে আকাশ একান্তই বাংলাদেশের।
বাংলাদেশের সরল জলের মত ভাষা হুমায়ূন আহমেদের , যাঁরা পড়েছেন, জানেন। যে জল কারো কোনো ব্যথা বোঝে না বলে তার কাছে আসতে হয় নিবিড়ের সজলতা ছেড়ে আর বড় বেশী ব্যথা দেয় বলেই একদিন চুপচাপ ছেড়ে যেতে হয় দিনের-রাতের জলভার।
'ছোট খালা একদিন মাকে জিজ্ঞেশ করেছিল'-রাবেয়া আপা লিখছে, 'শিরিন, তুমি তোমার ছেলেমেয়েদের একটুও দেখতে পার না।
মা জবাবে হেসে বলেছেন, এমন করে তৈরী করে দিচ্ছি যাতে ভালোবাসার অভাবে কখনো কষ্ট না পায়।'
আমি রাবেয়া আপাকে দেখতে পাই। সুবর্ণা মুস্তাফার মুখ। চোখদুটো একটু ফোলা ফোলা, ভরাট গাল, রংটা কি একটু চাপার দিকে? আমার খুব ইচ্ছে করে , বলি-আপা, আপনাকে একটা কাঠালিচাঁপা ফুল এনে দিই? আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে আপা, আপনি আমার বাংলাদেশ। মেঘে ঢাকা তারার নীতা। পথের পাঁচালির দুর্গা-সর্বজয়া-হরিহর। অপর্ণা মরে গেলে পরে ছন্নছাড়া অপু। আপনি আমার বৃষ্টিভেজা বাংলাভাষা। যেখানে বাংলাদেশের মন, ঘুমলো মা-হারা ভাইবোন। যেখানে হাওয়ায় হাওয়ায় ডাকে মাধব মালঞ্চী কইন্যাকে।

জীবন তো এই রকম। মৃত্যু আর বিচ্ছেদের একগাদা ফুটো, সুখের কয়েকফালি রঙ্গীন, পলকা মাকড়সা-সুতো দিয়ে জোড়া লাগানো, যার ওপরে রোদ পড়লে ঝলমল করে। যে বাংলাদেশী মেয়েটি আমাকে প্রথম হুমায়ূন আহমেদের বই উপহার দেয়, সে মাত্র অঠারো-উনিশ বছর কি তারও কম বয়েস থেকে নিরাময়হীন রোগে ভুগছে। পুরুষের ভালোবাসা পাবার জন্য কি যে কাতর ছিল সে !

এরকম হয়। আমাদের সব বৌদ্ধিক কসরৎ, ছায়াবাজি ও ওস্তাদির শেষে সন্ধ্যা নামলে আদিগন্ত মাতলা নদীটি পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় আসন্নপ্রসবা নারীর মত শ্লথ, উদাস শুয়ে থাকে। আমাদের বেঁচে থাকার লঞ্চ ফিরে আসছে সুন্দরবন থেকে। আমি কল্পনা করি থমথমে জ্যোৎস্নায় লঞ্চের ছাদে গীটারে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজাচ্ছে কেউ,তার মুখটা অন্ধকারে দেখা যায় না । প্রভু আমার প্রিয় আমার পরমধন হে।

'কোনো কোনো রাতে অপূর্ব জোছনা হয়। সারা ঘর নরম আলোয় ভাসতে থাকে। ভাবি, একা একা বেড়ালে বেশ হত। আবার চাদর মুড়ি দিয়ে নিজেকে গুটিয়ে ফেলি। যেন বাইরের উথালপাথাল চাঁদের আলোর সঙ্গে আমার কোনো যোগ নেই।

মাঝে মাঝে বৃষ্টি নামে। একঘেয়ে কান্নার সুরের মত সে শব্দ।
আমি কান পেতে শুনি। বাতাসে জামগাছের পাতার সর সর শব্দ হয়। সব মিলিয়ে হৃদয় হা হা করে ওঠে। আদিগন্ত বিস্তৃত শূন্যতায় কি বিপুল বিষণ্নতাই না অনুভব করি। জানলর ওপাশের অন্ধকার থেকে আমার সঙ্গীরা আমায় ডাকে। একদিন যাদের সঙ্গ পেয়ে আজ নি:সঙ্গতায় ডুবছি।'




Name:  tareq           Mail:             Country:  

IP Address : 211.28.40.185          Date:19 Jan 2006 -- 02:54 PM

হুমায়ুন আহমেদের লেখার আসল বৈশিষ্ঠ্য তার অদ্ভুত সারল্যমাখা ভাষা। যেন কেউ গোল হয়ে বসা একদল শ্রোতাকে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে গল্প শোনাচ্ছে।
মানুষের মনের জটিল সব অনুভূতিকে এত সহজ কথায় প্রকাশের ক্ষমতা খুব বেশি লেখকের নেই।

অবশ্য এই ভাষার জন্যেই তাকে সমালোচনাও শুনতে হয়েছে অনেক। আমারই আরেকজন প্রিয় লেখক মন্তব্য করেছিলেন, " হুমায়ুন আহমেদ উপন্যাস লেখেন না, অপন্যাস লেখেন।'

অবশ্য, কবে আর কোন পাঠক সমালোচকদের মন্তব্যে মাথা ঘামিয়েছে! তারা নিজেদের মত করেই লেখকদের ভালোবেসে যায়, যেমন করে হুমায়ুন আহমেদও সবার আপন হয়ে গেছেন।



Name:  tareq           Mail:             Country:  

IP Address : 211.28.40.185          Date:19 Jan 2006 -- 02:55 PM

ওহ, বলতে ভুলে গেছি। মন্তব্যকারী লেখকের নাম হুমায়ুন আজাদ।


এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--3