বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--2


           বিষয় : সাবিত্রীবাঈ ফুলেঃ বারবার তাঁকে ফিরে দেখা
          বিভাগ : অন্যান্য
          শুরু করেছেন :অর্জুন অভিষেক
          IP Address : 342323.223.674512.245 (*)          Date:03 Jan 2019 -- 11:34 AM




Name:  অর্জুন অভিষেক           

IP Address : 342323.223.674512.245 (*)          Date:03 Jan 2019 -- 11:36 AM

গত বছর লিখেছিলাম লেখাটি ফেসবুকে। লেখাটি সম্পাদনা না করে আজ আবার শেয়ার করলাম।

দেশের সামাজিক অবস্থা যখন তমসাচ্ছন্ন, সেই সময় এক দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত নারী, নারী শিক্ষা, শিশু শিক্ষা ও বিভিন্ন সামাজিক সংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে একটি জোড়াল প্রদীপ হাতে এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁর নাম সাবিত্রীবাঈ ফুলে। আজ তাঁর ১৮৮ তম জন্মবার্ষিকী ।

কাল (৩রা জানুয়ারী ২০১৮) মহারাষ্ট্রে দলিত সম্প্রদায়রা হরতাল ডেকেছে, দুদিন আগেই তাদের একটি পদযাত্রার ওপর অতর্কিতে হামলা চালানো হয়। তাতে একজন মারা গেছে ও অনেকে আক্রান্ত। পদযাত্রাটিও ছিল ১৮১৮ পেশয়া বালাজী বাজী রাওর বিরুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’র বিজয় উৎসবের দুশো বছরের উদযাপন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ওই সেনা দলে অধিকাংশই ছিল দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ। দেশীয় শ্রেণী শত্রুদের ঔপনিবেশিক শাসককুলের সাহায্যে পরাজিত করতে পারা উৎসব ছিল কি এটা ? ঘটনাটা খুব সহজ নয়। এই ঘটনায় মনে করিয়ে দেয়, আমাদের দেশে দলিত সম্প্রদায় ও শাসক দলের চিরাচরিত সমস্যাটা কত জলন্ত। আমার লেখাটা এই সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে নয়। বরং অনেকটা পিছনে ফিরে ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে একটু ফিরে দেখা। ঘটনাচক্রে ৩রা জানুয়ারী ছিল এমন এক মানুষের জন্মবার্ষিকী, যার জীবন দলিত সংগ্রামের সূচনাটা দেখতে সাহায্য করে।

তিনি হলেন সাবিত্রীবাঈ ফুলে (৩রা জানুয়ারী ১৮৩১- ১০ মার্চ ১৮৯৭) দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত এক অসামান্যা নারী। জন্মেছিলেন মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলার নওগাঁও এ। দেশের প্রথম মহিলা শিক্ষিকা। সাবিত্রীবাঈ যে সময়ে সমাজসেবার কাজে শুরু করেন অর্থাৎ ১৮৪০ এর শেষ ও ’৫০ এর শুরুতে, ১৮৫৭ র মহাবিদ্রোহেরও পূর্বে, সেই সময়ে স্ত্রী শিক্ষা ও স্ত্রী স্বাধীনতায় যারা অগ্রণী ভূমিকা নিচ্ছেন তারা সকলেই ব্রিটিশ প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত শহরাঞ্চলে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত উচ্চবর্গীয় পুরুষ। সাবিত্রী বাঈয়ের মত একদম নিম্নবর্গীয় সমাজের, যে সমাজে পুরুষরাই শিক্ষা পাননা, সেই শ্রেনী থেকে এক নারীর সমাজকল্যাণের কাজে এগিয়ে আসাটা একটি অভাবনীয় ঘটনা ছাড়া আর কি বলা যায়! এইরকম উদাহরণ আর আছে বলে আমার জানা নেই! অথচ তিনি ইতিহাস ও জনস্মৃতি থেকে কি ব্রাত্য।

তাঁর সময়ের পরে দেশের অন্যান্য যে মহিলারা পাদপ্রদীপের আলোকে এসেছিলেন, তারা সকলেই ছিলেন উচ্চবর্গীয় সমাজভুক্ত, কমবেশী পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত। তাই হয়ত ইতিহাসও সাবিত্রীবাঈকে মনে রাখেনি। আমাদের দেশ কোনোদিনও মনে রাখেনা দলিতদের। তিনি তাই হারিয়ে গেছেন ইতিহাসের পাদপ্রদীপের তলায়।

মহারাষ্ট্রে জ্যোতিরাও ফুলে আজ থেকে প্রায় ১৭০ বছর আগে জাতিবাদ, ব্রাহ্মণ্যবাদ, ধর্মীয় অনুশাসন, লিঙ্গ ভিত্তিক অসাম্য, পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক বৃহত্তর সংগ্রাম ও সংস্কার যজ্ঞ শুরু করেন। পরবর্তীকালে বি। আর। আম্বেদকার যে জাতীয় দলিত আন্দোলন শুরু করেছিলেন, জ্যোতিরাও ফুলে তার প্রায় ৭৫ বছর আগেই তার সূচনা করেন। জাতিতে মালি জ্যোতিরাও ফুলে ছিলেন আম্বেদকারের আদর্শ স্বরুপ। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে দেশবাসী ‘মহাত্মা’ আখ্যা দেবার আগেই জ্যোতিরাও কে ‘মহাত্মা’ বলে সম্বোধন করেছিল । এই ব্যাপক সমাজ সংস্কার কর্মযজ্ঞে তিনি পাশে পেয়েছিলেন সহধর্মিণী সাবিত্রীবাঈকে। জ্যোতিরাও যে সময়ে সমাজ সংস্কারের কাজ শুরু করলেন, সেই সময়ে বাংলায় বিদ্যাসাগর কাজ করছেন, রামমোহন রায় তার কিছু বছর আগেই অনেক কাজের সূচনা করেছেন। এর আগে পরে পশ্চিম ভারতে মহারাণা গোবিন্দ রানাডে, আত্মারাম পাণ্ডুরাম বা দণ্ড কেশব কার্ভেও যে ব্যাপক সংস্কার কর্ম শুরু করেন তারা প্রায় সকলেই ছিলেন জাতিতে উচ্চবর্গীয়, শহরাঞ্চলের এবং পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত। সঙ্গে পেয়েছিলেন দেশীয় ও ঔপনিবেশিক শাসক সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট কৃতি ব্যক্তিদের।

জ্যতিরাও ও সাবিত্রীবাঈ ফুলের সংগ্রাম ছিল একক ও স্বাতন্ত্র্য।

১৮৪৮ এ ফুলে দম্পতি পুনায় একটি বালিকা বিদ্যালয় খোলেন। ভাবতেও গায়ে কাঁটা দেয়, যে বড় শহরে সেই যুগে মেয়েরা ছিলেন অসূর্যস্পর্শা, ১৭ বছরের সাবিত্রীবাঈ পড়াশোনা শিখে আহমেদনগরের একটি মিশনারি সেন্টারে টিচার্স ট্রেনিং নিয়ে নিজেকে তৈরি করে পুনার মত একটি ব্রাহ্মণ অধ্যুষিত ছোট শহরে মেয়েদের শিক্ষা দেবার ব্রত শুরু করেন । কি ভাবে জোগাড় করেছিলেন ছাত্রীদের? কতগুলো দরজা তার মুখের সামনে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, মাথায় পরেছিল পাথর !! পুনায় থাকতে শুনেছি সমাজ এতই রুষ্ট ছিল এই কাজে যে তাদের বাড়ির সামনে সব নোংরা ও মলমূত্র ত্যাগ করে যেত। ছাত্রী জোগাড় করতে বেরোবার সময় তার ব্যাগে একটি বাড়তি শাড়ি নিতে হত, কারণ গ্রামের পথে যেতে তার গায়ে পড়ত গোবর ও নোংরা। পরে নিরাপত্তার জন্যে একটি সেপাই রাখতেন।

ভাবতে বেশ শিহরণ লাগে যে এক দলিত দম্পতির প্রতিষ্ঠিত এই অভিনব অনামা বালিকা বিদ্যালয়টি দেশের প্রথম বালিকা বিদ্যালয়। কলকাতায় বেথুন স্কুল প্রতিষ্ঠা পায় তার পরের বছর ১৮৪৯ এ। কলকাতা তখন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ও বেথুন প্রতিষ্ঠার পিছনে ছিলেন দেশী, বিদেশী সব বিখ্যাত শিক্ষাবিদেরা।

শুধু স্ত্রী শিক্ষাই নয়, তার সময়ের থেকে বহু যোজন এগিয়ে যাওয়া সাবিত্রীবাঈ আরও অনেক সমাজ সংস্কার মূলক কাজকর্মের সূচনা করেন। ধর্ষিতা অন্তঃসত্ত্বা মেয়েরা যারা সমাজে জন্তুজানোয়ারের চেয়েও অচ্ছুৎ তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। ভাবা যায়? তাঁর সমাজ সংস্কারের মধ্যে ছিল অসবর্ণ বিবাহ প্রচলন, ব্রাহ্মণ পুরোহিতহীন ও কোনোরকম পণহীন বিবাহ প্রথা। আজকের দিনের হিসেবেও বেশ চমকে দেবার মত, না? ২০১৭ তেও নিজের ধর্ম ও জাতের বাইরে বিবাহ করলে বাবা-মা সন্তানদের সগর্বে হত্যা করে। তার ওপর ‘লভ জেহাদ’ তো এখন হট টপিক। নিজেদের সময়ের থেকে কতটা এগিয়ে ছিলেন ফুলে দম্পতি? সমাজের তর্জনী উপেক্ষা করে স্বামী জ্যোতিরাও এর মৃত্যুর পরে তাঁর মুখাগ্নি করেছিলেন সাবিত্রীবাঈ।

ঘটনাগুলো শুনতে যত রোমাঞ্চ লাগে আমাদের, আসলে তাদের সময়ে কাজটা ছিল সীমাহীন কষ্টের। একটা একটা করে পথের কাঁটা তুলে এগোতে হয়েছিল তাঁদের । মিলেছিল শুধু ধিক্কার আর নানারকম নিপীড়ন।

এই কর্মময়ীর জীবনদীপও নিভেছিল পরের সেবা করতে করতেই। ১৮৯৭ এ পুনায় প্লেগ রোগ মহামারী আকার ধারণ করে। সাবিত্রীবাঈয়ের পালিত পুত্র প্লেগ রুগিদের সেবায় একটি হাসপাতাল খোলেন, সাবিত্রীবাঈ এগিয়ে আসেন সেবার কাজ করতে এবং এই সেবার কাজে করতে করতেই প্লেগ রোগই তাঁর মহান জীবন ছিনিয়ে নেয়।

আজ ও যখন আমরা বিভিন্ন সংখ্যালগু নিপীড়ন ও অসাম্য লড়াইয়ে সামিল হই তখন আমাদের মনে রাখা উচিত সাবিত্রীবাঈ ফুলে, জ্যোতিরাও ফুলের মত ব্যক্তিত্বরা ছিলেন এই সব সংগ্রামের পথ প্রদর্শক।

তাঁরা আমাদের দিয়ে গেছেন তাঁদের সব, পরিবর্তে আমরা তাঁদের শুধু দিতে পারি কুর্নিশ আর তাঁদের স্মরণ ।

তিনি আজও খুব প্রাসঙ্গিক।




Name:  খ          

IP Address : 2345.110.124512.155 (*)          Date:03 Jan 2019 -- 12:33 PM

সবসময় প্রাসঙ্গিক, প্রাতস্মরণীয় ব‍্যক্তিত্ত্ব।

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--2