বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1] [2]     এই পাতায় আছে22--52


           বিষয় : পায়ের তলায় সর্ষেঃ অরুণাচলের দিকে
          বিভাগ : অন্যান্য
          শুরু করেছেন : সিকি
          IP Address : 127812.61.458912.199 (*)          Date:03 Dec 2018 -- 08:45 PM




Name:   সিকি           

IP Address : 670112.215.56900.104 (*)          Date:07 Dec 2018 -- 11:48 PM

ভোর সাড়ে পাঁচটায় ঘুম ভাঙামাত্র যেটা প্রথম মাথায় এল, সেটা হল, “যাবো না”। একেবারে ইচ্ছে করছে না তৈরি হতে, অসীম একটা শারীরিক আর মানসিক ফ্যাটিগ চেপে বসেছে। কাল রাতে একটা পেনকিলার খেয়েছিলাম, কিন্তু গায়ের ব্যথার বিশেষ উপশম তাতে হয় নি, সেটা একটা কারণ হতে পারে, কিন্তু সেটাই একমাত্র কারণ নয়। কেমন যেন মনে হচ্ছে এবারে আমার মন আমার শরীরের সাথে নেই, কিংবা উল্টোটা। আমি কি মনের কথা না শুনে ভুল করছি? সঙ্গে তো কেউ নেই, যাওয়া ক্যানসেল করে আবার ধীরেসুস্থে দিল্লি ফিরে গেলেই বা কী ক্ষতি? কেমন একটা কারণহীনতা বিশালভাবে চেপে বসছে মাথার মধ্যে, কিছুতেই এই সুবিশাল ট্রিপে যাবার পক্ষে কোনও সহজবোধ্য কারণ দিয়ে নিজেকে প্রবোধ দিতে পারছি না।

দশ মিনিট এপাশ ওপাশ করার পরে দ্বিতীয় চিন্তাটা মাথায় এল, কাল ক্যামেরা পড়ে গেছিল, তার পরে আর খুলে দেখা হয় নি কী ক্ষতি হয়েছে ক্যামেরার।

ভাবামাত্র তড়াক করে উঠে বসলাম, আর ঝটপট বিছানার পাশ থেকে টেনে নিলাম ক্যামেরার ব্যাগটা। এটাকে গলায় ঝুলিয়ে আর নেওয়া যাবে না। ব্যাগের দুদিকেরই আংটা ভেঙে গেছে। চেন খুলে ক্যামেরাটাকে বের করলাম। না, আস্ত আছে। লেন্স ক্যাপ খুলতে গিয়ে দেখি, সে আর খুলছে না। কী রকম অদ্ভুতভাবে অর্ধেক ভেতরে অর্ধেক বাইরে হয়ে লেন্সের ডগায় বেকায়দায় আটকে গেছে।

খেয়েছে। লেন্স ক্যাপ না খুললে ছবি তুলব কী করে? … এক মিনিট বাদে মনে পড়ল, লেন্সের মুখে তো ইউভি ফিল্টার লাগানো, ক্যাপটা আটকে গেছের সেই ফিল্টারের ওপরে। ফিল্টারটা তো লেন্সের মুখে প্যাঁচ দিয়ে আটকানো, প্যাঁচ খুললাম, ক্যাপসমেত ফিল্টার খুলে এল, না, ভেতরে লেন্স একদম ইনট্যাক্ট আছে। একটা ছবি তুললাম, ছবি ঠিকঠাক উঠল। ক্যামেরা ঠিক আছে।

তা হলে এই দাঁড়াল, ছবি তুলতে গেলে প্যাঁচ ঘুরিয়ে ফিল্টার খুলে ছবি তুলতে হবে, তোলা হলে আবার প্যাঁচ লাগিয়ে বন্ধ করতে হবে। … সে না হয় হল, কিন্তু ক্যামেরা পিঠের ব্যাগে থাকলে চলতে চলতে ছবি তুলব কী করে?

আরও খানিকক্ষণ মাথা ঘামিয়ে ভেবে দেখলাম, ব্যাগের ঠিক মাঝামাঝি একটা হাতল আছে, শক্তপোক্ত কাপড়ের, ছিঁড়ে যাবার কোনও সমস্যা নেই। ওর মধ্যে দিয়ে স্ট্র্যাপটা গলিয়ে দিয়ে দুপ্রান্ত বেশ ভালো করে গিঁট দিয়ে নিলাম। হ্যাঁ, এইবারে ঠিক হয়েছে, এইবারে গলায় ঝুলবে। ছিটকে পড়ে যাবার ভয় নেই।

ঝটপট তৈরি হয়ে নিলাম। সকালবেলায় একজনকে পেয়ে গেলাম, যে সানন্দে আমার ব্যাগপত্র পার্কিং অবধি পৌঁছে দিল। পার্কিংটা ঘর থেকে সত্যিই অনেকটা দূরে। জেরিক্যানের পেট্রল মোটরসাইকেলেই ভরে নিলাম, অন্তত গৌহাটি অবধি তো পেট্রল পাম্পের কমতি হবে না, রোজ জেরিক্যান আলাদা লাগেজ হিসেবে বইবার দরকার কি। থাক খালি জেরিক্যান মোটরসাইকেলের ক্যারিয়ারে আটকে।

সাড়ে সাতটায় স্টার্ট করলাম, মোটামুটি পৌনে নটা নাগাদ উত্তরপ্রদেশ পেরিয়ে বিহার ঢুকলাম।

পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ বা দিল্লি হরিয়ানার সাথে পূর্ব ভারতের একটা বেসিক তফাৎ আছে। সেটা হল – সকালবেলায় বাজার বসা। এটা উত্তর ভারতে, পশ্চিম ভারতে একেবারে দেখা যায় না – এই সংস্কৃতিটা শুরু হয় বিহার থেকে। রাস্তার ধারে সবজি আনাজ মাছ মাংস ফলমূল নিয়ে ঢেলে বাজার চলছে।

আজকের দূরত্ব, গুগল ম্যাপ অনুযায়ী ৫৮৭ কিলোমিটার, খুব তাড়াতাড়িই হয়ে যাবার কথা, কিন্তু রাস্তায় যত সাইনেজ দেখছি, সর্বত্র শিলিগুড়ির দূরত্ব অন্তত নব্বই কিলোমিটার বাড়িয়ে লিখছে। এতটা তফাত কেন?

ভাবতে ভাবতেই ক্রমশ এক এক করে পেরিয়ে এলাম গোপালগঞ্জ, মুজফ্‌ফরপুর। সেখান থেকে অল্প বাঁদিকে ঘুরে দারভাঙা জেলা। একটা ধাবায় ঢুকে দুপুরের খাওয়া সেরে নিলাম। ইয়াব্বড় মাছের পিস, আলুভাজা আর ফুলকপির তরকারি দিয়ে পেটপুরে খেলাম মাত্র আশি টাকা দিয়ে। আহা, সে পুরো অমৃত।

খেয়ে উঠে বিশাল একটা আড়মোড়া ভেঙে আবার মোটরসাইকেলে স্টার্ট দিতে হল। এখনও সাড়ে তিনশো কিলোমিটার। গুগল ম্যাপের নেভিগেশনের হিসেবে। রাস্তার সাইনেজ বলছে চারশো পঁচাশি। কী কেস, কে জানে!

ফোর্বসগঞ্জ, বিহারী উচ্চারণে ফরবিসগঞ্জ পেরোলাম। তারপরে এল আরারিয়া। সেইখান থেকে জিপিএস আমাকে বলল বাঁদিকের রাস্তা নিতে। নিলাম – আর সেই হল আমার দুঃখের শুরু। মোড়ের মাথায় একটা পুরোপুরি আবছা হয়ে যাওয়া দিকনির্দেশিকা সাইনেজ ছিল, কিন্তু সেটা পড়ার কোনও উপায় ছিল না। আমি বাঁদিকে টার্ন নিলাম। শিলিগুড়ি তখন মোটামুটি একশো পঁচাত্তর কিলোমিটার।

দু চার কিলোমিটার বেশ সুন্দর রাস্তা। তারপরে হঠাৎ করে রাস্তাটা নেই হয়ে শুরু হল পাথর বিছানো পথ। মানে, রাস্তা তৈরি হবে, তার আগের কোনও একটা স্টেপ হিসেবে পাথর বিছিয়ে জমি বানিয়ে রেখেছে। হতেই পারে সামান্য একটু স্ট্রেচ খারাপ আছে, একটু এগোলেই ভালো রাস্তা পাবো।

কিন্তু ভেবে ভেবে অনেকদূর চলে এলাম, খারাপ রাস্তার কোনও শেষ নেই। এদিকে আমার স্পিড নেমে এসেছে তিরিশের ঘরে, বিকেল হয়ে এসেছে, আলো কমে আসছে দ্রুত, আমি বুঝতে পারছি, আমি বিহারের একেবারে গ্রামদেশে ঢুকে পড়েছি। এখন আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। একবার মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে জিপিএস স্ক্রোল করে দেখলাম, রাস্তা এটাই, একশো পঞ্চাশ কিলোমিটার কোনও একটা স্টেট হাইওয়ে।

চলতে থাকলাম। অন্ধকার হল। অন্ধকার ক্রমশ গাঢ় হল। রাস্তার দুধারে গাছপালা, মাঝে মাঝে লোকালয়, সন্ধের বাজার, কোথাও রাস্তার অর্ধেক জুড়ে উঁচু ইঁটের প্ল্যাটফর্ম করা, সেইখানে বাজার বসেছে, অটো চলছে, সাইকেল পারাপার করছে, তার মধ্যে দিয়ে আমাকে চলতে হচ্ছে। খানিক বাদে আবার নিকষ অন্ধকার, কখনও ট্রাকের পেছনে, কখনও ডাম্পারের পেছনে, ওভারটেক করার মতও চওড়া রাস্তা নেই। হাইবীমেও আলো দেওয়া যাচ্ছে না, উল্টোদিক থেকে মাঝে মাঝেই গাড়ি আসছে, অবশ্য, দেশটার নাম ভারত, এখানে রাস্তায় নামা লোকের ৯০% হাই বীম আর ডিপারের নিয়ম জানে না, তার ওপর এ হল বিহারের গ্রাম, এখানে ওসব এক্সপেক্ট করাই উচিত নয়, অতএব, আমাকেও হাইবীমে হেডলাইট জ্বালিয়েই এগোতে হল। এক একবার গাড়ি আসছে উল্টোদিক থেকে, আমার চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে, গাড়ি থামিয়ে নিতে হচ্ছে কারণ সামনে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। দূরত্ব এদিকে কমছে খুব ধীরে ধীরে, কারণ আমি নিজেই ধীরে ধীরে চলছি, রাস্তা বলে কিছু নেই, মাঝে মাঝে টার দেওয়া, বাকিটা পুরো পাথর, নয় তো ইঁট, নয় তো কাদামাটি।

এমনিই একটা স্ট্রেচে চলছি একটা ট্রাকের পেছন পেছন আর ভাবছি কখন ব্যাটাকে ওভারটেক করতে পারব, আচমকা আমার একটু পেছন দিকেই একটা মর্মভেদী আর্তনাদ কানে এল। তড়িঘড়ি পেছনদিকে তাকিয়ে দেখি সে মানে বিচ্ছিরি দৃশ্য। নিকষ অন্ধকারে এক আধমাতাল বুড়ো সাইকেল চালিয়ে আসছিল, তার চাকার নিচে চাপা পড়েছে একটা কুচকুচে কালো কুকুর। বুড়ো হয় তো এমনিতেই সন্ধেবেলায় চোখে ভালো দ্যাখে না, সে সাইকেল থামিয়ে “কা হো গইল বা” বলছে জড়ানো গলায়, এদিকে সাইকেলটা এমন সময়েই থামিয়েছে, তার সামনের চাকা কুকুরটার পেটের ওপর, কুকুরটার পেট ফেটে গেছে সাইকেলসমেত বুড়োর চাপে, বুড়ো কুকুরকে দেখতে পাচ্ছে না অন্ধকারে, এদিকে তারই পায়ের তলায় মৃত্যুযন্ত্রণায় কুকুরটা ছটফট করছে আর আর্তনাদ করছে।

ট্রাকটা একটু সাইড হতেই আমি মোটরসাইকেল গলিয়ে দিলাম ডানদিক দিয়ে, সামনে অনেকটা ফাঁকা রাস্তা, কিন্তু স্পিড তোলার উপায় নেই, যতটা সম্ভব দ্রুত আমি এলাকাটা ছাড়িয়ে এলাম।

সন্ধে ছটা নাগাদ আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম কাদাপাথরের স্তুপের মাঝে, কোথাও একটা ব্রিজ বানানো হচ্ছে, তার নিচ দিয়ে এদিক ওদিক রাস্তা গেছে। জিপিএস যেদিকে যেতে বলছে, সেদিকে আদৌ কোনও রাস্তা আছে কিনা বুঝতে পারছি না। কালন্তির শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি তখন, শুধু আমাকে সচল রেখে জিপিএস জানাচ্ছে, শিলিগুড়ি আর মেরেকেটে পঞ্চাশ কিলোমিটার।

সেইখানে একটা চায়ের দোকান ছিল। তার কাছে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ইসলামপুর-শিলিগুড়ি যাবার জন্য কোনদিকে? সে তিনটের মধ্যে একটা রাস্তা দেখিয়ে দিল। তিনটেই সামনের দিকে এঁকেবেঁকে এগিয়ে হারিয়ে গেছে অন্ধকারে।

উদ্দিষ্ট রাস্তা ধরে এগোলাম, দেখলাম জিপিএসও এই রাস্তার কথাই বলছে। বেশ খানিকটা এগোবার পরে রাস্তাটা একটু চওড়া হল। জিপিএস বলল, তিন কিলোমিটার পরেই বাঁদিক।

বাঁদিক নিয়ে ভালো রাস্তা পেলাম, এবং দেখলাম রাস্তার সাইডে ব্যারিকেডে লেখা আছে ওয়েস্ট বেঙ্গল পুলিশ। মানে, আমি পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে পড়েছি? … অবশ্য অতটাও উল্লসিত হবার কিছু নেই, এই এলাকায় হাইওয়ে একটু বাংলা, একটু বিহার, আবার একটু বাংলা, আবার একটু বিহার, এইভাবে চলে। এগোতে থাকলাম।

খানিক এগিয়ে দোকানপাট পেলাম এবং স্পষ্ট দেখলাম, সেখানে লেখা আছে, জেলা দার্জিলিং। মানে, ঐ অখাদ্য বিহারী স্টেট হাইওয়ে দিয়ে আমি সত্যিই শর্টকাট মেরে একদম শিলিগুড়িতে ঢুকতে পেরেছি? পূর্ণিয়া, কিষেণগঞ্জ, ইসলামপুর সমস্ত বাইপাস করে সোজা শিলিগুড়ি ঢুকে গেছি! জয়গুরু! আমার হোটেল আর পঁচিশ কিলোমিটার দূরত্বে, জিপিএস বলছে, সাড়ে সাতটায় আমি ঢুকে যাবো হোটেলে।

মানে আর একঘণ্টা! পঁচিশ কিলোমিটার তো আমি তার আগেই পৌঁছে যেতে পারি। যাই হোক, এগোলাম, দু একটা লোকালিটি পেরিয়ে আবার নিকষ কালো একটা মসৃণ হাইওয়ে, সরু। ঐ আমাদের ওখানে, হুগলি চুঁচড়ো চন্দননগরের জিটি রোড যেমন সুন্দর বানিয়ে দিয়েছে, দুধারে রিফ্লেক্টর বসানো, সেই রকম রাস্তা। একটা মাইলস্টোন চোখে পড়ল, বাগডোগরা এয়ারপোর্ট, বাইশ কিলোমিটার।

আচ্ছা! এটাই তা হলে বাগডোগরার রাস্তা। আগের বছর এই রাস্তাটা ভাঙাচোরা ছিল, আগের বছরেও শিলিগুড়ি আসার সময়ে এই রাস্তাটা আমি অন্ধকারে পেরিয়েছিলাম।

রাস্তার অবস্থা এখন ভালোই, কেবল মাঝে মাঝে হঠাৎ স্পীড ব্রেকার লাগানো, আর সেগুলো কোনও মার্কিংও করা নেই আলাদা রঙে। দু একবার জোর ঝাঁকুনি খাবার পরে আমাকে আবারও স্পীড কমাতে হল। আর তখনই নিকষ কালো অন্ধকার ভেদ করে একটা ট্রাক এল উল্টোদিক থেকে, আর আমি এক ঝলক আলোতে দেখতে পেলাম, আমার দু পাশে চা-বাগান। আমি বুঝতেই পারি নি এতক্ষণ আমি চা বাগানের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি।

বোধ হয় মুহূর্তের জন্য অন্যমনস্ক হয়েছিলাম, আচমকা সম্বিত ফিরল একটা স্পীড ব্রেকারে ঝাঁকুনি খেয়ে, স্পীড কমালাম সাথে সাথে, কিন্তু মনে হল একটা কিছু পড়ে যাবার আওয়াজ পেলাম পেছন দিক থেকে, আর আমার মোটরসাইকেলের সাথে সাথে ঘষটে চলেছে কিছু। তড়িঘড়ি মোটরসাইকেল থামিয়ে ঘাড় ঘোরাতেই চক্ষুস্থির।

বাঁদিকের বানজি কর্ড আলগা হয়ে খুলে গেছে, একটি মাত্র পাকের ভরসায় বাঁদিকের স্যাডল ব্যাগ এবং তার সাথে বাঁধা টেন্ট, বাঁদিকের ক্যারিয়ার থেকে খুলে, মাটিতে ঘষটাচ্ছে।

আমার সেই মুহূর্তে ডাক ছেড়ে চেঁচাতে ইচ্ছে করছিল রাগে। দেড়শো কিলোমিটার পাথর ইঁটের ওপর চালিয়ে তখন আমার সর্বাঙ্গে দ্বিগুণ ব্যথা, ঘাড় থেকে শুরু করে পায়ের পাতা অবধি, এই অবস্থায় এখন এই লাগেজ তুলে আমাকে বাঁধতে হবে?

কিন্তু, কাজ যদি সেটুকুই থাকত, তা হলে তো কথাই ছিল না, লাগেজগুলো খসে পড়েছে এমনভাবে, বাঁদিকের সাইডস্ট্যান্ড গেছে ব্লক হয়ে, মানে স্ট্যান্ড না নামালে আমি নামতেই পারব না মোটরসাইকেল থেকে, আর স্ট্যান্ড গেছে লাগেজের নিচে ফেঁসে। আমার পায়ে অত জোর এখন আর নেই যে পায়ে করে লাগেজ সরিয়ে তার নিচ থেকে স্ট্যান্ড উদ্ধার করব।

রাস্তায় একটাও লোক নেই। মাত্র সাতটা দশ বাজে। অগত্যা। অসাধ্যই সাধন করতে হল। প্রায় আড়ষ্ট হয়ে যাওয়া পা দিয়ে একতিল একতিল করে স্যাডল ব্যাগ সরিয়ে সাইডস্ট্যান্ড খালি করলাম, তারপরে সেটাকে পা দিয়ে নামালাম, তারপর নিজে নামতে পারলাম।

কালো রঙের স্যাডল ব্যাগ। কালো রঙের ক্যারিয়ার। চতুর্দিকে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার, আমার দু হাত দূরে মাঠ আছে না চা বাগান, তা-ও বুঝতে পারছি না। শেষমেশ মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে খানিক আলো হল। এক হাতে মোবাইল ধরে অন্য হাতে বানজি কর্ডের জট ছাড়ালাম, লাগেজ মুক্ত করলাম। তারপরে আবার তাকে ক্যারিয়ারের ওপর বসিয়ে, তার ওপর টেন্ট বসিয়ে আবার বানজি দিয়ে কষে ইড়িমিড়িকিড়ি বাঁধন। এতটাই অসম্ভব লাগছিল, পুরো কাজটা সারতে আধঘণ্টার ওপর লেগে গেল।

শেষ করে দুতিন মিনিট দম নিলাম মোটরসাইকেলের গায়ে হেলান দিয়ে। কোমর, পা, পাছু একেবারে ব্যথায় জমে আছে। একমাত্র ভরসা, জিপিএস। সে বলছে, হোটেল আর মাত্র তেরো কিলোমিটার।

স্টার্ট দিলাম। আর কোনও অঘটন ঘটল না, খানিক বাদেই বাগডোগরা এয়ারপোর্টের প্রবেশপথ, তার খানিক পরেই শিলিগুড়ি শহরের শুরু। হোটেলটাও লোকেট করতে এবার একেবারে অসুবিধে হল না, হিলকার্ট রোডের প্রায় ওপরেই হোটেল ভেঙ্কটেশ রিজেন্সি। দু তিনটে নেপালি যুবক চালায় মনে হল হোটেলটা। শিলিগুড়িতে পৌঁছেও বাংলায় কথা বলার তাই সুযোগ হল না।

ছেলেগুলো খুবই হেল্পফুল। ঝটপট আমার সাথে হত লাগিয়ে লাগেজ খুলে ঘর অবধি পৌঁছে দিল। হোটেলটায় এক একটা ঘরের নাম ভারতের এক একটা রাজ্যের নামে। … এইটা আমার ঘরের নাম।


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/12/20181118_204656.jpg

শারীরিক আর মানসিক ক্লান্তির মধ্যে বসে বিশ্বাস হচ্ছিল না যে আমি আজ সত্যিই জার্নি শেষ করতে পেরেছি, মাথার মধ্যে তখনও খালি ধাক্কা মারছে ঐ মরতে চলা কুকুরের আর্তনাদ, আর উল্টোদিক থেকে আসা চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া গাড়ির হেডলাইট। কাল সকালে আবারও বেরোতে হবে? প্লিজ, না। পারছি না। এতটুকু এনজয় করতে পারছি না।

রাতের খাবারের অর্ডার দিলাম। ছেলেটি এসে বলল, স্যর, বীয়ার ওয়াইন কিছু লাগলে বলবেন।

না ভাই, ও সব আমার নন-ডিপ। তুমি শুধু রাতের খাবারটুকুই দাও।

খেলাম, খেয়ে নিয়ে আবারও একটা পেনকিলার, কোনও লাভ হবে না জেনেও, খেলাম। এবং চমৎকার উচ্চমানের বাথরুমে ঢুকে চান করে, ফ্রেশ হয়ে, ঘুম। এসিটা বাড়িয়ে দিয়ে, চাদর মুড়ি দিয়ে।

দুটো দিন গেল।


Name:  hu          

IP Address : 013412.160.452312.4 (*)          Date:08 Dec 2018 -- 12:12 AM

পড়ছি


Name:  Tim          

IP Address : 780112.77.347812.2 (*)          Date:08 Dec 2018 -- 03:12 AM

পড়ে ফেললাম।


Name:  avi          

IP Address : 7845.11.238912.58 (*)          Date:08 Dec 2018 -- 11:46 AM

ওরেবাবা। আমি যখন কল করছিলাম দার্জিলিং থেকে নামার পথে, সিকিবাবু তখন নির্ঘাত লাগেজ বেঁধেই যাচ্ছে, বেঁধেই যাচ্ছে... আর রাস্তাটা নির্ঘাত নেপাল সীমান্তের সমান্তরালে গিয়ে একদম খড়িবাড়ির কাছে বড় রাস্তায় মিশলো। তার পরেই বাগডোগরা। আজ বিকেলেই ওই পথে যাব।


Name:  শঙ্খ          

IP Address : 5645.112.0178.135 (*)          Date:08 Dec 2018 -- 02:36 PM

বেশ! তারপর?


Name:   সিকি           

IP Address : 670112.215.56900.104 (*)          Date:09 Dec 2018 -- 10:01 PM

ঘুম হচ্ছে না আজকাল ঠিকঠাক। অ্যালার্ম বাজার আগেই তাই জেগে গেছি। উঠে শরীর নাড়িয়ে দেখলাম, না, ব্যথা একেবারে কমেনি ঠিকই, তবে এই তৃতীয় দিনে ইউজড টু হয়ে গেছি। খুব একটা অসুবিধে আর হচ্ছে না। মন যদিও সঙ্গ দিচ্ছে না এখনও পুরোপুরি, তবুও জোর করে নিজেকে বোঝালাম, গত দুদিন ছিল চূড়ান্ত বোরিং রাস্তা ধরে আসা। উত্তর প্রদেশ, বিহার, মাঝে আবার দেড়শো কিলোমিটার বিচ্ছিরি রাস্তা দিয়ে আসা। আজকের রাস্তা তো অমন নয়। সুন্দর রাস্তা, পাহাড়ের কোল ঘেঁষে, তদুপরি দিনের শেষে আজ আছে দেশি মুরগির ঝোল। এইবারে তো মনটকে একটু চাঙ্গা করো – তুমি অনর্থক দুঃখবিলাসী হয়ে যাচ্ছো, সিকি।

আজ্ঞে হ্যাঁ, আজকের গন্তব্য গৌহাটি, এবং সেথায় আজ কোনও হোটেলবাস নয়, গুরুচণ্ডা৯-র অন্যতম গুরু b-এর নেমন্তন্নে আজ তাঁর বাড়িতেই ভোজন এবং বিশ্রামের পরিকল্পনা হয়েছে। সেখানে আরও কিছু চণ্ডালের আগমন সংবাদ পেয়েছি। গুলজার হবার একটা তুমুল চান্স আছে, সেটা হয় তো আমার পরের যাত্রার জন্য একটা বুস্ট আপ ডোজের কাজ করতে পারে।

সাড়ে সাতটা নাগাদ ধীরেসুস্থে তৈরি হলাম। জিনিসপত্র নিচে নামিয়ে মোটরসাইকেলে ভালো করে লোড করা হল। গতকাল একটু বেশি কনফিডেন্সের বশে আমি দুদিকেই একটা করে বানজি কর্ড দিয়ে লাগেজ বেঁধেছিলাম, তার ফলে সন্ধেবেলায় ঐভাবে কর্ড লুজ হয়ে জিনিস উলটে পড়েছিল রাস্তার ওপর। আজ তাই আর কোনও রিস্ক নয় – প্রত্যেক দিকে দুখানা করে লম্বা লম্বা বানজি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে নিলাম লাগেজ। ভালো করে নাড়িয়ে ঝাঁকিয়ে দেখে নিলাম, না, আজ আর কোনওভাবেই এই ইড়িমিড়িকিড়ি বাঁধন খোলার চান্স নেই।

খিদে পেয়েছে। কাল রাতের চিকেন সেজওয়ান নুডল কাল রাতেই হজম হয়ে গেছে, পেটে কৃষ্ণগহ্বর তৈরি হয়ে গেছে। এদিকে সামনেই একটা ছোট্ট দোকান, সেখানে দেখতে পাচ্ছি গরম গরম পরোটা ভাজছে। অতএব, লাগেজসমেত মোটরসাইকেল রাস্তার পাশেই দাঁড় করিয়ে রেখে গুটিগুটি ঢুকলাম দোকানে। গোটাচারেক বড় বড় পরোটা নিঃশব্দে শেষ করে যখন জলের গ্লাসের দিকে হাত বাড়ালাম, তখন বাজে প্রায় সওয়া আটটা। চাপের কিছু নেই – আজকের দূরত্ব আরেকটু কম। সাড়ে চারশো কিলোমিটার। এখান থেকে আইআইটি গৌহাটি। রাস্তা যাবে আলিপুর দুয়ারের ওপর দিয়ে, সেইটা আরেকটা উৎসাহের কারণ, আলিপুর দুয়ার আমার জন্মস্থান। তখন আলিপুর দুয়ার ছিল জলপাইগুড়ি জেলার একটা মহকুমা, আজ সে নিজেই একটা জেলা। জন্মের কয়েক মাস পরেই বাবা ওখান থেকে বদলি হয়ে চলে আসে, আটাত্তরের বন্যার মরশুমে, আমার কোনও স্মৃতিই নেই।

আজকের জার্নি অনেকখানি সুন্দর রাস্তা দিয়ে। প্রথমে সেভক ব্রিজ, সেটা পেরিয়ে চা বাগানের মধ্যে দিয়ে যাওয়া, বাঁ পাশে নীলচে পাহাড়ের শিল্যুয়েট। হিলকার্ট রোড পেরিয়ে শিলিগুড়ি শহরের প্রান্ত থেকে সেভক ব্রিজ পর্যন্ত রাস্তাটাই এত সুন্দর – ফরেস্টের মধ্যে দিয়ে যায়, ঝকঝকে নিটোল রাস্তা।

সুন্দর রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে খানিকক্ষণের মধ্যে দিয়েই শুরু হল অল্প পাহাড়ী রাস্তা এবং তার পরেই এসে হাজির হল সেভক ব্রিজ। সোজা রাস্তা চলে গেছে গ্যাংটকের দিকে, আর ব্রিজ পেরিয়ে ডানদিকের রাস্তা আমার গন্তব্য। সে রাস্তা দিয়ে আমি গতবছরেই গেছি, কিছুই বদলায় নি। ব্রিজে খানিকক্ষণ দাঁড়ালাম, একটা মোটরসাইকেল গ্রুপ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে, বাঙালিই সব, কলকাতা থেকে এসেছে, তেড়ে সেলফি এবং গ্রুপফি তুলছে – আলাপ হল, ও, তুমি একা, কতদিনে এসেছো, কোথায় যাবে, কীভাবে যাবে, ইত্যাদি দিল খুশ করে দেওয়া প্রশ্নের জবাব দেবার শেষে তাঁরা আমার সাথে ছবি তুলতে চাইলেন, অতএব, সেলফি স্টিক নাকের ডগায় ঝুলিয়ে আমাকেও দাঁত বার করতে হল। তারপরে টা টা করে আমি আমার রাস্তা ধরলাম। একে একে পেরিয়ে গেল ওদলাবাড়ি টি এস্টেট, ডামডিম, মালবাজার, চালসা, চাপড়ামারি, নাগরাকাটা – বড় নস্টালজিক অনুভূতি হয় এই রাস্তায় এলে, একসময়ে অনেক ঘুরেছি, তখন রাস্তা এত ভালো ছিল না, ছোট ছোট গঞ্জ সব আজ চমৎকার টাউন হয়ে গেছে। এর পর বানারহাট, বিনাগুড়ি পেরিয়ে বীরপাড়া থেকে শুরু হয়ে গেল আলিপুর দুয়ার জেলা।


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/12/20181119_093141.jpg


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/12/dsc_0150.jpg

বীরপাড়ার খানিক পরেই পড়ে মাদারিহাট, জলদাপাড়া স্যাংচুয়ারির বাইরে দিয়ে রাস্তা, মাঝে মাঝে স্পীড ব্রেকার দেওয়া, এখান দিয়ে নাকি হাতি চলাচল করে। মাদারিহাটের পরেই হাসিমারা, এইখান থেকে জয়গাঁও ফুন্টশোলিংএর জন্য বাঁদিকে রাস্তা চলে যায়, আমি নিলাম ডানদিকের রাস্তা, যেটা দোমহানি হয়ে চলে যাচ্ছে আলিপুর দুয়ারের দিকে।


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/12/20181119_122308.jpg

কিন্তু না, আলিপুর দুয়ার শহরের ভেতর ঢোকার উপায় হল না, হাইওয়ে চলে গেছে শহরের বাইরে দিয়ে, তাই একটা তিন মাথা জংশন, যেখানে ডানদিকে তিরচিহ্ন দিয়ে লেখা আছে আলিপুর দুয়ার শহর, সেটাকে পেরিয়ে আমাকে সোজা বেরিয়ে যেতে হল আসাম ছোঁবার জন্য।


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/12/dsc_0148.jpg

বেলা একটা নাগাদ পশ্চিমবঙ্গ পেরিয়ে আসামে ঢুকলাম। এবং রাস্তার হাল খারাপ হল। এই হাইওয়ে পশ্চিমবঙ্গের স্ট্রেচটুকু চমৎকারভাবে মেনটেনড, কিন্তু আসামে তার বড়ই হতশ্রী দশা। বর্ডার লাগোয়া প্রথম এলাকাটির নাম শ্রীরামপুর। সেখানে একটি নিরিবিলি ধাবা পেয়ে মোটরসাইকেল থামালাম। উপস্থিত লোকজনের কৌতূহলী দৃষ্টি অগ্রাহ্য করেই ঢুকে জিজ্ঞেস করলাম, দুপুরের খাবার কী পাওয়া যাবে। ছেলেটি অনেক কিছুরই নাম বলল, কিন্তু তাতে নন ভেজ কিছু না থাকায় জিজ্ঞেস করলাম, মাছ মাংস কিছু পাওয়া যাবে না? – ছেলেটি ঘাড় নাড়ল, না, এটা ভেজু ধাবা।

বেরিয়ে আসতে হল। চলতে চলতে লক্ষ্য রাখলাম, আর ধাবা পাওয়া যায় কিনা। ধাবা আছে অজস্র, ইন ফ্যাক্ট, আসামের এই অংশটা যেহেতু বর্ডার এলাকা, অসংখ্য, অসংখ্য ছোট ছোট ফুড জয়েন্ট মূলত উত্তর ভারতীয় রাজ্যগুলোর নামে। হরিয়ানা ধাবা, পঞ্জাব ধাবা, অথেন্টিক রাজস্থানী রসুই, ইউপি ধাবা – সবেতেই খুব যত্ন করে লেখা, শুদ্ধ শাকাহারী।

ধুত্তেরি। পশ্চিমবঙ্গেই খেয়ে আসা উচিত ছিল। ভাবতে ভাবতেই দেখলাম একটা ধাবা টাইপের জয়েন্ট, সেখানে অহমিয়া ভাষায় লেখা ভেজ ও ননভেজ। মানে এটুকু লেখা অহমিয়া আর বাংলা দুটো ভাষাতেই এক রকমের। অহমিয়া লিপিতে মূল সমস্যা হয় চ, ছ এই দুটো অক্ষর নিয়ে। কখন যে এরা চ, ছ ইউজ করে আর কখন যে স, শ – সে আমার বুঝতে বেশ কষ্ট হয়েছিল, পুরোটা এখনও বুঝি নি। এই ধরুন কসমেটিক্সের দোকানে লেখা আছে কচমেটিক্‌চ, শপ্‌-কে লেখা হচ্ছে চপ, সিমেন্টকে চিমেন্ট, এদিকে দেবশ্রীর নাম অসমীয়াতেও দেবশ্রী। স্পন্দন, অহমিয়াতেও স্পন্দন। অহমিয়া বানানের গল্প পরে হয় তো আরও বলব, আপাতত জানাই, সরু সরু রাস্তাঘাটের শুরুতে ছোট বোর্ডে লেখা আছে প্রধানমন্ত্রী গ্রাম “চড়ক” যোজনা। মানে সড়ক যোজনা।

তো, সে যাই হোক, ভেজ ও ননভেজ দেখে তো থামলাম। সেখানে সত্যিই মাছমাংস পাওয়া যায়। যদিও রাতে দেশি মুরগি আছে, তাও, চারটে পরোটা অনেকক্ষণ হজম হয়ে গেছে, অনেকটা যেতেও হবে – এইসব ভেবেচিন্তে আবারও চিকেনই অর্ডার করে দিলাম।

ছেলেটি একটি বিসলেরির বোতল বের করে দিল ফ্রিজ থেকে। আমি, সাধারণত বোতল জল খাই না রাস্তায় বেরিয়ে, যেখানকার যা জল, সেটাই খাই। ছেলেটাকে তাই বললাম, ইয়ে নেহি চাহিয়ে, নর্মাল পানি দে দো।

ছেলেটি কী বুঝল কে জানে, বোতলটা ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে আরেকটা বিসলেরির বোতল নিয়ে এসে মটাস করে ক্যাপের সীলটা খুলে ফেলল – আমি আবার হাঁ হাঁ করে থামালাম, কী মুশকিল, বললাম না, নেহি চাহিয়ে? আমি কিন্তু এর পয়সা দেবো না। নর্মাল জল দাও, নর্মাল।

ছেলেটি চুপচাপ সেই বোতল ফিরিয়ে নিয়ে চলে গেল, এবং ফিরে এল আবার একটি নতুন বিসলেরির বোতল নিয়ে, সীলড, বলল, এইটা নর্মাল।

আমি তখন মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছি – এ কী জনতা রে ভাই! খুব মাথা ঠাণ্ডা করে, আস্তে আস্তে, কেটে কেটে বললাম, বটল পানি নেহি চাহিয়ে – সামনের একটা টেবিলে জলের জাগ রাখা ছিল, সেইটা দেখিয়ে বললাম, ও পানি দে দো, নর্মাল পানি। বটল কা নেহি।

খুবই চাপ। আমি বাংলায় বললে হয় তো বেটার বুঝত, কিন্তু আসামের এই মুহূর্তে যা হালচাল, বাংলা বলা কতটা সঙ্গত বুঝতে পারছিলাম না, তাই হিন্দিতেই স্টিক করে রইলাম। যাই হোক, চারবারের বার জলের জাগ এল। তার পর এল খাবার। খাবার ঠিকঠাকই ছিল, আলুভাজা, সম্ভবত স্কোয়াশের তরকারি – সেটা টাচ করতে পারলাম না। মাংসের ঝোলটা ঝালঝাল, উমদা একদম, কাঁচা পেঁয়াজ দিয়ে খেতে কী যে ভালো লাগছিল।

খেয়ে উঠতে উঠতে আড়াইটে বাজল। b-কে এবং বাবাকে ফোন করে আবার মোটরসাইকেলে স্টার্ট দিলাম। এক এক করে বিভিন্ন নাম না জানা জায়গা পেরিয়ে গেল – চেনা জায়গা বলতে দেখতে পাচ্ছি, লেখা আছে বঙ্গাইগাঁও অয়েল রিফাইনারি, যার দূরত্ব ক্রমশ কমে আসছে।

বঙ্গাইগাঁও এল বিকেল প্রায় চারটে নাগাদ। রাস্তা ভালো খারাপ মিশিয়ে, তার চেয়েও বড় উপদ্রব হল উল্টোদিক থেকে চলে আসা গাড়ি, যে যেমন পারছে চলছে। b-এর সাথে বার দুয়েক কথা হয়ে গেছে এর মধ্যে, জানিয়ে দিয়েছে আইআইটির কাছে কোন মার্কেটে পৌঁছে আমাকে ফোন করতে হবে। জিপিএসের টাইমলাইন অনুযায়ী আমার সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা পৌনে সাতটা নাগাদই পৌঁছে যাবার কথা।

রঙ্গিয়া পেরোলাম, খানিক বাদে এল b-বর্ণিত একটা জংশন পয়েন্ট বাইহাটা। ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে গেছে, ন্যাশনাল হাইওয়ে হওয়া সত্ত্বেও রাস্তাটা একেবারেই ওয়েল মেনটেনড নয়, জায়গায় জায়গায় খানাখন্দ, আর রাস্তায় আলো না থাকায় প্রায়ই সেইসব খন্দে মোটরসাইকেল পড়ে লাফিয়ে উঠছে, আমি ক্রমশ চিন্তা করে যাচ্ছি ক্যারিয়ারের ক্র্যাক না বেড়ে যায়, লাগেজ খুলে পড়বে না, সে আমি বার তিনেক মোটরসাইকেল থামিয়ে চেক করে দেখে নিয়েছি। কিন্তু ক্যারিয়ারের দুদিকেই ক্র্যাক ধরেছে। ডানদিকে তো রড দু টুকরোই হয়ে গেছে। স্ট্রাকচারের জন্য ভেঙে বেরিয়ে যাবার চান্স নেই। কিন্তু, তবুও …

বাইহাটা চৈরালি (চারমাথার মোড় বোধ হয়) থেকে ডানদিক নিলাম। আইআইটি ক্যাম্পাস এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়। গৌহাটি শহর ক্রমশ এগিয়ে আসছে, বাড়িঘরের সংখ্যা বাড়তে দেখেই আন্দাজ করছি।

ফাইনালি, একটা মোড় থেকে আমাকে জিপিএস বলল বাঁদিকে বেঁকতে। বাঁদিকে একটা বাজার বসেছে, কিন্তু প্রচুর চেষ্টা করেও আমি বাজারের নাম কোনও সাইনবোর্ডে দেখতে পেলাম না। এটাই কি b-বর্ণিত সেই মার্কেট? কে জানে! ক্রমশ সেই বাজারও পেরিয়ে এলাম, ডানদিকে টার্ন, তারপর খানিক গিয়ে আবার ডানদিক – একেবারে জনমানবশূন্য। আইআইটি জাতীয় কোনও কিছুরই চিহ্ন নেই আশেপাশে। এদিকে জিপিএস দেখাচ্ছে একশো মিটার দূরেই আইআইটি, সেখানে অ্যাকচুয়েলি, দেখতে পাচ্ছি, জঙ্গল।

খানিক এগোলাম, সামনে একটা দোকান। হিন্দি বলব, না বাংলা বলব, ঠিক করতে না পেরে শেষমেশ হিন্দিতেই জিজ্ঞেস করলাম, আইআইটিতে ঢোকার রাস্তা কোন দিকে। এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনিও খুব ভাঙাচোরা হিন্দিতে জানালেন, আইআইটির গেট তো অন্যদিকে, আমি হয় তো পেরিয়ে এসেছি, এটা তো আইআইটির পেছন দিক, আমি যদি পারি তো ও-ই সামনে যে বাঁক আছে, ঐখান দিয়ে যেন আবার ডানদিকে বেঁকে যাই, তা হলেই আইআইটির পেছনের গেট পাব।

এগোলাম। ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। বাঁকের মুখে একটা আবছা হয়ে আসা সাইনবোর্ডে লেখা আছে ইন্ডিয়ান অয়েল বটলিং প্ল্যান্ট। কোথায় যাচ্ছি কে জানে – খানিক এগোতে দেখলাম একটা পাওয়ার সাবস্টেশন, আইআইটি। যাক, অন্তত আইআইটি চৌহদ্দিতে এসে পড়েছি। গিয়ে জিজ্ঞেস করতে আমাকে একজন চৌকিদার বাঁদিকের আরেকটা গেট দেখিয়ে দিলেন। বাঁদিকে তাকিয়ে দেখলাম, সেদিকে আরো একটা বিশাল গেট, সেখানে সিকিওরিটি বসে আছে।

সিকিওরিটি তো বিশ্বাসই করতে চায় না যে আমি আইআইটিতে এসেছি, এই গেট দিয়ে কেউ আসে নাকি? ফ্ল্যাট নম্বর বলতেও বোঝে না। খানিক কনভিন্স করাবার চেষ্টা করার ফল হল এই – সে আমাকে আমাজনের ডেলিভারি এজেন্ট ঠাউরাল। আমি নাকি জিনিস ডেলিভারি করতে এসে ভুল গেটে পৌঁছে গেছি। সিকিওরিটির দোষ নেই – শেষে bকে ফোন করতে হল। সে তো ফোন পেয়ে পুরো হতবাক, তুমি ওখানে কী করে পৌঁছলে? ফোনটা সিকিওরিটিকে দাও, আমি কথা বলছি।

ফোনটা স্পিকারে ছিল, আমি সিকিওরিটিকে ডাকলাম, মুগ্ধ হয়ে শুনলাম b পুরো চোস্ত অহমিয়া ভাষায় ফোনে সিকিওরিটির সাথে কথা বলছে। পুরোটাই বুঝতে পারছিলাম, যদিও এক বেলায় শিখে ওঠা সম্ভব নয় – এটুকু বুঝলাম সিকিওরিটি বলছে আপনি চিন্তা করবেন না স্যার, আমি একে বুঝিয়ে সুঝিয়ে মেন গেটে পাঠিয়ে দিচ্ছি, আপনি ঐখানে রিসিভ করে নেবেন, আর b বলছে, না না, ও অনেকদূর থেকে এসেছে, ওকে আর কোথাও পাঠাবেন না, পাঁচ মিনিট দাঁড়ান, আমি ওদিকে পৌঁছে যাচ্ছি, ওখান থেকেই আমি ওকে রিসিভ করে নিচ্ছি। ময় আসু, ময় আসু – এইরকম কিছু একটা বলল লাস্টে, মনে আছে।

পাঁচ মিনিটের মধ্যেই প্রায় উড়ে উড়ে চলে এল b, তার পরে গেট খুলিয়ে আমাকে ক্যাম্পাসে ঢোকানো তো কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। পার্কিংয়ে মোটরসাইকেল লাগিয়ে সেখান থেকে লাগেজ খুলে ওপরের ফ্ল্যাটে পৌঁছতে পৌঁছতেই এসে হাজির হয়ে গেল গেছোদাদা, আর তার খানিক পরেই দেবর্ষি দাস। শ্রীমতি b অনবরত সাপ্লাই দিতে থাকলেন চা, ডিমের চপ ইত্যাদি। মানে এর পরে জীবনের কাছ থেকে আর কীই বা চাইবার থাকতে পারে? অফ অল প্লেসেস, গৌহাটিতে জমে উঠল গুরুভাট। খানিকক্ষণের জন্য ভুলেই গেছিলাম যে রাতে আবার দেশি মুরগীর একটা গল্প ছিল। যতক্ষণে মনে পড়ল, ততক্ষণে বোধ হয় গোটাচারেক ডিমের চপ শেষ করে ফেলেছি।

আমি আবার বেশি খেতে টেতে পারি না – বয়েস হচ্ছে তো। গেছোদাদাকে যেতে হবে খানিক দূর, তাই সে আগেই বিদায় নিল, দেবর্ষি রয়ে গেলেন, মিতভাষী লোকটির সাথে কথা বলে সুখ আছে। খাবার টেবিলে বসে দেখি দেশী মুরগী তো আছেই, সেটা মাত্র দশ পার্সেন্ট। তার সাথে তরিতরকারি, ভাজাভুজি, মাছ, শেষপাতে আবার চাটনি – একেবারে বিয়েবাড়ির খাবার। খেয়ে নিয়ে দেখি প্রায় ওঠার ক্ষমতা নেই।

দেবর্ষি বিদায় নিলেন, এবং বাকিদের গুডনাইট করে আমিও অস্ত গেলাম। মন একটু ভালো লাগছে আপাতত। কাল অরুণাচলে ঢুকব। গেছোদাদা রুট সংক্রান্ত কিছু টিপস দিয়েছিল, সেগুলো ম্যাপ ট্যাপ দেখে মোটামুটি মুখস্ত করে নিলাম।

এক ঘুমে রাত কাবার।


Name:  dd          

IP Address : 670112.51.7812.86 (*)          Date:09 Dec 2018 -- 10:19 PM

খামোখাই অ্যাতো রাস্তাঘাটের ছোবি কিসের জন্য? সে না হয় বই হয়ে বেরোলে তখোন দিও।

এক্ষণে শ্রী ও শ্রীমতি b , গেছোদাদা, দেবর্ষি বাবু - এঁয়াদের ছবিও দিলেই পারো।

আরে নানা, আপত্তির আবার কারন কি?


Name:  pi          

IP Address : 2345.110.564512.48 (*)          Date:09 Dec 2018 -- 10:43 PM

এদের সংগে ভাট মনে পড়ে যাচ্ছিল।

কিন্তু তুমি তেল চপচপে পরোটা খেয়ে জল খেলে? আর বাইরে সব জায়গায় জল খাও? তোমার তো লোহার পাকস্থলী হে!


তবে আমার ঐ ত্রিপুরাসুন্দরীর ট্রেনজার্নি মনে পড়ল, সেই তোমার বাড়ির পাশে অনন্তবিহার না কোন স্টেশন থেকে উঠেছিলাম। আমি ট্রেনজার্নি এত ভালবাসি, কিন্তু ইউপি বিহারী স্ট্রেচ সত্যি বোরিং, আর স্টেশনের খাওয়ও খুব বাজে। ঐ উত্তরবঙ্গ থেকে সুন্দর জার্নি শুরু হয়!


Name:   সিকি           

IP Address : 670112.215.56900.104 (*)          Date:09 Dec 2018 -- 11:01 PM

আমি তো এমনিতে জল টল খাই না, খাই শুধু কিছু খাবার স্স্ময়ে, এই ধরো ভাত খেতে বসে দেড় বোতল জল খেয়ে ফেলি। বাকি সব খেয়েই জল খাই - চানাচুর, চপ, কাটলেট, পরোটা, ভাত, দুধ, ফল। আবার খাবার পরে খানিকক্ষণ জল না পেলে তেষ্টাটা গলাতেই মরে যায়, তারপর আবার অনেকক্ষণ জল না পেলেও চলে।

ডিডিদা, লোকজনের ছপি তোলা হয় নি, সেটা bএর বাড়ি থেকে বেরোবার পরে মনে পড়েছিল :(


Name:   সিকি           

IP Address : 670112.215.56900.104 (*)          Date:09 Dec 2018 -- 11:02 PM

অনন্ত নয়, আনন্দ বিহার। হ্যাঁ মনে আছে, এক সুটকেস তেল নিয়ে ট্রেনে চেপেছিলে। :)


Name:   সিকি           

IP Address : 670112.215.56900.104 (*)          Date:09 Dec 2018 -- 11:04 PM

এই যে, আমার সেলপি। সেভক ব্রিজ পেরিয়ে কালিম্পংয়ে।


https://i.postimg.cc/VLvLsKTp/20181119-092456.jpg


Name:  I          

IP Address : 7845.15.451223.59 (*)          Date:09 Dec 2018 -- 11:30 PM

দিব্য সেলফি।গুয়াহাটি আই আই টি তে আমার বন্দুক শুভ্রদীপ এর সাথে দেখা হয়েছিল না?


Name:  Tim          

IP Address : 89900.253.8956.205 (*)          Date:09 Dec 2018 -- 11:50 PM

ইন্দোদা মন দিয়ে পড়ছেনা ঃ)


Name:  aranya          

IP Address : 3478.160.342312.238 (*)          Date:09 Dec 2018 -- 11:54 PM

দারুণ হচ্ছে। সিকি-র চাগ্রি-বাগ্রি ছেড়ে শুধু ভ্রমণ আর ট্রাভেলগ - এই নিয়েই থাকা উচিত


Name:  Izhikevich          

IP Address : 891212.185.5678.71 (*)          Date:10 Dec 2018 -- 10:28 AM

আইআইটি গৌহাটি ক্যাম্পাসটা বেশ সুন্দর। ছবি নাই কেন? সেখানে লেপার্ডও বেরোয় মাঝে মাঝে।


Name:  সিকি          

IP Address : 562312.19.4534.88 (*)          Date:13 Dec 2018 -- 09:46 AM

হেঁইও, ডুবে যাবার আগে তুলে রাখি। দেখি আজ এগোতে পারি কিনা।


Name:  গবু          

IP Address : 2345.110.674512.16 (*)          Date:13 Dec 2018 -- 06:44 PM

বেশ বেশ! শীঘ্রস্য শুভম!


Name:  dc          

IP Address : 127812.49.787812.223 (*)          Date:13 Dec 2018 -- 07:05 PM

"আমি তো এমনিতে জল টল খাই না, খাই শুধু কিছু খাবার স্স্ময়ে, এই ধরো ভাত খেতে বসে দেড় বোতল জল খেয়ে ফেলি। বাকি সব খেয়েই জল খাই - চানাচুর, চপ, কাটলেট, পরোটা, ভাত, দুধ, ফল।"

আমার মেয়ের এক্কেবারে সেম অভ্যাস। জল ছাড়া কিছু খেতে পারে না, এমনকি দুধ মুড়ি মেখে দিলে তার সাথেও জল চাইবে। বাকি সময়ে একফোঁটা খাবে না।


Name:  তারপর          

IP Address : 785612.51.234523.224 (*)          Date:15 Dec 2018 -- 01:30 PM

পড়বো বলে বসে আছি।


Name:   সিকি           

IP Address : 670112.223.8989.135 (*)          Date:15 Dec 2018 -- 04:37 PM

আজ রাতে। প্রমিস।


Name:  সুকি          

IP Address : 90045.205.012323.215 (*)          Date:15 Dec 2018 -- 05:57 PM

কবে আসবে লেখা? রাতে আসবে তো ঠিক?


Name:   সিকি           

IP Address : 670112.215.56900.104 (*)          Date:15 Dec 2018 -- 09:38 PM

তিন দিনে চলে এসেছি প্রায় দু হাজার কিলোমিটার। আজ একটু বিশ্রাম নিলে ভালোই হত, কিন্তু প্ল্যান বলছে আজ আমাকে দিরাং পৌঁছতে হবে। দূরত্বটা কম – তিনশো চার কিলোমিটার, কিন্তু রাস্তাটা পাহাড়ী। তবে একটু্ দেরি করে বেরোলেও চলবে। তাই চোখ খুললাম সকাল সাড়ে ছটায়।

মোবাইল অন করে দেখি শুভ্রদীপের মেসেজ – তুমি কি গৌহাটি এসেছো?

শুভ্রদীপ আমার ফেসবুক বন্ধু – কীভাবে যোগাযোগ হয়েছিল জানি না, আমাদের কমন ফ্রেন্ড ইন্দো, এইটুকু জানতাম। বাকি তিনি কে, কী কোথায় থাকেন, কিছুই জানি না, খোঁজ নেবার দরকারও মনে করি নি কোনওদিন। প্রথমে তাই লিখলাম, হ্যাঁ, কাল রাতেই এসেছি, আজ চলে যাবো – তারপরে কী মনে হল, শুভ্রদীপ নিশ্চয়ই গৌহাটিতেই থাকে, না হলে “এসেছো” লিখবে কেন? ঝট করে শুভ্রদীপের প্রোফাইলে গিয়ে দেখি, পরিষ্কার লেখা আছে, আইআইটি গৌহাটি। যাব্বাবা! আমরা তো একই জায়গায় আছি তার মানে।

সঙ্গে সঙ্গে লিখলাম, ইন ফ্যাক্ট, তোমার খুব কাছেই আছি। b-এর বাড়িতে। কিন্তু আমি তো একটু বাদেই বেরোব। তুমি এখানেই থাকো জানলে তো কাল রাতেই ডেকে নিতাম, কত আড্ডা হল।

শুভ্রদীপ লিখল, কটায় বেরোবে তুমি?

আমি লিখলাম, সাড়ে সাতটা অ্যাপ্রক্সিমেটলি।

– তুমি তৈরি হও। আমি মেয়েকে স্কুলবাসে তুলে দিয়েই আসছি সাতটা নাগাদ। bকে বলো, আমার জন্যে এককাপ ভালো করে চা বানাতে।

সাতটা চার নাগাদ দরজায় দর্শন দিল শুভ্রদীপ, এই প্রথম সামনাসামনি দেখা, কিন্তু যেন কতদিনের আলাপ। ফেসবুক আর গুরুচণ্ডা৯র ভার্চুয়াল আলাপ পরিচিতি শুধুই ভার্চুয়াল থাকে না সামনাসামনি মানুষগুলো এসে দাঁড়ালে। সেই অর্থে b, দেবর্ষি, শুভ্রদীপ – তিনজনকেই আমার এই প্রথম চাক্ষুষ দেখা। অতএব, আবার একপ্রস্থ আড্ডা, চটজলদি চায়ের সাথে। আমি ব্যাগপত্র গুছিয়ে তৈরি হয়ে নিলাম, তিনজনে মিলে হাতে হাতে ধরে ব্যাগ নামিয়ে নিচে পার্কিংয়ে আসতে আসতে আটটা প্রায় বাজে বাজে। ঝটপট আমার দৈনিক ইড়িমিড়িকিড়ি বাঁধন বেঁধে দুজনকে টা টা বাই বাই করলাম। শুভ্রদীপ বলল, দাঁড়াও, কালকে তো তুমি পেছনের গেট দিয়ে ঢুকেছো, সামনের গেটে তো এন্ট্রি নেই, হয় তো আটকাতে পারে, আমি যাচ্ছি গাড়ি নিয়ে তোমার আগে আগে।

তাইই হল। একেবারে রাজকীয় এক্সিট হল ভোর ভোর – সামনে শুভ্রদীপ গাড়ি চালিয়ে চলেছে, পেছনে মোটরসাইকেলে বোঁচকাবুঁচকি নিয়ে আমি। একদম মেনগেটের সামনে এসে ফাইনালি শুভ্রদীপকে বিদায় জানিয়ে আমি এগোলাম। শেষবেলায় মনে পড়ল, কারুর কোনও ছবি তোলা হয় নি।

সকালবেলার গৌহাটি আইআইটি ক্যাম্পাসের চারপাশটা বেশ নির্জন। একটা হালকা ফ্যাকাশে কুয়াশার আস্তরণ জড়িয়ে আছে চারপাশে। একটু এগোতেই বড়রাস্তা পেয়ে গেলাম। পেট্রল পাম্পে তেল ভরে নিয়ে এবার এগনো অরুণাচলের রাস্তায়। দূরে হাতছানি দিচ্ছে নীল পাহাড়ের শিল্যুয়েট।

গৌহাটি থেকে দিরাং হয়ে তাওয়াং যাবার দুটো রাস্তা। একটা সাধারণ প্রচলিত রাস্তা – যেটা যায় অল্প করে তেজপুর ছুঁয়ে ভালুকপং হয়ে বমডিলা দিয়ে। আরেকটা রাস্তা খুলেছে কয়েক বছর হল, সেটা যায় ভুটান সীমান্ত ছুঁয়ে, কালাকটাং বলে একটা জায়গা পেরিয়ে। বাইহাটা পর্যন্ত রাস্তা আগের দিনের মতই, এখান থেকে ডানদিকে বাঁক নিয়ে যেতে হয় – সিপাঝাড় পেরিয়ে মঙ্গলদই, সেখান থেকে আরেকটু এগিয়ে খারুপেটিয়া। পুরোটাই লোকালয়ের মধ্যে দিয়ে যাওয়া, রাস্তাও খুব একটা চওড়া নয়, ভালোও নয়, অল্পবিস্তর খানাখন্দে ভর্তি।

খারুপেটিয়ার পরেই বাঁদিকে একটা সরু মতন রাস্তা আছে ম্যাপে, জিপিএস যদিও সে রাস্তা রেকমেন্ড করে না – কিন্তু গেছোদাদা বলেছিল এই রাস্তাটা একটা স্টেট হাইওয়ে, সোজা নিয়ে গিয়ে ফেলে ভুটান সীমান্তের কাছে, দূরত্ব খানিকটা কমিয়ে দেয়। তো, ঢুকে পড়লাম। খানিক ভাঙাচোরা রাস্তা পেরিয়ে দেখি দিব্যি ভালো রাস্তা। একেবারে গ্রাম-আসামের (গ্রামবাংলার অনুকরণে) মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। দু পাশে ছোট ছোট গ্রাম, গোলাভরা ধান, ক্ষেতভরা ফসল, গোয়ালভরা গরু এবং রাস্তাভরা গোবর – এইসব দেখতে দেখতে দু তিন কিলোমিটার চলতে না চলতেই ভালো রাস্তা ফিনিশ, এবং নেই-রাস্তার শুরু। মাটি, কাদা, ইঁট, খোয়া ইত্যাদি দিয়ে বানানো মেকশিফট রাস্তা – কোথাও বাঁকাবাঁকি নেই, সোজা বাইশ কিলোমিটার চলতে হবে এই রাস্তায়। … এই রাস্তায়?

একেকটা ঝাঁকুনির সাথে সাথে চিন্তা বেড়ে যাচ্ছে, এক তো ক্যারিয়ারের দুদিকেই লোহার রড ভেঙে আলাদা হয়ে গেছে, যদিও আশু পুরো ব্যাপারটা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা নেই, কিন্তু রাস্তার এই অবস্থা হলে দুর্ঘটনা ঘটতে কতক্ষণ? আর দ্বিতীয়ত, এই স্পিডে যদি এতখানি রাস্তা চলতে হয়, তা হলে আবারও দিরাং পৌঁছতে পৌঁছতে রাত হবে। রাত বলতে, ভারতের এই উত্তরপূর্বদিকে এখন বিকের চারটের পরেই ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসছে। সাড়ে চারটেয় ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। যেখানেই যাই, বিকেল সাড়ে চারটের মধ্যে জার্নি শেষ করতেই হবে, না হলে অন্ধকারে এই ধরণের রাস্তায় চলা খুবই কষ্টকর।

এইসব ভাবতে ভাবতেই আবার দেখি রাস্তা বেশ ভালো হয়ে গেল। দশ এগারো কিলোমিটার সুন্দর রাস্তা পাবার পরে আবার কয়েক কিলোমিটার খারাপ রাস্তা, তারপরে আবার ভালো রাস্তা ছাড়িয়ে গিয়ে পৌঁছলাম উদলগুড়ি বলে একটা জায়গায়। এখান থেকে একটু এগোলেই ভৈরবকুণ্ড, ভুটানের সীমান্ত। রাস্তায় ভুটানের লাল রঙের নাম্বারপ্লেটওলা গাড়ির সংখ্যা বেশ বেড়ে গেছে দেখতে পাচ্ছি। আমি চলেছি এইসবের মধ্যে দিয়েই, কিন্তু কেমন যেন একটা বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকার অনুভূতি, সমানে আমাকে ঘিরে রেখেই চলেছে। …

… ডিভাইন ডিসকনটেন্ট। আসার আগে, অফিসের একটা লিডারশিপ প্রোগ্রামে এই বিষয়ের ওপর একটা সেশন অ্যাটেন্ড করে এসেছিলাম। শব্দবন্ধটা বেশ একটু অক্সিমোরন শুনতে। ডিসকনটেন্ট, বিচ্ছিন্নতাবোধ, সে আবার ডিভাইন হয় কেমন করে? ফেসিলিটেটর বোঝাচ্ছিলেন, এ হল সেই ডিসকনটেন্ট, যা তোমাকে স্থির থাকতে দেয় না, যা তোমার স্থিতাবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে, যা তোমাকে জাগিয়ে রাখে রাতে, যা তোমাকে তাড়িয়ে নিয়ে চলে পরের পর মাইলস্টোন ছুঁয়ে চলার নেশায়।

স্থিতাবস্থা। কাকে বলে, স্থিতাবস্থা? চল্লিশ পেরিয়ে গেছি প্রায় কত যেন বছর হতে চলল, শোবার ঘরে এসি আছে, গরমকালে চলে, অফিস সেন্ট্রালি এসি, সুন্দর গদি-আঁটা চেয়ার, সেখানে একটা মাঝারি গোছের পদ আছে, প্রোজেক্ট ম্যানেজার, পোর্টফোলিও ম্যানেজার। জুনিয়র কিছু ছেলেপুলে আমাকে সম্মান করে, কেউ কেউ আমাকে স্যার বলে, বার বার বলেও তাদের কর্পোরেট কালচারে অভ্যস্ত করাতে পারি নি এখনও। একটা গাড়িও আছে, চার চাকার। এসি চলে। মাস গেলে খুব খারাপ মাইনে পাই টাই না। আমি তো তথাকথিত সুখী মানুষদের দলে পড়ি। স্থিতাবস্থায় তো আমারও অভ্যস্ত হয়ে যাবার কথা এতদিনে। তবু হতে পারি না কেন? কেন রাতের পর রাত ঘুম ভেঙে যায়? ঘুম আসে না? এতোল বেতোল চিন্তা আসে? কেন শেষরাতের ঝোঁকে শেষবারের মত ঘুম আসার আগে, প্রত্যেকদিন মনে হয়, সব মিথ্যে, সবকিছু মিথ্যে, মিথ্যে একটা জীবন কাটাচ্ছি? … মিডলাইফ ক্রাইসিস?

মোটরসাইকেল নিয়ে যেদিন প্রথম নেমেছিলাম লাদাখের রাস্তায়, তখন আমার বয়েস ছিল চল্লিশের সামান্য কম। অফিস একটা বিশাল বড় ভয়েড, একটা ব্ল্যাকহোল হয়ে আমাকে গিলে খেতে আসছিল। প্রফেশনাল লাইফে চূড়ান্ত অন্ধকার সময় দেখে দেখে তখন আমি ক্লান্ত, সেই সময়ে রাতের স্বপ্নে আসত বেড়িয়ে পড়ার ইচ্ছে। শেষরাতের নির্জন রাস্তা, হ্যালোজেনের আলো, আর আমি চলেছি একলা। লাদাখ ঘুরে আসার পরও সেই স্বপ্ন ছাড়ে নি, আরও জোরে ঝাঁকিয়ে বসেছিল আমার মনে। এর পর টুকটাক এদিক ওদিক গেলাম, স্পিতি গেলাম, আমার বই বেরোল, লোকে ভিড় করে এল, বই কিনল, সুন্দরী সুন্দরী বান্ধবীরা বলল, বাব্বা, সিকি, তুমি তো সুপারম্যান – একদিনে এত লম্বা চালাও? তুমি ক্লান্ত হও না? পারো কী করে?

আমি মুখে হেসেছি, বলেছি, এ আর এমন কী ব্যাপার। মনে মনে গর্বিত হয়েছি, ওঃ, আমার ফ্যানবেস বাড়ছে, আমার একটা “ইমেজ” তৈরি হচ্ছে। লোকে আমার বই কিনে নিয়ে যাচ্ছে গুরুচণ্ডা৯র স্টল থেকে, সেইখানে আমি সই দিচ্ছি, গর্ব হবে না?

কালাচাঁদ দরবেশের গল্প মনে পড়ে তখন। কল্লোলদা শুনিয়েছিল, একাধিকবার।

এইচএমভি কালাচাঁদ দরবেশের ক্যাসেট বের করতে চায়, কিন্তু দরবেশ ধরা দেন না। এদিক সেদিক বিস্তর খোঁজাখুঁজির পর তাঁর খোঁজ পাওয়া যায় এক গাছতলায়। মাধুকরী করে দিন গুজরান করেন। ততদিনে কালাচাঁদের দেশ পেরিয়ে বিদেশেও খ্যাতি ছড়িয়েছে, আমেরিকায় গিয়ে গান করে এসেছেন। ভক্তরা বলে, তোমার এত নামডাক – ইচ্ছে করলেই দুটো ক্যাসেট বের করে তার টাকায় পায়ের ওপর পা তুলে বসে খেতে পারো, তুমি ভিক্ষে করো কেন?

কালাচাঁদ মিষ্টি হেসে বলেন, কেন ভিক্ষে করি, শুনবি? বোস।

ভক্ত বসে, সেই ধূলোটমূলে। কালাচাঁদের পায়ের কাছটিতে। কালাচাঁদ তাকে জিগান, বল তো, এই পৃথিবীতে কত লোক আছে?

– ধুর, তা আবার বলা যায় নাকি? সে তো অনেক!

– তাও, বল না।

– তা হবে, কোটি কোটি কোটি।

– হ্যাঁ রে, কোটি কোটি কোটি। তো এই কোটি কোটি কোটি লোকের মধ্যে কত লোক গান গাইতে পারে?

– তা কয়েক কোটি হবে।

– আর সেই কয়েক কোটির মধ্যে কত লোক এস্টেজে উঠে গান গাইবার সুযোগ পায়? এই ধর তোর আমার মতন লোক? যার গান লোকে পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে দেখতে আসে?

– তা তো হবেই কয়েক লাখ, কি কয়েক হাজার!

– এইবারে তুই একবারটি ভেবে দ্যাখ, এই যে দুনিয়া জোড়া কোটি কোটি কোটি মানুষ, তাদের মধ্যে মাত্র কয়েক হাজার মানুষ, যাদের গান লোকে খচ্চা করে শুনতে আসে, তাদের একজন হচ্ছিস তুই, আর আরেকজন হচ্ছি আমি।

– তা, সে তো বটেই।

– গব্বো হয় না?

– তা, একটু হয় বৈকি।

– অ্যায়, ওইখানটিতেই তোর পতন। যেই তোর গব্বো হয়ে গেল মনের মধ্যে, তুই গেলি। তোর সাধনা, তোর সাফল্য, সব ধূলোমাটি হয়ে উড়েপুড়ে গেল। ঐ গব্বোটি আমি হতে দিই না কিছুতেই, বুঝলি? যখনই লোকে এসে বলে – আপনার তো কত নামডাক, দেশে-বিদেশে যান, আপনে তো বিখ্যাত মানুষ, মনে গব্বো আসে, তখনই আমি ভিক্ষে করতে বেরোই। মাথা নিচু করে ভিক্ষে চাই। লোকে দয়া করে ভিক্ষে দেয়, আমি সেই দয়ার দানে পেট ভরাই। গব্বো আমায় খেতে পারে না।

……………………………………………………….

আমি তো কর্পোরেটের চাকুরে। আমি তো কালাচাঁদ দরবেশ হতে পারি না। আমি সে মেটেরিয়ালই নই। টের পাই, গর্ব হচ্ছে। গর্ব আমাকে খেয়ে নিচ্ছে। মাটির থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। তাই কি আমি রাস্তায় নেমেছি, একলা? সাতরাজ্যের ধূলো মাখছি, ব্যথা দিচ্ছি শরীরকে, এসির আরাম ছেড়ে রুক্ষ আবহাওয়ার মধ্যে হাওয়া কেটে বেড়াচ্ছি? এইজন্যেই কি? নাকি সেই যে আমার অনুরাগীরা বলে, বাব্বা সিকি, কী করে পারো, সেই কথাটুকু শোনার জন্য জোর করে আবার বেরোই, পরের বইয়ের, পরের লেখার প্লট বানাবো বলে বেরোই, সেই মুগ্ধতার খোলসটাকে গায়ে চড়িয়ে, সেটাকেই আসল আমি মনে করে অন্য একটা আমি বেরোই। আসলে কি মনের মধ্যে আমার সেই স্বপ্নটা আজও আছে? নাকি, নেই আর?

মন তো বলছে, না, নেই। এক বছর আগের আমি আর আজকের আমি অনেকটা বদলে গেছি। সেই থ্রিল, সেই আনন্দ আর পাচ্ছি না। নিজেকে কেমন যেন, জোর করে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি এইবারে মনে হচ্ছে। ডিসকনটেন্ট তৈরি হচ্ছে আবার, কিন্তু সেই ডিসকনটেন্টের মধ্যে ডিভাইনিটি নেই, কেমন যেন অভিমুখবিহীন লাগছে নিজেকে, কী করলে, কীভাবে বাঁচলে এই ডিসকনটেন্টের হাত থেকে মুক্তি পাবো, কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না। কেমন যেন দিনের পর দিন মনে হচ্ছে জাস্ট লোকে আমার এই বাইকার রাইডার ইমেজটা জানে, সেই ইমেজটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমি চলেছি কিলোমিটারের পর কিলোমিটার, এটা আর ঠিক সেই রকমের প্যাশন নেই, এমনটা ছিল গত বছর পর্যন্ত।

কেন করছি এই অভিনয়? কীসের দায় লোকের কাছে ইমেজ বজায় রাখার? আমি তো চাইলেই কালকে জার্নি ক্যানসেল করে ফিরে চলে যেতে পারি। চলে যাবো? মাত্র চারদিনের রাস্তা এসেছি। চাইলে আরামসে চারদিন কি ছদিনে আমি ফিরে যেতে পারি আবার দিল্লিতে, আমার চেনাপরিচিতির ঘেরাটোপে।

… এই ধরণের চিন্তা আমার মাথায় কখনও আগে আসে নি, এইবারে আসছে। ফিরে যাওয়া, জার্নি অ্যাবর্ট করা। সবাই জানে সিকি বেড়াতে যাচ্ছে, আমি জানি, আমি বেড়াতে যাই না, আমি নিজেকে খুঁজতে যাই, খুঁজে পাই হয় তো কিছুটা – কিন্তু এইবারে আর পাচ্ছি না। নিজের কাছে আমার সত্যিকারের আমি-টা কিছুতেই ধরা দিচ্ছে না। এ আমার কী হয়ে গেল? …


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/12/DSC_0152.jpg
(অরুণাচলে ঢোকার মুখে। বাঁদিকটা ভুটান। সোজা রাস্তা চলে যাচ্ছে কালাকটাংএর দিকে।)

ভুটান বর্ডারের গা ঘেঁষেই শুরু হচ্ছে অরুণাচলের সীমা। হিসেবমত এখানে আইএলপি দেখানো উচিত, কিন্তু কেউ দেখতেই চাইল না, একটা চেকপোস্ট মত ছিল, সেখানে একবার দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেসও করলাম, কালাকটাং হয়ে দিরাং যাবার পথ এটাই কিনা, মিলিটারি ছেলেটি হাসিমুখে হ্যাঁ বলল, কিন্তু আইএলপি তো দেখতে চাইল না!

বেলা প্রায় দেড়টা নাগাদ কালাকটাং পৌঁছে গেলাম, রাস্তা মোটের ওপর ভালোই, অল্প কিছু খারাপ স্ট্রেচ বাদে। এখান থেকে আরেকটু এগোলেই শেরগাঁও বলে একটা জায়গা। সেখানে পৌঁছতে পৌঁছতেই প্রায় তিনটে বেজে গেল। দিনের আলো আর খুব বেশি হলে দেড় ঘণ্টা থাকবে, এদিকে দিরাং তখনও আরও একশো কিলোমিটার দূরে।

পাহাড়ি রাস্তায় একশো কিলোমিটার পার হতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগতে পারে, রাস্তা কেমন তার ওপর নির্ভর করছে। কিছু খেয়ে নেওয়া যাক। ছোট্ট একটা দোকানে ঢুকে চা আর ম্যাগি খেয়ে খিদে মেটালাম। বাকি খাওয়াদাওয়া দিরাং পৌঁছেই করা যাবে বরং। দিরাংয়ে আমার কোনও বুকিং নেই, গিয়ে একটা হোমস্টে খুঁজতে হবে।


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/12/DSC_0156-1.jpg

শেরগাঁও থেকে দিরাং যাবার একটা শর্টকাট আছে। মোরসিং হয়ে যায়। আর লম্বা রাস্তাটা যায় রূপা, বমডিলা হয়ে। দোকানের ছেলেটা জানাল শর্ট রাস্তাটা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যায়, যেহেতু আর একটু পরেই অন্ধকার হয়ে যাবে, তাই জঙ্গলের রাস্তা না নেওয়াই ভালো, আমি যেন রূপার রাস্তা নিই, ভালো রাস্তা আছে আগে দিরাং পর্যন্ত, আরামসে চলে যাব।


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/12/20181120_203349.jpg
মা-মুরগী ও তার ছানাপোনারা। শেরগাঁওয়ের পথে।

শেরগাঁও ছাড়ার একটু পরেই রাস্তা সত্যি সত্যি ভালো হয়ে গেল, একদম রানওয়ের মত মসৃণ। গতি বাড়ালাম। ধীরে ধীরে দূরত্ব কমছে, আশি, সত্তর, ষাট – বমডিলা যখন ঢুকলাম, তখনই নিকষ অন্ধকার, ছটা বাজতে তখন আর দশ মিনিট বাকি। এখান থেকে দিরাং আর মাত্র পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার। কী করা উচিত? বমডিলাতেও থাকার জন্য হোমস্টে পাবো। থেকে যাবো, নাকি দিরাং যাবো? পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার এমন কিছু লম্বা দূরত্ব নয় – এটুকু এগিয়ে গেলে কালকের রাস্তাতেও খানিকটা এগিয়ে থাকা হবে। আমি ক্লান্ত, দুই উরুতে রক্ত জমে যাওয়ার মত অনুভূতি হচ্ছে, তবুও আর চালাতে পারব না, এমন অবস্থায় নেই। না, কাল পেনকিলার খাই নি, তাতে ব্যথা বাড়েও নি, কমেও নি। পিঠে ঘাড়ে হাতে কোথাও কোনও অস্বস্তি নেই, কেবল পা ধরে যাচ্ছে, উরুর কাছে।


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/12/DSC_0158.jpg

এগিয়েই গেলাম। প্রায় সাড়ে ছটা বাজল দিরাং পৌঁছতে। বাঁ হাতে প্রথম যে হোমস্টে দেখলাম, সেখানেই নক করতে এক বয়স্কা মহিলা বেরিয়ে এলেন। হ্যাঁ, রুম আছে।

মেন গেটে তালা পড়ে গেছিল, উনি তালা খুলে দিলেন, ভেতরে একটা ছোট্ট কম্পাউন্ড মতন, তার দুদিক ঘিরে ঘর। ঘাসে ঢাকা কম্পাউন্ডে দেখতে পেলাম, একটা বুলেট রাখা আছে, মেরুন রঙের, তাতে দিল্লির নাম্বারপ্লেট। দিল্লি থেকে আরও কেউ এসেছে?

ঠাণ্ডা আছে, তবে অসহনীয় কিছু নয়। পাঁচ ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াস মত হবে। বেশ আরামদায়ক ঠাণ্ডা। হোমস্টে-র হোস্টেসকে বললাম, কাল সকালেই তো বেরিয়ে যাবো, সমস্ত লাগেজ তা হলে আর মোটরসাইকেল থেকে খুলছি না, আমি কভার করে দিচ্ছি পুরোটা। একটা ব্যাগ, যাতে আমার রাতের জামাকাপড় আর জরুরি জিনিস ছিল, সেটুকু নিয়ে ঘরে ঢুকলাম। ঢোকার মুহূর্তেই হোস্টেস বললেন, দো ফরেনার লোগ আয়া হ্যায়। ও ভি দিল্লি সে। বাত করো।

দিল্লি থেকে ফরেনার এসেছে? সে আবার কী কেস? এই দিল্লির নাম্বারওলা বুলেটটা কি তাদেরই?

হ্যাঁ, তাদেরই। কিচেনে বসে আছে।

বেশ। ধরাচুড়ো ছেড়ে পায়ে পায়ে কিচেনে গেলাম, একটি বিদেশি দম্পতি বসে আছেন জল গরম হওয়া একটি জাম্বো সাইজের সামোভারের সামনে। সামনে আরও দুটো চেয়ার রাখা, ওটা ওম পোয়ানোর জায়গা। সামোভারে জল ফুটছে, তাতেই রান্নাবান্নার কাজ চলবে। দুজনেরই গায়ের রঙ লালের শেড পেরিয়ে একটু তামাটের দিকে, মানে অনেকদিন ধরে ঘুরছেন, মহিলাটির কোলে একটি মোটাসোটা লোমশ বেড়াল।

গিয়ে বসলাম, আলাপ হল। ফ্রান্স থেকে এসেছেন। মহিলাটি ইংরেজি বলতে ও বুঝতে পারেন, তাঁর স্বামী একেবারেই ফ্রেঞ্চের বাইরে কিস্যু জানেন না। শুনলাম, প্রায় এক মাস ধরে ঘুরছেন। দিল্লি থেকেই মোটরসাইকেল রেন্ট নিয়ে এসেছেন। আজই তাওয়াং থেকে ফিরেছেন। এর আগে নাগাল্যান্ড, মেচুকা, রোয়িং ইত্যাদি জায়গা ঘুরে এসেছেন। তাওয়াংয়ে তিনদিন ছিলেন, এখানে দুদিন কাটিয়ে এখান থেকে নেমে এর পরে মেঘালয় ঘুরতে যাবেন।

গল্পগুজব হল, একপ্রস্থ চা আর বাটার টোস্টের সাথে। বলার মত ঘটনা বলতে, এর মাঝে বেড়ালটি কী কারণে কে জানে, আমাকে পছন্দ করে বিনা নেমন্তন্নেই এক লাফে আমার কোলে চলে এল। আমি কুকুর বেড়াল এমনিতে অপছন্দ করি টরি না, কাছে এলে হাত বুলিয়েও দিই টিই, কিন্তু গায়ে নিয়ে ঘষাঘষি আমার একদম পোষায় না। তবে কিনা ইনি হোমস্টে মালকিনের বেড়াল, সম্ভবত গেস্টদের কোলে উঠে আদর খাওয়া এঁর অভ্যেস, এতক্ষণ ফরাসী আদর খেয়ে এখন বাঙালি দেখে হয় তো স্বাদবদল করতে এসেছেন, কী আর করা, খানিক গায়েমাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম, তিনি ঘ্রুর্‌র্‌ ঘ্রুরুৎ টাইপের আওয়াজ করে আদর খেয়ে খানিক বাদে নিজে থেকেই নেমে ভেতরঘরে চলে গেলেন।

যে সব জায়গায় তাড়াতাড়ি অন্ধকার হয়ে যায়, সেখানে সময় আস্তে ধীরে চলে। অনেকক্ষণ গল্পগুজব করার পরে দেখলাম মাত্র পৌনে আটটা বাজে। ফরাসী দম্পতি বারান্দায় চলে গেলেন ফুঁকতে। আমি মালকিনের সাথেই গল্প জুড়লাম।

এঁরা মোনপা উপজাতির লোক। সম্পূর্ণ অরুণাচল প্রদেশে ছাব্বিশ রকমের উপজাতি আছে। উপজাতির ইংরেজি হচ্ছে ট্রাইব। সেই হিসেবে সাব-ট্রাইবের বাংলা কী হবে? উপ-উপজাতি? সমগ্র অরুণাচলে একশোরও ওপর সাব-ট্রাইব আছে। এঁরা মোনপা ট্রাইব, আর সাব-ট্রাইবের হিসেবে এঁরা হলেন দিরাং মোনপা। সেলা পাসের অন্যপারে তাওয়াংয়ে আছে তাওয়াং মোনপা।

জিজ্ঞেস করলাম, দিরাং মোনপা আর তাওয়াং মোনপার মধ্যে কতটা তফাত? আপনারা কি তিব্বতিদেরই বংশধর উপজাতি? মালকিন বললেন, না, তিব্বতি নই। আমরা খানিকটা ভোট (মানে ভুটানিজ), খানিকটা বার্মিজ, বাকিটা অরুণাচলীই। তাওয়াং মোনপাদের থেকে আমাদের ভাষা একটু আলাদা, কালচারও সামান্য আলাদা।

সাড়ে আটটা নাগাদ তিনি দুঃসংবাদটি দিলেন। রাতের খাবার হবে, কিন্তু নন-ভেজ নেই। পুরো লে হালুয়ে কেস। আমাকে আগে বললে আমি হারগিজ এই হোমস্টে-তে আসতাম না! বাইরে এখন কোনও দোকানপাটও বোধ হয় খোলা নেই।

আমার মুখ দেখে মালকিনের করুণা হল, উনি বললেন, একটা ডাবল ডিমের অমলেট করে দেব।

ভাগ্যিস দিয়েছিলেন, তাই দিয়েই গোটা তিনেক রুটি খেলাম, কারণ সঙ্গের যে তরকারিটা ছিল, সেটা ঠিক কীসের তরকারি ছিল – বহু চেষ্টা করেও বুঝতে পারি নি, কারণ না তাতে আলু ছিল, না মটরশুঁটি বা গাজরের মত চেনাশোনা কোনও পদার্থ ছিল।

খাবার টেবিলে আরও খানিক তথ্য জোগাড় করার চেষ্টা করলাম ফরাসী দম্পতির থেকে, ওঁরা আজকেই তাওয়াং থেকে ফিরেছেন কিনা। না, রাস্তা পরিষ্কার, তেমন বরফ টরফ নেই, তবে খুব কুয়াশা ছিল, খুব, সেলা লেকের সামনে দাঁড়িয়ে নাকি সেলা লেক দেখা যাচ্ছিল না এতটাই ঘন কুয়াশা। তবে এখন তো আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেছে, কাল আমি সুন্দর রোদ ঝলমলে সেলা দেখতে পেলেও পেতে পারি।

শুভরাত্রি জানিয়ে কম্পাউন্ডে নেমে এলাম, মোটরসাইকেলের কভার ছিল, সেইটা দিয়ে বেশ ভালো করে মুড়ে দিলাম মোটরসাইকেলটাকে। বাইরের গেটে তালা দেওয়া, বেরনোর উপায় নেই, চারদিক নিঝঝুম, খানিক ওখানেই গেটের সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। কাল তাওয়াং পৌঁছনো।

তাওয়াং আমার ইটিনেরারি থেকে ছেঁটে দিয়েছিলাম, যাবার কথা ছিল না, শেষ মুহূর্তে ঢুকিয়েছি, হতে পারে সেটার জন্য মন থেকে তেমন ইচ্ছে হচ্ছে না, তবে মূল কারণ হচ্ছে পর পর লাগাতার চলা, একেবারে বিশ্রাম হচ্ছে না, এইটাও ফ্যাটিগের একটা কারণ হতে পারে।

না, আপাতত ফিরব না। কাম হোয়াট মে, দ্য শো মাস্ট গো অন।

যাই, শুয়ে পড়ি।


Name:  dd          

IP Address : 670112.51.2323.240 (*)          Date:15 Dec 2018 -- 10:12 PM

বাঃ, বাঃ।

বেশ লাগছে পড়তে। চারিদিকে অ্যাতো থোর বড়ি খাড়া গোছের লোক দেখি আর আমি নিজেই চিরোকালই অ্যাতো ঘরকুনো যে এরকম অ্যাডভেঞ্চারের গপ্পো শুনতে ভারী ভালো লাগে।

কিন্তু সিকির, অ্যাতো অহৈতূকী ভাবনা কিসের? আমার সেই টিন এজেই যা একবার মিডলাইপ ক্রাইসিস হয়েছিলো, তারপরে বাকী জীবনে সত্যিকারের ক্রাইসিস অ্যাতো হয়েছিলো , তারপরে কেমন অভ্যেস হয়ে গ্যালো।

কিন্তু সে কথা থাক। সিকি তুমি গাড়ী চালাও, আমরা তোমরা সংগে আছি।


Name:   সিকি           

IP Address : 670112.215.56900.104 (*)          Date:15 Dec 2018 -- 10:15 PM

:)

অজ্জিত আর ইন্দোদাদা অশা করি উত্তর পেয়েছে।


Name:  r2h          

IP Address : 232312.172.8912.125 (*)          Date:15 Dec 2018 -- 11:09 PM

আমার মাঝেমধ্যে কৌতুহল হয়, ঘরকুনো লোকেরাই কি এইরকম বেড়ানোর গল্পে বেশি আপ্লুত হয়? এই যেমন আমি বা ডিডিদা, আর 'এইরকম' শব্দটাতে আন্ডারলাইন।


Name:   সিকি           

IP Address : 2389.223.45.62 (*)          Date:15 Dec 2018 -- 11:50 PM

মামু আপ্লুত হলেই হাইপোথিসিসটি প্রমাণিত হয়।


Name:  সুকি          

IP Address : 90045.205.012323.215 (*)          Date:16 Dec 2018 -- 08:27 AM

খুব ভালো. " এক বছর আগের আমি আর আজকের আমি অনেকটা বদলে গেছি। সেই থ্রিল, সেই আনন্দ আর পাচ্ছি না। নিজেকে কেমন যেন, জোর করে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি এইবারে মনে হচ্ছে। ডিসকনটেন্ট তৈরি হচ্ছে আবার, কিন্তু সেই ডিসকনটেন্টের মধ্যে ডিভাইনিটি নেই, কেমন যেন অভিমুখবিহীন লাগছে নিজেকে, কী করলে, কীভাবে বাঁচলে এই ডিসকনটেন্টের হাত থেকে মুক্তি পাবো, কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না। কেমন যেন দিনের পর দিন মনে হচ্ছে জাস্ট লোকে আমার এই বাইকার রাইডার ইমেজটা জানে, সেই ইমেজটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমি চলেছি কিলোমিটারের পর কিলোমিটার, এটা আর ঠিক সেই রকমের প্যাশন নেই, এমনটা ছিল গত বছর পর্যন্ত". এই জায়গাটি নিয়ে ভাবছিলাম. জানি না কেন, ইদানিং আমি চারপাশের অনেক লোকজনকে এমন কথা বলতে শুনেছি, একটা কমন ব্যাপার আছে, তারা সবাই কর্পোরেট চাকুরীজীবি



Name:  Izhikevich          

IP Address : 781212.194.893423.178 (*)          Date:16 Dec 2018 -- 01:46 PM

কর্পোরেট কথাটাই কীওয়ার্ড। এইসব বেড়ানোর ক্ষেত্রে, বা অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে। ইচ্ছে, শখ এই নিজস্ব জিনিসগুলোকে খেয়ে নেয় ওই শব্দটা। প্রফেশনাল ইচ্ছেও বাদ যায় না, যদি না কর্পোরেটের গোল আর আপনার গোল এক না হয়।


Name:   সিকি           

IP Address : 232312.177.560123.27 (*)          Date:16 Dec 2018 -- 02:21 PM

একদম। ক্ষইয়ে দেয় ভেতর থেকে।


Name:  I          

IP Address : 785612.35.121212.230 (*)          Date:16 Dec 2018 -- 03:39 PM

ক্ষইয়ে গেলে হবে না গুরু। আগে বাড়ো। মন দিয়ে পড়ছি।


Name:  শঙ্খ          

IP Address : 2345.110.784512.119 (*)          Date:17 Dec 2018 -- 11:38 AM

চলুক। চলছি পাশাপাশি।

এই সুতোর পাতাগুলি [1] [2]     এই পাতায় আছে22--52