বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1] [2]     এই পাতায় আছে18--48


           বিষয় : গল্প
          বিভাগ : অন্যান্য
          শুরু করেছেন :ইন্দ্রলেখা ভট্টাচার্য
          IP Address : 2345.110.015612.29 (*)          Date:23 Sep 2018 -- 07:20 PM




Name:  NiPa           

IP Address : 780123.188.45900.14 (*)          Date:18 Oct 2018 -- 02:10 AM

এবাবা - এই গল্পটা থেমে গেলো কেন? কী ভালো হচ্ছিলো। ভাগ্গিস নাম ছিলোনা তাই পড়লুম - নাহলে আমি কক্ষণো ভয়ের গল্প পড়িনা। কিন্তু - তাপ্পর লো হলো? তাপ্পর তাপ্পর???


Name:  দ          

IP Address : 670112.210.674512.47 (*)          Date:18 Oct 2018 -- 08:50 AM

হ্যাঁ অনেকদিন হয়ে গেল। তারপর?


Name:  Atoz          

IP Address : 125612.141.5689.8 (*)          Date:26 Oct 2018 -- 01:08 AM

দু দি, এই নাও, তুলে দিলাম। ঃ-)


Name:  ইন্দ্রলেখা ভট্টাচার্য           

IP Address : 2345.110.454512.147 (*)          Date:26 Oct 2018 -- 03:37 AM

নরকনন্দিনী~ ৯ম ভাগ।
তৎক্ষণাৎ সে চকিতা হরিণীর ন্যায় দ্রুতপদে বাটী অভিমুখে ছুটিতে লাগিল। বহুদূর হইতে শববাহকগণের অপার্থিব, খলখল অট্টহাস্য তদ্যাপি তাহার কর্ণে ভাসিয়া আসিতেছিল। কোনক্রমে বাটীর দ্বারপ্রান্তে পঁহুছিয়া সে কিঞ্চিৎ আশ্বস্ত হইয়া সবে শ্বাস লহিতেছে, এমন সময় মাধব ও ছিদাম তাহাকে দেখিয়া ছুটিয়া আসিল। বেপথুমানা, ত্রস্তা, ক্লান্ত মানদা তাহাদিগকে দেখিয়া সেইস্থানেই বসিয়া পড়িল। মাধব কম্পিতকণ্ঠে বলিল,"অ মানদাদিদি, তুমি কী গা, কেদের পেচুনে গিচিলে!! অদের পেচুনে কি যাতি আচে? অরা কি মনুষষি জেতের?! অ বউটার গায়ে ভকভক করতিচে পচাজল আর শেওলার বুনো গন্দো!! অ কি মানষের গায়ের গন্দো! রাম রাম! আমি আর কত্তাকে কী বোজাবো? তিনি তো দুব্বাসা মুনি। কিচু বুজবেন?!! রাম রাম।" মাধব কম্পিত যুক্তহস্ত বারংবার মাথায় ঠেকাইতে লাগিল, এবং চক্ষু মুদ্রিত করিয়া অস্ফুটকণ্ঠে রামনাম জপিতে লাগিল। ছিদাম কহিল, "কত্তাবাবু আর গিন্নিমার সামনে এ কতা কইতে পারলুমনা গ, আমি কিচুদিন কলকেতায় মুদ্দেফরাশের কাজ করেচিলুম। উনাদের কাচ থেকে আমি যে বাস পেইচি, মাকালীর দিব্যি দে বলচি, তা বহুদিনের বাসি মড়ার কাচ থিকেও আসেনি কককনো।" কোনমতে কথা শেষ করিয়াই ছিদাম ধপ করিয়া মানদার পার্শ্বে বসিয়া পড়িল। তাহারা তিনজন কিয়ৎকাল চিন্তামগ্ন ও নিশ্চুপ হইয়া থাকিবার পর মানদা কিঞ্চিৎ ধাতস্থ হইয়া বাকি দুইজনকে মৃতদেহ স্পর্শোত্তর করণীয় স্নান ও মঙ্গল দ্রব্যাদি দ্বারা শুদ্ধিকরণের কথা মনে করাইয়া ও স্বয়ং সেসকল আচারপালনের প্রয়াসে সদ্য উঠিতেছে, এবং অপরদিকে ভোরের আলো প্রস্ফুটিত হইতেছে, এমনসময় নকুল বেহারা ও চরণদাস পাইক প্রায় ছুটিতে ছুটিতে, ও হাঁপাইতে হাঁপাইতে বাটীতে এক বার্তা আনিল। কুলপুরোহিত ঠাকুরমহাশয় গতপরশ্ব রাত্রিকালে চিকিৎসকগৃহ হইতে প্রত্যাবর্তনকালে পালকিমধ্যই কোনো অজ্ঞাত উপায়ে প্রাণ হারাইয়াছেন। রায়বাহাদুরকর্তৃক প্রেরিত বেহারা ও লেঠেলগণ ব্রাহ্মণঠাকুরের অনুমতি লহিয়া একটু পালকি নামাইয়া ক্ষণকাল বিশ্রাম ও তামুক সেবন করিতে বসিয়াছিল। ব্রাহ্মণঠাকুর পালকির অভ্যন্তরেই অবস্থান করিতেছিলেন, নামেন নাই। কিয়ৎক্ষণ পশ্চাৎ তিনি অকস্মাৎ যেন রুদ্ধকণ্ঠে আর্তনাদ করিয়া উঠেন। বেহারাগণ কিঞ্চিৎ দূরত্ব রাখিয়া বসিয়াছিল। তথাপি তাহারা পালকির অভ্যন্তর হইতে ঠাকুরমহাশয়ের সেই অস্ফুট আর্তনাদ শ্রবণ করিতে বিফল হয় নাই। তৎক্ষণাৎ সকলে তামাকু ইত্যাদি ফেলিয়া পালকি অভিমুখে ছুটিয়া যায়। কিন্তু শেষরক্ষা হয় নাই। ততক্ষণে সেই অজ্ঞাত বিভীষিকার ছোবলে আপাতদৃষ্টিতে ব্রাহ্মণ ঠাকুরের মৃত্যু হইয়াছে বলিয়াই তাহাদের নিকট প্রতীত হয়; তাহা কোনো বিষধরই হউক অথবা হৃদরোগাদি ব্যাধিই হউক, তাহা তাহারা বুঝে নাই, কিন্তু তাহাদিগের উপস্থিত বুদ্ধির বলে কর্তব্যটুকু বিলক্ষণ বুঝিয়াছিল। সেই মূহুর্তেই তাহারা দুইদলে বিভক্ত হইয়া, একদল ঠাকুরমহাশয়ের দেহসমেত পুনরায় চিকিৎসক বাবুর বাটীর উদ্দেশে, অর্থাৎ গঞ্জের দিকে গমন করে; অপর দল ভীতচকিত চিত্তে ঠাকুরমহাশয়ের গৃহে কোনমতে সংবাদ পঁহুছাইয়াই ছুটিতে ছুটিতে রায়বাহাদুরকে সংবাদ দিতে আসিয়াছে। প্রভু ব্যতীত থানাপুলিশের ক্রূরহস্ত হইতে গরীবকে আর কে রক্ষা করিতে পারে! সকল বিবৃত করিয়া, সত্যই তাহাদিগের কোনো দোষ নাই, ইত্যাদি বলিয়া চরণদাস ও নকুল রায়বাহাদুরের পদপ্রান্তে কাঁদিয়া পড়িল। ততোক্ষণে সংবাদবাহক ও সাক্ষ্যসঙ্গী বাকি বেহারা-পাইকেরাও আসিয়া পড়িয়াছে। তাহারাও চরণদাসদিগের ন্যায় চরণবন্দনার পথ ধরিল। রায়বাহাদুর সব শুনিয়া প্রথমটায় বেশ খানিক হতবুদ্ধি ও ভীত হইয়া পড়িলেও ক্রমে তাঁহার স্বাভাবিক স্বত্বা ও বুদ্ধি ফিরিয়া আসিল। ভূস্বামী তাঁহার লোকলস্করদিগকে বিলক্ষণরূপে জানিতেন। দ্রুতই ইহা অনুধাবন করিয়া লহিলেন যে, উহারা তামাকু নহে, গঞ্জিকা সেবন করিতে গিয়াছিল। সে যাক। ভৃত্যজাতি বাটীর বাহিরে বাহির হইলে আর তাহাদিগের ছোটোখাটো বিনোদনসমূহ প্রভুর আয়ত্তে থাকা কঠিন। কিন্তু এ সর্বনাশের পশ্চাতে তাঁহার ভৃত্যগণের কোনো ভূমিকা নাহি, এবং কোথাও বা কিঞ্চিৎ অতিরঞ্জন হইলেও তাহারা সত্যই কহিতেছে, ইহা রায়বাহাদুর সম্যকভাবেই বুঝিলেন। তাঁহার হস্তে অধিক চোটপাট করিবার সময়ও ছিলনা। কুলপুরোহিতের অপঘাতমৃত্যু যেকোনো সম্ভ্রান্ত বংশ বা পরিবারের পক্ষেই সুসংবাদ নহে। তাহার উপর জমিদার মহাশয়ের তত্ত্বাবধানে, তাঁহার পালকিতেই যাত্রা করিয়া প্রত্যাবর্তনকালে এরূপ ঘটনা। রায়বাহাদুর হইলেও পাঁচকড়িবাবুকে অল্পবিস্তর থানাপুলিশের ঝক্কি তো পোহাইতেই হইবে। সুতরাং বেহারা-পাইকাদির প্রতি দুই চারিটা লঘু শ-কার ব-কার ও দায়সারাগোছের মোলায়েম চড়থাপ্পড় নিক্ষেপ করিয়াই তিনি স্বয়ং নায়েব মহাশয়কে লহিয়া প্রথমে পুরোহিতমহাশয়ের বাটী অভিমুখে পালকিযোগে বাহির হইয়া গেলেন। তথা হইতে গঞ্জে চিকিৎসকবাবুর দাওয়াখানায় যাইবার পরিকল্পনা করিলেন। তাঁহার মনের মধ্যে আজিকে অসম্ভব কু গাহিতেছিল। বিপত্তির যে ঝঞ্ঝাবাত তাঁহার পরিবারকে ঘিরিয়া বেশকিছুদিন হইতে ঘুরপাক খাইতেছিল, আজ তাহার একটি সুস্পষ্ট ভয়াবহ অবয়ব যেন তাঁহার চক্ষুর সামনে দানা বাঁধিয়া, শির উচ্চ করিয়া দাঁড়াইয়াছে। যাত্রাপথে নায়েব বাবু তাঁহাকে যে কয়টি কথা কহিতেছিল তাহার উত্তরে তিনি কয়েকটি মামুলি হুঁ হ্যাঁ ব্যতীত কিছুই কহিলেননা। ঠাকুর মহাশয়ের গৃহে পঁহুছিয়া দেখিলেন বেহারাগণ চিকিৎসকগৃহ হইতে সামান্য পূর্বেই দেহ আনয়ন করিয়াছে। সে বাটীতে কান্নার রোল ও শোকের ঝাপটা সামলানো দুষ্কর হইয়া উঠিয়াছে। পুরোহিতপত্নী বারংবার মূর্ছা যাহিতেছেন। যাহা হউক সকলকে কোনমতে সান্ত্বনাবাক্য কহিয়া পুরোহিতপুত্র যুবক সতীশকে সঙ্গ লহিয়া, তথা হইতে গঞ্জে চিকিৎসকবাটী যাহিবার জন্য নিষ্ক্রান্ত হইলেন। ডেথ সার্টিফিকেটটি চিকিৎসক বাবু বেহারাগণের হস্তে সঙ্গতভাবেই প্রেরণ করেন নাই। গঞ্জে চিকিৎসকের দাওয়াখানা হইতে উহা সংগ্রহ করিবার অগ্রে ব্যাপারটি পুলিশ রিপোর্ট করা হইবে কিনা, এবং পোস্ট মর্টেম হইবে কিনা, জমিদারবাবু এবং মৃতের পরিবারকে তাঁহা সম্যক বিবেচনা করিয়া সিদ্ধান্ত লহিতে বলিয়া এক চিরকুট পাঠাইয়াছেন। মৃত্যুর আপাত কারণ হিসাবে চিকিৎসক বাবু এযাবৎ কোনো বিষধর সর্প বা কীট দ্বারা দংশন বা তেমন কিছু চিহ্ন খুঁজিয়া পাহেন নাই। মৃতদেহ পোস্টমর্টেমে প্রেরণ করার দায়িত্ব মৃতের পরিবারের। কিন্তু যেহেতু রায়বাহাদুরের পালকিতে চড়িয়া, তাঁহার অনুচরগণের দ্বারা পরিবেষ্টিত হইয়া গমনকালে পুরোহিত মহাশয়ের মৃত্যু হয়, সেইহেতু এক্ষেত্রে ভূস্বামীর এই ঘটনা বা দুর্ঘটনার সহিত আইনানুসারে জড়াইয়া পড়িবার পূর্ণ সম্ভাবনা। সহস্র হউক, তিনি এ জিলার সর্বাপেক্ষা নামী ও প্রতাপশালী ব্যক্তি। সামান্য চিকিৎসকের ক্ষমতা কি, যে তাঁহাকে আইন দর্শায়। ইহা শুধুই নিয়মরক্ষার নিমিত্তে বলা, ইত্যাদি বিনয়বচন চিকিৎসক মহাশয় সংক্ষেপে ঈষৎ পরোক্ষ ভাষায় লিখিয়া চিরকুট স্বাক্ষর করিয়াছেন। সতীশের পাঠ পশ্চাৎ রায়বাহাদুর চিরকুট পাঠ করিয়া প্রথমে যথেষ্টই অপ্রসন্ন মুখ করিয়া দুই একটা উত্তপ্ত হইতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু চিরকুটের একেবারে নিম্নে স্থানসঙ্কুলানের নিমিত্ত অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র হরফে লিখিত এমন একটি বাক্য পড়িলেন, যে তাঁহার মানসিক শান্তি ও স্থিতির পুষ্করিণীর ইতোমধ্য যথেষ্ট তরঙ্গায়িত জল একেবারে তোলপাড় হইয়া উঠিল। সেই নিম্নতম অংশে চিকিৎসক লিখিয়াছিলেন, যে সন্ধ্যায় পুরোহিত মহাশয় তাঁহার দাওয়াখানায় নিজ অসুস্থতার চিকিৎসা করাইতে আসেন, তিনি রায়বাহাদুরগৃহমন্দিরে ঘটিত দুর্ঘটনার বিবৃতি চিকিৎসককে সবিস্তার দিয়া তাহার সহিত সে তাঁহার অভিজ্ঞতার অন্তর্ভুক্ত একটি ক্ষুদ্র, কিন্তু উৎকট, ও ভয়াবহ, অতিপ্রাকৃত তথ্যও উন্মোচিত করেন, যাহা একবার রায়বাহাদুরকে বলা তাঁহার অবশ্য কর্তব্য। ভূস্বামী একবার কষ্ট করিয়া তাঁহার আলয়ে দর্শন দিলে উত্তম হয়। ~ক্রমশ


Name:  amit          

IP Address : 340123.0.34.2 (*)          Date:26 Oct 2018 -- 05:42 AM

দারুন এগোচ্ছে গল্প। একটু "ওমেন" সিনেমাটার আভাস পাওয়া যাচ্ছে যদিও পরের দিকে, কিন্তু ভাষার ওপর দখল অতুলনীয়।


Name:  শঙ্খ          

IP Address : 2345.110.564512.248 (*)          Date:26 Oct 2018 -- 10:43 AM

ওহ, শুক্কুর বারের বাজারে নরক নন্দিনী ইজ ব্যাক। কোন কথা হবে না।


Name:  Du          

IP Address : 7845.184.6734.44 (*)          Date:01 Nov 2018 -- 09:00 AM

লগ ইন করে নিন তাহলে সহজে পাবেন।


Name:  ...          

IP Address : 342323.233.3412.118 (*)          Date:03 Nov 2018 -- 02:13 PM

তারপর কি হল?????


Name:  ¥          

IP Address : 457812.254.453412.15 (*)          Date:06 Nov 2018 -- 01:06 AM

আজকের দিনে তাঁরা যদি এই কাহিনীর একটা কিস্তিও না এগিয়ে দিতে পারেন, তবে তেনাদের থাকা না থাকা সমান!


Name:  সিকি          

IP Address : 894512.168.0145.123 (*)          Date:06 Nov 2018 -- 09:57 AM

পড়ব বলে বসে আছি যে!


Name:  শঙ্খ          

IP Address : 2345.110.015612.62 (*)          Date:06 Nov 2018 -- 02:00 PM

আজকে অন্ততঃ একটা পর্ব আসুক। জাতি জানতে চায় 'ক্ষুদ্র, কিন্তু উৎকট, ও ভয়াবহ, অতিপ্রাকৃত তথ্য' টি কী?


Name:  ....          

IP Address : 342323.233.5645.236 (*)          Date:07 Nov 2018 -- 12:27 PM

ছ তারিখ ঘুরে সাত তারিখ চলে এলো যে! সেই তথ্য এখনো সামনে এলো নাঃ(


Name:   Indralekha Cleopatra Bhattacharya           

IP Address : 2345.110.9002312.233 (*)          Date:16 Nov 2018 -- 01:53 AM

#নরকনন্দিনী ~১০ম ভাগ~
পত্রটি পাঠ করিয়া শুষ্ক, ও চিন্তিত আননে সতীশের হস্তে তাহা পুনঃপ্রদান করিয়া রায়বাহাদুর সেইস্থানেই ভূমির উপর বসিয়া পড়িলেন। সতীশ তাহা দেখিয়া ব্যস্ত হইয়া হাঁহাঁ করিয়া উঠিল, "ওকী কাকাবাবু, অমন ভূঁয়ে বসলেন কেন! ওরে ছোটু, ইদিকে শীগগির জলচৌকিটে আন!"- ভূস্বামী তাহাকে ইঙ্গিতে আশ্বস্ত করিলেন। তাঁহার পশ্চাতে দণ্ডায়মান বটুকলাল পাইক কিন্তু অভ্যাসবশত বুঝিল, হুজুরের সহসা কোন জটিল চিন্তার বিষয় উপস্থিত হইয়াছে, এবং তাঁহার একছিলিম তামাকুর ব্যবস্থা সে সঙ্গ করিয়াই আনিয়াছিল। গড়গড়াটি সে কেবলমাত্র আগাইয়া দিতে যাহিবে, এমন সময় রায়বাহাদুর অকস্মাৎ গাত্রোত্থান করিয়া বলিলেন, "চল বটকু, বেরোই।" এপর্যন্ত রায়বাহাদুর ও সতীশের একত্রে যাহিবার যোজনা হইয়াছিল বলিয়াই সহসা রায়বাহাদুরকে এরূপে স্বীয় গতিপথ বিচ্ছিন্ন করিতে দেখিয়া সতীশ প্রথমে কিঞ্চিৎ আহত হইলেও, পরক্ষণেই বুদ্ধিমান যুবক চিকিৎসক বাবুর সহিত ভূস্বামীর পৃথক, নিভৃত সাক্ষাতের প্রয়োজন অনুধাবন করিয়া, ও ভূস্বামীর পদমর্যাদা ও বয়োজ্যেষ্ঠতার সম্মানের নিমিত্ত তাঁহার গন্তব্য বা কার্যসূচি সম্পর্কে আর অধিক প্রশ্ন করিলোনা। একবার শুধু তাঁহাকে গমনের পূর্বে কিঞ্চিৎ ফলমিষ্টান্নাদি দিয়া জলপান করিতে অনুরোধ করিলে রায়বাহাদুর তরুণের স্কন্ধে একরূপ সস্নেহ সান্ত্বনা ও সন্তুষ্টিসূচক মৃদু চপেটাঘাত করিয়া, সতীশকে সঙ্গ না লহিয়াই একাকী, নিজ দলবলসমেত সেই গৃহ হইতে বিদায় লহিলেন। অতঃপর হুজুরের নির্দেশে পালকি গঞ্জাভিমুখে ধাবিত হইল।
যে সময়টুকু যাবৎ চিকিৎসকবাবুর দাওয়াখানায় বসিয়া রায়বাহাদুর আসন্ন বিস্ফোটক তথ্যসংবাদাদি শুনিবার নিমিত্ত ব্যাকুল উৎকণ্ঠার সহিত প্রতীক্ষা করিতেছিলেন, তার মধ্যই অপরদিকে দিগন্তে দিননাথ অস্তাচলে গিয়াছেন, ও চরাচরে সন্ধ্যা নামিয়াছে। দাওয়াখানায় একটি বড়মাপের গ্যাসবাতি জ্বলিয়া ঘনায়মান অন্ধকারকে দূরীভূত করিতেছে। চিকিৎসক বাবুর কম্পাউন্ডার ও একাধারে ভৃত্যস্থানীয় মনোময় ব্যতীত দাওয়াখানায় বর্তমানে অপর কাহাকেও না দেখিতে পাহিয়া রায়বাহাদুর কিঞ্চিৎ আশ্চর্য হইলেন। তবে কি আজিকে কোনোই রোগী হয় নাই!
কিয়ৎক্ষণ পূর্বে মনোময় চিকিৎসক বাবুর বাটীমধ্য যাহিয়া তাঁহাকে নাকি রায়বাহাদুরের আগমন সংবাদ দিয়া আসিয়াছে। দাওয়াখানার উপরতলাতেই তাঁহার গৃহ।' শালা জোচ্চোর ডাক্তার খুব দুপয়সার পসার করেচে যাহোক, দোতলা বাড়ি হাঁকিয়েচে', রায়বাহাদুর মনে মনে বলিলেন। যদিও চিকিৎসক যদুনাথ সেন তাঁহাকে পত্রে স্বগৃহেই আমন্ত্রণ জানাইয়াছিল, তথাপি বিনা খাতিরসম্ভাষণে সে অপরিচিত বাটীতে পাদপ্রবেশ করিতে জমিদারবাবুর রুচি হইলনা। সহস্র হউক, এ পরগনার বৃহদাংশ তাঁহার জমিদারির অধীনস্থ। তিনি প্রকৃত মান্যব্যক্তির ন্যায়, সঙ্গস্থ পালকি ও দলবল, অনুচরবর্গকে দাওয়াখানা হইতে কিঞ্চিৎ দূরে রাখিয়া আসিয়া নীচতলায় অবস্থিত দাওয়াখানাতেই অপেক্ষা করিতেছিলেন।
দাওয়াখানার বৃহদাকৃতি ওয়ালক্লকের প্রহরনির্দেশক কাঁটাটি যখন সন্ধ্যা প্রায় সাতটা ছুঁই ছুঁই, তখন মনোময় কম্পাউন্ডার আসিয়া যেন একপ্রকার মিচকা হাসিয়া বলিল, "ডাক্তারবাবু এয়েচেন। আপনাকে ভেতরে ডেকেচেন আজ্ঞে।" রায়বাহাদুর অন্যমনস্ক হইয়া বসিয়া নানা চিন্তা করিতেছিলেন। সহসা যেন তাঁহার ঘোর কাটিল। বক্ষমধ্য হৃদপিণ্ডটি যেন মূহুর্তে ধড়াস করিয়া লাফাইয়া উঠিল এবং ধমনীর রক্তপ্রবাহ তৎক্ষণাৎ দ্রুততর হইয়া উঠিল। কেন!! ডাক্তার কী বলিবে এই ভয়?! রায়বাহাদুর নিজ স্নায়ুমণ্ডলীর এই অস্বাভাবিক আচরণ নিজেও বুঝিলেননা। মনোময় তাঁহাকে 'ওইদিকে,' বলিয়া ডাক্তারের কক্ষটির দিক নির্দেশ করিয়া দিলো। আলো আঁধারির প্রভাবে মনোময়ের মুখটি ভারি এক অপার্থিব ও রহস্যাবৃত ধরণের লাগিতেছিল। রায়বাহাদুর তড়িঘড়ি যদুনাথ ডাক্তারের চেম্বার অভিমুখে চলিলেন। যদুনাথবাবুর চেম্বারের দ্বার ভিতর হইতে আলতোভাবে রুদ্ধ ছিল। করাঘাত করিতে যাইতেই ভিতরদিকে খুলিয়া গেলো। "আসুন আসুন জমিদারবাবু, গরীব ডাক্তারের দাওয়াখানায় পদধূলি দিলেন, কি সৌভাগ্যি।" এ কক্ষে একটি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ও ম্রিয়মাণ গ্যাসবাতি জ্বলিতেছিল। হয়তবা অদ্য ডাক্তারবাবুর তেমন কোন রোগী দেখিবার কার্য ছিলনা বলিয়া তিনি আর অধিক আলো জ্বালিবার প্রয়োজন অনুভব করেন নাই, ভুস্বামী ইহা বুঝিলেন। যদুনাথ ডাক্তার স্বয়ং তড়িঘড়ি কুরসি ছাড়িয়া উঠিয়া আসিয়া শশব্যস্তভাবে জমিদার পাঁচকড়ি লাহাকে তাঁহার কাঠের টেবিলের বিপরীত দিকের, তাঁহার সম্মুখস্থ রোগী বসিবার মধ্যমাকৃতির বেঞ্চখানিতে এরূপ সমাদরে বসাইলেন যেন সিংহাসনে বসাইতেছেন। ইত্যবসরে জমিদারবাবু তীক্ষ নজরে যদুনাথ ডাক্তারকে জরিপ করিতে লাগিলেন। ব্যক্তি দীর্ঘাঙ্গ, এবং সুগঠিত, মেদহীন কায়ার অধিকারী। কিন্ত কৃশকায় নহে। চক্ষু দুইটি অত্যুজ্জ্বল এবং ধারালো। খড়্গ নাসিকার দুইপার্শ্বে তাহারা দুই শাণিত ছুরিকার ন্যায় অবস্থান করিতেছে। ইহার অবয়ব দেখিয়া ইহার চিন্তাপ্রবাহের গতিপথ কোনোমতেই নির্ধারণ করা যায়না। আবার ইহাকে নিরস্ত্র বা নির্ধন বলিয়া কোনোমতে এরূপ দুর্বল বা অসহায় বলিয়াও বোধ হয়না, যে কোনো পরিস্থিতিতেই লেঠেল বা ভাড়াটে খুনি পাঠাইয়া সাবাড় করিবার কথা কল্পনা করা যাহিতে পারে। "আহা, ডেকে এনে বড় কষ্ট দিলুম আপনাকে, তাইনা জমিদারবাবু!"- এরূপ সবিনয় সৌজন্যের ধাক্কায় ডাক্তারকে হত্যার কল্পনা শুরু হইবার পূর্বেই হোঁচট খাইয়া ভাঙ্গিয়া যাওয়ায়, মনেমনে কিঞ্চিৎ বিরক্ত হইলেও মুখে সে ভাব আনিতে দিলেন না পাঁচকড়ি জমিদার। এখানে আসিবার পূর্বে যে ভয় বা উৎকণ্ঠা অনুভব করিয়াছিলেন তাহা পূর্বেই অনেকাংশে অন্তর্হিত হইয়াছে। আপাতত সেইস্থানে একপ্রকার বিরক্তি জন্মাইয়াছে। লোকটা নিশ্চয় একটা ধূর্ত বিশেষ, তাহাতে সন্দেহ নাহি। একটা আকস্মিক মৃত্যুকে অবলম্বন করিয়া ও একটা মিথ্যা, স্বকপোলকল্পিত কাহিনী বানাইয়া, এবং তাহাকে মৃত পুরোহিত মহাশয়ের শেষ বয়ান বলিয়া চালাইয়া জমিদারবাবুকে ভয় খাওয়াইয়া কিছু কপর্দক কামাইতে চাহে। "হ্যাঁ, এবারে বলুন দিকিনি ডাক্তারবাবু, কী বলবেন। শেষদিনটেয় কী বলেচিলেন ঠাকুরবাবা?! কী দেকেচিলেন আমার বাড়িতে?"- রায়বাহাদুরের কন্ঠে অধৈর্য পরিস্ফুট হইয়া উঠিলো। গ্যাসবাতির ফ্যাকাসে রঙের হালকা আলোয় যদুনাথ ডাক্তারের চক্ষুদুইটি আরো উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। তাঁহার অবয়বের একাংশ কিন্তু তদ্যাপি অন্ধকারাবৃত ছিল। ধীরে ধীরে ডাক্তারের ওষ্ঠপ্রান্তে একরূপ বিচিত্র হাস্য প্রস্ফুটিত হইল। যদুনাথ সরাসরি বলিলেন, "ঠাকুর মশায় বলেচিলেন, আপনাদের মন্দিরের ঠাকুরের সোনার সিংহাসনে ঠাকুরের আসনে একটা ছোট্ট খুকী বসেচিলো। যেইনা ঠাকুর মশায় ব্যস্ত হয়ে তাকে ধরতে গেলেন, অমনি সে তুড়ুক করে দেওয়ালে চড়লো।"- ব্যস, এই অবধি শুনিয়াই রায়বাহাদুর তেলেবেগুনে জ্বলিয়া উঠিলেন। "মানে?!! বলো কি হে তুমি ডাক্তার!! বাচ্চা বসেচিলো, আবার দেওয়ালে চড়লো?!! তাই বললেন ঠাকুরবাবা?!! বলি তুমি কি সন্দের পর গাঁজা টাজা টানো নাকি হে?!"- উত্তপ্ত রায়বাহাদুর এরূপ উৎকট মস্করায়, আর সামান্য ডাক্তারের তাঁহার সম্মুখে ফাজলামি করিবার ধৃষ্টতা দেখিয়া যে ক্রোধে একেবারে রুদ্ররূপ ধারণ করিয়াছিলেন তাহা পাঠককে বলাই বাহুল্য। কিন্তু তাহাতে যদুনাথ ডাক্তারের কোনো ভাবান্তর হইলোনা। তিনি শান্তভাবে হাসিয়া বলিলেন, জানি আপনি বিশ্বাস করবেন না। আপনাকে বরঞ্চ হাতেকলমে দেকাই, দেকুন।"- এইকথা বলিয়া তৎক্ষণাৎ, রায়বাহাদুরের দুই নশ্বর চক্ষুর সম্মুখে ডাক্তার যদুনাথ সেন সম্মুখস্থ খাড়া দেওয়ালখানি বাহিয়া খদ্যোতের ক্ষিপ্রতায় তাহাতে আরোহণ করিতে লাগিল। তাহার হস্তপদগুলি যেন সরীসৃপের স্বাচ্ছন্দ্যে দেওয়ালের গাত্রে অচ্যুতভাবে সংযুক্ত রহিলো ও সড়সড় করিয়া উপরের দিকে উঠিতে লাগিলো। আরোহণকালে মধ্যমধ্য সে পশ্চাতে ভূস্বামীর দিকে মস্তক ঘুরাইয়া তাহার শ্বেতশুভ্র ক্ষুদ্রাকৃতি অসীর ন্যায় ধারালো দন্তগুলি খিঁচাইয়া একপ্রকার হিংস্র হাসি হাসিতে লাগিলো। ইতোমধ্য তাহার দুই চক্ষুর মণি অবলুপ্ত হইয়াছে, ও সেই স্থানে দুইটি হরিতাভ আলো জ্বলিতেছে। আর পাঁচকড়ি লাহা? তিনি যেন কোনো অজানা মন্ত্রে আচ্ছন্ন, মুগ্ধবৎ হইয়া, চিত্রার্পিতের ন্যায় সেইস্থানে বসিয়া এই দৃশ্য অবলোকন করিতে থাকিলেন। অবশেষে যদুনাথ খদ্যোৎ তাহার দীর্ঘ অমানুষিক জিহ্বা বাহির করিলো। অতি প্রাচীন মহাবৃক্ষের কোনো দীর্ঘায়ত উপশাখা, কিংবা ঝুরির ন্যায় উহা প্যাঁচালো, সর্পিল হইয়া ভূস্বামীর দিকে আগাইয়া আসিতে থাকিলো।~ক্রমশ~


Name:  i          

IP Address : 783412.157.89.253 (*)          Date:16 Nov 2018 -- 03:14 AM

বড়ই উপভোগ করিতেছি। ভাষা ও প্রকাশভঙ্গী অতীব প্রশংসনীয়। পাঠকালে মনোমধ্যে বিচিত্রভাব খেলিয়া যাইতেছে- এক টি ষড়যন্ত্রের আভাস পাইতেছি কখনও-যৌথ বা একক।


Name:  £          

IP Address : 457812.254.9002312.25 (*)          Date:16 Nov 2018 -- 04:48 AM

খদ্যোৎ মানে জোনাকী জানতুম। এখানে পড়ে মনে হচ্ছে অন্য কিছু।


Name:   Indralekha Cleopatra Bhattacharya           

IP Address : 2345.110.125612.90 (*)          Date:16 Nov 2018 -- 07:13 AM


Edited.


#নরকনন্দিনী ~১০ম ভাগ~
পত্রটি পাঠ করিয়া শুষ্ক, ও চিন্তিত আননে সতীশের হস্তে তাহা পুনঃপ্রদান করিয়া রায়বাহাদুর সেইস্থানেই ভূমির উপর বসিয়া পড়িলেন। সতীশ তাহা দেখিয়া ব্যস্ত হইয়া হাঁহাঁ করিয়া উঠিল, "ওকী কাকাবাবু, অমন ভূঁয়ে বসলেন কেন! ওরে ছোটু, ইদিকে শীগগির জলচৌকিটে আন!"- ভূস্বামী তাহাকে ইঙ্গিতে আশ্বস্ত করিলেন। তাঁহার পশ্চাতে দণ্ডায়মান বটুকলাল পাইক কিন্তু অভ্যাসবশত বুঝিল, হুজুরের সহসা কোন জটিল চিন্তার বিষয় উপস্থিত হইয়াছে, এবং তাঁহার একছিলিম তামাকুর ব্যবস্থা সে সঙ্গ করিয়াই আনিয়াছিল। গড়গড়াটি সে কেবলমাত্র আগাইয়া দিতে যাহিবে, এমন সময় রায়বাহাদুর অকস্মাৎ গাত্রোত্থান করিয়া বলিলেন, "চল বটকু, বেরোই।" এপর্যন্ত রায়বাহাদুর ও সতীশের একত্রে যাহিবার যোজনা হইয়াছিল বলিয়াই সহসা রায়বাহাদুরকে এরূপে স্বীয় গতিপথ বিচ্ছিন্ন করিতে দেখিয়া সতীশ প্রথমে কিঞ্চিৎ আহত হইলেও, পরক্ষণেই বুদ্ধিমান যুবক চিকিৎসক বাবুর সহিত ভূস্বামীর পৃথক, নিভৃত সাক্ষাতের প্রয়োজন অনুধাবন করিয়া, ও ভূস্বামীর পদমর্যাদা ও বয়োজ্যেষ্ঠতার সম্মানের নিমিত্ত তাঁহার গন্তব্য বা কার্যসূচি সম্পর্কে আর অধিক প্রশ্ন করিলোনা। একবার শুধু তাঁহাকে গমনের পূর্বে কিঞ্চিৎ ফলমিষ্টান্নাদি দিয়া জলপান করিতে অনুরোধ করিলে রায়বাহাদুর তরুণের স্কন্ধে একরূপ সস্নেহ সান্ত্বনা ও সন্তুষ্টিসূচক মৃদু চপেটাঘাত করিয়া, সতীশকে সঙ্গ না লহিয়াই একাকী, নিজ দলবলসমেত সেই গৃহ হইতে বিদায় লহিলেন। অতঃপর হুজুরের নির্দেশে পালকি গঞ্জাভিমুখে ধাবিত হইল।
যে সময়টুকু যাবৎ চিকিৎসকবাবুর দাওয়াখানায় বসিয়া রায়বাহাদুর আসন্ন বিস্ফোটক তথ্যসংবাদাদি শুনিবার নিমিত্ত ব্যাকুল উৎকণ্ঠার সহিত প্রতীক্ষা করিতেছিলেন, তার মধ্যই অপরদিকে দিগন্তে দিননাথ অস্তাচলে গিয়াছেন, ও চরাচরে সন্ধ্যা নামিয়াছে। দাওয়াখানায় একটি বড়মাপের গ্যাসবাতি জ্বলিয়া ঘনায়মান অন্ধকারকে দূরীভূত করিতেছে। চিকিৎসক বাবুর কম্পাউন্ডার ও একাধারে ভৃত্যস্থানীয় মনোময় ব্যতীত দাওয়াখানায় বর্তমানে অপর কাহাকেও না দেখিতে পাহিয়া রায়বাহাদুর কিঞ্চিৎ আশ্চর্য হইলেন। তবে কি আজিকে কোনোই রোগী হয় নাই!
কিয়ৎক্ষণ পূর্বে মনোময় চিকিৎসক বাবুর বাটীমধ্য যাহিয়া তাঁহাকে নাকি রায়বাহাদুরের আগমন সংবাদ দিয়া আসিয়াছে। দাওয়াখানার উপরতলাতেই তাঁহার গৃহ।' শালা জোচ্চোর ডাক্তার খুব দুপয়সার পসার করেচে যাহোক, দোতলা বাড়ি হাঁকিয়েচে', রায়বাহাদুর মনে মনে বলিলেন। যদিও চিকিৎসক যদুনাথ সেন তাঁহাকে পত্রে স্বগৃহেই আমন্ত্রণ জানাইয়াছিল, তথাপি বিনা খাতিরসম্ভাষণে সে অপরিচিত বাটীতে পাদপ্রবেশ করিতে জমিদারবাবুর রুচি হইলনা। সহস্র হউক, এ পরগনার বৃহদাংশ তাঁহার জমিদারির অধীনস্থ। তিনি প্রকৃত মান্যব্যক্তির ন্যায়, সঙ্গস্থ পালকি ও দলবল, অনুচরবর্গকে দাওয়াখানা হইতে কিঞ্চিৎ দূরে রাখিয়া আসিয়া নীচতলায় অবস্থিত দাওয়াখানাতেই অপেক্ষা করিতেছিলেন।
দাওয়াখানার বৃহদাকৃতি ওয়ালক্লকের প্রহরনির্দেশক কাঁটাটি যখন সন্ধ্যা প্রায় সাতটা ছুঁই ছুঁই, তখন মনোময় কম্পাউন্ডার আসিয়া যেন একপ্রকার মিচকা হাসিয়া বলিল, "ডাক্তারবাবু এয়েচেন। আপনাকে ভেতরে ডেকেচেন আজ্ঞে।" রায়বাহাদুর অন্যমনস্ক হইয়া বসিয়া নানা চিন্তা করিতেছিলেন। সহসা যেন তাঁহার ঘোর কাটিল। বক্ষমধ্য হৃদপিণ্ডটি যেন মূহুর্তে ধড়াস করিয়া লাফাইয়া উঠিল এবং ধমনীর রক্তপ্রবাহ তৎক্ষণাৎ দ্রুততর হইয়া উঠিল। কেন!! ডাক্তার কী বলিবে এই ভয়?! রায়বাহাদুর নিজ স্নায়ুমণ্ডলীর এই অস্বাভাবিক আচরণ নিজেও বুঝিলেননা। মনোময় তাঁহাকে 'ওইদিকে,' বলিয়া ডাক্তারের কক্ষটির দিক নির্দেশ করিয়া দিলো। আলো আঁধারির প্রভাবে মনোময়ের মুখটি ভারি এক অপার্থিব ও রহস্যাবৃত ধরণের লাগিতেছিল। রায়বাহাদুর তড়িঘড়ি যদুনাথ ডাক্তারের চেম্বার অভিমুখে চলিলেন। যদুনাথবাবুর চেম্বারের দ্বার ভিতর হইতে আলতোভাবে রুদ্ধ ছিল। করাঘাত করিতে যাইতেই ভিতরদিকে খুলিয়া গেলো। "আসুন আসুন জমিদারবাবু, গরীব ডাক্তারের দাওয়াখানায় পদধূলি দিলেন, কি সৌভাগ্যি।" এ কক্ষে একটি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ও ম্রিয়মাণ গ্যাসবাতি জ্বলিতেছিল। হয়তবা অদ্য ডাক্তারবাবুর তেমন কোন রোগী দেখিবার কার্য ছিলনা বলিয়া তিনি আর অধিক আলো জ্বালিবার প্রয়োজন অনুভব করেন নাই, ভুস্বামী ইহা বুঝিলেন। যদুনাথ ডাক্তার স্বয়ং তড়িঘড়ি কুরসি ছাড়িয়া উঠিয়া আসিয়া শশব্যস্তভাবে জমিদার পাঁচকড়ি লাহাকে তাঁহার কাঠের টেবিলের বিপরীত দিকের, তাঁহার সম্মুখস্থ রোগী বসিবার মধ্যমাকৃতির বেঞ্চখানিতে এরূপ সমাদরে বসাইলেন যেন সিংহাসনে বসাইতেছেন। ইত্যবসরে জমিদারবাবু তীক্ষ নজরে যদুনাথ ডাক্তারকে জরিপ করিতে লাগিলেন। ব্যক্তি দীর্ঘাঙ্গ, এবং সুগঠিত, মেদহীন কায়ার অধিকারী। কিন্ত কৃশকায় নহে। চক্ষু দুইটি অত্যুজ্জ্বল এবং ধারালো। খড়্গ নাসিকার দুইপার্শ্বে তাহারা দুই শাণিত ছুরিকার ন্যায় অবস্থান করিতেছে। ইহার অবয়ব দেখিয়া ইহার চিন্তাপ্রবাহের গতিপথ কোনোমতেই নির্ধারণ করা যায়না। আবার ইহাকে নিরস্ত্র বা নির্ধন বলিয়া কোনোমতে এরূপ দুর্বল বা অসহায় বলিয়াও বোধ হয়না, যে কোনো পরিস্থিতিতেই লেঠেল বা ভাড়াটে খুনি পাঠাইয়া সাবাড় করিবার কথা কল্পনা করা যাহিতে পারে। "আহা, ডেকে এনে বড় কষ্ট দিলুম আপনাকে, তাইনা জমিদারবাবু!"- এরূপ সবিনয় সৌজন্যের ধাক্কায় ডাক্তারকে হত্যার কল্পনা শুরু হইবার পূর্বেই হোঁচট খাইয়া ভাঙ্গিয়া যাওয়ায়, মনেমনে কিঞ্চিৎ বিরক্ত হইলেও মুখে সে ভাব আনিতে দিলেন না পাঁচকড়ি জমিদার। এখানে আসিবার পূর্বে যে ভয় বা উৎকণ্ঠা অনুভব করিয়াছিলেন তাহা পূর্বেই অনেকাংশে অন্তর্হিত হইয়াছে। আপাতত সেইস্থানে একপ্রকার বিরক্তি জন্মাইয়াছে। লোকটা নিশ্চয় একটা ধূর্ত বিশেষ, তাহাতে সন্দেহ নাহি। একটা আকস্মিক মৃত্যুকে অবলম্বন করিয়া ও একটা মিথ্যা, স্বকপোলকল্পিত কাহিনী বানাইয়া, এবং তাহাকে মৃত পুরোহিত মহাশয়ের শেষ বয়ান বলিয়া চালাইয়া জমিদারবাবুকে ভয় খাওয়াইয়া কিছু কপর্দক কামাইতে চাহে। "হ্যাঁ, এবারে বলুন দিকিনি ডাক্তারবাবু, কী বলবেন। শেষদিনটেয় কী বলেচিলেন ঠাকুরবাবা?! কী দেকেচিলেন আমার বাড়িতে?"- রায়বাহাদুরের কন্ঠে অধৈর্য পরিস্ফুট হইয়া উঠিলো। গ্যাসবাতির ফ্যাকাসে রঙের হালকা আলোয় যদুনাথ ডাক্তারের চক্ষুদুইটি আরো উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। তাঁহার অবয়বের একাংশ কিন্তু তদ্যাপি অন্ধকারাবৃত ছিল। ধীরে ধীরে ডাক্তারের ওষ্ঠপ্রান্তে একরূপ বিচিত্র হাস্য প্রস্ফুটিত হইল। যদুনাথ সরাসরি বলিলেন, "ঠাকুর মশায় বলেচিলেন, আপনাদের মন্দিরের ঠাকুরের সোনার সিংহাসনে ঠাকুরের আসনে একটা ছোট্ট খুকী বসেচিলো। যেইনা ঠাকুর মশায় ব্যস্ত হয়ে তাকে ধরতে গেলেন, অমনি সে তুড়ুক করে দেওয়ালে চড়লো।"- ব্যস, এই অবধি শুনিয়াই রায়বাহাদুর তেলেবেগুনে জ্বলিয়া উঠিলেন। "মানে?!! বলো কি হে তুমি ডাক্তার!! বাচ্চা বসেচিলো, আবার দেওয়ালে চড়লো?!! তাই বললেন ঠাকুরবাবা?!! বলি তুমি কি সন্দের পর গাঁজা টাজা টানো নাকি হে?!"- উত্তপ্ত রায়বাহাদুর এরূপ উৎকট মস্করায়, আর সামান্য ডাক্তারের তাঁহার সম্মুখে ফাজলামি করিবার ধৃষ্টতা দেখিয়া যে ক্রোধে একেবারে রুদ্ররূপ ধারণ করিয়াছিলেন তাহা পাঠককে বলাই বাহুল্য। কিন্তু তাহাতে যদুনাথ ডাক্তারের কোনো ভাবান্তর হইলোনা। তিনি শান্তভাবে হাসিয়া বলিলেন, জানি আপনি বিশ্বাস করবেন না। আপনাকে বরঞ্চ হাতেকলমে দেকাই, দেকুন।"- এইকথা বলিয়া তৎক্ষণাৎ, রায়বাহাদুরের দুই নশ্বর চক্ষুর সম্মুখে ডাক্তার যদুনাথ সেন সম্মুখস্থ খাড়া দেওয়ালখানি বাহিয়া কৃকলাসের ক্ষিপ্রতায় তাহাতে আরোহণ করিতে লাগিল। তাহার হস্তপদগুলি যেন সরীসৃপের স্বাচ্ছন্দ্যে দেওয়ালের গাত্রে অচ্যুতভাবে সংযুক্ত রহিলো ও সড়সড় করিয়া উপরের দিকে উঠিতে লাগিলো। আরোহণকালে মধ্যমধ্য সে পশ্চাতে ভূস্বামীর দিকে মস্তক ঘুরাইয়া তাহার শ্বেতশুভ্র ক্ষুদ্রাকৃতি অসীর ন্যায় ধারালো দন্তগুলি খিঁচাইয়া একপ্রকার হিংস্র হাসি হাসিতে লাগিলো। ইতোমধ্য তাহার দুই চক্ষুর মণি অবলুপ্ত হইয়াছে, ও সেই স্থানে দুইটি হরিতাভ আলো খদ্যোতের ন্যায় জ্বলিতেছে। আর পাঁচকড়ি লাহা? তিনি যেন কোনো অজানা মন্ত্রে আচ্ছন্ন, মুগ্ধবৎ হইয়া, চিত্রার্পিতের ন্যায় সেইস্থানে বসিয়া এই দৃশ্য অবলোকন করিতে থাকিলেন। অবশেষে যদুনাথরূপী সরীসৃপ তাহার দীর্ঘ অমানুষিক জিহ্বা বাহির করিলো। অতি প্রাচীন মহাবৃক্ষের কোনো দীর্ঘায়ত উপশাখা, কিংবা ঝুরির ন্যায় উহা প্যাঁচালো, সর্পিল হইয়া ভূস্বামীর দিকে আগাইয়া আসিতে থাকিলো।~ক্রমশ~


Name:  £          

IP Address : 457812.254.9002312.25 (*)          Date:16 Nov 2018 -- 07:54 AM

এইবার খদ্যোৎ ঠিকঠাক হয়েছে।
কিন্তু ইনি সরীসৃপরূপী যদুনাথ। উল্টাটি নহেন।


Name:  amit          

IP Address : 340123.0.34.2 (*)          Date:16 Nov 2018 -- 08:16 AM

গল্পের টাইম লাইন গুলো কি একটুখানি অফস্কেল হয়ে যাচ্ছে ? আগের পর্বে আছে পালকি বেহারা রা এবং ভৃত্যেরা ভোরবেলা রায়বাহাদুরকে এসে সংবাদ দিলো পুরোহিত মশায়ের অপমৃত্যু ঘটেছে। সাথে সাথেই রায়বাহাদুর নায়েবমশায় কে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন, প্রথমে পুরোহিত মশায়ের বাড়ি, তারপর গঞ্জে চিকিৎসকের বাড়ি গন্তব্যে।

এর আগের পর্বগুলো পড়তে মনে হয়েছে গঞ্জ খুব বেশি হলে সামান্য কয়েক ঘন্টার রাস্তা , নাহলে পুরোহিত মশাইকে পালকি করে পাঠানো হলো কেন ? রায়বাহাদুরের এটুকু যেতে যেতেই সন্ধে হয়ে আসাটা একটু কেমন লাগলো। আরো কিছুতে বা গোলযোগে আটকে পড়ে সন্ধে হয়ে গেলে হয়তো আরো ঠিক ঠাক হতো।


Name:  .....          

IP Address : 127812.51.783412.243 (*)          Date:16 Nov 2018 -- 01:45 PM

ওগো তারপর কি হলো?????


Name:   Indralekha Cleopatra Bhattacharya           

IP Address : 2345.110.125612.90 (*)          Date:16 Nov 2018 -- 04:13 PM

@£ প্রথমবার দুটি শব্দের স্থান সোঅপিং এর জন্য দুঃখিত। ধরিয়ে দেওয়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ পাঠক। কিন্তু যদুনাথরূপী সরীসৃপ যে সরীসৃপরূপী যদুনাথই তা এখনো গল্পে প্রকাশ হয়নি। তাই ও বাক্যাংশটুকুর ব্যবহার ইচ্ছাকৃতই ধরুন। সরীসৃপ কিন্ত সর্বদা পার্থিব সরীসৃপও না হতে পারে। পুনশ্চ ধন্যবাদ।


Name:   Indralekha Cleopatra Bhattacharya           

IP Address : 2345.110.125612.90 (*)          Date:16 Nov 2018 -- 04:49 PM

@amit প্রথমেই অশেষ ধন্যবাদ জানাই আমার কল্পিত কাহিনীর স্রোতে এমনভাবে মিশে যাওয়ার জন্য। সময়ের হিসাবে এদিক ওদিক গরমিল খুঁজে পাওয়া গেলে অত্যন্ত দুঃখিত। তবে যেহেতু যাত্রার গতি মনুষ্য পদচারণ অথবা ধাবন গতির উপর নির্ভর, এবং পথও সুগম নয়, সেহেতু পথে বিভিন্ন অসুবিধা এবং যাত্রী এবং পালকিবাহকদের পথিমধ্যে বায়োব্রেক, এবং যাত্রাবাহিনীর নিকোটিন ব্রেক ইত্যাদির কথা ও সময় অপচয়ের কল্পনা করতে বাধা নেই। তারপরেও ভুলত্রুটি বা গরমিল চোখে লাগলে তার জন্য পাঠকববন্ধুদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করি। ধন্যবাদ।


Name:  Amit           

IP Address : 9003412.218.0145.48 (*)          Date:25 Nov 2018 -- 07:11 AM

তুলে রাখলুম এইটা। পরের পর্ব কবে আসবে ? প্লিজ জলদি লিখে ফেলুন ।


Name:  SD          

IP Address : 238912.65.90045.4 (*)          Date:01 Dec 2018 -- 11:35 AM

তুললাম, অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।


Name:  শঙ্খ          

IP Address : 2345.110.9004512.3 (*)          Date:01 Dec 2018 -- 03:42 PM

দুহপ্তা না পুইলে লেকা আসবেনি এজ্ঞে। নরকবেটি মা ঠাইরেনের হুকুম।


Name:  রিভু          

IP Address : 780112.0.892323.218 (*)          Date:03 Dec 2018 -- 03:07 AM

তুললাম। ফেবু তে লোক জন কেঁদে কেঁদে হন্যে হয়ে যাচ্ছে লেখার জন্যে ।


Name:  ইন্দ্রলেখা ভট্টাচার্য          

IP Address : 2345.110.233412.22 (*)          Date:03 Dec 2018 -- 03:43 AM

#নরকনন্দিনী~ ১১ নং ভাগ~
রায়বাহাদুরের দুই ভয়বিমূঢ় নেত্রের নিষ্পলক দৃষ্টির সম্মুখে উহা তাঁহার কণ্ঠদেশ প্রদক্ষিণ করিয়া তাহা সবে প্যাঁচাইয়া ধরিতে উদ্যত হইয়াছে, এমন চরম মূহুর্তে বাহিরের দরোজায় একটা শোরগোল শুনা যাহিল। কাহারা সমবেত পদশব্দে ভিতরে প্রবেশ করিয়া ভূস্বামীর নাম ধরিয়া ডাকাডাকি, চেঁচামেচি শুরু করিল। তাহারা সকলে ডাকিতে ডাকিতে, খুঁজিতে খুঁজিতে দ্রুত সেই ডাক্তারের কক্ষে প্রবেশ করিল, এবং পাঠকগণকে বলিলে তাঁহারা হয়ত বিশ্বাস করিবেন না, ভিতরে ভূমিতে অচৈতন্যরূপে পতিত একাকী রায়বাহাদুর ভিন্ন কাহাকেও পাহিলনা। ডাক্তার যদুনাথ সেন, কম্পাউন্ডার মনোময়, ছিদাম, বটুক ও অন্যান্য পাইক-বেহারাগণ সকলেই সে দলে ছিল। ত্রস্তব্যস্ত হইয়া রায়বাহাদুরের অচেতন দেহ ভূমি হইতে উত্তোলিত করিয়া তাঁহাকে বেঞ্চে শোয়াইয়া মুখমণ্ডলে ও মস্তকে জলের ছিটা দিয়া, ডাক্তারবাবুর স্মেলিং সল্ট ঘ্রাণ করাইয়া প্রাথমিক শুশ্রূষা কীরূপে করিল, এবং তদপশ্চাৎ কীরূপ ঝঞ্ঝাট করিয়া তাঁহাকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করানো হইলো তাহার বিস্তারিত বিবরণে যাহিবনা। কিন্তু মোটের উপর ঘটনাটি কী ঘটিয়াছিল তাহার কতকটার আভাষ পাঠককে দান করা আবশ্যক। সে রাতে কার্যত দাওয়াখানা অর্ধদিবসে বন্ধ হইয়া গেলেও যদুনাথ ডাক্তার ও কম্পাউন্ডার মনোময় অকস্মাৎ পার্শ্ববর্তী পল্লীর একটি স্বচ্ছল গৃহের কিঞ্চিৎ সঙ্কটাপন্ন রোগী দেখিবার কল পাহিয়া সেস্থানে গিয়াছিল। ফিরিতে কিঞ্চিৎ বিলম্ব হয়। অপরদিকে প্রভুর বিলম্ব দেখিয়া রায়বাহাদুরের বেহারাদি লোকেরা মনে করিয়াছিল তিনি বুঝি চিকিৎসকবাবুর সহিত সাক্ষাতেই কালাতিপাত করিতেছেন, তবু তাহারা ঈষৎ চিন্তিত ও চঞ্চল হইয়া সদ্য একবার দাওয়াখানার ওদিকে গিয়া খবর লহিবে ভাবিতেছে, এমন সময় তাহাদের সম্মুখ দিয়া তাহারা ডাক্তারবাবু ও কম্পাউন্ডারবাবুকে বাটী অভিমুখে গমন করিতে দেখে। অর্থাৎ তিনি এযাবৎ গৃহের বাহিরে ছিলেন। তবে প্রভু কাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতেছেন! তাহাদিগের চিন্তা ও সন্দেহের উদ্রেক হয়, ও তাহারা তৎক্ষণাৎ চিকিৎসকবাবুকে নিজদলের পরিচয় দিয়া তাঁহার সঙ্গ নেয়। যদুনাথ সে দিবসের অপরাহ্নে বা বৈকালান্তে ভূস্বামীর আগমনের সম্ভাবনার কিঞ্চিৎ আন্দাজ করিয়াছিলেন, কিন্তু তাঁহার ধারণা ছিল যে তাঁহার বার্তানুরোধ মাফিক রায়বাহাদুর আসিলে তাঁহার গৃহেই আসিবেন। এবং তদ্রূপ তিনি স্বগৃহে বলিয়াও রাখিয়াছিলেন, যে রায়বাহাদুর আসিলে যেন তাঁহাকে উত্তমরূপে সমাদর জানাইয়া যদুনাথের গৃহে বসিয়াই তাঁহার প্রতীক্ষা করিতে বলা হয়। কিন্তু ভূস্বামীকে যে অবস্থায় পাহেন তাহা তাঁহার কল্পনায় ছিলনা। যেক্ষণে তাঁহারা বাহির হইয়াছিলেন, দাওয়াখানার প্রবেশদ্বারখানি বাটীর দিক হইতে আসিয়া দাওয়াখানার ভিতরদিক হইতে তালা ও অর্গল দ্বারা উত্তমরূপে বন্ধ করিয়া গিয়াছিলেন। যদুনাথের বাটীতে প্রবেশমাত্র না করিয়া ভূস্বামীপ্রবর তাহা বাহির হইতে খুলিয়া ভিতরে প্রবেশ করিলেন কীরূপে? বাটীমধ্য পরিবারের কেহই তো তাঁহার আগমনবার্তা পাহে নাই। তাই বাটীমধ্য হইতে কেহ আসিয়া খুলিয়া দিবার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনাও পরিলক্ষিত হইলনা। ভূস্বামী নিশ্চয় কোনরূপ বলপ্রয়োগ বা পদাঘাতপূর্বক, ভিতর হইতে রুদ্ধ দাওয়াখানার দরোজা ভাঙ্গিবার চেষ্টা করিবেননা! কেনই বা অমন করিবেন, আর যদি করিয়াও থাকেন, তবে অর্গল বা দরোজা বা তালার কোনো ক্ষতি হয় নাই কেন!! পুনশ্চ, শূণ্য দাওয়াখানায় ভূস্বামী একাকী কী করিতেছিলেন?! তিনি অচৈতন্য হইলেন কীরূপে?! এমতে বহু প্রশ্ন সকলের চিত্তেই পঙ্গপালের ন্যায় ঝাঁক বাঁধিয়া বারে বারে অনুপ্রবেশ করিতেছিল। তাহার অন্ততঃ কতকগুলিরও উত্তর যিনি দিতে পারিতেন সেই রায়বাহাদুর পাঁচকড়ি লাহা ততোক্ষণে সদর হাসপাতালের শয্যায় মূহুর্মুহু চেতনা হারাইতেছেন ও পুনরায় লাভ করিতেছেন, এবং কতকটা চেতনা হইলেই অসংলগ্ন সব প্রলাপবাক্য বকিতেছেন। সাহেব ডাক্তার সকল পরীক্ষা করিয়া বলিলেন, তেমন বড় কোন ব্যাধি বা আঘাতের নমুনা এযাবৎ পাওয়া যাহে নাই। সম্ভবতঃ কোনোকিছু দেখিয়া বা শুনিয়া প্রবল মানসিক আঘাত, অর্থাৎ 'শক্' পাহিয়াছেন। তা যাহা হউক ইতোমধ্য জমিদারপত্নী সংবাদ পাহিয়া হাসপাতালে ছুটিয়া আসিয়াছেন ও স্বামীর নিমিত্ত অত্যন্ত কাতর হইয়া কান্নাকাটি করিতেছেন। ভূস্বামী নামী লোক। অতএব কেহ না বলিলেও সদর হাসপাতালে রাষ্ট্র হইয়া স্থানীয় মানুষের মধ্য জানাজানি হইয়াছে। যদুনাথ ডাক্তারের সামাজিক স্তরে কিঞ্চিৎ প্রাথমিক জেরাও হইয়া গিয়াছে। তাঁহারই দাওয়াখানাটিতে এমন ঘটনা, সুতরাং তাঁহার দায়িত্বই সকলের চাহিতে অধিক। থানাপুলিশের আশঙ্কায় তাঁহার আননখানি মেঘাচ্ছন্ন। কিন্তু যাহা হউক বিধুসুন্দরী দেবী অবগুণ্ঠণের অন্তরাল হইতে সম্ভ্রান্ত গৃহের কর্ত্রীর উপযুক্ত মহিমায় ডাক্তারসাহেবের সহিত কথাবার্তা বলিয়া তাঁহাকে একপ্রকার বিশ্বাস করাইলেন যে, পতিদেবের শরীর নানা দায়িত্ব ও দুশ্চিন্তার তাড়নায় প্রথম হইতেই এমত খারাপ হইয়াছিল যে অকস্মাৎ অসুস্থ বা অচৈতন্য হওয়া আশঙ্কার কথা হইলেও কল্পনাতীত নহে। কতকটা নিজ চিকিৎসার প্রয়োজনেও রায়বাহাদুর ডাক্তার যদুনাথ সেনের চেম্বারদর্শনে যাহিয়াছিলেন, বেচারা যদুনাথ যদি ভূস্বামীকে তাঁহার সচেতন অবস্থায় সাক্ষাৎ করিতে পাহিতেন তবে তাঁহার শারীরিক দুর্বলতার জন্য তিনি উত্তম ঔষধপথ্যই লিখিয়া দিতেন সন্দেহ নাহি। এই মূহুর্তে অসুস্থ স্বামী কতকটা ধাতস্থ হইলেই তাঁহাকে লহিয়া তিনি গৃহাভিমুখে ফিরিতে চাহেন। রায়বাহাদুরের বিশ্রামের অতি প্রয়োজন। স্বামী কতকটা সুস্থ হইলে পর কালক্ষেপ না করিয়া কলিকাতায় তাঁহাকে ভূস্বামিনীর পিত্রালয়ে লহিয়া গিয়া পিতৃকুলের চিকিৎসক এক বড় ডাক্তারকে দেখাইবেন। সে নামজাদা বিশেষজ্ঞের নাম শুনিয়া খোদ ডাক্তারসাহেবও আপাতদৃষ্টিতে চমৎকৃত হইলেন। এমত বিভিন্ন নিপুণ বিচক্ষণতার বাক্য প্রয়োগ করিয়া বিধুসুন্দরী আনুষঙ্গিক ঝঞ্ঝাটের তৎকালিক নিষ্পত্তি করিয়া স্বামীর উপযুক্ত পত্নী হইবার পরিচয় দিলেন।
যাহা হউক, এ যাত্রায় রায়বাহাদুর বাঁচিয়া যাহিলেও তাঁহার মানসিক সন্তুলন তদ্যাবধি কিঞ্চিৎ দোদুল্যমান রহিয়াছিল। তিনি কী করিয়া দাওয়াখানার অভ্যন্তরে প্রবেশ করিলেন বা কী দেখিয়া অচৈতন্য হইয়া পড়িয়াছিলেন তাহা সমস্ত রাত্রির মধ্য কোনমতেই স্মরণ করিতে পারিলেননা। থাকিয়া থাকিয়া কিছু অসংলগ্ন বাক্য বলিতেছিলেন বলিয়া ডাক্তার তাঁহাকে এক কড়া ইঞ্জেকশন প্রয়োগ করিয়া নিদ্রাচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছিলেন। যাহা হউক, প্রহর দুইয়ের মধ্য নিশান্ত হইবার ঠিক পূর্বেই বিধুসুন্দরী দেবী সঙ্গস্থ ভৃত্য ও পরিচারিকাগণের সহায়তায়, ও ডাক্তারসাহেবের একপ্রকার অনিচ্ছাপূর্বক সম্মতিতেই অর্ধজাগ্রত রায়বাহাদুরকে লহিয়া তাঁহাদের পালকিতে উঠাইলেন। যদুনাথ ডাক্তার রাত্রিব্যাপী জাগিয়া হাসপাতালের অপেক্ষাগৃহে বসিয়া বসিয়া কিঞ্চিৎ নিদ্রিত হইয়া পড়িয়াছিলেন। বিধুসুন্দরী সহকারী ডাক্তারবাবু ও নার্সদিগকে বলিয়া যাহিলেন, চিকিৎসক বাবুকে জাগাইয়া আর অধিক ক্লেশ দিবার প্রয়োজন নাহি। তিনি ইতোমধ্যই যথেষ্ট বিড়ম্বিত ও শ্রান্ত হইয়া আছেন। তিনি নিদ্রা সম্পূর্ণ করিয়া উঠিলে পর তাঁহাকে তাঁহাদের বিদায় সংবাদ দিলেই চলিবে। সনার্সগণ ইহা শুনিয়া আশ্চর্য হইয়া ডাক্তার সাহেবের মুখপানে তাকাইয়া সেখানে কী দেখিলেন বলিতে পারিনা, তাঁহারা কেমন একপ্রকার নিরুত্তর ও নীরব হইয়া গেলেন। কিন্তু ডাক্তার সাহেব নিরুত্তর রহিলেও শিকারি মার্জারের ন্যায় সতর্ক ছিলেন। তিনি অভিজ্ঞ, উচ্চশিক্ষিত ও ধর্মভীরু খ্রিষ্টান। তাঁহার ডাক্তারি ইউনিফর্মের পকেটে ছোটো বাইবেল ও কণ্ঠদেশ আবেষ্টনকারী প্রলম্বিত চেনে লাগানো ক্ষুদ্র ক্রসখানি সর্বদাই আত্মগোপন করিয়া থাকিত। তিনি বিধুসুন্দরী ও তাঁহার সঙ্গীগণের প্রবেশকাল হইতে গমন ইস্তক সে দ্রব্যগুলি তাঁহার অন্তরাত্মার কোন গোপন ইঙ্গিতে একবারও স্পর্শচ্যুত করেন নাই। কিন্তু এইবারে তাঁহারও শেষ অস্ত্র প্রয়োগের মূহুর্ত উপস্থিত হইয়াছে। জলদগম্ভীর স্বরে তিনি পার্শ্ববর্তিনী বঙ্গদেশীয়া সিস্টারকে আহ্বান করিলেন, "মিস বসাক, নাউ।" অত্যন্ত দ্রুত প্রায় ক্ষিপ্রগতিতে একটি জবাপুষ্পের মাল্য নির্দিষ্ট মন্ত্রোচ্চারণের সহিত উড্ডীন হইয়া আসিয়া রায়বাহাদুরের কণ্ঠে পুষ্পাঞ্জলির ন্যায় পড়িল। কক্ষে যেন বজ্রপাত হইল। একী! এত দ্রুত, চক্ষের পলকে কোথায় গেলেন রায়বাহাদুরের ধর্মপত্নী!! কোথায় লোকজন? কোথায় কে?!! নিষ্ক্রমণদ্বারের নিকট শুধুমাত্র, যেন সদ্যজাগ্রত, বিমূঢ় রায়বাহাদুর, ও ডাক্তার সাহেব ব্যতীত মোট পাঁচ কম্পিতহৃদয়, হতভম্ব ডাক্তার ও নার্স। ~ক্রমশ~


Name:  amit          

IP Address : 340123.0.34.2 (*)          Date:03 Dec 2018 -- 06:08 AM

এক নিঃস্বাসে পরে ফেললুম। আবার পরের পর্ব কবে আসবে ?


Name:  রিভু          

IP Address : 450112.191.564523.191 (*)          Date:03 Dec 2018 -- 12:40 PM

ইন্দ্রলেখা এটা ফেবু গ্রূপেও দিয়ে দেবেন? সেখানে লোকজন হত্যে দিয়ে পড়ে আছে।




Name:  pi          

IP Address : 4512.139.122323.129 (*)          Date:03 Dec 2018 -- 12:45 PM

রিভু, এই লিন্কটা গ্রুপে দিয়ে দে না!


Name:  ইন্দ্রলেখা ভট্টাচার্য           

IP Address : 2345.110.125612.154 (*)          Date:03 Dec 2018 -- 02:07 PM

রিভু গুরুর ফেবু গ্রুপে তো রাত্রেই দিয়ে দিয়েছি এটা।


Name:   Indralekha Cleopatra Bhattacharya           

IP Address : 2345.110.894512.95 (*)          Date:15 Dec 2018 -- 01:27 AM

#নরকনন্দিনী~ ১২ নং ভাগ~
ডাক্তার সাহেব অবস্থার গতি অনুধাবন করিয়া দ্রুত রায়বাহাদুরের নিকট আসিয়া তাঁহার স্কন্ধদ্বয় দৃঢ়ভাবে ধরিয়া না ফেলিলে হয়ত পাঁচকড়িবাবু ভূপতিত হইতেন। সকলে মিলিয়া ভূস্বামীকে ধরাধরি করিয়া লহিয়া গিয়া পুনরায় তাঁহার নির্দিষ্ট শয্যায় শয়ন করাইয়া দিলেন। নার্স তাঁহাকে গেলাসে করিয়া ধূমায়িত দুগ্ধ প্রদান করিলেন। অতঃপর কক্ষে চিকিৎসক যদুনাথ সেনের আবির্ভাব হইল। ডাক্তারসাহেব হাসিয়া পাঁচকড়িকে বলিলেন, "বাবু, দ্যের কামস ইয়োর সেভিয়র। আপনার প্রকৃঠ ঠ্রাটা যঢুনাট আসিয়া পড়িয়াছেন, আর অঢিক চিন্ঠা খরিবেন না।" তদ্যাপি ভয়জর্জরিত, কম্পিতহৃদয় পাঁচকড়ি বিস্মিত ও মূঢ়বৎ তাঁহাদের দিকে ফ্যালফ্যাল করিয়া চাহিলে পর, ডাক্তার থমাস বেকার চক্ষুর ইঙ্গিতে যদুনাথের অনুমোদন লহিয়া সবিস্তারে পাঁচকড়িবাবুকে সকল বৃত্তান্ত বুঝাইয়া বলিলেন। তাহার সারমর্ম এই যে যদুনাথের দাওয়াখানায় যে রহস্যময় পরিস্থিতিতে ভূস্বামী অসুস্থ হইয়া পড়িয়াছিলেন, তাহাতে যেমন প্রারম্ভে হাসপাতালে আসিয়া যদুনাথকে অনেকের সন্দেহ ও অনুসন্ধিৎসার কেন্দ্রে পড়িতে হয়, তদ্রূপ তিনিও প্রথম হইতেই স্বীয় অন্তরে কিছু আশঙ্কা ও সন্দেহ পোষণ করিতেছিলেন যাহা তিনি প্রথম হইতেই গূঢ় রাখিয়াছিলেন, এবং কিঞ্চিৎ উপযুক্ত প্রমাণাদি না সংগ্রহ করিয়া কাহাকেও জানান নাই। হাসপাতালে আনয়ন করিবার কালে রায়বাহাদুরের কন্ঠাবেষ্টনকারী উত্তরীয়টি স্খলিত হইয়া পড়িয়াছিল, এবং যদুনাথ তাহা সযত্নে উত্তোলন করিয়া সঙ্গ করিয়া লহিয়া চলেন। সদর হাসপাতালের অতি নিকটে এক তন্ত্রসিদ্ধ যোগী পুরুষের আশ্রমে তাঁহার ও তাঁহার পরিবারের যাতায়াত ছিল। হাসপাতালে পঁহুছিয়া ভূস্বামীর ভর্তির ব্যবস্থাদি করিয়াই তিনি সর্বপ্রথম সেই উত্তরীয় লহিয়া যোগীবাবার আশ্রমে যান। তত্র মহাপুরুষকে প্রণামপূর্বক তাঁহাকে সে উত্তরীয়টি আগাইয়া দিয়া সবে ভূমিকা সহকারে সকল ঘটনার বিবরণ দিতে যাহিতেছেন, কি সেই যোগীপুরুষ সেই উত্তরীয়খানি টানিয়া লহিয়া সক্রোধ ঘৃণায় দূরে নিক্ষেপ করিলেন। উত্তরীয়টিতে যে বায়ু লাগিয়াছে, তাহার দুর্গন্ধ সাধারণ মনুষ্য না পাহিলেও সেই মহাযোগী তান্ত্রিক উত্তমরূপেই পাহিয়াছিলেন। তিনি উত্তরীয় স্পর্শ করিয়াই ইহা বহনকারী দুর্ভাগা মনুষ্যটির জীবনের উপস্থিত বিড়ম্বনা ও বিপদসকলের সম্বন্ধে সম্যক অবগত হইয়াছিলেন। তিনি যদুনাথকে বলিলেন, "বেটা, দিব্যি তো বদ্যিগিরি করে খাচ্চিলি, একী আপদে জড়ালি বল দিকিনি! এ হতভাগা যে সাক্ষাৎ সেকানকার রাজাকে ঘরে পুষেচে। এর যে গুষ্টিনাশ হতে চলিচে রে! এ কলঙ্কের ছায়া যে তোর ঘরেও সুড়সুড়িয়ে সেঁদিইচে রে। এবার তো সব্বোনাশ!" একথা শুনিয়া যদুনাথ চরম বিচলিত হইয়া পড়িলেন। তাঁহার চক্ষুর সম্মুখে তাঁহার দুই শিশুকন্যার মিষ্ট আনন দুইটি ভাসিয়া উঠিল। তিনি তৎক্ষণাৎ যোগীবাবার পদপ্রান্তে পড়িয়া তাঁহার করুণা ভিক্ষা করিলেন, এবং তাঁহাদের সকলের এই আসন্ন অমঙ্গল হইতে পরিত্রাণের উপায় বলিবার জন্য যোগীবাবাকে আকুল অনুরোধ করিতে লাগিলেন। অবশেষে যোগীর প্রাণে অত্যন্ত করুণর সঞ্চারই হইয়া থাকুক, অথবা তিনি তাঁহার সাধকের কর্তব্য স্মরণ করিয়াই হউক, "আঃ মোলো যা, করিস কী, পা ছাড় দিকি বাপু" বলিয়া যদুনাথকে তাঁহার চরণ আকর্ষণ হইতে নিবৃত্ত করিয়া, ও তাঁহাকে কিঞ্চিৎ আশ্বাসপ্রদানপূর্বক ক্ষণকালের নিমিত্ত ধ্যানমগ্ন হইলেন। কিয়ৎক্ষণ পশ্চাৎ চক্ষু উন্মীলন করিয়া সম্মুখস্থ কালীমূর্তির পদপ্রান্তে পতিত একটি জবামাল্য উত্তোলন করিলেন, ও তাহাতে লঘুস্বরে মন্ত্রোচ্চারণ সহকারে গঙ্গাজলের ছিটা দিয়া সেই মন্ত্রঃপূত পুষ্পমাল্যটি যদুনাথের হস্তে দিয়া তাঁহাকে অতঃপর করণীয় কিছু নির্দিষ্ট কার্যসূচি বুঝাইয়া দিলেন। যদুনাথ মাল্য লহিয়া হাসপাতালে ফিরিয়া ডাক্তার সাহেবকে একান্তে ডাকিয়া তাঁহাকে সকল তথ্যাদি জানাইতে একপ্রকার বাধ্য হইয়াছিলেন, যেহেতু প্রধান চিকিৎসক মহাশয়ের অবগতি ও সম্মতি ব্যতীত রোগীর উপর এরূপ কোনো ধর্মীয় প্রহরা রাখা সম্ভব ছিলোনা । যাহা হউক, ধর্মবিশ্বাসী, নিষ্ঠাবান খ্রিস্টধর্মাবলম্বী থমাস সাহেব যদুনাথকে নিরাশ তো করেনই নাই, উপরন্তু পরম সহায়তা করিয়াছেন। অবশ্য সেবামূলক কার্যাদি ও দানধ্যানের নিমিত্ত সদরের গীর্জায় ও নিকটবর্তী স্থানগুলিতে তাঁহার সুনাম ছিল। রায়বাহাদুর সকল শুনিয়া কিয়ৎকাল স্তম্ভিত হইয়া থাকিলেন, অতঃপর স্বীয় বস্ত্রপ্রান্ত দ্বারা দুই চক্ষু হইতে উদ্গত অশ্রুবিন্দু মার্জনা করিয়া দুই হস্তে একবার যদুনাথ, ও একবার থমাস বেকারের দুই হস্ত করজোড়ে আবেষ্টন করিয়া বাষ্পাকুল কণ্ঠে তাঁহাদিগকে বারংবার ধন্যবাদ প্রদান করিতে করিতে অবশেষে কহিলেন, "ডাক্তারসাহেব, যদুনাতবাবু, এ জীবনকালে তেমন ভালো কাজ তো কিচু করেচি বলে মনে পড়েনা; তবে কোন পুণ্যির জোরে আপনাদের মত মহৎ, সাধু পুরুষদের সঙ্গ পেলুম, উপকার পেলুম!! আপনাদের এ ঋণ কেমন করে শুদবো তা ভেবে পাইনে! এ বিপদ হতে যদি নিস্তের পাই, কথা দিচ্চি আপনাদের সেবাকার্যে সাহায্য, দানধ্যান করেই বাকি দিনকটা কাটিয়ে দেবো। গরীব প্রজাদের উপর অত্যেচার, জোরজুলুম তো কম করিনি। এসব হ'ল আমারই সব অপকর্মের ফল, যা একন সবাইকে ভোগ করতে হচ্চে। আমি বুজিচি এবার, সেদিন মদনমোহন ঠাকুরও কেন আমার দিকে মুক ফিরিয়ে আমার মন্দির ত্যাগ করে গেলেন। তিনি আগে থেকেই রুষ্ট। আমি যে বড় খারাপ মানুষ! আমার, কি আমার পরিবারের রক্ষে তিনি কেন করবেন? আমি এবার সব বুজিচি। আমার চেতনা হয়েচে। যদুনাতবাবু, কোতায়, নে চলুন আমায় যোগীবাবার কাচে। তেনের পায়ে পড়বো আমি। যা পাচিত্তির বলেন, করবো। আমার পরিবার, পুত্তুরদের বাঁচান তিনি। চাই কি মরতে হয়, আমি মরি।" কহিতে কহিতে দোর্দণ্ডপ্রতাপ রায়বাহাদুরের কণ্ঠস্বর আরো অধিক অশ্রুবিজড়িত, আর্দ্র হইয়া আসিল। যদুনাথ ও থমাস সাহেব মিলিয়া তাঁহাকে যথোচিত সান্ত্বনা ও আশ্বাস দিয়া ধাতস্থ করিয়া কিঞ্চিৎ বিশ্রাম দিলেন। অতঃপর যদুনাথ ভূস্বামীকে সঙ্গ করিয়া তাঁহার যোগীবাবার নিকট লহিয়া যাইলেন। যোগীবাবার আশ্রমে প্রবেশ করিতেই যদুনাথের পশ্চাতে পাঁচকড়িবাবুকে দেখিয়া সে সিদ্ধপুরুষ অট্টহাস্য করিয়া উঠিলেন। তাঁহার গম্ভীর হাস্যধ্বনি আশ্রমের প্রাকারগাত্রে প্রতিহত হইয়া চতুর্পার্শ্বে মন্দ্রিত হইয়া উঠিল। "এ কাকে আনলিরে ব্যাটা বদ্যি? একি সেই হারামজাদা পাঁচকড়ি জমিদার, নাকি কলে পড়া ইঁদুর!" রায়বাহাদুর সেই মেঘমন্দ্র, গম্ভীর, ভীষণ কণ্ঠস্বর শুনিয়া প্রথমে শিহরিত, পরে থতমত,সন্ত্রস্ত হইয়া গুটিগুটি যোগীবাবার আসনের নিকট যাহিয়াই "উদ্ধার করুন বাবা" বলিয়া ত্বরায় তাঁহার পদপ্রান্তে একেবারে সাষ্টাঙ্গে প্রণত হইয়া লুটাইয়া পড়িলেন। বিশাল জটাজুটধারী, রক্তচক্ষু, গাঢ় শ্যামবর্ণ সন্ন্যাসীর মুখপানে তিনি তখনো ভালো করিয়া চাহেন নাই। কিন্তু হঠাৎ কর্ণে শ্রবণ করিলেন, "ওরে ওট ব্যাটা পাঁচু। খুব হয়েচে। ওট দিকিনি এবার।" এবার জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বর যেন পাঁচকড়ির কর্ণে ঈষৎ মোলায়েম এবং কেমন যেন বহুদিনের পরিচিত লাগিলো।তিনি চকিতে চমকাইয়া মুখ তুলিয়া একবার সন্ন্যাসীর মুখপানে চাহিয়াই "ছোটকাকা" বলিয়া অস্ফুট এক চীৎকার করিয়া উঠিলেন। যোগীবাবাও তাঁহার আপাত কাঠিন্যের সুউচ্চ দৃঢ় প্রাচীরের কোথায় যেন একটু ছোট ছিদ্র করিয়া ঈষৎ করুণামিশ্রিত নয়নে পাঁচকড়িকে দেখিলেন। পাঁচকড়ি যখন দ্বাদশ বৎসরের বালক তখন তাঁহার ছোটকাকা দু' কড়ি, ওরফে বলাই লাহা গৃহত্যাগী হইয়াছিলেন। জনশ্রুতি ছিলো এই, যে বলাই লাহা সংসারত্যাগী হইয়া কোনো এক তান্ত্রিক সন্ন্যাসীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়াছেন। আজি দীর্ঘ প্রায় ত্রিশ বৎসরকাল পর খুড়া-ভাইপোর মিলন হইল। পাঁচকড়ির জমিদারিতে যখন হইতে প্রবেশ ও বসত করিতেছেন, সন্ন্যাসী বলাই লাহা ভ্রাতুষ্পুত্রের বৈষয়িক উন্নতির আলোচনা যত্রই শুনিতেছেন, তত্রই প্রশংসা অপেক্ষা অত্যাচারী ও দাম্ভিক ভূস্বামী হিসাবে তাহার নিন্দাই অধিক শুনিতেছেন ও অপ্রসন্ন হইতেছেন। কিন্তু আজি এতকাল পরে ভ্রাতুষ্পুত্রকে সাক্ষাৎ করিয়া তিনি অধিকক্ষণ অন্তরের কটুভাব বজায় রাখিতে পারিলেন না, এবং অবশেষে তাঁহার সন্ন্যাসীসুলভ ক্ষমাসুন্দর হৃদয়ে বিপন্ন ভ্রাতুষ্পুত্রের প্রতি করুণা ও আর্দ্রভাব জাগিয়া উঠিল। "মা তোকে ঠিক সময়ে আমার কাচে এনেচেন। তোর ও তোর পরিবারের মঙ্গল হোক পাঁচু। তোর সুমতিও জেগে উটুক" বলে পাঁচকড়ির মস্তকে তাঁহার করতল রাখিয়া বলাই সন্ন্যাসী তাঁহাকে স্নেহাশীর্বাদ করিলেন। পাঁচকড়ি তাঁহার খুল্লতাতের পদযুগল জড়াইয়া ধরিয়া যুগপৎ আনন্দ এবং অনুতাপের অশ্রুবর্ষণ করিতে লাগিলেন। ~ক্রমশ


এই সুতোর পাতাগুলি [1] [2]     এই পাতায় আছে18--48