বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--12


           বিষয় : সৈকত (২য়) , সাহিত্য বিষয়ে মন্তব্য সমূহ
          বিভাগ : বই
          শুরু করেছেন :oraphe
          IP Address : 340123.132.451223.86 (*)          Date:13 Aug 2018 -- 05:50 PM




Name:  h          

IP Address : 340123.132.451223.86 (*)          Date:13 Aug 2018 -- 05:52 PM

সৈকত ২য়ঃ

নইপল আমি একটিই পড়েছি আন আরেঅ ওফ ডর্ক্নেস্স, ষাটের দশকের মাঝামাঝি লেখা ট্রাভেলগ, নইপলের প্রথমবারের জন্য ভারতে আসা সে সময়ে। সারা বই জুড়ে ছড়িয়ে ছিল ভারতের প্রতি নইপলের অত্যন্ত ক্রিটিকাল দৃষ্টি, প্রায় কিছুই পছন্দের ছিলনা নইপলের ঐ যাত্রায়, বইয়ের নামেই সেটা স্পষ্ট। সবচেয়ে বেশী অপছন্দের ছিল, চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অপরিষ্কার, নোংরা আর দারিদ্র। বইটা এদেশে ব্যানও হয়েছিল, ঐ দৃষ্টিভঙ্গীর জন্য।

প্যরালাল টেক্স্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল ভারতে ফিরে আসার পরে এই দেশ সম্বন্ধে মোহনদাস গান্ধীর মতামত, চিঠি, লেখালেখি। "বাইরের" লোক হিসেবে গান্ধী যা দেখেছিল, দেশের লোকদের সেই সব চোখ এড়িয়ে যেত, বাইরের লোক যারা তারাই বেশী দেখে, এরকমই ছিল নইপলের বক্তব্য ! নিজেও সেটাই বলতে চেয়েছিলেন মনে হয়। (কলকাতাতেও এসেছিলেন । সমালোচনা প্রবনতা কিছুটা কম ছিল, কলকাতা নিয়ে ? মূলতঃ কলকাতা শহরকেন্দ্রিক সাহিত্য-শিল্প সংক্রান্ত কাজকর্মের খোঁজ পেয়ে। ) শেষ পর্যন্ত, উত্তর প্রদেশের সেই গ্রামে, যেখান থেকে তাঁর পূর্বপুরুষরা চলে গিয়েছিল ত্রিনিদাদ, সেখানে পৌঁছে, যখন নইপলের মনে হল, গ্রামের লোকেরা অপেক্ষা করছে তার কাছ থেকে টাকা-পয়সা-আর্থিক সাহায্য, তখন প্রবল হয়ে ওঠে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে।

নইপল, তায়েব সালিহ নয়, নীলনদের জলে জলে ডুবে যেতে যেতে যে সাহায্যের জন্যে প্রাণপণে চেঁচিয়ে উঠবে। হয়ত কনরাড অনুসারীই বেশীটা, কলোনীর ক্ষত স্পষ্ট নয় বা তার থেকে আলাদা, কিছুটা বাইরে দাঁড়িয়ে।




Name:  সৈকত          

IP Address : 340112.99.675612.98 (*)          Date:04 Sep 2018 -- 12:26 PM

আর নুট হামসুন, লেখায় মডার্নিস্ট ধারার পুরোধা পুরুষ। টমাস মান, কাফকা, স্টিফেন জইগ হয়ে আইসাক বাশেভিস সিঙ্গার, সবাই কিছু না কিছু নিয়েছে হামসুনের লেখা থেকে। বিংশ শতক শুরুর আগে থেকে, ১৯২০ নাগাদ অবধি, হামসুনের লেখালেখির সেরা সময়। Hunger, Mysteries, Pan, Victoria হয়ে ১৯২০ তে নোবেল, মূলতঃ Growth of the Soil উপন্যাসের জন্য, সাগা বিশেষ। মোটামুটি একই সময়ে, হামসুন, স্ট্রিন্ডবার্গ আর এদোয়ার্ড মুঙ্খ, উপন্যাসে, নাটকে, আর ছবিতে - এক্সপ্রেসানিজমের চূড়ান্ত প্রকাশ, অন্তরমনের বিস্ফার !! স্ট্রীম অফ কনশাসনেস, ইন্টিরিয়র মনোলগ, ছেঁড়াখোঁড়া মানসিক অবস্থার প্রকাশ, মডার্নিস্ট লেখালেখির এই চিহ্নগুলো সবই` উপস্থিত নুট হামসুনের লেখায়।

এখানে তো প্রেমেন মিত্র চেয়েছিলেন, কল্লোলের আতিশয্যে, গোর্কি আর হামসুনের লেখাকে মিলিয়ে লিখবেন। মাণিকবাবু সে কথা শুনে, হামসুন পড়তে গিয়েছিলেন, বুঝতে পারেননি ঐ মেলানোটা কি ভাবে সম্ভব !!

রাজনীতি আর বক্তব্য যাই হোক, এসব লেখকদের, নাঃ, জাস্ট ছাড়া যায় না, শুধু দু-চারটে বইয়ের জন্যই ।




Name:  সৈকত          

IP Address : 340123.99.121223.134 (*)          Date:04 Sep 2018 -- 02:15 PM

- প্রসঙ্গটা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখাতেই ছিল। হয় 'লেখকের কথা' বইয়ের কোন লেখায়, অথবা মার্ক্সবাদী পত্রিকায় বিতর্কের সময়ে মাণিকবাবুর বড় প্রবন্ধটায়, অথবা শরৎচন্দ্রের "শেষ প্রশ্ন" উপন্যাসের সমালোচনায়।


Name:  i          

IP Address : 452312.169.9005612.240 (*)          Date:04 Sep 2018 -- 02:35 PM

'লেখকের কথায়' আছে। কালি কলমে প্রেমেন্দ্র মিত্র একটি চিঠি লেখেন- জীবনকে দেখাবার পাঠ নিতে যদি গোর্কি হ্যামসুনের পাঠশালায় গিয়েই থাকি তাতে দোষ কী-এযে জটিল দুর্বোধ্য জগৎ... ইত্যাদি। আরো লিখেছিলেন, এই জগতে এলে ইউক্লিডরা ফাঁপরে পড়ে।
মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখলেন, হ্যামসুনের বই তিনি পড়েছিলেন (হাঙ্গার সম্ভবতঃ), এই চিঠি পড়ে গোর্কি পড়তে গেলেন এবং মাদার পড়তে পড়তে আশ্চর্য হয়ে ভাবলেন, হ্যামসুন আর গোর্কিকে প্রেমেন্দ্র মিত্র মেলাবেন কেমন করে...


Name:  সৈকত          

IP Address : 340112.99.675612.98 (*)          Date:11 Sep 2018 -- 08:48 AM

i-দিকে ধন্যবাদ জানালাম, ঠিক তথ্যটা দেয়ার জন্য।


Name:  ওরফে          

IP Address : 340123.99.121223.132 (*)          Date:11 Sep 2018 -- 03:14 PM

ইন্দোকে বলার, যে ড্যানিল খার্মস পড়তেই পার। যে কোনো অ্যাবসার্ডিস্ট লেখাপত্তর পড় উচিত, আরও উচিত ১৯২০-৩০ এর রাশিয়ার চরম আভাগার্দ লেখালেখিগুলো, শ্ক্লভস্কির ফর্ম্যালিস্ট স্কুলের সমালোচনা সাহিত্য সমেত !!


Name:  সৈকত          

IP Address : 342323.176.2389.171 (*)          Date:12 Sep 2018 -- 01:24 AM

ঈশানের আগের দুটো উপন্যাস, খেরোবাসনা ও মনেঞ্জোদারো, মূলতঃ প্যারানৈয়াক জগতের আখ্যান। প্রধাণ চরিত্রদুটি, ক্রমাগত তাদের চারপাশকে নিয়ন্ত্রন করার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যায়। খেরোবাসনায় সেটা শুধুই লোকজনকে লক্ষ্য করে যাওয়া, নোটবইতে তাদের সম্বন্ধে লিখে যাওয়া অথবা শিশুর ড্রয়িং-এর মত অদ্ভুত ছবি আঁকা; সবই যেন সে করে যাতে নিজের ওপর থেকেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে না ফেলে, তার চেষ্টা। মহেঞ্জোদারোয়, জগতটা যেন আরও নিয়ন্ত্রনের বাইরে, তার চাপে বুনো, মুখ্য চরিত্রটি, নিজের চিন্তাভাবনাকেও পালটে ফেলতে চায়। সে যা চায় তা কখনই ঘটবে না জেনে, অথচ সেইগুলো ঘটুক সেরকমই ইচ্ছে বলে, নিজের চাওয়াগুলোও উল্টে দিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত ঘটনার আকাঙ্খা করে, কারণ 'আশা' যে সেগুলোও সে সত্যিই চাইছে বলে, সেগুলোও না ঘ'টে যা সে চায় সেগুলোই ঘটবে !! কিন্তু শেষরক্ষা হয়না, যারা পড়েছেন তারা জানেন যে প্রথম লেখাটায় , শেষ পর্যন্ত চারপাশটা মা্ছের বাজার হয়ে ওঠে, চোর সন্দেহে নিরপরাধ একটি ছেলেকে গণপিটুনির মধ্যে দিয়ে তুমুল ভায়োলেন্স শুরু হয়, আর কিছুই করার থাকে না। পরের লেখাটি শেষ হয় বান্ধবী বিচ্ছেদে এবং প্রাণপণে এই (বিপরীত) চাওয়াতে যে সে আর বাঁচতে চায় না, সত্যি সত্যি যাতে সে বেঁচে থাকতে পারে, জীবনের সবকিছু নিয়ে !!

'দিনগুলি রাতগুলি'-তে প্যারানৈয়ার জগত অতখানি ব্যাপক নয়। একেবারে যে নেই, সেটাও নয়, উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদ শেষই হচ্ছে এই বোধ দিয়ে যে চরিত্রটি কোন মানুষের মুখই স্পষ্ট করে চিনতে পারে না, মাঝামাঝি অংশে ফিরে আসছে একই কথা, যে পরিপ্রেক্ষিত বদলে গেলে কোন লোককে সে চিনতে পারে না, অথবা নন্দন চত্বরের পরিচ্ছেদেও একই রকম ঘটে, সুবেশ-সুবেশা মানুষ-মানুষীর ভিড়ে, ঠ্যালা আর গুঁতো খেতে খেতে মাথার ভেতরে এই বোধটা স্থিরই থাকে যে সে পৃথিবীর কোন লোককেই চিনতে পারে না। যেন সে এক অবোধ শিশু অথবা অপরিপক্ক মষ্তিষ্কশুদ্ধ এক মানুষের বোধ তার !!

কিন্তু এর অরেও যে বুনো তার চারিদিককে নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করে না, তার কারণ সে নিজেকে যেন এক ঘোরের মধ্যে ছেড়ে দিয়েছে অথবা ঐ ঘোরের মধ্যে থেকে যাওয়াটাই তার একরকমের বেঁচে যাওয়া। এই ঘোরটা কামনার ছোঁয়া লাগা যৌনতা যা
পর্নোগ্রাফির শরীর নয় অথবা প্লেটোনিক কিছু, শিরশিরানিময় এক অনুভূতি, ডিজায়ার বলি যাকে, অপ্রাপণীয় যা, তার থেকে এই কামনার ইশারাটা সমানে সে ধরতে পারে, বুনো সেই জন্যই হয়ত শেষ পর্যন্ত দৈনন্দিনটা কাটিয়ে উঠতে পারে, আগের দুটো উপন্যাসের মত নিয়ন্ত্রনহীন অদ্ভুত পরিপার্শ্ব তার সম্পূর্ন জগত নয়।

চরিত্রের ক্রোনোলজি অনুযায়ী অথবা উপন্যাসের বাস্তব মানলে, দিনগুলি রাতগুলি যেন আগের ঘটনা, চরিত্রটি এরপর তার যৌবনকালকে ফেলে রেখে ধারালো পৃথিবীতে ঢুকে যাবে পরের দুটি লেখায়, কামনা বা যৌনতা সেখানে অনুপস্থিত, যা আছে তা সম্পর্ক নয়, সম্পর্কের ক্যরিকেচার, সেখানে ক্রন্দনেরও স্থান নাই। এও লক্ষ্য করে দেখি যে মহেঞ্জোদারো বা দিনগুলি রাতগুলিতে, দুটো উপন্যাসেই চরিত্রটির নাম বুনো ! খেরোবাসনায় কি ছিল মনে নেই, একই নাম থাকলেও বা না থাকলেও বিশেষ কিছু যায় আসে না বলেই মনে করি। অন্য কেউ নাম ধরে তাকে খুব কমই ডাকে (বুনো নামটিও অদ্ভুত, যেন কোন নামই নয়), প্রথম পুরুষে লেখা তিনটি উপন্যাসেই 'আমি'ই প্রধাণ, আমি-টি ক্রমাগতই নিজেকে একটা স্থিরতা দিতে চাইছে কারণ সে হয়তবা তার গৃহ হারিয়েছে।





Name:  ওরফে          

IP Address : 2345.110.123412.80 (*)          Date:14 Sep 2018 -- 05:35 AM

http://www.guruchandali.com/blog/guruchandali.Controller?portletId=8&p
orletPage=2&contentType=content&uri=content1321614002982


ওপেন ভেইনস এবং সকার ঈন শেডস অ্যন্ড সান খ‍্যাত এডুয়ারডো গালি য়ানো প্রসঙ্গে (সৈকত এবং কেসি)


Name:  সৈকত          

IP Address : 340112.99.675612.98 (*)          Date:25 Sep 2018 -- 03:13 PM

'গগন ঠাকুরের সিঁড়ি' নামে, দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় একটি উপন্যাস লিখেছিলেন, ১৯৬০-৬১ সাল নাগাদ 'বিংশ শতাব্দী' নামে পত্রিকায় এগারোটি অধ্যায় প্রকাশ হওয়ার পরে, লেখাটি অসমাপ্ত অবস্থায় বন্ধ হয়ে যায়। দেবেশ রায়, পরে, দীপেন্দ্রনাথ মারা যওয়ার পরই হয়ত পরিচয়-তে সেই লেখাটা ছাপিয়েছিলেন।কয়েক বছর আগে, উপন্যাস সমগ্রতে লেখাটি এসেছে, শেষের আরও কয়েকটি অধ্যায় সমেত; হয়ত লেখাটি সমাপ্ত হয়। কিন্তু আমার মতে লেখাটি তাও অসমাপ্ত, শুধু যেভাবে হঠাৎ করে শেষ হচ্ছে সেই জন্যই নয়, লেখাটির বিষয়ের কারণেই।পুরো উপন্যাসটি নিশানাথ নামে এক যুবকের চিন্তাস্রোত, পরিবার-মানুষজন-চারপাশটা-রাজনীতি, সব কিছু নিয়ে এক সর্বগ্রাসী মত ও অমত। আর কল্পিত এক বিচারসভায় তার উপশ্থিতি। আমার মনে হয়েছিল, নিশানাথ, তার পরিবেশ, সে যা দেখছে, সব কিছুই যে সে মনে করছে প্রায় নিরবয়ব, স্থানুতা পাচ্ছে না সেসব, ফর্মলেস, জোর করে যেন খাড়া করে রাখা হয়েছে সেসব, এই বোধের জন্যই, তার চিন্তাগুলো কখনই সমাপ্তি পাবে না, অতএব উপন্যাসটি অসমাপ্তই থাকবে !! বেশ কয়েকবার ভেবেছি উপন্যাসটির নামটি নিয়ে। উপন্যাসের মধ্যে গগন ঠাকুরের অবশ্য কোনো উল্লেখ নেই, নিশানাথ ছবিও দেখেনা। পরে বুঝেছি, নামের সাথে উপন্যাসের বিষয়ের অন্বয় স্থাপন করতে গেলে, উপন্যাসটির নামটি হতে পারত, 'গগন ঠাকুরের সিঁড়ির মত নিশানাথের চিন্তাভাবনা'। গগনেন্দ্রনাথের ছবিতে সিঁড়িগুলো যেমন, ক্রমাগত এক তল থেকে আর এক তল, আলোছায়ার খেলা, একটার পরে যেন আরো একটা থাকবে, উঁচু-নীচু, কক্ষ থেকে কক্ষান্তরের আভাস যেন বা, নিশানাথের চিন্তাগুলোও তেমনি, যেন তাদের তল খুঁজে পাওয়া যায় না।

(এখানেও থাকল, তা না হলে বোধি এসে আবার !! আরও কিছু যোগ করারও ইচ্ছে আছে)


Name:  সৈকত          

IP Address : 238912.66.9003412.210 (*)          Date:10 Oct 2018 -- 02:04 AM

এটা সেটা, বঙ্কিমবাবু প্রসঙ্গ -

সীতারাম উপন্যাসের তৃতীয় খন্ড শুরু হয় ভূষনার যুদ্ধে সীতারামের জয় এবং সেই যুদ্ধে তোরাব খাঁর মৃত্যুতে। প্রথম পরিচ্ছেদের প্রথম অনুচ্ছেদে দুই বাক্যে এইটুকু বলে নিয়ে বঙ্কিম ঘটনার বিবরণ দেওয়া থেকে বেরিয়ে এসে পাঠকের সাথে সরাসরি কথা বলেন। এই সরাসরি কথা বলাটা বঙ্কিমের মোটামুটি সব উপন্যাসেই আছে; উপন্যাসে ব্যবহৃত একটা ট্রোপ যেন। ঘটনা নিয়ে, চরিত্র নিয়ে,আলাদা করে কিছু বলার জন্য বা গল্পটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হলে, সেই বলার স্বরটা বদলে নেন। অবশ্য এক্ষেত্রে অন্যরকম বিষয় আসে। মন্তব্য যেটা করেন সেটা উপন্যাস নিয়ে বা উপন্যাসের বিষয়বস্তু কী সেটা নিয়ে। বঙ্গদর্শন পেরিয়ে 'প্রচার' পর্বের বঙ্কিম, অনুশীলন তত্ত্ব পর্বের বঙ্কিম বা বাঙালীর ইতিহাসহীনতা নিয়ে আক্ষেপ করা বঙ্কিম লেখেন, "সে সকল ঐতিহাসিক কথা, কাজেই সেসব আমাদের কাছে ছোট কথা"। অতএব সেসবের বিস্তারিত বর্ণনায় সময় নষ্ট করা যায় না, কারণ "উপন্যাসলেখক অন্তর্ব্বিষয়ের প্রকটনে যত্নবান হইবেন", ইতিহাসের সাথে সম্বন্ধ রাখা নিষ্প্রয়োজন ! ইতিহাস একটা ফ্রেম যেন, গল্পের কাঠামোটা তৈরী করছে, কিন্তু উপন্যাস আলাদা কিছু যেটা মূলতঃ ব্যক্তিমানুষের অন্তর্মনের প্রকাশের একটা মাধ্যম, ইতিহাস বড়জোর যেন পরিপ্রেক্ষিত তৈরী করবে।

(ইতিহাস আর উপন্যাসের এই সম্পর্ক বা দ্বন্দের জায়গাটা, শুধু এই উপন্যাসেই নেই, সম্পূর্ণ উল্টোভাবে কৃষ্ণচরিত্রতে আ্ছে। বঙ্কিমের উদ্দেশ্য সেখানে কৃষ্ণর ঐতিহাসিকতা নির্মাণ, পুরাণ আর ভাগবত ঘেঁটে আদর্শ চরিত্র হিসেবে খাড়া করা। ফলে যেখানেই সেই ঐতিহাসিকতার ক্ষতি হচ্ছে, যেখানেই পুরাণের গল্পে অলৌকিকতার প্রবেশ ঘটছে, যুক্তি দিয়ে বঙ্কিম কৃষ্ণচরিত্রের ব্যাখ্যা করতে পারছেন না, সেখানেই ঐসব অলৌকিক ঘটনা উপন্যাস মাত্র, কবিকল্পনা ইত্যাদি বলে যুক্তির ফাটলগুলো এড়িয়ে যাচ্ছেন। )

আগে মনে হয়নি, এবার মনে হল, তিন খণ্ডের উপন্যাসে শেষ খণ্ডে এসেই বা এই মন্তব্য কেন ? তাহলে তো ইতিহাসের কথাই বেশীই থাকল, মুসলিম শাসনে হিন্দু রাজা সীতারামের উত্থানের কথাই প্রাধান্য পেল, বঙ্কিমের শেষ পর্বের উপন্যাসের বা লেখার যা প্রকল্প বলে জেনে এসেছি। কিন্তু লক্ষ্য করে দেখি, না, পৃষ্ঠাসংখ্যার হিসেবে ঠিকই আছে; একেবারে যেন মাপমতো লিখেছেন !! প্রথম দু'খণ্ড যেখানে প্রায় চুয়াল্লিশ পাতার, শেষ খণ্ডটি সেখানে চল্লিশ পাতার ! উপন্যাসের আধখানা যদি হয় ইতিহাসের গল্প , বাকী আধ্খানা প্রেম থেকে চ্যুত হয়ে, দখলদারি মনোবৃত্তির কারণে সীতারামের পতনের কাহিনী এবং উপন্যাসের শেষে নিজের ভুল বুঝতে পেরে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা। কিন্তু এই উপন্যাসে অত্যন্ত যুক্তি দিয়েই সীতারামের নৈতিক পতনের ধাপগুলো তৈরী করছেন; সীতারামের থেকে তার সঙ্গী-সাথী-মন্ত্রনাদাতারা সরে যাচ্ছে, স্ত্রীয়ের সাথে দ্বন্দ তৈরী হচ্ছে, এবং চরম পতন ঘটে যখন লোকসমক্ষে জয়ন্তীকে উলঙ্গ করে বেত মারার ব্যবস্থা করে সীতারাম !! ভুল শেষ পর্যন্ত সীতারাম বুঝতে পারবে, শেষ বারের জন্য নবাবের সৈন্যের সাথে লড়াইয় করবে মাত্র পঞ্চাশজন অনুচর আর স্ত্রী-পুত্র নিয়ে, কিন্তু চল্লিশ পাতার মধ্যে সেই ঘটনা হয়তবা আট-দশ পাতার। ব্যক্তির পতন দেখনোই যেন বঙ্কিমের মুখ্য উদ্দেশ্য এই লেখায়, অথবা সেরকম কিছু না, আমারই অনুমান, কিন্তু সব মিলিয়ে পড়লেও এই খণ্ডটি যেন ব্যক্তির ঐতিহাসিকতা।

কিন্তু দ্বন্দ অত সহজে যাওয়ার নয়। ঐ অল্প সংখ্যক লোক নিয়ে নবাবসৈন্যর মধ্যে থেকে সীতারাম হয়ত আশ্চর্যজনকভাবে বেরিয়ে যায়, যদিও রাজ্য তার ধ্বংস হয়, তবুও বঙ্কিম আবার হোঁচট খান সেই ইতিহাস নিয়ে। শেষ পর্যন্ত সীতারামের কী ঘটে ? উপন্যাসের পরিশিষ্টে রামচাঁদ আর শ্যামচাঁদ - যারা ইতিহাসের দুই উলুখড়ই যেন, কিন্তু সীতারামের নৈতিক পতনের সময়ে, রাজ্য শাসন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সময়ে যারা চণ্ডীমণ্ডপে বসে সীতারামকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে মজা করতে ছাড়েনি অথবা জয়ন্তীকে বেত মারা উৎসাহভরেই দেখতে যায়, আমোদের জন্যই যেন বা অথবা সীতারামের সম্পূর্ন পতন দেখার জন্যই যেন বা- তারা রাজ্য ধ্বংসের আগে, যুদ্ধের আগে, প্রাণ বাঁচানোর জন্য বাড়ীঘর ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে এই আলোচনায় রত থাকে যে সীতারামকে আদৌ নবাবের সৈন্যরা শূলে চড়িয়েছে নাকি সীতারামকে দেবতারা এসে উঠিয়ে নিয়ে চলে গেছে। বিভিন্ন লোকের বিভিন্ন রকমের কথাকে নস্যাৎ করে এই সিদ্ধান্তে পৌছয় যে দুপক্ষের কথাই, হিন্দু আর মুসলমান দু'পক্ষের কথাই "রচা কথা, উপন্যাস মাত্র", সময়কালে হয়তবা যা দু'পক্ষেরই ইতিহাস হয়ে দাঁড়াত।

হ্যাঁ, সীতারামের স্বাধীন রাজা হওয়ার ঘটনা, নবাবী শাসনের মধ্যেই বারো ভুঁইঞার ওপর আধিপত্য স্থাপন করে মহারাজ উপাধি নেওয়া বা ইতিহাস যেভাবে এই উপন্যাসে ব্যবহার হয়েছে, সেগুলো পুরোটাই ঐতিহাসিকভাবে সত্য, অন্তত যদুনাথ সরকারে সেরকমই মত ছিল (আমি অবশ্য সেই লেখা পড়িনি, উল্লেখ দেখেছি মাত্র অন্য লেখায়), কিন্তু বঙ্কিমের কাছে হয়ত সেই তথ্য ছিল না অথবা ইতিহাসে সেই বিবরণ ছিল না, যা দিয়ে রাজ্য ধ্বংসের কারণ নির্দেশ করা যায়। কিন্তু এই উপন্যাস লেখার সময়েও হিন্দু ইতিহাসের প্রতি একটা আনুগত্য থাকলেও, সেই আনুগত্য এত বেশী নয় যে বঙ্কিমের ঔপন্যাসিক সত্ত্বা সেই জন্য টাল খেয়ে যায়। ঔপন্যাসিকের মনটাই সেখানে প্রাধান্য পাচ্ছে, ফলে ইতিহাসকে হয় এড়িয়ে গিয়ে চরিত্রের মধ্যে ঢুকতে হচ্ছে, প্রধাণ চরিত্রটিকে পতন-অভ্যুদয়-বন্ধুর পন্থার মধ্যে দিয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে অথবা ইতিহাসের ধোঁয়াশাগুলোকে নিজের মত করে নস্যাৎ করতে হচ্ছে। আর এসব করতে গিয়ে সব মিলিয়ে একটা দ্বন্দ থেকেই যাচ্ছে লেখায়, জীবনের শেষ উপন্যাস লেখার সময়েও, যা মোটামুটি বঙ্কিমের সারা জীবনের লেখালেখিরই একটা প্রধান দিক বলে মনে হয়।

(বঙ্কিম যখন লিখছেন, তখন তো আর ঐতিহাসিক উপন্যাসের ধারাটি তৈরী হয়নি বাংলায়, বঙ্কিমের তিন-চারটি উপন্যাস লেখার পরে যা তৈরী হল। বঙ্কিম তো একজন ঔপন্যাসিকই শুধু, প্রেমের উপন্যাস, সামাজিক উপন্যাস, ঐতিহাসিক উপন্যাস, মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস, এসব কিছুরই প্রথম বঙ্কিমেরই কলম থেকে, এরকম মত ইত্যাদি তো পরে তৈরী হয়েছে। সেসব ঠিক আছে, ক্যানোনাইজেসন পরেই ঘটে। কিন্তু অবাক লাগে কীভাবে সত্তর-আশি পাতার ঐতিহাসিক উপন্যাসের ধারা মোটামুটি কয়েক দশকের মধ্যে বা বড়জোর একশো বছরের মধ্যেই, কিছু না হোক, কম করে শ'তিনেক পাতায় পৌছে গেল, যেখানে ইতিহাসের গল্পই প্রধান, মূলতঃ পীরিয়ড পীস যেন বা।)




Name:  oraphe          

IP Address : 340123.99.121223.135 (*)          Date:10 Oct 2018 -- 05:38 PM

মান্তো ফিল্ম এর আলোচনা /আর্বানিটি/বাংলা সাহিত্য কনটেম্পোরারিটি উইথ অর্জুন অভিষেক/ট/দে/দমু/খ

"৭০ পরবর্তীতে বাংলা লেখায় আর্বানিটির ফলে দলিত সাহিত্যটা তৈরী হল না, বোধির এই বক্তব্যটা বুঝিনি। মোটামুটি ষাট আর সত্তরের দশকে, মহারাষ্ট্রে যখন দলিত রাজনীতি আর দলিত সাহিত্যের বেড়ে ওঠা, এখানে তখন বামপন্থী আন্দোলন হয়ে নকশাল আন্দোলন। ফলে লেখালেখি যা তার একটা অংশ এইসব নিয়ে। কিন্তু নকশাল আন্দোলন শেষ হয়ে যাওয়ারও পরে, সত্তরের মাঝামাঝি বা শেষ থেকে যার লিখতে শুরু করলেন তার অনেকেই কর্মসূত্রে গ্রামে গেলেন, সেখানকার মানুষকে লেখায় নিয়ে এলেন। এদের কাছে কিছুটা মডেল হিসেবে হয়ত মহাশ্বেতা দেবীর লেখাপত্রভ ছিল, বাকিটা তারা যা দেখছেন, সেখান থেকে লেখা উঠে আসছে। আমার কাছে তো বরং উল্টোটা, সত্তর আর আশির দশকের বাংলায় লেখালেখি মূলতঃ নন-আর্বান, আমি দেশ-আনন্দর কথা বলছি না। দেবেশ রায়ের তিস্তাপাড়ও তো সত্তরের শেষ থেকে আশির দশকের প্রথম অবধি বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকল কিন্তু সেটা দলিত সাহিত্য না হলেও, আর্বান সাহিত্য নয়।"




Name:  sors bhaaTa          

IP Address : 340123.99.121223.135 (*)          Date:10 Oct 2018 -- 05:39 PM

IP Address : 340112.99.675612.98 (*) Date:10 Oct 2018 -- 05:27 PM

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--12