বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1] [2] [3] [4] [5] [6]     এই পাতায় আছে149--179


           বিষয় : দুই দেশ, ছয় রাজ্য, দুই চাকা, পাঁচ হাজার একশো কিলোমিটার ও এক পাগল
          বিভাগ : অন্যান্য
          শুরু করেছেন : সিকি
          IP Address : 192.69.204.49 (*)          Date:10 Nov 2017 -- 12:38 AM




Name:   সিকি           

IP Address : 132.177.206.126 (*)          Date:11 Apr 2018 -- 12:04 AM

৩রা নভেম্বর, পঞ্চদশ দিন
================

পাসপোর্টে লেখা আছে, প্লেস অফ বার্থ, জলপাইগুড়ি। তবে কথাটা আজকের দিনে আর তেমন সত্যি নয়, কারণ আমার জন্ম হয়েছিল পাহাড়ে, আলিপুর দুয়ারে। তখন সেটা ছিল জলপাইগুড়ি জেলার একটা মহকুমা, আজ সেটা আলাদা একটা জেলা। যে মহকুমা হাসপাতালে আমার জন্ম হয়েছিল, সেটা আজ জেলা হাসপাতাল। যদিও আমার তেমন কোনও স্মৃতি নেই আলিপুর দুয়ারের, কারণ আমার যখন এক বছর বয়েস, তখনই বাবা ওখান থেকে ট্রান্সফার হয়ে চলে আসে।

আমার ছোটবেলা কেটেছে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায়, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, মেদিনীপুর। তার কিছু কিছু জায়গা আজ ছুঁয়ে যাবার আছে। কলেজে পড়াকালীন এ পথে আমার কতবারের যাতায়াত হয়েছে, সমস্তই ট্রেনে যদিও, একবার উল্টোডাঙ্গা থেকে রকেট বাসে চেপেও এসেছিলাম, কিন্তু নিজে মোটরসাইকেল চালিয়ে উত্তরবঙ্গের একদা পরিচিত জায়গা থেকে দক্ষিণবঙ্গে আমার বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার থ্রিলটা সম্পূর্ণ আলাদা। দৈর্ঘ্যে পশ্চিমবঙ্গ বেশ লম্বা, কলেজ থেকে আমার বাড়ি পাঁচশো তেষট্টি কিলোমিটারের দূরত্ব। তাই, সকাল সকাল জার্নি শুরু করতে হবে – নইলে বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে রাত্তির হয়ে যেতে পারে। আগামীকাল হুগলি চুঁচুড়া মিউনিসিপ্যালিটির কনফারেন্স হলএ আমার লাদাখ আর স্পিতি বেড়ানোর গল্পের বই সর্ষেদানায়, ইচ্ছেডানায় প্রকাশিত হবার দিন। হুগলিতে আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু চিররঞ্জন সমস্ত ব্যবস্থা করে রেখেছে, আমাকে শুধু সেখানে উপস্থিত থেকে ধন্য করতে হবে। কলকাতা থেকে গুরুচন্ডা৯ টিমের একগুচ্ছ বন্ধুবান্ধব আসছে, সরাসরি প্রেস থেকে আমার বই নিয়ে, নিজের বই এডিট করেছি হাজারবার, কিন্তু ছেপে বের হওয়া সে বই চোখে দেখব আগামীকালই, প্রথমবারের জন্য। এ উত্তেজনার সঙ্গে হয় তো কিছুটা তুলনা করা যায় নিজের সন্তানজন্মের ক্ষণের।

ভোর পাঁচটাতেই ঘুম ভেঙে গেছিল, সাড়ে পাঁচটায় তৈরি হয়ে গেলাম। বাইরের মেন গেটের চাবি আমার কাছেই রাখা রয়েছে। নিচে মোটরসাইকেলে লাগেজ বেঁধেছেঁদে স্টার্ট দিয়ে বের করলাম। বাইরে থেকে আবার তালা লাগিয়ে চাবিটা, আগের দিনের কথামত ভেতরের ধাপিতে রেখে দিলাম।

ক্যাম্পাস ঘুমোচ্ছে, লোকজন বিশেষ নেই। এক নিমেষে কলেজ ক্যাম্পাস পেছনে ফেলে বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। রাস্তার এই অংশটার নাম কলেজ মোড়, বহু বহু রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তের সাক্ষী, আমাদের সময়ের। বাঁদিকে চলে যাচ্ছে ময়নাগুড়ি যাবার পথ – যে পথ দিয়ে কাল আমি এসেছি, ডানদিকে শিলিগুড়ির রুট। আমাকে যেতে হবে এদিকে। শিলিগুড়ি শহরে ঢুকব না, বাইরে দিয়ে একটা বাইপাস হয়ে নেমে যেতে হবে নিচের দিকে।

কলেজ থেকে একটু এগোতেই একটা Yএর মত রাস্তার কাট আছে, যেটার নাম আসাম মোড়। না, আলাদা করে আসামে যাবার কোনও রুট এদিক থেকে শুরু হয় নি, রাস্তা একটাই, কেবল Yএর ডানদিকের রাস্তাটা ঢুকে যাচ্ছে জলপাইগুড়ি শহরের ভেতর, মাষকলাইবাড়ি, শান্তিপাড়া হয়ে কদমতলার দিকে, আর বাঁদিকের রাস্তাটা ময়নাগুড়ি বাইপাসের, জলপাইগুড়ি শহরের বাইরে দিয়ে, আমাদের কলেজের সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে – হ্যাঁ, এ রাস্তা দিয়ে আসাম যাওয়া যায় বৈকি। ভুটানও যাওয়া যায়।

এই আসাম মোড়ে একটা পেট্রল পাম্প ছিল। জলুরই কোনও এক এক্স স্টুডেন্টের মালিকানায় চলত। ভাবলাম, সেখানেই মোটরসাইকেল আর জেরিক্যানের জন্য পেট্রল ভরে নেব, কিন্তু আসাম মোড়ে পৌঁছে দেখলাম পেট্রল পাম্পটি খোলে নি তখনও – বন্ধ। অতএব, আবার এগিয়ে গেলাম। একটু এগোতে মোহিতনগর সাবস্টেশন, জলু কলেজের ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই লাইন গেছে এখান থেকে, একবার কলেজের প্রফেসরের সাথে এখানে এসেছিলাম ট্রান্সফর্মার আর কী কী সব যেন দেখতে, ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনীয়ারিং পড়তাম তো। তো, সেই মোহিতনগর সাবস্টেশন এখনও একইরকম ভাবে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে, মৈসে পড়া একদা-হলুদ-রঙের দেয়াল নিয়ে।

মোহিতনগরের পর লোকালয় কমে এল, এর পরে শুধুই সরু রাস্তা শিলিগুড়ি যাবার জন্য। রাস্তাটা এখনও একই রকমের সরু আছে। দুদিকে ধানক্ষেত। মাঝে মাঝে একটা দুটো গ্রাম পড়ে, ফাটাপুকুর, রাধাবাড়ি, ফুলবাড়ি।

একটা জিনিস মাথায় ঘুরছিল। এইটাই তো সেই সময় – তা হলে কাল দেখতে পাই নি কেন? আজ কি দেখা যাবে?

কলেজে যখন পড়তাম, নভেম্বরের গোড়া থেকে ডিসেম্বরের দশ বারো তারিখ পর্যন্ত, উত্তরবঙ্গে শীত পড়ার আগে পর্যন্ত, চারপাশের আবহাওয়া যখন একদম পরিষ্কার হয়ে যেত, এক অপূর্ব দৃশ্য দেখা যেত আমাদের ক্যাম্পাস থেকে, বা বলা যায়, দোতলা ব্যাক উইংয়ে আমার ঘর থেকে।

কাঞ্চনজঙ্ঘা। সম্পূর্ণ কাঞ্চনজঙ্ঘা রেঞ্জ সেই সময়ে প্রতিদিন দেখা যেত, কত যে দেখেছি ভোর থেকে উঠে হস্টেলের ছাদে বা টেরেসে বসে, সূর্যোদয়ের মুহূর্তে, টকটকে লাল থেকে কাঁচা সোনার রঙ, তার পরে পাকা সোনা, তার পরে রূপোলী ঝিলিক মেরে ধীরে ধীরে সাদা হয়ে যাওয়া কাঞ্চনের চূড়া। আবার বিকেল বেলায় রঙগুলো ফিরে আসত উলটো অর্ডারে। দিনের পর দিন দেখেছি।

আজ তেসরা নভেম্বর। এই তো সময় কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাবার, ডানদিকে চোখ রাখলেই দেখতে পাবার কথা, … হ্যাঁ, ওই তো দেখা যাচ্ছে, খুব প্রমিনেট নয় যদিও, আবছামতন, কিন্তু উত্তরবঙ্গ আমাকে নিরাশ করল না, ধানক্ষেত আর গাছপালার পেছনে ধবধবে সাদা রঙের ওই তো দেখা যাচ্ছে কাঞ্চনকে। এর থেকে বেশি স্পষ্ট হবার সময় আসে নি এখনও, নভেম্বরের শেষদিকে আরও ভালো ভিউ আসে, কিন্তু আজ এই সময়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার সকালের রূপ দেখে আমার মনে হল, আমার উত্তরবঙ্গ ফিরে আসা এতক্ষণে সার্থক হল। আর কোনও অতৃপ্তি নেই।


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/04/dsc_0351.jpg

ফুলবাড়ি এখন শিলিগুড়ির আউটস্কার্টে বেশ বড়সড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব। গ্রাম পঞ্চায়েতই আছে, কিন্তু গ্রাম্য ভাবটা আর নেই, এটা শিলিগুড়ি শহরের একদম শুরু, এখান থেকে তৈরি হয়েছে বিশাল চওড়া এক্সপ্রেসওয়ে – ফুলবাড়ি-ঘোষপুকুর বাইপাস, যেটা শিলিগুড়ি শহরের বাইরে দিয়ে একদম নিয়ে গিয়ে ফেলে আমাদের চিরপরিচিত এন এইচ সাতাশে, যেটা আমাকে নিয়ে যাবে দক্ষিণবঙ্গের দিকে।

ফুলবাড়ি থেকে বাইপাস ধরে উড়িয়ে দিলাম গাড়ি – দু পাশে পর পর চা বাগান, একটা শেষ হলে আরেকটা, সেটার পরে আরেকটা। ট্র্যাফিক নেই খুব বেশি, অসাধারণ রাস্তা। … একটা জিনিস বুঝলাম, আগে জানতাম চা বাগান শুধু দার্জিলিং আর জলপাইগুড়ি জেলাতেই আছে (এখন আলিপুর দুয়ারকেও ধরতে হবে) – কিন্তু আসতে গিয়ে দেখলাম উত্তর দিনাজপুর পর্যন্ত চা বাগান রয়েছে।

অনেকটা চলার পরে একসময়ে বাইপাস শেষ হল, পূর্ণিয়া কিষেণগঞ্জ লেখা বোর্ড সামনে এল। এই রাস্তাও পুরোটা চলার নয়, ইসলামপুর পেরোবার পরে ধানতলা বলে একটা জায়গা পড়বে, সেইখান থেকে ডানদিকের রাস্তা নিয়ে পরের হাইওয়ে ধরতে হবে। এমনিতে এই সোজা রাস্তা সোজা বিহার হয়ে গোরখপুরের দিকে যাচ্ছে, যে রাস্তা দিয়ে আমি তেরো দিন আগে এসেছিলাম।

ইসলামপুর পেরিয়ে জিপিএসের দিকে চোখ রাখছি, চওড়া হাইওয়ে, বাঁ পাশে ইতস্তত দুটো একটা গ্রাম, সামান্য কয়েকটা বাড়ি, গোটাদুই দোকান, তার পরে আবার ফাঁকা – ঠিক যে জায়গাটায় বাঁদিকে বেঁকতে বলল, সেখানে আমি কোনও কাটই দেখতে পেলাম না, এমনিই ইতস্তত বাড়িঘর, তার মাঝখান দিয়ে এদিক ওদিক গলি – ভাঙাচোরা খোয়া ওঠা সরু রাস্তা মত – সেগুলো কোনওমতেই কলকাতা যাবার রাস্তা হতে পারে না। জিপিএস নিশ্চয়ই ভুল কিছু দেখাচ্ছে, সোজা খানিক এগিয়ে যাই, আগে নিশ্চয়ই আবার রাস্তা আছে কোনও, জিপিএস হয় তো আগে আগেই কাট দেখাচ্ছে, কাট হয় তো পরে কোথাও আছে।

এগোতে থাকলাম, জিপিএসে দেখলাম আমি কাট পেরিয়ে চলে যাচ্ছি, এক কিলোমিটার, দুই কিলোমিটার – তার পরে দেখি জিপিএস রিক্যালকুলেট করে আমাকে বলছে চার কিলোমিটার আগে থেকে ইউ টার্ন নিয়ে আবার আগের পয়েন্টে এসে সেখান থেকেই টার্ন নিতে বলছে।

এ তো মহা মুশকিল হল। আমি তো কাট বুঝতেই পারছি না – তা হলে কি ফিরে গিয়ে ওখানে কোনও লোককে জিজ্ঞেস করে দেখব? … তাই করা যাক।

চার কিলোমিটার আরও এগিয়ে যেতে হল ইউ টার্ন নেবার জন্য – আমার ডানদিকে তখন গাইসাল স্টেশন, ঘুরে গিয়ে আবার ছ কিলোমিটার ফেরত এলাম, আবার ডিভাইডারের মাঝে পরের কাট খুঁজে সেই জায়গায় ফেরত এলাম, যেখানে জিপিএস আমাকে বলছে বাঁদিকে যেতে।

একটা ভাঙাচোরা পাথর বের করা সরু রাস্তা, সামনে একটা গার্ড রেলিং দাঁড় করানো, পাশে একটা লোক বসে আছে। মোটরসাইকেল থামিয়ে লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম – আচ্ছা, মালদা যাবার জন্য কি এইটাই রাস্তা?

লোকটা সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল, হ্যাঁ, এই রাস্তা ধরে সোজা –

আমি হতবাক। এই রাস্তায় কী করে যাবো? আবার জিজ্ঞেস করলাম – রাস্তা কি আগে এই রকম ভাঙাচোরা? লোকটা আমাকে আশ্বস্ত করে বলল, না না, এই দুশো মিটার মতন ভাঙা আছে, আগে একদম ফাইন রাস্তা পাবেন, ওই বাঁকের পর থেকেই ভালো রাস্তা শুরু। এই গার্ড রেলিংয়ের পাশ দিয়ে চলে যান সোজা।

সাহসে ভর করে হ্যান্ডেল ঘোরালাম বাঁদিকে। লোকটা ঠিকই বলেছিল – ঠিক দুশো মিটার বাদেই সুন্দর রাস্তা শুরু হয়ে গেল। একদম স্মুথ। খানিকটা এগোতেই মকদমপুর বলে একটা জায়গাতে গিয়ে সেই রাস্তা আবার ন্যাশনাল হাইওয়েতে পড়ল – এটাই বোধ হয় এন এইচ থার্টি ফোর, উত্তরবঙ্গের সাথে দক্ষিণবঙ্গের কানেক্টর রাস্তা। হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি, বড় বড় সাইনবোর্ডে লেখা মালদা, বহরমপুর, ফারাক্কার নাম। জয় গুরু, চালাও পানসি।

রাস্তা এখান থেকে বেশ চওড়া, ন্যাশনাল হাইওয়ে যেমন হওয়া উচিত আর কি। সকাল থেকে খাওয়া দাওয়া হয় নি কিছু, কাল রাতে জলপাইগুড়িএ রেস্তরাঁয় গলা পর্যন্ত ঠেসে খেয়েছি, তাই দিয়েই চলছে এখনও। মনে মনে ঠিক করলাম, ফারাক্কা পেরিয়ে একেবারে লাঞ্চ করব, দেখি না, ওদিকে কোনও লাইন হোটেলে যদি ভালো মাছভাত পেয়ে যাই। ঠিকঠাক এই স্পিডে চললে বেলা সাড়ে বারোটার মধ্যে মালদা টাউন, আর দেড়টার মধ্যে তো ফারাক্কা পৌঁছে যাবই।

রাস্তা মোটের ওপর ভালো, কখনও কখনও বড়সড় গর্ত, কোথাও কোথাও রাস্তা সারাইয়ের কাজ চলছে, কোথাও বা রাস্তা আবার সরু হয়ে গেছে লোকালয়ের মধ্যে – তাই সেইমত স্পিড বাড়িয়ে কমিয়ে চলতে থাকলাম। রায়গঞ্জ এসে গেল এক সময়ে। মালদা আর ষাট কিলোমিটার মত দেখাচ্ছে।

এর পরে এল গাজোল। আমার খুব পরিচিত একজন এই গাজোলে ল্যান্ড রেভিন্যু অফিসার হিসেবে কাজ করতেন এক সময়ে। অনেক গল্প শুনেছি গাজোলের, তাঁর কাছ থেকে, সেই গাজোলে এখন আমি দাঁড়িয়ে – এখান থেকে মালদা টাউনের দূরত্ব আরও কম – আর মাত্র পঁচিশ কিলোমিটার।

চাপটা শুরু হল সেখান থেকে। মালদা শহরের ওপর দিয়ে গেছে এই ন্যাশনাল হাইওয়ে, রথতলা হয়ে – আর মোটামুটি গোটা শহরটা এই হাইওয়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। রাস্তাও এখানে সরু, এলোপাথাড়ি ট্র্যাফিক, জাস্ট এগোবার কোনও রাস্তা নেই, এ ওর গায়ে সে তার ওপর দিয়ে – সে মানে বিদিকিচ্ছিরি ব্যাপার। তার ওপরে দেখলাম মালদায় একটা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল হয়েছে, একেবারে হাইওয়ের পাশে, সেখানে জ্যাম আরও ভয়াবহ, দুর্বিষহ।

স্রেফ মালদার কয়েক কিলোমিটার পার করতে আমার চল্লিশ মিনিট খরচা হয়ে গেল। দেড়টা বাজে। ফারাক্কা এখান থেকে এখনও পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার দূর। এ জ্যাম কতক্ষণে কাটবে, কে জানে!

কাটল, রথতলার সেই ভয়াবহ মোড় থেকে আরেকটু এগিয়ে গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে এসে ট্রাফিক একটু হালকা হল। মোটরসাইকেলে আবার স্পিড তুললাম।

খিদের চোটে মাথা ঘুরছে প্রায়, ফারাক্কা ব্যারেজ আসব আসব করছে, ঠিক সেই সময়েই বাঁদিকে দেখলাম বেশ খোলা চত্বরের পাশে একটা ধাবা, ঠিক যেখানে বসে খেতে খেতে মোটরসাইকেলের দিকে নজর রাখা যায়।

গোগ্রাসে খেলাম মাছ আর ভাত। শেষে মাংস আছে জানতে পেরে একবাটি খাসির মাংসও চেয়ে নিলাম, আর তিনবার করে ঝুরো ঝুরো আলুভাজা চাইতে হল। গলা পর্যন্ত ঠেসে খেয়ে আবার বেরিয়ে যখন গাড়িতে স্টার্ট দিলাম, তখন আড়াইটে বাজে। আর ঠিক এক কিলোমিটার দূরেই শুরু হচ্ছে ফারাক্কা ব্যারেজ। যখন জলুতে পড়তাম, আসা যাওয়ার পথে এই পর্যন্ত জেগে থাকতেই হত, চারদিকে উজ্জ্বল আলোয় ঝকমক করা ফারাক্কা ব্যারেজ আর তার পাশে এনটিপিসির এলাকা দেখার জন্য।

সেই ব্যারেজ আজ দিনের আলোয় পার করছি, নিজের মোটরসাইকেলে চেপে। কী নিদারুণ সে অভিজ্ঞতা! রাস্তা বলে কিছু নেই, এবড়োখেবড়ো খোয়া ওঠা একটা পথ, এত আস্তে যেতে হচ্ছে তাতেও ঝাঁকুনি কমছে না, এদিকে এত খেয়েছি যে সামান্য ঝাঁকুনিও অসামান্য হয়ে দেখা দিচ্ছে – রাস্তা এত সরু যে সোয়া দু কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই ব্রিজের ওপর আমি একবারের জন্যও একটা গাড়িকে ওভারটেক করতে পারলাম না, পনেরো কুড়ির স্পিডে পুরোটা চলে তবে ভালো রাস্তা পেলাম আবার।

আমার ছোটবেলার এলাকা, আবার। উনিশশো তিরাশি থেকে পঁচাশি আমি থাকতাম রঘুনাথগঞ্জে। বাবার অফিসের জীপগাড়িতে চেপে আমি বোধ হয় কতবার এসেছি ফারাক্কা ধূলিয়ান আহিরণ বহরমপুর খাগড়া নিমতিতা। পুরো স্মৃতি নেই, কারণ তখন আমার বয়েস ছিল নিতান্তই পাঁচ সাত বছর, কিন্তু ছেঁড়া ছেঁড়া স্মৃতি রয়ে গেছে, যাদের সঙ্গে আজকের মুর্শিদাবাদকে মিলিয়ে দেখার আর কোনও উপায় নেই।

আমার ছোটবেলা পশ্চিমবঙ্গের যে সমস্ত জেলায় ছড়িয়ে আছে, তার মধ্যে সেরা জায়গা ছিল এই মুর্শিদাবাদ। পেটি পেটি আম আসত ঘরে, লিচু আসত, কাঁঠাল আসত, আর একটা কিছু আমাদের পয়সা দিয়ে কিনে খেতে হত না – সব এর ওর তার বাগানের ফল। খেয়ে খেয়ে গরমকাল ফুরিয়ে যেত, ফলের স্টক শেষ হত না। … আর, ইলিশ। বাবা অফিসের কাজে যেত ধূলিয়ান, একদিন রাত এগারোটার সময়ে ফিরল, হাতে ঝোলানো এক মা ইলিশ আর খোকা ইলিশ, পদ্মা থেকে ধরে আনা। তখন ফ্রিজ ছিল না, গ্যাস ওভেন ছিল না, মা আবার কয়লা বসিয়ে ঘুঁটে ধরিয়ে উনুন সাজাল – অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকতে থাকতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, সকালে উঠে ইলিশ মাছ ভাজা খেয়েছিলাম, আর যখন তখন ইলিশ মাছের পার্বণ তো তখন নিত্যিকার ব্যাপার ছিল – এতটাই ইলিশ পাওয়া যেত।

অনেক, অনেক মণিমুক্তো ছড়ানো আছে আমার মুর্শিদাবাদে, রঘুনাথগঞ্জ স্কুলের হেডস্যার, আমাকে নিজের ছেলের মত ভালোবাসতেন – বাবার আবার যেদিন বদলি হয়ে যাবার দিন এল, আমরা বাক্স তোরঙ্গ গোছাচ্ছি, হেডস্যার সাইকেল চেপে এলেন আমাদের কোয়ার্টারে, দোর্দণ্ডপ্রতাপ হেডস্যারের দু চোখে জল দেখে বাচ্চা-আমি যারপরনাই অবাক হয়েছিলাম, আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন দুটো বই – যত কাণ্ড কাঠমাণ্ডুতে আর ফটিকচাঁদ – আর একটা দামী আর্টেক্স পেন, স্যার আর্টেক্স পেনের দিওয়ানা ছিলেন, ওই পেন কিনিয়ে দিনের পর দিন আমার পেছনে লেগে থেকে আমার হাতের লেখা সুন্দর করে ছেড়েছিলেন। স্যারের দুই মেয়ে ছিল, আমাকে নিজের ছেলের মত ভালোবাসতেন। … এত ভালোবাসা পেয়েছি, এত ভালোবাসা – আমার তবলা শেখার শুরু সেখানে, অনিলদা, আমার তবলার প্রথম গুরু, সর্বক্ষণ হাসি ফাজলামি ইয়ার্কি আর মুক্তোর মত হাতের লেখায় তবলার বোল লিখে দিত আমার খাতায়, আমি তো বাচ্চা ছিলাম, সে খাতার যত্ন রাখতে পারি নি, তিন বছরে ছিঁড়ে গেছিল, আমরা চলে আসার দিন সেই অনিলদা কেঁদেছিল, নতুন একটা বাঁধানো খাতায় – তখন পত্রালি, বঙ্গলিপি, নবলিপি – এইসব নামের খাতা পাওয়া যেত, সেই রকম কোনও একটা খাতায় আমার তিন বছরে শেখা সমস্ত তবলার বোল আবার প্রথম থেকে যত্ন করে লিখে দিয়েছিল তার সবুজ রঙের কালির পেনে। … বড় হয়ে কতবার ভেবেছি একটিবার মুর্শিদাবাদে যাবো, সেই হেডস্যার আর অনিলদার সাথে আরেকবার দেখা করব – আজও যাওয়া হয় নি।

হুড়মুড়িয়ে মাথা বেয়ে নেমে আসছে পুরনো স্মৃতিরা, আর আমি ফারাক্কা ব্রিজ পেরিয়ে চলেছি আরও দক্ষিণে, ধূলিয়ান, নিমতিতা, সুতি, ঔরঙ্গাবাদ, আহিরণ – ইতিহাসের জায়গা সব, নামগুলো দেখছি বোর্ডে – আর কত কত কথা মনে পড়ে যাচ্ছে ছোটবেলার। কেমন ছিল তখনকার রাস্তাঘাট – মনে পড়ে না, বাবার অফিসের জীপগাড়ির চারপাশ খোলা ছিল, খুব ধূলো মাখতাম গাড়িতে বসে বসেই, এটুকু মনে আছে।

রঘুনাথগঞ্জের খুব কাছেই উমরপুর। আমরা প্রথম যখন মুর্শিদাবাদে আসি – বাবার ট্রান্সফার হয়েছিল বর্ধমান থেকে, তখনও রঘুনাথগঞ্জে আমাদের ডেজিগনেটেড কোয়ার্টার খালি হয় নি, একমাস মত আমাদের থাকতে হয়েছিল এই উমরপুরে পিডাব্লুডির বিশাল বড় বাংলোতে। বড়রাস্তার ওপরেই ছিল সেই বাংলোটা। উমরপুর পেরিয়ে এলাম এইমাত্র, কিন্তু বাংলোটা ঠিক কোথায় ছিল, আর মনে করতে পারলাম না।

মোরগ্রাম থেকে জিপিএস আমাকে বলল ডানদিকের রাস্তা নিতে। যদিও সামনে বড় বড় সাইনবোর্ডে লেখা আছে সোজা রাস্তা বহরমপুর কৃষ্ণনগর হয়ে কলকাতা যাচ্ছে – এন এইচ থার্টি ফোর, কিন্তু জিপিএস দাবি করছে ডানদিকের রাস্তা নিতে হবে।

নিলাম। একটুখানি ডানদিকে বেঁকেই আবার বাঁদিকে টার্ন। স্টেট হাইওয়ে সেভেন। দাঁড়ালাম। কী করা উচিত? স্টেট হাইওয়েই নেব, নাকি ফিরে যাব চেনাপরিচিত এন এইচ থার্টি ফোরে?

ফোন বাজছে, বাবা ফোন করেছে, বললাম, উমরপুর পেরিয়ে এসেছি একটু আগে, সন্ধ্যে তো হবেই বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে, আমি ছটা নাগাদ ফোন করে আমার পজিশন জানিয়ে দেব।

জিপিএসে রাস্তা স্ক্রোল করে দেখলাম, অনে-কদূর গিয়ে এই রাস্তা গিয়ে পড়েছে বর্ধমানে। আর, বর্ধমান মানেই দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে, সেখানে একবার গিয়ে পড়লে আর বাড়ি পৌঁছতে কতক্ষণ! এই স্টেট হাইওয়েতে আমাকে মাত্র একশো পঁচিশ কিলোমিটার যেতে হবে।

মোটরসাইকেল ঘুরিয়ে নিলাম এস এইচ সেভেনের দিকে।

রাস্তাটি বড় মনোরম, টিপিকাল গাছে ঘেরা পুকুরপাড়, আধপাকা বাড়িঘর, গ্রামবাংলার রূপ ছড়ানো চারদিকে, তার মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে যাচ্ছে পরিচ্ছন্ন পরিপাটি রাস্তা, পিডাব্লুডি মেনটেন করে। দুদিকে গ্রামের বাড়িঘর পেরিয়ে যতদূর চোখ যায়, শুধু ধানক্ষেত আর ধানক্ষেত। গাড়িঘোড়া খুব কম, চালাতে কোনও অসুবিধেই হচ্ছে না, কেবল মাঝেমধ্যে ট্রাক সামনে চলে এলে তাকে ওভারটেক করাটা প্রায় দুঃসাধ্য কাজ হয়ে যাচ্ছে, কারণ রাস্তা বেশ সরু।

বেলুয়া, রাজমহল, বুড়াডাঙ্গা এইসব নামে গ্রাম পেরিয়ে হঠাৎ একটা বাজার মত এলাকা এল, আর রাস্তা ভয়ঙ্কর খারাপ হয়ে গেল। ইঁট বের করা, এবড়োখেবড়ো – লাগেজভর্তি মোটরসাইকেল নিয়ে তার ওপর দিয়ে চলা – সে এক বিড়ম্বনাবিশেষ। অবশ্য এক কিলোমিটার বাদে, বাজার শেষ হতেই রাস্তা আবার ভালো হয়ে গেল, আবার স্পিড তোলা গেল।

কিন্তু সুখ বেশিক্ষণ সইল না, ক্রমশ এল খড়গ্রাম বলে একটা জায়গা, আর সেইখানে সেই যে খারাপ রাস্তা শুরু হল – সে আর শেষ হতেই চায় না। লোকালয় শেষ হয়ে গেল, তবু রাস্তা আর ঠিক হয় না, মনে হল বছর কুড়ি আগে একবার রাস্তা বানানো হয়েছিল – তার পরে আর কোনওদিন তাকে রিসারফেস করা হয় নি, এদিকে বিকেল সাড়ে চারটে বাজে, নভেম্বরের বিকেল – আরেকটু পরেই তো অন্ধকার নেমে যাবে, আমি মনে হচ্ছে এখনও মুর্শিদাবাদ জেলা ছেড়ে বেরোইই নি, – মরিয়া হয়ে স্পিড তোলার চেষ্টা করলাম, … না, সম্ভব না, মোটরসাইকেল সোজা রাখাটাই চ্যালেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে, অতএব, আবার আস্তে আস্তে, পনেরো-কুড়ির স্পিডে।

শেষরক্ষা হতে গিয়েও হল না, কোনও এক বাজারের মধ্যে, সরু রাস্তার প্রায় পুরোটাই জুড়ে দাঁড়িয়ে ছিল এক বড়সড় ডাম্পার। তার পাশ দিয়ে – মনে হল জায়গা আছে, বেরিয়ে যেতে পারব, সেইমত হ্যান্ডেল বাঁকিয়ে বেরোতে যেতেই ‘টং’ করে এক জোরালো শব্দ, পেছন ফিরে দেখি – লাগেজ ক্যারিয়ার সমেত মোটরসাইকেলের প্রস্থ আন্দাজ করতে ভুল করেছিলাম, ক্যারিয়ারের বাঁপাশটা ধাক্কা খেয়েছে ডাম্পারের সামনে।

পড়তে গিয়েও পড়লাম না, স্পিড বেশি ছিল না বলে, সামলে নিলাম। এবার ক্লান্ত আর হতাশ লাগছে – এই খারাপ রাস্তার কি শেষ নেই? তাও তো দিনের আলো রয়েছে এখনও, এর পরে অন্ধকার নামলে এই রাস্তায় চলব কী করে?

ভাবতে ভাবতেই দেখি আবার ঝকঝকে পরিষ্কার রাস্তা ফিরে এল, একটা বাজার পেরোতেই – প্রায় দশ পনেরো কিলোমিটার রীতিমত এবড়োখেবড়ো খোয়া বের করা রাস্তার ওপর দিয়ে চালিয়েছি আমি। এদিক ওদিক দুএকটা সাইনবোর্ড দেখেও জায়গাটার নাম বুঝে উঠতে পারলাম না, কোনও একটা গ্রাম হবে। একটু পরেই এক সরু নদীর ওপর একটা ছোট্ট ব্রিজে উঠলাম – জিপিএসে দেখলাম, নদীটার নাম ময়ূরাক্ষী। এত সরু?

এর পর আর খারাপ রাস্তা নেই – খানিক পরে মঙ্গলকোট পেরোলাম, বর্ধমান এখান থেকে আর বত্রিশ কিলোমিটার, প্রায় মেরে এনেছি, আর সেখানেই সন্ধ্যে হল। এত সুমধুর সন্ধ্যে আমি আর কখনও দেখি নি, সরু রাস্তা, দুদিকে আদিগন্ত ধানক্ষেত আর ইতিউনি কিছু তাল নারকোল টাইপের গাছ দেখা যাচ্ছে – সেই ধানক্ষেতের পেছনে কমলা থেকে লালচে হয়ে, সারা আকাশকে লাল রঙে রাঙিয়ে সূর্য ম্লানমুখে ডুব দিল। একটা নির্মেঘ আকাশে স্পষ্ট সূর্যাস্ত দেখলাম, খানিকক্ষণের জন্য চলা থামিয়ে।

সূর্য ডুবতেই তাপমাত্রা কমে এল বেশ খানিকটা, তবে আমার রেনগীয়ার পরা আছে, খুব অসুবিধে কিছু হল না, ওটাই উইন্ডচীটারের কাজ করে।

মঙ্গলকোট পেরিয়ে এল ভাতার, আর তার পরেই একটা তিন মাথার মোড় এল, বাঁদিকে চলে যাচ্ছে কাটোয়ার রাস্তা, সোজা বর্ধমান। রাস্তা এখনও পর্যন্ত বেশ ভালো – বর্ধমান পর্যন্ত যদি ঠিকঠাক রাস্তা পেয়ে যাই তো আর চিন্তা নেই, তার পরেই দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে।

ক্রমশ লোকবসতি বাড়ছে, সরু রাস্তায় গাড়ির সংখ্যাও বাড়ছে, অটো, মিনিবাস দেখা যাচ্ছে বর্ধমানগামী। বর্ধমান আসছে, আসছে, হঠাৎ কোথা হইতে কী হইয়া গেল, একটা মোড় ঘুরতেই দেখি তুমুল গাড়িঘোড়া, আমি একটা ফ্লাইওভারের ওপর উঠে গেলাম, আর নিচে একটা রেলস্টেশন, ফ্লাইওভারের পাঁচিলের ফাঁক দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে স্টেশনের সাইনবোর্ড – বর্দ্ধমান জং। আমি একেবারে বর্ধমান স্টেশনের মাথায়। ফ্লাইওভার আমাকে নামাল তিনকোনিয়া বাসস্ট্যান্ডের পাশটিতে, চারপাশে অগুন্তি মিষ্টির দোকান, বারকোশে করে সীতাভোগ আর মিহিদানা বিক্রি হচ্ছে চতুর্দিকে। … কিনব একটু? না, একেবারে না, তিনকোনিয়া বাসস্ট্যান্ডের আশেপাশে যে সব মিষ্টির দোকান থাকে, তাদের থেকে নাকি আসল সীতাভোগ মিহিদানা পাওয়া যায় না, আসল সে জিনিস নাকি পাওয়া যায় বর্ধমান শহরের বিশেষ একটা দুটো দোকান থেকে। আর এই ভিড়ের মধ্যে লাগেজবাঁধা মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে দোকানে ঢোকাও রিস্কি। তিনকোনিয়া পেরিয়ে তাই এগোতে থাকলাম – মাঝে উঁচু ডিভাইডার আর রেলিং দেওয়া রাস্তা, এগোতে এগোতে হঠাৎ দেখি আমার ডানদিকে কার্জন গেট! আরে, তাই তো!

এই বর্ধমানও আমার ছোটবেলার জায়গা। মুর্শিদাবাদের আগে থাকতাম বর্ধমানে। উত্তমকুমার যে বছর মারা যান, সেই বছরে আমরা আসি এখানে, কোয়ার্টার পাওয়া যায় নি – নতুন পল্লীতে এক বাড়িতে আমরা ভাড়া থাকতাম। কার্জন গেট পেরিয়ে একটু এগোলেই বাঁ হাতে একটা সিনেমাহল ছিল – মৌসুমী সিনেমা। সেইখানে বাবামায়ের সঙ্গে সিনেমা দেখতে গেছিলাম, ওগো বধূ সুন্দরী। …

… তখন আমি সবে প্রথম ভাগ শেষ করেছি। সাড়ে তিন বছর বয়েস। সিনেমা শুরুর মুখে পর্দায় বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে, তখনকার দিনের কাপড়ের ব্র্যান্ড – স্টানরোজ। এখন বোধ হয় আর সে ব্র্যান্ড নেই, তো যাই হোক, স্টানরোজ লেখাটা এমন স্টাইল করে লেখা ছিল, প্রথম বানান করে পড়বার মজায় আমি হল কাঁপিয়ে চীৎকার করে পড়েছিলাম – সটানরোজ, আর হলশুদ্ধু লোক হ্যাহ্যা করে হেসে উঠেছিল। আমি তখনও যুক্তাক্ষর পড়তে শিখি নি আসলে। পরের দিন বাবা আমাকে বর্ণপরিচয় দ্বিতীয় ভাগ এনে দিয়েছিল।

এই মৌসুমী সিনেমার ঠিক সামনেই একটা স্কুল ছিল, বাণীপীঠ বিদ্যালয়। আমার প্রথম স্কুল, কেজি টু পড়েছিলাম এখানে, উনিশশো বিরাশি সালে, তার পরে আমরা মুর্শিদাবাদ চলে যাই। গুগল ম্যাপ খুঁজেও আর সেই বাণীপীঠ স্কুল বা মৌসুমী সিনেমা হলের দেখা পেলাম না। বর্ধমানের কেউ থাকলে জানাবেন তো, তারা এখনও আছে কিনা।

বর্ধমান শহরের একদম মাঝখান দিয়ে ট্র্যাফিক ঠেলতে ঠেলতে এক সময়ে পেয়েই গেলাম দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়েকে – ব্যস, এইবারে আমার চেনা রাস্তা। আবার স্পিড তোলা গেল। প্রায় সাড়ে সাতটা বাজে, ঘণ্টা দেড়েক আরও তো লাগবেই। শক্তিগড় পেরিয়ে মেমারীতে একটা কাট আছে, যেটা দিয়ে আদি জিটি রোড ধরে পাণ্ডুয়া বৈঁচি হয়ে ব্যান্ডেল ঢোকা যায়, কিন্তু সে বড় ভয়ংকর রাস্তা – ভাঙাচোরা। তার চেয়ে সোজা এগিয়ে গিয়ে সিঙ্গুর দিয়ে ঢোকা ভালো, একদম টিপটপ রাস্তা, সিঙ্গুর নসিবপুর পেরিয়ে সোজা নিয়ে ফেলবে চন্দননগরের দিল্লি রোডে, সেখান থেকে আবার একটু বাঁদিকে পিছিয়ে এসে সুগন্ধ্যা হয়ে চুঁচুড়া ঢোকা ভালো। সুগন্ধ্যা থেকে চুঁচুড়া স্টেশনের তলা দিয়ে খাদিনা মোড়, সেখান থেকে আবার বাঁদিক নিলেই আদি জিটি রোড ধরে সোজা আমার বাড়ি। এ তল্লাটের প্রতিটা রাস্তা প্রায় আমার চেনা।

শক্তিগড় পেরোল, দুপাশে সেই বিরক্তিকর ল্যাংচা হাব। অগুনতি ল্যাংচার দোকান সারি সারি, লোকে গাড়ি মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে হাম হাম করে ল্যাংচা খাচ্ছে। কী বাজে খেতে – আগের বারে যাওয়া এবং আসার পথে দু বারই চারটে আলাদা দোকান থেকে খেয়ে দেখেছিলাম, অতীব জঘন্য খেতে হয়। বরং এরা সকালবেলায় কচুরি আলুরদম করে, সেইটা উমদা খেতে হয়, কিন্তু এখন তো আর সকাল নয়, আর এই ভিড়ের মধ্যে মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে খাওয়ারও ইচ্ছে নেই। অতএব এগিয়ে গেলাম।

চওড়া দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে রাতের অন্ধকারেও দারুণ রঙীন। দু পাশে কিছুদূর অন্তর অন্তর ফুড জয়েন্ট, ধাবা। দুদিক দিয়ে হু হা স্পিডে বেরিয়ে যাচ্ছে বাঁকুড়া, শিলিগুড়ি কি বহরমপুর থেকে আসা রকেট বাসের দল। মেমারীর কাটও পেরিয়ে এগিয়ে গেলাম, এমনিতেও, বোধ হয় রাস্তা ভালো নয় বলেই, জিপিএসও এই রুট সাজেস্ট করছে না – সোজা এগিয়ে যেতেই বলছে।

অনেকটা যাবার পরে জিপিএসের কথামত বাঁদিকের রাস্তা ধরে নিলাম। যদিও আশেপাশে কোথাও সিঙ্গুর লেখা বোর্ড দেখতে পেলাম না, এখানে একটা বড় বোর্ড থাকার কথা ছিল। যাক গে, পরিষ্কার দেখছি সোজা রাস্তা – আর বোর্ড দেখে কী হবে।

চলতে থাকলাম, গ্রামের রাস্তা, ঘুরঘুট্টি অন্ধকার, কিন্তু বেজায় সুন্দর, মসৃণ রাস্তা। একটা সময়ে দিল্লি রোডের কাটও পেয়ে গেলাম, সেখান থেকে বাঁদিক নিতে হবে। এবং এর পরের মোড় – সুগন্ধ্যার মোড় থেকে ডানদিক নিতে হবে।

নিলাম। এইবারে একটু এগোলেই চুঁচুড়া ধান্য গবেষণা কেন্দ্র আর তার পরেই চুঁচুড়া স্টেশন। কিন্তু রাস্তাটা কেমন অচেনা ঠেকছে কেন? চলতে চলতে একটা সময়ে হঠাৎ দেখি জিপিএস আমাকে বলছে সামনে একটা তিনমাথার মোড় আছে, সেখান থেকে ডানদিকে বেঁকতে।

এইখানে খটকা লাগল – ডানদিক কেন? ডানদিকে তো কোথাও বেঁকার কথা নয়!

এগিয়ে গেলাম – সরু সরু তিনটে রাস্তার সংযোগস্থল, মাঝখানে শরৎচন্দ্রের একটা আবক্ষ মূর্তি বসানো। … নাঃ, মিলছে না তো, সিঙ্গুর ধনেখালীর রাস্তায় কোথাও তো এমন তিনমাথার মোড়ে শরৎচন্দ্রের মূর্তি ছিল না!

তা হলে কী করব – ডানদিকে যাবো, না বাঁদিকে? যাক, জিপিএস যা বলে বলুক, আটটা পনেরো বাজে, আমি বাঁদিকেই টার্ন নিই।

নিলাম, খানিকদূর এগিয়ে আরও কেমন অচেনা লাগল। জিপিএস বারবার বলছে ইউ টার্ন নিয়ে উল্টোদিকে ফিরতে। একবার দাঁড়িয়ে স্ক্রোল করে দেখলাম মোবাইলে, আমার বাড়ি নাকি এখান থেকে আর মাত্র তিন কিলোমিটার! … ঠিক দেখাচ্ছে তো! কী করে হয়?

মোটরসাইকেল ঘুরিয়ে আবার ফিরে গেলাম সেই তিনমাথার মোড়ে, আর তখনই বিদ্যুৎচমকের মত মাথায় এল, তবে কি, তবে কি আমি সিঙ্গুর পর্যন্ত যাইই নি? এটা তার আগের কাট?

জিপিএসে কথা মত ডানদিকের রাস্তাই নিলাম, এবং কিছুদূর এগোতেই রেললাইনের নিচে আন্ডারপাস পেয়ে গেলাম, খুব খুব চেনা আন্ডারপাস – কিন্তু না, এটা চুঁচুড়া স্টেশনের আন্ডারপাস নয়, ওপরে বড় করে সাইনবোর্ড দেখা যাচ্ছে, ব্যান্ডেল জংশন।

এতক্ষণে পুরো গল্পটা ক্লিয়ার হল। আমি সিঙ্গুরের কাট পর্যন্ত যাইই নি, বেলমুড়ি থেকে ধনেখালীর রাস্তা নিয়েছি, যেটা সিঙ্গুরের রাস্তার মতই সরু। সিঙ্গুর পেরিয়ে নসিবপুর পেরিয়ে যেখানে রাস্তাটা দিল্লি রোডে এসে মেশে, ধনেখালীর রাস্তাও একইভাবে দিল্লি রোডে এসে মেশে, কিন্তু সেই মোড়টাই সুগন্ধ্যার মোড়। আমি যেখান থেকে বাঁদিক নিয়ে পরের মোড়কে সুগন্ধ্যার মোড় ভেবে ডানদিক নিয়েছিলাম, সেটা আসলে ছিল পোলবার মোড়, আমি পোলবা হয়ে কোরোলা কাজিডাঙা পেরিয়ে এইমাত্র দেবানন্দপুরের মোড় থেকে ডানদিক নিলাম, তাইজন্য ওখানে শরৎচন্দ্রের মূর্তি বসানো ছিল। আর তাই চুঁচুড়ার বদলে আমি এসে পড়েছি একদম ব্যান্ডেল স্টেশনের সামনে, আর তাই তখন আমার বাড়ি দেখাচ্ছিল তিন কিলোমিটার। সুগন্ধ্যা থেকে আমার বাড়ি কিছু না হোক আট ন কিলোমিটার তো হবেই।

মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে একবার বাবাকে ফোন করে বললাম, ব্যান্ডেল স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, আর দশ মিনিটে বাড়িতে ঢুকছি।

দশ মিনিটও লাগল না, ঢুকে গেলাম বাড়িতে। আটটা তিরিশ।

মোটরসাইকেল চালিয়ে হুগলি অবধি চলে আসব, এমন প্ল্যান শুরুর দিকে ছিলই না – বইপ্রকাশের অনুষ্ঠান আমাকে টেনে নিয়ে এল। কাল বেলা দুটো থেকে মিউনিসিপ্যালিটির কনফারেন্স হল বুক করে রাখা আছে।

রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম, ডাউন মেমোরি লেন বোধ হয় একেই বলে। আজ সকাল থেকে এমন একটা জার্নি করে এলাম – আমার সমস্ত ফেলে আসা দিনগুলোকে ছুঁতে ছুঁতে ফেরা, ছোটবেলার স্মৃতি, কিশোরবেলার স্মৃতি – সব দেখতে দেখতে আমার আসল ঘরে ফেরা হল আজ।


Name:  দ          

IP Address : 144.159.168.72 (*)          Date:11 Apr 2018 -- 05:47 PM

ওহো এই পর্বটা এসে বসেছিল খেয়ালই করি নি


Name:  সুকি           

IP Address : 71.6.238.244 (*)          Date:11 Apr 2018 -- 07:57 PM

সিকি,
তুমি মনে হয় 'অনিতা' সিনেমা হলের কথা বলতে চেয়েছ, মৌসুমী হল নয়। ওই নামে তো বর্ধমানে কোন সিনেমা হল মনে পড়ছে না। আর বাণীপিঠ বিদ্যালয় রয়েছে তোঃ

https://www.google.com/maps/place/Burdwan+Banipith+High+School/@23.240
0446,87.8657117,20.5z/data=!4m13!1m7!3m6!1s0x39f849d1ea7e5efd:0x4ce71a
0a521f8b0e!2sBardhaman,+West+Bengal,+India!3b1!8m2!3d23.2324214!4d87.8
614793!3m4!1s0x39f849c4d923f233:0xbe77877e290a91bc!8m2!3d23.2401268!4d
87.865657





Name:   সিকি           

IP Address : 132.177.206.126 (*)          Date:11 Apr 2018 -- 08:51 PM

থ্যাঙ্কু সুকি। হ্যাঁ, ম্যাপে অনিতা সিনেমাই দেখাচ্ছে বটে। বাণীপীঠ স্কুলও পেলাম। একটু খোঁজ নিয়ে বলবে, অনিতার নাম কখনও মৌসুমী ছিল কিনা, এই ধরো উনিশশো আশি একাশি সালে?


Name:  শঙ্খ          

IP Address : 126.206.220.202 (*)          Date:11 Apr 2018 -- 10:12 PM

শেষের দিকে প্রায় দমবন্ধ করে পড়ছিলুম, আবার কোন লাস্ট মোমেন্ট সারপ্রাইজ এসে যায় পাছে। যাক ভালোয় ভালোয় সিকি ঘরে পৌঁছাল। ঃ)


Name:   সিকি           

IP Address : 132.173.82.156 (*)          Date:14 Apr 2018 -- 11:59 PM

৩রা নভেম্বর, পঞ্চদশ দিন
===============

“আমার একজন গার্লফ্রেন্ড আছে বুঝলে, আমেরিকায় থাকে। আমাকে ডার্লিং বলে ডাকে। তার কাছে চারটে হার্লে ডেভিডসন রয়েছে। মাঝে মাঝেই শখ চাপলে বেরিয়ে পড়ে। বয়েস এখন মাত্র বিরানব্বই চলছে। বয়েস ফয়েস তো জাস্ট একটা নাম্বার, বুঝলে – এখনও যে রকমের ফিট আছে না সে, ইচ্ছে হলেই যখন তখন হার্লে চেপে আমেরিকার বুক চিরে পুরো এফোঁড় ওফোঁড় করে ঘুরে আসে।”

ডক্টর কুমার কৌস্তুভ রায় যখন মুখ খোলেন, তখন বাকিরা মুখ খোলার বিশেষ সুযোগ পায় টায় না। তার অবশ্য কারণও আছে, তাঁর আমেরিকান ডার্লিংয়ের মত প্রাইজড পজেশন না থাকলেও হাওড়ানিবাসী এই ভবঘুরে ডাক্তারটির আছে একটি হার্লে ডেভিডসন। এবং আছে কিছু ভিন্টেজ কালেকশন – একটি ১৯৭৫ সালের কাওয়াসাকি শেরপা মোটরসাইকেল, এখনও চলে, এবং রীতিমত চলে, আর আছে একটি আদি অকৃত্রিম অ্যাম্বাসাডর, যাতে চেপে একবার উনি বর্ডার পেরিয়ে চীনে ঢুকে ঘণ্টাখানেক ঘুরে এসেছিলেন, কোনও বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই। এর বাইরেও তাঁর ঝুলিতে আছে সম্ভব অসম্ভব নানা রকমের বেড়ানোর অভিজ্ঞতা। পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে কোথায় কতগুলো সচল এবং পরিত্যক্ত এয়ারস্ট্রিপ আছে, কোথায় গেলে ডাইনোসরের ডিম দেখতে পাওয়া যায়, তার লিস্টি এঁর নখের ডগায় – শুধু গুগল বা উইকি করে এ তথ্য আহরণ করা নয় – ইনি তার প্রত্যেকটি নিজের মোটরসাইকেলে চড়ে ঘুরে ছুঁয়ে এসেছেন। এমন লোক যখন নিঃসঙ্কোচে, বিনা অহঙ্কারে মাটিতে থেবড়ে বসে নিজের গল্পের সুটকেসটা খোলে, তখন সাধ্যি কি, বাকিরা মুখ খোলে আর?

লোনলি হাইওয়ে নামক একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আছে, মূলত সারা দেশের বাইকারদের একটা ছোট গ্রুপ, নিজের নিজের ট্র্যাভেল প্ল্যান শেয়ার করে, প্রশ্ন থাকলে সেগুলো এই ফোরামে জিজ্ঞেস করে – যেমন হয়ে থাকে সমস্ত ক্লোজড গ্রুপেই আর কি – সেই গ্রুপ এই ডক্টর কুমার কৌস্তুভ রায়ের মডারেশনে চলে। সেই সূত্রেই আমি ভদ্রলোককে চিনতাম, এর পরে জয়গাঁওতে বসে কদিন আগে এঁর ফোন, তার পরে আজকেই প্রথম দর্শন। ইনি একা নন, লোনলি হাইওয়ে গ্রুপ থেকে আরও বেশ কয়েকজন এসেছিলেন আমার বইপ্রকাশের অনুষ্ঠানে। কাউকে চিনতাম না, ভার্চুয়াল গ্রুপেই যেটুকু বক্তব্যের আদানপ্রদান, আমি যখন গ্রুপে জানিয়েছিলাম, নভেম্বরের চার তারিখে হুগলিতে আমার বইপ্রকাশের অনুষ্ঠান, তাঁরা জানিয়েছিলেন – আসবেন, এসেছিলেন, অনুষ্ঠানের ঔজ্জ্বল্য একসঙ্গে হাজারগুণ বেড়ে গেছিল। সেদিনের গুণীজন সমাবেশ আমার বহুকাল মনে থাকবে।

এত জায়গা থাকতে, হুগলি কেন বাছা হল বইপ্রকাশের জন্য? আসলে এর প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল তারও আগে। এর আগেও আমার একটা বই বেরিয়েছিল গুরুচন্ডালি থেকে, লা জবাব দিল্লি নামে, কিন্তু গুরু তখন প্রকাশনার জগতে জাস্ট হামাগুড়ি দিচ্ছে, ফলে আনুষ্ঠানিক বইপ্রকাশ তখন করার কথা মারুর মাথাতেই আসত না, শুধু আমি নয়, সেই সময়ে যাদেরই বই বেরিয়েছে, কারুর প্রকাশের জন্যই আলাদা করে অনুষ্ঠান করা হত না। গুরু এখন প্রকাশনার জগতে পাকাপোক্ত হয়েছে – বেশ পরিচিত নাম, তাই অনুষঙ্গ হিসেবে আসে এইসব অনুষ্ঠান, আর আমার বইয়ের ফাইনাল প্রুফ যখন প্রেসে জমা দেওয়া হল, তখন পিনাকী আমাকে একদিন ফোন করে বলল, আমরা তো সবাই জানি, এইসব প্রকাশ-আবরণউন্মোচন ইত্যাদি কাজ সদাসর্বদা কলকাতা শহরে হল বুক করে করা হয়ে থাকে। আমরা এই প্রোটোটাইপটা প্রথম ভাঙি না কেন? শহর কলকাতাকেন্দ্রিকতা ছেড়ে আমরা শহরতলির কাছে নিয়ে যাই গুরুকে। লোকে জানুক, মফস্‌সলেও এসব অনুষ্ঠান করা যায়।

সবাই এক বাক্যে লুফে নিয়েছিল প্রস্তাবটা, আমি তো নিয়েছিলামই, কারণ, যদিও আমার যাওয়া আসার প্ল্যানে প্রথমে হুগলি ছিল না – কিন্তু এই ছুতোয় একবার বাবা মায়ের সঙ্গে দেখা করা হয়ে যাবে, আর হুগলি আমার এলাকা, সেখানে এই অনুষ্ঠান করবার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবি নি, ভাবতে বাধ্য করল গুরুচণ্ডা৯। সৈকত লিখে দিল একটা জম্পেশ ব্লার্ব, আর ঈপ্সিতা বার চব্বিশেক বলেছিল, ইশশ, আমিই যেতে পারব না। খুব মিস করব।

আমাদের এখানে, হুগলিতে অনুষ্ঠানের জায়গা বলতে আমার মাত্র দুটি জায়গাই জানা ছিল – এক তো হুগলি চুঁচুড়া মিউনিসিপ্যালিটির হল, অন্যটা চুঁচুড়া রবীন্দ্রভবন। মিউনিসিপ্যালিটি হল আমি ছাত্রাবস্থায় বহুবার গেছি প্রাইজ নিতে, তখন সায়েন্স ট্যালেন্ট বলে একটা পরীক্ষা হত, আর ফি বছর সেই পরীক্ষার পরে একটা করে বই পুরস্কার পেতাম, আমরা সবাই। বড় লেভেলের পুরস্কার পেয়েছিলাম মাধ্যমিকের পর, ঐ পৌরসভার তরফে শহরের কৃতি ছাত্রছাত্রীদের বইটই দেয় না – তো তেমন কৃতি না হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে আমার নাম এসে গেছিল লিস্টিতে, আর একটা বইও পেয়েছিলাম। মিউনিসিপ্যালিটির পুকুরেই আমি সাঁতার শিখেছি চার বছর। তো, সেই হল বুক করার জন্য কাকে কী বলতে হয়, হুগলি ছাড়ার এত বছর পরে তো আমি সুদূর দিল্লি থেকে সে ব্যবস্থা করতে পারব না। বাবারও বয়েস হয়েছে, তাঁর পক্ষেও এই বয়েসে দৌড়ঝাঁপ করে খোঁজখবর নেওয়া সম্ভব নয়।

এই সময়েই মাথায় এল চিররঞ্জনের কথা।

সে এক অদ্ভুত ছেলে। তার সাথে আমার আলাপ হয়েছিল রামোজী ফিল্ম সিটিতে, দু হাজার এগারো সালে। ইটিভি বাংলার একটা রিয়েলিটি শো – হাই টেনশনে অংশগ্রহণ করতে আমি গিয়ে পৌঁছেছি হায়দ্রাবাদ, সেইখানে একঝাঁক উজ্জ্বল প্রতিভাবান ছেলেপুলের মাঝে এই ছেলেটিকে আমি দেখি। এমনিতে যদি জিজ্ঞেস করেন, কে এই ছেলে, তা হলে উত্তর এক কথায় দেওয়া যায় – পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের একজন কর্মচারী। কিন্তু খোলস ছাড়ালে দেখবেন, সে পরিচয়ের আড়ালে আছে আরও কিছু পরিচয়, যার খবর সবাই জানে না।

ওরিগামি। চৌকো করে কাটা রঙিন কাগজ থেকে বানিয়ে তোলা হাতি ঘোড়া ব্যাঙ প্রজাপতি কিংবা সুদৃশ্য খেলনা অহঙ্কার-পেটিকা – আপনারা যারা ফেসবুকে চিররঞ্জনের সাথে যুক্ত আছেন, তারা দেখে থাকবেন ওর হাতের বানানো ওরিগামির কাজ।

নিউম্যাটোলজি। দেশ বিদেশের কয়েন আর কারেন্সি নোট জমাবার হবি। হায়দ্রাবাদের সেই গেস্ট হাউসে যখন চিররঞ্জনের সাথে দেখা হয়েছিল, ও নিয়ে এসেছিল ওর সংগ্রহ। তাক লাগিয়ে দেবার মত কালেকশন ছিল তখনই ওর কাছে। এতদিনে নিশ্চয়ই সে সংগ্রহ আরও সমৃদ্ধ হয়েছে।

অ্যাস্ট্রোনমি। না, প্রথাগত পড়াশোনার দিক দিয়ে অবশ্য চিররঞ্জন জ্যোতির্বিদ নয়, তবে এটাও তার অন্যতম একটা হবি। চুঁচুড়া ও সন্নিহিত এলাকার বিভিন্ন অ্যাস্ট্রোনমি ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র আমাদের এই বন্ধুটি।

তালিকা আরও লম্বা করাই যায়, তবে চিররঞ্জনের পরিচয় পাবার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। চুঁচুড়ারই ছেলে; ফলে, তাকে যখন জানালাম আমার প্ল্যানের কথা, এক কথায় বলল, তুমি একেবারে চিন্তা কোরো না, আমি দু তিনটে জায়গা বেছে রাখছি, তুমি একবার বলো, কোথায় করতে চাও, আমি সেই রকম ব্যবস্থা করে দেব।

আলোচনায় মাঝে একবার ঠিক হল জোড়াঘাটের বন্দেমাতরম বাড়িটা যদি ভাড়া পাওয়া যায় – এমনিতে ওটা ভাড়া দেওয়া হয় কিনা আমি জানি না, তবে চিররঞ্জনই জানাল, ঘরটা খালিই থাকে, দিনের বেলায় ওখানে আধার বানাবার লোকেরা বসে কাজ করে, কথা বললেই একবেলার জন্য পাওয়া খুব অসুবিধে হবে না, একদম গঙ্গার ঘাটে, বসবার জায়গার অভাব হবে না, তবে মাইক প্রজেক্টার শতরঞ্চি বা চেয়ার ইত্যাদি সমস্ত আলাদা করে ভাড়া করতে হবে। সেই নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে নিতেই আমি তখন ঘুরে ফেলেছি সিকিমের অর্ধেক – তার মধ্যেই চিররঞ্জন আবার একদিন ফোন করে জানাল, পৌরসভাতেই একটা নতুন কনফারেন্স হল হয়েছে, পঞ্চাশজনের মত বসার জায়গা, এসি প্রজেক্টার মেশিন চেয়ার ডায়াস পোডিয়াম সমস্ত ফিট করা, এই ধরণের অনুষ্ঠান করবার জন্য একদম আদর্শ জায়গা, নামমাত্র মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে। আমি বুক করে ফেলেছি, তারপর এখন তোমাকে জানাচ্ছি।

এই হচ্ছে চিররঞ্জন – মুখের কথাটি খসাবার আগে কাজ করে ফেলে।

কাল রাতেই বাড়ি ফিরে খেয়ে উঠে একবার চেক করলাম কে কে আসতে পারে আজকের অনুষ্ঠানে। বাবাও বলল, পাড়ায় বেশ কয়েকজনকে বলে রেখেছে – অমুক আসবেই, তমুক আসতেও পারে, এইবারে তমুক এলে অমুক নাম্বার টু আসবে না কারণ দুজনের মধ্যে মুখ দেখাদেখি নেই – বলে একটা টেনটেটিভ লিস্ট দিল। দুদিকের লিস্ট মিলিয়ে দেখলাম মোটামুটি চল্লিশ জন হচ্ছে, আমাকে ধরে।

সকালে উঠে চিররঞ্জনকে ফোন করে জেনে নিলাম সমস্ত কিছু ঠিকঠাক কিনা। আমাদের ব্যান্ডেলের সুইটস সেন্টারের মিষ্টি ব্যান্ডেল ছাড়িয়ে দিল্লি ব্যাঙ্গালোরেও সুখ্যাতি লাভ করেছে – সেখানে গিয়ে অরূপদাকে চল্লিশ প্যাকেট সামান্য জলযোগের অর্ডার দিয়ে রাখলাম, ওদিকে চিররঞ্জন চা এবং জলের বোতলের অর্ডার দিয়েই রেখেছে। সমস্ত কিছু সেট, আমরা গিয়ে পড়লেই হয়। একটা থেকে অনুষ্ঠান, রাত আটটা পর্যন্ত হল আমাদের জন্য খোলা থাকবে।

সাজোসাজো রব চলছে চারদিকে, ভার্চুয়ালি তার খবর পাচ্ছি। রৌহিন জানালো ওরা ঠিক সময়মত কলকাতা থেকে স্টার্ট করবে, প্রেস থেকে আমার বই নিয়ে সবাই মিলে একটা গাড়িতে করে আসবে। এদিকে বুনান আসবে আলাদা, লোনলি হাওওয়ের তরফে কুমার কৌস্তুভ রায় বলে রেখেছেন ঠিক একটায় পৌঁছে যাবেন, অতএব আমাকে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে সাড়ে বারোটার মধ্যে তো পৌঁছতেই হয়। আর চিররঞ্জন না থাকলে আমি এই নতুন কনফারেন্স হলটা চিনতেও পারব না, ফলে ওকেও ডেকে নিতে হয়।

কাল আমার ফেরার পথে যাত্রা শুরু। যেমন হয়, প্রথম দিনের গন্তব্য বেনারস, ভোর ভোর বেরোতে হবে, ফলে মোটরসাইকেলের কাজকর্ম আজ সকালেই সেরে রাখতে হবে। চেনে লুব্রিক্যান্ট দেওয়া, টায়ারে হাওয়ার প্রেশার চেক করা ইত্যাদি মামুলি কাজ সেরে চলে গেলাম ব্যান্ডেল মোড়ে, আমাদের এলাকার পেট্রল পাম্প। দের্ঘদিন ধরে এই পেট্রল পাম্পটিকে আমি দেখেছি, কিন্তু সেখান থেকে তেল ভরতে চলেছি জীবনে এই প্রথম, কারণ এর আগে আমি তো হুগলিতে কোনওদিন গাড়িই চালাই নি।

জিটি রোডের পেট্রল পাম্পটিতে কখনওই ভিড় থাকে না, ধীরেসুস্থে গেলাম, পেট্রল ভরার সময়ে, যিনি ভরছিলেন, আর পাশে অন্য একজন খোশগল্পে মত্ত ছিলেন। বিষয়ঃ আমার মোটরসাইকেলের লাগেজ ক্যারিয়ার।

প্রথমজনঃ এই গুলো কী লাগিয়েছে বল তো?
দ্বিতীয়জনঃ আরে ওই তো, দেখিস নি আজকাল পিঠে ঢাউস ঢাউস ব্যাগ নিয়ে সব হোম ডেলিভারি দেয়, আমাজন, ফিলিপকাট, ঐ ওদেরই লোক হবে হয় তো, এতে করে বস্তা বেঁধে নিয়ে যায়।
প্রথমজনঃ আরে না না, এ নিশ্চয়ই চাল ডাল আনাজ সাপ্লাই দেয়, তাই বাক্সো বানিয়ে রেখেছে, এইখানে বস্তা বেঁধে নিয়ে যায়।

আমি চুপ করে শুনতে থাকলাম। আমাকে কেউ একবারও জিজ্ঞেস টিজ্ঞেস করলেন না, মোটরসাইকেলের ট্যাঙ্ক ফুল করে যখন পেট্রল জেরিক্যান ভরে দিতে বললাম, তখন তাঁদের কথাবার্তা থেকেই জানলাম, তাঁরা ঠিকই আন্দাজ করেছিলেন, আমি গ্রামেগঞ্জে চালডালসবজি সাপ্লাই করি, গ্রামের দিকে তো বেশি পেট্রল পাম্প থাকে না, তাই পেট্রলও বেঁধে নিয়ে যাচ্ছি।

মুচকি হেসে, পেট্রলের দাম মিটিয়ে ফিরে এলাম বাড়ি। তৈরি হবার পালা। আমাকে সাড়ে বারোটার মধ্যে পৌঁছতে হবে – বাবা মা পরে আসবে।

হুগলি এতটাই ছোট এলাকা, আমার বাড়ি থেকে পিপুলপাতির মোড়ে পৌরসভা চত্বরে পৌঁছতে সময় লাগে খুব বেশি হলে দশ থেকে পনেরো মিনিট। কনফারেন্স হলটা আমার পক্ষে লোকেট করা সম্ভব নয়, তাই নিচেই একটা ধাপিতে বসে রইলাম। আজ শনিবার, ছুটির দিন। পৌরসভা তাই বন্ধ, লোকের ভিড়ও নেই।

ঠিক একটার সময়ে ফোন এল কুমার কৌস্তুভ রায়ের, আমি ঠিক মিউনিসিপ্যালিটির গেটের সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি, এইবারে কোনদিকে যাবো? … তাঁকে ফোনে ডিরেকশন দিতে গিয়েই দেখতে পেলাম লম্বা একহারা চেহারাটাকে, দৌড়ে গিয়ে নিজেই ডেকে এনে বসালাম – চিররঞ্জন এসে গেল একটু পরেই। তিনজনে মিলে ওপরে উঠে আবিষ্কার করলাম কনফারেন্স রুমটাকে, সুন্দর সাজানো গোছানো দিব্যি মনোহর।

কলকাতার দলকে ফোন করতে গিয়ে জানা গেল, তারা এখনও সবাইকে তুলে উঠতে পারে নি, সবাইকে তুলে নিয়ে তবেই বেরোবে। সুতরাং, আসতে আসতে সাড়ে তিনটে তো বাজবেই।

সে বাজতেই পারে, কিন্তু ততক্ষণ কি আমরা ফাঁকা মাঠে বসে এসির হাওয়া খাবো? একজন দুজন করে লোক আসছেন, বেশির ভাগই আমার আত্মীয়স্বজন, আমার মামারা, পিসতুতো দাদা, মায়ের বন্ধু, বাবার বন্ধু, মামাদের বন্ধুরা, ধীরে ধীরে হল ভরে উঠছে, আর সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতে কুমার কৌস্তুভ রায়ের অ্যাডভেঞ্চারের গল্প। সঙ্গে ধরতাই দিচ্ছেন তাঁর সঙ্গীসাথীরা, লোনলি হাইওয়েরই সদস্য সবাই, প্রত্যেকের আলাদা আলাদা বেড়ানোর গল্প। সে গল্পের খানিক তো ওপরেই লিখেছি।


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/04/dsc_0359.jpg

https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/04/dsc_0363.jpg

কত যে চেনা মুখ এল, একসময়ে এল অর্পণ, সেই অর্পণ যে আমার আর বুনানের সাথে দয়ারা বুগিয়াল ট্রেকে গেছিল। হঠাৎ দেখি চুপিচুপি ঢুকছে লামা আর হুতো। গুরুচণ্ডা৯র বাইরের লোকজন যাঁরা এদের চিনতে পারছেন না, তাঁদের বলি – হুতো ওরফে রবাহুত আমার বইয়ের প্রচ্ছদশিল্পী। শুধু এই বইয়ের নয়, আমার আগের বইয়েরও। এবং, শুধু আমার বই নয়, গুরুচণ্ডা৯ থেকে প্রকাশিত হওয়া অধিকাংশ বইয়ের প্রচ্ছদ বানায় হুতো। প্রতিভাশালী এই ছেলেটির দাদা হচ্ছে লামা, সে আমাদের গুরুসভার আরেক রত্ন। লেখা, আঁকা, অ্যানিমেশন – সমস্ত সৃষ্টিমূলক কাজকর্মে সে একাই একশো। লামার লেখায় এক অদ্ভুত মায়া জড়িয়ে থাকে।


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/04/dsc_0379.jpg


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/04/dsc_0378.jpg


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/04/dsc_0358.jpg

সাড়ে তিনটেও নয়, প্রায় চারটের সময়ে হইহই করে একটা টেম্পো ট্র্যাভেলার এসে ঢুকল হুগলি চুঁচুড়া পৌরসভার গেট দিয়ে, আর সেইখান থেকে হুড়মুড়িয়ে নেমে এল টিম গুরুচণ্ডা৯, অনেকটা এই রকমভাবেঃ


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/04/viva-tapioca.jpg

বেশির ভাগই অবশ্য অচেনা মুখ, কাউকে কাউকে ভার্চুয়ালি চিনি, কেবল রৌহিন, পারমিতাদি, সব্যসাচীবাবু আর শেখরদাকে এর আগে সামনাসামনি দেখা। সব্যসাচীবাবু হাঁকপাঁক করে ঢাউস ঢাউস বইয়ের বাণ্ডিল নামাচ্ছেন, আর বাকিরা হাতে হাতে সে সব পৌঁছে দিচ্ছে ওপরে।

নিজের চোখে নিজের বই দেখলাম সেই প্রথম। রৌহিন আর শেখরদা মিলে বই সাজিয়ে রাখল টেবিলের ওপর, আর উপস্থিত দর্শকরা দিব্যি আগ্রহভরে দেদার কিনে ফেললেন আমার বই।


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/04/dsc_0369.jpg

পরের কয়েকটা ঘণ্টা কীভাবে কেটে গেল, জানি না; জয়াদি, বুনান, আমার কয়েকজন আত্মীয় প্রত্যেকে নিজের নিজের মতন করে বিভিন্নরকমের বেড়ানোর গল্পের স্মৃতিচারণা করলেন, বেড়ানোর নেশাকে মূলধন করেই বুনানের একটা প্রচেষ্টা ধীরে ধীরে রূপ পাচ্ছে আরও কয়েকজনের সাথে, সেই নিয়ে একটা চমৎকার প্রেজেন্টেশন দিল বুনান, জয়াদির মুখে শুনলাম ইওরোপ থেকে সাইকেল চালিয়ে তাঁর ভারতে আসার রোমহর্ষক কাহিনি, আর সঙ্গে ছিল সুইটস সেন্টারের মিষ্টির প্যাকেট, চা আর জল। সাড়ে আটটা নাগাদ যখন চৌকিদার এসে হল বন্ধ করার অনুমতি চাইল, তখন আমাদের হুঁশ ফিরল। হিসেব করে দেখা গেল, প্রায় পঁয়তাল্লিশ জনের জমায়েত হয়েছিল, ফলে আমার, চিররঞ্জনের, আরও দু একজনের ভাগ্যে মিষ্টির প্যাকেটই জোটে নি।


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/04/dsc_03651.jpg

https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/04/dsc_0366.jpg

https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/04/dsc_0367.jpg

কিন্তু হল বন্ধ করে দিলেই কি আড্ডার মেজাজ মেটে? নিচে নেমে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা হল, ছবি তোলা হল, তার পর আস্তে আস্তে যে যার গন্তব্যে ফেরত।


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/04/dsc_0388.jpg

বেড়ানোর সময় শেষ হয়ে আসছে, তবু তা শেষ হয়েও শেষ হয় না – লোনলি হাইওয়ের আরেক বন্ধু, তাকেও চোখে দেখি নি – বিপিন, সে ফোন করে নেমন্তন্ন করে রেখেছে। যেদিন থেকে সে জেনেছে আমি সিকিম ভুটান বেড়ানোর প্ল্যান করছি – যতরকম ভাবে সম্ভব সে আমাকে সাহায্য করেছে। সম্প্রতি কারা কারা গেছে, তারা কীভাবে পারমিট জোগাড় করেছে, কেমন ওয়েদার পেয়েছে, কী কী ডকুমেন্ট ক্যারি করতে হয় – সমস্ত তথ্য আমাকে ফোন করে হোয়াটসঅ্যাপ করে আমাকে অনবরত জোগান দিয়ে গেছে।

তার বাড়ি আসানসোলে, কাল যাবো তার বাড়ির কাছ দিয়েই, কথা হয়েছে একদম আসানসোলে গিয়েই ব্রেকফাস্ট করব। শক্তিগড়ে এবারেও আর থামার গল্প নেই।


Name:  aranya          

IP Address : 172.118.16.5 (*)          Date:15 Apr 2018 -- 07:14 AM

এই বন্ধুত্ব গুলো ও পাওনা - কৌস্তুভ, বিপিন - সম মানসিকতার ভ্রমণকারী, অ্যাডভেঞ্চারার-দের সাথে
খুবই উপভোগ করছি লেখা ও ছবি


Name:   সিকি           

IP Address : 116.223.92.59 (*)          Date:15 Apr 2018 -- 08:59 AM

রাস্তায়, আমরা বলি, সব ধর্মের সেরা ধর্মের নাম হল বাইকার্স।


Name:  শঙ্খ          

IP Address : 126.206.220.119 (*)          Date:17 Apr 2018 -- 11:33 PM

বাহ। খুব মিস করেছি গুরুর হুগলি-কন


Name:   সিকি           

IP Address : 132.177.198.143 (*)          Date:29 Apr 2018 -- 08:27 PM

৫ই নভেম্বর, সপ্তদশ দিন

বেড়ানোর পালা শেষ। আবার গতানুগতিক জীবন মাত্র দুদিনের দূরত্বে। ফিরতে হবে। এবারে যা ঘোরা হল, স্মৃতিতে অনেকদিন ধরা থাকবে প্রতিটা দিন, আলাদা করে। কিলোমিটারের পর কিলোমিটার বৈচিত্র্যে ভরা জায়গা পেরিয়ে চলা, কখনও প্রচণ্ড একঘেয়ে, কখনও বিপদসঙ্কুল। আগামী দুদিনে আমাকে ফিরতে হবে দেড় হাজার কিলোমিটার আরও। একটানা রাস্তা, সমতল, কোনও পাহাড় নেই, বেশির ভাগটাই লোকালয়ের মধ্যে দিয়ে চলা। এ পথে আমি আগেও ফিরেছি, তবে সেটা গাড়ি চালিয়ে, দু চাকায় এই প্রথম।

আগের দিনের অসাধারণ বইপ্রকাশের অনুষ্ঠান তখনও চোখের সামনে ভাসছে। বাবা মা উচ্ছ্বসিত, হুগলিতে এই ধরণের অনুষ্ঠান আগে কখনও হয়েরছে বলে তাদের জানা নেই।

ভোর ভোর উঠে বাঁধাছাঁদা শুরু। আগের বারের মতই, এই সময়টাতেও বাবা সারাক্ষণ সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, যেতে দেবার ইচ্ছে নেই, তবু যেতে দিতে হয় টাইপের একটা মনোভাব, আমাকেও, বুঝেও কিছুই বুঝি নি মুখ করে বানজি কর্ডগুলোকে শক্ত করে বেঁধে জড়িয়ে নিতে হল লাগেজের সাথে, খোলা হবে সেই বেনারসে গিয়ে।

সাড়ে ছটায় টা-টা করে বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। আজ আর শক্তিগড়ে ব্রেকফাস্ট করার গল্প নেই, সোজা আসানসোলে গিয়ে দাঁড়ানো, বিপিনের সাথে আলাপ এবং জলযোগ।

বিপিন ছেলেটি বেশ ইন্টারেস্টিং। লোনলি হাইওয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমেই আলাপ, সামনাসামনি দেখা হয় নি যদিও কোনওদিন, তবু একেবারে কতদিনের চেনা বন্ধুর মত আমাকে সময়ে সময়ে সিকিম সম্বন্ধে সমস্ত তথ্য জুগিয়ে গেছে, তার কোন বন্ধু গ্যাংটকে পৌঁছে পারমিট নিয়েছে, সেই পারমিটের ফোটোকপি হোয়াটসঅ্যাপে চেয়ে নিয়ে আমাকে ফরোয়ার্ড করে গেছে, যখন যখন পেরেছে লাচেন, লাচুং, গুরুদোংমারের সমস্ত রাস্তার বিবরণ, হোটেলের বিবরণ আমাকে পাঠিয়ে গেছে, মানে সিকিম হয় তো আমার সেইভাবে চেনা হত না, বিপিন আমাকে পরিচিত না করালে।

প্রথমে পড়তে হবে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়েতে, সেইখানে পড়ার দুটো রাস্তা – আগের বারে ভাঙাচোরা জিটি রোড ধরে পাণ্ডুয়া পেরিয়ে মেমারিতে গিয়ে এক্সপ্রেসওয়ে ধরেছিলাম, সে রাস্তায় এবারে আর যাবো না, দ্বিতীয় রাস্তাটা সুগন্ধ্যা হয়ে সিঙ্গুর পেরিয়ে – সেট যাওয়াই যায়, কিন্তু আমি বেছে নিলাম আরও শর্ট রাস্তাটাই, পরশুদিন যেখান দিয়ে এসেছি, দেবানন্দপুরের রাস্তা। ভেতরে গিয়ে দিল্লি রোড, আর সেখান দিয়ে সোজা একটা সরু রাস্তা ধরে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে।

কিন্তু ব্যান্ডেল স্টেশন পেরিয়েই পড়লাম ঝামেলায়। দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া – খেয়ালই ছিল না এ রাজ্যে বাজার বসে সকালবেলায়, পৌনে সাতটার সময়ে দেবানন্দপুরের সরু রাস্তা আরও সরু হয়ে গেছে দুদিকে সবজি আর মাছমাংসের বাজারে, কোনও রকমে অগুনতি সাইকেল, রিকশা, সুতলি বের করা নাইলনের বাজারের ব্যাগ আর অজস্র কৌতূহলী চোখ পেরিয়ে কোনওরকমে ফাঁকা রাস্তায় পৌঁছে তবে থার্ড গিয়ার নিতে পারলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যেই চাকা ছুঁল দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে। পেরিয়ে গেল মেমারি, শক্তিগড়ের সেই ল্যাংচা হাব। পেরিয়ে গেলাম বর্ধমান, এর পরেই আসার কথা পানাগড়ের। কিন্তু আগের বারের সেই পানাগড়ের রাস্তায় আর যেতে হল না, পানাগড়ের সেই বিখ্যাত জ্যামকে টা-টা করে তৈরি হয়ে গেছে পানাগড় বাইপাস, চওড়া, মসৃণ। ঠিক পাঁচ মিনিট লাগল পানাগড় পেরিয়ে আবার ন্যাশনাল হাইওয়েতে পৌঁছতে।

সুন্দর আবহাওয়া – পানাগড় এলাকায় কিছু সিআরপিএফ ক্যাম্প রয়েছে সম্ভবত, ভারত সরকারের নিয়ম অনুযায়ী তার সাইনেজগুলো হিন্দিতেই লেখা, কিন্তু এ তল্লাটে বোধ হয় হিন্দি সাইনেজও বানানো হয় খাঁটি বাঙালিকে দিয়ে – ফলে যা হবার তাইই হয়েছে, ক্যাম্প বানান লিখেছে क्याम्प। পানাগড় পেরোতেই শুরু হয়ে গেল দুর্গাপুর, আর সেখান থেকে একটু এগোতেই এল আসানসোল লেখা সাইনেজ।

বিপিনকে একবার ফোন করতে গিয়ে দেখি তিনখানা রিসিভড কল। আজ সকালের তারিখে। বিপিনই কল করেছে, কিন্তু আমি শুনতে পাই নি কেন? হেলমেটে লাগানো ব্লুটুথ রিসিভারে হাত লাগিয়ে বুঝলাম, জ্যাকটা লুজ হয়ে গেছিল। ব্লুটুথ চালু থাকায় কল রিসিভ হয়ে গেছিল পর পর, কিন্তু জ্যাকটা লাগানো না থাকায় আমি কিছুই শুনতে পাই নি। ফোন করলাম, বিপিন জানিয়ে দিল ঠিক কোনখানটায় এসে আমাকে দাঁড়াতে হবে।

ঠিক সাড়ে দশটার সময়ে নির্দিষ্ট ফ্লাইওভারের নিচে দাঁড়ালাম। বিপিনকে আবার ফোন করতেই জানাল, ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছে।

সাড়ে পাঁচ মিনিটের মাথায় একটা স্কুটি এসে দাঁড়াল আমার সামনে, এবং সেখান থেকে হাসিমুখে যে ছেলেটি নামল, তার দিকে একবার তাকালেই পরিষ্কার বোঝা যায়, হাঁটুর নিচ থেকে তার দুটো পা-ই নকল। আসল পা নেই।

ফ্লাইওভারের ঠিক নিচে মাঝবরাবর যে জায়গাটায় এসে আমি দাঁড়িয়েছিলাম, সেখান থেকে একটু এগোতেই একটা ছোট রেস্টুরেন্ট মত, সেইখানে সাদরে আমাকে নিয়ে গেল বিপিন, সঙ্গে তার দুই বন্ধু। গরমাগরম উপাদেয় খাবারের সঙ্গে জমে উঠল গল্প। বিপিনের জন্য আমার বই এনেছিলাম, হস্তান্তর করলাম, যদিও আমি বেশি উদগ্রীব ছিলাম বিপিনের নিজের গল্প শোনার জন্য।

ঘটনা দু হাজার ছয় সালের। বিপিন কলকাতায় পড়াশোনা করত, সপ্তাহান্তে বাড়ি ফিরত ট্রেনে চেপে। এই রকমই একদিন বাড়ি ফেরার পথে, শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেস থেকে নামার সময়ে কীভাবে পা হড়কে ঢুকে যায় ট্রেন আর প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে, আর সেই সময়েই ট্রেনও ছেড়ে দেয়। দুটো পা-ই সারাজীবনের জন্য হারায় বিপিন।

দীর্ঘ চিকিৎসা চলে, প্রথমে আসানসোলে, তার পরে চেন্নাইতে – টানা এক বছর ঘরবন্দী হয়ে থাকতে হয়। স্বপ্ন দেখার অফুরন্ত সময় পেয়েছিল, যন্ত্রণার সাথে অভ্যস্ত হবার সাথে সাথে। ক্রমশ কৃত্রিম পা নিয়ে হাঁটাচলা, তার পরে মোটরসাইকেলের গিয়ার ব্রেক কন্ট্রোল করার অভ্যেস।

২০১২ সালে বন্ধুদের সাথে নিজের নতুন কেটিএম মোটরসাইকেল নিয়ে বিপিন ঘুরতে যায় গয়া। সফলভাবে ঘুরে আসার পরে আর তাকে দ্বিতীয়বার ভাবতে হয় নি – এর পরে দু হাজার তেরো সালে ইস্ট সিকিম, চোদ্দতে নেপাল, আর পনেরোতে নর্থ সিকিমের সেই ভয়ংকর রাস্তা পেরিয়ে গুরুদোংমার ছুঁয়ে ফিরেছে সে। এবং, সেখানেই থেমে না থেকে দু হাজার ষোলতে সে সান্দাকফুও ঘুরে এসেছে। মোটরসাইকেল চালিয়ে।

বিপিন আমার বই হাতে পেয়ে খুব খুশি, বার বার জানাচ্ছে সে কথা, বলছে, ওর সঙ্গী যে দুজন, তারা বাংলা বলতে পারলেও আসলে হিন্দিভাষী, বাংলা পড়তে লিখতে পারে না, বিপিন ওদের পড়ে শোনাবে – কিন্তু আমার কানে ঠিক সে সব ঢুকছে না, আমার মনের মধ্যে স্রেফ তোলপাড় হয়ে চলেছে বিপিনের অধ্যবসায়ের গল্প, গল্প তো নয়, সত্যি সমস্ত। মানুষ চাইলে কী না পারে। বিপিন বলছিল – এই পা-দুটো ঠিক আরামদায়ক নয়, শস্তার পা লাগানো হয়েছিল তো, ইমপোর্টেড পা পাওয়া যায়, কিন্তু সে অনেক অনেক খরচার ব্যাপার। বাবুল সুপ্রিয়দা-কে টুইট করে বলেছিলাম আমার কথা, বলেছিলাম সাহায্য করার জন্য, উনি বলেওছিলেন দেখবেন, কিন্তু আজ পর্যন্ত কিছু হয় নি, বুঝলে? তুমি একটু দ্যাখো না দাদা, তুমি তো দিল্লিতে থাকো, ওখানে কোনওভাবে কিছু করা যায় কিনা, আমার জন্য একটু সাহায্য পেলে আমি ভালো পা লাগিয়ে আরও বড় বড় ট্রিপে যেতে পারি। আমার নিজের তো অত পয়সা নেই।

দিল্লিতে থাকি ঠিকই, কিন্তু আমার সত্যিই তো সে রকম কোনও কনট্যাক্ট নেই – আমি কিছুই করতে পারি নি বিপিনের জন্য, তবে সে জন্য ওর সাথে আমার যোগাযোগ নষ্ট হয় নি আজও, বিপিন এখন লম্বা ট্রিপের প্রস্তুতি করছে ওর বর্তমান পা নিয়েই, তাই নিয়ে মাঝেমধ্যে ফোনে কথাবার্তা আজও চলে।

সাড়ে এগারোটা নাগাদ বিদায় নিতে হল। তার আগে অবশ্য মোবাইলেই ছোট করে ছবি-সেশন হল, আমার মোটরসাইকেলে ইঞ্জিন অয়েল টপ আপ করা হল। আমি আবার যাত্রার জন্য তৈরি।


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/04/20171105_112731.jpg

চাকা একটু গড়াতেই ঢুকে গেলাম ঝাড়খণ্ডে। অপূর্ব সুন্দর এই একটা রাজ্য, ছোটনাগপুর মালভূমির ইতিউতি ছোট ছোট পাহাড়, তালগাছের সারি, অপূর্ব সুন্দর কুঁড়েঘরের বিন্যাস, আর জায়গায় জায়গায় গতজন্মের চেনা পরিচিত সেইসব নামের সাইনবোর্ড, তালসারি, ঝুমরি তালাইয়া, দুমকা, গিরিডি – তাদের মাঝখান দিয়ে আমি ফিরতে লাগলাম।

এ পথে আমার তৃতীয়বার যাত্রা, মোটরসাইকেলে প্রথমবার। আবহাওয়া না-গরম না-ঠাণ্ডা বলে চলতে এতটুকুও অসুবিধে হচ্ছে না। দুটো নাগাদ গিরিডিতে পৌঁছলাম, সেই চেনা জায়গা, আগের বারে কলকাতা সফরে যাওয়া এবং আসার সময়ে যেখানে আমরা লাঞ্চ করেছিলাম, সেই অশোকা হোটেল অ্যান্ড রিসর্ট পেরিয়ে এলাম। ঢুকব কিনা ভাবতে গিয়েও আর ঢুকলাম না, এত বেশি খেয়েছি আসানসোলে, পেট এখনও ভর্তি। বরং একেবারে টেনে দিই, বেনারসে পৌঁছেই ডিনার করব। রাস্তায় খিদে পেলে একটা বিস্কুটের প্যাকেট আছে আর মা খানিক চিড়েবাদামভাজা ভরে দিয়েছে হরলিক্সের কৌটোতে – সেসব দিয়ে চালিয়ে নেওয়া যাবে।

ডেহরি অন শোন ব্রিজের ওপর বিকেল হল। সূর্যটা কমলা থেকে টকটকে লাল হয়ে আশ্রয় নিতে গেল শোন নদীর বেডে। আমি তিরিশ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে দেখলাম সে দৃশ্য। শিল্যুয়েটের মত সারি সারি ট্রাকের দল নেমে এসেছে নদীর বুকে, বালি খুঁড়ে তুলছে, গোধূলির আলোয় তাদের দেখাচ্ছে সারি সারি পিঁপড়ের মত।


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/04/20171105_164914.jpg

বিহার এখনও একশো কুড়ি কিলোমিটার মত, তার পরে উত্তরপ্রদেশে ঢুকব। সাসারামে দাঁড়াতে হল পেট্রল ভরার জন্য, এবং মোটামুটি পৌনে আটটা নাগাদ বেনারসে ঢুকলাম। ঢোকামাত্র সেই তীব্র হর্নের দাপট, উন্মাদের মত ট্র্যাফিক এবং অসভ্যের মত গাড়ি চালানো ড্রাইভারেরা হুড়মুড়িয়ে সে পড়ল আমার সামনে। আস্ত একটা প্রাচীন শহরের প্রায় সমস্ত লোক যে আজও এতটা নোংরা, অসহ্য, আনসিভিলাইজড অবস্থায় বেঁচে থাকতে পারে, এ বেনারসে না গেলে বোঝা যায় না।

জিপিএসের ভুলে প্রথমে ভুল করে বেনারস থেকে বেরিয়ে চলে গেছিলাম সারনাথের রাহী ট্যুরিস্ট বাংলোতে – আমার বুকিং আছে বেনারসের রাহী ট্যুরিস্ট বাংলোতে – প্রতিবারের মতই। দুটোর মধ্যে দূরত্ব ছ-সাত কিলোমিটারের, কিন্তু যে কারণেই হোক, জিপিএস চুজ করেছিল সারনাথেরটা। যাই হোক, আবার ম্যাপ রিসেট করে বেনারস ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনের ঠিক সামনে প্রতাপ হোটেলের পাশ দিয়ে গলিটা চিনে ফেলতেই বাকিটা আর চেনার দরকার পড়ল না। আমার চেনা জায়গা। নটা বাজল চেক ইন সেরে ঘরে ঢুকতে। সেখানে বোধ হয় আজ কোনও নেতামন্ত্রীর কারুর বিয়ের অনুষ্ঠান। সামনেটা বেলুনের গেট দিয়ে সাজানো, চারপাশে অজস্র কারবাইনধারী নিরাপত্তারক্ষী ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদেরই গাড়ির ফাঁকে মোটরসাইকেলটা গুঁজে দিয়ে আমি লাগেজগুলো খুলে নিয়ে ঘরে ঢুকলাম। এইবারে তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়া সেরে নিই, কাল সক্কাল সক্কাল বেরিয়ে পড়তে হবে।

৬ই নভেম্বর, অষ্টাদশ দিন

“মহাভারতের তো একটা ভার্সন নেই, এ নিজেই এত বড় একটা কাব্য, উত্তরভারতের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে এর গল্পগাথা। আর উত্তর ভারতে, হিমালয়ের কোল ঘেঁষে প্রায় প্রত্যেকটি গ্রামে, প্রত্যেকটি ছোট জনপদে তুই শুনতে পাবি এমন কিছু উপকাহিনি, যাদের চরিত্রদের লিঙ্কেজ করে রাখা আছে মহাভারতের চরিত্রদের সাথে। মান্যতা পাবার প্রচেষ্টা। মহাভারতের গল্প উচ্চবর্ণের কাহিনি, সেখানে অন্ত্যজ, সাবঅল্টার্নরা এসেছে, গেছে পার্শ্বচরিত্র হিসেবে, তাদের দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে গেছে রাজতন্ত্র আর নিজেরা নাম কিনেছে ধর্মের ধ্বজাধারী হিসেবে। কেউ খোঁজ রাখে নি, পঞ্চপাণ্ডব আর কুন্তীর বদলে যে দলিত রমণী আর তাঁর পাঁচ ছেলেকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল বারণাবতের জতুগৃহে, তাদের দোষ কী ছিল, তাদের নিকটআত্মীয়কে কিছু ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা কখনও করা হয়েছিল কিনা। এই পুড়িয়ে মারার কৌশল কার মাথা থেকে বেরিয়েছিল? বিদুরের, যিনি কিনা স্বয়ং ধর্মের অবতার।

কিংবা ধর খাটুশ্যামের গল্প। এমনি বাঙালি যে কাউকে জিজ্ঞেস করে দ্যাখ খাটুশ্যাম কে – কেউ বলতে পারবে না। কিন্তু রাজস্থানে চলে যা – দেখবি সীকর এলাকায় রমরমিয়ে চলছে খাটুশ্যামজীর মন্দির। এই একই দেবতাকে গুজরাতে পুজো করা হয় বালিয়াদেব নামে।

কে এই খাটুশ্যাম? তিনি ভীমের নাতি। ঘটোৎকচের পুত্র। কথিত আছে, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শুরু হবার আগে নিজের নাতিকে বলিদান দিয়েছিলেন মধ্যম পাণ্ডব স্বয়ং, পাণ্ডবপক্ষের জয় সুনিশ্চিত করতে। একা কৃষ্ণের উপস্থিতি হয় তো যথেষ্ট কনফিডেন্স জোগাতে পারে নি তাঁর মনে। অন্য আরেকটি ধারার গল্প অনুযায়ী, অন প্রিন্সিপল তিনি পরাজিত পক্ষের হয়ে যুদ্ধ করতেন, ফলে পাণ্ডববপক্ষের হাতে তাঁর মৃত্যু হয়ে উঠেছিল অবশ্যম্ভাবী।

স্কন্দপুরাণে এঁর একটা পাসিং রেফারেন্স আছে, কিন্তু মহাভারতের প্রচলিত ভার্সনে খাটুশ্যামের দেখা কোথাও পাওয়া যায় না, ফলে এটা মনে করা যেতেই পারে, লোকায়ত দেবতা স্থানীয় গল্পগাথার মাধ্যমে মহাভারতের চরিত্রদের মধ্যে নিজের লিনিয়েজ তৈরি করে নিয়েছে সময়ের সাথে সাথে। এক সময়ে যে রকম অনার্য কালী দুর্গা মনসা ইত্যাদিদের বিভিন্ন পুরাণের মাধ্যমে, বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যের মাধ্যমে বৈদিক দেবদেবীদের সাথে এক আসনে বসিয়েছিল লোকায়ত সংস্কৃতি। এই মিশ্রণ চলতেই থাকে। সাবঅল্টার্ন কালচারের মেনস্ট্রিমের সাথে মিশবার প্রচেষ্টা, কিংবা উল্টোটা। সংস্কৃতির আত্মীকরণ।

বিরাট রাজার গল্পটাও অনেকটা এই রকমের। সত্যি সত্যি বিরাট রাজ্য কোথায় ছিল তাই নিয়ে একটু গুগল ঘাঁটাঘাঁটি করলেই জানা যায়, মহাভারতের মাধ্যমে আমরা যেটুকু জানি, বিরাটরাজার ছিল বিশাল বড় গোয়াল, প্রচুর গরু, সম্ভবত সেটাই ছিল তাঁর আয়ের উৎস, অতিথিবৎসল ছিলেন তিনি, পাণ্ডবদের না চিনেই এক বছর তাঁর রাজত্বে তিনি তাঁদের প্রতিপালন করেছিলেন, অবশ্য পরিবর্তে ডাকাতদের হাত থেকে তাঁর গোশালার গরুদের উদ্ধার করে দেন বৃহন্নলারূপী অর্জুন, এবং সৈরিন্ধ্রীর দিকে নোংরা হাত বাড়ানোর ফলস্বরূপ তাঁর শ্যালক কীচককে খুন করেন পাচকরূপী ভীম। এর বেশি কিছু জানতে পারি কি আমরা বিরাটরাজা সম্বন্ধে? রাজা হিসেবে কেমন ছিলেন? তাঁর রাজত্বে প্রজারা কেমন ছিল? মহাভারত তো প্রজাদের ভাষ্য লেখে নি। শোন তা হলে সেই গল্প।

আমি তখন সাইকেল চালিয়ে চলেছি দেহ্‌রাদুন থেকে যমুনোত্রীর পথে। রাস্তায় পড়ে কালসি বলে একটা জায়গা। সেখানেই রাত্রিবাস। ছোট্ট হোটেল, হোটেল না বলে হোমস্টে বলাই ভালো, ভাগ্নে চালায়, মামা দেখভাল করেন। যমুনা ঠিক সেইখানটিতেই পাহাড় থেকে নেমে এসেছে সমতলে। গাঁয়ে ইলেকট্রিসিটি নেই, হ্যারিকেনের আলোতে বসে রুটির সাথে তরোইয়ের সবজি চিবোচ্ছি। কিন্তু সারাদিন সাইকেল চালিয়ে এসে কি আর ভ্যাজ মুখে রোচে? দোনামোনা করে তাই পেড়েই ফেললাম কথাটা – ভাগ্নের কাছেঃ সুনা হ্যায় পাহাড় কি বকরি কি মীট বহোত স্বাদিষ্ট হোতি হ্যায়? আপ লোগ বনাতে নেহি?

দপ করে নিভে গেল আলো; না, হ্যারিকেনের নয়। হোটেল মালিকের ভাগ্নের মুখের। পেছনে গৃহদেবতার সান্ধ্যপূজারত মামার দিকে চট করে এক বার চেয়ে নিয়ে, প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল, আপনি বাইরের লোক। আমরা এ সব মুখেও আনি না। মামা যেন না শোনে।

অপ্রস্তুত আমি, তড়িঘড়ি বললাম, সরি, আমি ভেবেছিলাম পাহাড়ের লোক ননভেজ খায়।

– খাই, খাই। সেটা কথা নয় – কিন্তু ছাগল নয়। আপনারা সমতলের হিন্দুরা যেমন গোরু খাবার কথা ভাবতে পারেন না, গোরুকে ‘মা’ বলেন, আমরা এই জওনসার ভাবর এর লোকেরা তেমনই চোখে দেখি ছাগলকে। ছাগল আমাদের মা। গোরু নয়।

গরু সম্পর্কে আমার নিজস্ব খাদ্যস্পৃহা আর ব্যক্ত করতে গেলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, জওনসার ভাবর-টা কী?

– কেন, এই জায়গাটা, এটাই তো জওনসার ভাবর!

এবার চমকাবার পালা আমার – এটা, এই জায়গাটা কালসী নয়!

– আরে এটা তো এখনকার নাম। আসলে জওনসার ভাবর। আমরা সব জওনসার এর ‘জন’। আমি সামান্যই জানি। মামাকে জিজ্ঞেস করুন। উনি অনেক গল্প জানেন।

দেখলাম মামাবাবু পূজা শেষ করে কাছে এসে বসলেন উল্টো দিকের বেঞ্চিতে। সামান্য নীরবতার সুযোগে নিজেকে তৈরি করে নিয়ে মুখ খুললেন তিনি, – গল্প নয়। আমাদের জনের ইতিহাস। সমতল থেকে রাজাদের আসার আগের ইতিহাস।

আমি তখন কোথায়! তরোইয়ের সব্জি থালাতে শুকোচ্ছে।

জিজ্ঞেস করলাম, তার আগে আপনাদের নিজেদের রাজা ছিলেন?

বহিরাগতের সামনে মনের বিরক্তিটুকু মামাবাবু মুখে ফুটে উঠতে না দিলেও, তার রেশটুকু লুকোতে পারলেন না। বললেন, – জনের কোনো রাজা হয় না। রাজার অধীনতা জন কখনওই মন থেকে মেনে নেয়নি। জন বরাবর স্বাধীন ছিল। নিজেদের শাসক তারা নির্বাচন করতেন। এখন যেমন আপনারা ইলেকশনে করেন।

আমি তখন শুধুই দুটো কান। পেছনে সদ্য সমতল ছোঁয়া উচ্ছ্বসিত যমুনার কল্লোল, আর সামনে এই অশীতিপর বৃদ্ধের ন্যারেশন। বৃদ্ধ বলে চলেছেন, – আমাদের এই জওনসার ভাবরে কখনো দুঃখ আর দারিদ্র ছিল না। আমাদের প্রাচীন পূর্বজরা গরু, মহিষ পালন করতেন। পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে সমতলে যা শস্য জন্মাত, দুধ, দই, পনীরের সাথে তা আমাদের ভাঁড়ার উপচে পড়ত। আর সেটাই হল আমাদের কাল। রাজস্বের লোভে অত্যাচারী রাজা বিরাট, তার সেনা নিয়ে হাজির হলেন জওনসারের দ্বারে।

(পাহাড়ের অন্তর্বর্তী স্থানগুলিতে প্রবেশের যে ফাঁক গুলো থাকে, তার নাম দ্বার; যেমন কি না, কোটদ্বার, হরিদ্বার, আলিপুরদুয়ার ইত্যাদি)

তিনি বলে চলেছেন, – জন তার সাধ্যমত লড়লেন। কিন্তু রণকৌশলী বিরাট রাজার সেনাবাহিনির সমান কুশলতা তাঁদের ছিল না। আক্রমণ করে রাজা বিরাটের সেনাকে পর্যুদস্ত করার রণকৌশল তারা জানতেন না। অসংখ্য মৃত্যুর পর তাঁরা হার স্বীকার করলেন। করতে বাধ্য হলেন। রাজা বিরাটের রাজপ্রতিনিধিরা গ্রামে গ্রামে স্থাপিত হল রাজস্ব আদায়ের জন্য। এর আগে জন-এর কোনও রাজস্ব ছিল না।

গ্রামে গ্রামে পরিবার পিছু গরু, মহিষ, আর জমির ভিত্তিতে রাজস্ব নির্ধারিত হল। প্রতিদিন সকালে রাজার লোক এসে নিয়ে যেত দুধ, দই, পনীর। তার বেশিরভাগ পথেই নষ্ট হত। তবু, সেটাই ছিল নিয়ম।

এক দিকে প্রচুর খাবার নষ্ট হচ্ছিল আর অন্য দিকে দারিদ্র্য ছেয়ে যাচ্ছিল জওনসারে। যার কোনো গবাদিপশু কিংবা জমি ছিল না, তাকে কাজ করতে হত, কায়িক শ্রম দিতে হত রাজার জন্য, বিনা পয়সায়; সেটাও রাজস্ব।

জওনসারের এক গ্রামে এক মহিলা ছিলেন। তাঁর স্বামী মারা গিয়েছিলেন যখন, মহিলা ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। মৃত্যুর আগে তার স্বামীর শ্রমে চলত রাজস্বপ্রদান। স্বামীর মৃত্যুতে রাজস্ব বন্ধ হওয়ায় রাজকর্মচারী হানা দেয় তাঁর ঘরে। সেই নারীর তখন কোলে সদ্যোজাত শিশু। কাকুতি মিনতি, ক্ষমা ভিক্ষা, কোনো কিছুতেই টলে না রাজকর্মচারী। আদেশ হয়, যদি শ্রম বা গবাদিপশুর দুগ্ধজাত না পাওয়া যায়, তবে ঐ নারীর বুকের দুধ নিয়ে যাওয়া হোক রাজার জন্য। তাই হয়।

কথিত আছে, রাজা বিরাট সেই দুধ পান করেন। এরপর আসে আরো ভয়াবহ আদেশ। রাজাদেশ হয়, কোনও সদ্যোজাত শিশু আর তার মায়ের বুকের দুধ খেতে পাবে না। শিশুর মায়ের বুকের দুধে রাজার অধিকার। শক্ত চামড়ার বক্ষস্ত্রাণ তৈরী হয়, তালা চাবি সহ। সন্তান জন্মাবার খবর পাওয়া মাত্র রাজার লোক এসে সে জিনিস পরিয়ে দিয়ে যেত শিশুর মায়ের বুকে। প্রতিদিন সকালে আসত রাজকর্মচারী। সংগ্রহ করে নিয়ে যেত মায়ের বুকের দুধ।

ফল হয় আরও সাঙ্ঘাতিক। এবার গ্রামে গ্রামে মরতে শুরু করল নবজাত। কান্নার রোল উঠল জওনসার ভাবরের ঘরে ঘরে।

তখন জনের লোকেরা নবজাতকের প্রাণ বাঁচাতে পথ খুঁজতে লাগলেন। ঠিক হল, পাহাড়ি বুনো ছাগল পোষ মানিয়ে তার দুধ খাওয়ানো হবে নবজাতককে। সে কথা গোপন রইল রাজার কাছে। শিশু বাঁচলো। জওনসার বাঁচলো। সেই থেকে পাহাড়ী বুনো ছাগল জওনসারের মা।

– তারপর?

– সে সময় পাণ্ডবরা এসে আশ্রয় নিয়েছে রাজা বিরাটের কাছে। অজ্ঞাতবাস। পাণ্ডবদের নির্দেশনায় তৈরি হচ্ছে বিরাটের দুর্গ আর প্রাসাদ। জওনসারের গ্রামে গ্রামে যে মাত্র কর্মক্ষম, বিনা পারিশ্রমিকে শ্রমদানের জন্য তাদের সবাইকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে রাজরক্ষী। জওনসারে হাহাকার। জওনসারের জন তখন একসাথে প্রার্থনায় বসেন দেবতার। পাহাড়ের দেবতা, কাশ্মীরের রাজা ছিলেন তিনি। প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে তিনি এসে পৌঁছলেন জওনসারে। জন তার পায়ে কেঁদে পড়লেন। দেবতা আদেশ দিলেন এক ঢোলক বানাতে। ঢোলক তৈরি হল।

– তারপর?

– তারপর, রাত্রি নামলে দেবতা আদেশ দিলেন দুর্গ আক্রমণের। জনের লোক দুর্গ আক্রমণ করলেন। আর দেবতা সেই ঢোলক নিয়ে বাজাতে শুরু করলেন তাঁর জাদুর বাজনা।

হয়েছিল কী, যে গরু আর মহিষের দুধ রাজস্ব হিসেবে বিরাটের লোকেরা নিয়ে যেতেন, তারা চরত পাইনের জঙ্গলে। পাহাড়ি ঘাসের সাথে পাইনের বীজ চলে যেত তাদের পেটে। সেই পাইনবীজের তত্ত্ব মিশে ছিল সেই দুধে। নগরে রাজার লোক আর সেনা খেত সেই দুধ। দুর্গপ্রাকার আর নগরের প্রাসাদসমূহের পাথরের নিচেও চাপা পড়ে ছিল পাইনের বীজ। দেবতার জাদু বাজনার ছন্দে ছন্দে ভাঙ্গল সেই বীজের ঘুম। আর দুর্গপ্রাকার, প্রাসাদ, সেনাদের, এবং রাজার শরীর ছিন্ন ভিন্ন করে বেরিয়ে এল পাইন গাছ। বিরাট রাজার পতন হল। জওনসার আবার মুক্ত হল।”

কথা হচ্ছিল লখনউয়ের দস্তরখ্বান রেস্তোরাঁতে বসে, সুকান্ত দাসের সঙ্গে। সেই সুকান্তদা, যার নম্বর নিয়ে এসেছিলাম স্বরাজের কাছ থেকে।

কথা হয়ে গেছিল আগের দিনেই। প্ল্যান সামান্য বদলে ফেলেছিলাম তাই। বেনারস থেকে একটানে দিল্লি যাবার মূল যে রাস্তাটা, এলাহাবাদ কানপুর ইটাওয়া হয়ে, সেটা বদলে নিজেকে সক্কাল সক্কাল নিয়ে যাচ্ছিলাম লখনউয়ের রাস্তায় – গুগল ম্যাপের হিসেবে দুই দিকের দূরত্বের তফারেন্স মাত্র তিরিশ কিলোমিটারের। একদিকে আটশো কুড়ি, অন্যদিকে আটশো পঞ্চাশ। তা তিরিশ কিলোমিটার বাড়তি চলার সুবাদে দুটো জিনিস হয়ে যাবে, সুকান্তদার সাথে একটা ছোট করে আড্ডা, আর তার পরে লখনউ থেকে সোজা আমার বাড়ি পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে ননস্টপ, একটানা আশি নব্বইয়ের স্পিডে বেরিয়ে আসতে পারব। আসার সময়ে লখনউ এক্সপ্রেসওয়ে দেখে আমার এত ভালো লেগে গেছে, যে সে রাস্তা ছেড়ে আর কানপুর ইটাওয়ার রাস্তা নিতে আমার ইচ্ছে করছিল না।

বেনারস থেকে সকাল ঠিক সাড়ে ছটায় বেরিয়ে পড়েছিলাম, ম্যাপ ধরে ধরে এগোতে হচ্ছিল ভেতরের রাস্তা ধরে, লখনউ হাইওয়েতে পড়ার আগে। অশ্বরী, মড়িয়াহু ইত্যাদি অদ্ভুত সব নামের জায়গা পেরিয়ে বেলা নটা নাগাদ যখন এক নাম না জানা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি, হেলমেটের ভেতর থেকে ব্লু-টুথে কুড়কুড় করে বেজে উঠল ফোন, কুমার কৌস্তুভ রায় – তুমি কি মোটরসাইকেল চালাচ্ছো? আমি কি পরে ফোন করব?

বললাম, না না, আমি চালাতে চালাতেই কথা বলতে পারব, বলুন।

অতঃপর উনি কানে মধু ঝরালেন – ভাই, তোমার বইটা কাল আমি এক সিটিংয়ে বসে শেষ করে ফেলেছি, কী লিখেছো বস, মানে একটাই অভিযোগ, বড্ড বেশি ভালো হয়ে গেছে। আমি শেষ না করে উঠতেই পারলাম না, এত ভালো লিখলে টিখলে তো আমাদের লেখা আর কেউ পড়বে না হে –

ফোনের মাধ্যমেই যতটা দাঁত দেখানো সম্ভব ততটা দেখিয়ে আমার ভালোলাগা জানালাম। ভালো কথা শুনতে বেজায় ভালো লাগে, শেষদিনের জার্নি আর ততটা ক্লান্তিকর লাগে না, অবিশ্যি ক্লান্তি আমার এমনিতেও আসে নি।

খানিক বাদে একটা প্রমিনেন্ট মোড় এল, তার নাম মছলি শহর। সেখান থেকে বাঁদিকে বেঁকে আবার চলা। এমনিতে বেনারস থেকে লখনউ মাত্রই তিনশো দশ কিলোমিটার, কিন্তু পুরো রাস্তাটাই বিভিন্ন লোকালয়ের মধ্যে দিয়ে চলেছে, মাঝে মধ্যে একটা দুটো চওড়া টোল রোড। মছলি শহরের পরে টোল রোড শুরু হল – পেরিয়ে গেলাম রাণীগঞ্জ, মোহনগঞ্জ ইত্যাদি এলাকা। মধুপুরী বলে একটা জায়গায় এসে টোল রোড শেষ হল, ঢুকলাম রায়বেরিলীতে। এখান থেকে বোধ হয় চেনা রাস্তা, এদিক দিয়েই এসেছি।

রায়বেরিলী সনিয়া গান্ধীর নির্বাচনী ক্ষেত্র, এখানে রাস্তার মোড়ে মোড়ে কংগ্রেসের চাষ হয়, মাঝেমধ্যেই চোখে পড়ছিল ইন্দিরা গান্ধী বা রাজীব গান্ধীর অদ্ভূতদর্শন মূর্তিরা।

রায়বেরিলীর পর বছরাওয়াঁ, এবং তার পরেই লখনউয়ের আউটস্কার্ট – মোহনলালগঞ্জ। সুকান্তদাকে বলাই ছিল – আরেকবার ফোন করে আমি এগোতে থাকলাম, একটু অপরাধবোশ কাজ করছিল যে না, তা নয়, আমি ফিরছি কাজের দিনে, আজ সোমবার, কাউকে তার অফিস থেকে টেনে আনা স্রেফ “দেখা” করব বলে – পরে বুঝেছিলাম, সেদিনের সেই দেখা হওয়া আমার কাছে কতটা মূল্যবান ছিল।

লখনউয়ে ঢোকার মুখেই বড়সড় হসপিটাল এসজিপিজিআই – সঞ্জয় গান্ধী পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ইনস্টিট্যুট অফ মেডিকাল সায়েন্স। সেই মেডিকেল কলেজের সামনে একটা বাসস্ট্যান্ডের কাছে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম।

খানিক বাদেই যে লোকটা বুলেটে করে এসে আমার কাছে এসে দাঁড়াল, আর হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে বলল – আরে, এসে গেছিস? – আমি তাকে কলেজে কখনও দেখেছি বলেই মনে করতে পারলাম না। আমার এমনিতে এই ব্যাপারে স্মৃতিশক্তি খুব খুব কম, আমি লোকের মুখ একেবারে মনে রাখতে পারি না, তাও এতটা বিস্মৃতি আমি আশা করি নি নিজের কাছে। তবুও, ব্যবহারে এতটুকুও মনে হল না সুকান্তদা আমার অপরিচিত। ঠিক কলেজে হস্টেলে যেভাবে কথাবার্তা হত, সেইভাবেই বলল, চল তা হলে কোথাও একটা গিয়ে বসি।


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/04/sukanta-das.jpg

আমার সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয় নি, খিদে পেয়েছে প্রচণ্ড, আর লখনউতে দাঁড়িয়ে কেউ যদি সেই সময়ে খাবার প্রস্তাব দেয়, তা হলে কি আর না করা যায়? বুলেটের পিছু নিলাম। লখনউ শহর চিরে আমরা এগোলাম।

সুন্দর সাজানো গোছানো শহর লখনউ। এটা বোধ হয় লখনউয়ের নতুন এলাকা। চওড়া রাস্তাঘাট, বড় বড় রাউন্ডঅ্যাবাউট, দিল্লির থেকে কোনও অংশে কম নয়। … সে সব পেরিয়ে আমরা ঢুকলাম ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়, আর সে সবও পেরিয়ে আমরা এলাম লখনউয়ের আরেকটা দিকে, রাস্তার একদিকে হিন্দুস্তান এরোনটিকস লিমিটেডের লম্বা পাঁচিল, মাঝখান দিয়ে ব্যারিকেড করা, লখনউ মেট্রোর কাজ চলছে, আর রাস্তার অন্যপ্রান্তে গিয়ে আমরা থামলাম একটা মার্কেট কমপ্লেক্সের মধ্যে।

না, টুন্ডে কাবাবি টাবাবি নয়, দস্তরখ্বান। লখনউয়ের নামকরা রেস্তরাঁর চেন। সেইখানে বসে খাবারের অর্ডার দিয়ে সুকান্তদা খুলল তার অভিজ্ঞতার ঝাঁপি।

কয়েকজন বন্ধুর সাথে কয়েক বছর আগে সুকান্তদা গেছিল লখনউ থেকে ব্যাঙ্গালোর, সাইকেল চালিয়ে। মধ্যপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশের বিভিন্ন গ্রামের মধ্যে দিয়ে। বিভিন্ন গ্রামে রাত কাটিয়েছে, এমন লোকের সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলার অভিজ্ঞতা হয়েছে যিনি নিজে হয় তো এক সময়ের তেলেঙ্গানা বিপ্লবে জড়িত ছিলেন। এমন লোকের সঙ্গে কথা বলেছে যার নিজের জমি জিরেত উন্নয়ন শিক্ষা সম্পদ বলতে কিচ্ছু নেই, কিচ্ছু না। একদিকে ঝাঁ চকচকে ড্যাম, আলোয় মোড়া সেতু, তার পাশে মাইলের পর মাইল রুক্ষ বানজারা জমি, জল পৌঁছয় না সেখানে, মাঠের ঘাস জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে গেছে। চাষ হয় না। শহরের প্রান্তে এমনি গ্রাম পেরিয়েছে, সমতল ভারতের সে গল্পও কম রোমহর্ষক নয়।

হায়দরাবাদের কাছেই কোথাও হয় তো সে গ্রাম। সুকান্তদার সহযাত্রী, বা কো-রাইডারের বাইসাইকেলের স্পোক ভেঙে গেছিল। ফলে সামান্য ডিট্যুর করে সেই গ্রামে ঢুকতে হয়। সেখানে সাইকেলের মেকানিক ছিল, সাথে ছিল একটি ছোট চায়ের দোকান।

“যে সময় স্পোক চেঞ্জ হচ্ছিল, গ্রামের লোক আমাদের স্টিলের গ্লাসে ফিল্টার কফি আর ইডলি চাটনি খেতে দিয়েছিল। প্রশ্নের পর প্রশ্ন আর উত্তরের পর উত্তর। এর মধ্যে আমি একটু এদিক ওদিক হেঁটে বেড়াতে গিয়ে দেখি, খানিক দূরেই, একটা ছোট্ট বেদীর সামনে তালঢ্যাঙা একটা বাঁশের মাথায় উড়ছে লাল পতাকা। ঠা-ঠা রোদ্দুরে পাশে বসে দুই অশীতিপর বৃদ্ধ। … আমার সাথী ফোর্স ব্যাকগ্রাউন্ডের লোক। এসব ব্যাপারে তার উৎসাহ নেই। আমিই কৌতূহলবশত কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে এক বৃদ্ধ জানালেন, এক সময়ের লাল পার্টির কৃষক বিদ্রোহের অনুসারীরা ঐ পতাকা উড়িয়েছিলেন, এবং এখনো ওঁরা ওড়ান। তাঁদের কাছেই শুনলাম বিদ্রোহ ব্যর্থ হবার পর সেই সময়ে ব্যপ্ত হতাশার কথা। ওঁরা জানিয়েছিলেন, যখন অস্ত্র সমর্পণ করার নির্দেশ আসে, বিদ্রোহীদের অনেকেই অস্ত্র সমর্পণ না করে গর্ত খুঁড়ে লুকিয়ে ফেলেন, যদি কখনো আবার ডাক আসে সেই জন্য। আর নিয়ম করে লাল ঝাণ্ডাটা আজও বাঁশের মাথায় উড়িয়ে দেন তাঁরা।”

সব হারানোর এই সময়ে নিজের বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার এ গল্পও কম মন ছুঁয়ে যায় না। …আবার পাহাড়ের গল্পও শুনলাম, সেই জওনসার ভাবরের গল্প তো ওপরে লিখেইছি।

নিজেকে যখন জিজ্ঞেস করি, এই যে বেরিয়ে পড়ি, কখনও লাদাখ যাচ্ছি, কখনও সিকিম – কী দেখি? পাহাড়? বরফ? উঁচু উঁচু পাস? স্থাপত্য?

চোখ বুজলে ফিরে আসে – না, গুরুদোংমার লেক নয়, খারদুং লা পাস নয়, আমার স্মৃতিতে বারবার ফিরে আসে সেইসব মানুষেরা – লাদাখ ডিসকিটের সেই বয়স্ক লামা, যিনি আমার স্ত্রীর ঘড়ির ব্যান্ডে পিন লাগিয়ে দেবার বদলে একটা পয়সাও নেন নি, মঙ্গনের সেই সুনীল – সিকিমের প্রেমে পড়ে যে আইবিএমের লোভনীয় চাকরি এক কথায় ছেড়ে চলে এসে নিজের ধাবা খুলে সেখানে আলু পরোটা বানায় খুশি মনে, লাচেনের ছিরিন, জয়গাঁওয়ের সমীরণ – আমি দেখি মানুষ। রত্নের মত জ্বলজ্বলে সেইসব মানুষেরা, যারা এত দূষিত, এত কলূষিত পৃথিবীতেও হার মানে নি, হার মানে না, যারা আমাকে বেঁচে থাকার শক্তি জোগায়, যারা আমাকে পথ চলার অনুপ্রেরণা জোগায়, আমি রাস্তায় নামি সেই মানুষদের দেখতে। এই বিপিন, এই সুকান্তদা, তার চোখ দিয়ে দেখা জওনসর ভাবরের সেই মামা, ইওরোপ থেকে সাইকেল চালিয়ে ভারতে পাড়ি দেওয়া জয়াদি – আমার সেই জমানো রত্নের টুকরোটাকরা, আমার পজেশন, হীরের চেয়েও দামী এইসব মানুষদের কুড়িয়ে নিতেই আমি পথ চলি।

কথায় কথায় কখন বিকেল চারটে বেজে গেল, খেয়াল করি নি। এবার তো উঠতে হবে। এবার ননস্টপ যাত্রা – বাড়ি পর্যন্ত, পাঁচশো তিরিশ কিলোমিটার অ্যাপ্রক্সিমেটলি। একঘেয়ে কিন্তু দারুণ চমৎকার এক্সপ্রেসওয়ে।

এবং, মাথার পেছনে যে জিনিসটা সব সময়ে কাজ করছে, সেটা হল, এই পুরো লখনউ আগ্রা এক্সপ্রেসওয়েতে তিনশো দুই কিলোমিটার, এবং তার পরে আগ্রা থেকে যমুনা এক্সপ্রেসওয়ের প্রথম সত্তর কিলোমিটার, সবশুদ্ধ তিনশো বাহাত্তর কিলোমিটার কোথাও কোনও পেট্রল পাম্প নেই। সুতরাং, আমার জেরিক্যান এবং মোটরসাইকেলের ট্যাঙ্ক, দুটোই ভরে নিয়ে এগোতে হবে।

দস্তরখ্বানের থেকে একটু এগোতেই পেট্রল পাম্প, সেখানে ট্যাঙ্ক ফুল করলাম আর একটা জেরিক্যান ভরে নিলাম। আমার মোটরসাইকেলের ফুল ট্যাঙ্কে সাড়ে তিনশো কিলোমিটার চলে, আর পরে আরও পাঁচ লিটার তেলে, অ্যাভারেজ তিরিশ কিলোমিটার মাইলেজ ধরলে, চলবে আরও দেড়শো কিলোমিটার।

পেট্রল ভরছি, সেই সময়ে এক অতি কৌতূহলী মোটরসাইকেলওয়ালার জিজ্ঞাসা – আপ ইতনা সামান লেকে কেয়া কোই মিশন পে নিকলে হো? কাঁহা হ্যায় আজ রাত কা ঠিকানা?

আমার চোখ বাদে বাকি পুরোটাই মাস্কে ঢাকা, মুচকি হাসিটা তাই দেখা গেল না, বললাম, আজ রাতকো তো ঘর জানা হ্যায়।

সুকান্তদা আমাকে এক্সপ্রেসওয়ের মুখ পর্যন্ত এগিয়ে দিল, বাকি পথটা আমাকে জিপিএসই দেখিয়ে দেবে। লখনউ এক্সপ্রেসওয়ের প্রথম কিলোমিটারটা যখন পার করলাম, তখন ঘড়িতে বাজে সাড়ে পাঁচটা, সূর্য ডুববে একটু বাদেই। চট করে দাঁড়িয়ে বাড়িতে সিকিনীকে ফোন করে দিয়ে বললাম, আমার ফিরতে রাত হবে, সবে লখনউ থেকে স্টার্ট করেছি। হয় তো রাত বারোটা মত বাজবে।


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/04/dsc_0390.jpg


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/04/dsc_0393.jpg

শুরু হল একটা একটা করে কিলোমিটার পেরনো। আর কিছু দেখার নেই, আর কোথাও থামার নেই, শুধু চলতে থাকা, যতক্ষণ না বাড়ি আসে। দস্তরখ্বানের খাবারে পেট ভরেছে জম্পেশ, আর পর পর শোনা গল্পে ভরে গেছে মন। এখন শুধু ক্রুজ কন্ট্রোল মোডে মোটরসাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে বসে থাকা। ক্রমশ পেরিয়ে গেলাম সেই এলাকা, এক্সপ্রেসওয়ের যে অংশটা রানওয়ে হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আর তার একটু পরেই সূর্য ডুবে গেল।

স্মৃতিতে এক এক করে ফিরে আসছে গত কয়েকটা দিন। পারোতে সেই কষ্ট করে টাইগার্স নেস্টের চূড়ায় ওঠার স্মৃতি, সমীরণের গলায় শোনা সেই গানেরা, গুরুদোংমারের পথে ঝাঁকুনির চোটে আমার মোটরসাইকেলের লাগেজ ক্যারিয়ারের একটা একটা করে রড খুলে বেরিয়ে আসা, সবশুদ্ধ আমি আমার পরের লেখাগুলোকে সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম।

কিন্তু সামনে আরও একটা জিনিস দেখতে পাচ্ছিলাম, আমার ফুয়েল ইন্ডিকেটরের দৈর্ঘ্য ক্রমশ কমছে। একটা দাগ মানে, চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার, সেই হিসেবে যতগুলো দাগ এখনও বাকি আছে, তাতে করে তো মনে হচ্ছে না তেল না ভরে আমি লখনউ এক্সপ্রেসওয়ে পুরো কভার করতে পারব! এখনও একশো তিরিশ কিলোমিটার বাকি, আর তেল যা বলছে, খুব বেশি হলে আমি ষাট সত্তর কিলোমিটার টানতে পারব। এমন কেন হল?

মাথায় এল, আমি পেট্রল ভরেছি এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠার প্রায় চব্বিশ কিলোমিটার আগে, এক্সপ্রেসওয়ের শুরুতেই একটা পেট্রল পাম্প আছে, সেইখানে ট্যাঙ্ক ফুল করে নিলে কাজ দিত, কিন্তু আমি ফুল করেছি তার অনেক আগে, যাই হোক, সঙ্গে জেরিক্যান আছে, তেল ভরে নেওয়া যাবে, কিন্তু এই নির্জন এক্সপ্রেসওয়েতে ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে তেল ভরা-টা নিরাপদ, সেটা বুঝতে বুঝতেই পেরিয়ে এলাম আরও চল্লিশ কিলোমিটার, ইন্ডিকেটরে আরও একটা দাঁড়ি কমে গেল।

দাঁড়াতে হবেই, কিন্তু আরও একটা সাঙ্ঘাতিক কাজ করে ফেলেছি, সেইটা আমাকে আরও বেশি চিন্তায় ফেলল।

পেট্রল ভরার ফানেলটা আমি আমার লাগেজের মধ্যে প্যাক করে ফেলেছি, সেই ব্যাগে রেনকভার মোড়ানো আছে, এবং তার ওপর দিয়ে দু স্তরের বানজি কর্ড লাগানো আছে। শুধু দাঁড়ালেই হবে না, আমাকে সমস্ত লাগেজ খুলে ওই ফানেল বের করতে হবে, তবেই আমি পেট্রল ভরতে পারব। আবারও, রাত আটটা বাজে তখন, ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে এসব করা নিরাপদ – ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

কী মনে হতে হঠাৎ চোখ গেল আকাশের দিকে, আর ঠিক সেই সময়েই মাথার একদম ওপর থেকে দ্রুতগতিতে লম্বা লাইন টেনে দিগন্তের একটু ওপরে চলে গেল একটা তারা, আর মিলিয়ে গেল।

উল্কা! উল্কা! তারাখসা!! আমি এতদিন পড়েছি এই জিনিসটার ব্যাপারে, হিন্দি সিনেমার রোম্যান্টিক সীনে কম্পিউটার গ্রাফিক্সে বানানো “টুটতা-হুয়া-তারা” দেখেওছি, কিন্তু সরাসরি নিজের চোখে, সত্যিকারের তারাখসা দেখতে পেলাম, এই প্রথম।

হিন্দি সিনেমা আমাদের শিখিয়েছে, টুটতা-হুয়া-তারা দেখলেই চোখ বন্ধ করে উইশ করতে হয় – সে কথা ভাবতে গিয়েই আমার এই টেনশনের মধ্যেও ফ্যাক করে হাসি পেয়ে গেল। তার পরে মনে মনে ভাবলাম, একটা উইশ করেই দেখি না – এই মুহূর্তে কী উইশ করার আছে আমার? একটা নিরাপদ জায়গায় নির্বিঘ্নে দাঁড়িয়ে, লাগেজ যতটা সম্ভব না খুলে ফানেলটা বের করে মোটরসাইকেলের ট্যাঙ্কে তেল ঢালা।

সত্যিই অলৌকিক ব্যাপার, আর কয়েক কিলোমিটার দূরেই দেখলাম একটা কাট, যেখান থেকে বাঁদিকে রাস্তা বেরিয়ে যাচ্ছে, সেখানে একগাদা চড়া ফ্লাডলাইট বসানো, আর চারধার দিনের আলোর মত পরিষ্কার। গাড়ি সাইড করে দাঁড় করালাম।

ফানেলটা আছে ওপরের ব্যাগেই, আর দাঁড়িয়ে দেখে মনে হল, পুরো কর্ড খোলার দরকার নেই, ওপরের কর্ডটা একটু লুজ করলেই ব্যাগের রেনকভারটা অর্ধেক সরানো যাবে, আর চেনটা খুললেই সামনে ফানেল। সবার ওপরেই রেখেছিলাম।

খুব সহজেই ফানেল বেরিয়ে এল ব্যাগ থেকে, বানজি কর্ডের আঙটা খুলতেও হল না। পাঁচ লিটার পেট্রল ঢেলে দিলাম ট্যাঙ্কের মধ্যে। তার পরে আবার চলা শুরু।

সওয়া নটা নাগাদ নির্বিঘ্নে লখনউ আগ্রা এক্সপ্রেসওয়ে পেরিয়ে গিয়ে পড়লাম যমুনা এক্সপ্রেসওয়েতে, এবং পৌনে দশটার সময়ে মথুরার পেট্রল পাম্পে। ট্যাঙ্ক আবার ফুল করে নিলাম, বাড়ি আর মাত্র দেড়শো কিলোমিটার মতন।

যমুনা এক্সপ্রেসওয়েতে প্রতিটা টোল বুথের কাছে বড়সড় খাবার জায়গা আছে, কিন্তু আমার আর খাবার ইচ্ছে নেই এখন, আর বলে রেখেছি, যত রাতই হোক, বাড়ি পৌঁছে খাবো।

সিকিম আর ভুটানের গল্প এ বারের মত শেষ, এর পরে আরও লম্বা কোনও জার্নির জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।

মনে মনে হিসেব কষছিলাম, সবশুদ্ধ কতগুলো রাজ্যে আমার মোটরসাইকেলের চাকা পড়লঃ দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, সিকিম, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড। ছটা।

ফাইনালি বাড়ি পৌঁছলাম যখন, তখন তারিখ বদলাতে বাকি আর মাত্র পনেরো মিনিট। লাগেজ সমস্ত বের করে নিয়ে লিফটের সামনে রেখে, শেষবারের মতন কী মনে হল, মোবাইলটা নিয়ে দৌড়ে গেলাম মোটরসাইকেলের কাছে। শেষবারের মত কিলোমিটার রিডিংটা নিলাম।

আপনারা যোগ করতে পারেন তো?


https://achalsiki.files.wordpress.com/2018/04/odometer.jpg


Name:   সিকি           

IP Address : 132.177.198.143 (*)          Date:29 Apr 2018 -- 08:27 PM

সেশ।


Name:  গবু          

IP Address : 116.203.185.175 (*)          Date:29 Apr 2018 -- 10:27 PM

আহা বেশ বেশ!

শেষ তো? 😁


Name:  dd          

IP Address : 59.205.216.234 (*)          Date:29 Apr 2018 -- 10:27 PM

বাঃ বাঃ বাঃ। ফের বেরুচ্ছো কবে?

আর ঐ যে চারজনের ছবি দিলে তাতে বিপিন কোনজনা?

আর এটা যাস্ট তাদের জন্য যারা গুগুলও দেখতে চান না, বিরাট রাজার মৎস্য দেশ লোকে বলে জয়পুর সংলগ্ন অঞ্চল।
আর কুরুক্ষেত্রের 14thদিনে ,সেদিন রাতের বেলাতেও যুদ্ধ হয়েছিলো, তখন ঘটৎকচের ছেলে অঞ্জনপর্বা ফৌত হয়। মূল মহাভারতে আর কোনো ছেলের গপ্পো ছিলো না।

সারা ভারত জুড়ে এরকম নানান লোককথা আছে , নট নেসেসারিলি পান্ডবদের সুখ্যাত করে। ভেরী ইন্টেরেস্টিং।


Name:  শঙ্খ          

IP Address : 126.206.220.199 (*)          Date:29 Apr 2018 -- 11:14 PM

যা, শেষ হয়ে গেল? একটু ভারি হয়ে গেল মনটা। ভারি সুন্দর হচ্ছিল।

যাকগে, সব ভালো জিনিসেরই শেষ আছে। সিকিকে কুদোস!


Name:   সিকি           

IP Address : 132.177.198.143 (*)          Date:29 Apr 2018 -- 11:54 PM

বিরাটনগর, বিরাট রাজার রাজ্য, যদ্দূর জানি এখন নেপালে পড়ে। বিরাট রাজা কি মৎস্য রাজ্যের রাজা ছিলেন? জয়পুরের কাছে মৎস্যনগর বলে একটা জায়গা সত্যিই আছে।


Name:   সিকি           

IP Address : 132.177.198.143 (*)          Date:29 Apr 2018 -- 11:56 PM

ছবিতে একদম বাঁদিকে চশমা পরা যে ছেলেটি, সে-ই বিপিন।


Name:  Pagla Dashu          

IP Address : 34.146.214.225 (*)          Date:03 May 2018 -- 06:06 AM

দেড় ঘন্টায় একশ (মাইল বা km ) এই নিয়ম - ইহি সাচ - দেরা সঁচা সৌদা ক্লাব এর নাম দিল bike বাবা ওই লাইন এ - ইস্টার্ন bull এর পিন দেখলাম, ভালো লাগলো - পালসার দিব্বি ভালো bike - পিছনের tire টা ভালো হয়েছে এক সাথে সামনের টাও বদলে দিলে পারতেন? আর টুক টাক মেরামতি নিজেও করে নেয়া যায় বোধয় অল্প দু একটা টুল থাকলেই, তবে ও বোধয় RE র লোকজন শখ এ করে থাকে মেকানিক এর অভাব নেই কোথাও| অপেক্ষা করে থেকেছি - হামলে পড়েছি - খুব ভালো লেখা।
গোধূলি র ছবি টা খুব ভালো - কথিত আছে ওই সময় একটু কোথাও দাঁড়িয়ে যেতে হয় - অন্ধকার জমাট বাধলে তবে আবার চালানো, বোধহয় চোখে আলো লাগতো বলে, বা উল্টো দিক এর হেড লাইট পরিষ্কার দেখা যেত না বলে - অথবা শত্তি জীন পরী দেড় ঘুম ভাঙে তখন |
আর একটা কথা - অন্য কোথায় আর কি লিখবো - এখানেই লিখি| আমরা যারা অনেকটা হেটে এসেছি - আমাদের বোধহয় আর সব তক্কো জেতার দরকার নেই আর| আপনারা যারা এখনো অনেকটা হাঁটবেন তাদের কাছে অনুরোধ অশালীন নামকরণ করে বৃদ্ধ মানুষ দেড় নিচু নাই করলেন| নমস্কার


Name:  সিকি          

IP Address : 158.168.40.123 (*)          Date:03 May 2018 -- 07:59 AM

পাগলা দাশু,

ধন্যবাদ।

মোটরসাইকেলের দুটো টায়ারই বদলানো হয়েছে। পেছনের টায়ার আগেই বদলেছি, অক্টোবরে বেরোবার আগে সামনের টায়ারটাও বদলেছি - প্রথম বা দ্বিতীয় পর্বেই লিখেছি সে কথা।

টুকটাক মেরামতি বলতে পাংচার হলে সারতে পারি আর হাওয়া ভরতে পারি। এর বেশি দরকারও হয় না মোটরসাইকেল নিয়মিত সার্ভিসিং করালে।

গোধূলির ব্যাপারটা একদম ঠিক লিখেছেন, গোধূলির সময়টাতে না-দিনের আলো, না হেডলাইটের আলো, কোনওটাই জোরালো মনে হয় না, চোখে অসুবিধে হয় অল্প আলোয় সবকিছু সইয়ে নিতে। দাঁড়ালে ভালোই হত, কিন্তু সুদূর ফাঁকা এক্সপ্রেসওয়েতে আর দাঁড়ানোর দরকার হয় নি।

অন্য প্রসঙ্গে, না, তক্কে জেতার দরকার নেই। কোনও মেয়ের সাথে বাঁদরামি করার পরে যখন কোনও যুবককে আমরা 'রোমিও', 'চ্যাংড়া' বা 'লাফাঙ্গা' বলে নিন্দে করি, সেটা যেমন সমগ্র যুবককূলের উদ্দেশ্যে নিন্দে করা হয় না, তেমনই কিছু নামকরণ করে সমগ্র বয়স্ক মানুষদের নিচু করা হয় নি, যাঁরা মাসল পাওয়ার দেখিয়েছিলেন, তাঁদেরই বলা হয়েছে শুধু। এটা রাগের বহিঃপ্রকাশ, আর রাগ কখনওই র‌্যাশনাল ওয়েতে প্রকাশিত হয় না।


Name:  স্বাতী রায়           

IP Address : 127.194.44.94 (*)          Date:03 May 2018 -- 06:59 PM

শেষ মানে তো নতুনের শুরু. পরেরটা কবে কোথায়? সেই অ্যাম্বিসাস প্রোজেক্ট টা ? ...

হেব্বী হয়েছে লেখাটা .


Name:  স্বাতী রায়           

IP Address : 127.194.44.94 (*)          Date:03 May 2018 -- 06:59 PM

শেষ মানে তো নতুনের শুরু. পরেরটা কবে কোথায়? সেই অ্যাম্বিসাস প্রোজেক্ট টা ? ...

হেব্বী হয়েছে লেখাটা .


Name:   সিকি           

IP Address : 132.177.198.143 (*)          Date:03 May 2018 -- 11:39 PM

পরেরটা হয় তো এ বছরেই। বাকিটা সাসপেন্সে থাক :)


Name:   সিকি           

IP Address : 132.177.198.143 (*)          Date:08 May 2018 -- 11:40 PM

বিপিনকে নিয়ে আজ সংবাদ প্রতিদিনে একটা আর্টিকল বেরিয়েছে।

http://www.sangbadpratidin.in/asansol-biker-with-prosthetic-limbs-emba
rks-on-world-tour/



Name:  ইফতেখার , টরোন্টো          

IP Address : 109.227.240.128 (*)          Date:14 May 2018 -- 05:18 AM

দারুন লেখা...... এক টানে বসে সব পড়ে ফেলেছি।


Name:  avi          

IP Address : 57.11.203.5 (*)          Date:14 May 2018 -- 08:50 AM

এই লেখাটা পড়ে সিকিমের ওই জায়গাগুলো আর একবার চোখের সামনে জেগে উঠলো। দেখতে খুব ইচ্ছে হলো। ফলে ধাঁ করে আরেকবার ঘুরে এলুম উত্তর আর পুব সিকিম। চার চাকায় অবিশ্যি। রাস্তার সমস্ত দু চাকায় দুনিয়াজয়ীদের নতুন করে দেখে নিচ্ছিলাম এবার। গুরুডংমারের রাস্তায় বরফে ঢাকা কামান, ট্যাঙ্ক আর পাহাড়ের ব্যাকড্রপে, জিরো পয়েন্টের স্নোফলের মধ্যে, ইয়ুমথং রোডোডেনড্রন পার্কের মধ্যে - সিকিময় সিকিম। :))


Name:   সিকি           

IP Address : 233.225.45.225 (*)          Date:14 May 2018 -- 09:24 AM

তোমার আর কী, তোমার তো পাশের পাড়া - উইকেন্ডে গেলেই হল টাইপ।


Name:  pi          

IP Address : 167.40.205.189 (*)          Date:14 May 2018 -- 09:31 AM

সিকিময় সিকিম টা ভাল হয়েছে। পরের বইয়ের নাম এটা দিলেই হয় ঃ)


Name:  সিকি          

IP Address : 158.168.40.123 (*)          Date:14 May 2018 -- 10:07 AM

সিকিমে সিকি নামটা কেমন? বেশ একটা হিন্দি হিন্দি ভাবও আসবে - সিকি-মে সিকি। :)


Name:  saumitra          

IP Address : 228.248.49.2 (*)          Date:15 May 2018 -- 12:48 PM

আপনার দু'চাকার ভ্রমন কাহিনী রুদ্ধশ্বাসে পড়লাম, যেমন পড়েছি লাদাখের দু,রকম ভ্রমন। নতুন সারভিস করা সাইকেলের মত সাবলীল ভাবে গড়িয়ে যায় আপনার লেখা। উত্তরবঙ্গও পড়েছি,খুব মন ছুয়ে গিয়েছিল। প্রসংগতঃ আমারও এনজিনিয়ারিং কলেজের হস্টেল ব্যাকগ্রাউন্ড আছে।
একটা কৌতূহল বা জানার বিষয় আছে, যে এই সুদীর্ঘ পথে কখন ব্রেকডাউন ফেস করতে হয়েছিল কি? সাম্ভাব্য ব্রেকডাউন বা পাংচার ইত্যাদির জন্য কি ধরনের ব্যাবস্থা নিয়েছিলেন? আমি টুকটাক মোটর সাইকেলে ঘুরি, শেয়ার করলে উপকৃত হব। আরো লিখুন প্লীজ।
ধন্যবাদ।



Name:  saumitra          

IP Address : 228.248.49.2 (*)          Date:15 May 2018 -- 12:51 PM

@ সিকি, 14 May 2018 -- 10:07 AM
জটায়ু টাইপ হবে।


Name:  হুঁকো / কল্যাণী          

IP Address : 113.208.144.89 (*)          Date:16 May 2018 -- 04:39 PM

সিকি-র "২-ই দেশ - ৬-য় রাজ্য" এক নিশ্বাসে পড়তে হয়েছে। রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়া - এত সাবলীল বর্ণনা, যেন চোখের সামনে সব ভাসছে।
আমি প্রায় সত্তুর বুড়ো। কিন্তু মনে হল যে সিকি-র সাথে আমিও ঘুরে এলাম।
বসে রইলাম - আরো কিছু পাবো বলে।


Name:  সিকি          

IP Address : 158.168.40.123 (*)          Date:16 May 2018 -- 05:04 PM

হুঁকো - অনেক ধন্যবাদ।

এ যাত্রায় তো আর কিছু পাবার নেই, তবে বছরের শেষাশেষি নাগাদ নতুন কিছু পাবেন আশা করছি।

এই সুতোর পাতাগুলি [1] [2] [3] [4] [5] [6]     এই পাতায় আছে149--179